গল্পের নাম মায়া। প্রধান তিন চরিত্র মায়া, রাহাত আর সাবের মাহমুদ। ভালোবাসা থেকেই বুঝি মায়ার সম্পর্ক তৈরী হয় কিন্তু শুধু মায়াই কি পারে দুইজন মানুষকে বেঁধে রাখতে? মায়ার কাছ থেকে দূরে সরেও রাহাতের ভালোবাসা কোথাও থেকেই যায় আবার মায়ার কাছে থেকেও কাছের মানুষ হতে পারে না সাবের মাহমুদ। রাহাতের কাছে ফিরে আসতেই হয় সাবের মাহমুদকে, প্রিয় মানুষকে ফিরে পাবার আশায়। ভালোবাসার ছোট্ট গল্প "মায়া"
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭৯
গল্প/কবিতা: ২৪টি

সমন্বিত স্কোর

৬.৮

বিচারক স্কোরঃ ৩.৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ৩ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - ভ্যালেন্টাইন (ফেব্রুয়ারী ২০১৯)

মায়া
ভ্যালেন্টাইন

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৬.৮

সালমা সিদ্দিকা

comment ১৩  favorite ১  import_contacts ৬৪৩
স্যার, এখন কী করবো?'

রাহাত শামীমের উপর বিরক্ত হলো । ছেলেটা একটু হাদা ধরনের। সামান্য ব্যাপারে অস্থির হয়ে যায়, নিজে থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। একটু পর পর রাহাতের দরজায় টোকা দিয়ে কোন একটা তুচ্ছ সমস্যার কথা জানিয়ে বোকার মতো জিজ্ঞেস করে, 'স্যার, এখন কী করবো?'

রাহাত অবশ্য বিরক্তি প্রকাশ করলো না। ও ঠান্ডা মাথার ছেলে। শান্ত কণ্ঠে বললো, 'কী সমস্যা হয়েছে আবার?'
'স্যার, উনি তো পনেরো লাখ টাকার চেক পাঠিয়েছেন, আপনার নামে।'
'হুম, একবার তো বলেছো। চেকটা ক্যাশ করো। উনি যেহেতু টাকা পাঠিয়ে দিয়েছেন, আমি পারফর্ম করবো। উনাকে জানিয়ে দাও। '

রাহাতের চেয়ে বেশি উত্তেজিত শামীম। তার স্যার ভালো গান করেন, সে ইউটিউবে স্যারের গাওয়া পুরোনো গান শুনেছে। তবে উনার গান শোনার জন্য কেউ এতগুলো টাকা দিতে পারে সেটা শামীম ভাবতেই পারে না। সে হুড়মুড় করে ঘর থেকে বেরিয়ে কমার্শিয়াল ডিপার্টমেন্টে গিয়ে চেকটা ব্যাংকে পাঠানোর ব্যবস্থা করলো। একটু পরে আবার ব্যাংক যাবে বন্ধ হয়ে, চেকটা আজকে আর ক্লিয়ার হবে না।

শামীম একমাস হলো রাহাতের পার্সোনাল সেক্রেটারি হিসাবে জয়েন করেছে। ঠিক মতো কাজ না করলে যদি চাকরিটা চলে যায়, এই ভয়টা ওকে শান্তি দেয় না। শামীম মাস্টার্স করে প্রায় একবছর বেকার ছিল । রাহাতের বাবার হাত পা ধরে বহু কষ্টে এই চাকরি জুটেছে। রাহাতের আগের সেক্রেটারি নাকি খুব কাজের ছিল। সে সৌদি আরবে চাকরি পেয়ে চলে গেছে। শামীম সবার্ত্মক চেষ্টা করছে আগের সেক্রেটারির মতো রাহাতের আস্থাভাজন হতে।

রাহাতের একটুখানি অস্বস্তি হচ্ছে। শুধুমাত্র দু'জন মানুষের সামনে বসে গান গাওয়ার কথা সে কখনো ভাবেনি। ও সবসময় গান করেছে হাজার হাজার মানুষের সামনে। মাঝে মাঝে অবশ্য মোটা অংকের দর্শনীর বিনিময়ে অভিজাত হোটেলেও গান গেয়েছে। এই ভদ্রলোকের চাহিদা অবশ্য অন্যরকম। এবার তাকে গান গাইতে হবে বিখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী সাবের মাহমুদের হোটেল রুমে। উনি সম্প্রতি আমেরিকায় লাস্কার ডি ব্যাকি ক্লিনিক্যাল রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। মাসখানেক আগেই পত্রিকায় উনাকে নিয়ে একটা আর্টিকেল পড়েছিল রাহাত। বাংলাদেশী বিজ্ঞানীর সাফল্যে মনে মনে গর্ববোধ করেছিলো। ভদ্রলোক দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে ক্যান্সার রোগ নিয়ে গবেষণা করছেন। পুরস্কার পেয়েছেন মহিলাদের সার্ভিকাল ক্যান্সার এবং টিউমার প্রতিরোধে এইচ পি ভি ভ্যাকসিন আবিষ্কার করার জন্য। ক্যান্সার বিষয়ে বক্তব্য দেয়ার জন্য সারা বিশ্বে বিভিন্ন সম্মেলনে যোগ দেন সাবের মাহমুদ। তাছাড়া আমেরিকায় বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে অতিথি শিক্ষক হিসেবে ক্লাস নেন। বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে দেশে এসেছেন প্রায় চব্বিশ বছর পরে, বাৎসরিক স্বাস্থ্য সম্মেলনে তার সাম্প্রতিক গবেষণা তুলে ধরতে। প্রধানমন্ত্রী সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। রাহাত কয়েকদিন আগেই খবরটা পত্রিকায় দেখেছে। অফিসে এসে রাহাত প্রথমেই দৈনিক পত্রিকা খুঁটিয়ে পড়ে, বহু দিনের অভ্যাস।

সাবের মাহমুদ দেশে এসেই রাহাতের অফিসে যোগাযোগ করেছেন। রাহাতের ফোনে খুব কাছের মানুষ ফোন করে, অপরিচিত নাম্বারের কল আর ব্যবসায়িক কলগুলো ওর সেক্রেটারির হাত ঘুরে আসে। শামীমের সাথে কথা বলে সাবের জানিয়েছেন তিনি পঁচিশ তারিখ সন্ধ্যায় রাহাতের গান শুনতে চান, মাত্র একঘন্টার জন্য। শামীমের কাছে প্রস্তাবটা শুনে রাহাত চমকে গেছে। এত বছর বিদেশে থেকে এই ভদ্রলোক পুরো মাত্রায় আমেরিকান হয়ে গেছেন নিশ্চই, বাংলা গান তার ভালো লাগার কথা না। কিন্তু শামীম জানালো পঁচিশ তারিখ ভদ্রলোকের স্ত্রীর জন্মদিন। তিনি জন্মদিনে তার স্ত্রীকে সারপ্রাইজ দিতে চান কারন রাহাত তার স্ত্রীর প্রিয় গায়ক।

রাহাত গান করে না প্রায় দশ বছর হলো। এখনো যে গান গাওয়ার প্রস্তাব মাঝে মাঝে আসে না, তা নয়। কিন্তু রাহাত আলগোছে সেই আবদারগুলো এড়িয়ে যায়। একসময় বাংলাদেশের সব জায়গায় তার গান বাজতো, তার গানের অ্যালবাম বের হলে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়তো। দশ বছর আগে রাহাতের মায়ের মৃত্যুর পর হুট্ করেই গান ছেড়ে দিলো। একান্ত নিজস্ব ঘরোয়া অনুষ্ঠানে মাঝে মাঝে দু'এক লাইন গেয়ে শুধু শায়লার মন রক্ষা করে। রাহাতের স্ত্রী শায়লা আর তাদের দুই সন্তান রিদি আর তন্ময় তার গান দারুন পছন্দ করে কিন্তু রাহাত গায় না। গানের প্রতি যে প্রচন্ড আসক্তি কাজ করতো একসময়, সেই তীব্র আবেগ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।

সাবের মাহমুদের আবদার রক্ষা করা রাহাতের পক্ষে সম্ভব না, স্পষ্ট জানিয়ে দিলো রাহাত। হোটেল রুমে গিয়ে দুই বুড়োবুড়িকে গান শোনাচ্ছে, ভাবতেই হাসি পায়। রাহাত এখন এত বড় একটা প্রতিষ্ঠানের ভাইস চেয়ারম্যান, কেউ ডাকলেই ছুঁটে গিয়ে গান শোনানোর প্রশ্নই আসে না।

'স্যার, ভদ্রলোক খুব রিকোয়েস্ট করছেন। বলেছেন, আপনি যত টাকা চান দেবেন, আপনি শুধু এমাউন্ট বললেই হবে।'
'হোয়াট? আমাকে টাকার গরম দেখায়? বলে দাও একঘন্টা গান গাইতে আমি পনেরো লাখ টাকা চার্জ করি।'
'পনেরো লাখ বলবো স্যার?'
'তুমি কি কানে কম শোনো শামীম? পনেরো লাখ বলো, টাকার গরম বেরিয়ে যাবে।'

রাহাত ভেবেছিলো টাকার পরিমান শুনে সাবের পিছিয়ে যাবেন। অদ্ভুত ব্যাপার, ভদ্রলোক রাজি হয়েছেন! আজকে দুপুরে পনেরো লাখ টাকার একটা চেক পাঠিয়ে দিয়েছেন ভদ্রলোক! রাহাত অবাক হয়েছে আবার মনে মনে খুশিও হয়েছে। এক ঘন্টা গান গাওয়ার জন্য এত টাকা কেউ কখনো দিতে চায়নি। ভদ্রলোক হয়তো খেয়ালী ধরণের, স্ত্রীকে অবাক করতে এতগুলো টাকা খরচ করতে কার্পণ্য করেন না। রাহাতের অবশ্য তাতে কিছু যায় আসে না। শায়লা বেশ কিছুদিন ধরে অস্ট্রেলিয়া বেড়াতে যাওয়ার আবদার করছিলো, এই টাকায় সুন্দর ভাবে বেড়ানোর খরচ কুলিয়ে যাবে।

রাতে শায়লাকে ঘটনা বলতেই খুব অবাক হলো।
'এতগুলো টাকা দিতে রাজি হয়ে গেলেন ভদ্রলোক? স্ত্রীকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য? কি রোমান্টিক, দেখলে?
'কিসের রোমান্টিক? উনার কি টাকার অভাব আছে? টাকার গরম দেখায়, বুঝলে? একেক জায়গায় খ্যাপ দিয়ে লাখ লাখ ডলার কামাই করেন। পনেরো লাখ টাকা উনার কাছে কোনো ব্যাপারই না। এখন তো মনে হচ্ছে পঁচিশ লাখ চাইলেও দিতেন।'

রাহাতকে একটু গম্ভীর মনে হলো। শায়লার খানিকটা মন খারাপ হলো। রাহাতের চোখে মুখে কেমন লোভ চকচক করছে।

পঁচিশ তারিখ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে স্টোররুম থেকে গিটারটা বের করলো রাহাত। দীঘদিনের অব্যবহারে কেমন ভুতুড়ে লাগছে যন্ত্রটাকে। হাত দিয়ে ছুঁতেই বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। গিটারের প্রতিটা স্ট্রিং একসময় কত আপন ছিল, কত সুখ দুঃখের স্পন্দন বেজেছে এই তার গুলোতে! অযত্নে ধুলো জমেছে গিটারের সর্বাঙ্গে।

গিটারটা শামীমকে দিয়ে বললো পরিষ্কার করতে। শামীম যন্ত্রটাকে পুরো চকচকে করে নিয়ে আসলো। এবার বারান্দায় বসে স্ট্রিংগুলোকে টিউনিং করে নিলো রাহাত। নাহ, এখনো হাতে সেই ম্যাজিক আছে। কিছুক্ষনের মধ্যেই টুংটাং বিচ্ছিন্ন কর্ডগুলো অর্থবহ মূর্ছনা ছড়াতে লাগলো। রাহাতের মনে হলো গিটার তো রেডি, গলাটা এখন সঙ্গ দিলেই হয়।

শামীম যাবে রাহাতের সাথে। কোনো কাজে বাইরে গেলে শামীমকে সাথেই রাখে, কখন কি কাজে লাগে বলা যায় না। ইদানিং গাড়ির দরজাটাও নিজে খুলতে ইচ্ছা হয় না রাহাতের। সাথে সেক্রেটারি থাকলে সবখানে আলাদা সমীহ পাওয়া যায়।

রেডিসনে পৌঁছে লবি থেকে সাবের মাহমুদের রুমে কল করলো শামীম। ওদের আসতে একটু দেরি হয়েছে। ঢাকার ট্রাফিকে এমন দেরি কোনো বিষয় না কিন্তু সাবের মাহমুদ আমেরিকান গবেষক, তিনি এই দেরিতে কিছু মনে করেন কিনা কে জানে! অযথাই টেনশন হচ্ছে শামীমের।

সাবের মাহমুদ রুমেই আছেন, রাহাতের অপেক্ষা করছেন। শামীমকে নিয়ে রাহাত চলে এলো রুম নাম্বার চারশো সাতে। রুমের দরজা খুলে দিলেন সাবের মাহমুদ। পত্রিকার ছবির চেয়ে সামনাসামনি একটু বেশি বয়স্ক এবং ক্লান্ত লাগছে। বয়স পঁয়ষট্টির আশেপাশে। মাঝারি উচ্চতা, মাঝারি গড়ন। চোখ মুখে একটা অদ্ভুত দ্যুতি আছে। বাদামি গায়ের রং, সাধারণ বাংলাদেশীদের মতোই চেহারা। শামীম রাহাতের পরিচয় দিতেই হেসে হাত বাড়িয়ে দিলেন। তারপর স্পষ্ট বাংলায় বললেন,
'আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আমি জানি আপনি এখন পারফর্ম করেন না। কিন্তু আমার জন্য আজকের পারফরম্যান্স খুব স্পেশাল। প্লিজ, ভেতরে আসুন।'

শামীমকে লবিতে অপেক্ষা করতে বলে রাহাত রুমে ঢুকলো। যথেষ্ট বড় রুম, আলাদা বসার ঘর। বসার ঘর থেকে বেড রুম দেখা যাচ্ছে না। বোঝাই যাচ্ছে সরকার যথেষ্ট আদর যত্নে সাবের মাহমুদকে এই হোটেল সুইটে রেখেছে। রাহাত ভাবলো,ভদ্রলোকের স্ত্রী হয়তো ভেতরে আছেন।
সোফায় বসলো রাহাত। সাবের রাহাতের সামনের সোফায় হেলান দিয়ে আরাম করে বসলেন।
'সাবের সাহেব, কংগ্রাচুলেশন অন উইনিং দা প্রেস্টিজিয়াস প্রাইজ।' রাহাত বললো।

সাবের মাহমুদ যেন কি একটা চিন্তায় ডুবে ছিলেন। রাহাতের কথা শুনে চমকে হেসে ফেললেন। ভদ্রলোকের হাসি সুন্দর।
'ওহ ইয়েস, দা প্রাইজ। থাঙ্কস। আমি জানি আপনার হাতে সময় কম, আপনি বরং গান শুরু করুন। ইয়ে, আমি আপনার ভিডিও করবো, আশা করি আপত্তি করবেন না।'
'না না, শিউর, ভিডিও করুন তবে কোথাও পাবলিশ করবেন না। আপনি তো জানেন, আমি এখন গান করি না। আপনার স্ত্রী কোথায়? আজকে তো উনার জন্মদিন। ওনার জন্যই তো আজকের এই আয়োজন, না কি?'
'ওহ। সি ইজ নট হিয়ার। ও খুবই অসুস্থ। এই মুহূর্তে সে মিনেসোটায় মায়ো ক্লিনিকে চিকিৎসা নিচ্ছে। আসলে আমি ওকে আপনার গানটা ভিডিও করে পাঠাবো। ও খুব খুশি হবে। '

রাহাত আবারো অবাক হলো। স্ত্রীকে তার গান রেকর্ড করে পাঠাতে এতগুলো টাকা খরচ করলেন ভদ্রলোক! যাকগে, টাকা উনার কাছে নিশ্চই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না।

রাহাত একটু জড়তা নিয়ে গিটার তুলে নিয়ে গান শুরু করলো। প্রথমে জং ধরা গলায় সুর একটু দিকবিভ্রাট করলেও দুইটা গানের পরে গলা একেবারে মসৃন হয়ে গেলো। গলার ধার এখনো আছে, মনে মনে তৃপ্ত হলো রাহাত। সবাই বলতো ওর গলায় ম্যাজিক আছে, কথাটা মিথ্যা নয়, এতবছর পরেও না।

সাবের মাহমুদ গান ভিডিও করে যাচ্ছেন একের পর এক। তিনটা গানের পর তিনি বললেন,
'রাহাত আপনার ওই গানটা করবেন প্লিজ? ওই যে, "রাত গভীর হলে, নাচবে অন্ধকার, জোনাক নিয়ে তুমি এসো, তুমি এসো "- ওই গানটা।'

রাহাত চমকে বললো, 'এই গানটা আপনি কোথায় শুনেছেন? এইটা আমি কখনো পারফর্ম করিনি তো!'

সাবের ক্যামেরা সরিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন, 'পারফর্ম করেছেন রাহাত। মায়ার জন্মদিনে, সতেরো বছর আগে। আপনি গানটা লিখেছিলেন ওর জন্য।'

হটাৎ করেই অদ্ভুত একটা নিঃস্তব্দতা ছড়িয়ে পড়লো হোটেল রুমে। 'আপনি মায়াকে চেনেন?' রাহাত কিছুক্ষন পরে জিজ্ঞেস করলো।
'মায়া আমার স্ত্রী। আমার অসুস্থ স্ত্রী।'
'আপনার সাথে বিয়ে হয়েছে মায়ার!' রাহাতের কণ্ঠে বিস্ময় ঝরে পড়ে।
'হুম, যেদিন মায়া সবার সামনে আপনার পা ধরে কাকুতি মিনতি করেছিলো, তাকে বিয়ে করার জন্য, সে রাতেই ওর সাথে আমার বিয়ে হয়। ওর প্রথম বিয়ে, আমার দ্বিতীয়। আমার প্রথম স্ত্রী আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলো। আপনি ওকে প্রত্যাখ্যান করে নিজের মিউজিক ক্যারিয়ারকে বেছে নিয়েছিলেন। ওর সব অনুরোধ ছুঁড়ে ফেলে মিউজিক ফেস্ট কম্পিটিশনে চলে গিয়েছিলেন। সেখানে আপনার ব্যান্ড প্রথম হয়। আপনাদের অ্যালবাম চারদিকে হৈচৈ ফেলে দেয়। আপনি ছিলেন ব্যান্ডের লিড ভোকাল। যখন আপনাদের গ্রূপের সাফল্য এলো, আমি গ্রূপ ভেঙে সোলো ক্যারিয়ার করলেন। সেখানেও সাফল্য পেলেন। পেছনে পড়ে রইলো আপনার টিম মেম্বাররা। ওরা এখন কে কোথায় আছে বলতে পারেন রাহাত?'

রাহাত কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে। 'আপনি কি এসব বলতে আমাকে ডেকেছেন?"
'না রাহাত। আমি আপনার গান শুনতে এবং মায়ার জন্য আপনার গান রেকর্ড করতে এখানে ডেকেছি। স্পেশালি ওই গানটা, যেটা আপনি মায়ার জন্মদিনে গেয়েছিলেন। সেটার কোনো রেকর্ড নেই, এই গানটা আমার দরকার। আপনাকে সব না বললে গানটা কেমন করে পাবো বলুন?'

রাহাতের কেমন যেন শূন্য লাগছে। দীর্ঘদিন মনের ভেতর লুকানো গোপন আঘাতগুলো উসকে দিলো সাবের মাহমুদের কথাগুলো। এই কষ্টকে লুকিয়েই রাখতে চেয়েছে রাহাত। কিন্তু আজকে স্মৃতিগুলো মনের ভেতর লুকোনো প্রকোষ্ট থেকে বেরিয়ে রাহাতকে ধাঁধায় ফেলে দিয়েছে। প্রায় দীর্ঘ নিঃস্তব্দতার পর রাহাত বললো, 'কী হয়েছে মায়ার?'
'ক্যান্সার, স্টেজ ফোর । কি অদ্ভুত ব্যাপার দেখেন, আমি সারাজীবন ক্যান্সার নিয়ে গবেষনা করলাম, অথচ আমার স্ত্রী লিভার ক্যান্সারে ভুগছে, আমি একবার খেয়ালও করিনি। একেবারে শেষে গিয়ে সব ধরা পড়লো। আমার খারাপ সময়ে ও অড জব করে করে টাকা জোগাড় করেছে। সংসার ও ম্যানেজ করতো, আমি যাতে ঠান্ডা মাথায় গবেষণা করতে পারি তার জন্য আমাকে এসব নিয়ে কখনো ভাবতে দেয়নি। চরম আর্থিক সমস্যায় ও আমার পাশে থেকেছে। আর এখন ও কোমায়, প্রায় দু সপ্তাহ হয়ে গেছে, কোনো রেসপন্স করছে না। ক্লিনিক্যালি ডেড বলতে পারেন।'


সাবের মাহমুদ মহা নিচু করলেন, সম্ভবত চোখের পানি লুকাতে চেষ্টা করলেন।
'জানেন, প্রথম দুদিন কোমায় থাকার পর একদিন কি মনে করে ইউটিউবে আপনার পুরোনো একটা গান ছাড়লাম। আপনি শুনলে অবাক হবেন, একটু সময়ের জন্য ও রেসপন্স করলো! ডাক্তাররা অবাক! ওরা ভাবলো চিকিৎসায় কাজ হয়েছে কিন্তু আমি জানি ও গান শুনে রেসপন্স করেছে। ও আপনাকে ভালোবাসতো, আপনার গান ভালোবাসতো। আপনার প্রতিটা গান, প্রতিটা কনসার্টের খবর ও রাখতো। আপনার গান শুনে কেঁদে চোখ ভাসাতো। অথচ নিজের যোগ্যতা প্রমান করতে আপনি এতই অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন যে আপনার কাছে মায়া তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিলো। '

রাহাতের চোখ কেমন ঝাপসা হয়ে আসছে, কিছুই বলতে পারছে না। জীবনে অনেক সময় আসে যখন মানুষের ভেতর হাজার কথা ঘুরপাক খেতে থাকে কিন্তু মুখে কিছুই বলতে পারে না, রাহাতের জন্য এখন তেমন একটা মুহূর্ত। পুরোনো মুখগুলো চোখের সামনে এসে গেলো আরেকবার।

রাহাত বড়লোক বাবার একমাত্র সন্তান । ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি প্রবল ভালোবাসা রাহাতের। তার বাবা এই পাগলামি কখনোই পছন্দ করেননি। বাবার অঢেল টাকায় প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়তে ওর কোনো সমস্যা হচ্ছিলো না। মায়া মফস্বলের মেয়ে, বাবা মারা গিয়েছিলেন। তার মা শেষ সম্বল জমিজমা বিক্রি করে মেয়েকে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়তে পাঠিয়েছিলেন। কারণ এই ইউনিভার্সিটির ভালো ছাত্র ছাত্রীকে আমেরিকার কয়েকটা ইউনিভার্সিটি থেকে স্কলারশিপ দেয়া হয়। মায়ার ইচ্ছা ছিল এই স্কলারশিপ নিয়ে দেশের বাইরে পালিয়ে যাওয়ার।

মায়াকে সেভাবে কখনোই রাহাতের চোখে পড়েনি। ও চোখে পড়ার মতো মেয়ে না। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ঝলমলে ফ্যাশনেবল মেয়েদের তুলনায় মায়া অতি সাধারণ, সাধারণ দেখতে আর সাধারণ সাজসজ্জা। মায়ার সাথে রাহাতের প্রথম কথা হয় পরীক্ষার হলে। রাহাত পরীক্ষার কোন প্রস্তুতি নেয়নি তাই পাশের সিটে বসা মায়াকে অনুরোধ করেছিল খাতা দেখানোর জন্য। ও দেখায়নি, ধরা পড়ার ভয় পেয়েছিলো। সে পরীক্ষায় পাশ করা রাহাতের খুব দরকার ছিলো। সারাদিন গান নিয়ে ব্যস্ত থাকে বলে লেখাপড়ায় রাহাত কখনোই মনোযোগী ছিল না। বারবার রেজাল্ট খারাপ হচ্ছিলো বলে ইউনিভার্সিটি থেকে নোটিশ এসেছিলো, এই সেমিস্টারে পাশ করতে না পারলে ইউনিভার্সিটি থেকে বের কর দেয়া হবে।

রাহাত সে পরীক্ষায় ফেল করলো । ওর ভীষণ রাগ হচ্ছিলো, মনে হচ্ছিলো মায়া একটু খাতা দেখলেই তো সে পাশ করতো । রাহাত রাগের মাথায় মায়াকে সবার সামনে খুব অপমান করলো। কত কিছুই তো বলেছিলো সেদিন -"নিজেকে লেডি আইনস্টাইন মনে করো? নিজেই একা ভালো রেজাল্ট করবা ? খাতা দেখলে কি তোমার নাম্বার কম হয়ে যেত? সবাই খাতা দেখে, দেখায় , খালি তোমার সমস্যা হয়ে গেলো, তাই না?"

সেই কোর্স টিচার জানালেন এক্সাম রিটেক করবেন, এক সপ্তাহ পরে। রাহাত বুঝতে পারছিলো এক সপ্তাহ পরেও সে আবার ফেল করবো কারণ বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য দিন রাত গানের প্রাকটিসের জন্য পড়ালেখার ধরে কাছেও রাহাত নেই। এক সপ্তাহে পুরো কোর্সএর জন্য প্রস্তুত হওয়া অসম্ভব । রাহাত বুঝতে পারছিলো এই ইউনিভার্সিটি থেকে তাকে বের করে দেয়া হবে। তার বাবা ভয়ংকর রাগী মানুষ, উনি রাহাতকে পেটাতেও পিছপা হবেন না। সে মনে মনে ভাবছিলো কিভাবে বাবাকে পুরো ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করবে।

মায়া তখন তাকে বললো, যেহেতু ফেল করার জন্য রাহাত মায়াকেই দায়ী মনে করে তাহলে মায়াই রাহাতকে পাশ করাবে । রাহাতের কাছে আর কোনো উপায় ছিল না। ও প্রতিদিন ক্লাসের পরে মায়ার কাছে পড়তে বসতো লাইব্রেরিতে। অংকের সমাধান করার অদ্ভুত সব পদ্ধতি ছিল মায়ার । যে অঙ্কগুলোকে ভয় পেতো রাহাত
সেগুলোই কেমন মজাদার মনে হতে লাগলো। মায়া সত্যি সত্যি এক সপ্তাহের মধ্যে রাহাতকে পাশ করার জন্য তৈরী করে দিলো।

পরীক্ষার পরে রাহাত আর মায়া আবার ফিরে গেলো তাদের নিজস্ব জগতে। যেদিন রাহাত জানতে পারলো সে পাশ করেছে সেদিন ও পুরো ক্যাম্পাসে মায়াকে খুঁজলো। সেমেস্টার শেষ বলে ক্যাম্পাস প্রায় খালি, মায়াকে খুঁজে পাওয়া গেলো না। সেদিন কেমন যেন ফাঁকা লাগছিলো সব। মনে হচ্ছিলো একমাত্র মায়ার সাথেই আজকের আনন্দ ভাগ করা যায়।

সেই সেমেস্টার ব্রেকে মায়াকে প্রতি মুহূর্তে মিস করতে লাগলো রাহাত। মিউজিক প্র্যাকটিসে মন দিতে পারছিলো না। অদ্ভুত একটা মনের জোর আছে মেয়েটার মধ্যে, ওর আশেপাশে থাকলেই মনে হয় পৃথিবীতে সব করা সম্ভব, মনের জোর অনেক বেড়ে যায়। মেয়েটার মোবাইলও নেই যে ফোন করবে। পরের সেমিস্টারে প্রথমেই মায়াকে খুঁজে বের করলো রাহাত। সারাক্ষন মায়ার কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করতো। মায়া ছিল রাহাতের শক্তি, অনুপ্রেরণা। মায়া অনেক চেষ্টা করেও রাহাতকে উপেক্ষা করতে পারলো না। ওদের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক হয়ে গেলো।

আহারে, দুজনের সেই প্রজাপতি দিনগুলো! যেন গোলাপি আদরের আবরণে রাহাতের অস্থির জীবনটা পরম মায়ায় ঢেকে রেখেছিলো মায়া, রাহাতের মায়া। বিজনেস ফ্যাকাল্টির নীচতলার দেয়ালে যেখানে সব প্রেমিক প্রেমিকা নিজেদের নাম লিখে রাখতো, সেখানে রাহাত লিখেছিলো, "রাহাতের মায়া"। লেখাটা প্রতিদিন দেখতো রাহাত। এখনো আছে সেই লেখাটা?

'কী ভাবছেন রাহাত? আপনি কি গানটা করবেন প্লিজ?'
'সাবের মাহমুদ সাহেব, আমি জানি না আমার সম্পর্কে মায়া আপনাকে কি বলেছে। যেহেতু আপনি প্রসঙ্গটা তুলেছেন, আপনাকে জানানো দরকার বলে মনে করি। আমার বাবার টাকার অভাব ছিল না। কিন্তু আমার ব্যান্ডের অন্যান্য মেম্বার -জাহিদ, সানী আর জয় -ওরা অত ধনী পরিবার থেকে আসেনি। গান ছাড়া ওরা পৃথিবীতে আর কিছুই জানতো না। ওদের ধ্যান জ্ঞান সব ছিল এই ব্যান্ড। ব্যান্ড নিয়ে ওদের কত স্বপ্ন, কত উচ্চাশা! আমাদের ব্যান্ড মিউজিক ফেস্টে ব্যান্ডের লড়াইয়ে অংশ নেবে। সবাই আমরা রাত দিন প্রাকটিস করছিলাম। অথচ আমার মনোযোগ সব মায়ার জন্য। ওকে নিয়ে সারাদিন ঘুরে বেড়াই, আমার টিম মেম্বাররা ঘন্টার পর ঘন্টা আমার জন্য অপেক্ষা করে। একদিন সন্ধ্যায় প্র্যাকটিসে আসার পর ওরা আমাকে চেপে ধরলো। জাহিদ ছিল একটু মারমুখী ধরণের মানুষ। ও আমাকে বললো ভব্যিষৎ ক্যারিয়ার নিয়ে আমার চিন্তা না থাকলেও ওদের সবার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই ব্যান্ডের উপর, যেমন করেই হোক এই ব্যান্ডকে সফল করতেই হবে। এই ব্যান্ডের প্রতি আমার অমনোযোগিতা ওদের রাগিয়ে দিয়েছিলো। ওরা আমাকে বললো কিছুদিন যেন মায়ার সাথে যোগাযোগ না রাখি, ব্যান্ডকে ডেডিকেশন দেই। এই নিয়ে আমাদের মধ্যে ভীষণ কথা কাটাকাটি হয়। আমি এতই রেগে যাই যে হুট্ করে জাহিদকে ঘুষি মেরে বসি। সানী আর জয় আমাদের ঝগড়া থামায়, আমরা একসময় শান্ত হই। আমি ভুল বুঝতে পারলাম। আমি ঠিক করলাম প্রতিযোগিতা শেষ হওয়া পর্যন্ত ব্যান্ডকে সময় দেবো। এর মধ্যেই মায়া হটাৎ করে জানালো ওর বিয়ে ঠিক হয়েছে। আমি যেন দ্রুত ওকে বিয়ে করার ব্যবস্থা করি। আচ্ছা আপনি বলুন, আমার সেই মুহূর্তে কী করার ছিলো ? আমার পড়ালেখা শেষ হয়নি, বাবার কাছে আমি একটা অপদার্থ ছাড়া আর কিছুই না, নিজের এক পয়সা নেই, আমি কি করে ওকে বিয়ে করবো? আমার ফ্যামিলিতে বিয়ের প্রসঙ্গে কথা বলাই সম্ভব ছিলোনা। এই একটা সুযোগ গানের ব্যাপারে নিজের আর আমার ব্যান্ডের যোগ্যতা প্রমান করার। দুঃশ্চিন্তায় আমার মাথা ঠিক ছিল না। আমি মায়াকে জানিয়ে দেই এই মুহূর্তে বিয়ে করা সম্ভব না, ও যেন অপেক্ষা করে। ও জেদ করে বিয়ে করে ফেললো। আচ্ছা, আপনি বলুন তো, ওই সময় হুট্ করে বিয়ে করলে আমার ব্যান্ড মেম্বারদের কী হতো?'
'আপনি আপনার টিম মেম্বার নিয়ে এত চিন্তা করেন অথচ ওদের ছেড়ে নিজের সোলো ক্যারিয়ার করলেন , ব্যাপারটা অদ্ভুত না?'
'না সাবের সাহেব। আমি যখন জানতে পারলাম মায়া বিয়ে করেছে, আমেরিকা যাওয়ার অপেক্ষায় পড়ালেখা বিসর্জন দিয়ে ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে, আমি ভয়াবহ বিষন্নতায় ডুবে গেলাম। আমাদের ব্যান্ডের সাফল্য আমার বন্ধুদের এতই অন্ধ করে দিয়েছিলো যে আমার দুরবস্থা ওদের নজরেই আসেনি। যেন মায়ার চলে যাওয়া বা আমার প্রচন্ড বিষন্নতায় ওদের কিছুই যায় আসে না। আমি যতই ওদের কাছ থেকে সাপোর্ট আশা করি ওরা যেন ততই আমাকে দূরে সরিয়ে দেয়। আপনি হয়তো জানেন না, বেশ অনেকদিন ড্র্যাগ এডিকশনের চিকিৎসা নিতে হয়েছিল আমার। একসময় আমি ডিসিশান নিলাম ওদের সাথে আর না। আমি ব্যান্ড ভেঙে বেরিয়ে এলাম। ব্যাপারটা এত সহজ ছিল না। কিন্তু তখন শায়লা পাশে দাঁড়িয়েছে, আমার সোলো ক্যারিয়ার করতে সবরকম সাহায্য করেছে। শায়লা এখন আমার স্ত্রী। বাবা একসময় গর্ব করে তার বন্ধুদের বলতেন, এইযে আমার ছেলে, অনেক বড় শিল্পী, দেশে তো গায়ই, দেশের বাইরেও গান করতে যায়।'

সাবের মাহমুদ তাকিয়ে আছেন রাহাতের চোখের দিকে। তার চোখ কেমন চকচক করছে।
'থ্যাংক ইউ রাহাত সাহেব। হয়তো আপনি ঠিক ছিলেন। আমার দুঃখ কি জানেন, অনেক চেষ্টা করেও মায়া আমাকে কখনো ভালোবাসতে পারেনি। আমার সাথে বাস করতো, কিন্তু ওর মনটা আপনাকে দিয়ে গিয়েছিলো। আমার মনে হয় ওকে এতদিন বন্দি করে রেখেছি আর মায়া ধুঁকে ধুঁকে শেষ হয়ে গেছে। আমাকে কখনো কিছুই বলেনি। ও যখন প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলো, তখন সে আপনার উদ্দেশ্যে অনেকগুলো চিঠি লিখেছিলো। ওই চিঠিগুলো পড়ে আমি আপনার কথা জানতে পারি। আমি প্রচন্ড আহত হই, আমার সবকিছুই অর্থহীন মনে হতে শুরু করলো। আমি বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ গ্রহণ করি। তারপর একসময় মনে হলো আমি আপনার সাথে দেখা করবো, আমি দেখবো কে সেই মানুষ যার জন্য মৃত্যুশয্যায় আমার স্ত্রী চিঠি লিখেছে। লোকটা কি আমার চেয়ে অনেক বড় মাপের মানুষ? তাছাড়া গানটা আমি সত্যি রেকর্ড করতে চেয়েছি। আমার ভয় ছিল আপনি হয়তো রাজি হবেন না। যখন আপনাকে টাকা দিলাম, আপনি রাজি হলেন। আমি মিথ্যা বলবো না, মনে মনে একধরণের স্বস্তি পেয়েছি। মনে হয় আপনি টাকার কাছে বিক্রি হওয়ার মতো একজন মানুষ। মায়া আপনাকে যেমন নিষ্পাপ মানুষ মনে করে, আপনি তেমন নন। আপনি অন্য সবার মতোই অতি সাধারণ। '

রাহাতের মুখে একটু হাসি খেলে গেলো, 'আপনি ঠিকই বলেছেন, আমি অতি সাধারণ। তাই জীবনে অনেক ভুল করেছি, ভবিষ্যতেও করবো। আপনি কি মায়ার জন্য গানটা রেকর্ড করবেন?'

সাবের মাহমুদ হেসে ভিডিও ক্যামেরা চালু করলেন। রাহাত গিটারে হাত বুলিয়ে মায়ার মুখটা একবার মনে করলো, জন্মদিনে জয়ের বাড়ির ছাদে গানটা করেছিল রাহাত। তারপর চোখ বন্ধ করে গাইতে শুরু করলো,

'রাত গভীর হলে, নাচবে অন্ধকার, জোনাক নিয়ে তুমি এসো, তুমি এসো
মোমের আলোর টিপ পরে আমার জীবনে এসো
আর কিছু নেই, শুধু তুমি আমি আর জোনাকের সাগর
তুমি এসো, আমার পাশে এসো......'

সাবের মাহমুদের চোখ থেকে পানি পড়ছে। কি গভীর দরদ দিয়ে গান করছে রাহাত! প্রতিটা শব্দ অগ্রাসী মায়ায় জড়ানো। এই গান শুনলে যেকোনো মেয়ে রাহাতের প্রেমে পড়বে।

গান গাওয়ার এক ঘন্টা শেষ হয়েছে। রাহাত গিটারটা কভারের মধ্যে গুছিয়ে নিলো। তারপর মাথা নিচু করে সাবের মাহমুদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। ও বুঝতে পারছে না কি বলা উচিত এখন। সাধারণ ভাবে হাত মিলিয়ে বিদায় নেবে? রাহাতের নিজেকে কেমন তুচ্ছ লাগছে। তার সব অহংকার যেন এই হোটেল রুমের ঠান্ডা বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে।

'রাহাত, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। গানটা আমি হাসপাতালে পাঠিয়ে দিচ্ছি, ডক্টর আমার অনুরোধে গানটা বাজাবেন মায়ার জন্য। আরেকটা অনুরোধ ছিলো। বলবো?'
'অবশ্যই বলবেন। '
'মায়ার শেষের দিকের চিঠিগুলো এত হিজিবিজি করে লেখা যে আমি সেগুলোর অর্থ বের করতে পারিনি। দেখে মনে হয় খুব তাড়াহুড়ো করে লিখেছে কিন্তু অসুস্থতার জন্য হয়তো ওর হাত কাঁপছিলো। আমার কেন জানি মনে হয় ওই চিঠিগুলোতে আপনার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু লিখেছে। আমি গত কয়েক সপ্তাহ দিনরাত শুধু ওই চিঠিগুলো নিয়ে বসে আছি, অর্থ বের করার চেষ্টায়। মনে হয় খুব কঠিন একটা পাজল সল্ভ করছি, কয়েকটা শব্দ উদ্ধার করতে পেরে মনে হয়েছে বিশাল কিছু করে ফেলেছি। আপনি কি চিঠিগুলোর এক কপি নেবেন? আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আপনি হয়তো সেগুলোর অর্থ বের করতে পারবেন।'

রাহাত মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো। সাবের মাহমুদ একটা বাদামি খামে ফটোকপি করা কিছু কাগজ দিলেন। তার চোখে মুখে ক্লান্তির সাথে ভর করেছে আকুলতা। রাহাত ক্ষীণ কণ্ঠে বললো, 'মায়াকে বলবেন আমাকে ক্ষমা করতে, প্লিজ।'

রাহাত লবিতে এসে শামীমকে বললো গাড়ি ডাকতে। শামীম অবাক হয়ে বললো, 'স্যার আপনার কি হয়েছে? আপনাকে এমন লাগছে কেন?'
'কিছুই হয়নি শামীম। তাড়াতাড়ি চলো এখান থেকে, আমার ভালো লাগছে না'।

শামীম কথা বাড়ালো না। গড়িয়ে বসে সাইড ভিউ মিররে একঝলক দেখে শামীমের মনে হলো রাহাত কাঁদছে! ওর খুব ইচ্ছা হলো ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে কিন্তু কাজটা করা ঠিক হবে না। পেছনের সিটে বসা রাহাতকে ও আবার মিররে ভালো করে লক্ষ্য করলো কিন্তু ওখানে জমাট অন্ধকার অবয়ব ছাড়া কিছুই দেখতে পেলো না।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement