বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৯ ডিসেম্বর ১৯৯৫
গল্প/কবিতা: ১টি

গল্প - বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী (নভেম্বর ২০১৭)

আনিলার গল্প

Amaranthine Elysian
comment ০  favorite ০  import_contacts ৩২
আমি আনিলা। ক্লাস সিক্সে পড়ি।আজকে স্কুল বন্ধ।সারাদিন বাড়িতে একা থাকতে হবে। বাড়িতে আমি নানাভাই আর কয়েকজন কাজের লোক থাকেন।নানাভাই বিশাল ব্যবসায়ী মানুষ। সকালবেলা বেরিয়ে যান আর রাতে ফেরেন।ছুটির দিন ছাড়া তার সাথে খুব একটা দেখা হয়না।ব্রেকফাস্ট টেবিলে গিয়ে দেখলাম নানাভাই খবরের কাগজ পড়ছেন। চশমার উপর দিয়ে আমার দিকে একবার তাকালেন। কিন্তু কোন কথা বলার প্রয়োজনবোধ করলেননা। ব্রেকফাস্ট শেষ করে আমি আমার রুমে চলে আসলাম।বাসায় আসলে কারো সাথে আমার খুব একটা কথা হয়না।আমি চুপচাপ থাকি।আমার রুম আমার নিজস্ব জগত। এখানে কিছু জিনিস আছে যা আমার বয়সী একটা মেয়ের রুমে বেমানান।যেমন, কয়েকটা রোবটের প্রটোটাইপ আছে। প্রটোটাইপ গুলো অবশ্য ব্যবহারের উপযোগী না। কারণ এগুলো যিনি বানাচ্ছিলেন তিনি তো আর বেঁচে নেই। বলছি আমার মায়ের কথা। ছোটবেলায় আমাকে কোলে নিয়ে কম্পিউটারের মনিটরের সামনে বসতেন। আর কি কি সব লিখতেন। কিছু সংখ্যা, সংকেত আরও হাবিজাবি জিনিস। তখনও বুঝতামনা। এখনও একই অবস্থা।তবে এখন এটা জানি যে এগুলোকে কোড বলে।যাই হোক রুমে বসেই দিন কাটাব। কম্পিউটার চালু করলাম।কিছুক্ষন গেম খেললাম, ইউটিউব দেখলাম, ফেসবুক লগইন করলাম। এই করতে করতে দুপুর হয়ে গেল। কম্পিউটার বন্ধ করে লাঞ্চ করতে যাব। কিন্তু কম্পিউটার কিছুতেই সাটডাউন করতে পারছিনা। হয়ত হ্যাং হয়ে গেছে।আচ্ছা থাক, লাঞ্চ করে এসে বন্ধ করব। লাঞ্চ করে এসে এত ঘুম পেল যে কম্পিউটার বন্ধ করার কথা ভুলে গেলাম।সন্ধ্যাবেলা যখন ঘুম থেকে উঠলাম তখন অদ্ভুত একটা জিনিস দেখলাম। মনিটরে একের প্র এক কোড ভেসে আসছে।হটাৎ করে সাউন্দ বক্সটা কেঁপে উঠল। আর ঠিক তখন যান্ত্রিক একটা কন্ঠস্বর শোনা গেল।
-ঐন্দ্রিলা, শুনতে পাচ্ছ?...... কি হল উত্তর দাও।
আমি তো হতভম্ব।বললাম- তুমি কে? আর আমার মাকে কেন চাচ্ছ?
কন্ঠস্বর-সেটা তাকেই বলব।
আমি- মা মারা গেছেন।
কন্ঠস্বর- ও আচ্ছা। আর তোমার বাবা?
আমি- বাবাকে কখনও দেখিনি। আর আমাকে কেউ তার কথা বলেও না।
কন্ঠস্বর- তুমি আজকে রাত ১২টার পরে সবাই যখন ঘুমিয়ে যাবে তখন ছাদে আসবে।
আমি- কিন্তু তুমি কে???
আমার কথার কোন জবাব পেলামনা। মনিটরে কোড আসাও বন্ধ হল। আর কন্ঠস্বরটি কোথায় জানি মিলিয়ে গেল। এর পরবর্তী সময়টুকু একটা অস্থিরতার মধ্যে কাটল।রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে আমি ছাদে চলে গেলাম।আজকের পরিবেশটা খুব শান্ত। ঠাণ্ডা বাতাস বইছে।ছাদে অনেকগুলো জোনাকিপোকা দেখতে পেলাম। ভালই লাগছিল দেখতে। একটাকে ধরতে গেলাম তো মনে হল ছেঁকা লাগল। চমকে উঠলাম।তারপর যা দেখলাম তাতে আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলামনা। একটা জোনাকিপোকা থেকে মানুষ আকৃতির কিন্তু ঠিক মানুষ না এমন একজনে রূপান্তরিত হল। আমার নাম পাঞ্জারি। তোমার সাথে আমার কথা হয়েছিল আনিলা।
আমি- তুমি আমার নাম জানলে কিভাবে?
পাঞ্জারি- তোমাকে আজকে আমরা দুপুর থেকে অবজারভ করছি।এই বাসা আর বাসার মানুষজন ঠিক আগের মত আছে।তোমার মাকে আমরা খুব মিস করছি।তোমার বাবাকেও।
আমি- তুমি আমার বাবা মাকে কিভাবে চেন? আর সবচেয়ে বড় কথা তুমি কে?
পাঞ্জারি- তবে শোন মেয়ে। আমরা প্রায় কয়েক লক্ষ আলোকবর্ষ দুরের একটি গ্রহ থেকে এসেছি।প্রথমবার যখন এসেছিলাম তখন কিছু দুষ্টলোক আমাদের ধরে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। আমাদের উপর নাকি বিভিন্ন পরীক্ষা করবে। জানবে যে আসলে আমরা কিসের তৈরি। তখন তোমার মায়ের সাথে আমদের যোগাযোগ হয়। ও আমাদের নেটওয়ার্ক সিস্টেম হ্যাক করেছিল। তবে ওর মন ভালোছিল। ওর রোবট বানানোর শখ ছিল। আমরা যাতে পৃথিবীতে নিরাপদে থাকতে পারি এজন্য ও আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল।
আমি অবাক হয়ে শুনছিলাম। জিজ্ঞাসা করলাম- আর আমার বাবা?
পাঞ্জারি- তার সাথে তোমার দেখা হবে নিশ্চয়ই। তোমার কথা বল। দিনকাল কিভাবে চলে?
আমি- তোমরা তো আমাকে সারাদিন অবজারভ করেছ। ছুটির দিন এভাবেই কাটে। স্কুল থাকলে আলাদা কথা। তবে স্কুলে যেতে আমার ভালো লাগেনা।আমাকে কেউ পছন্দ করেনা।
পাঞ্জারি-কেউ পছন্দ করেনা। এটা কেমন কথা।
আমি- হম।আমি আসলে পড়াশোনায় অতটা ভালনা। ক্লাসের সবচেয়ে খারাপ স্টুডেন্ট। টিচাররা আর ক্লাসের ছেলেমেয়েরা আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। আমার ক্লাসমেটদের প্যারেন্টরাও নিজেদের ছেলেমেয়েদের চেয়ে আমাকে নিয়ে বেশি আলোচনা করে।
পাঞ্জারি- এই হচ্ছে মানুষদের সমস্যা। আগে যখন এসেছিলাম তখনও এই ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছিলাম। নিজেদের চেয়ে অন্যদের নিয়ে কথা বলতে তোমরা বেশি পছন্দ কর। তুমি এমন কিছু করে দেখাও যা ওরা কক্ষনো করতে পারবেনা।আর এক সপ্তাহের মধ্যে তোমাদের স্কুলে সাইন্স ফেয়ার হবে। সেখানে তুমি রোবট বানাবে।
আমি- এটা কিভাবে হবে?এই জিনিস আমার ভালো লাগেনা। আর তোমার কথা আমার স্কুলের হেডমিস্ট্রেস কেন শুনবেন?
পাঞ্জারি- আমরা মাইন্ড কন্ট্রোল করতে পারি। তোমার স্কুলের হেডমিস্ট্রেস কে দিয়ে সাইন্স ফেয়ার হওয়ার ঘোষণা দেওয়ানো হবে। তারপর আমরা তোমাকে সাহায্য করব রোবট বানাতে।এখন তুমি নিচে যাও। পরে কথা হবে।
পাঞ্জারি স্পেসশিপে ফিরে গিয়ে তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগীকে একটা প্রোফাইল দিয়ে বলল এই ব্যক্তিকে আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। খুব দ্রুত।
পরেরদিন টিফিন এর পরে সবার মাঝে একটা আলোড়ন দেখা গেল। নোটিশ বোর্ডে একটা নতুন নোটিশ আসছে। আর এক সপ্তাহ পরে সাইন্স ফেয়ার হবে । সবাই এটা নিয়ে আলোচনা করছে। আমার কাছে সবকিছু অবিশ্বাস্য লাগছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে রাতের ঘটনাটাকে স্বপ্ন মনে হয়েছিল। এখন মনে হচ্ছে সেটা সত্যি।
কাজেই পাঞ্জারিকে প্রতি রাতে আমাকে সাহায্য করতে দেখা গেল।একদিন আমি লক্ষ্য করলাম ও আড়ালে গিয়ে ওর যোগাযোগ যন্ত্রে কারো একজনের সাথে কথা বলছে। ঐ ভাষা আমি বুঝিনা। কিন্তু আমাকে দেখে চুপ হয়ে গেল। কয়েকবার এমন হওয়ার পরে আমার কেন জানি সন্দেহ হল। আসলে ও যে কথাগুলো আমাকে বলেছে তা সত্য না মিথ্যা।আবার ও আমার প্রতি খুব সহানুভূতিশীল। তাই ওর সম্পর্কে অন্যরকম কিছু ভাবতে ইচ্ছা করেনা।
কিছুক্ষন আগে সাইন্স ফেয়ারের উদ্বোধন করা হল। সবাই নিজের প্রজেক্ট স্টলে সাজিয়ে রেখেছে।আমি যেটা বানিয়েছি সেটার নাম লাইন ফলোয়ার রোবট। এটা কালোরেখা বরাবর চলতে পারে। আসলে ব্যাপারটা এতটা সহজ না।পাঞ্জারি আমাকে বলছিল আমার মনোযোগের অনেক অভাব। তাই আমি পড়াশোনায় ভালনা। তাই সে আমার মাইন্ডকে এমনভাবে কন্ট্রোল করেছে যে আমি যাতে শুধু একটা জিনিসের প্রতি সর্বোচ্চ মনোযোগ দেই।এই সময় ও আমাকে যা যা শিখিয়েছে আমি তাই শিখেছি। মানুষজন আসতে শুরু করেছে। আমার স্টলের টেবিলের নিচে পাঞ্জারি জোনাকিপোকা হয়ে লুকিয়ে আছে। ব্যাপারটা বেশ মজার। ইচ্ছামত ছোটবড় হওয়া যায়। আমার স্টলে এসে সবাই অনেক অবাক হচ্ছে। আমাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করছে। আমার বেশ ভালই লাগছে।
এরই মাঝে একজন ভদ্রলোক আসলেন। আর টেবিলের নিচে পাঞ্জারি আর তার বিশ্বস্ত সহযোগীর চঞ্চলতা বেড়ে গেল।
সহযোগী- ঐ তো উনি এসে গেছেন। আমরা কি করব এখন?
পাঞ্জারি- কিছু করবনা। শুধু দেখব।
সহযোগী- কি? শুধু দেখার জন্য আমি তাকে এত কষ্টকরে খুঁজে বের করলাম? তারপর ওর বাসা অফিস সব জায়গায় এই সাইন্স ফেয়ারের পোষ্টার লাগিয়ে আসলাম ওকে এখানে আনার জন্য।
পাঞ্জারি- ওকে এখানে আনাই উদ্দেশ্য ছিল। এখন বাকিটা শুধু আমরা দেখব।
ভদ্রলোক কিছুক্ষণ অবাক হয়ে আমার আর রোবটের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর আমাকে অনেক ব্যক্তিগত প্রশ্ন করলেন। পকেট থেকে ওনার কার্ড বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন - আমি অনিন্দ্য চৌধুরী। আমার সাথে যোগাযোগ রাখলে খুশি হব।
আজকের দিনটা আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন। আজকে সবাই আমাকে যেভাবে অভিনন্দন জানিয়েছেন এমনটা এর আগে কেউ করেনি। আমার প্রজেক্ট বেস্ট প্রজেক্ট হয়েছে। আমি পুরষ্কার নিয়ে বাসায় আসলাম। সবাইকে দেখালাম। কেউ এমন কিছু বুঝল বলে মনে হলনা। সে যাই হোক।রাতে পাঞ্জারির সাথে দেখা করার জন্য ছাদে গেলাম।
পাঞ্জারি- আজকে তোমার সাথে আমার শেষ কথা হচ্ছে। আর কিছুক্ষণ পরে আমরা আমাদের গ্রহের দিকে যাত্রা শুরু করব।
আমি তো খুব অবাক। বললাম- এত তাড়াতাড়ি কেন যাবে? আর কয়েকটা দিন থেকে যাও।
পাঞ্জারি- আমাদের জ্বালানি শেষ হয়ে আসছে। তাই আমাদের চলে যেতে হবে। তবে আমরা আবার আসব।
আনিলা- আমার অনেক খারাপ লাগছে। বাসার কেউ আমার কাজ বুঝেনা । তুমি চলে গেলে আমি একদম একা হয়ে যাব।
পাঞ্জারি- মোটেও না। আজকের পর থেকে তুমি একদম একা না। তুমি তো তোমার সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্খির দেখা পেয়েছ.........
তিনি দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত দূর থেকে আনিলাকে দেখেছেন। ও যখন পুরষ্কার পেল তখন সবচেয়ে জোরে হাত তালি দিয়েছেন।এত খুশি হয়েছেন যে তার চোখে পানি এসে গিয়েছিল। কিন্তু মানুষের জীবনে কক্ষনো কক্ষনো এমন জটিল অবস্থা আসে যে তার সবচেয়ে কাছের মানুষটির সবচেয়ে কাছে যাওয়া সম্ভব হয়না। তবে অনিন্দ্য চৌধুরী আশাবাদী এই জটিল অবস্থা বেশিদিন থাকবেনা। একদিন আনিলা নিশ্চয়ই তাকে বাবা বলে ডাকবে।











আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন