এক.
"স্লামালাইকুম"। কামরায় প্রবেশ করলো ২০/২২ বয়েসী একটি মেয়ে। আমি তাকে দেখে চমকে উঠলাম। বললাম, "আরে অনন্যা, তুমি কোত্থেকে?"
হাসলো মেয়েটি। কোনো কোনো মেয়েরা হাসলে গালে টোল পড়ে। এই মেয়েটিও সে রকমের। সে বললো, "আমার নাম নিতুন। রংপুর থেকে এসেছি। শুনেছি আপনি একজন ভালো সাইকিয়াটিস্ট।"
বলে কি মেয়েটা! তার নাম নিতুন কি করে হয়। তার নাম তো অনন্যা। আমার কি তাহলে কোনো ভুল হয়েছে? হতে পারে, সারাদিন নানারকম মানসিক রোগী দেখতে দেখতে হয়তো আমিও ওদের একজন হয়ে গেছি।
"ডাক্তার সাহেব! আপনি আমার কথা বুঝতে পেরেছেন?"
"দেখো তোমার নাম কিন্তু অনন্যা। তুমি নিতুন বলছ কেন?"
"আমি জানি না অনন্যা কার নাম। আমার নাম নিতুন।"
"ভালো কথা। নিতুন তুমি এখানে কেন এসেছ?"
"রোগী হয়েই কেউ ডাক্তারের কাছে আসে। তাই নয় কি?"
"ভালো কথা। বলো তোমার সমস্যা কি?"
"সমস্যা অতি সাধারণ।"
"যেমন..."
"আমার মাঝে মাঝে মনে হয় যেন পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে যায়। আমার তখন ইচ্ছে হয় কাউকে খুন করে ফেলি"
"কাকে?"
"যেমন এ মুহূর্তে আপনাকে।"
"ভালো কথা, কিন্তু কেন?"
"কারণ, আপনার একটি মুদ্রা দোষ আছে। যেমন- আমার কথাগুলো কোনোটাই ভালোকথা বা ভালো লক্ষণ নয়। অথচ আপনি প্রতি বাক্যেই বলছেন, 'ভালোকথা'।
"আচ্ছা, তুমি কি মাঝে মাঝে রাতে বিশ্রী কোনোরকম স্বপ্ন দেখো?"
"স্বপ্ন দেখি, তবে বিশ্রী নয়। সুন্দর স্বপ্ন। যেমন সে আমাকে বলে, তোমার একটি সন্তান হয়েছে। তার নাম 'সাহারা'। তখন আমি বহুদূর থেকে সাহারা নামের একটি শিশুর কান্না শুনতে পাই।"
"তুমি কি আমাকে চিনতে পেরেছে?"
"আপনি ডাঃ মিযানুল কারীম চৌধুরী। একজন সাইকিয়াটিস্ট।"
"তুমি আমার কাছে কী চাও?"
"এই চেম্বারে ঢোকার আগে ৫শ' টাকা ভিজিট দিয়ে প্রবেশ করেছি। আমি আপনার একজন পেশেন্ট। একজন পেশেন্ট ডাক্তারের কাছে কী চায়? চায় ডাক্তার সাহেব তার সমস্যা সমাধানে মনোযোগ দিক।"
"কিন্তু তোমার তো কোনো সমস্যা-ই নেই। দিব্যি আমার সাথে তুমি সুন্দর সুন্দর কথা বলছ।"
"আমি তাহলে মাঝে মাঝে বাচ্চার কান্না শুনতে পাই কেন?"
"হয়তো পাশের কোনো বাসা থেকে।"
"আমাদের বাড়ির আশেপাশে কোনো বাড়ি নেই। চারদিকে ফসলের মাঠ। প্রায় দু'মাইল দূরে মানুষের বসতি।"
"তুমি যে বাচ্চাটার কান্না শুনতে পাও তার বয়স আনুমানিক কত হবে?"
"সদ্যজাত শিশু। সে 'মা' 'মা' বলে কাঁদে।"
"এ শিশুর কান্না কি সব সময়ই শুনতে পাও?"
"না। যখন একা থাকি ঠিক তখন, অথবা ঘুমের মধ্যে।"
"স্বপ্ন দেখার পর?"
"জি্ব।"
"তুমি কি বিবাহিতা।"
"না।"
"প্রেম করেছো?"
"না"
"কাউকে বিয়ে করার কথা ভাবছো?"
"না।"
"তুমি আগামী কাল তোমার বাবা-মাকে আমার চেম্বারে পাঠিয়ে দিবে। ওঃ হাঁ যা, ওনারা কি জীবিত আছেন?"
"জি্ব।"

দুই.
"আপনার নাম?"
"মমিনুল হক।"
"আপনি কী করেন?"
"আপনার সামনে বসে আছি।"
"ভালো কথা। আপনার মেয়ের সমস্যা কি জানেন?"
"না। ওরতো কোনো সমস্যাই নেই। ও কি আপনার কাছে এসেছিলো?"
"আপনার মেয়ের নাম কী?"
"নিতুন।"
"না ওর নাম অনন্যা। ও ভার্সিটিতে আমাদের এক ব্যাচ নিচে ছিলো। আমি ওকে চিনি।"
আঁতকে উঠলো বৃদ্ধ মমিনুল হক। বললো, "আপনি ভুল করেছেন। অনন্যা মারা গেছে। যে এসেছিলো সে তার ছোট বোন নিতুন।"
"মিথ্যে বলছেন আপনি। অনন্যা মরেনি। অনন্যার কণ্ঠস্বর আমি চিনি। ওর নাকের এক পাশে একটি তিল আছে। তাছাড়া যখন অনন্যা আর ইমরুল কোথাও বের হতো আমিও অনেক সময় ওদের সাথে যেতাম। অনন্যাকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছিলো।"

তিন.
থ' বনে গেছে মমিনুল হক। যেন এইমাত্র তার ফাঁসির হুকুম হলো। মুখে কোনো রা' নেই।
"অনন্যার কাহিনী বলুন। ইমরুল এখনও বেঁচে আছে। অনন্যাকে মরিয়া হয়ে খুঁজছে সে।"
"ইমরুল আলম এখনও বেঁচে আছে?"
"জি্ব। ও একটা পত্রিকার সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছে।"
আমার হাত দুটি জড়িয়ে ঘরে হুঁ হুঁ করে কাঁদতে লাগল বাবার বয়েসি বৃদ্ধ মমিনুল হক। আমার হাতের ওপর গড়িয়ে পড়তে লাগল তার বিগলিত ধারাবাহিক অশ্রুধারা।


চার.
হতদন্ত হয়ে আমার বাসায় প্রবেশ করল ইমরুল আলম। বলল, "কই, কোথায় অনন্যা?
"বসো বন্ধু, ধীরে ধীরে। হারানো ভালোবাসাকে ফিরে পাবে তুমি আজ। সেই সাথে পাবে একটা উপহার।"
"কী উপহার, বিয়ের!"
"হাঁ যা বিয়ের। বিয়ে না করে এ উপহার কেউ পায়নি বৈধভাবে।"
আমি আমার গৃহভৃত্যকে ইংগিত করতেই পাশের কামরা থেকে 'সাহারা'কে নিয়ে এলো সে।
"এটা কার বাচ্চা? চেহারাটা যেন ঠিক আমারই মতো। তুমি কি আমাকে চমক দেখাচ্ছ দোস্ত। ক্লোন করছো নাকি?"
"না। এটা তোমার, মানে তোমাদের।"
"বুঝলাম না।"
"বুঝবে একটু পর।"

পাঁচ.
দরজায় কলিং বেলের আওয়াজ পাওয়া গেলো। একটু পর কামরায় মমিনুল হক সহ অনন্যা প্রবেশ করলো । অনন্যা ইমরুলকে দেখেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো। তারপর ইমরুলের কোলে বাচ্চাটাকে দেখেই ছোঁ মেরে কোলে তুলে নিলো। বিড়বিড় করে বলতে লাগল, "এটা আমার বাচ্চা, এটা আমার বাচ্চা। এ বাচ্চার কান্নাই আমি বহুদিন শুনেছি।"
ইমরুল কিছুই বুঝতে না পেরে আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। আমি তাকে সব খুলে বললাম। বললাম, অ্যাকসিডেন্টে তোমরা কারসহ ডুবে গিয়েছিলে। তারপর তুমি কোনোমতে সাঁতরে তীরে ওঠো। কিন্তু নিতুন মারা যায়। অনন্যা স্রোতের টানে ভেসে গিয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় নদীর পাড়ে ঠেকে। তাকে জেলেরা উদ্ধার করে। অনন্যা বেঁচে যায় কিন্তু কিছুটা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। এর কয়েকদিন পরই সন্তান প্রসব করে। ওর বাবা মমিনুল হক জানেন না যে, তোমাদের বিয়ে সংক্রান্ত গোপন কথা। সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে সাহারাকে একটা এতিমখানায় দিয়ে দেয়। অনন্যাকে জানায়, তার মৃত সন্তান হয়েছে। কিন্তু একজন মমতাময়ী মা হিসেবে সন্তানের প্রতি অনন্যার গভীর মায়া জন্মায়। একটা টেলিপ্যাথি ক্ষমতায় বা রক্তের টানে সে মাঝে মাঝে সাহারার কান্না শুনতে পায়। সত্যিকার অর্থে প্রতিটি মায়ের সাথেই সন্তানের একটা অদৃশ্য বন্ধন বিরাজ করে। আমরা যা খালি চোখে প্রত্যক্ষ করি না। অনেক সময় সন্তান ব্যথা পেলে মা হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও সেটা বুঝতে পারে। মা তখন নিজেই সন্তানের দুঃখে দুঃখ ভারাক্রান্ত হন। মায়ের মন আনচান করে সন্তানের জন্যে। সৃষ্টিকর্তা ছাড়া পৃথিবীর কোনো শক্তিই মায়ের সাথে সন্তানের এ বন্ধন মুছে দিতে পারে না।