মাইকেল মধুসূদন দত্ত 'বাংলাভাষা' নামক একটি চতুর্দশপদী কবিতায় লিখেছিলেন:
"হে বঙ্গ ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন
তা সবে (অবোধ আমি) অবহেলা করি,
পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ
পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি।
---------------------------
পালিলাম আজ্ঞা সুখে পাইলাম কালে
মাতৃ-ভাষা-রূপ খনি, পূর্ণ মণিজালে।"
বাংলার ভাণ্ডারে যে 'বিবিধ রতন' এবং 'মাতৃ-ভাষা-রূপ খনি, পূর্ণ মণিজালে' তিনি উল্লেখ করেছেন সে বাংলাভাষা ও সাহিত্য কিন্তু আজকের মতো এতো সমৃদ্ধ ছিলো না। বাংলাভাষাকে পূর্ণ মণিজালরূপে গড়ে তুলতে এদেশের মানুষের বহু ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। কবি তাঁর নিজের জীবনের অনেক বন্ধুর পথ অতিক্রম করে দেখেছেন যে, মাতৃভাষাকে পরিপূর্ণভাবে শ্রদ্ধা না করে এবং এর বিকাশে আত্মনিয়োগ না করে পরের ভাষা শিখে অর্থাৎ কাক হয়ে মযূরপুচ্ছ পরিধান করে কোনো জাতি মর্যাদার আসনে আসীন হতে পারে না। মহান একুশ আমাদেরকে সেই চেতনায় উজ্জ্বীবিত করেছিলো। বাঙালির স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা এবং মায়ের ভাষার অধিকার সম্পর্কে করেছিলো সচেতন। নিজেদের সার্বিক অধিকার আদায়ের স্পৃহা জুগিয়েছে, বাংলা ভাষাকে বিশ্ব মাতৃভাষায় উত্তীর্ণ করেছে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতিকল্পে সৃষ্টি হয়েছে বাংলা একাডেমী। কিন্তু যদি বাংলার দামাল ছেলেরা মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলনে নিজ রক্তবিন্দু দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি না করতো তাহলে কখনই এসব অর্জন সম্ভব হতো না।
বাংলাভাষা রক্ষার দাবিতে উনিশশ' বায়ান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারি নিজপ্রাণ বিলিয়ে দিয়েছিলো বাঙালি জাতির সূর্যসন্তানরা। জাতির সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় রচিত হয়েছিলো এই দিনটিতেই, যা আজ সারাবিশ্ব পালন করছে। পৃথিবীতে শুধুমাত্র বাংলাদেশ ছাড়া কোনো দেশে মাতৃভাষার রক্ষার জন্যে মানুষ শহীদ হয়েছে- এমন ঘটনা বিরল। শুধুমাত্র আমাদের মাতৃভূমিতেই ১৯৫২ সনের একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ হয়েছিলো অকুতোভয়, দেশপ্রেমিক, দুর্লভ মানুষগুলো। যাদের রক্তের এক বিন্দুর দাম শোধ করা আমাদের পক্ষে সম্ভবপর নয়। সে এক ঐতিহাসিক ঘটনা।
পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক-শোষক চক্র পাকিস্তানের স্বাধীনতার পর থেকেই পূর্ব বাংলাকে নানাভাবে শোষণ করে আসছিলো। এদেশের অর্থ-সম্পদ তারা নিয়ে যেত পশ্চিম পাকিস্তানে। এদেশে কোনো কল-কারখানা স্থাপন করতো না। পূর্ব বাংলার মানুষের প্রতি শাসনের নামে শোষণ, বঞ্চনা, প্রতারণা ও নিষ্ঠুরতায় মেতে উঠে তারা। সর্বোপরি তারা এদেশের ভাষার ওপরও সুদূরপ্রসারী আঘাত হানে এবং ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান গণপরিষদে ঘোষণা করেন, যেহেতু পাকিস্তান একটি মুসলিম রাষ্ট্র, তাই এর রাষ্ট্রভাষা হবে উদর্ু। এরপর মার্চ মাসে ঢাকার কার্জন হলে জিন্নাহ ঘোষণা করেন, \"টৎফঁ ধহফ টৎফঁ ংযধষষ নব ঃযব ঝঃধঃব ষধহমঁধমব ড়ভ চধশরংঃধহ\" (একমাত্র উদর্ুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা)। বাঙালি জাতি চিরদিনই আত্মমর্যাদা সচেতন। তারা কোনোভাবেই মায়ের ভাষাকে পরিত্যাগ করতে চাইল না। সেদিনের তরুণ সাহসী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিষ্ঠিত হলো 'পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ'। এটাই ছিলো পরবতর্ীকালে জনগণের আওয়ামী মুসলিম লীগ_ পরবতর্ীতে 'ছাত্রলীগ'। বাংলা ও বাঙালির দাবি আদায়ের প্রধান ছাত্র সংগঠন। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ প্রতিবাদ দিবস কর্মসূচি ঘোষণা করলে তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক ও অলি আহমদকে ওইদিন সেক্রেটারিয়েটের সামনে পিকেটিংরত অবস্থায় পুলিশ লাঠিচার্জ করে এবং গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। মুসলিম লীগের এই অগণতান্ত্রিক দমননীতির ফলে মাতৃভাষা আন্দোলন আরও জোরদার হয়। ১৩ মার্চ প্রদেশব্যাপী ছাত্র ধর্মঘট এবং ১৪ মার্চ হরতাল পালন করা হয়। ১৫ মার্চ মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন আপোস মিমাংসার প্রস্তাব করে। আটদফা চুক্তি স্বাক্ষরের পর চুক্তির শর্তানুসারে শেখ মুজিবুর রহমান সহ অন্যান্য নেতাগণ মুক্তি পান। ১৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর সভাপতিত্বে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে সভা আহ্বান করা হয়। সভাশেষে অ্যাসেম্বলি ঘেরাও এবং বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়। ফলে শাসকবর্গের ইশারায় ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ এবং এর প্রতিবাদে ১৭ মার্চ ধর্মঘট আহ্বান।
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা। তরুণ শেখ মুজিব দলের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। সারাদেশব্যাপী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভাষার দাবিতে ধর্মঘট, হরতাল, জুলুম দিবস পালন।
১৯৫১ সালের ১১ মার্চ ভাষা সৈনিক আবদুল মতিনকে আহ্বায়ক করে 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি' গঠন এবং বাংলাভাষা রক্ষাকল্পে ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে ও পূর্ববাংলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক শামসুল হক সহ ৪০ জন প্রতিনিধি সমন্বয়ে কাজী গোলাম মাহবুবকে আহ্বায়ক হিসেবে সর্বদলীয় ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় বাংলাভাষা সংগ্রাম পরিষদ ঢাকায় ১০ হাজার ছাত্র-ছাত্রীসহ সম্মিলিতভাবে মিছিল ও ধর্মঘট পালন করে। কিন্তু পশ্চিমা শাসকচক্র ২১ ফেব্রুয়ারি জারি করে ১৪৪ ধারা। ছাত্ররা থেমে থাকেনি। তারা মায়ের ভাষার স্বাধীনতার জন্যে বের করে বিরাট মিছিল। ভঙ্গ করে ১৪৪ ধারা। পূর্ব বাংলার অথর্ব শাসক নূরুল আমিন সরকারের নির্দেশে নির্ভিক, নিরাপরাধ, দেশপ্রেমিক ছাত্রদের ওপর চলে নিষ্ঠুরভাবে গুলিবর্ষণ। পুলিশের গুলিতে সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারসহ শহীদ হয় ৭ জন, আহত হয় ৩ শতাধিক এবং গ্রেপ্তার করা হয় ৬২ জনকে।
২২ ফেব্রুয়ারিতেও ছাত্র সমাবেশের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণে বিভিন্ন স্থানে ৭ জন নিহত হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্যে বন্ধ করে ৭ ঘণ্টার কারফিউ জারি করা হয়। ওইদিনই পুলিশী বর্বরতার প্রতিবাদে পূর্ববাংলা এসেম্বলির মেম্বার পদ থেকে মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ এবং দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম সামসুদ্দীন পদত্যাগ করেন। মাওলানা ভাসানী, বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কাজী গোলাম মাহবুব, আবুল কাশেম, আবদুল গফুর, আবদুল আউয়াল, শামসুল হক, খন্দকার মোশতাক, আবদুল মতিন প্রমুখসহ অসংখ্য ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়। এভাবেই পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকচক্র ভাষার ওপর শাণিত ছুরি চালিয়ে একটি জাতির বাক স্বাধীনতাকে স্তব্ধ করে দিতে চাইল। বীর বাঙালি জাতি বুকের তাজা রক্তে প্রতিহত করল তাদের চক্রান্ত।
১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শহীদদের স্মরণে অনুষ্ঠিত জানাযা ও হরতালের কর্মসূচির দৃঢ়তা ও তীব্রতা দেখে মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব পাস করতে বাধ্য হয়। এরপর অনেক ঘটনা। আবারও বাঙালিদের দমিয়ে রাখার পন্থা অবলম্বন। আইয়ূব খান ক্ষমতার দাপটে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে একের পর এক ষড়যন্ত্র শুরু করে। গঠন করে 'হামিদুল হক শিক্ষা কমিশন'। রোমান হরফে বাংলা লিখানোর চেষ্টা চললো। পাকিস্তানের ভাষা মিলিয়ে 'পাকিস্তানী জবান' বানানোর এক উদ্ভট চেষ্টা করা হয়। বাংলা শব্দের মাথায় টুপি পরিয়ে 'মুসলমানি শব্দ তৈরি'র চেষ্টায় পাকিস্তান সরকারের অনুগ্রহপুষ্ট একদল ভাড়াটে লেখক লেলিয়ে দেয়া হলো। শুরু হলো বাংলা ভাষার মাঝে আরবি, ফারসি ও উদর্ুর মিশ্রণে ভাষার সুন্নত তৈরির অপকৌশল। জনগণ মায়ের ভাষায় কথা বলার অপরিহার্যতা চূড়ান্ত উপলব্ধি করে এবং স্বাধিকার আদায়ের আন্দোলন শুরু করে। পাকিস্তানী শাসকদের সব চক্রান্ত ধুলোয় মিশে যেতে থাকে। ১৯৫৬-এর সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।
ভাষা শহীদগণের আত্মদান, বাঙালির মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলন বৃথা যায়নি। তাঁদের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্তদানের ফলে আজ আমরা মাতৃভাষায় কথা বলতে পারছি। আমরা তাঁদের অবদান ভুলিনি। অমর ভাষা শহীদগণের বুকের তাজা রক্তের প্রতিদানে প্রতি বছর গড়ি শহীদ মিনার এবং সালাম, জব্বার, রফিক, বরকতসহ সব ভাষা সৈনিকগণকে জানাই অশ্রুভেজা সালাম। অমর ভাষা সৈনিকদের আত্মদানের ফলে আজ একুশে ফেব্রুয়ারি 'মাতৃভাষা দিবস' রূপে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। এ দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাবার পেছনেও রয়েছে কিছু দেশপ্রেমিক মানুষের অবদান। কানাডার প্রবাসী রফিকুল ইসলাম ও আব্দুস সালাম এদের মধ্যে অন্যতম। তাদের নেতৃত্বে 'মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ অব দ্যা ওয়ার্ল্ড' নামে একটি সমিতি গঠন করা হয়। এই সমিতির পক্ষ থেকে ১৯৯৮ সালের ২৯ মার্চ তৎকালীন জাতিসংঘের প্রেসিডেন্ট কফি আনানের কাছে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' নামে একটি দিন ঘোষণার প্রস্তাব করার জন্যে আবেদন করা হয়। পরবতর্ীতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশক্রমে শিক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের প্রস্তাব নিয়ে প্যারিসে পেঁৗছেন। এ প্রস্তাবটি আরো ২৭টি দেশের সমর্থনসহ ২৮ অক্টোবর ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো সাধারণ অধিবেশনে পেশ করা হয়। প্রস্তাবে বলা হয়, বর্তমান পৃথিবীতে প্রায় ৪ হাজার মাতৃভাষা রয়েছে। ফলে প্রত্যেক ভাষাকে সম্মান প্রদর্শন করা জন্যে একটি আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস পালন করা প্রয়োজন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের মানুষের বাংলার ভাষার প্রতি আত্মত্যাগের কারণে এ দিনটিকে স্মরণ করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব করা হয়। বাংলাদশের এই প্রস্তাবে ইউনেস্কো সাধারণ পরিষদের সদস্য ১৮৮ দেশ সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে ১৭ নভেম্বর-১৯৯৯ বুধবার প্রস্তাবটি পাস হয়।
এই প্রস্তাব পাসের ফলেই আজ সারাবিশ্বজুড়ে সব ভাষার মানুষেরা মায়ের ভাষাকে শ্রদ্ধা জানাতে দিনটিকে মাতৃভাষা দিবস রূপে পালন করে থাকে। তাই, আজ স্মরণ করি আমরা সেই মহান ভাষা শহীদগণকে, কৃতজ্ঞতা জানাই সকল ভাষাসৈনিককে এবং বলি, হে অমর ভাষা সৈনিকরা! তোমাদের আত্মত্যাগ ও সংগ্রাম বৃথা যায়নি। তোমাদের বুকের তাজা রক্তে সৃষ্টি হয়েছে বিশ্বজুড়ে মাতৃভাষার মহান ইতিহাস। তাই বাঙালি জাতি তোমাদেরকে হৃদয়গভীরে প্রভাতের সূর্যোদয়ের মতো ধারণ করবে অমলিন এবং লালন করবে মহান একুশের অমর চেতনা।
একুশ আমাদের স্বাধিকার আদায়ের কথা বলে
আমাদের স্বাধীনতার কথা বলে
জাতির সুমহান মর্যাদার কথা বলে
বলে মায়ের ভাষাকে বিকশিত করার কথা।