বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৫ জুন ১৯৮১
গল্প/কবিতা: ৪টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৫৭

বিচারক স্কোরঃ ১.৮৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৭ / ৩.০

গল্প - পার্থিব (জুন ২০১৭)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৫৭ পার্থিব

ফাজল্লুল কবির
comment ৩  favorite ০  import_contacts ৫৮
করিম মিয়া গরীব কৃষক । কষ্টেই তার দিন কেটে যায় । পড়াশোনা করেননি তবে স্বাক্ষর করা শিখেছেন । নৈশ স্কুলে যেতেন । সেখানে কিছু কিছু শিখেছেন । ছোট খাট হিসেব রাখতে পারেন। দুই ছেলে তিন মেয়ে তার। আর্থিক অনটন লেগেই থাকে। শেষ কবে ভাল খাবার খেয়েছেন মনেই করতে পারেন না। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। বিয়েতে তেমন কিছুই করতে পারেন নি। এ কষ্ট মাঝে মাঝেই পীড়া দেয়। সেদিন চেয়ারম্যনের মেয়ের বিয়ে হলো । তাকে দাওয়াত দেয়া হয়নি। একটু মন খারাপ হয়েছিল। তার মতো একজন সাধারণ কৃষকের কীইবা দাম আছে সমাজে! এলাহি কাণ্ডকারখানার বিবরণ জমিরের কাছ থেকে শুনেছিলেন। দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এসেছিল অজান্তেই। জমির মিয়া ধুরন্ধর মানুষ । করিম মিয়া তাকে দেখতেই পারেন না। সবসময় গীবত করে। সুদের কারবারও করে। চেহারার মধ্যেই একটা অসাধু ভাব আছে। করিম মিয়া একথা ভেবে সান্ত্বনা পেয়েছিলেন যে মেয়ে দুটির বিয়ে দিয়েছেন তারা সুখে আছে। মাঝে মাঝে বাবার বাসায় বেড়াতে আসে। বাবার কষ্ট তারা বোঝে । বাবাকে ভালবাসে । টুকটাক জিনিসপত্র নিয়ে আসে। ছোট ছেলে আর মেয়ে স্কুলে পড়ে । বড় ছেলে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে বসে আছে। ভাল জায়গায় কোচিং করতে পাঠাতে পারেন নি। এলাকায় একটা কোচিং এ দিয়েছেন। প্রাইভেট পড়িয়ে কোচিং করছে করিম মিয়ার বড় ছেলে জলিল। করিম মিয়ার খুব শখ ছেলেটা ডাক্তার হবে। একবার করিম মিয়ার অসুখ হয়েছিল। তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল। তখন ডাক্তারদের চলাফেরা তার খুব ভাল লেগেছিল। মানুষের জন্যে কত কিছু করছে। হাসপাতালেই মসজিদ ছিল। নামাজ পড়ে খুব কেঁদেছিলেন । ছেলে যেন ডাক্তার হতে পারে সেই দোয়া করেছিলেন । মানুষের সেবা করেই জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারে একথা ভেবেছিলেন । বাসায় ফিরে জলিল কে বলেছিলেন সেকথা। জলিল পড়াশোনায় মোটামুটি ভাল। এসএসসি তে স্টারমার্ক পেয়েছিল। এইচএসসি পরীক্ষাও মোটামুটি হয়েছে। স্টার পাবে বলে মনে হচ্ছে তার কাছে । রেজাল্টের আগেরদিন খুব ভয় লাগছিল জলিলের। রেজাল্ট যদি খারাপ হয় মেডিকেল পড়া অনিশ্চিত হয়ে পড়বে । খুব অসহায় লাগছিল নিজেকে। পরদিন আব্বাকে বলে, “ দোয়া করেন আব্বা । রেজাল্ট আনতে যাচ্ছি’ । জলিলের আব্বা বলেছিলেন, “ যাই হোক তাড়াতাড়ি চইল্যা আসিস। দেরী করিস না। ফল ভালই হইব। রাত জেগে পড়েছিস”। তাড়াতাড়ি কলেজের দিকে চলে যায় জলিল। এবারও স্টার পেয়েছে যেয়ে জানতে পারে। বাসায় চলে আসে দ্রুত। কিছু মিষ্টিও নিয়ে আসে। বড়বোন দুইজনও তাদের ছেলেমেয়ে নিয়ে চলে আসে ফলাফল শুনে । করিম মিয়ার কান্না চলে আসে। মুরগী রান্না হয়। ভাত , ডাল আর সব্জি থাকে। সামান্য আয়োজন । সবাই একসাথে খেতে বসে। এক অপার্থিব জগত তৈরি হয় সেখানে । করিম মিয়ার কেমন জানি ভাল লাগে। খুব বাঁচতে ইচ্ছে করে অনেকদিন। ছেলেমেয়েকে ভাল ভাল খাবার দিতে পারেন নি। ভাল শিক্ষকের কাছে পড়াতে পারেন নি। তাও ভাল করেছে বড় ছেলে। ছেলেকে ডেকে খুব উৎসাহ দেয়। পরদিন জমির মিয়ার সাথে দেখা হয়। ছেলেকে ডাক্তার বানাতে চান শুনে বলে, “ ডাক্তারি পইর্যান এখন লাভ নাই। বেকার হইয়্যা ঘুরন লাগব। ভার্সিটিতে পড়াও । স্কুল কলেজে মাষ্টার হইবার পারব”। করিম মিয়া দমেন না। তিনি জমির কে চেনেন। কারো মঙ্গল সে চাইবে না সেটা বুঝতে পারেন। জলিল কে খুব উতসাহ দেন । দিন রাত পড়তে বলেন। জলিল ও পড়তে থাকে। বাবার কথা শুনে। পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে আসে। জলিল সাহস পায়না। তার এলাকা থেকে অনেক আগে একজন মেডিকেলে চান্স পেয়েছিল। তারপর আর কেউ পায়নি। তাই সবসময় ভয় লাগে। কিন্তু পড়তে থাকে। পরীক্ষার আগের দিন শহরে চলে আসে জলিল। সাথে করিম মিয়া। সস্তা এক হোটেলে উঠে । রাতটা কেমন ঘোরের মধ্যে কেটে যায় জলিলের। ফজরের নামাজ পড়ে আল্লাহ্‌র কাছে খুব কান্নাকাটি করে করিম মিয়া।খুব সকালেই ভয়ে ভয়ে মেডিকেল কলেজে চলে যায় দুজন। “দোয়া করেন আব্বা” বলে ভেতরে চলে যায় জলিল। এত পরীক্ষার্থী দেখে ভীষণ ভয় পায় জলিল। বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করে। মাথাটা ফাঁকা লাগে। মনে হয় সব ভুলে গেছে। কান্না আসতে থাকে। পরীক্ষা শুরুর ঘণ্টা বেজে উঠে । মাত্র ১ ঘণ্টার পরীক্ষা । মনপ্রান দিয়ে বৃত্ত ভরাট করতে থাকে। কিভাবে এক ঘণ্টা শেষ হয় বুঝতেই পারেনা। তার আগেই পরীক্ষা শেষ হয়ে যায় । আব্বাকে বলতে পারেনা পরীক্ষা কেমন হয়েছে। দুজন আবার গ্রামের পথ ধরে। জলিল পরদিন একটু ধাতস্থ হয়। তবে ধারণা করতে পারেনা কি হতে পারে। কেমন যে পরীক্ষা হলো তাও বুঝতে পারেনা। এভাবে সপ্তাহখানেক পার হয়ে যায় । জলিল ভার্সিটির জন্যে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে আবার। একদিন বিকেলে শুয়ে ছিল জলিল। শরীরটা ভাল যাচ্ছিল না। হঠাৎ কোচিং এর এক বড় ভাইয়ের গলা। জলিল জলিল বলে উচ্চস্বরে ডাকছে । এসেই জড়িয়ে ধরে। “ তুমি রংপুর মেডিকেল কলেজে চান্স পাইসো জলিল ” । জলিলের বিশ্বাসই হতে চায়না। কেমন যেন লাগে। কান্না চলে আসে। আনন্দের কান্না। কতদিন এরকম ভাবে কাঁদে নি সে। আবার পরিবারের সব সদস্য চলে আসে। সে রাতে করিম মিয়ার বাড়ীতে আবার এক অপার্থিব জগত তৈরি হয়। পার্থিব জগতের কোন অস্তিত্বই থাকে না।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন