বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৩ ফেব্রুয়ারী ১৯৬৩
গল্প/কবিতা: ৩টি

গল্প - প্রশ্ন (ডিসেম্বর ২০১৭)

প্রশ্নো

Ajoy Ratan Barua
comment ৪  favorite ০  import_contacts ৩৬
(একজন মনীষার সত্য ঘটনা অবলম্বনে)
বাসায় নিজের রুমে নিয়ে এসে বসানো হলো মনীষাকে। সে দেখে সামনে তার প্রিয় ড্রেসিং টেবিলটার আয়না পর্দা দিয়ে ঢাকা। চারিদিকে চোখ বুলিয়ে বুঝতে পারে আয়নার কাজ করতে সক্ষম সব কিছু, তার জন্যে নিষিদ্ধ হয়ে গেছে এখন। চোখে ঝাপসা দেখলেও মন তার দেখে ফেলে অনেক কিছু।মনে মনে হাসে সে এ সাময়িক আয়োজনে, কেননা আগে থেকেই মনকে বুঝিয়ে রেখেছে, তার পরবর্তী জীবনের চলার পত্থ। তাকে সংগ্রাম করতে হবে, বুঝিয়ে দিতে হবে এ দায় তার নয়, এ সমাজের অসুস্থার প্রতিকী প্রতিবাদ হয়ে থাকতে চায় সে।কাকের ডিম লুকানোর মতো পরিবারের এ চেষ্টা তাকে আশাহত করে। তাকে দেখে মূর্ছা যাওয়া মায়ের পাশে দাঁড়ায় সে, মাথার চুলে হাত বুলাতে বুলাতে মাকে সান্তনা দেয়
" মা, আমি তো কোন অন্যায় করিনি। আমি আমার অধিকার নিয়ে বাঁচতে চেয়েছি। কেউ যদি অন্যায় ভাবে আমার অধিকার কেড়ে নিতে অপরাধ করে, আর আমি যদি সে অপরাধের শিকার হই। এর দায় সমাজের, কেননা আমার অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা সে দিতে পারেনি।আমি যদি ভেংগে পড়ি, তাহলে অপরাধী তার উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারলো। আমি কেন তা হতে দেবো। "
স্নেহময়ী মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেংগে পড়ে, কান্না জড়ানো কন্ঠে বলে,
"মা, আমি আমার সব বিক্রি করে তোকে চিকিৎসা করাবো, তোর আগের চেহারা ফিরিয়ে আনবো "
এক মুহূর্তের জন্যে থমকে যায় মনীষা, তার হৃদয়ের গভীর থেকে বেদনার জমানো কান্না, আগ্নেয়গিরির জলন্ত লাভা স্রোতের মতো উদগিরিত ক্ষোভের অনল বেড়িয়ে আসে,
" না, মা, আমি এ ধারণের কোন কিছু ভাবছি না, আমি আমার এ অসুন্দর মুখ নিয়ে থাকতে চাই, আমি এ সমাজকে দেখাতে চাই, এ ব্যর্থতা তোমার, তুমি ব্যর্থ বলেই আমার সুন্দরকে রক্ষা করতে পারোনি। সুন্দরকে রক্ষা করতে তোমাকেই এগিয়ে আসতে হবে। আমি সৌন্দর্যের সুরক্ষায় সমাজের দায়িত্বটুকু বুঝিয়ে দিতে এমনটি থাকতে চাই মা। "
মায়ের অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকা দুচোখে, জলে ভেজা চোখ লুকোতে দ্রুত বেড়িয়ে চলে আসে নিজের রুমে মনিষা। ধীরেধীরে এগিয়ে যায় ড্রেসিং টেবিলের দিকে, একটানে সরিয়ে দেয় পর্দা। আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে কান্নায় ভেংগে পড়ে। চাঁদের আলোর মতো স্নিগ্ধ কপোলে যেন কলঙ্ক ছাপ, ডাগরআঁখি দুটিতে শকুনের নখের আঁচর, নিজেকে চিনতে পারছে না সে। পরক্ষণে সামলে নেয়, নিজকে প্রবোধ দেয়
'আমাকে অনেক প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে যেতে হবে। মুখের সৌন্দর্য ছাড়া তার তো অন্য কিছু হারায়নি। আমাকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। "
হাসপাতালের ওয়ার্ডে নির্যাতনের শিকার হয়ে চিকিৎসাধীন, চোখ হারানো, হাত -পা অকেজো হয়ে যাওয়া অনেক মেয়েকে সে দেখেছে। কাছে গিয়ে আলাপ করে জানতে পেরেছে তাদের বাঁচার আকুলতা। সে তুলনায় তার ভেংগে পড়ার মতো অবস্থা নয়। তাকে কতোগুলো দুর্বৃত্তের কাছে, তাদের পশু মানসিকতার কাছে হেরে গেলে চলবে না। নিজেকে প্রতিবাদের জীবন্ত পোস্টারের মতো মানুষের বিবেকের সামনে দাঁড় করাতে চায়। সে কী অন্যায় করেছে, কারও ক্ষতি তো করেনি। তবে কেন তাকে এ দুর্বিষহ যন্ত্রণাকে বরণ করতে হচ্ছে। স্কুলের ইতিহাসের ক্লাশে বরেণস্যারের কথাটা মনে পড়ে
"মানুষের জীবন দু:খময় নয়, দু;খকে জয় করার সংগ্রামময়। "
সে ছোটবেলা থেকেই তো তাকে সংগ্রামই করতে হচ্ছে। এস এস সি পরীক্ষায় জি পি এ প্লাস পাওয়ার আনন্দ নিয়ে বাসায় এসে বাবা -মাকে প্রণাম শেষ করতেই কাকার ভরাট কন্ঠের মন্তব্য শুনতে পেলো
"অনেক লেখা পড়া হয়েছে, এবার মেয়ের বিয়ে দেয়ার কথা ভাবো বৌদি। মেয়েদের বেশি পড়া লেখার দরকার নেই। ঘর সংসার তো ই করবে।"
মা জবাব দেয় "মেয়ে আমার অনেক গুণী, সে পড়তে চাইলে না করবোনা "।তারপর বুকে জড়িয়ে ঘরের ভেতর নিয়ে যায়।কাঠের আলমারি খুলে গয়নার বাক্স খুলে একজোড়া স্বর্ণের কানের দুল বের করে তার কানে লাগিয়ে দেয়।ক্লাশ টেনে পড়াবস্থায় মায়ের বিয়ে হয়ে যায়, লেখাপড়া করার আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও। গল্পের ছলে মনের সেই গোপন ব্যথা মায়ের কাছে শুনেছে সে, আজ যেন তার স্বীকৃতি মিললো। অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তিতে খুশির আনন্দ নিয়ে ছুটলো বান্ধবী স্নিগ্ধার কাছে। উঠোনে প্রায় ধাক্কা লাগা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে দেখে সামনে দীপলদা, স্নিগ্ধার বড় ভাই, ডাক্তারি পড়ে। হেসে জিজ্ঞেস করে তাকে রেজাল্টের খবর। সে শুধু কানের দুল দেখিয়ে বলে, "এটা, সুন্দর না। "
তার জিজ্ঞাসু চোখে চোখ রেখে দীপলদা উত্তর দেয় "এ তো চাঁদের জোৎন্সা "। লজ্জা পেয়ে দ্রুত সে স্নিগ্ধার রুমে ঢুকে পড়ে।
ভালো কলেজে পড়তে গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসা। দু' রুমের একটা ছোট্ট বাসা ভাড়া নেয়া হয়েছে, খরচের বিষয়টা মাথায় রেখে।বাবা আপাতত শহর আর গ্রামে আসা যাওয়ার করে চাষবাস দেখবেন।বাসাটা গলির ভেতরে ঘিঞ্চি এলাকা, তবুও তারা মানিয়ে নেয়। বেশ কাটছিলো দিনগুলো। কলেজে সে স্যারদের আশার তালিকায় স্থান করে নিয়েছে ইতোমধ্যে।
জীবনাকাশে বলাকারা শুধু উড়ে না, কালো মেঘও জমে। পাড়ার বখাটে ছেলে পলাশের নজর পড়েছে তার উপর। প্রথম কদিন গলির মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। একদিন সরাসরি সামনে এসে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসে।বিষয়টা সে ইচ্ছে করে বাবা মাকে জানায়নি। কিন্তু সেদিন অনেকে ঘটনাটা দেখেছে। তারাই মাকে জানায়। অবাক বিষয় কেউ এর প্রতিবাদে নয়, বরং ছেলের বাবার প্রতিপত্তি নিয়েই কথা বলেছে। বাবা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, একমাত্র ছেলের চেয়ে অর্থবিত্তের দিকে নজর বেশি দিয়েছেন,তাই ছেলে বখে গেছে।যখন যা চেয়েছে পেয়েছে, তাই তার পচাওয়াই মূখ্য।এখানে এক মেয়ের চাওয়ার স্বপ্নের কোন মূল্য নেই।
পাড়ার প্রতিবেশিদের কথা মেয়েকে তো বিয়ে দিতেই হবে, তা হলে এতো দেমাগ দেখানোর কী আছে। ছেলের বাবার যা আছে, মেয়ের সুভাগ্য বলতে হয়, ছেলে তাকে পছন্দ করেছে। সুযোগে ভয়ও দেখাতে ভুল করেনি। বেশ কদিন কলেজে যায়নি সে। সেদিন গুরুত্বপূর্ণ ক্লাশ ছিলো, তাই কলেজে যাওয়া। সহপাঠী মেয়েরাও তাকে এড়িয়ে চলে, বিপদের ভয়ে। তাই একাই ফিরছলো। গলির মুখে পলাশ তার পথরোধ করে দাঁড়ায়।
পলাশের অনুনয়ের উত্তরে সে জানিয়ে দেয়,
"আমি আরও বড় স্বপ্ন দেখি। তুমি যদি আমাকে সত্যি ভালোবাস। তাহলে ভালোবাসার মানুষটির ভালো কিছুর জন্যে তোমাকে সরে দাঁড়ানো উচিত।"
ইতোমধ্যে চার পাচঁজন ছেলে তাকে ঘিরে দাঁড়ায়, অসহায়বোধ করে সে। সাহায্যের আশায় চারিদিকে তাকায়। কিন্তু আশেপাশের সবাই নির্বিকার, কেউ এগিয়ে আসেনা। হঠাৎ তার মুখে তারা ঢেলে দেয় কিছু তরল পদার্থ, আগুনের তীব্র উত্তাপের ছোঁয়া অনুভব করে সে মুখ মন্ডলে। তারপর আর কিছু মনে নেই, জ্ঞান ফিরে আসার পর দেখে হাসপাতালের বেডে। সারা মুখে ব্যান্ডেজ বাঁধা।
মায়ের ডাকে মনীষা ভাবনা জগৎ থেকে ফিরে আসে। সামনে দাঁড়িয়ে মা, তাকে বলে
"টেলিভিশনের লোকেরা এসেছে, তোর ইন্টার্ভিউ নিবে "।
শত আঘাতের মাঝেও সে ভেংগে পড়েনি।হাসপাতালে শুয়ে পরীক্ষা দিয়েছে। এবারো পেয়েছে জিপিএ প্লাস ।বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে তার এ ঘটনার প্রকাশ পেয়েছে। তাই তার ইন্টার্ভিউ নিতে এসেছে এক টিভি চ্যানেল। এতো দিন সে এসব প্রচার মাধ্যমকে এড়িয়ে গেছে। নিজেকে পণ্যের বিজ্ঞাপন মনে হয়েছে তার।কিন্তু প্রতিবেশিদের একটি মন্তব্য তার এ সিদ্ধান্ত পাল্টাতে ভূমিকা রাখে। সবার একই কথা তুমি বিয়েতে রাজি হলে কি হতো, এতো বড় ক্ষতি থেকে বেঁচে যেতে। সব দোষ যেন তার, এক অপরাধীর অপরাধ মেনে না নিয়ে যেন সে ভুল করেছে। সমাজের মানুষ নামের এ দ্বিপদ প্রাণীদের কাছে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে সে হাসপাতালে ছেঁড়ে আসার আগে টিভিতে সাক্ষাৎকার দিতে সম্মত হয়েছিলো।আজ ওরা এসেছে।
ধীরেধীরে উঠে দাঁড়ায় সে, তারপর এগিয়ে যায় ড্রইং রুমের দিকে। মা এগিয়ে এসে স্কার্ফ দিয়ে ঢেকে দিতে চায় তার মুখের পুড়ে যাওয়া অংশটুকু। মৃদু হেসে তা সরিয়ে দেয় মনীষা। ড্রইং রুমে ঢুকে ক্যামেরার সামনে বসে। ক্যামেরার স্থির হয় তার মুখের উপর। জ্যোৎস্না আলোকিত চাঁদের মুখের মতো ভেসে কলংক রেখা। এ যেন প্রতিবাদী পোস্টার যাতে আছে একটি প্রশ্ন "এ লজ্জা কার"?
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন