বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২০ জুন ১৯৮৯
গল্প/কবিতা: ১টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৬৯

বিচারক স্কোরঃ ১.৮৯ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮ / ৩.০

গল্প - আঁধার (অক্টোবর ২০১৭)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৬৯ অন্ধকার

অনার্য মুর্শিদ
comment ৩  favorite ০  import_contacts ১৩৭
দুর্বল সূর্যটা হয়ে ক্রমে লাল হয়ে নিচের দিকে নামছে। একটু পরই অন্ধকারে থই থই করবে চারদিক। মেঠোশেয়াল আর বনমোরগগুলো ডেকে উঠবে। কালো শুয়োরটা গোঁৎ গোঁৎ করতে করতে খোয়াড়ের দিকে যাবে। মুখে তার কাঁচা গুয়ের গন্ধ।
অসহ্য! ফিরোজার অন্ধকার ভালো লাগে না। বিরক্তি হয়, ঘেন্না লাগে তার। তবু অন্ধকার চলে আসে। দ্রুত পায়ে। নির্লজ্জের মতো, বেহায়ার মতো।
ফিরোজা যেখানে থাকে, সেটা একটা শহর। বরেন্দ্র অঞ্চলের ছোট্ট একটা শহর। স্থানীয় লোকজন এটাকে শহর বলে না, তারা বলে বাজার। তবু কাগজ-কলম আর রাজধানীর লোকজন এটাকে মফস্বল শহরই বলে।
ফিরোজা থাকে শহরের ঠিক মাঝখানে। একটা ভাড়া বাড়িতে। আগে রেলের তৃতীয় শ্রেণীর একটি কলোনিতে থাকত। বাবার রেলে চাকরি সূত্রে সেখানে থাকা কলোনির পরিবেশ খারাপ বিধায় ভাড়া বাড়িতে উঠেছিল তারা। আজ বাবা নেই। পাঁচ বছর হলো গত হয়েছেন। তবু তারা এ বাড়িতে থাকে। কেন থাকে, ফিরোজা জানে না। ফিরোজার ইচ্ছা ছিল গ্রামে ফিরে যাবে। বাবার গ্রামে, নিজের গ্রামে। তার ইচ্ছে পূরণ হয়নি। মায়ের এক কথা। তিনি এখানেই থাকবেন। এখান থেকেই অল্প কিছু দূরে তাঁর বড় দুই মেয়ের শ্বশুরবাড়ি। মেয়ে দুটি কাছাকাছি আছে ভেবেই হয়তো দূরে কোথাও যাওয়ার ইচ্ছা হয়নি। ছেলে দুটোর বয়সও কম। ফিরোজার চেয়েও কম। কার ভরসায় তিনি গ্রামে ফিরবেন।
ফিরোজার ছোট দুই ভাই ঢাকায় পড়ে। বড়জন রূপক পড়ে বুয়েটে। ছোটজন রূপম সবে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ছে। ফিরোজা মফস্বল শহরে অনার্স শেষে করে ঢাকার একটা কলেজে মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছে সবে। মাস ছয়েক ক্লাস করার পর আবার তাকে মফস্বলে চলে আসতে হয়।
বাবা মারা যাওয়ার পর রূপক রূপম দুজনকেই ফিরোজাই পড়াশোনা করিয়ে আসছে। টিউশনি করে, কোচিং করিয়ে নিজের এবং দুই ভাইয়ের খরচ জোগাত। বোড় দুই বোনের কেউ পড়াশোনায় বেশি এগোতে পারেনি। এসএসসির আগেই দুজনকে বিয়ের পিঁড়িতে বসে যেতে হয়। ফিরোজা পরিবারের সঙ্গে যুদ্ধ করে নিজ উদ্যোগে গিয়ে বিভাগীয় শহরের গিয়ে পড়েছে। এর মধ্যে কতবার যে বিয়ের কথা বলেছে তার পরিবার! তা ফিরোজাও গুনে বলতে পারবে না। মা, বোন, বোনজামাইÑসবাই মিলে যখন তাকে বিয়ের জন্য চাপ দিত, ফিরোজা তখন বলত, ‘বিয়ে আমার স্বাধীনতা। সময় হলে আমি নিজেই করে নিব।’
ফিরোজার বিয়ে না করার বড় কারণটা হলো পরিবারে বাবা নেই। সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো শিক্ষিত কোনো অভিভাবক নেই। স্বার্থপরের মতো বিয়েটা করে ফেললে ভাই দুটির পড়াশোনা নিশ্চিত খারাপ হয়ে যাবে। সে যদি তাদের পড়ার পেছনে লেগে না থাকে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাবে না কেউ। বিষয়গুলো মাথায় এলে ফিরোজার মাথাটা টন করে উঠত। বুকটা ধক করে উঠত। পরিবার স্বল্প শিক্ষিত হওয়ায় নিজে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারেনি। তাই ছোট ভাইয়েরাও কি পড়বে না! তারা যদি না-ই পড়তে পারে, তাহলে তার এতদূর পড়াশোনা করে কী লাভ হলো? ফিরোজা বিয়ের সিদ্ধান্ত মাথা থেকে নামিয়ে ফেলে। দুই ভাইয়ের পাশে বটগাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। অথচ রূপক এখন চায় না ফিরোজা ঢাকায় থাকুক, আর পড়াশোনা করুক।
ঢাকায় রূপক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকে। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে কয়েকটা। খরচ বাদ দিয়ে মাসের শেষে হাজার তিনেক টাকা হাতে থাকে। রূপমের খরচ বাবার পেনশন থেকে দেওয়া হয়। ফিরোজা ঢাকায় নতুন গিয়ে বুঝতে পারে দুই ভাই কষ্ট করে পড়াশোনা করলেও কেউ একেবারে না খেয়ে নেই। ভাবতে ভালোই লাগে ফিরোজার। এমনটাই তো চেয়েছিল সে।
কিন্তু তার কী হবে! সে কীভাবে চলবে এই যান্ত্রিক শহরে। নেই চাকরি। নেই টিউশনি। লিংক ছাড়া কিছুই হয় না যেন। জোর চেষ্টা চালালে হয়তো একটা টিউশনি পাওয়া যাবে। কিন্তু এই বয়সে টিউশনি আর ভালো লাগে না তার। এবার চাকরির মতো একটা চাকরি চাই তার। তারপর বিয়ে।
ফিরোজা ঢাকায় এসে যখন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণপণ লড়ছিল, তখন রূপক তাকে বারবার বুঝিয়েছে, ‘দেখ আপা, আমরা যে পরিবারে বড় হয়েছি, সেই পরিবারে মেয়েদার বেপর্দায় উপার্জন মানায় না। আমল আখলাকের কারণেই এলাকার সবাই আব্বাকে শ্রদ্ধা করত। তার ছেলেমেয়ে হিসেবে আমাদেরও লোকজন শ্রদ্ধা করে। আমি চাই না তোর কারণে আমাদের কেউ খারপ বলুক। তুই মফস্বলে ফিরে যা। সবাই তোকে নিয়ে দুশ্চিন্তিত।’
ফিরোজা বুঝতে পারল ঢাকায় থাকলে বাড়ি থেকে কোনো সাহায্যই সে পাবে না। কারণ, কথাগুলো শুধু রূপকের না। এগুলো খোদ বড় দুলাভাইয়ের। বড় দুলাভাই এখন পরিবারের হর্তাকর্তা। চিন্তাভাবনা আইএসের চেয়েও রক্ষণশীল। রূপকও ইদানীং তার চিন্তাভাবনা দ্বারা প্রভাবিত। পারিবারিক সিদ্ধান্তে প্রতিনিয়তই তার সঙ্গে যুদ্ধ করে আসছে ফিরোজা। ফিরোজা বুঝতে পারছে না সামনে কি তার জন্য তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ অপেক্ষা করছে কি না। ঈশ্ববরের কাছে সে আসন্ন যুদ্ধ থেকে মুক্তির প্রার্থনা করে।
মফস্বলে ফেরার পর ফিরোজা ভালোমতো বুঝতে পারল কেন রূপক সেদিন তাকে বিয়ের জন্য পীড়াপীড়ি করেছিল। এর আগে কখনো ফিরোজাকে বিয়ের জন্য এতটা চাপ দেয়নি। বড় বোনের বয়সটা তার চোখে লাগছে এখন। সে জন্যই কি? না, স্রেফ সে জন্য না। রূপক তখন নতুন সম্পর্কে জড়িয়েছিল। মেয়ের বাবা-মা তাকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিল। কিন্তু বড় বোনকে এড়িয়ে সে কীভাবে বিয়ে করে! তাও আবার পড়াশোনা অবস্থায়। পরিবার কী বলবে! সমাজ কী বলবে!
ফিরোজার কাছে বিষয়গুলো তখন আকাশ থেকে পড়ার মতো মনে হয়েছিল। কখনোই ভাবেনি রূপক সত্যিই ছাত্রজীবনে বিয়ে করে ফেলবে। রূপকের বিয়ের কিছুদিন পর মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফিরোজা মফস্বলে ফিরে যায়। আজ ছয় মাস হলো সে মায়ের কাছে। মফস্বলে।
বিকেলের ট্রেনে রূপক মফস্বলে ফেরার কথা ছিল। ফেরেনি। হয়তো কাজ পড়ে গেছে। কিন্তু ফোন করে তো জানাতে পারত একবার। না, ফোন বন্ধ! ইদানীং ওর ফোন বন্ধ থাকে। এই সেটে নাকি বেশিক্ষণ চার্জ থাকে না।
ট্রেনটা যখন চলে যাচ্ছিল, ফিরোজা তখনো স্টেশনে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ট্রেনটার চলে যাওয়া দেখছিল। ফিরোজার মনে পড়ছে, আজ থেকে চার বছর আগের কথা। ঠিক এই স্টেশন থেকে শেষ বিদায় নিয়েছিল তার প্রিয় মানুষটি। বলেছিল, ‘ছয় মাসের মধ্যে আমাকে বিয়ে না করলে তোমার সঙ্গে আমি আর চলব না। ফ্যামিলি তো আমাকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে।’ ফিরোজার এক কথা, সম্ভব নয়। ভাই দুটির পড়াশোনার অবস্থান মজবুত হওয়া ছাড়া সে বিয়ের পিঁড়িতে বসবে না। শুনে মানুষটি সেদিন হনহন করে চলতি ট্রেনে উঠে গেল। আর ফিরোজা তাকিয়ে ছিল তার প্রস্থানের দিকে।
সন্ধ্যা প্রায় নেমেই গেছে। স্টেশনের বেঞ্চির তলে। রেললাইনের স্লিপারের নিচে। বস্তির ঝুপড়ি ঘরগুলোতে। ঠিকরে ঠিকরে অন্ধকার ঢুকছে। হনহন করে, ভনভন করে। একটু পর আবার হুইসেল বেজে উঠল। ঢাকা মেইল এসে গেছে লাইনে। ফিরতি যাত্রীদের হুড়োহুড়ি, উঠতি যাত্রীদের ব্যস্ততা। ওই তো রূপক, এই ট্রেনেই এল বুঝি! হ্যাঁ রূপকই তো। রূপক এসে গেছে। অন্ধকার এসে গেছে। তবু ফিরোজা এগিয়ে যায়। বুকের একপাশে আগলে নেয় রূপককে। অন্য পাশে অন্ধকার।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন