বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬
গল্প/কবিতা: ১টি

সমন্বিত স্কোর

৪.১

বিচারক স্কোরঃ ২.৪৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৬৫ / ৩.০

গল্প - নগ্নতা (মে ২০১৭)

মোট ভোট ১১ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.১ নোনা জলের পুনরাবৃত্তি

যোহা খাঁন
comment ৭  favorite ১  import_contacts ১০৩
১.
ঘুম ভাঙ্গতেই আনন্দে মনটা নেচে উঠলো সুপালির। চারিদিকে একটা সাঁজ সাঁজ রব। লাল লাল ফুলে পূর্ণ সাদা শাড়িটা তুলে নিলো হাতে। নতুন নতুন আবেশটা শুধু তার শাড়িতে নয় যেনো বাতাসেও মিশে আছে। আর যেনো তর সইছে না।
-“শুভ নববর্ষ পরি”
প্রত্যেকটি বিশেষদিনে সবার প্রথমে মেয়েকে শুভেচ্ছা জানাতে ভুল হয়না মিসেস মিনা রহমানের। একটি মাত্র মেয়ে। পরির মতো সুন্দর। ঠিক যেনো মায়ের মতো হয়েছে মেয়েটি। তাই মা ছোটোবেলা থেকেই মেয়েকে পরি বলে ডাকে। বীরাঙ্গনার সন্তান বলে বাবার আদর কপালে জুটেনি। কিন্তু বাবার অভাব কখনো বুঝতে দেয়নি মা। বুকে আগলে রেখে বড় করেছে।
সুপালির জন্মের আগেই স্বামী আব্দুর রহমান তাকে ছেড়ে চলে যায়। কোনো এক অজানা শংকায় সুপালির নানা-নানি লুকিয়েছিলো বীরাঙ্গনার ইতিহাস। কিন্তু বিয়ের দু’বছরের মাথায় সেটি জানতে পেরে স্ত্রীকে ছেড়ে চলে যান আব্দুর রহমান।
আজ ২১ বছর পার হওয়ার পরেও তার খবর নেওয়া দূরে থাক মেয়ের খবর নিতেও প্রয়োজনবোধ করেন নি আব্দুর রহমান। মিনা রহমানের তাতে বিন্দু মাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। মেয়েকে বুকে নিয়ে অনেক ভালো আছেন তিনি।
পিছনদিকে ফিরে একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে মা’কে জড়িয়ে ধরলো সুপালি।
-শুভ নববর্ষ মা।
-কখন বেরুবি তোরা?
-এইতো মা এক্ষুনি।
-এক্ষুনি! নাস্তা করবিনা!
_না মা। বান্ধবিরা সবাই মিলে বাইরে পান্তা-ইলিশ খেতে যাবো। প্লিজ মা রাগ করোনা।
মেয়ের আবদার কখনই ফেলতে পারেন না মিনা রহমান। তাই এবারো কিছু বললেন না। অনার্স ২য় বর্ষের ছাত্রী সুপালি। তাও আব্দারের বেলায় যেনো মায়ের কাছে এখনো সেই ছোট্টটিই আছে।
বৈশাখীর সাঁজে অপূর্ব লাগছে সুপালিকে। এ যেনো পরিদেরও হার মানিয়ে ছাড়বে। মা কপালে একটা আলতো চুমু খেলেন।
-মা আমার মেইকাপ তো নষ্ট করে ফেলবে! এভাবে চুমু খেওনা তো!
-ঠিক আছে যা। এখন আমার আদর থেকে তোর কাছে মেইকাপ বড় হয়ে গেলো! যা আরেকবার আমার কাছে আদর চেয়ে দেখিস পাস কি...
সুপালি মাকে জরিয়ে ধরে বললো,
-অমনি রাগ! মা তুমি আজকাল আমার দুস্টুমিটাও ধরতে পারোনা! তোমার থেকে বড় আমার কাছে যে আর কিছুই নেই মা। আমি তো শুধু একটু দুস্টুমি করলাম।
চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিল সুপালি মাকে।
-হয়েছে হয়েছে থাক। আর আদর দেখাতে হবেনা। এবার বেরও নাহয়। ওরা এতোক্ষনে হয়তো এসে গেছে।
-এই যাহ! সত্যিই তো বেশ দেরি হয়ে গেলো। আমি তাহলে যাই মা।
-যাই না, বল আসি।
-আচ্ছা বাবা আসছি আমি।
-সাবধানে থাকিস মা।
-ঠিক আছে একদম ভেবোনা তুমি। তুমিও সাবধানে থেকো। খেয়ে নিও, আমার জন্য আবার বসে থেকো না। আমার ফিরতে একটু দেরি হবে। বেশিনা কিন্তু, একটু দেরি হবে।
মেয়ের এসব দুস্টুমি বড় ভালো লাগে মিনা রহমানের। মেয়ের গমন পথে পলকহীন দৃস্টিতে তাকিয়ে রইলেন তিনি। দেখতে দেখতে কতো বড় হয়ে গেছে মেয়েটি। মেয়ের বয়সের সাথে সাথে তার দুশ্চিন্তাও যেনো বেড়ে চলেছে ক্রমাগত। মেয়েটিকে উপযুক্ত পাত্রের হাতে তুলে দিয়ে তবেই নিশ্চিন্ত হবেন তিনি। বাবার দায়িত্ব তো তাকেই পালন করতে হবে। বাবা তো থেকেও নেই।

২.
ঘুম থেকে উঠেই মুখটা বাংলার পাঁচের মতো করে রেখেছে অভিজিৎ। সুপালির ভাবনায় হাবুডুবু খাচ্ছে ভাবনার সাগরে। আজ শুধু বছরের প্রথম দিন-ই নয় আজ ওর আর সুপালির বন্ধুত্বের ১ বছর হয়ে গেছে। গত বছরের এই দিনটাতে ওদের বন্ধুত্ব হয়েছিলো। অথচ মেয়েটি একটা বার শুভেচ্ছা জানানো তো দূরে থাক কাল রাত থেকে ফোনই ধরছেনা।
মনে মনে সুপালিকে বেশ পছন্দ করে অভিজিৎ। কিন্তু কখনো বলতে পারেনি। ধর্ম আর সমাজের কাছে বাঁধা পড়ে রয়েছে তার অনিভুতিগুলো। কে জানে সুপালি কি ভাবে তার সম্পর্কে। শুধুই বন্ধু নাকি…
-কিরে এই সকাল সকাল মুখটা পেঁচার মতো করে কি এতো ভাবছিস! বছরের প্রথম দিন, সকাল সকাল উঠে ঠাকুরের আশীর্বাদ নিবি তা নয় বসে বসে রাজ্যের চিন্তা ভাবনায় মগ্ন হয়ে আছিস! কি হয়েছে রে তোর?
মায়ের কথায় বাস্তবে ফিরে এলো অভিজিৎ। মায়ের দিকে ফিরে মিষ্টি হেসে বললো,
-হ্যাপি নিউ ইয়ার মা।
মা অনন্যা রায় বিস্ফোরিত চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
-কি বললি তুই!
রুমে ঢুকতে ঢুকতে অভিজিৎ এর বাবা অমরেশ রায় বললেন,
-কি আবার বলবে, এ যুগের ছেলে মেয়েরা তো সংস্কার সংস্কৃতি সব লাটে উঠিয়ে রেখছে। তাই আজকের দিনেও...
-সরি বাবা সরি। আই মিন আমি খুবই দুঃখিত। শুভ নববর্ষ আমার শ্রদ্ধেয় বাবা এবং মা। তোমাদের দুজনকে নববর্ষের অনেক অনেক শুভেচ্ছা।
কথাটা বলেই বিছানা থেকে উঠে গিয়ে বাবা-মাকে জড়িয়ে ধরলো অভিজিৎ।
বাবা-মাও হাসি মুখে ছেলেকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানালেন।
-হয়েছে এবার যা হাত মুখ ধুরে আয় আমি পান্তা-ইলিশ করেছি, খাবি।
কথাটি বলে অভিজিৎ এর বিছানা গোছানোর কাজে হাত লাগালেন অনন্যা রায়। অভিজিৎ চলে গেলো ফ্রেশ হতে। বিছানা গোছাতে গোছাতে ছেলের পাগলামির কথা ভেবে ভেবে মুচকি হাসছিলেন অনন্যা রায়। তার হাসিতে ভাটা পড়লো ছেলের ফোনের শব্দে। সুপালির নাম ভাসছে মোবাইলের স্ক্রিনে। কপাল কুচকে তাকিয়ে রইলেন ফোনের ডিসপ্লের দিকে। তার ধারনা ছেলের মনের অলি-গলিরও খবর জানেন তিনি। ছেলে যে সুপালির জন্য কিছুটা দুর্বল সেটি তিনি খুব ভালো ভাবেই বুঝতে পারেন। তিনি সেটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেন না। একটি ভিন্ন ধর্মী মেয়েকে তিনি কোনো ভাবেই ছেলের বউ করে আনবেন না।
-কার ফোন মা?
ছেলের দিকে ফোনটা এগিয়ে দিয়ে সরু চোখে তাকিয়ে বললেন,
-কতোদিন বলেছি সুপালির সাথে মিশবিনা! ওকে আমার ভালো লাগেনা।
-কেনো মা? ও তো অনেক ভালো একটা মেয়ে।
-ভালো না ছাই। যা বলেছি তাই করবি, এতো বুঝতে যাস কেনো!
-মা ও আমার সব থেকে ভালো বন্ধু।
-দু দিনের পরিচয়ে সব থেকে ভালো বন্ধু হয়না কেউ।
-ভূল বললে মা। মানুষ ঠিকভাবে চিনতে পারলে ২ দিন কি ২ মিনিটেই চেনা যায়। আর ওর সাথে তো আমার ১ বছর ধরে পরিচয়।
-তোকে আমার বাবা এসেও বোঝাতে পারবেনা। কিন্তু আমার কথার মর্ম একদিন ঠিক বুঝবি।
-আচ্ছা বাবা বুঝবো যাও এবার খুশিতো? এবার কি আমার খাবারটা পাবো জননী? বড্ড খিদে পেয়েছে।
সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে খাবার বাড়তে চলে গেলেন অনন্যা রায়।
সুপালির নামের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো অভিজিৎ। একটা ফোন কি সুন্দর করে মনের সব রাগ যেমন জলের মতো ধুয়ে দিলো!
-কি রে! তখন থেকে ফন দিচ্ছি কোনো হদিস-ই নেই তোর! কথায় গিয়ে মরেছিলি!
-বাথরুমে।
-যাহ বাবা! এত যায়গা থাকতে বাথরুমে কেনো বাপু! জায়গার অভাব আমাকে বলতি আমি ঠিক করে দিতাম জায়গা।
-বাজে কথা বলিসনা। তোর সাথে আমার কোনো কথা নেই।
-কেনো রে! আমি তোর কোন গোয়ালে আগুন দিয়েছি!
-মনের গোয়ালে।
-তাই! তা কটা গরু ক্ষতিগ্রস্ত হলো আপনার!
-আমার গোয়ালে আমি ওই একটাই গরু। নইলে তোর সাথে বন্ধুত্ব করি!
-সেটাই তো! এতো দিন পর নিজেকে চিনতে পেরেছিস জেনে ভিষন ভালো লাগছে। যাক ছাড় এসব কথা। জলদি জলদি চলে আয় তো তোর জন্য পান্তা-ইলিশ নিয়ে বসে আছি।
-না আমি আসতে পারবোনা।
-বাজে কথা রেখে জলদি জলদি আয়। রমনা তে আছি। আমার ভিষন খিদে পেয়েছে। তুই আসলে একসাথে খাবো। রাখলাম বাই।
বলেই ফোন কেটে দিলো সুপালি।

৩.
-মা আমি গেলাম।
-গেলাম মানে! কোথায় যাচ্ছিস? খাবিনা??
-সরি মা, একটা জরুরি কাজ পড়ে গেছে। তুমি তুলে রেখে দাও আমি এসে খাবো এই নববর্ষের দিব্যি করে বলছি।
-যা খুশি কর যা আমাকে কিছু বলতে আসিস না।
-মা প্লিজ লক্ষি মা আমাকে অনেক জরুরী কাজে বেরুতে হচ্ছে। আমি এসে খাবো মা সত্যি বলছি।
-ঠিক আছে ঠিক আছে যা।
-একটু হাসো তাহলে। তোমার হাসি মুখ দেখে বেরুলে আমার দিন ভালো যায়।
-হয়েছে আর মাকে ভালোবাসা দেখাতে হবেনা যে কাজে যাচ্ছিস যা, জলদি ফিরে আসিস। সাবধানে যা।
-এইতো মা যাবো আর আসবো। যাই তাহলে?
-যা, দুজ্ঞা দুজ্ঞা।

৪.
“এসো হে বৈশাখ, এসো এসো” গানে চারিদিক মুখোরিত। সুপালি আর তার বান্ধবিরা বসে একটার পর একটা বসে ছবি তুলছে। পিছন্ দিক থেকে এসে আলতো একটা ধাক্কা দিলো সুপালিকে অভিজিৎ।
-যাহ দিলি তো ছবিটা নষ্ট করে!
-বেশ করেছি। তুই বন্ধু নামের কলঙ্ক।
বলেই মুখটা বাঁকা করলো অভিজিৎ।
-তাহলে গিফট টা ফেরত দিয়ে আসি।
-মানে! কিসের গিফট!
-ওমা আজ না তোর আমার বিবাহ বার্ষিকী!
-হলে তো ভালই হতো ।(নিচু স্বরে)
-কিছু বললি?
-না না কিছু না দে দে গিফট দে।
-না আগে উইশ কর তারপর খাওয়াবি তারপর গিফট পাবি।
-খাওয়াবো মানে! আমি কেনো খাওয়াবো!
-আজকের দিনটা কিপ্টামি করিস না। না খাওয়ালে গিফট পাবিনা।
-বেশ বেশ এই গিফটের জন্য আমি যে কোনো কিছু করতে পারি।
-তাই! কানে ধরে উঠবস কর। বেশি না। আড়াই বার করলেই হবে।
-আড়াইবার! কিভাবে!
-ওইতো বসবি-উঠবি, আবার বসবি-উঠবি, এরপর বসবি। আড়াই মিনিট বসে থাকবি। ব্যস হয়ে গেলো।
-তুই পারিস ও বটে।
-হয়েছে হয়েছে এবার চল তো, পরে তোকে শাস্তি দেওয়া যাবে। এখন অনেক ক্ষিদে পেয়েছে, চল খাবো।
বলেই ওরা চললো খাওয়ার উদ্দেশ্যে।
সারাদিন হৈ-হুল্লোর করে খাওয়া-দাওয়া করে অনেকগুলো ছবি তুললো। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। এবার ফেরার পালা। মাকে একটু সময়ের কথা বলে বের হয়েছিলো অভিজিৎ। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে। আসলে সুপালির সাথে থাকলে কোনদিক দিয়ে যে সময় চলে যায় সেটি বুঝতেই পারেনা অভিজিৎ। তবুও সুপালিকে বাসায় পৌছে দেওয়ার প্রস্তুতি নিতেই সুপালি তার মনের ভাব বোঝে বললো,
-তুই এবার বাড়ি যা। আন্টি অনেক রাগ করে আছে হয়তো।
-না না তোকে একা যেতে দেই কি করে! তোর বান্ধবিদের বাসা তো কাছেই, তোর বাসা তো অনেক দূর।
-আমি কি ছোট বাচ্চা নাকি, যে হারিয়ে যাবো!
-ছোট বাচ্চা কোনো কথা না, অনেক ভীর আজ, ভগবান না করুক খারাপ কিছু হয়ে গেলে!
-ধুর! কি হবে! যা তো তুই। তা ছাড়া আমি বুঝি যে আন্টি আমাকে ঠিক পছন্দ করেন না। জানিনা কেনো কিন্তু আন্টির কথা বার্তায় মনে হয় তিনি চান না তুই আমার সাথে মিশিস।
-কে বলেছে তোকে! যতো সব বাজে কথা। চল তো যাই।
-না না বললাম তো আমি যেতে পারবো, তুই যা তো প্লিজ।
-তোর সাথে কখনই পারিনা বাপু।
-পারতে হবেনা যা।
-ঠিক আছে, সাবধানে যাস। বাসায় যেয়ে আমাকে জানাবি কিন্তু।
-ঠিক আছে জানাবো।
-বাই।
অভিজিৎ যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই সুপালি বলে উঠলো,
-হুম, গিফট টা তাহলে ফেরতই দিয়ে দিবো।
কথাটা শুনেই অভিজিৎ পিছনে ফিরে বললো,
-দে দে দে জলদি দে, কিভাবে যে ভুলে চলে যাচ্ছিলাম!
হাসি মুখে ব্যাগ থেকে একটা খাম বের করে দিলো সুপালি। খামের উপর একটা তাজা লাল গোলাপ। দেখে খুব খুশি হলো অভিজিৎ। তারপর অপরাধীর মতো মুখ করে বললো,
-তোর জন্য যে কিছু আনা হয়নি রে। রাগের মাথায় বেমালুম ভুলে গেছি। আচ্ছা বল তুই কি চাস, কাল দিবো তোকে।
-সত্যিই আমি যা চাইবো দিতে পারবি?
-নিশ্চই! বলেই দেখ না বাবা।
-ঠিক আছে। যদি সত্যিই কিছু দিতে চাস তো আমি যা দিয়েছি তাই আমাকে দিবি।
-কি দিয়েছিস তুই দেখি।
-না বাসায় যেয়ে দেখবি। যখন সবাই ঘুমিয়ে যাবে তখন দেখবি চুপি চুপি।
-ঠিক আছে তাই হবে।
অজানা এক আনন্দে নেচে উঠলো অভিজিৎ এর মন। তারপর বিদায় নিয়ে নিজের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিল সে।

৫.
রাত ৯:২০ মিনিট। খাবার টেবিলে মাত্র বসেছে অভিজিৎ। তখনই ফোনের শব্দ কানে এলো তার। উঠতে যেতেই মা রেগে বাঁধা দিয়ে বললো,
-একদম উঠবিনা। সকালেও খাবার রেখে চলে গেছিস। এখন আগে খাবি এরপর তোর রাজ্যের সব কাজ করবি।
-মা ফোনটা নিয়ে আসি। কোথাও তো যাচ্ছি না। খাবো তো মা।
-না তা হবেনা। ফোন আসুক না ঘূর্ণিঝড় আসুক, আগে তুই খাওয়া শেষ করবি তারপর সব কিছু।
অনিচ্ছা স্বত্তেও খেতে বসতে হলো অভিজিৎকে। কিন্তু ফোন ক্রমাগত বেজেই চলেছে। এবার অভিজিৎ করুণ চোখে তাকিয়ে বললো,
-মা, নিশ্চই কোনো জরুরী ফোন হবে। প্লিজ মা একটা বার দেখতে দাও।
-ঠিক আছে তুই খা, আমি নিয়ে আসছি।
বলেই মা উঠে চলে গেলো ফোন আনতে। অভিজিৎ মনে মনে ভাবতে লাগলো,
-কে এতোবার কল করতে পারে আমাকে! সুপালি নয়তো! মা’কে পাঠানো উচিৎ হয়নি। সুপালি হলে মা আবার রেগে যাবে।
ফোনটা অভিজিৎ এর দিকে এগিয়ে দিলেন অনন্যা রায়। অচেনা একটা নাম্বার থেকে ৭ বার কল এসেছে তার ফোনে। অভিজিৎ ভাবতে লাগলো কে হতে পারে! ছেলের চিন্তিত মুখ দেখে অনন্যা রায় বললেন,
-কার ফোন রে অভি?
-জানিনা মা। দেখি ফোন দিয়ে...
অভিজিৎ এর কথা শেষ হতে না হতেই আবার ফোন আসলো ওই নাম্বারটি থেকে। অভিজিৎ ফোনটা ধরে হ্যালো বলার পর অপাশের কথা শোনে ফোনটা টেবিলে রেখে মাটির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
-কি রে কার ফোন ছিলো?
অনন্যা রায় ভয়ার্ত স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন। মায়ের দিকে একবার তাকিয়ে এক লাফেই উঠে দাড়ালো অভিজিৎ।
-মা আমাকে যেতে হবে।
-কোথায়!
-হাসপাতালে।
বলেই অভিজিৎ দৌড়ে বেড়িয়ে গেলো। মা পিছু ডাকতে লাগলো কিন্ত অভিজিৎ-এর যেনো আর ফিরে তাকানোরও সময় নেই।

৬.
-সুপালি, এই সুপালি, শুনতে পাচ্ছিস?
অভিজিৎ এর মৃদু ডাকে সুপালি আস্তে আস্তে চোখ মেলে তাকালো। অভিজিৎকে দেখতে পেয়েই তাকে জড়িয়ে ধরে হাউ-মাউ করে কাঁদতে শুরু করে দিলো সুপালি। আর চিৎকার করে বললো,
-ওরা আমাকে সুন্দরভাবে বাঁচতে দিলো না রে অভি। ওরা আমার সব স্বপ্ন নিমিষেই শেষ করে দিলো।
অভিজিৎ কি বলে শান্তনা দিবে সুপালিকে বোঝে উঠতে পারলো না, ওর ও যে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। ওকে তো শক্ত থাকতে হবে সুপালির সম্মুখে, দুর্বল হলে চলবে কিভাবে! দাঁতে দাঁত চেপে কান্না আটকনোর বৃথা চেষ্টা করে যাচ্ছে ও, তবুও আঁখির নোনা জল কি এতো সহজে বাঁধ মানে!
সুপালিকে শান্ত করে শুইয়ে দিয়ে উঠে দাড়ালো অভিজিৎ। বাইরে বেরিয়ে দেখলো দু’টো লোক বসে আছে যারা সুপালিকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে এবং উনারাই অভিজিৎ কে তখন ফোন করে খবরটি জানিয়েছিলো।
-আমরা উনার ফোনে আপনার নাম ডায়ালে বেশি দেখেই আপনাকে ফোন দিলাম। উনার মায়ের নাম্বার ও ছিলো, কিন্তু ভাবলাম মেয়ের এই অবস্থা দেখে উনি...
-কি করে হলো?
লোক দুজনকে কথা শেষ করতে না দিয়েই অশ্রু চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো অভিজিৎ।
-তা তো জানিনা। আমরা উনাকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে নিয়ে এসেছি। ডাক্তার পুলিশ কে জানিয়েছেন, আমাদের তো তাতে বাঁধা দেওয়ার উপায় নেই বলুন।
অভিজিৎকে কিছু না বলে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে লোক দু’জনের মাঝে একজন বলে উঠলো,
-আমরা তাহলে এবার যাই। আমরা কোনো পুলিশি ঝামেলায় পড়তে চাইছিনা।
-জি আপনারা আসুন, অনেক কষ্ট করেছেন। সেজন্য আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ।
কথার প্রতিউত্তর না শোনেই অভিজিৎ সুপালির কেবিনে ফিরে চলে গেলো।

৭.
সন্ধাবেলা বান্ধবীদের বিদায় করে দিয়ে একা বাসায় ফিরছিলো সুপালি। ভীরের মাঝে লক্ষ্য করলো কিছু ছেলে ওকে বার বার বিরক্ত করছে, ধাক্কা-ধাক্কি করছে। ও কোনো ভাবেই তাদের থেকে সরে যেতে পারছিল না। তারপর সুপালি কোনো রকমে একটা বাসে উঠে গেলো বাসার উদ্যেশে। কিন্তু পরক্ষণেই খেয়াল করলো ছেলেগুলোও একই বাসে উঠে গেলো ওর পিছু পিছু। বাসে আরো অনেকগুলো ছেলে ছিলো। বাস চলতে শুরু করার কিছু সময় পরেই একটি ছেলে আচমকা একটি রুমাল দিয়ে সুপালির নাক-মুখ চেপে ধরলো। সাথে সাথেই সুপালি জ্ঞান হারালো।
জ্ঞান ফেরার পর সুপালি নিজেকে আবিস্কার করলো রাস্তার পাশে অর্ধনগ্ন অবস্থায়। চারিদিকে উৎসুক জনতার ভীর। তখন দু’জন লোক তাকে এসে তুললো। সুপালি উনাদের মুখে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আলোচনা করতে শুনলো। সুপালি কিছু বোঝে উঠার আগেই আবার জ্ঞান হারালো। পরবর্তীতে জ্ঞান ফিরলো হাসপাতালে অভিজিৎ এর ডাকে।

৮.
সবকিছুই যেনো স্বপ্প মনে হচ্ছে সুপালির কাছে। কি থেকে কি হয়ে গেলো। কি হবে এখন তার জীবনের!
সুপালির ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটলো মিনা রমানের ডাকে। এসে বসলেন তিনি সুপালির কাছে। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। মাকে দেখে আবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো সুপালি।
-কেনো এমন হলো মা! কেনো! তোমার জীবনের পুনরাবৃত্তি আবার আমার জীবন দ্বারা হল মা। সবাই তোমাকে বীরাঙ্গনা বলে সম্বোধন করে, কিন্তু আমাকে তো ধর্ষিতা ছাড়া আর কিছুই বলবেনা। সমাজে আমার আর কোনো জায়গা নেই মা, কোনো জায়গা নেই।
এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বলে গেলো সুপালি। কান্নার জন্য বার বার কেঁপে কেঁপে উঠছিলো সে। মিসেস মিনা রহমানের দু’চোখ বেয়ে নোনা জলের অঝর ধারা নামছে। কিন্তু মুখ দিয়ে একটা কথাও বেরুচ্ছেনা যেনো তার। কি করবেন তিনি এখন এই মেয়েটাকে নিয়ে। এই নিষ্টুর সমাজ কি ভালো থাকতে দিবে তার এই ফুলের মতো নিষ্পাপ মেয়েটিকে!

৯.
রাত ২:৩০ মিনিট
অভিজিৎ বাসায় ফিরলো। অনেক ক্লান্ত লাগছে তার। চারিদিক কেমন শূন্য শূন্য লাগছে। অভিজিৎ বাসায় ঢোকার পর দরজা লাগাতে লাগাতে মা বললো,
-কি রে তুই কোথায় ছিলি? এতো দেরী করে ফিরলি যে! জানিস কতো চিন্তা করছিলাম! ফোন ধরছিলি না কেনো!
-মা আমার বড্ড ক্লান্ত লাগছে। আমি একটু ঘুমাবো। সকালে উঠে তোমাকে আমি সব বলবো মা।
বলেই অভিজিৎ নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালো। নিজের ঘরে যাওয়ার পর ওর চোখ পড়লো সুপালির দেওয়া গিফটের খামটার দিকে। ধীরে ধিরে সেটি হাতে তুলে নিলো অভিজিৎ। তারপর খামটি খুললো। ভিতরে একটি চিরকুট। চিঠিটা থেকে সেই পারফিউমের গন্ধ বেরুচ্ছে, যেটি সুপালি সবসময় ব্যবহার করে, ওর সবথেকে প্রিয় পারফিউম। কিন্তু অভিজিৎ সবসময় নাক কুঁচকে বলতো “কি বিচ্ছিরী গন্ধ ইস!”। তাই অভিজিৎ কে ক্ষেপানোর জন্য সুপালি আরো বেশি বেশি ব্যবহার করতো সেটি। কিন্তু মনে মনে অভিজিৎ এর ও খুব ভালো লাগতো গন্ধটা, কিন্তু কখনো প্রকাশ করতনা সে।
গন্ধটা পেয়ে বুকের ভিতরটা কেমন জানি করে ঊঠলো অভিজিৎ এর। আস্তে আস্তে চিঠিটা খুলতে লাগলো সে। চিঠিটা পড়ার আগে মনে হলো বুকের ভিতর কে জানি হাতুরিপেটা করছে ওর।
নিজের একটা ছবি প্রিন্ট করে দিয়েছে সুপালি একটা কাগজে। ছবিটির নিচে লেখা,
“জানি অনেক বাধা-বিপত্তি আছে। তবুও ওতো কিছু বুঝিও না, মানিও না। ছবির মেয়েটাকে তোকে গিফট হিসেবে দিয়ে দিলাম। পছন্দ হলে নিস, না হলে ফেরত দিয়ে দিস।”
বুক ফেটে কান্না আসছে অভিজিৎ এর। যে কথাটা ভয়ে কোনোদিনো বলেনি সে সুপালিকে পাছে বন্ধুত্বটা হারিয়ে ফেলে। সেই কথাটাই সুপালি কি সুন্দর করে গুছিয়ে নিজে থেকে বলে দিলো! মেয়েটা পারেও বটে।

১০.
পুলিশ সকালে এসে সুপালির পুরো ঘটনা শুনে তাকে আশ্বাস দিয়ে গেলো যে তারা অপরাধীদের অবশ্যই উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করবে।
পুলিশ যাওয়ার পর থেকেই সুপালির মাথায় একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে অভিজিৎ কি তার চিরকুটটা পড়েছে? কি ভাবছে অভিজিৎ? যা চেয়েছিল সুপালি, সেটি তো আর কোনোভাবেই সম্ভব হবেনা, মাঝ থেকে ওদের বন্ধুত্ব না নষ্ট হয়ে যায়।
-কি ভাবছিস মা?
মায়ের কথায় ভাবনার জগত থেকে ফিরে এলো সুপালি। বললো,
-মা, আমাকে আর কেউ কখনো ভালোবাসবে না তাইনা মা?
-কি বলছিস মা! কেনো ভালোবাসবে না! তুই তো কোনো অন্যায় করিসনি।
-মিথ্যে শান্তনা দিওনা মা। এই সমাজের চোখে আমি এখন…
-চুপ কর মা, চুপ কর। কারো ভালবাসা লাগবে না তোর জীবনে। আমি আছি তো। আমি তোকে অনেক ভালোবাসি। আর কারো ভালোবাসা চাইনা, কারো না।
-আমারো না?
অভিজিৎ এর কথায় চমকে উঠলো সুপালি এবং মিনা রহমান। মিনা রহমান গলায় উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,
-মানে?
-আপনার যদি কোনো আপত্তি না থাকে আমি সুপালির হাত সারা জীবনের জন্য ধরতে চাই।
-কি বলছ বাবা তুমি! ভেবে বলছো! একে তুমি ভিন্ন ধর্মী তার উপর সুপালি... তোমার পরিবার, সমাজ কেউ মানবে না বাবা।
-এত কিছু আমি বুঝিনা। সমাজকে আমি তোয়াক্কা করিনা। আমার জীবন আমি যেভাবে চাইবো সেভাবে এগিয়ে যাবে, যার সাথে চাইব তার সাথে জীবন কাটাবো। এতে সমাজ কেনো বাঁধা দিবে! সমাজ আমাকে খায় না পরায়!
-এভাবে বলোনা বাবা। সমাজের একটা নিয়ম-কানুন আছে। তাছাড়া তোমার পরিবার...
-আমার ভালোবাসার কাছে সব মূল্যহীন। একটি সন্ধ্যার দোহাই দিয়ে আমি আমার এতোদিনের ভালোবাসাকে ভুলে যেতে পারিনা! আমি ভেঙ্গে দিতে পারিনা আমার আর সুপালির স্বপ্নগুলো। সেই সাহস বা শক্তি কোনোটাই আমার নেই। আর পরিবারের কথা বলছেন! জানি এদিক থেকে আমাকে কাঠ-খড় পোহাতে হবে। সে হউক। ভালোবাসার জন্য আমি সব পারি, সব। তাছাড়া আপনারা কেনো এতো ভাবছেন বলুনতো! একটি সন্ধার জন্য আমার সুপালি কি ফেলনা হয়ে গেছে নাকি! এতে তো ওর কোনো দোষ ছিলোনা!
অভিজিৎ এর কথা শুনে মিনা রহমানের দু’চোখ জলে ভরে উঠলো। তিনি কখনই চান না তার মতো কষ্ট তার মেয়েও পাক। তাই অভিজিৎ এর কথা শুনে মনের কোনো এক কোনায় যেনো এক ফোঁটা সুখের খোঁজ পেলেন তিনি।
মিনা রহমানের চোখে পানি দেখে অভিজিৎ সেটি মুছে দিতে দিতে বললো,
-এই নোনা জলের পুনরাবৃত্তি আমি কখনই হতে দিবোনা। কক্ষনো না।
তারপর সে সুপালির পাশে গিয়ে বসলো। দু’হাতে সুপালির মুখটা আলতো করে ধরে বললো,
-কি রে তোর গিফট নিবিনা? নাকি ফেরত দিয়ে দিবো!
সুপালি অভিজিৎ কে জড়িয়ে ধরে বললো,
-বেস্ট গিফট ফরএভার...



আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন