বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৩১ জানুয়ারী ১৯৯৩
গল্প/কবিতা: ১টি

গল্প - বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী (নভেম্বর ২০১৭)

সমীকরণ এবং পরিভ্রমণ

মোহাইমিনুল ইসলাম বাপ্পী
comment ৩  favorite ০  import_contacts ৭৭
পর্ব-১:বিজ্ঞানীর ডায়েরি
আমি একজন বিজ্ঞানী, লেখক নই। কাজেই যে গল্প বলতে যাচ্ছি, সেটা কতটা গুছিয়ে বলতে পারব, নিশ্চিত নই আমি। পৃথিবীর কেউ যদি এই লেখা পড়ে থাকেন (যদিও সে সম্ভাবনা নেই বললেই চলে), অনুগ্রহ করে আমার সাহিত্যজ্ঞান ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখবেন। কোয়ান্টাম ফিজিক্সের উপর যদি আমি লিখতে বসি, অনেক কিছুই গুছিয়ে বলতে পারব, কিন্তু আজ বুঝতে পারছি, জীবনের গল্প বলা মোটেও সহজ নয়। কেন? অন্যতম কারণ হলো, জীবনের গল্প অবিশ্বাস্য শোনায়। ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশান, গল্পের চেয়ে জীবন অনেক বেশি প্যাঁচালো, অনেক বেশি জটিল। জীবনের বাঁকে বাঁকে যে টুইস্টগুলো থাকে, তা ভীষণ অপ্রত্যাশিত!
যাই হোক, নিজের কথা বলে আপনাদের বিরক্ত করব না। আমি বরং আপনাকে নিয়ে বলি। হ্যা, আপনাকে নিয়েই বলছি! অবাক হবেন না! আপনি হয়তো ভাবছেন, আমি কি ভাবে আপনার সম্পর্কে জানি! আপনি যেই হোন না কেন, যেখানেই থাকুন না কেন, আপনার সঙ্গে আমাদের এক্সপেরিমেন্টের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। কি এক্সপেরিমেন্ট, সেটা পরে বলছি, জানতে পারবেন। কাজেই আপনি চাইলে আমাকে মনে মনে একটা ধন্যবাদ দিতেই পারেন!
আচ্ছা, আমি কি বেশি বকবক করছি? আমি কি নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ প্রমাণ করতে চাইছি? ক্ষমা করবেন। বহুদিন আমি এই কক্ষে বন্দী। আলো বাতাস দেখিনি। বহুদিন সভ্যতার স্পর্শে আসিনি। কি করে সভ্য ভাবে, ভদ্রতা রক্ষা করে কথা বলতে হয়, বোধহয় ভুলেই গিয়েছি!
কাজেই আমি বরং আমার গল্পটা বলি। জানি বিশ্বাস করবেন না। না করুন, তাতে কি! আমার গল্প তো তাতে বদলে যাবে না! দেখুন, নিকোলাস কোপার্নিকাস যখন বলেছিলেন, পৃথিবী সৌরজগতের কেন্দ্র নয়, তখন মানুষ কি তাকে পাগল ভাবেনি? কিংবা যখন গ্যালিলিও বলেছিলেন যে পৃথিবী গোল, তখন তার কারাবাসের কথা তো আপনারা জানেনই। আমিও না হয় তেমনি একটা গল্প বললাম! পাগল ডাকুন, তবুও শুনেই দেখুন না!!
আমার গল্পটা শুরু হয় এক বর্ষণমুখর দিনে।

পর্ব-২: গবেষণার দিন
ঘুম থেকে উঠে একরকম দৌড়ে ছুটে গেলাম ল্যাবের দিকে। দেরি হয়ে গেল নাকি! সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ আজ, দেরি করা যাবে না! তবে যখনই আমি গবেষণা ভবনের ভেতর পা রাখতে যাব, তখনই আকাশ ভেঙে ঝুম বৃষ্টি নামল। আমার হাতের প্লাস্টিকের ফাইলটি মাথার উপর ধরে আমি দ্রুত ছাদের নিচে ঢুকে গেলাম গা বাঁচাতে। মূল ভবনের দরজার সামনে দাড়াতে ভবনের সিকিউরিটি কম্পিউটার আমার শরীরের তামপাত্রা, হার্টবিট, রেটিনা চেক করে যান্ত্রিক নারী কণ্ঠে “ভ্যারিফাইড” কথাটা বলল, তারপর খুলে দিল দরজাটা। হাসি পেল আমার। পৃথিবীতে খুব বেশি মানুষ বেঁচে নেই আর। এই এলাকায় আছি শুধু আমরা ৩ জন বিজ্ঞানী। সিকিউরিটি সিস্টেমের কোন প্রয়োজনই নেই আর। অনাহুত কেউ ঢুকতে যাবে না এখানে। বেঁচে থাকলে তো ঢুকবে! তিন বছর আগে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে, সভ্যতা ধ্বংস হয়েছে তাতে, মরে গেছে বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ।
“গুড মর্নিং ডক্টর জোন।”
টিনা আমাকে দেখতে পেয়ে হাসিমুখে বলল কথাটা। আমার আগে আগেই আজ পৌঁছে গেছে সে। টিনার হাসি দেখলে মনটা ভালো হয় যায়। এই এলাকায় বেঁচে আছি শুধু আমি, টিনা আর রবিন; এই ৩ জন বিজ্ঞানী। রবিন আর টিনার মধ্যে একটা সম্পর্ক রয়েছে। সভ্যতা টিকে থাকলে এতদিনে হয়তো ওরা বিয়ে করে ফেলত। যেহেতু নেই, তাই বিয়েটা সেরে নিতে হয়েছে সাজানো উপায়ে। আমিই সাক্ষী, আমিই কাজী। ওরা দু’জন বর-কনে। এখনো প্রতি বছর ওদের বিয়ের দিনে আমরা কৃত্রিম খাবারের বদলে সত্যিকারের খাবার দিয়ে ডিনার সারি। সে রাতে রবিন হেরে গলায় গান ধরে, টিনা হালকা তালে বেসামাল নাচে। তার নাচের তাল লয় নেই। তবুও আমাদের চোখে সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নৃত্যশিল্পী আর রবিন শ্রেষ্ঠ গায়ক; যেহেতু একমাত্র শ্রোতা-দর্শক আমি এবং একমাত্র শিল্পী ওরা দু’জন।
আমি পাল্টা হেসে জবাব দিলাম, “গুড মর্নিং টিনা, রবিনও চলে এসেছে?”
“হ্যা, অলরেডি কাজ শুরু করে দিয়েছে সে ল্যাবে।”
আমি আর টিনা ল্যাবে ঢুকলাম। ভারী চশমার ভেতর দিয়ে কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল রবিন। আমাদের দেখে স্ক্রিন থেকে চোখ ফিরিয়ে উঠে দাড়াল। চশমার মোটা কাঁচ ভেদ করে তার নীল চোখের মণি দু’টো চকচক করে উঠল। “ড. জোন, এইমাত্র আরেকবার চেক করলাম পুরো এলগরিদম, কোথাও কোন ভুল নেই। টাইম-স্পেস ফেব্রিকের ইলাস্ট্রেশনে নিখুঁত রেজাল্ট পাচ্ছি প্রতিবার।”
শুনে খুশী হলাম আমি। তবে টিনাকে দেখে মনে হলো সে দুঃখ পেয়েছে কিছুটা। দুঃখ পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। আমাদের গবেষণা সত্যি হলে টিনাকে আলাদা হয়ে যেতে হবে আমাদের দল থেকে। কিংবা এটাও হতে পারে যে আজ পৃথিবীর শেষ দিন। তাতে কিছু যায় আসে না অবশ্য। আমরা বিজ্ঞানী; ক্ষুদ্র আবেগ, মানুষে মানুষে ভালোলাগালাগি, কাছাকাছি থাকা, এসবের চেয়ে আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানবজাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা, পৃথিবীকে রক্ষা করা। শুনতে গৎবাঁধা উপদেশের মতো শোনায়, তবে আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য ওটাই।
আমি কেশে গলা পরিষ্কার করে নিয়ে বললাম, “তাহলে শুরু থেকে সংক্ষেপে পুরো ঘটনাটা ব্রিফ করি আমি একবার। তারপরই আমাদের এক্সপেরিমেন্ট শুরু হবে।”
রবিন মাথা দুলিয়ে বলল, “নিশ্চয়ই।”
টিনা আর রবিন বসে পড়ল একটা চেয়ারে। পুরো মনোযোগ নিয়ে তাকিয়ে রইল আমার দিকে। যদিও ৩ বছর গবেষণা করার পর এখন আর ব্রিফ করার প্রয়োজন ছিল না, তবুও নিয়ম ধরে কাজ করার জন্যই ব্রিফ করা। আমি বলতে লাগলাম-

পর্ব-৩: পটভূমি
“আমাদের এক্সপেরিমেন্টের উদ্দেশ্য হলো জে-৯ আর জে-৭ দেশগুলোর মধ্যে বেঁধে যাওয়া যুদ্ধ প্রতিরোধ করা। আমরা জানি পশ্চিমা শক্তিশালী দেশগুলো মিলে জে-৭ গঠন করেছিল ত্রিশ বছর আগে। পরে এশিয়া এবং ইউরোপের কিছু দেশ মিলে গঠন করেছে জে-৯। পর্যাপ্ত পারমানবিক অস্ত্র এবং পৃথিবীর সচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীগুলো ছিল এই দুই জোটের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে। বিভিন্ন রাজনৈতিক কারণে স্নায়ু যুদ্ধ তো চলছিলই তাদের মধ্যে, একসময় সত্যিকারের যুদ্ধই বেঁধে গেল। ‘যুদ্ধ বেঁধে গেল’ কথাটা যত সহজ, ঘটনাটা ততো সহজ ছিল না। যুদ্ধ শুরু হবার কারণ ছিল অত্যন্ত তুচ্ছ! জে-৯ দেশের একটি মিলিটারি ট্যাঙ্ক একবার এক আর্মি বেজ থেকে আরেক আর্মি বেজে যাচ্ছিল দেশের বর্ডারের কাছাকাছি একটা রাস্তা ধরে। পাশেই ছিল জে-৭ জোটের একটি দেশ। জে-৯ এর ট্যাঙ্কের চাকা চলে গেল জে-৭ এর বর্ডারের মধ্যে দিয়ে, বর্ডারের কিছু অংশ মাড়িয়ে দিয়ে। ট্যাঙ্কের সৈন্যরা বিশেষ আর্টিলারি ট্রেনিং শেষ করে এক ঘাটি থেকে আরেক ঘাটিতে যাচ্ছিল। তাদের ঐ সময়কার দিনগুলো ছিল একঘেয়ে, সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন। কাজেই ঘটনাটা সৈন্যরা ইচ্ছে করে স্রেফ আনন্দ পাবার জন্য করেছে, নাকি নেহায়েত দুর্ঘটনা ছিল ব্যাপারটা, বলা মুশকিল! তবে এই ঘটনায় ক্ষুদ্ধ জে-৭ দেশ থেকে হালকা গোলা বর্ষণ শুরু হয়। তারপর পুরো ব্যাপারটা যুদ্ধে গড়াতে সময় লাগে না। তুমুল যুদ্ধ বাঁধার পর আর কারোই মনে রইল না যুদ্ধটা শুরু হয়েছিল কেন। তখন রাজনৈতিক কারণগুলোই মুখ্য হয়ে গেল। সেগুলো আসলেই মুখ্য ছিল, তবে ট্রিগার পয়েন্ট ছিল ঐ ট্যাঙ্কের ঘটনাটাই।
মজার ব্যাপার হলো, জে-৭ এবং জে-৯ দেশগুলোর নেতাদের নিয়ে একটা মিটিং বসার কথা ছিল এক সপ্তাহ পর, জাতিসংঘের উদ্যোগে। তথ্য অনুযায়ী, সে মিটিংটা হতে পারলে যুদ্ধ শুরু হবার কোন সম্ভাবনাই ছিল না। শান্তিচুক্তি নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছিল। তবে মিটিং হবার আগেই ঘটে গেল এই কান্ড। সেই ঘটনারই বাটারফ্লাই এফেক্ট ছিল তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তোমরা তো জানোই, একটা ঘটনা যখন অনেকগুলো ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করে, তখন ব্যাপারটাকে বাটারফ্লাই এফেক্ট বলে। ঠিক যেমন ফার্দিনান্দের মিসফায়ারের ঘটনাটা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বাটারফ্লাই এফেক্ট।
এখন আমাদের কাজ হলো টাইম স্পেস ফ্যাব্রিক ভেঙে অতীতে গিয়ে এই ঘটনাটা ঘটতে না দেওয়া। সময় পরিভ্রমণের দু’টো সূত্র বলে এটা সম্ভব নয়। প্রথম সূত্র, বিজ্ঞানী লুইসের মতে অতীতে যাওয়া সম্ভব হলেও অতীতে কোন কিছু পরিবর্তন করা অসম্ভব। কারণ অতীতের সব ঘটনার মতো ভবিষ্যৎ থেকে অতীতে যাবার ঘটনাটাও ইতিমধ্যে ঘটে গেছে। আজকের ভবিষ্যৎ সেই ঘটে যাওয়া অতীতেরই ফলাফল মাত্র। দ্বিতীয় সূত্রটি দিয়েছে বিজ্ঞানী সিডমার। সে বলেছে, টাইম স্পেস ফ্যাব্রিকে কিছু কিছু দুর্বল গিঁট রয়েছে। অর্থাৎ কিছু কিছু ঘটনা আছে, যেগুলো বদলানো সম্ভব। তবে তাতে তেমন কোন পরিবর্তন ঘটবে না বড় ঘটনাগুলোর। আমাদের এক্সপেরিমেন্ট এই দ্বিতীয় সূত্রের উপর ভিত্তি করে এগুবে।
আমরা টাইম স্পেস ফ্যাব্রিকের অনেকগুলো দুর্বল পয়েন্ট খুঁজে বের করেছি। অর্থাৎ যে ঘটনাগুলো আসলে বদলানো সম্ভব, তাতে বড় ধরনের কোন পরিবর্তনও হবে না। কিন্তু একমাত্র ব্যতিক্রম সেই ট্যাঙ্কের ঘটনাটা। ওখানেও টাইম ফ্যাব্রিক দুর্বল, তবে কম্পিউটারে সব রকম প্রবাবিলিটি বিশ্লেষণ করে দেখেছি, যদি ট্যাঙ্কটাকে আটকানো যেত সেদিন, তাহলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটত না। অর্থাৎ টাইম ট্রাভেলের সূত্রগুলো বাটারফ্লাই এফেক্টের ক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রযোজ্য নয়। দুর্বল গিঁটগুলো যদি বাটারফ্লাই এফেক্টের উপর পরে যায়, তাহলে সেই ঘটনাটি বদলাতে পারলে পুরো ইতিহাস বদলে দেওয়া যাবে। আমরা সে কাজেই পাঠাচ্ছি টিনাকে অতীতে। ট্যাঙ্কটাকে আটকাতে হবে। আমরা না গিয়ে টিনাকে পাঠানোর কারণ রয়েছে। প্রথম কারণ হলো ভর। আমাদের টাইম ট্রাভেল টেকনোলজি এখনও নতুন। আমরা ১১৫.৩৫ পাউন্ডের বেশি ভর অতীতে পাঠাতে পারি না। টিনার ওজন এর মধ্যে পরে। তাছাড়া মেয়েদের আবেদন রয়েছে এক রকমের। যদি টিনাকে আমরা ট্যাঙ্কের সামনে পাঠিয়ে দেই, যদি ধরো, অজ্ঞান অবস্থায় পরে থাকে সে রাস্তায়, তাহলে একঘেয়েমির শিকার সেই সৈন্যদল হয়তো শুধু এডভেঞ্চারের জন্য পাশের দেশের বর্ডার মাড়াবে না। পড়ে থাকা সুন্দরীকে উদ্ধার করবে। তবে এতে ঝুঁকিও আছে। সৈন্যদের হাতে নির্জন রাস্তায় টিনা নিরাপদ নয়। তাই ওর কাছে এক রকমের ইলেক্ট্রনিক ওয়েভ সৃষ্টিকারী ডিভাইস থাকবে। আধুনিক ট্যাঙ্কগুলোতে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক সিগন্যাল বাঁধা দেবার ডিভাইস থাকলেও বিশ-ত্রিশ বছর আগের ট্যাঙ্কে তা ছিল না। কাজেই এই শক্তিশালী ওয়েভ তৈরি করে ট্যাঙ্কটাকে রাস্তার মাঝখানে থামিয়ে রাখা সম্ভব কিছুক্ষণের জন্য। ঐ সময়টুকুই যথেষ্ট। টাইম ফ্যাব্রিকের পরের অংশে যুদ্ধ হবার কোন সম্ভাবনা নেই।
তবে টিনা সফল হলে আমার আর রবিনের এই অস্তিত্ব মুছে যাবে। আমরা হয়তো অন্য কোন সময়ে, অন্য কোন পরিচয়ে বেঁচে থাকব, আজকের এক্সপেরিমেন্টের কথা কারও মনে থাকবে না। কারণ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ না হলে আমরা কেউ এই ল্যাবে থাকতাম না, আমাদের দেখা হতো না কখনো। তবে তাতে কিছু যায় আসে না। মিশনের সফলতাই গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে টিনা তুমি রেডি?”

পর্ব-৪: এক্সপেরিমেন্ট
টিনা মাথা দোলাল উপর নিচে।
“বেশ, তবে রেডি হয়ে নাও। ত্রিশ বছর আগের জামা কাপড়, টাকা পয়সা, পরিচয়পত্র একটা ব্যাগে জোগাড় করে রেখেছি আমরা, জানোই তো! তুমি পোশাক পালটে নাও, ততোক্ষণে আমরা ইন্সট্রুমেন্টগুলো রেডি করি।”
টিনা পাশের ঘরে চলে গেল জামা পাল্টাতে, প্রস্তুত হতে।
রবিন একটু ইতস্তত বোধ করছিল কেন যেন। সন্দিহান সুরে সে জিজ্ঞেস করল- “আচ্ছা, আমরা যে এক্সপেরিমেন্ট করছি, পুরোটাই থিওরি নির্ভর। আমাদের হাতে এলগরিদম আছে বটে, তবে সেগুলো এর আগে বাস্তব কোন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করিনি আমরা। এক্ষেত্রে সবকিছু প্ল্যান-মতো ঘটবে, এমনটা আশা করা কি কিছুটা বোকামি নয়?”
“প্রথমত, এই থিওরি পরীক্ষামূলক-ভাবে প্রয়োগ করার মতো এনার্জি রিসোর্স, টেকনোলজি এবং ঝুঁকি নেবার সাহস কোনটাই আমার হাতে নেই। আমাদের হাতে যা যা আছে, তা নিয়েই কাজ চালাতে হবে। হ্যা, সবকিছু প্ল্যান-মতো ঘটবে এমনটা আশা করছি না আমি। উল্টোপাল্টা কিছু ঘটবেই। তবে কয়েক বিলিয়ন মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে আমরা তিনজনই যদি মারা যাই, তাতে আফসোস থাকবে না। আর আমরা ব্যর্থ হলেও কেউ দোষ দিতে আসবে না। দোষ দেবার মতো মানুষ পৃথিবীতে অবশিষ্ট নেই।”
রবিন মাথা দোলাল, যেন একমত হয়েছে অনিচ্ছা সত্ত্বেও। আমরা ইন্সট্রুমেন্টগুলো রেডি করতে লাগলাম। বড়সড় একটা কাঁচের টিউবে বেশ কিছু ছোট ছোট টিউব লাগানো। ভেতরের বায়ুচাপ, তাপমাত্রা, এনার্জি পার্টিকল, ওয়েভ ফ্রিকোয়েন্সি ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ছোট টিউবগুলো।
একটা নীল ডেনিমের জিনস, লাল টি শার্ট পরে ফিরে এলো টিনা। তার সোনালী চুল লাল-নীল পোশাকের সাথে চমৎকার মানিয়েছে। প্রাচীন সাঁজে অসম্ভব সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে।
আমি বললাম, “টিনা, টিউবের মধ্যে গিয়ে দাড়াও। বায়ুচাপ ১০২৬.৬৬ মিলিবার ভেতরে। একটু অস্বস্তি হতে পারে। শ্বাস নিতেও কষ্ট হবে কিছুটা। শরীরে ৫৪.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপের আঁচ লাগবে। তবে খুব বেশিক্ষণ কষ্ট করতে হবে না তোমাকে। সব মিলিয়ে, ২৩ বছর আগের সময়ে যেতে লাগবে ৮৯ সেকেন্ড। কয়েক পিকো সেকেন্ড আগে পরে হতে পারে, স্পেস ফেব্রিকের কারণে। লম্বা দম নিয়ে ধীরে ধীরে ছাড়বে। আশা করি খুব বেশি কষ্ট হবে না।”
টিনা মৃদু হেসে মাথা দোলাল। “চিন্তা করবেন না ড. জোন। সামলে নেব আমি।”
রবিন মায়া মায়া চোখে তাকিয়ে রইল টিনার দিকে। তার চোখের দিকে চোখ পড়তেই নিজের চোখগুলো কিছুটা ভিজে গেল টিনার। রবিনের গলা জড়িয়ে ধরে শেষবারের মতো আলতো চুমু খেল সে। বলল, “সময় বদলে গেলে হয়তো তোমার কিছু মনে থাকবে না, তবুও নতুন পৃথিবীতে আমি তোমাকে খুঁজে বের করব রবিন। কথা দিলাম। যে সময়েই তোমার সাথে আমার দেখা হোক না কেন, ভালোবাসব তোমায়!”
এরপর একবারও পিছন ফিরে না তাকিয়ে টিনা টিউবের মধ্যে ঢুকে গেল। আমি সবুজ বাতি জ্বলতে থাকা বাটনে চাপ দিলাম। প্রচন্ড নীল আলোতে ভরে গেল টিউবটি, অদৃশ্য করে দিল টিনাকে।
রবিন কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল-“কতক্ষণ লাগবে ব্যাপারটা ঘটতে, কোন ধারণা আছে আপনার ড. জোন?”
আমি নিজের চশমাটা ঠিক করতে করতে টাইম-স্পেস ফ্যাব্রিকের ইলাস্ট্রেশন মনিটরে ইঙ্গিত করলাম। বললাম-“এখানে দেখতে পাচ্ছ? এই লাল মার্ক করা বিন্দুটি? টিনা টাইম ফেব্রিকের এই অংশে গিয়েছে। যদি সে সফল না হয়, এখন থেকে ১৭ মিনিট ২২ সেকেন্ড পরও বিন্দুটা লালই থাকবে। অর্থাৎ সে কোথাও কোন পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি। আর যদি সে সফল হয়, তাহলে বাতিটা সবুজ হয়ে যাবে। তবে সেটা দেখার সৌভাগ্য হবে না তোমার আমার। তার আগেই আমাদের অস্তিত্ব চলে যাবে অন্য কোন খানে, অন্য কোন সময়ে; আমাদের এই সব এক্সপেরিমেন্টের কিছুই মনে থাকবে না। মনে থাকবে না, আমরা তিন জন মিলে পুরো সভ্যতাকে বাঁচিয়েছি। মনে থাকবে না টিনা নামের এই সোনালী কেশী মেয়েটাকে কতটা ভালবাসতে তুমি!”
রবিনের চোখে একই সাথে বিষণ্ণতা এবং আনন্দ দেখতে পেলাম। সভ্যতাকে বাঁচানোর আনন্দ, প্রেমিকা হারানোর দুঃখ! চোখের দৃষ্টি কত অদ্ভুত হতে পারে!!
আমার মধ্যে অবশ্য দুঃখ-আনন্দ কোনটাই কাজ করল না। আমি শুধু টেনশনে ভুগতে থাকলাম, কাজের সফলতার কথা ভেবে। কম্পিউটার অবশ্য বলছে, সফলতার সম্ভাবনা ৯৫.১%। তবুও আমি নিশ্চিন্ত হতে পারছি না। সময়ের সমীকরণ বেশ জটিল এবং অপূর্ণাঙ্গ। বিজ্ঞানী সিডমার অবশ্য অনেক রকম এলগরিদম দেখিয়ে গেছেন, আমরাও নতুন নতুন এলগরিদম বের করেছি, তবে তার কোনটাই পুরোপুরি ভাবে সময়কে ব্যাখ্যা করতে পারে না। সময় অনেকটা আলোর মতো, কখনো তরঙ্গ কখনো কণার মতো আচরণ। তার উপর রয়েছে স্পেসের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক। এমনকি একটি সুসঙ্গত সংজ্ঞাও নেই সময়ের!
আমি টাইম-স্পেস ফ্যাব্রিকের ইলাস্ট্রেশন মনিটরের দিকে তাকালাম। মনিটরে বাইনারি মান দিয়ে উপস্থাপন করা হচ্ছে সময়ের সুসংহত-বোধ। এখন ফেব্রিকের মান দেখাচ্ছে ১০১০১০১০... এভাবে। টিনা সফল হলে বাইনারি সংখ্যাটা বদলে হবে, ১০০১০১০০০১...এভাবে।
হাত ঘড়ি দেখলাম। চার মিনিট পেরিয়েছে। এখনো অনেকটা সময় বাকী। কফি মেশিন থেকে কফি ঢাললাম এক কাপ। সত্যিকারের কফি আর অবশিষ্ট নেই, কৃত্রিম কফি এগুলো। নার্ভ ঠান্ডা করার জন্য এটাই এখন খেতে হবে।
কফিতে চুমুক দিতে দিতে আমি টিনার কথা ভাবতে লাগলাম। কি করছে সে এখন অতীতে? কল্পনা করার চেষ্টা করলাম আমি।

পর্ব-৫: সময় পরিভ্রমণ
নির্জন বর্ডার এলাকা। একপাশে সবুজ ফসলের মাঠ। বড় বড় ভুট্টা গাছ মাঠে। আরেক পাশে অল্প একটু কংক্রিটের রাস্তা। টিনা চুলগুলো দু’হাত দিয়ে যতটা সম্ভব পরিপাটি করে নিল। হয়তো চিরুনির অভাব বোধ করল কিছুক্ষণের জন্য, কে জানে! তারপর রাস্তাটা ধরে হাঁটতে লাগল সে দ্রুত পায়ে।
৭ মিনিট পেরিয়েছে।
একটু সামনেই টিনা দেখতে পেল ট্যাঙ্কটাকে। দ্রুত হাতে ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসটা বের করল সে। একটাই বাটন রয়েছে সেখানে। প্রেস করল। তীক্ষ্ণ গলায় যেন কোন পাখি ডেকে উঠল ধারে কাছে! থেমে গেল ট্যাঙ্কটা। রাস্তার পাশে একটা ল্যামপোস্ট ছিল। সেটার বাতিটা বিস্ফোরিত হলো কাঁচ সহ। একটু আঁতকে উঠল টিনা, রাস্তার বাঁকের ওপাশে সৈন্যদের ওখান থেকে বাতিটা দেখবার কথা নয়, তবে শব্দ শুনলেও সন্দেহ করতে পারে। বেশি কিছু ভাবতে দেওয়া যাবে না তাদের। ডিভাইসটা ভুট্টা ক্ষেতে ফেলে দিয়ে দ্রুত পায়ে ওদের ট্যাঙ্কের সামনে চলে এলো সে। ততোক্ষণে সৈন্যরা একজন দু’জন করে বের হতে শুরু করেছে ট্যাঙ্ক থেকে।
ঘড়িতে ১১ মিনিট পেরিয়েছে।
টিনা ওদের সামনে গিয়ে দাড়াল। ভাঙা ভাঙা আঞ্চলিক একসেন্টে জিজ্ঞেস করল, “হাই! পুয়ের্তাকো গ্রামটা কোনদিকে বলতে পারেন আপনারা?”
সৈন্যরা দু’জন বাইরে, একজন ট্যাঙ্কের ভেতর থেকে গলা বের করে উঁকি দিচ্ছিল। ভেতরে, নিচেও দু’য়েকজন আছে বোধহয়। তিন সৈনিকের চোখগুলো যেন গিলে খাচ্ছে টিনাকে। টিনা অস্বস্তিবোধ করলেও, কষ্ট করে মুখের হাসিটা ধরে রাখল। তারপর প্রশ্নটা করল আরও একবার। এবার একজন সৈন্য চোখ সরিয়ে এনে ওর চোখের দিকে তাকাল। বলল-“বামের কাঁচা রাস্তাটা ধরে চলে যান মিস। আধা কিলোমিটার হাটলেই পেয়ে যাবেন।”
টিনা ম্যাপ দেখে এসেছে। বুঝতে পারল সৈন্যের দেওয়া ডিরেকশন সঠিক। সে হেসে ধন্যবাদ জানাল। তারপর বাম দিকের রাস্তাটা ধরে এগোল।
১৪ মিনিট পেরিয়েছে।
সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে এতক্ষণে সৈন্যদের পাশের দেশের সীমানার উপর দিয়ে যাবার কথা। এখনো যায়নি, তবে সময়ও চলে যায়নি। আরও তিন মিনিট রয়েছে। দ্রুত পায়ে একটা বাঁক পেরিয়ে ঝোপের আড়াল হতে পেছন দিকে তাকাল সে। একজন সৈন্য তখনো লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর চলার পথে। বোঝাই যায়, এতক্ষণ একবারের জন্যও ওর পেছন থেকে চোখ সরায়নি সে। বাকীরা ট্যাঙ্কের চাকা পরীক্ষা করছে। বোঝার চেষ্টা করছে সমস্যাটা কোথায়।
১৬ মিনিট।
আর মাত্র এক মিনিট বাকী। হঠাৎ ট্যাঙ্ক স্টার্ট নিল। এখনও এক মিনিট সময় আছে টাইম ফ্যাব্রিকে। চোখে উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে রইল টিনা। এক এক করে সৈন্যরা ট্যাঙ্কের মধ্যে ফিরে যাচ্ছে। ট্যাঙ্ক চলতে শুরু করল। আর মাত্র কয়েকটা সেকেন্ড...

পর্ব-৬: কারাবাস
হঠাৎ রবিন চেঁচিয়ে উঠল। “ড. জোন...দেখুন!”
আমি দেখলাম। বাতিটা সবুজ হয়ে গেছে লাল থেকে। টাইম-স্পেস ফ্যাব্রিকের ইলাস্ট্রেশন মনিটরের সিরিজটা হয়ে গেছে ১০০১০১০০০১... । তার মানে টিনার মিশন সফল। কিন্তু, প্রশ্ন হলো......
হ্যা, প্রশ্নটা করল রবিনই।
“কিন্তু ড. জোন, আমরা সবুজ বাতিটা দেখছি কেন? মিশন সফল হলে তো আমাদের এখানে থাকার কথা না। আমরা কিভাবে এখনো এখানে, এই ল্যাবে রয়েছি?”
আমার মাথাটা ফাঁকা হয়ে গেল হঠাৎ করে। ভীষণ কোন অনিয়ম ঘটেছে কোথাও। কী, সেটা ধরতে পারছি না। তারপর, হঠাৎই সব পরিষ্কার হয়ে গেল আমার কাছে। বুঝলাম, হিসেবে মস্ত বড় ভুল হয়েছে। দুর্বল গলায় রবিনকে বললাম, “ল্যাবের দরজা-জানালাগুলো খুলে দাও তো রবিন।”
রবিন এক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর দ্রুত পায়ে উঠে গিয়ে খুলে দিল ল্যাবের দরজা। যা দেখল, সহ্য হলো না ওর। চিৎকার করে লাফ দিয়ে পিছিয়ে এলো। আমি জানি বাইরে কি দেখতে পাচ্ছে সে। তাই উঠে দেখবার প্রয়োজন বোধ করলাম না। মৃত্যুর মতো শীতলতা আচ্ছন্ন করল আমাকে। মিইয়ে আসা কণ্ঠে রবিনকে বললাম, “টিনা পৃথিবীকে বাঁচাতে পেরেছে। তবে, আমরা অক্সবো পয়েন্টে চলে এসেছি রবিন।”
রবিন দু’হাতে মাথা চেপে ধরে আরও জোরে চিৎকার দিয়ে উঠল।
অক্সবো পয়েন্ট নামটা এসেছে অক্সবো লেক থেকে। অনেক সময় নদীর পাশ দিয়ে নদীর ছোট একটা শাখা বের হয়। সেটা একটু সামনে গিয়েই আবার নদীতে মেশে। যেন নদীর পেটে একটু খানি মাটি ঢুকে পড়েছে, এমন দেখায় তখন। তারপর সময়ের সাথে সাথে সেই ছোট শাখাটার দু’মুখেই মাটি জমতে থাকে। একসময় নদী থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে বাঁকানো একটা লেকে পরিণত হয় সেটা, যার সাথে নদীর আর কোন সম্পর্ক থাকে না। এটাকে বলে অক্সবো লেক। তেমনি ভাবে, সময়েরও এক রকম অক্সবো পয়েন্ট থাকে।
আমরা সময়ের স্রোতকে এখানে বসে বসে পাল্টে দিয়েছি। আমরা রয়েছি সময়ের এমন একটা জায়গায়, যেখানে সময়ের বদলে যাওয়া স্রোত আর ফিরে আসবে না। মূল সময়ের ধারা আমাদের কাছ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এখন। টাইম-স্পেস ফেব্রিকের একটা ছিটকে পড়া অংশ আমরা। এটাকে আমরা, বিজ্ঞানীরা বলি অক্সবো পয়েন্ট। এখানে সময়ের মান ধ্রুব। কখনো বদলাবে না তা। তবে ঘটনার মান ইনফিনিটি। আমরা যত যাই করি না কেন এই ছোট্ট টাইম স্পেস ফ্যাব্রিকে, এই ছোট্ট ল্যাবে, বাইরের সময়ের উপর কোন প্রভাব পড়বে না তাতে। দরজার বাইরে আসলে সময় এবং স্থান বলতে কিছু নেই। আছে নিঃসীম শূন্যতা। এত শূন্যতা কোন মানুষ কখনো দেখেনি, তাই তারা কল্পনাও করতে পারে না তা। সময় সরিয়ে নিলে, স্পেস সরিয়ে নিলে যা আসে, তা মানুষের কল্পনার বাইরে। মহাশূন্যের বাইরে যে অসীম শূন্যতা আছে, তা মানুষ কখনোই কল্পনা করতে পারবে না তাই। এই ভীষণ শূন্যতা দেখেই ভয় পেয়েছে রবিন।
আমার দিকে তাকিয়ে সে ভীত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল-“তাহলে টিনা...”
“টিনা তোমাকে খুঁজে পাবে, একটা প্যারালাল সময়ে, তোমার আমার একটা প্যারালাল অস্তিত্ব রয়েছে সেখানে। প্যারালাল সময় তাদের তৈরি করবে। খুঁজে পেলেও কখনোই সে জানতে পারবে না, এই তুমি, এই আমি আটকা পড়েছি এই অক্সবো পয়েন্টে।”
রবিনের নীল চোখগুলোতে নেমে এলো বিষাদের ছায়া!

(সমাপ্ত)
পর্ব-১:বিজ্ঞানীর ডায়েরি
আমি একজন বিজ্ঞানী, লেখক নই। কাজেই যে গল্প বলতে যাচ্ছি, সেটা কতটা গুছিয়ে বলতে পারব, নিশ্চিত নই আমি। পৃথিবীর কেউ যদি এই লেখা পড়ে থাকেন (যদিও সে সম্ভাবনা নেই বললেই চলে), অনুগ্রহ করে আমার সাহিত্যজ্ঞান ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখবেন। কোয়ান্টাম ফিজিক্সের উপর যদি আমি লিখতে বসি, অনেক কিছুই গুছিয়ে বলতে পারব, কিন্তু আজ বুঝতে পারছি, জীবনের গল্প বলা মোটেও সহজ নয়। কেন? অন্যতম কারণ হলো, জীবনের গল্প অবিশ্বাস্য শোনায়। ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশান, গল্পের চেয়ে জীবন অনেক বেশি প্যাঁচালো, অনেক বেশি জটিল। জীবনের বাঁকে বাঁকে যে টুইস্টগুলো থাকে, তা ভীষণ অপ্রত্যাশিত!
যাই হোক, নিজের কথা বলে আপনাদের বিরক্ত করব না। আমি বরং আপনাকে নিয়ে বলি। হ্যা, আপনাকে নিয়েই বলছি! অবাক হবেন না! আপনি হয়তো ভাবছেন, আমি কি ভাবে আপনার সম্পর্কে জানি! আপনি যেই হোন না কেন, যেখানেই থাকুন না কেন, আপনার সঙ্গে আমাদের এক্সপেরিমেন্টের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। কি এক্সপেরিমেন্ট, সেটা পরে বলছি, জানতে পারবেন। কাজেই আপনি চাইলে আমাকে মনে মনে একটা ধন্যবাদ দিতেই পারেন!
আচ্ছা, আমি কি বেশি বকবক করছি? আমি কি নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ প্রমাণ করতে চাইছি? ক্ষমা করবেন। বহুদিন আমি এই কক্ষে বন্দী। আলো বাতাস দেখিনি। বহুদিন সভ্যতার স্পর্শে আসিনি। কি করে সভ্য ভাবে, ভদ্রতা রক্ষা করে কথা বলতে হয়, বোধহয় ভুলেই গিয়েছি!
কাজেই আমি বরং আমার গল্পটা বলি। জানি বিশ্বাস করবেন না। না করুন, তাতে কি! আমার গল্প তো তাতে বদলে যাবে না! দেখুন, নিকোলাস কোপার্নিকাস যখন বলেছিলেন, পৃথিবী সৌরজগতের কেন্দ্র নয়, তখন মানুষ কি তাকে পাগল ভাবেনি? কিংবা যখন গ্যালিলিও বলেছিলেন যে পৃথিবী গোল, তখন তার কারাবাসের কথা তো আপনারা জানেনই। আমিও না হয় তেমনি একটা গল্প বললাম! পাগল ডাকুন, তবুও শুনেই দেখুন না!!
আমার গল্পটা শুরু হয় এক বর্ষণমুখর দিনে।

পর্ব-২: গবেষণার দিন
ঘুম থেকে উঠে একরকম দৌড়ে ছুটে গেলাম ল্যাবের দিকে। দেরি হয়ে গেল নাকি! সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ আজ, দেরি করা যাবে না! তবে যখনই আমি গবেষণা ভবনের ভেতর পা রাখতে যাব, তখনই আকাশ ভেঙে ঝুম বৃষ্টি নামল। আমার হাতের প্লাস্টিকের ফাইলটি মাথার উপর ধরে আমি দ্রুত ছাদের নিচে ঢুকে গেলাম গা বাঁচাতে। মূল ভবনের দরজার সামনে দাড়াতে ভবনের সিকিউরিটি কম্পিউটার আমার শরীরের তামপাত্রা, হার্টবিট, রেটিনা চেক করে যান্ত্রিক নারী কণ্ঠে “ভ্যারিফাইড” কথাটা বলল, তারপর খুলে দিল দরজাটা। হাসি পেল আমার। পৃথিবীতে খুব বেশি মানুষ বেঁচে নেই আর। এই এলাকায় আছি শুধু আমরা ৩ জন বিজ্ঞানী। সিকিউরিটি সিস্টেমের কোন প্রয়োজনই নেই আর। অনাহুত কেউ ঢুকতে যাবে না এখানে। বেঁচে থাকলে তো ঢুকবে! তিন বছর আগে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে, সভ্যতা ধ্বংস হয়েছে তাতে, মরে গেছে বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ।
“গুড মর্নিং ডক্টর জোন।”
টিনা আমাকে দেখতে পেয়ে হাসিমুখে বলল কথাটা। আমার আগে আগেই আজ পৌঁছে গেছে সে। টিনার হাসি দেখলে মনটা ভালো হয় যায়। এই এলাকায় বেঁচে আছি শুধু আমি, টিনা আর রবিন; এই ৩ জন বিজ্ঞানী। রবিন আর টিনার মধ্যে একটা সম্পর্ক রয়েছে। সভ্যতা টিকে থাকলে এতদিনে হয়তো ওরা বিয়ে করে ফেলত। যেহেতু নেই, তাই বিয়েটা সেরে নিতে হয়েছে সাজানো উপায়ে। আমিই সাক্ষী, আমিই কাজী। ওরা দু’জন বর-কনে। এখনো প্রতি বছর ওদের বিয়ের দিনে আমরা কৃত্রিম খাবারের বদলে সত্যিকারের খাবার দিয়ে ডিনার সারি। সে রাতে রবিন হেরে গলায় গান ধরে, টিনা হালকা তালে বেসামাল নাচে। তার নাচের তাল লয় নেই। তবুও আমাদের চোখে সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নৃত্যশিল্পী আর রবিন শ্রেষ্ঠ গায়ক; যেহেতু একমাত্র শ্রোতা-দর্শক আমি এবং একমাত্র শিল্পী ওরা দু’জন।
আমি পাল্টা হেসে জবাব দিলাম, “গুড মর্নিং টিনা, রবিনও চলে এসেছে?”
“হ্যা, অলরেডি কাজ শুরু করে দিয়েছে সে ল্যাবে।”
আমি আর টিনা ল্যাবে ঢুকলাম। ভারী চশমার ভেতর দিয়ে কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল রবিন। আমাদের দেখে স্ক্রিন থেকে চোখ ফিরিয়ে উঠে দাড়াল। চশমার মোটা কাঁচ ভেদ করে তার নীল চোখের মণি দু’টো চকচক করে উঠল। “ড. জোন, এইমাত্র আরেকবার চেক করলাম পুরো এলগরিদম, কোথাও কোন ভুল নেই। টাইম-স্পেস ফেব্রিকের ইলাস্ট্রেশনে নিখুঁত রেজাল্ট পাচ্ছি প্রতিবার।”
শুনে খুশী হলাম আমি। তবে টিনাকে দেখে মনে হলো সে দুঃখ পেয়েছে কিছুটা। দুঃখ পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। আমাদের গবেষণা সত্যি হলে টিনাকে আলাদা হয়ে যেতে হবে আমাদের দল থেকে। কিংবা এটাও হতে পারে যে আজ পৃথিবীর শেষ দিন। তাতে কিছু যায় আসে না অবশ্য। আমরা বিজ্ঞানী; ক্ষুদ্র আবেগ, মানুষে মানুষে ভালোলাগালাগি, কাছাকাছি থাকা, এসবের চেয়ে আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানবজাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা, পৃথিবীকে রক্ষা করা। শুনতে গৎবাঁধা উপদেশের মতো শোনায়, তবে আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য ওটাই।
আমি কেশে গলা পরিষ্কার করে নিয়ে বললাম, “তাহলে শুরু থেকে সংক্ষেপে পুরো ঘটনাটা ব্রিফ করি আমি একবার। তারপরই আমাদের এক্সপেরিমেন্ট শুরু হবে।”
রবিন মাথা দুলিয়ে বলল, “নিশ্চয়ই।”
টিনা আর রবিন বসে পড়ল একটা চেয়ারে। পুরো মনোযোগ নিয়ে তাকিয়ে রইল আমার দিকে। যদিও ৩ বছর গবেষণা করার পর এখন আর ব্রিফ করার প্রয়োজন ছিল না, তবুও নিয়ম ধরে কাজ করার জন্যই ব্রিফ করা। আমি বলতে লাগলাম-

পর্ব-৩: পটভূমি
“আমাদের এক্সপেরিমেন্টের উদ্দেশ্য হলো জে-৯ আর জে-৭ দেশগুলোর মধ্যে বেঁধে যাওয়া যুদ্ধ প্রতিরোধ করা। আমরা জানি পশ্চিমা শক্তিশালী দেশগুলো মিলে জে-৭ গঠন করেছিল ত্রিশ বছর আগে। পরে এশিয়া এবং ইউরোপের কিছু দেশ মিলে গঠন করেছে জে-৯। পর্যাপ্ত পারমানবিক অস্ত্র এবং পৃথিবীর সচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীগুলো ছিল এই দুই জোটের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে। বিভিন্ন রাজনৈতিক কারণে স্নায়ু যুদ্ধ তো চলছিলই তাদের মধ্যে, একসময় সত্যিকারের যুদ্ধই বেঁধে গেল। ‘যুদ্ধ বেঁধে গেল’ কথাটা যত সহজ, ঘটনাটা ততো সহজ ছিল না। যুদ্ধ শুরু হবার কারণ ছিল অত্যন্ত তুচ্ছ! জে-৯ দেশের একটি মিলিটারি ট্যাঙ্ক একবার এক আর্মি বেজ থেকে আরেক আর্মি বেজে যাচ্ছিল দেশের বর্ডারের কাছাকাছি একটা রাস্তা ধরে। পাশেই ছিল জে-৭ জোটের একটি দেশ। জে-৯ এর ট্যাঙ্কের চাকা চলে গেল জে-৭ এর বর্ডারের মধ্যে দিয়ে, বর্ডারের কিছু অংশ মাড়িয়ে দিয়ে। ট্যাঙ্কের সৈন্যরা বিশেষ আর্টিলারি ট্রেনিং শেষ করে এক ঘাটি থেকে আরেক ঘাটিতে যাচ্ছিল। তাদের ঐ সময়কার দিনগুলো ছিল একঘেয়ে, সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন। কাজেই ঘটনাটা সৈন্যরা ইচ্ছে করে স্রেফ আনন্দ পাবার জন্য করেছে, নাকি নেহায়েত দুর্ঘটনা ছিল ব্যাপারটা, বলা মুশকিল! তবে এই ঘটনায় ক্ষুদ্ধ জে-৭ দেশ থেকে হালকা গোলা বর্ষণ শুরু হয়। তারপর পুরো ব্যাপারটা যুদ্ধে গড়াতে সময় লাগে না। তুমুল যুদ্ধ বাঁধার পর আর কারোই মনে রইল না যুদ্ধটা শুরু হয়েছিল কেন। তখন রাজনৈতিক কারণগুলোই মুখ্য হয়ে গেল। সেগুলো আসলেই মুখ্য ছিল, তবে ট্রিগার পয়েন্ট ছিল ঐ ট্যাঙ্কের ঘটনাটাই।
মজার ব্যাপার হলো, জে-৭ এবং জে-৯ দেশগুলোর নেতাদের নিয়ে একটা মিটিং বসার কথা ছিল এক সপ্তাহ পর, জাতিসংঘের উদ্যোগে। তথ্য অনুযায়ী, সে মিটিংটা হতে পারলে যুদ্ধ শুরু হবার কোন সম্ভাবনাই ছিল না। শান্তিচুক্তি নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছিল। তবে মিটিং হবার আগেই ঘটে গেল এই কান্ড। সেই ঘটনারই বাটারফ্লাই এফেক্ট ছিল তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তোমরা তো জানোই, একটা ঘটনা যখন অনেকগুলো ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করে, তখন ব্যাপারটাকে বাটারফ্লাই এফেক্ট বলে। ঠিক যেমন ফার্দিনান্দের মিসফায়ারের ঘটনাটা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বাটারফ্লাই এফেক্ট।
এখন আমাদের কাজ হলো টাইম স্পেস ফ্যাব্রিক ভেঙে অতীতে গিয়ে এই ঘটনাটা ঘটতে না দেওয়া। সময় পরিভ্রমণের দু’টো সূত্র বলে এটা সম্ভব নয়। প্রথম সূত্র, বিজ্ঞানী লুইসের মতে অতীতে যাওয়া সম্ভব হলেও অতীতে কোন কিছু পরিবর্তন করা অসম্ভব। কারণ অতীতের সব ঘটনার মতো ভবিষ্যৎ থেকে অতীতে যাবার ঘটনাটাও ইতিমধ্যে ঘটে গেছে। আজকের ভবিষ্যৎ সেই ঘটে যাওয়া অতীতেরই ফলাফল মাত্র। দ্বিতীয় সূত্রটি দিয়েছে বিজ্ঞানী সিডমার। সে বলেছে, টাইম স্পেস ফ্যাব্রিকে কিছু কিছু দুর্বল গিঁট রয়েছে। অর্থাৎ কিছু কিছু ঘটনা আছে, যেগুলো বদলানো সম্ভব। তবে তাতে তেমন কোন পরিবর্তন ঘটবে না বড় ঘটনাগুলোর। আমাদের এক্সপেরিমেন্ট এই দ্বিতীয় সূত্রের উপর ভিত্তি করে এগুবে।
আমরা টাইম স্পেস ফ্যাব্রিকের অনেকগুলো দুর্বল পয়েন্ট খুঁজে বের করেছি। অর্থাৎ যে ঘটনাগুলো আসলে বদলানো সম্ভব, তাতে বড় ধরনের কোন পরিবর্তনও হবে না। কিন্তু একমাত্র ব্যতিক্রম সেই ট্যাঙ্কের ঘটনাটা। ওখানেও টাইম ফ্যাব্রিক দুর্বল, তবে কম্পিউটারে সব রকম প্রবাবিলিটি বিশ্লেষণ করে দেখেছি, যদি ট্যাঙ্কটাকে আটকানো যেত সেদিন, তাহলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটত না। অর্থাৎ টাইম ট্রাভেলের সূত্রগুলো বাটারফ্লাই এফেক্টের ক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রযোজ্য নয়। দুর্বল গিঁটগুলো যদি বাটারফ্লাই এফেক্টের উপর পরে যায়, তাহলে সেই ঘটনাটি বদলাতে পারলে পুরো ইতিহাস বদলে দেওয়া যাবে। আমরা সে কাজেই পাঠাচ্ছি টিনাকে অতীতে। ট্যাঙ্কটাকে আটকাতে হবে। আমরা না গিয়ে টিনাকে পাঠানোর কারণ রয়েছে। প্রথম কারণ হলো ভর। আমাদের টাইম ট্রাভেল টেকনোলজি এখনও নতুন। আমরা ১১৫.৩৫ পাউন্ডের বেশি ভর অতীতে পাঠাতে পারি না। টিনার ওজন এর মধ্যে পরে। তাছাড়া মেয়েদের আবেদন রয়েছে এক রকমের। যদি টিনাকে আমরা ট্যাঙ্কের সামনে পাঠিয়ে দেই, যদি ধরো, অজ্ঞান অবস্থায় পরে থাকে সে রাস্তায়, তাহলে একঘেয়েমির শিকার সেই সৈন্যদল হয়তো শুধু এডভেঞ্চারের জন্য পাশের দেশের বর্ডার মাড়াবে না। পড়ে থাকা সুন্দরীকে উদ্ধার করবে। তবে এতে ঝুঁকিও আছে। সৈন্যদের হাতে নির্জন রাস্তায় টিনা নিরাপদ নয়। তাই ওর কাছে এক রকমের ইলেক্ট্রনিক ওয়েভ সৃষ্টিকারী ডিভাইস থাকবে। আধুনিক ট্যাঙ্কগুলোতে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক সিগন্যাল বাঁধা দেবার ডিভাইস থাকলেও বিশ-ত্রিশ বছর আগের ট্যাঙ্কে তা ছিল না। কাজেই এই শক্তিশালী ওয়েভ তৈরি করে ট্যাঙ্কটাকে রাস্তার মাঝখানে থামিয়ে রাখা সম্ভব কিছুক্ষণের জন্য। ঐ সময়টুকুই যথেষ্ট। টাইম ফ্যাব্রিকের পরের অংশে যুদ্ধ হবার কোন সম্ভাবনা নেই।
তবে টিনা সফল হলে আমার আর রবিনের এই অস্তিত্ব মুছে যাবে। আমরা হয়তো অন্য কোন সময়ে, অন্য কোন পরিচয়ে বেঁচে থাকব, আজকের এক্সপেরিমেন্টের কথা কারও মনে থাকবে না। কারণ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ না হলে আমরা কেউ এই ল্যাবে থাকতাম না, আমাদের দেখা হতো না কখনো। তবে তাতে কিছু যায় আসে না। মিশনের সফলতাই গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে টিনা তুমি রেডি?”

পর্ব-৪: এক্সপেরিমেন্ট
টিনা মাথা দোলাল উপর নিচে।
“বেশ, তবে রেডি হয়ে নাও। ত্রিশ বছর আগের জামা কাপড়, টাকা পয়সা, পরিচয়পত্র একটা ব্যাগে জোগাড় করে রেখেছি আমরা, জানোই তো! তুমি পোশাক পালটে নাও, ততোক্ষণে আমরা ইন্সট্রুমেন্টগুলো রেডি করি।”
টিনা পাশের ঘরে চলে গেল জামা পাল্টাতে, প্রস্তুত হতে।
রবিন একটু ইতস্তত বোধ করছিল কেন যেন। সন্দিহান সুরে সে জিজ্ঞেস করল- “আচ্ছা, আমরা যে এক্সপেরিমেন্ট করছি, পুরোটাই থিওরি নির্ভর। আমাদের হাতে এলগরিদম আছে বটে, তবে সেগুলো এর আগে বাস্তব কোন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করিনি আমরা। এক্ষেত্রে সবকিছু প্ল্যান-মতো ঘটবে, এমনটা আশা করা কি কিছুটা বোকামি নয়?”
“প্রথমত, এই থিওরি পরীক্ষামূলক-ভাবে প্রয়োগ করার মতো এনার্জি রিসোর্স, টেকনোলজি এবং ঝুঁকি নেবার সাহস কোনটাই আমার হাতে নেই। আমাদের হাতে যা যা আছে, তা নিয়েই কাজ চালাতে হবে। হ্যা, সবকিছু প্ল্যান-মতো ঘটবে এমনটা আশা করছি না আমি। উল্টোপাল্টা কিছু ঘটবেই। তবে কয়েক বিলিয়ন মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে আমরা তিনজনই যদি মারা যাই, তাতে আফসোস থাকবে না। আর আমরা ব্যর্থ হলেও কেউ দোষ দিতে আসবে না। দোষ দেবার মতো মানুষ পৃথিবীতে অবশিষ্ট নেই।”
রবিন মাথা দোলাল, যেন একমত হয়েছে অনিচ্ছা সত্ত্বেও। আমরা ইন্সট্রুমেন্টগুলো রেডি করতে লাগলাম। বড়সড় একটা কাঁচের টিউবে বেশ কিছু ছোট ছোট টিউব লাগানো। ভেতরের বায়ুচাপ, তাপমাত্রা, এনার্জি পার্টিকল, ওয়েভ ফ্রিকোয়েন্সি ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ছোট টিউবগুলো।
একটা নীল ডেনিমের জিনস, লাল টি শার্ট পরে ফিরে এলো টিনা। তার সোনালী চুল লাল-নীল পোশাকের সাথে চমৎকার মানিয়েছে। প্রাচীন সাঁজে অসম্ভব সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে।
আমি বললাম, “টিনা, টিউবের মধ্যে গিয়ে দাড়াও। বায়ুচাপ ১০২৬.৬৬ মিলিবার ভেতরে। একটু অস্বস্তি হতে পারে। শ্বাস নিতেও কষ্ট হবে কিছুটা। শরীরে ৫৪.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপের আঁচ লাগবে। তবে খুব বেশিক্ষণ কষ্ট করতে হবে না তোমাকে। সব মিলিয়ে, ২৩ বছর আগের সময়ে যেতে লাগবে ৮৯ সেকেন্ড। কয়েক পিকো সেকেন্ড আগে পরে হতে পারে, স্পেস ফেব্রিকের কারণে। লম্বা দম নিয়ে ধীরে ধীরে ছাড়বে। আশা করি খুব বেশি কষ্ট হবে না।”
টিনা মৃদু হেসে মাথা দোলাল। “চিন্তা করবেন না ড. জোন। সামলে নেব আমি।”
রবিন মায়া মায়া চোখে তাকিয়ে রইল টিনার দিকে। তার চোখের দিকে চোখ পড়তেই নিজের চোখগুলো কিছুটা ভিজে গেল টিনার। রবিনের গলা জড়িয়ে ধরে শেষবারের মতো আলতো চুমু খেল সে। বলল, “সময় বদলে গেলে হয়তো তোমার কিছু মনে থাকবে না, তবুও নতুন পৃথিবীতে আমি তোমাকে খুঁজে বের করব রবিন। কথা দিলাম। যে সময়েই তোমার সাথে আমার দেখা হোক না কেন, ভালোবাসব তোমায়!”
এরপর একবারও পিছন ফিরে না তাকিয়ে টিনা টিউবের মধ্যে ঢুকে গেল। আমি সবুজ বাতি জ্বলতে থাকা বাটনে চাপ দিলাম। প্রচন্ড নীল আলোতে ভরে গেল টিউবটি, অদৃশ্য করে দিল টিনাকে।
রবিন কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল-“কতক্ষণ লাগবে ব্যাপারটা ঘটতে, কোন ধারণা আছে আপনার ড. জোন?”
আমি নিজের চশমাটা ঠিক করতে করতে টাইম-স্পেস ফ্যাব্রিকের ইলাস্ট্রেশন মনিটরে ইঙ্গিত করলাম। বললাম-“এখানে দেখতে পাচ্ছ? এই লাল মার্ক করা বিন্দুটি? টিনা টাইম ফেব্রিকের এই অংশে গিয়েছে। যদি সে সফল না হয়, এখন থেকে ১৭ মিনিট ২২ সেকেন্ড পরও বিন্দুটা লালই থাকবে। অর্থাৎ সে কোথাও কোন পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি। আর যদি সে সফল হয়, তাহলে বাতিটা সবুজ হয়ে যাবে। তবে সেটা দেখার সৌভাগ্য হবে না তোমার আমার। তার আগেই আমাদের অস্তিত্ব চলে যাবে অন্য কোন খানে, অন্য কোন সময়ে; আমাদের এই সব এক্সপেরিমেন্টের কিছুই মনে থাকবে না। মনে থাকবে না, আমরা তিন জন মিলে পুরো সভ্যতাকে বাঁচিয়েছি। মনে থাকবে না টিনা নামের এই সোনালী কেশী মেয়েটাকে কতটা ভালবাসতে তুমি!”
রবিনের চোখে একই সাথে বিষণ্ণতা এবং আনন্দ দেখতে পেলাম। সভ্যতাকে বাঁচানোর আনন্দ, প্রেমিকা হারানোর দুঃখ! চোখের দৃষ্টি কত অদ্ভুত হতে পারে!!
আমার মধ্যে অবশ্য দুঃখ-আনন্দ কোনটাই কাজ করল না। আমি শুধু টেনশনে ভুগতে থাকলাম, কাজের সফলতার কথা ভেবে। কম্পিউটার অবশ্য বলছে, সফলতার সম্ভাবনা ৯৫.১%। তবুও আমি নিশ্চিন্ত হতে পারছি না। সময়ের সমীকরণ বেশ জটিল এবং অপূর্ণাঙ্গ। বিজ্ঞানী সিডমার অবশ্য অনেক রকম এলগরিদম দেখিয়ে গেছেন, আমরাও নতুন নতুন এলগরিদম বের করেছি, তবে তার কোনটাই পুরোপুরি ভাবে সময়কে ব্যাখ্যা করতে পারে না। সময় অনেকটা আলোর মতো, কখনো তরঙ্গ কখনো কণার মতো আচরণ। তার উপর রয়েছে স্পেসের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক। এমনকি একটি সুসঙ্গত সংজ্ঞাও নেই সময়ের!
আমি টাইম-স্পেস ফ্যাব্রিকের ইলাস্ট্রেশন মনিটরের দিকে তাকালাম। মনিটরে বাইনারি মান দিয়ে উপস্থাপন করা হচ্ছে সময়ের সুসংহত-বোধ। এখন ফেব্রিকের মান দেখাচ্ছে ১০১০১০১০... এভাবে। টিনা সফল হলে বাইনারি সংখ্যাটা বদলে হবে, ১০০১০১০০০১...এভাবে।
হাত ঘড়ি দেখলাম। চার মিনিট পেরিয়েছে। এখনো অনেকটা সময় বাকী। কফি মেশিন থেকে কফি ঢাললাম এক কাপ। সত্যিকারের কফি আর অবশিষ্ট নেই, কৃত্রিম কফি এগুলো। নার্ভ ঠান্ডা করার জন্য এটাই এখন খেতে হবে।
কফিতে চুমুক দিতে দিতে আমি টিনার কথা ভাবতে লাগলাম। কি করছে সে এখন অতীতে? কল্পনা করার চেষ্টা করলাম আমি।

পর্ব-৫: সময় পরিভ্রমণ
নির্জন বর্ডার এলাকা। একপাশে সবুজ ফসলের মাঠ। বড় বড় ভুট্টা গাছ মাঠে। আরেক পাশে অল্প একটু কংক্রিটের রাস্তা। টিনা চুলগুলো দু’হাত দিয়ে যতটা সম্ভব পরিপাটি করে নিল। হয়তো চিরুনির অভাব বোধ করল কিছুক্ষণের জন্য, কে জানে! তারপর রাস্তাটা ধরে হাঁটতে লাগল সে দ্রুত পায়ে।
৭ মিনিট পেরিয়েছে।
একটু সামনেই টিনা দেখতে পেল ট্যাঙ্কটাকে। দ্রুত হাতে ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসটা বের করল সে। একটাই বাটন রয়েছে সেখানে। প্রেস করল। তীক্ষ্ণ গলায় যেন কোন পাখি ডেকে উঠল ধারে কাছে! থেমে গেল ট্যাঙ্কটা। রাস্তার পাশে একটা ল্যামপোস্ট ছিল। সেটার বাতিটা বিস্ফোরিত হলো কাঁচ সহ। একটু আঁতকে উঠল টিনা, রাস্তার বাঁকের ওপাশে সৈন্যদের ওখান থেকে বাতিটা দেখবার কথা নয়, তবে শব্দ শুনলেও সন্দেহ করতে পারে। বেশি কিছু ভাবতে দেওয়া যাবে না তাদের। ডিভাইসটা ভুট্টা ক্ষেতে ফেলে দিয়ে দ্রুত পায়ে ওদের ট্যাঙ্কের সামনে চলে এলো সে। ততোক্ষণে সৈন্যরা একজন দু’জন করে বের হতে শুরু করেছে ট্যাঙ্ক থেকে।
ঘড়িতে ১১ মিনিট পেরিয়েছে।
টিনা ওদের সামনে গিয়ে দাড়াল। ভাঙা ভাঙা আঞ্চলিক একসেন্টে জিজ্ঞেস করল, “হাই! পুয়ের্তাকো গ্রামটা কোনদিকে বলতে পারেন আপনারা?”
সৈন্যরা দু’জন বাইরে, একজন ট্যাঙ্কের ভেতর থেকে গলা বের করে উঁকি দিচ্ছিল। ভেতরে, নিচেও দু’য়েকজন আছে বোধহয়। তিন সৈনিকের চোখগুলো যেন গিলে খাচ্ছে টিনাকে। টিনা অস্বস্তিবোধ করলেও, কষ্ট করে মুখের হাসিটা ধরে রাখল। তারপর প্রশ্নটা করল আরও একবার। এবার একজন সৈন্য চোখ সরিয়ে এনে ওর চোখের দিকে তাকাল। বলল-“বামের কাঁচা রাস্তাটা ধরে চলে যান মিস। আধা কিলোমিটার হাটলেই পেয়ে যাবেন।”
টিনা ম্যাপ দেখে এসেছে। বুঝতে পারল সৈন্যের দেওয়া ডিরেকশন সঠিক। সে হেসে ধন্যবাদ জানাল। তারপর বাম দিকের রাস্তাটা ধরে এগোল।
১৪ মিনিট পেরিয়েছে।
সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে এতক্ষণে সৈন্যদের পাশের দেশের সীমানার উপর দিয়ে যাবার কথা। এখনো যায়নি, তবে সময়ও চলে যায়নি। আরও তিন মিনিট রয়েছে। দ্রুত পায়ে একটা বাঁক পেরিয়ে ঝোপের আড়াল হতে পেছন দিকে তাকাল সে। একজন সৈন্য তখনো লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর চলার পথে। বোঝাই যায়, এতক্ষণ একবারের জন্যও ওর পেছন থেকে চোখ সরায়নি সে। বাকীরা ট্যাঙ্কের চাকা পরীক্ষা করছে। বোঝার চেষ্টা করছে সমস্যাটা কোথায়।
১৬ মিনিট।
আর মাত্র এক মিনিট বাকী। হঠাৎ ট্যাঙ্ক স্টার্ট নিল। এখনও এক মিনিট সময় আছে টাইম ফ্যাব্রিকে। চোখে উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে রইল টিনা। এক এক করে সৈন্যরা ট্যাঙ্কের মধ্যে ফিরে যাচ্ছে। ট্যাঙ্ক চলতে শুরু করল। আর মাত্র কয়েকটা সেকেন্ড...

পর্ব-৬: কারাবাস
হঠাৎ রবিন চেঁচিয়ে উঠল। “ড. জোন...দেখুন!”
আমি দেখলাম। বাতিটা সবুজ হয়ে গেছে লাল থেকে। টাইম-স্পেস ফ্যাব্রিকের ইলাস্ট্রেশন মনিটরের সিরিজটা হয়ে গেছে ১০০১০১০০০১... । তার মানে টিনার মিশন সফল। কিন্তু, প্রশ্ন হলো......
হ্যা, প্রশ্নটা করল রবিনই।
“কিন্তু ড. জোন, আমরা সবুজ বাতিটা দেখছি কেন? মিশন সফল হলে তো আমাদের এখানে থাকার কথা না। আমরা কিভাবে এখনো এখানে, এই ল্যাবে রয়েছি?”
আমার মাথাটা ফাঁকা হয়ে গেল হঠাৎ করে। ভীষণ কোন অনিয়ম ঘটেছে কোথাও। কী, সেটা ধরতে পারছি না। তারপর, হঠাৎই সব পরিষ্কার হয়ে গেল আমার কাছে। বুঝলাম, হিসেবে মস্ত বড় ভুল হয়েছে। দুর্বল গলায় রবিনকে বললাম, “ল্যাবের দরজা-জানালাগুলো খুলে দাও তো রবিন।”
রবিন এক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর দ্রুত পায়ে উঠে গিয়ে খুলে দিল ল্যাবের দরজা। যা দেখল, সহ্য হলো না ওর। চিৎকার করে লাফ দিয়ে পিছিয়ে এলো। আমি জানি বাইরে কি দেখতে পাচ্ছে সে। তাই উঠে দেখবার প্রয়োজন বোধ করলাম না। মৃত্যুর মতো শীতলতা আচ্ছন্ন করল আমাকে। মিইয়ে আসা কণ্ঠে রবিনকে বললাম, “টিনা পৃথিবীকে বাঁচাতে পেরেছে। তবে, আমরা অক্সবো পয়েন্টে চলে এসেছি রবিন।”
রবিন দু’হাতে মাথা চেপে ধরে আরও জোরে চিৎকার দিয়ে উঠল।
অক্সবো পয়েন্ট নামটা এসেছে অক্সবো লেক থেকে। অনেক সময় নদীর পাশ দিয়ে নদীর ছোট একটা শাখা বের হয়। সেটা একটু সামনে গিয়েই আবার নদীতে মেশে। যেন নদীর পেটে একটু খানি মাটি ঢুকে পড়েছে, এমন দেখায় তখন। তারপর সময়ের সাথে সাথে সেই ছোট শাখাটার দু’মুখেই মাটি জমতে থাকে। একসময় নদী থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে বাঁকানো একটা লেকে পরিণত হয় সেটা, যার সাথে নদীর আর কোন সম্পর্ক থাকে না। এটাকে বলে অক্সবো লেক। তেমনি ভাবে, সময়েরও এক রকম অক্সবো পয়েন্ট থাকে।
আমরা সময়ের স্রোতকে এখানে বসে বসে পাল্টে দিয়েছি। আমরা রয়েছি সময়ের এমন একটা জায়গায়, যেখানে সময়ের বদলে যাওয়া স্রোত আর ফিরে আসবে না। মূল সময়ের ধারা আমাদের কাছ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এখন। টাইম-স্পেস ফেব্রিকের একটা ছিটকে পড়া অংশ আমরা। এটাকে আমরা, বিজ্ঞানীরা বলি অক্সবো পয়েন্ট। এখানে সময়ের মান ধ্রুব। কখনো বদলাবে না তা। তবে ঘটনার মান ইনফিনিটি। আমরা যত যাই করি না কেন এই ছোট্ট টাইম স্পেস ফ্যাব্রিকে, এই ছোট্ট ল্যাবে, বাইরের সময়ের উপর কোন প্রভাব পড়বে না তাতে। দরজার বাইরে আসলে সময় এবং স্থান বলতে কিছু নেই। আছে নিঃসীম শূন্যতা। এত শূন্যতা কোন মানুষ কখনো দেখেনি, তাই তারা কল্পনাও করতে পারে না তা। সময় সরিয়ে নিলে, স্পেস সরিয়ে নিলে যা আসে, তা মানুষের কল্পনার বাইরে। মহাশূন্যের বাইরে যে অসীম শূন্যতা আছে, তা মানুষ কখনোই কল্পনা করতে পারবে না তাই। এই ভীষণ শূন্যতা দেখেই ভয় পেয়েছে রবিন।
আমার দিকে তাকিয়ে সে ভীত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল-“তাহলে টিনা...”
“টিনা তোমাকে খুঁজে পাবে, একটা প্যারালাল সময়ে, তোমার আমার একটা প্যারালাল অস্তিত্ব রয়েছে সেখানে। প্যারালাল সময় তাদের তৈরি করবে। খুঁজে পেলেও কখনোই সে জানতে পারবে না, এই তুমি, এই আমি আটকা পড়েছি এই অক্সবো পয়েন্টে।”
রবিনের নীল চোখগুলোতে নেমে এলো বিষাদের ছায়া!

(সমাপ্ত)
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন