লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৩১ ডিসেম্বর ১৯৯০
গল্প/কবিতা: ১টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবাবা দিবস (জুলাই ২০১৪)

অজানা ঠিকানায়
বাবা দিবস

সংখ্যা

Noor Jahan Amin Nayon

comment ০  favorite ০  import_contacts ৫৬৬
সময়টা বড়ই অদ্ভুত। বেশ ক’দিন থেকে কেমন যেন সব কিছু আচানক মনে হয়। বাতাসের গতিটা বড়ই মন্থর। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। একটা অজানা কষ্ট মনের মাঝে ভিড়ে বিষাদ কাল মেঘ হয়ে আছে,মনে হচ্ছে ভারি বর্ষণে সস্তি পাব।না তা আর হচ্ছেনা।মনের সাথে কথোপকথন করেই যাচ্ছি।কার ও কিছু হয়নি তো। সবার সাথে কথা হচ্ছে, তবুও মনের ভিতরের হাহাকার কমছে না।প্রায় এক সপ্তাহ ধরে এমন লাগছে। তবে দু’দিন ধরে একটা দুঃস্বপ্ন আমাকে ভীষণ তাড়া করছে। বড্ড বেশি কান্না পাচ্ছে। ইচ্ছে করছে হাও মাও করে কাঁদি। ভাইয়াদের ফোন করি, বাবাকে মাকে সবাইকে ফোন করি। আমার কিছুই ভালো লাগছেনা। নামায পড়ে আল্লাহর কাছে কাদি।তারপর একটু সস্তি পাই।সারা দিনের বেস্ততার পর ভার্সিটি থেকে এলেই বাবার সাথে রোজ কথা বলি।বাবার সাথে কথা না বললে মনে হয় পুরো দিনটাই আমার ফাঁকা। সাত বছর ধরে বাবা প্যারালাইসিসে চলা ফেরা করতে পারেনা।সারাক্ষণ বদ্ধ ঘরে ছাতকের মত তৃষ্ণার্ত চোখে বাইরে তাকিয়ে থাকে। বাবাকে এভাবে থাকতে দেখে বুকের ভিতরটা হু হু করে উথে।তবুও নিয়তির নিষ্ঠুর নিয়মে ও ভাবেই থাকতে হয়।জীবনের তাগিদে আমরা সব ভাইবোন বাবা-মায়ের থেকে দূরে থাকি। ভাইয়ারা বাড়ি গেলেই বাবা যেন প্রান ফিরে পায়।ওরা বাবাকে হুইলচেয়ারে করে এদিকওদিক নিয়ে যায় আবার বাবা একা হয়ে যায়। অসহায়ের মত থাকে। তাই বাবার সাথে একটু বেশি কথা বলা, বাবাকে হাসানোর চেষ্টা, যাতে বাবার মনটা ভালো থাকে।বাবার সাথে সারাক্ষণ দুষ্টুমি করি। বাবাও তাই। বাবা ভীষণ মজার মানুষ, লোকে বলে তোমার বাবার কথা শুনলে মৃত মানুষ ও হেসে দিবে, এমনি রসিক।বাবার সাথে খুনসুটি লেগেই থাকে।বাবার সাথে যখন ফোনে কথা বলি সবাই বুঝতে পারে আমার সাথে কথা বলছে।আমার সাথে কথা বলার সময় বাবা শুধু হাসে কথা খুব কম বলে। প্রান খোলা হাসি হা হা করে হাসতে থাকে। উচ্ছ্বাসের হাসি যেন ঝরনার কলতান। সবাই আমায় বলে তুমি তোমার বাবাকে কি এমন বল তোমার বাবা এত হাসে। আমিও হাসি।বাবা যেমন বলে আমিও তেমন বলি।তাই বাবার সাথে কথা বলার সময় অটো রেকর্ড দিয়ে রাখি, পরে সেগুলো আবার শুনি মন ভালো হয়ে জায়।প্রায় তিন মাস হয়ে গেল বাড়ি থেকে আসছি। ইচ্ছে থাকা সত্তেও বাড়ি যেতে পারছিনা। ছুটি নেই। এবার বাড়ি গিয়ে বাবার কিছু আচরণ আমার মনে দাগ কাটে। বাবা এমন কখনো করেনি। বাবার সব কিছু পরিপাটি থাকতে হয়, ভীষণ রাগি মানুষ। কোন কিছুর দরকার হলে ডেকে এখুনি সেটা করার জন্য অর্ডার করে।কিন্তু এবার বাবা কিছুর জন্য বলতেই কেমন যেন অসহায়ের মত কান্না জড়ানো কণ্ঠে বলতো আমায় এটা এনে দে। বাবার অসহায়ত্ত বুঝতাম সেটা বাবাকে বুঝতাম না।বাবার হিসেবটা সবার কাছে আলাদা। মা থেকে শুরু করে ভাইয়ারা সবাই পৃথিবীর সব এক দিকে আর বাবার সব আরেকদিকে। বাবাকে সবাই এত ভালবাসে, এত সমীহ করে যে বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলেনা। বাবা গুণী মানুষ, বাবার সবচেয়ে বড় পরিচয় বাবা পরোপকারী, সততার প্রতীক। অন্নের জন্য বাবা নিজের জীবন বাজি রেখেছেন।বাবার জীবনী মনে পড়লে নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে হয়। এমন একটা মহৎ মানুষের সন্তান আমি।
আবার বাবা যখন ঘুমাত তখন বাবার নাকের কাছে হাত নিয়ে দেখতাম ঠিক আছে তো? তবে এমন কৌতূহল এর আগে আমার কখনো হয়নি।একদিন মাকে বলি আমার এবার এমন কেন মনে হচ্ছে? দুঃস্বপ্নটার কথাও বলি।মা আশ্বাস দেয়।কিন্তু আমার সেই অজানা কষ্ট আমায় রোজ তাড়া করে। রোজ হাউমাউ করে কাঁদি।সামনে রোজার ঈদ, এখনি কেনাকাটা করতে হবে। কাল থেকে রজা।বাবার জন্য আর ভাইয়াদের জন্য ভাইয়ারা অনেক আগেই অর্ডার দিয়ে দিয়েছে। শুধু আমার, মায়ের, পুস্কু পাস্কুর জন্য আমাকে কিনতে হবে। ভার্সিটি থেকে ফেরার সময় বাড়িতে ফোন দেই। মার জন্য কেমন শাড়ি কিনবো। ফোন দিতেই বাবা রিছিভ করল। কেমন আছে জানতে চাইলে বাবা হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। আর তখনি লাইনটা কেটে গেল। তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে বাবাকে ফোন করি। বাবা কি হয়েছে? বাবা আবারো কাঁদছে। বুকের ভিতরটায় আবারো হু হু করে উঠছে।আমাকে কাঁদতে কাঁদতে মনুর কথা বলল। মনু আজ ঢাকায় চলে গেছে। মনুর জন্য বাবার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমার ছোট দু’ভাই মনু, মাহফুয।দু’জনেই হাফেয। রমজান মাস, ওরা তারাবীহ পরাবে।মাহফুজ বাড়ির মসজিদে আর মনুর তারাবীহ তখনো ঠিক হয়নি। তাই বাবার কষ্ট হচ্ছে। বাবাকে বুঝালাম। তারপর আর বাবা কথা বলল না।মাকে দিয়ে দিল।মনটা আর ভালো লাগছেনা।কাল আমার প্রেসেনটেসান। স্লাইড বানাতে হবে। তাই ঐ কাজ করছিলাম। কাজ করতে করতে রাত ১২ টা বেজে গেল। বাবাকে আবার ফোন দিব। এর মাঝে মনু ফোন করে বলল ওর তারাবীহ ঠিক হয়েছে মিরপুরে। আলহামদুলিল্লাহ্‌ শুনে মনটা ভরে গেল। বাবাকে জানাতে বললাম। বাবাকে জানিয়েছে আগেই। ফোন হাতে নিয়ে আর কল দেওয়া হয়নি। মনে হল বাবা ঘুমিয়ে পড়লে ফোনের শব্দে বাবার ঘুম ভেঙ্গে যাবে। বরং সকালে ফোন করব। সারাটা রাত এক বারের জন্য চোখের পাতা বন্ধ করতে করতে পারিনি। ভোর হতেই আমার ভাই বুলবুলের ফোন, এত সকালে ভাইয়া বলল কি করিস? বললাম কাজ করি, ভাইয়া বলল রেডি হও আমরা বাড়ি যাবো। বাবা অসুস্থ। আমার তখনি খটকা লাগলো আমার পরীক্ষা আছে শুনেও ভাইয়া আমাকে বাড়ি নিয়ে যাবে কেন? এরি মাঝে আমার ফ্রেন্ড শাহাদাত ফোন করে একই কথা বলল। কিন্তু কিছুই মিলাতে পারছিনা। বাবার সাথে সন্ধায় ও কথা বলছি। রাত ১০ টায় মনু কথা বলছে।

আর বাবা অসুস্থ হলে বাবাকে ঢাকায় নিয়ে আসবে। আমারা বাড়ি যাবো কেন? বাড়িতে ফোন করি। মাহফুজ এর সাথে কথা হয়, ওর কাছে জানতে চাইলে ও তাই বলে। আমার চাচাত ভাই হাসান, ফুফাতো ভাই রিয়াদ কেও ফোন করি সবাই একই কথা বলছে। ততক্ষণে মনের মধ্যে ঝড়ের তাণ্ডব বইছে। অঝরে বারি ঝরছে। তার কিছুখন পর আমার বড় ভাই মেহেদী আসছে আমাকে নিয়ে যেতে। পুরোটা রাস্তা আমার হাত ধরে রেখেছে। ওর মুখের দিকে ,চোখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। আমরা তাড়াতাড়ি যাবার জন্য মাইক্রো ভাড়া করি। রাস্তায় মনু আর বুলবুল ভাইয়া উঠলো। এবার আর আমার বুঝতে বাকি রইলনা। কিন্তু আমি সেটা বিশ্বাস করতে পারছিনা। এও কি সম্ভব? বাবার কান্না এখনো আমার কানে লেগে আছে। না এমন একটা সময়ের মুখোমুখি আমি হবো কখনো ভাবতেও পারিনি। তবে আমার দুঃস্বপ্ন টাই সত্যি হল? এ জন্য কি আমার সেই অজানা কষ্ট আমাকে তাড়া করল? তবে এটা বিধাতার কেমন খেলা? আমরা সবাই বাড়ি গিয়েছি ঠিক। কিন্তু বাবা আমাদের কাউকে আর বুকে জড়িয়ে নেয়নি। পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়নি। হা হা করে আর হাসেনি। বাবার জন্য ভাইদের বানানো ফতোয়া আর পরা হয়নি। এমনকি বাবা চেয়েও দেখেনি। শুধু অঝোর ধারায় কান্নার নোনতা জ্বলে সবাইকে ভাসিয়ে বাবা চলে গেছে অজানা পথের হাত ধরে।
ছোট বেলা থেকে বাবাকে চিঠি লিখতাম, বাবাও আমাকে লিখতেন। অনেকটা বছর পার হয়ে গেছে। কলম আর ডায়েরীর পাতা হাতে তুলে নেওয় হয়না। বাবাকে লিখব বলে। আজ আবার সেই কলম ডায়েরীর পাতা হাতে তুলে নিলাম বাবাকে লিখব বলে.।।বাবা, কেমন আছ তুমি? আমার বিশ্বাস বিধাতার পরম মহিমায় তুমি ভালো আছ। তিনি যেন তোমায় কোন কষ্টের আঁচড় লাগতে না দেয়।আমি একটুও ভালো নেই। বাবা তুমি কি অনেক বেশি অভিমান করে আছ? রোজ ফোন করি তুমি একবারের জন্য ফোন রিছিভ করোনা। বল আমার কি কষ্ট হয়না? থাক আমায় নিয়ে আর ভেবনা। আমার জন্য দোয়া করো। জানো বাবা কত মজার ঘটনা ঘটে তুমি শুনলে খুব মজা পেতে। কিন্তু আমি তোমাকে বলতে চেয়েও বলতে পারিনা। আর হ্যাঁ বাবা তুমি না বলেছিলে আমায় একটা ল্যাপটপ কিনে দিবে, তার আর দরকার হবেনা। আমার ভাইয়েরা আমায় ওটা দিয়েছে। খুব সুন্দর। আমার পছন্দ হয়েছে। অনেক গুলো হাসির নাটক রেখেছি তুমি দেখলে হাসতে হাসতে তোমার পেতে খিল ধরে যাবে। এইতো আর কটা দিন। তারপর সবাই আসবো। বাবা আরেকটা কথা অবশ্য তোমাকে বলেই বা কি লাভ? তুমি তো সব সময় তোমার ছেলেদের পক্ষই নিবা। তাও বলি। আর মাত্র দুটা সেমিস্টার শেষ হলে তোমার মেয়ে গ্র্যাজুয়েট হবে। আর তোমার ছেলেরা এখনো ফোন করলে বলে কিরে স্কুলে গিয়েছিস? বলতো কেমন লাগে? জানি তুমি খুব হাসবা, মজাও পাবা। আমার কষ্ট আমারি থাক। বাবা দেখতে দেখতে সেমিস্টার গুলো শেষ হয়ে গেল। রেজাল্ট ও হয়ে গেল। তোমায় কতবার ফোন করেছি বলার জন্য তুমি একবার ও রিছিভ করনি। তুমি না রেজাল্ট শুনার জন্য কত প্রতিক্ষায় থাকতে।কত খুশি হতে। বাবা তোমার মনে পরে তুমি আমায় বৃত্তি দিতে নিয়ে গিয়েছিলে আমি বৃত্তি পাওয়ার পর তুমি কত খুশি হয়েছ। বাবা ছোট বেলায় তো কত বৃত্তি পেলাম। তাই বুঝি বড় বেলার এই রেজাল্ট শুনার জন্য তোমার আর সময় নেই।
আচ্ছা বাবা আমার ভাগ্যটা এমন কেন? সেই প্রথম এস।এস।সি পরীক্ষার রেজাল্ট হবে পরদিন তার আগের দিন তোমায় খোদা নিয়ে যেতে চাইলো, ভাবিনি কখনো আমার পড়াশুনা হবে। তারপর তুমি সুস্থ হলে, তোমার ছেলেরা কত কষ্ট করে আমায় কলেজে ভর্তি করালও। আবার যখন ফাইনাল পরীক্ষা দিব ঠিক তার আগের দিন আবার তোমায় নিয়ে যেতে চাইলো। ভেবেছিলাম ছাত্র জীবনের ইতি আমার টানতে হবে। না বাবা তা হয়নি। খোদা তোমায় ফিরিয়ে দিলেন। আর আমায় নিয়ে তোমার ছেলেরা এক পাও পিছু হয়নি। দুঃখের তপ্ত সাগর পাড়ি দিয়ে আমায় নিয়ে ছুটল দিগন্তের দিকে। গোধূলি লগ্নে রাত পেরুলেই ভোরের আলোর আভা দেখবে ঠিক তখনি তোমায় চলে যেতে হবে? বাবা আমায় নিয়ে না কত সপ্ন দেখতে। বাবা ছটা মাস কি তোমার খুব দেরী হয়ে যেত? বাবা আমি তোমায় কিছুই দেখাতে পারিনি।আমি যে বড়ই হতচ্ছরি।বাবা এখনো শেষ বিকেলের রোদ ডুবে যায়। অন্ধকারে আলোর ছটা দেখা যায়। শুধু আমি তোমায় আলো দেখাতে পারিনি। বাবা পত্রিকায় আমার লেখা দেখলে তুমি কত খুশি হতে। জানো বাবা বই মেলায় আমার বই প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু আমি তোমায় বলতে পারিনি। বাবা এত চড়াই উতরাই এর মাঝে আমায় নিয়ে তুমি রুপী ভাইগুলো যে সপ্ন দেখে, শরীরের রক্ত কে ঘামে ঝরায়, আমি যেন ওদের সপ্ন তোমার সপ্ন, এক দুঃখিনী মায়ের সপ্ন পুরন করতে পারি। ঐ দুঃখিনীর হৃদয়ের আর্তনাদ, ভাইদের কষ্টের দাগ যেন মুছে দিতে পারি। একটা সোনালী সূর্য যেন আঁকতে পারি।
বাবা আমি জানি আমার এই চিঠি তুমি পড়বে না। উত্তর দিবেনা এমনকি তোমার কাছেও জাবেনা। তবুও তোমায় লিখলাম কোন অজানা ঠিকানায়।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement