বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৭ মে ১৯৬৮
গল্প/কবিতা: ১১২টি

মৃত্যুর শিরোনাম

প্রশ্ন ডিসেম্বর ২০১৭

ভূতের ছবি অাঁকি

ভৌতিক সেপ্টেম্বর ২০১৭

বিড়াল ভূত

ভৌতিক সেপ্টেম্বর ২০১৭

গল্প - প্রশ্ন (ডিসেম্বর ২০১৭)

একাত্তরের দশরথ

মিলন বনিক
comment ৪  favorite ১  import_contacts ৬০
খোরশেদ সাহেব নিখোঁজ হয়েছেন।
বিষয়টা কিছুতেই চেপে রাখা যাচ্ছে না। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের এমন একজন জাঁদরেল কর্মকর্তা, তাকে কী না আজ ছয় দিন ধরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বাসার সবাই অস্থির। বৃহষ্পতিবার অফিস থেকে বাসায় ফিরে প্রতিদিনের মতো চা বিস্কিট খেয়েছে। স্ত্রী সাহানা বেগম পাশে বসে চায়ের কাপ হাতে তুলে দিয়ে বলেছে-
- এবার মেয়েটার বিয়ের কথাতো ভাবতে হবে। তোমার তো সবকিছুতে গা ছাড়া ভাব।
- তোমার ফুফাতো বোনের ছেলেটার নাম যেন কি? খোরশেদ সাহেব চায়ে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।
- সাগর। সাগর আহমেদ।
- বোষ্টন থেকে ফিরেছে?
- এই সামারে আসবে।
- ছেলেটা মন্দ না। তুমি কী বলো?
- আমারও তাই মনে হচ্ছে। দু’জনের মধ্যে ফেসবুকে কথাবার্তা হয়। আমার ফ্রে-লিস্টেও আছে। সাগর প্রায়ই ফোন করে।
- তাই না কি? ভাবছি এই বয়সে আমিও একটা ফেসবুক একাউন্ট করে নেবো। বয়সটা একটু কমিয়ে দেবো। তারপর সেই ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়কালীন একটা ছবি প্রোপাইলে দিয়ে দেবো। তুমি কী বলো সাহানা?
- তোমার আবার এই ভীমরতি হলো কবে? কতবার বলেছি মোবাইল সেটটা পাল্টে একটা এনড্রয়েড সেট নাও। কত সহজে ফেসবুক ব্যবহার করা যায়। তোমার মোবাইলে তো কল করা আর ধরা ছাড়া কোনো অপশন নেই।
- বেশ তো চলে যাচ্ছে। তা তোমার ফেসবুক বন্ধু এখন কতো?
- লিমিট ক্রস করেছে।
- ছবি দিয়েছো?
- হ্যাঁ। ছবি না দিলে এতো বন্ধু হতো? সেই ইউনিভার্সিটি লাইফের ছবি।
- আর ডেট অব বার্থ?
- অপশনটা খালি রেখেছি। মানে সালটা দিই নি।
- পেশা?
- তাও খালি রেখেছি।
খোরশেদ সাহেব জোড়ে হাসলেন।
- হাসলে যে?
- হাসলাম, কারণ আমরা তো সবাই খালি, শুধু ঘন্টা বাজিয়ে যাচ্ছি।
চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে কাপটা সাহানার হাতে দিয়ে দিয়ে বললেন-
- তৌশি এখনও ফেরেনি?
- না, ক্লাস শেষে নাকি গ্রুপ ষ্টাডি আছে। সামনে পরীক্ষা।
- ওহ! বলে খোরশেদ সাহেব উঠলেন।

ক’দিন ধরে বেশ অস্থির সময় পার করছেন খোরশেদ সাহেব। মাঝে মধ্যে খুব আনমনা হয়ে যান। সচিবালয়ের ডাকসাইটে কর্মকর্তা। অফিসে কতোরকমের লোকজন আসেন। সবার সাথে, সহকর্মীদের সাথে কথা বলছেন। মেলামেশা করছেন। অথচ নির্দ্দিষ্ট দুরত্ব বজায় রাখছেন। অনেক কিছুই মুখ ফুটে বলছেন না। কি কারণে মনের এই দৈন্যদশা তাও ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। আর ক’দিন পর একটা গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রনালয়ের সচিব হিসাবে পদোন্নতি পাবেন। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ।
সচিবালয়ে খোরশেদ সাহেবকে নিয়ে রীতিমতো কানাঘুষা শুরু হয়ে গেছে। অধস্তন যারা তারাও স্যারের এই অবস্থার কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না। অবাক ব্যপার হলো খোরশেদ সাহেব যেদিন পিয়ন রহমতকে ডেকে বললেন-
- রহমত।
- জ্বী স্যার।
- এদিকে এসো। রহমত সামনে এসে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
- দুপুরের খাবার এনেছো?
- জ্বী স্যার।
- কী রান্না করেছে?
- আলু ভাজি আর ডিম সেদ্ধ।
- ক্ষুধা লেগেছে?
- জ্বী স্যার।
- আমারও লেগেছে। প্রতিদিন বিরানী খেতে ইচ্ছে করে না?
রহমত চুপ করে আছে।
- বিরানী খেলে খরচ বেশি? জিজ্ঞাসা করলেন খোরশেদ সাহেব।
- জ্বী স্যার।
খোরশেদ সাহেব মানিব্যাগ বের করলেন। একটা একহাজার টাকার নোট রহমতের হাতে দিয়ে বললেন-
- এই নাও, বিরানী খেয়ে এসো। বাকি টাকা দিয়ে তোমার বউ ছেলেমেয়ের জন্য বিরানি নিয়ে যাবে। ওদের বিরানি ভালো লাগে?
- জ্বী স্যার।
- তোমার লাঞ্চটা আমাকে দিয়ে যাও। আমি খাবো। অসুবিধা আছে?
- স্যার, এই আলু ভাজি আর ডিম---মানে---মানে স্যার। আমতা আমতা করছে রহমত। কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না।
খোরশেদ সাহেব পরম আনন্দে রহমতের খাবার খেলো আর তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বললো-
- আল-হামদুলিল্লাহ। খুব শান্তি পেলাম।

সেদিনের পর থেকে রহমতের বার বার মনে হচ্ছিল স্যারের মাথায় যেন গ-গোল দেখা দিয়েছে। গ-গোল থাকলেও মানুষটা খুব ভালো। ঘটনাটা কাউকে বলতে পারছে না। রহমত না বললেও ব্যাপারটা চাপা থাকেনি। রহমতের কপাল ভালো। যে স্যারকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানো যায় না, উনি কী না নিজে থেকে চেয়ে খেয়ে নিল। তাও আলু ভাজি আর ডিম সেদ্ধ। সত্যিই লোকটা অনেক বড় মনের মানুষ। সিনিয়র সচিবরা মুখ টিপে হাসেন। আড়ালে পেলে জিজ্ঞাসা করেন-
- খোরশেদ সাহেব। শরীর ভালো তো?
- জ্বী স্যার। ভালো।
- কোনো সমস্যা হলে ক’দিন বাইরে গিয়ে হাওয়া বদল করে আসুন। ভালো লাগবে।
- স্যার, আমি ভালো আছি। ঢাকা শহরের বিষাক্ত বাতাস গা সওয়া হয়ে গেছে। বাইরের বিশুদ্ধ বাতাস সহ্য হবে না।
- ঠিক বলেছেন। এক কাজ করুন, কক্সবাজার চলে যান। আমি ডিসি কে বলে দিচ্ছি। সব ব্যবস্থা করে রাখবেন।
- ধন্যবাদ স্যার। তেমন প্রয়োজন হলে আমিই বলবো স্যার।

নাহ! অফিসের কাজেও খোরশেদ সাহেবের কোনো সমস্যা আছে বলে মনে হচ্ছে না। কাগজ না দেখে কারও কথার উপর একটা সইও করবেন না। যা হচ্ছে তা খোরশেদ সাহেবের একান্ত নিজস্ব ব্যাপার। নিতান্ত মনের ব্যাপার।

কখন যে কেন খারাপ লাগছে তা নিজেও বুঝে উঠতে পারছেন না। খুব দরিদ্র পরিবার থেকে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আজ এই অবস্থানে এলেও কোনো অপূর্ণতা নেই। গুলশানে তিনহাজার স্কয়ার ফিটের ফ্লাট তো আছেই। সংসারেও তেমন কোনো ঝামেলা নেই। স্ত্রী সাহানা, মেয়ে তৌশি আর ছেলে রায়হানকে নিয়ে সুখের সংসার। বড় ছেলে রায়হান ইউএসএ থেকে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং-এ হায়ার ষ্টাডি শেষ করে ওখানেই সেটেলড। ভালো জব করছে। তৌশি ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ করছে। এখন ভালোই ভালোই বিয়েটা দিতে পারলে ঝামেলা শেষ। একবারে ঝাড়া হাত পা।

সুযোগ পেলে দেশের বাইরে গিয়েও ঘুরে আসেন। একজন মানুষ সুখে থাকার জন্য যা যা প্রয়োজন তার সবিই আছে খোরশেদ সাহেবের। শরীর স্বাস্থ্যও ভালো। এখনও প্রতিদিন সকাল বিকাল একঘন্টা করে হাঁটেন। গায়ের রং ফর্সা গৌরবর্ণ। নিয়মিত ক্লিন শেভ করেন। বেশ পরিপাটি পোশাক পরিচ্ছদ। হাফশার্ট ইন করে পড়েন। ডান হাতে রোলেক্স ঘড়ি পড়েন।

চা খেয়ে জগিং ট্রাকস্যুট পরে হাঁটতে যাওয়ার কথা। যাচ্ছেন না। মন ভালো নেই। সিডিটা অন করেছেন। ছোট ভলিউমে রবীন্দ্র সংগীত শুনছেন। কথাবার্তাও তেমন বলছেন না। স্ত্রীর সাথেও তেমন মনোমালিন্য ইদানীং ঘটেনি। স্বাভাবিক বাঙালি সংসারে যা হয়। সংসারের বয়স বেড়ে গেলে প্রেম-ভালোবাসাও মুটিয়ে যায়। মাঝে মধ্যে স্ত্রী সাহানার সাথে কথা কাটাকাটি হয়। কয়েকদিন মান অভিমানও চলে। আবার যথানিয়মে তা মিলিয়েও যায়। সংসারে যা হয়। ভুলে যেতে হয় অতীত। এমনকি ভুলে থাকতে হয় গতকাল যা হয়েছে তাও।

তৌশি ঘরে ঢুকে বাবাকে ড্রইং রুমে বসে থাকতে দেখে বিস্মিত হয়। এই সময়ে মন্ত্রনালয়ের ডাকসাইটে কর্মকর্তার তো ইভনিং ওয়ার্কে থাকার কথা। তৌশি ব্যগটা সোফায় রেখে বাবার পাশে বসে জিজ্ঞাসা করলো-
- হাঁটতে যাওনি?
- না।
- শরীর খারাপ?
- না।
- তাহলে? কী হয়েছে তোমার?
- আয়, তোর কানে কানে বলি।
খোরশেদ সাহেব তৌশির মাথাটা নিজের মুখের কাছে টেনে এনে বললো-
- পেতিœ ভর করেছে। তোর মাকে বলিস না।
হো হো শব্দ করে হেসে উঠলেন খোরশেদ সাহেব। মেয়েও কম কিসে। সাথে সাথে চুপি চুপি জিজ্ঞাসা করলেন-
- বাবা পেতিœটা দেখতে কেমন?
- খুব সুন্দর। তবে উপরের পাটির সামনের দাঁত দুটো একটু বড়, আর নিচের পাটির সামনের দুটো দাঁত নেই।
- বাবা, তুমি কিন্তু ইয়ার্কি করছো। আমি সিরিয়াসলি বলছি।
- আমি মোটেও ইয়ার্কি করছি না। একদম ঠিক বলছি। আচ্ছা মনে কর, ত্রিশ বছর আগে দেখা একটা ছোট্ট গ্রাম্য কিশোরীর ছবি আজ ত্রিশ বছর পর কেমন হতে পারে?
- বাবা, একটা পয়েন্ট মিস করে গেলে।
- কি?
- যখন দেখেছিলে তখন ঐ কিশোরীর বয়স কত ছিল?
- বড়জোড় পনের ষোলো।
- ধরলাম পনেরো। এখন ত্রিশ যোগ করলে পঁয়তাল্লিশ। তার মানে পঞ্চাশের কাছাকাছি। ধরো এখন মায়ের মতো হবে।
- ঠিক বলেছিস।
- আচ্ছা যখন পেতিœটাকে দেখেছো তখন কি শাড়ি পরা ছিলো নাকি ফ্রক?
- শাড়ি। কেমন করে যেনো শাড়িটা পরেছিলো?
একমুহূর্ত ভাবলেন। কিছুসময়ের জন্য অতীতে ফিরে গেলেন। মুহূর্তেই একটা মৃদু হাসির রেখা ষ্পষ্ট হয়ে উঠলো। তারপর বললেন-
- সবুজ জমিনে লাল পাড়ের মোটা সুতি শাড়ি। এক কুচি করে পরেছিলো। খুব সুন্দর লাগছিলো।
- বয়সটা কি পরে বুঝেছিলে বাবা?
- হ্যাঁ। ওর মাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। বলেছিলো, এককুড়ি হইতে এখনও চাইর বছর বাকি।
- নাম?
- আয়েশা। আয়েশা খাতুন।
- উনাকে তোমার এখনও মনে আছে?
- হ্যাঁ, খুব মনে আছে। মেয়েটা সামান্য লেখাপড়া জানতো। অথচ কী সুন্দর করে কথা বলতো! হাসলে মতো হতো চাঁদ বুঝি তার মুখ লুকাচ্ছে। কী অপূর্ব সেই হাসি! একা একা সারা ধানক্ষেত চষে বেড়াতো। খুব চঞ্চল ছিলো মেয়েটা।
- বাবা, তুমি মেয়েটাকে ভালোবেসেছিলে?
- জানি না। তবে এখনও খুব মনে পড়ে।
- কোথায় দেখা হয়েছিলো বাবা?

খোরশেদ সাহেব চুপ থাকলেন। সাহানা বেগম মেয়ের জন্য কপি নিয়ে এসেছেন। এই সময় তৌশি মায়ের হাতে বানানো কফিটা পছন্দ করে। কফিটা তৌশির হাতে দিয়ে বললেন-
- কোথায় একটু ফ্রেশ হবি, তা না। এসেই বাপ মেয়ে গল্প জুড়ে দিয়েছিস।
- মা বলছো কী তুমি? বাবা ইভনিং ওয়ার্কে যায়নি। তুমি একবারও জিজ্ঞাসা করেছো?

সাহানা বেগম লজ্জা পেলেন। সত্যিই তো এই কথাটা জিজ্ঞাসা করা হয়নি। এটাতো খোরশেদ সাহেবের রুটিন ওয়ার্ক। মনে করিয়ে দেওয়ার দরকার ছিল। কিংবা একবারও জিজ্ঞাসা করা হয়নি, তোমার মন খারাপ কেন? ঐ যে সংসার পুরানো হলে যা হয়। তৌশি বাবার মুখ থেকে আয়েশার গল্পটা শুনতে চাই। হাঁটতে হাটঁতে শুনলে বাবার কাজটাও হবে গল্পটাও শোনা হবে। সাথে সাথে বললো-
- বাবা চলো। হাটঁতে হাঁটতে তোমার মুখে আয়েশার গল্পটা শুনবো।
ট্রাকস্যুট পরা আছে। কেডসটা পায়ে দিয়ে মেয়ের সাথে বেরিয়ে পরলেন খোরশেদ সাহেব। মেয়েটা কাছে থাকাতে মনটা হালকা লাগছে। হাঁটতেও ভালো লাগছে।

পৃথিবীর সব মেয়েগুলো বুঝি মায়ের মতোই হয়। সবকিছুতেই তদারকি। হাঁটতে হাঁটতে একটুখানি হাঁফিয়ে উঠলেই বলছে, তোমার খারাপ লাগছে না তো? অবশ্য মেয়েরা মায়ের পার্টটা এখান থেকেই পায়। বাবাদের ছেলে বানিয়ে নেয়। তারপর প্র্যাকটিক্যাল ফিল্ডে জল গড়িয়ে যায়।

শীতের সন্ধ্যা। ঢাকা শহরে কুয়াশার আস্তর নেই। ভ্যাপসা গুমোট গরম। জোনাকীর ঝিঁ ঝিঁ শব্দ নেই। দূর গ্রামে বেড়ার দরজা খোলা রেখে কেউ কুপি জ্বালিয়ে অপেক্ষা করছে না। কুয়াশার চাদর ভেদ করে অন্ধকারে পথ হাতড়ে পথ খুঁজে পাওয়ার রোমাঞ্চ নেই। পার্কের কনক্রিটের ওয়াকওয়ে গুলো যেভাবে গেছে সেভাবেই হাঁটতে অভ্যস্ত শহরের মানুষ। পথের কুয়াশায় পা ভেজানো হয় না।

পার্কের চেরিফুলের গাছগুলোর আড়ালে বসে যুবক-যুবতীরা গল্প করছে। একে অন্যকে ভালোবাসছে। খোরশেদ সাহেব মেয়ের হাত ধরে হাঁটছেন। অন্যরকম এক ভালোলাগায় মনটা ছেয়ে আছে। তৌশি যেমন ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে হাঁটতে শিখেছে, আজ মনে হচ্ছে তৌশির হাত ধরে তিনি নিজেও পথ চলতে শিখছেন।

তৌশি ভাবছে, এখন আয়েশার কথা তুললে বাবা হয়তো ইমোশনাল হয়ে পরবে। তাই ভাবছে আগে জগিংটা হয়ে যাক। তারপর একসময় পার্কের বেঞ্চে বসে গল্প করা যাবে। এর মধ্যে খোরশেদ সাহেব হাঁটা থামিয়ে দিয়ে বললেন-
- না রে মা, আজ আর হাঁটতে ইচ্ছে করছে না।
- সে কী বাবা? মাত্র বিশ মিনিট হলো। ডাক্তার বলেছে কমপক্ষে তিরিশ মিনিট।
- থাক মা। প্রতিদিন একই রুটিনে কি জীবন চলে? চল, একটু বসি।
লেকের পাড়ে একটা বেঞ্চিতে বসতেই তৌশি জিজ্ঞাসা করলো-
- বাবা, আয়েশাকে কোথায় দেখলে বললে না তো?
- ও হ্যাঁ, সেই ইউনিভার্সিটি লাইফে। পঁয়ত্রিশ বছর আগে।
- আমাদের গ্রাম মানিক নগরে?
- আরে না, না।
- তাহলে, নানার বাড়ি মধুপুরে?
- তাও না।
- তবে কি মনে করতে পারছো না?
- ঠিক তা নয়। আমি আমার বন্ধুটার নাম মনে করতে পারছি না। তাই ভাবছি।
- কোন বন্ধুটা? শরীফ আংকেল?
- না না।
খোরশেদ সাহেবকে খুব অস্থির লাগছে। কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছেন। বন্ধুদের মধ্যে যারা প্রায়ই ফোন করেন, দেখা সাক্ষাৎ হয়, বাসায় আসেন, পার্কে বসে আড্ডা হয়, তদবীরের জন্য আসেন, ভালোমন্দ খোঁজ খবর নেন, তাদের মধ্য থেকে কাউকে মনে পরছে না। এমনটি হলে বিচক্ষণ চৌকষ খোরশেদ সাহেব ঠিকই চিনতে পারতেন। মেয়ের সামনেও কেমন লজ্জা হচ্ছে। অথচ কত আপন ছিল সেই বন্ধুটি! আজ এতবছর পর নামটাও মনে করতে পারছেন না। সেই কবে দেখা। তারপর আর কেউ কারো খোঁজ খবর রাখেনি। দেখা সাক্ষাৎও হয়নি।

খোরশেদ সাহেব তখন অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে। ম্যানেজমেন্টে পড়াশোনা করছেন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে। ১৯৭০ সালের কথা। খোরশেদ সাহেব মুখে বিড়বিড় করে কী যেন বলছেন। নামটা মনে করার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। পারছেন না। মনে হচ্ছে ঠোঁটের কোনে, মনের দরজায় খিলবিল করছে, অথচ মনে আসছে না। এ যে বড় কষ্টের।
এই দশরথ নামটা এতক্ষণ প্রসব যন্ত্রণার মতোই কষ্ট দিচ্ছিল। আনন্দে চোখের কোণে জল এলো। তৌশিকে জড়িয়ে ধরে বললো, পেয়েছি মা, পেয়েছি। দশরথ। দশরথ নন্দী।
- তোমার মুখে তো এ নাম কখনও শুনিনি।
- আজ শুনলি তো?

দশরথের চেহারাটা খোরশেদ সাহেবের মানসপটে ভেসে ওঠলো। হ্যাংলা পাতলা পরিশ্রমী শরীর। গায়ের রং শ্যামলা। মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া লম্বা চুল। কান পর্যন্ত ঢাকা। ঢাকা শহরে এলেও সারাক্ষণ গ্রামের সোঁদা মাটির গন্ধ লেগে থাকতো। সারাক্ষণ গ্রামের কথা বলতো। প্রথম প্রথম ঢাকা শহরে কিছুতেই মন বসছিল না। রাত হলে শুধু মা বাবা আর বোনের কথা বলে কাঁদতো। ঘুমের মধ্যে মাকে ডেকে বলতো, মা ভাত খাইয়ে দাও। ক্ষুধা পাইছে। বন্ধুরা অনেকে মায়ের ন্যাওটা ছেলে বলে ক্ষেপাতো। দশরথ রাগ করতো না। হেসে বলতো, ক’জন পারে মায়ের ন্যাওটা ছেলে হতে? ছোট বোনটির নাম ছিলো রমা। কী সুন্দর মিষ্টি চেহারা! আমাকে দাদা বলে ডাকতো। আমার মনটা ভরে যেতো। এমন মিষ্টি ডাক জীবনে কখনো শুনিনি।

সেই প্রথম ১৯৭০ সালে যখন পুজোঁর ছুটিতে খোরশেদ সাহেব দশরথের বাড়িতে গেলো। বাড়ির সবাই ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিলো। দশরথের চাষী পরিবার। তার ওপর মুসলমানের ছেলে। বন্ধু খোরশেদকে গ্রামের বাড়িতে নেওয়ার ইচ্ছাও ছিলো না দশরথের। খোরশেদই আগ বাড়িয়ে যেতে চাইলো। না নিয়েও কোনো উপায় ছিলোনা।

দশরথের বাবার পেশা কৃষিকাজ। চার কামড়ার মাটির ঘর। পৈতৃক জমিতে যা চাষ হয় তাতেই বেশ চলে যায়। সারাক্ষণ মাঠের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন দশরথের বাবা অমরনাথ। ধান, সব্জী, গাছের তাল, পুকুরের মাছ, নিজেদের গাছের খেজুর রস, গরুর দুধ কোনো কিছুরই যেন অভাব নেই।

বাবাকে সবদিক থেকে সাহায্য করতো দশরথ। এখন দশরথ চলে যাওয়াতে বাবাটা বড্ড একা হয়ে গেছে। তবুও সান্ত¦না, ছেলেটা লেখাপড়া শিখে মানুষ হলে অমরনাথের সব আশা পূরণ হয়ে যায়। ছোট ছোট টিলাভূমির গা ঘেষে দু’টো বড় বড় পুকুর। চারপাশে সব ধানি জমি। পুকুর পাড়ে সব ফলের বাগান। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু আরো কত রকমের ফলের গাছ। তাল খেজুর বিভিন্ন রকম ফলের বাগান। কোনো কোনো সিজনে পুরো জমি যখন ফলে ফুলে ভরে উঠে, তখন রাত জেগে বাগান পাহারা দিতে হয়। গাছের সাথে খুঁটি বেঁধে ঝুলন্ত মাচা তৈরি করা হয়েছে। দিনের বেলায়ও বেশ আরাম করে বিশ্রাম নেওয়া যায়। ইচ্ছে করলে ঘুমানোও যায়।

খোরশেদ সাহেব দশরথের বাড়ি গিয়ে একদিন একরাত শুধু ঐ মাচাতেই থেকেছিলো। দশরথের বাবা কত করে বলেছে, ছেলেটা ঢাকা থেকে এসেছে। রাত বিরাতে কষ্ট হবে। ওখানে থাকতে হবে না। খোরশেদ কোন কথা শোনে নি। বলেছিলো, আমার কোনো অসুবিধা হবে না মেসো। আমি ঠিক থাকতে পারবো। খুব ভালো লাগবে। রমা ঘর থেকে সব খাবার সময়মতো নিয়ে আসতো। আর খাবার দিয়ে ভয় দেখাতো, আজ তোমাদের ভূতে ধরবে। দেখো। আমি কিন্তু ঠিক ঠিক বলছি। ঐ যে ঐ গাছে ভূত আছে।
- বেশ তো। আজ তাহলে ভূতের সাথে গল্প করা যাবে।
- গল্প করবে না, ঘাড় মটকে দেবে।

সেদিন দুপুরেই আয়েশার সাথে দেখা। দুপুরে খাওয়ার পর মাচায় বসে তাস খেলছিলো দুই বন্ধু। হঠাৎ কোথা থেকে একটা ঢিল এসে পড়লো খোরশেদের মাথায়। মাথাটা ঘুরে ওঠলো। উঃ মাগো! বলে চিৎকার করে উঠলো। মাচার পাশেই গাছভর্তি পেয়ারা। হাতে নাগাল পাচ্ছিল না। ঢিল ছুঁড়ে পেয়ারা পারতে চেয়েছিলো। না পেরে গাছে চড়ে বসেছে। অসভ্যের মতো খিল খিল করে হাসছে। দশরথ ঠিকই চিনতে পেরেছে। এই দস্যি মেয়েটার জ্বালায় সবাই অস্থির। কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না।

মির্জা বাড়ির একমাত্র মেয়ে। কেউ কোনো নালিশ করলে মির্জা সাহেব ক্ষমা চেয়ে নিয়ে বলেন, আমার একমাত্র মা মরা মেয়ে। ওর মুখ চেয়েই তো বেঁচে আছি। ও যদি কোনো ভুল করে থাকে আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। মির্জা সাহেবের এমন বিনয়ের উপর আর কোনো কথা থাকতে পারে না। প্রতিদিন হাজারো নালিশ। তাতে কিছু যায় আসে না। আয়েশার দস্যিপনা যেন আরো বাড়তে থাকে।

কিছুটা স্বাভাবিক হলে দুজনেই মাচা থেকে নেমে আসে। দশরথের সাথে অপরিচিত যুবককে দেখে প্রথমে কিছুটা লজ্জা পেলেও পরক্ষণে আবার খিল খিল করে হেসে ওঠে আয়েশা। আয়েশা রমারই সমবয়সী। দশরথ বকা দিতে পারে না। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছে। জিজ্ঞাসা করলো,
- ঢিল ছুড়লি কেন? আমার বন্ধুর গায়ে লেগেছে।
- আমি কি জানি যে ঢিলটা তোমার বন্ধুর গায়ে লাগবে? খিলখিলিয়ে হেসে বললো, আমি তো পেয়ারা গাছে মেরেছি।
- একেতো চুরি করে পেয়ারা খাবি। আবার বড় বড় কথা? কালও তো নিয়েছিস।
- হ্যাঁ নিয়েছি তো কী হয়েছে? ছ’টা চেয়েছিলাম। কাকা মাত্র দুটো দিয়েছে। বাকি চারটা আজ নিতে এসেছি। দাও, তাড়াতাড়ি চারটা পেয়ারা পেরে দাও।

খোরশেদের মাথা ব্যথা সেড়ে গেছে। কতক্ষণ যে আয়েশার দিকে তাকিয়েছিলো ঠিক মনে নেই। শেষ পর্যন্ত আয়েশাই মনে করিয়ে দিয়ে বললো-
- ও মা! তোমার বন্ধু তো হা করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি কি জুলেখা না রজকিনী? হা করে কী দেখছে?
খোরশেদ সত্যিই লজ্জা পেয়েছে। আয়েশা ততক্ষণে শাড়ির আঁচলটা কোমড়ে গুজে নিয়েছে।
- দাও দাও, তাড়াতাড়ি পেয়ারা দাও। নয়তো আবার ঢিল ছুড়বো। বললো আয়েশা।
- দেখ আয়েশা, ভাগ্য ভালোতো চলে যা। এমনিতে খুব অন্যায় করেছিস। চাচাকে বলে দেবো কিন্তু।
- বয়েই গেছে। বলে দাও গিয়ে সব। আমার কিচ্ছু হবে না।

দশরথ জানে, চাচাকে বলে কোনো লাভ হবে না। তার চেয়ে দুটো পেয়ারা পেরে দিলে ল্যাটা চুকে যাবে। দশরথ তাড়াতাড়ি একটা ডাল টেনে ধরে ক’টা পেয়ারা ছিড়ে নিচ্ছিল। এই ফাঁকে আয়েশা ক’টা তুফানি লতা খুঁজে নিয়ে হাতের তালুতে কচলে রসটা খোরশেদের মাথায় চেপে ধরে বললো-
- হাত দিয়ে চেপে ধরেন। এখনি বন্ধ হয়ে যাবে। বেশি ফাটেনি। একটুখানি রক্ত পরেছে। আরো বেশি পরলে ভালো হতো।
খোরশেদ হা করে তাকিয়ে আছে। মেয়েটা বলে কী? রক্ত আরো বেশি পরলে ভালো হতো। আচ্ছা মেয়েতো। এমন দস্যি মেয়ে তো জীবনে দেখিনি।

দশরথের দেয়া পেয়ারাগুলো আঁচলে নিয়ে একটা ঢাসা পেয়ারা খোরশেদের হাতে দিয়ে বললো-
- এটা আপনার জন্য। আজ বিকালে দাশু’দার সাথে আমাদের বাড়ি আসবেন। বাবার সাথে এককাপ চা খেয়ে যাবেন। আমি ভালো চা বানাতে পারি।

মাথাটা ঝিমঝিম করছে। বিকালে আর যাওয়া হয়নি। ঠিক সন্ধ্যার সময় আয়েশা এসে হাজির। রমার সাথে গল্প করছিলো খোরশেদ। আয়েশা এসেই কৈফিয়ত চাইল-
- যান নি কেন? ব্যাথা কমেছে?
উত্তরের অপেক্ষা না করে আবার বললো, আমি মলম নিয়ে এসেছি। ভালো হয়ে যাবে। খোরশেদ কি বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। কিছু একটা বলতে হবে। ভাবতে ভাবতে আয়েশা আঙ্গুলের মাথায় মলম লাগিয়ে বললো-
- এদিকে আসেন। কপালে একটু মলম লাগিয়ে দিই।
- তার দরকার হবে না। এমনিই সেরে যাবে।
- কি দরকার হবে, সে আমি বুঝবো। চুপ করে বসে থাকেন।
আয়েশা মলম লাগিয়ে দিচ্ছে। কোন সংকোচ বা দ্বিধা নেই। কত সহজ সরল! খোরশেদ অবাক বিস্ময়ে বললো-
- তুমি খুব ভালো মেয়ে।
- ভালো না ছাই? ভালোর তো এখনও কিছু দেখেন নি। সময় হলে টের পাবেন।
- ওরে বাবা! তাই না কি?
- জ্বী।
- তা কী টের পাবো?
- সে তো কপালের ফুলা দেখেই আন্দাজ করতে পারছেন।
- না রে বাবা। আর টের পাওয়ার দরকার নেই।
ফিক করে হাসলো আয়েশা। সরি, আমার ভুল হয়ে গেছে। আজ চলি। কাল আমাদের বাড়িতে আসবেন। দেখা হবে। সেই থেকে আজ অব্দি আয়েশার সাথে আর দেখা হয়নি। শ্রীপুর ছেড়ে পরদিন ঢাকায় চলে আসতে হয়েছে দুজনকেই।

আজ এতদিন পর সে কথা মনে হওয়াতে নষ্টালজিয়ায় ভুগছেন খোরশেদ সাহেব। পার্কের বেঞ্চিতে পাশে বসে আছে তৌশি। খোরশেদ সাহেবের মনে হচ্ছে কতদিন সবুজের কাছাকাছি যাওয়া হয়নি। নদীর পাড়ে বটের ছায়ায় বসে নদীর জলে পা ভেজানো হয়নি। সবুজ ধানক্ষেত মাড়িয়ে হলুদ শষ্যক্ষেতে বন্ধুরা মিলে কতদিন লুকোচুরি খেলা হয়নি। গ্রামের হরি গোয়ালার দোকানে বসে দুধের সরে ভিজিয়ে বনটোষ্ট খাওয়া হয়নি। দশরথের ঘরের বারান্দায় বসে রাতের অন্ধকারে উঠোনের চেরীফুল গাছ ঘিরে জোনাকীর মহোৎসব দেখা হয়নি কতকাল।
মাচায় বসে আয়েশার দেওয়া সেই ঢিলের আঘাতটা হঠাৎ যেন চিনচিন করে ওঠলো। মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়াতে গিয়ে আবার বেঞ্চে বসে পরলেন খোরশেদ সাহেব। তৌশি বিচলিত হয়ে বললো-
- বাবা তোমার কী হয়েছে? খারাপ লাগছে?
- না, মা।
- তাহলে?
- নষ্টালজিয়ায় ভুগছিলাম।
- আয়েশার কথা মনে পড়েছে বুঝি?
- অনেকটা তাই। কতদিন তোর দশরথ কাকার সাথে দেখা হয় না। কোথায় আছে তাও জানি না।
- বাবা, অত ভেবো না তো। পৃথিবীটা খুব ছোট। দেখবে একদিন ঠিকই দেখা হয়ে যাবে।
- কিন্তু কীভাবে?
- একদম সোজা। তুমি ফেসবুকে সার্চ দাও। পেয়েও যেতে পারো। তৌশি উৎফুল্ল হয়ে বললো।

আবার যেন স্মৃতি হাতড়ে বেড়াচ্ছে খোরশেদ সাহেব। একটা ঘোরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সময়। আজ হঠাৎ এভাবে মনে পরছে কেনো দশরথকে। না কি একজন মানুষকে এতদিন ধরে মনে না পরার যে ক্ষতিপূরণ, তা পলে পলে কষ্টের নাড়া পুড়িয়ে, সুদে আসলে উশুল করে নিচ্ছে। সত্যিই খোরশেদ সাহেবের খুব কষ্ট হচ্ছে। এতদিন পর এই ফিকে হয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলো এভাবে কষ্ট দেবে ভাবেনি। আরাম আয়েশে ভর করেও কেবল অতীতটাই যেন ঘন ঘন দরজায় কড়া নাড়ছে। আর খোরশেদ সাহেব অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে দরজা খুঁজে বেড়াচ্ছেন একটুকরো আলোর জন্য। ফিকে হয়ে যাওয়া অতীতটা আবছা আলো আধাঁরিতে লুকোচুরি খেলছে।

দশরথের সাথে সবশেষ দেখা হয়েছিলো ১৯৭১ এর ২৫ মার্চের কালো রাত্রির দিন। পাকিস্তানিরা ঐ রাতে যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, তাতে সারা দেশে বারুদের মতো আগুন জ্বলছে। দেশের এই দুর্দিনে ঘরে বসে থাকা যায় না। দু’জনে মিলে সিদ্ধান্ত নিল, যুদ্ধ করবে। যেভাবে হোক এদশকে শত্রুমুক্ত করতে হবে। তাতে যদি মৃত্যও হয় কোন ভয় নেই।

দশরথ খুব সহজ সরল হাবাগোবা হলেও সাহস ছিলো অনেক। একবার গোঁ ধরলে ছাড়ানো মুশকিল। পরদিন ভোর না হতেই দু’জন একসাথে হল ত্যাগ করেছিলো। দশরথ চলে গেলো তার গ্রামের বাড়ি। খোরশেদও নিজ গ্রামে গিয়ে দেশের জন্য যুদ্ধের কাজে লেগে গেলো।

কারও সাথে আর কোনো দেখা সাক্ষাৎ হয়নি। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে কেউ কারো খোঁজ খবর নেওয়ারও ফুরসত হয়নি। বিভিন্ন এলাকা থেকে যুদ্ধের খবর আসতো সহযোদ্ধাদের কাছে। মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাঁথা অন্য সকল মুক্তিযোদ্ধাদের মনে সাহস জোগাতো। প্রাণ সঞ্চার করতো।

যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে দশরথের ছবিসহ একটা বীরত্বগাঁথা একটা পত্রিকায় ছাপানো হয়েছিলো। সেই পত্রিকার কপিটা খোরশেদের হাতে পড়েছিলো। পত্রিকাটা বুকে চেপে ধরে খোরশেদের সে কী গর্ব! সে কী আনন্দ! সে কী উল্লাস! তারপর অনেক্ষণ কেঁদেছিলো খোরশেদ। দুঃখে নয়, আনন্দে, গর্বে। রাইফেল কাঁধে বার বার দশরথের ছবিটাকে চুমু খাচ্ছিলো আর গর্বে বুকটা ভরে যাচ্ছিলো।

খবরের সারমর্ম ছিলো এই, মাইন ব্লাষ্ট করে দশরথ একাই এক প্লাটুন পাকিস্তানি সৈন্যদের খতম করে দিয়েছে। তারা কেউ জীবিত ফিরতে পারেনি। পুরো চানমারি ব্রীজ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। নদীতে লাফ দিয়ে যে ক’জন সৈন্য জীবন বাঁচাতে চেয়েছিলো তাদের প্রত্যেককে গুলি করে মেরেছে দশরথ। দশরথের হাতের নিশাণা ছিল অব্যর্থ। বুকে ছিলো অসীম সাহস আর দেশের প্রতি ছিলো গভীর ভালোবাসা। যা দশরথকে তার বীরতে¦র স্বীকৃতি এনে দিয়েছে।

দশরথের এই সাহসিকতা আর বীরত্বের খেসারত দিতে হলো ছোট বোন রমাকে। দশরথের মা বাবা আর বোন আশ্রয় নিলো মির্জা বাড়িতে। সেখানেও শেষ রক্ষা হয়নি। রাজাকাররা রমা আর আয়েশাকে তুলে নিয়ে পাকিস্তানি মেজরের হাতে তুলে দিলো। যুদ্ধ থামলো। দশরথ ফিরে এলো। ফিরলো না রমা। তার ক্ষত বিক্ষত বিবস্ত্র লাশ পাওয়া গেলো সেনা ক্যাম্পে। দশরথ আর ঢাকা মুখো হয়নি। গ্রামেই থেকে গেলো। যুদ্ধের পর আবার ঢাকা ফিরে দেশ গড়ার কাজে লেগে গেলো খোরশেদ। একবার দশরথের খোঁজ খবর নিয়ে সবকিছু জানা হলেও নানা কারণে আর যোগাযোগ হয়ে ওঠেনি।


দীর্ঘ সময় পর আজ দশরথের কথা মনে করতে পেরে কিছুটা হালকা লাগছে। তৌশির সাথে সময়টাও কাটছে ভালো। পায়ে হেঁটে বাসায় এসে স্ত্রী সাহানাকে এক কাপ কপি দিতে বলে ফ্রেশ হয়ে সোজা কম্পিউটার টেবিলে গিয়ে বসলেন। খোরশেদ আলম নামে ফেসবুকে নতুন একাউন্ট করলেন। বার বার তৌশির কথাটা মনে হচ্ছে, ফেসবুকে সার্চ করলে পাওয়া যেতে পারে।

খোরশেদ সাহেবের টেবিলে রাখা কপি ঠান্ডা হয়ে গেছে। কম্পিউটারে বসে নিজের ফেসবুক একাউন্টে ঢুকে দশরথ নাম লিখে সার্চ করছে। অনেকগুলো নাম আসলেও মনের মধ্যে দশরথের যে ছবি বার বার উঁকি দিচ্ছে, তার সাথে ফেসবুক এর ছবির কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছে না। ফেসবুক ব্যবহারে অনভ্যস্ত খোরশেদ সাহেব যেন প্রযুক্তির সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। হাল ছেড়ে দিতে রাজী নন। যেভাবে হোক দশরথকে খুঁজে বের করতেই হবে।

তৌশির কথামতো ফেসবুক-এ খুঁজে পেলে তো ভালো। নয়তো একসময় ছুটি নিয়ে শ্রীপুর রওয়ানা করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে ফেললেন। এবার বাংলায় দশরথ নন্দী লিখে সার্চ দিলেন। প্রথম যে দশরথ নন্দী লেখা ছবিটা এলো তার দিকে অনেক্ষন তাকিয়ে থাকলেন। খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছেন ছবিটা। প্রোফাইলে ঢুকলেন। প্রোফাইল ছবি দেওয়া আছে। বিস্তির্ণ সোনালী ধানক্ষেত। এককোণায় দশরথের একটা ছবি। সম্ভবত মোবাইলে তোলা। প্রোফাইল নেইম দশরথ নন্দী, শ্রীপুর। শুধু এটুকু লেখা আছে। খোরশেদ সাহেব চিনতে পারলেন। আবেগে আনন্দে তৌশিকে ডাকলেন।
- মা পেয়েছি। তোকে যে কী বলে ধন্যবাদ দেবো?
- তোমাকে বলেছি না। এবার বন্ধুর সাথে ছুটিয়ে আড্ডা মারতে পারবে। এখনিই একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েষ্ট পাঠিয়ে দাও। আর ইনবক্সে একটা মেসেজ দিয়ে রাখো।
- ফ্রেন্ড রিকোয়েষ্ট পাঠিয়েছি। সে অনলাইনে নেই।
খোরশেদ সাহেব ইনবক্সে লিখলেন, প্রিয় বন্ধু, কেমন আছিস? তাড়াতাড়ি তোর ফোন নম্বরটা আমার ইনবক্সে দে প্লিজ। অনেক কথা আছে। খোরশেদ।

অনেক রাত পর্যন্ত কোন প্রতিউত্তর না পেয়ে ঘুমাতে গেলেন খোরশেদ সাহেব। ঘুম আসছে না। মনের মধ্যে তোলপাড় চলছে। শেষ পর্যন্ত দশরথের সাথে যোগাযোগ হবে তো? পরদিন অফিসে গিয়ে ফেসবুকে ঢুকলেন খোরশেদ সাহেব। ফ্রেন্ড লিষ্টে যোগ হলো দশরথের নাম। ইনবক্সে ছোট্ট একটা মেসেজ। আমি ভালো আছি। তুমি ভালো তো? তারপর এগার ডিজিটের মোবাইল নাম্বারটা দিলেন।

খোরশেদ সাহেব দশরথকে এত সহজে পেয়ে যাবেন ভাবেন নি। আজ খুব আনন্দ হচ্ছে। মনটা খুব খুশি খুশি লাগছে। এক মুহূর্ত দেরি না করে ফিরতি বার্তা পাঠালেন। ধন্যবাদ বন্ধু। অনেকদিন পর তোকে পেয়ে খুব ভালো লাগছে। তারপর নিজের মোবাইলে নাম্বারটা তুলে ডায়াল বাটন চাপলেন। রিং হচ্ছে। কেউ ধরছে না। আবার কল করলেন। কয়েকটা রিং পরার পর কেউ একজন রিসিভ করলেন। মেয়েলি কন্ঠ। বললেন-
- হ্যালো।
- জ্বী, এটা কি দশরথের নাম্বার?
- হ্যাঁ। আপনি কে বলছেন?
- আমাকে আপনি চিনবেন না। আমি দশরথের বন্ধু খোরশেদ আলম। দশরথ আছেন?
- না। উনি খামারে গেছেন। মোবাইলটা ভূলে ফেলে গিয়েছেন।
- প্লিজ, আসলে বলবেন, এই নাম্বারে একটা ফোন করতে।
- আচ্ছা।

ওপ্রান্ত থেকে ফোনটা কেটে দিলো। খোরশেদ সাহেবের তর সইছে না। ভদ্রমহিলা সম্ভবত দশরথের বউ হবে। মিনিট দশেক পরে আবার রিং করবেন কি না ভাবছেন। কম্পিউটারে দশরথের প্রোফাইল ছবিগুলো দেখছেন। কয়েকটা মুক্তিযুদ্ধের ছবি। বাকি সবগুলো গ্রাম প্রকৃতির দৃশ্য। যুদ্ধের ছবিগুলোর মধ্যে পত্রিকায় প্রকাশিত সেই ছবিটাও আছে।
সেল ফোনটা বেজে উঠলো। দশরথের ফোন। রিসিভ করতেই ওপ্রান্ত থেকে বললো-
- আমি দশরথ। আপনি?
- আপনি কী রে? বল তুই। আমি খোরশেদ। খোরশেদ আলম।
দশরথের চিনতে কষ্ট হচ্ছিল। গলার স্বর নিষ্প্রাণ। কোন ব্যাকুলতা নেই। জীবনের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বিধ্বস্ত ঝড়ের তান্ডবের রেশ যেন এখনও কাটেনি। বললো-
- খোরশেদ----।
- আরে সেই ঢাকা ইউনিভার্সিটির খোরশেদ। পুঁজোর ছুটিতে তোদের বাড়ি গিয়েছিলাম। মনে নেই?

হঠাৎ তুই বলতেও কেমন সংকোচ বোধ হচ্ছিল। দশরথ লেখাপড়া জানা গ্রামের চাষাভূষা মানুষ। গায়ে গতরে পরিশ্রম করে সংসার চলে। হঠাৎ করে অনেক দূরের পরিচিত কারো সাথে তুই তোকারি বলতে বিবেকে বাঁধে। অনেকটা অপ্রস্তুত হয়ে আমতা আমতা করে শেষ পর্যন্ত তুই না বলে তুমি সম্বোধন করলো। খোরশেদ সাহেবের বুঝতে বাকি থাকলো না ব্যাপারটা কোথায়?

বন্ধুত্ব যত গভীরই হোক, দুরত্বের সীমারেখা অত সহজে নৈকট্য লাভ করতে পারে না। মরচে পরা লৌহা ব্যবহার উপযোগী করতে হলে যতœ করতে হয়। পরিচর্যা করতে হয়। তাতে কিছু সময়ও লাগে। দশরথ এবার বললো-
- হ্যাঁ, মনে পড়েছে।
- আমাদের বাড়ি এসেছিলে। তোমার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলো আয়েশা।
- আমি আবার যেতে চাই। প্লিজ, আগে বল তুই কোথায় আছিস?
- শ্রীপুর বাড়িতেই আছি।
- সেই ধানক্ষেত আর পেয়ারা বাগানের উপর মাচাটা এখনো আছে?
- এখন নেই। যুদ্ধের সময় ওগুলো সব জ্বালিয়ে দিয়েছে।
- আবার গড়লি না কেন?
দশরথ কোন কথা বললো না। হঠাৎ করে অসহায় দরিদ্র মানুষের সব কথা কাউকে বলতে নেই। তাছাড়া দশরথ একবারও জিজ্ঞাসা করেনি, খোরশেদ কোথায় আছে? কী করছে?
খোরশেদ সাহেব আবার বললেন-
- আমি আগামি সপ্তাহে তোর ওখানে আসছি। ক’টা দিন থাকবো। তোর কোনো আপত্তি নেই তো?
- না না। আপত্তি থাকবে কেন? তবে তোমার খুব অসুবিধা হবে।
- ও নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। সে আমি মানিয়ে নেবো। ঠিক আছে। রাখছি। খুব শীঘ্রই দেখা হচ্ছে আমাদের।

ফোন রেখে দিলো দশরথ। নিজের ভিতর অপরাধবোধ কাজ করছে। এক এক করে সেই অতীতের স্মৃতিগুলো মনে করার চেষ্টা করছে। এখন ফোন করে, কি করছে? কোথায় আছে? এসব জিজ্ঞাসা করাটাও উচিত হবে না। অথচ অনেকদিন পর কথা। এটুকু জিজ্ঞাসা করা উচিত ছিল।

খোরশেদ সাহেবের একবার প্রটোকল নিযে যাবার কথা মনে হলেও পরক্ষণে তা ঝেড়ে ফেললেন। থানা পুলিশ, সারাক্ষন স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি, জ্বী স্যার জ্বী স্যার করা তাবেদারি এসব একদম ভালো লাগে না। জীবনের ক’টা দিন নীরবে লোকচক্ষুর অন্তরালে কাটাতে চাই।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন