বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬
গল্প/কবিতা: ৬টি

রূপকথার জন্য মেঘবালিকা

আঁধার অক্টোবর ২০১৭

ঘুম নেই

ভৌতিক সেপ্টেম্বর ২০১৭

অভিলাষ অথবা একটি মথের গল্প

কামনা আগস্ট ২০১৭

গল্প - ভৌতিক (সেপ্টেম্বর ২০১৭)

ভূত-বিভ্রাট

বিনায়ক চক্রবর্তী
comment ১৭  favorite ১  import_contacts ৩৩০
(এক)

মহাফাঁপরে পড়েছেন কেদারবাবু। একমাস হয়ে গেল, তিনি লিখতে পারছেন না!

কেদারনাথ ভট্টাচার্য। স্বনামধন্য ভুতুড়ে লেখক! শীর্ষেন্দু পরবর্তী জমানার সেরা 'ভূত সাহিত্যিক' বললে- লোকজন সচরাচর তাঁর নামটাই করে থাকে।

তা কোন ধরনের ভূতের গল্প লেখেন তিনি?

কোনটা চান? অদ্ভুত বদ-ভূত, মিঠে অথবা কড়া, রসিক এবং সিরিয়াস, ভূতের-হাঁপানি, প্রবাসী হোক বা জাপানি স...অব পাবেন। লেখাকে হরেকরকম ফ্লেভারে চুবিয়ে কড়কড়ে করে ভেজে এমন কায়দায় ভদ্রলোক পরিবেশন করেন যে, সে প্রলোভন এড়ানো পাঠকের পক্ষে বিষম একটা দায় বৈকি! ফলে সাত থেকে সত্তর সবার কাছেই তিনি সাংঘাতিক জনপ্রিয়।

দুষ্টুলোকে যদিও বলে থাকে- গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ দিয়েই কেরিয়ার শুরু করেছিলেন তিনি। সেখানে বিশেষ কল্কে পান নি। তাই কোন এক জ্যোতিষীর পরামর্শে এসব লঘুচালের সাহিত্যবৃত্তি করে দিন গুজরান করছেন! অবশ্য ঈর্ষানলে দগ্ধ হয়ে তো কতজনেই কত কথা বলে থাকে। কেদারবাবু তাই এসবে বড় একটা ভ্রূক্ষেপ করেন না।

নিন্দুকে যা বলে বলুক। মোদ্দা কথা, এই পিডিএফ আর ই-বুক এর ডিজিটাল জমানায় কেদারনাথ বাংলা বই বিক্রির মরা গাঙে ভরা কোটাল এনেছেন বললে কিছুমাত্র অত্যুক্তি হবে না।

বেশিদিনের কথা নয়। এইতো গেল বইমেলাতেই নয় নয় করে পাঁচটি উপন্যাস বেরিয়েছে তাঁর। দুটো ছোটগল্প সংকলন। আর কিছু না হলেও গোটাচারেক ছড়ার বই। মেলায় পড়তে না পড়তেই স্রেফ কর্পূরের মতো উবে গ্যাছে সেসব! সামনের পূজা বার্ষিকীর জন্য লেখা চেয়ে দুয়ারে হন্যে হয়ে পড়ে আছেন একুশ জন সম্পাদক!

এহেন কেদারবাবু, প্রকাশের একমাসের মধ্যেই যাঁর বইয়ের পুনর্মুদ্রণ করতে হয় তাঁর কলমে লেখা আসছে না! তরুণ লেখকেরা যাঁর ছবি ল্যাপটপের ব্যাকগ্রাউন্ডে সেট করে রাখে সে ব্যক্তির লেখা আসছে না! শুধু রিম রিম কাগজ কিনেই যিনি পাড়ার দোকানদারের তিনতলা বাড়ি উঠিয়ে দিলেন সেই কেদারবাবুর লেখা আসছে না! এও কি বিশ্বাসযোগ্য!



(দুই)

কেদারনাথ মৃতদার। এমনিতে লোক খারাপ নন। সদাশিব গোত্রেরই বলা চলে। তবে পত্নীবিয়োগের পর থেকে সামান্য খিটখিটে মেজাজের হয়ে উঠেছেন। এমনটাই ধারণা তাঁর পরিচারক- বাহাদুরের।

লেখক-মশায় অন্যদিনের মতো আজও বৈকালিক ভ্রমণ সমাধা করে বাড়ি ফিরেছেন। চা-য়ে বিস্কুট ডুবিয়ে টিভিতে সান্ধ্য-সিরিয়াল দেখেছেন। তারপর আটটার দিকে কাগজ-কলম নিয়ে নিয়মমাফিক লিখতে বসে গ্যাছেন। কেদারবাবু পুরনো দিনের মানুষ। বাড়িতে কম্পিউটার একটা আছে ঠিকই। কিন্তু তাতে লেখালিখি করা তাঁর বিলকুল না-পসন্দ!

যাইহোক, অনেকক্ষন কলমটা হাতে ধরে নাড়াচাড়া করলেন বটে। তাতে সাদা পৃষ্ঠার বুকে বেশ কিছু ত্রিভুজ এবং গোটাকয়েক ট্যারাবাঁকা বৃত্ত অঙ্কিত হল। কপালের রগ চেপে ধরে মগজের ওপর জোর খাটাতেও কসুর করলেন না। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত প্লট অধরাই রইল। ইতস্তত কিছু সরলরেখারা ছাড়া কাগজে একটি শব্দও এসে আঁচড় কেটে গেল না।

এ অবস্থায় যা হয়ে থাকে সাধারণত। প্রথম দিকটায় ভারী ভয় করতে থাকল। গুচ্ছের প্রকাশনী আর পত্রিকা থেকে আগাম নেওয়া আছে। তাগাদা তাঁরাও কিছু কম দিচ্ছেন না। এদিকে লেখা জমা দেবার দিন ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে। এই পর্যায়ে এসে ভয়ানক কান্না পেল তাঁর। রাইটার্স ব্লকে কেদারনাথের বিশ্বাস নেই। তাই রাহু কেতু শনি একত্রে মিলে যে তাঁর বিরুদ্ধে বিষম একটা ষড়যন্ত্র রচনা করছে --এ ধারণা ক্রমশ বদ্ধমূল হতে থাকল তাঁর। উল্লেখ্য, আমাদের কেদারবাবু ভুত ভগবান তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলেও জ্যোতিষশাস্ত্রে অগাধ আস্থা রাখেন। অ্যাস্ট্রোলজি আর অ্যাস্ট্রোনমি এ দুই-ই তাঁর মতে মুদ্রার দুই পিঠ মাত্র!

আচমকা দুম করে কারেন্ট চলে গেল। কেদারবাবু বেজার হলেন। রাজনৈতিক ভোট-পর্ব মিটে যেতেই শহরে আবার ঘনঘন লোডশেডিং শুরু হয়েছে। ঘরের গুমোট গরমে ভূতের মতো থম মেরে বসে থাকতে থাকতে একসময় ধৈর্যচ্যুতি ঘটল তাঁর। 'ধুত্তোর' বলে রেগেমেগে উঠে পড়লেন তিনি।







(তিন)

খোলা ছাদ। একান্তে পায়চারি করতে মন্দ লাগছিল না। ফুরফুরে বাতাস দিচ্ছে। স্যান্ডোগেঞ্জি পরিহিত কেদারের মন মেজাজ বেশ প্রসন্ন হয়ে উঠল। চারিদিকে বরফের চাঁইয়ের মতো জমাট নিটোল অন্ধকার। মাঝে-মাঝেই দূরের বিচ্ছিন্ন কয়েকটা বাড়িতে বোধ করি মোমবাতি জ্বালানো হয়েছে। জানালার ফাঁক-ফোকর দিয়ে চুঁইয়ে পড়া সেই আলোয় রাতের রূপ যেন আরও খুলেছে। জীবনে, এই প্রথমবারের মতো কেদারবাবু অনুভব করলেন- অন্ধকারেরও একটা নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। আবেগের তোড়ে গুনগুন করে হয়ত বা দু-এক কলি গেয়েই ফেলতেন। এমন সময়, কে যেন পিঠে টোকা দিল।

-- মিনিট পাঁচেক সময় হবে? কিছু কথা ছিল।

চমকে ফিরে তাকিয়ে কেদার দেখলেন- উটকো একটা লোক প্রায় তাঁর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। এই গরমের মধ্যেও তার পরনে ইয়াব্বড়ো একটা আলখাল্লা! যেটার আবার হুডও রয়েছে। আর এভাবে ঘোমটা দিয়ে রাখায় লোকটার মুখটা অব্দি ঠিক করে দেখা যাচ্ছে না। বলিহারি ফ্যাশন বাপু! এ ব্যাটাকে আগে কোথায় যেন তিনি দেখেছেন। ভাবতে ভাবতে মনে পড়ল- তাঁর লেখার টেবিলের ওপর রাখা জোব্বা পরা রবীন্দ্রনাথের ফোটোটার কথা! ফিক করে হেসে ফেলতে গিয়েও সামলে নিলেন তিনি। তারপর গম্ভীর হয়ে বললেন,


-- কে আপনি? ছাদের ওপর আসলেন কাকে বলে?

প্রসন্নতা চটকে গিয়ে এবার একটু বিরক্তই হয়েছেন তিনি। বড়ঘড়িতে ছ'টার ঘন্টা বাজলেই যে বাড়ির গেট বন্ধ করতে হবে --এ কথা তো তিনি বাহাদুরকে কম বার বলেন নি। আর সে হারামজাদাও হয়েছে তেমনি। লোডশেডিং এর ফাঁকতালে নির্ঘাত অভিসারে বেরিয়ে পড়েছে। বেল্লিক কোথাকার! এখন এই যে বাড়িতে চোর-ছ্যাঁচোড় ঢুকে গেল, যদি ভালোমন্দ একটা কিছু হয়ে যায়; এর দায় কে নেবে?

-- ঘাবড়ে যাবেন না। গেট বন্ধই আছে। বাহাদুর তার কামরায় ঘুমুচ্ছে।

কেদারবাবুর কপালে ঘামের ফোঁটা জেগে উঠল। গলা আগেই শুকিয়েছে। এ শালা তাঁর মনের কথা টের পেল কী করে! অবশ্য এমনটা যে প্রথমবার ঘটছে তা নয়। গিন্নি যতদিন বেঁচে ছিল ততদিন তাঁকে মুখটি পর্যন্ত খুলতে হয়নি কোনদিন। হাঁ করলেই সে ঠিক হাওড়া বুঝে নিত। তা বলে...!

-- গে-গেট বন্ধ তো ভিতরে ঢুকলেন কী করে? উড়ে উড়ে? স্পাইডারম্যান নাকি মশাই আপনি?

কেদারবাবুর কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল এবং গলা কাঁপছিল।

লোকটা আলতো করে হাসল। যদিও তা কেদারের চোখে ধরা পড়ল না। হয়ত অন্ধকারের জন্য। হয়ত বা ভয়ের কারণে।

-- একপ্রকার উড়েই এসেছি বলতে পারেন। এসেছি নিবিভূস থেকে! নিখিল বিশ্ব ভূত সমিতি... নাম শোনেননি?






(চার)

কারেন্ট এসেছে অনেক আগেই। কেদারবাবু তাঁর বিছানার ওপর শুয়ে। বাঁ-হাতটা আলগোছে কপালের ওপর রাখা। চোখ বন্ধ। ঘুমোচ্ছেন কিনা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। তবে খানিকটা কাছে এগিয়ে গেলে লক্ষ্য করা যাবে যে, নিঃশ্বাসের তালে তালে তাঁর বিপুল ভুঁড়িটি উঠছে-নামছে। কাজেই বেঁচে যে আছেন তা বলাই যায়। আরও ভালো করে চোখ চালালে দেখা যাবে- বাঁ হাতের মুঠির মধ্যে একটা ভাঁজ করা ছেঁড়া লেফাফা। যার ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে একটা কাগজ। সেটা বাইরে টেনে এনে খুলে ফেললে দেখা যাবে কারা যেন বিচ্ছিরি হস্তাক্ষরে তাঁকে চিঠি লিখেছে। খুব সম্ভব আলতা দিয়ে!



প্রিয় কেদার,

প্রবাহের ধর্মই হইল সগর্জনে আপন নিশান উড়াইয়া আগাইয়া যাওয়া। তাহাকে রুধিবার প্রচেষ্টা কালক্ষেপ মাত্র। আমাদিগের কালের সহিত আজিকার ফারাক যে যোজন বিস্তৃত তাহা স্বীকার করি। কিন্তু হালের শিশু-কিশোর ও যুবক-যুবতীগন বড়ই অভব্য এবং চ্যাংড়া। উহারা গুরুজনে যথোচিত সম্মান প্রদর্শনে অপারগ। অন্তর্জালের কল্যাণে লজ্জা ভীতির তুল্য সুকুমার প্রবৃত্তিগুলি জলাঞ্জলি দিয়া উহারা কেবল তাচ্ছিল্য করিতে শিখিয়াছে। শুধু উহাদিগেরই বা দোষ দিই কোনমুখে? আবালবৃদ্ধবনিতা যুগের হুজুগে মাতিয়া নির্লজ্জ ধেইনৃত্য করিতেছেন। বিজ্ঞান তোমাদিগকে পরীক্ষা অন্তে বিশ্বাস করিতে শিখাইয়াছে। তাহার অর্থ বুঝি পরীক্ষা না করিয়াই অবিশ্বাসে মত্ত হওয়া? বলি আমরা কি বিজ্ঞান পড়ি নাই? আচ্ছা, আমার কথা না হয় ছাড়িয়া দাও। এই যে সত্যেন আমার পাশে দাঁড়াইয়া কাঁচালঙ্কা সহযোগে মুড়ি চিবুচ্ছে, যাহার জন্মদিবস আসিলে এখনো দু-চারিটি পুস্পস্তবক তোমরা এইখানে পাঠাইয়া দাও, সেও কি তাহা হইলে বিজ্ঞানচর্চা করে নাই বলিতে চাও? বেশ। আমদিগকে না মানিতে চাহ মানিও না। কিন্তু সাঁঝের বেলা শীতলপাটি বিছাইয়া আমদিগের গল্প শুনিতেও কি আর ইচ্ছা করে না? বুড়ি ঠাম্মা'র কাছে? নাকি ইংরাজের অনুকরনে উঁহাদিগকেও বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাইয়া ল্যাঠা চুকাইয়া দিয়াছ?

এইরূপ মানসিক দৈন্যের কালেও, তুমি পুনরায় আমাদের কথা লিখিতে শুরু করায় যে কী আনন্দ পাহিয়াছিলাম তাহা লিখিয়া প্রকাশ করা যায় না কেদার। কিন্তু কালের করাল গ্রাস তোমাকেও রেহাই দিল না। যৎকিঞ্চিত পার্থিব অর্থের মোহে পড়িয়া শেষকালে কিনা তোমারও মতিভ্রম হইল? ছিঃ। নির্মল হাস্যরসের বাহানা উঁচাইয়া তুমি ভূতদিগকে লইয়া যে ঠাট্টা-তামাশা আরম্ভ করিয়াছ তাহা কহতব্য নহে। দুনিয়ার ভূতসমাজের নিকট বঙ্গালী ভূত ও বঙ্গালী জাতির নাক কাটাইয়া ছাড়িছ। জাতির নাক অবশ্য ইতিপূর্বেই বিসর্জন দিয়াছিলে।

যাহাই হউক, আমরা সিদ্ধান্ত লহিয়াছি... তাহা বোধ করি এতদিনে তুমি টেরও পাহিয়াছ যে, ভাবীকালে তোমার দ্বারা আর কোনরূপ ভৌতিক (নাকি কিম্ভৌতিক কহিব?) কাহিনী রচনাই সম্ভবপর নহে। কোন শক্তিবলে এ কথা কহিতেছি তাহা জানিতে গেলে আরও কিছু বৎসর তোমাকে ধৈর্য ধরিতে হইবে। অর্থ, যতদিন না তুমি আমাদিগের দলভুক্ত হইতেছ!

ইতি
তোমার একদা গুনমুগ্ধ জনৈক বরিষ্ঠ শুভানুধ্যায়ী
সম্পাদক সমীপেষু,
স্বার্থরক্ষা দপ্তর, বঙ্গীয় ভুতসমাজ,
নিখিল বিশ্ব ভূত সমিতি (নিবিভূস)
তাং - ১৯শে ভাদ্র, ১৪২১


পুনশ্চঃ আমরা তোমাদিগের স্বরূপ অকৃতজ্ঞ নহি। অতএব ভাতে মারা পড়িবে না জানিয়া রাখ। আশা করি বুঝিয়াছ।




(পাঁচ)

এ ঘটনা পার হয়েছে- তা বেশ কয়েকবছর হয়ে গেল। লোকমুখে শোনা যায়, বাংলা সাহিত্যে নাকি তথ্যবহুল মনোজ্ঞ প্রবন্ধের সুদিন ফিরে এসেছে।

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন