বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৬ জুন ১৯৮২
গল্প/কবিতা: ৭০টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৬৮

বিচারক স্কোরঃ ২.৬৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২ / ৩.০

পাথর

কামনা আগস্ট ২০১৭

সান্ধ্য আলিঙ্গন

কামনা আগস্ট ২০১৭

ব্যর্থ প্রত্যাবর্তন

ঋণ জুলাই ২০১৭

গল্প - ঋণ (জুলাই ২০১৭)

মোট ভোট ২০ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৬৮ অব্যক্ত প্রতিদান

ড. জায়েদ বিন জাকির শাওন
comment ১৯  favorite ০  import_contacts ৩১১
আইসা পড়সে! আইসা পড়সে!!’ বলে প্রায় শ’দুয়েক বাচ্চা ছেলেমেয়ে হাই স্কুল মাঠে হৈচৈ করে উঠলো। বাচ্চাগুলোর কারো গায়ে কাপড় আছে, আর কেউ কেউ খালি গায়ে কোনমতে একটা হাফপ্যান্ট পরে চলে এসেছে। সবার চোখে মুখে অন্যরকম একটা খুশির ঝলক খেলা করছে। প্রতিবছর এই দিনটাতে ওদের খুব আনন্দ হয়। আজ ওরা ইচ্ছেমত দুধ খেতে পারবে। যতক্ষণ খুশি, যত গ্লাস খুশি। যেসব বাচ্চারা বেশী ছোট, তাদের মায়েরা মাঠের অন্যপাশে অপেক্ষা করছে। তাদের হাতেও আজকে দুধের প্যাকেট তুলে দেয়া হবে বিনামূল্যে; মৃধা ডেইরি ফার্মের পক্ষ থেকে।

বড় বড় দুইটা লরি এসে থামলো মাঠের পাশে। পেছনে একটা কালো জিপ গাড়িতে এসে নামলেন ডাইরি ফার্মের কর্ণধার মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী এবং তার স্ত্রী। উনাদের দেখে বাচ্চারা আর এক প্রস্থ সোল্লাসে হৈচৈ করে উঠলো। গ্রামের কয়েকজন ভলান্টিয়ার দ্রুত চেয়ার নিয়ে এগিয়ে এলো। ‘কি রে নুরু, কেমন আছিস তোরা?’ চেয়ার এগিয়ে দেয়া ছেলেটাকে জিজ্ঞাসা করলেন মাহতাব সাহেব।
‘জ্বে স্যার, ভালা আছি’।
‘সেলিমুল্লাহ কেমন আছে? ওর নাকি যমজ বাচ্চা হইসে?’
‘জ্বে স্যার। যমক মাইয়া হইসে, খুব সোন্দর হইছে স্যার। সেলিমুল্লাহ হাটে গেসে। চইলা আইবো’।

মাহতাব সাহেব দেখলেন তার স্ত্রী মহিলাদের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় করছেন আর কোলের বাচ্চাগুলো দেখছেন ভালো করে। দুই একটা বাচ্চাকে নিজেও কোলে তুলে নিচ্ছেন। মাহতাব সাহেবের চোখের কোনায় পানি জমলো। কাউকে বুঝতে না দিয়ে টিস্যু পেপার দিয়ে মুছে ফেললেন চশমা খোলার ছলে।
‘স্যার, বাচ্চাদের লাইন করা হয়েছে। বারোটা লাইনে ওরা দাঁড়ানো আছে। শুরু করে দেই?’ কর্মচারীদের একজন জিজ্ঞাসা করে।
‘হুম শুরু কর’। গম্ভীর গলায় বললেন মাহতাব সাহেব।

টেবিলের উপরে অনেকগুলো দুধের ডিস্পেন্সার আর প্লাস্টিকের গ্লাস রাখা। বাচ্চারা একে একে আসছে আর দুধ পান করছে। যার যত গ্লাস খুশি। কেউ পুনরায় খেতে চাইলে আবার লাইনে দাঁড়াচ্ছে। মাহতাব সাহেব আর তার স্ত্রী ঘুরে ঘুরে দেখছেন বাচ্চাদের এই দুধ খাওয়া উৎসব। এমন সময় স্কুলের হেডমাস্টার মাহমুদ আলী এসে মাহতাব সাহেবকে সালাম দিয়ে বললেন, ‘স্যার, ঢাকা থেকে সাংবাদিক এসেছে, আপনার সাথে কথা বলার জন্য। আসতে বলবো?’
‘আমার সাথে কথা বলবে? আমি তো ভেবেছিলাম উনারা বাচ্চাদের ভিডিও করবে’। হেডমাস্টারের সাথে হাত মেলাতে মেলাতে বললেন মাহতাব সাহেব। ‘ওদের ভিডিও চলছে স্যার। কয়েকটা বাচ্চার সাথে কথাও বলেছেন উনারা। বাচ্চারা ক্যামেরা দেখে অনেক খুশি হয়েছে। ওদের টিভিতে দেখাবে এতেই ওদের অনেক আনন্দ’।
‘বাচ্চারাতো হৈচৈ করবেই। ওদেরকে আজ ইচ্ছামত আনন্দ করতে দিন মাহমুদ সাহেব। আজ কোন বকাঝকা নেই’। হাসতে হাসতে বললেন মাহতাব সাহেব।
‘জ্বি স্যার অবশ্যই’।

অল্পবয়স্ক একজন মেয়ে হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে এগিয়ে এলো। পেছন পেছন এলো একটা ক্যামেরাম্যান। মাহতাব সাহেব দ্রুত বলে উঠলেন, প্লিজ ক্যামেরা এখন নয়। আগে আমরা কথা বলে শেষ করি। মেয়েটি হাতের ইশারায় ক্যামেরাম্যানকে ভিডিও না করার ইঙ্গিত দিল। হেডমাস্টার বললেন, স্যার আমার রুমে চলেন। ওখানে নিরিবিলি কথা বলতে পারবেন। এখানে অনেক শব্দ’।

হেডমাস্টার এর রুমে সাংবাদিকের মুখোমুখি বসলেন মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী। ‘জ্বি বলুন’। গুরুগম্ভীর কন্ঠে বললেন মাহতাব সাহেব।
‘স্যার, আমরা মুলত আপনার গ্রামের এই দুধ উৎসবের ব্যাপারে জানতে আগ্রহী। এর পেছনে কোন কারণ আছে কি না? অথবা আপনার কোন পরিকল্পনা আছে কি না?’
‘না পরিকল্পনা তেমন কিছু না। আমার ডেইরি ফার্মের প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই আমরা এই দিনে এমন অনুষ্ঠান করে আসছি। নিছক বাচ্চাদের সাথে সময় কাটানোর জন্য, ওদের একটু আনন্দ দেবার জন্য। আর বাচ্চাদের অনেকেই তো দুধ খেতে পছন্দ করে’।
‘জ্বি স্যার অবশ্যই। স্যার, আপনার নামের পদবী আমরা জেনেছি চৌধুরি, কিন্তু আপনার ফার্মের নাম মৃধা ডেইরি ফার্ম কেন জানতে পারি কি’?
‘জ্বি, অবশ্যই পারেন। কিন্তু আমি আপনার এই প্রশ্নের উত্তরটা একটু পরে দেব। হয়ত আমার কথার মধ্যে আপনি নিজেই উত্তর পেয়ে যাবেন’।
‘ঠিক আছে স্যার। কোন সমস্যা নেই। বাচ্চাদের এভাবে উৎসবের মাধ্যমে দুধ পান করানো, এর পেছনে কি আপনার বিশেষ কোন কারণ আছে? যদি কাইন্ডলি আমাদের বলেন, মানে যদি আপনার কোন আপত্তি না থাকে’?
‘না আপত্তি কি! আমার ছেলেটা দুধ খেতে খুব পছন্দ করতো। বলতে পারেন ওর স্মরণে আমরা এটা করি’।
‘স্মরণে?’
‘জ্বি আমার ছেলেটা চার বছর বয়সে মারা যায়’।
‘স্যার, আমরা সমবেদনা প্রকাশ করছি। আপনার অন্য সন্তান সন্ততি’?
‘আমার আর কোন সন্তান নেই’।
‘স্যার আমি সত্যিই দুঃখিত। আপনার কষ্টকে বাড়িয়ে তুললাম। কি হয়েছিল আমাদের কি বলা যাবে স্যার?’
‘জ্বি বলা যাবে। এটাই আমার গ্রাম। আমার ছেলেটা যখন হয়, তখন আমাদের নিতান্তই দরিদ্র সংসার। আমাদের জমিজমাও এমন কিছু ছিল না। আমার ছেলে হল। ছেলেটা একটু বড় হল। দুধ খেতে খুব ভালবাসতো ও। কিন্তু ওকে নিয়মিত দুধ খাওয়ানোর সামর্থ্য আমার ছিল না। আমার কোন গরুও ছিল না। ছেলেটা আমার বলতো, বাজান আমাদের গরু কিনবা কবে? হাট থেকে লাল রঙের গরু কিনবো বলে ওকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে রাখতাম। ওর যখন সাড়ে চার বছর বয়স, তখন খুব জ্বর হল। কিছুতেই জ্বর ছাড়ে না। ডাক্তার অষুধ ঝাড় ফুঁক সবই করানো হয়েছিল। গঞ্জে নিয়ে ডাক্তার ও দেখানো হয়েছিল। জানতে পারলাম কালাজ্বর হয়েছে। ঐসময় কালাজ্বরের তেমন কোন চিকিৎসা আমাদের এই তল্লাটে ছিল না। ঐ জ্বরেই ছেলেটা আমার মারা গেল। আমাদের চোখের সামনেই। আমরা কিছুই করতে পারিনি’।

এটুকু বলে চোখ মুছলেন মাহতাব সাহেব। আবার বলা শুরু করলেন, ‘যেদিন মারা গেল, তার কিছুক্ষণ আগে আমার ছেলেটা ওর মাকে বললো, মা দুধ খাবো। তখন আমার ঘরে আর কিছুই ছিল না। ওর চিকিৎসা করতে গিয়ে সব ব্যয় হয়ে গিয়েছিল। ওর মা একটা মগ আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘যেখান থেকে পারেন ওর লাইগা একটু দুধ আইনা দেন’। এই বলে ওর মা হাউমাউ করে কাদতে থাকে। আমার ছেলেটা নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছিলো। চোখের পানি মুছে মগ নিয়ে বের হলাম। কার কাছে যাব, আর কার ঘরে একটু দুধ পাবো? কিছুই মাথায় চিন্তা করে পারছিলাম না। কাঁদতে কাঁদতে পাগলের মত রাস্তা দিয়ে দৌড়াচ্ছিলাম। তখন পাশের পাড়ার রহিম মৃধা ভাই, তার গরু আর বাছুর নিয়ে মাঠে ঘাস খাওয়ানোর জন্য যাচ্ছিল। আমার বিহ্বল দশা দেখে বলল, ও মিয়া কই যাইতাসো? উনাকে বললাম। সাথে সাথে উনি গরুকে রাস্তার উপরে গরু দাঁড় করায়ে আমার মগে কিছুটা দুধ দুইয়ে দিল। আমাকে বলেছিল, জলদি যাও মিয়া। পোলারে খাওয়াও। আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে গরু নিয়ে চলে গেলেন। আমি ঘরে ফিরে দেখি আমার ছেলের বুক হাপরের মত ওঠা নামা করছে। ওর মা, ঐ কাঁচা দুধ ঝিনুকে করে দুইবার ছেলের গালে দিল। ছেলে মুচকি একটু হাসি দিয়ে ঢোক গিললো। এরপরের বার দুধ গালের পাশ দিয়ে বেয়ে পড়ে গেল। মারা গেল আমার ছেলে। এরপর জীবনে কতো কিছু হল। একটা দুইটা গরু থেকে ডেইরি ফার্ম দাঁড় করিয়ে ফেললাম। রহিম ভাই একজন নিঃসন্তান লোক ছিলেন। সারাজীবন এই লোকটার জন্য কিছু করতে চেয়েছি। কখনও আমার কাছ থেকে কিছু নেয় নি। আজ কতো বছর হয়ে গেল রহিম ভাই ও চলে গেল। এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন আমার ফার্মের এরূপ নামকরণের কারণ?’ সাংবাদিককে প্রশ্ন করলেন মাহতাব সাহেব।
‘জ্বি স্যার বুঝতে পেরেছি। রহিম মৃধা সাহেবের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আপনি এই নাম দিয়েছেন’।
‘শুধু শ্রদ্ধা নয় ম্যাডাম, রহিম ভাই এর ঋণ শোধ করার মিছেমিছি একটু চেষ্টা করি মাত্র। চলুন নিচে যাই। দেখি বাচ্চারা কি করছে’।সাংবাদিক মুগ্ধ চোখে একজন কৃতজ্ঞ মানুষের গমনপথের দিকে তাকিয়ে থাকে।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন