বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ মে ১৯৯২
গল্প/কবিতা: ১টি

গল্প - স্বপ্ন (জানুয়ারী ২০১৮)

আজো স্বপ্ন দেখে

Ms Ahmad
comment ৪  favorite ০  import_contacts ৬৩
রফিক নিজের বিছানায় জড় বস্তুর মতো পড়ে থাকে। তার বিছানাটি বেশাবেশি আরাম দায়ক। এ বিছানায় শুলে আর উঠতে মন চায় না। রফিক ঠিকমতো উঠতে পারেনা। লেখা-পড়াতেও ক্ষতি হয়। ঠিকমতো ক্লাসে উপস্থিত হতে পারেনা। কখনো কখনো অনেক দেরীতে ঘুম ভাঙ্গে। তখন যথা সময়ে ক্লাসে উপস্থিত হতে পারে না। অনেকবার বকাও খেতে হয়েছে স্যারদের কাছ থেকে। তাছাড়া, শরীরের জন্যও ক্ষতিকর। সকালের নাস্তাটা ঠিক সময় করা হয়না। কখনো কখনো করা হয়ই না। সার্বিকদিক বিবেচনা করে কয়েকদিন আগে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো বিছানাটি পরিবর্তন করার। কিন্তু, তা হয়নি। তার বিল্ডিংয়ে ব্যাচালার ছেলেরাই থাকে। অন্যান্ন রুমে দুই/তিনজন করে থাকে। রফিক তার রুমে একাই থাকে। সে লেখা-পড়াতে খুব ভালো ও মনোযোগী। তার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ সকল পরিক্ষায় কোনো ব্যর্থতার ছোঁয়া নাই। লেখা-পড়াতে খু-ব সচেতন। কখনো কখনো তাকে ভূতে ধরে মনে হয়। সব কিছু ছেড়ে পড়া-লেখায় এমনভাবে লিপ্ত হয় যা, তার বন্ধুদের চিন্তায় ফেলে দেয়। আরামের বিছানা ছেড়ে টেবিল আর ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকে। বই-খাতা টেবিল ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। খাওয়া-গোসল ছেড়ে দেয়। বন্ধুরা তাকে গোসল করতে বাধ্য করে। খাওয়ার খোজ-খবর নেয়। সে অসংখ্য বই পড়েছে ও পড়ছে। বন্ধুরা তাকে বই খেকো বলে ডাকে। এমন লেখক কমই আছে যার বই সে পড়েনি। পলিটিক্সে মন নেই। সে বলে, আমাদের দেশের পলিটিকাল পরিবেশ নোংরা। প্রেম-ভালোবাসায়ও অমনোযোগী। রফিক খুব লাকি ছেলে। স্যাররা তাকে অতিরিক্ত ¯স্নেহ করে। বন্ধুরা সীমাহীন ভালোবাসে। তার চেহারায় অদ্ভুত ধরনের আকর্ষণ শক্তি রয়েছে। তাকে যে দেখে, সেই তার বন্ধু হয়ে যায়। বেশা-বেশি মায়াবি চেহারার অধিকারি। কথাগুলোও মিষ্টিমাখা। শুনতেই মন চায়। কথাও বলে গুছিয়ে গুছিয়ে। তার কোনো শত্রুর হদিস পাওয়া যায় না। রফিক এক আশ্চর্য ধরনের মানুষ। সে কখন কি সিদ্ধান্ত নেয় তার খবর সে নিজেও ধরতে পারে না। রাতে এক রকম সকালে অন্যরকম ধরনের মানুষ সে। তার পড়া-লেখার খরচের চিন্তা করতে হয়না। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সে ভাতা পায়। যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ভাতার আবেদন করেছে, তার সবগুলো থেকে সে ভাতা পায়। ভাতার টাকা বই ক্রয়ে ও বন্ধুদের নিয়ে খরচ করে। কয়েক বন্ধুর খরচ সে অশংকোচে দিয়ে থাকে। বাড়িতেও কিছু পাঠায়।
বিছানা পরিবর্তন না করার একটি যুক্তি তার মাথায় এসে হাজির হয়। যার পরিণামে সে নিজের সিদ্ধান্ত পাল্টিয়ে ফেলে। যুক্তিটি তার কাছে তার জীবনের সেরা যুক্তি মনে হয়েছে। এরকম কিছু যুক্তি কিছুদিন পর পর হাতের কাছে ধরা দিলে জীবনকে খুব সহজেই বদলে দেয়া সম্ভব।
রফিকের স্পর্শকাতর একটি অভ্যাস আছে। সে স্বপ্ন দেখে। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখে দেখে এ পর্যন্ত এসেছে। সে মনে করে, তার এ পর্যন্ত আসার পেছনে একমাত্র অবদান তার স্বপ্ন। স্বপ্ন না দেখলে তার জীবনের গতি আজ জিরোতে থাকতো। কিছুই অর্জন করতে পারত না জীবনে। না কিছু হতে পারত। থমকে যেত তার জীবনরে চাকা। তাই স্বপ্ন দেখা তার কর্তব্য। স্বপ্ন তার রক্তের অনু-পরমাণুতে মিশে আছে। তবে রফিকের একটি ভয়ঙ্কর গুণ হলো, স্বপ্ন পূরণের বাতিক। সে তার দেখা সব স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত করতে চায়। সে তার দেখা যৌক্তিক অধিকাংশ স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত করে দেখিয়েছে। এজন্য তার মাঝে স্বপ্ন পূরণের আশা গভীরভাবে প্রোথিত।
রফিক তার স্বপ্নগুলো পূরণ করার ক্ষেত্রে কখনো কখনো সমস্যার মুখে পড়েছে। অধিকাংশ বাধা উতরিয়ে যেতে সক্ষমও হয়েছে। হাতে গনা কয়েকটি যৌক্তিক স্বপ্ন বাধার কারনে উতরাতে পারেনি। তখন নিজের স্বপ্ন পূরণ না করতে পেরে খুবই হাতশ হতো। কখনো কখনো নিজের রুমে বা নির্জনে বসে মনে মনে কাঁদতো। কয়েকবার নয়নও মনের সাথে ক্রন্দনে যোগ দিয়েছে। নিজেকে ধিক্কার-ভর্ৎসনা দিত, ব্যর্থ হওয়ার কারনে। অপ্রাণ চেষ্টা করতো বাধা পেরিয়ে যেতে। এজন্য কয়েক বার কঠিন বিপদের সাক্ষাত পেয়েছে। যখন বিপদের মেকাবেলা করতে পারেনি, তখনই সে স্বপ্ন পূরণের হাল ছেড়েছে। কিন্তু ততক্ষণে তার অবস্থা কাহিল। বন্ধুরা তার এ ভয়ঙ্কর অভ্যাসের কথা জানে। এ জন্য তার বন্ধুদের অনেকেই তাকে স্বপ্ন পূরণের এ অভ্যাস থেকে ফিরে আসার অনুরোধ করেছে। কোনো কাজ হয়নি। অনেকেই বলেছে, দেখ রফিক! এ অভ্যাস তোকে একদিন চরম ও ভয়ঙ্কর বিপদে ফেলে দিবে। তখন তো তুই নিজের অস্তিত্ব খুইতে বসবি। তাদের কথা শুনে রফিক হেসে উড়িয়ে দিতো। বলতো, দেখ বন্ধু! আমি আমার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পিছনে যে কষ্ট,পরিশ্রম, ত্যাগ ও ছাড় দিয়েছি। তাতে আমি একরকম গন্ডারের চামড়ার মতো শক্ত হয়ে গেছি। এজন্য সাধারণ বিপদ সহজেই পার হতে পারবো। একটি কথা সত্য, কোনো কোনো স্বপ্ন আমাকে অনেক ভুগিয়েছে। রফিক কিছুক্ষণ সময় চুপ থেকে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলে, দোস্ত! আমিও ভাবি, একদিন স্বপ্ন নিয়ে ভয়ঙ্কর বিপদের সাক্ষাত পাবো। এজন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত রয়েছি এখন থেকেই। দোয়া করিছ, আমার জন্য।
একদিন রফিক তার বন্ধুদেরকে করুন মুখে কাদো কাদো সুরে বললো। দোস্ত! আমি অনেক বার ভেবেছি স্বপ্ন পূরণের মাত্রা কমিয়ে দিবো। কিন্তু পারিনি। তোরাই বল, যে স্বপ্ন আমাকে আজ এ পর্যন্ত টেনে এনেছে। আমার বংশে আমার মতো ডিগ্রীধারী সম্পন্ন অন্য একজনের কথা কেউ বলতে পারে না। আমার বংশের মানুষ আমাকে মাথায় নিয়ে নাচতে চায়। তারা আমার কথা বুক ফুলিয়ে অপরের সাথে আলোচনা করে। বাবা-মা, আত্মিয়-স্বজন আমাকে মুক্তা মনে করে। তারা আমাকে আকাশের চাঁদ মনে করে। তারা আমার নাম নিয়ে পূলকিত হয়। আর বলে, আমার ছেলে এই, আমার ভাই এই, আমার ভাতিজা এই, আমার নাতি এই আমার...। এমনকি আমি এলাকার অনেককে বলতে শুনেছি। তারা বলছে, এ আমাদের এলাকার গৌরব, অহঙ্কার। আমাদের এলাকার সন্তান। দোস্ত! আমি নিজ কর্ণে শুনেছি, তারা অন্য এলাকার লোককে বলছে, ঔ যে ছেলেটা দেখছেন না? সে এই, অমুক জাগা থেকে এই পাশ করেছে। বর্তমানে এ-ই করছে/পড়ছে। তে-ই করছে। ছেলেটি ভালো, খু-ব ভালো। এমন ছেলে পাওয়া অসম্ভব। আরো কত কি বলে। দোস্ত! আমি যদি কখনো তাদের সাথে কথা বলি, তখন তারা কেমন আনন্দিত হয় জানোস? তা দেখলে তোদের বিশ্বাস হবে। আমি বললে, তোদের বিশ্বাস হবে না। তারা আমাকে দেখেই কেমন জানি হয়ে যায়। সর্বোচ্চ সম্মান দেয় আমাকে। তোরা জানিস, তারা আমাকে যা ভাবে। আসলে আমি তা হতে পারিনি। তবে, আমার জীবনকে আমি সার্থক মনে করি। কারন, আমি আমার বাবা-মা, আত্মিয়-সজন, এলাবাসির মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছি। তাদের মুখে যখন আমি হাসি দেখি। আমার আত্মা সান্তনা পায়। তোদের, স্যারদের পরামর্শ, সহযোগিতাই আজ আমি এ অবস্থানে এসে দাড়িয়েছি। যা আমার প্রতি তাদের অগাধ বিশ্বাসে ছেদ পারতে দিবে না। তোরা সবাই জানোস, আমি স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে চাই সব সময়। এ অভ্যাস (তোরা যাকে বদ অভ্যাস বলিস) আমার ছোটকাল থেকেই। এ অভ্যাস যদি আমার না থাকতো। তাহলে আমার মূর্খ পরিবার ও উশৃঙ্খল, অনুন্নত, শিক্ষালয়হীন এলাকায় আমার পক্ষে এ পর্যন্ত আসা সম্ভব হতো না। শিক্ষালয়হীন বলা ভূল হবে, কেননা আমাদের বাড়ি থেকে দুই মাইলের মধ্যে কোনো শিক্ষালয় নাই। দুই মাইল পরে একটি শিক্ষালয় আছে, কিন্তু তাদের শিক্ষা-দীক্ষার পরিবেশ বড়ই হতাশা জনক। তখনই আমি শিক্ষার স্বপ্ন দেখি, এবং তা বাস্তবায়নের পিছনে গোপনে একা পরিবার ত্যাগ করি। চলে যাই চোখের আড়ালে দূরে বহু দূরে কোনো এক জাগায়। তখন থেকেই আমার পথ চলা শুরু। অন্তরের গহিন তলদেশ থেকে বড়ই কৃতজ্ঞতা জানাই তোদের মতো বন্ধুদের। তোরা না থাকলে আমার স্বপ্ন কস্মিন কালেও বাস্তবতার দেখা পেতো না। তোদের আমি খু-ব ভালোবাসি, আপন মনে করি। সর্ব প্রথম তোদের মতো একজন আমার হাত ধরে রাস্তা দেখিয়েছে। আজো তোদের সহযোগিতা পাচ্ছি। পরামর্শ পাচ্ছি। বিশেষ করে আমার প্রিয় শিক্ষকদের কৃতজ্ঞতা জানাই। তোদের ও স্যারদের কৃতজ্ঞতা আদায় করে শেষ করা যাবে না। যাক, সে ইমোশনাল কথা। আজ তোরাই তো দেখছিস। কোথায় এসেছি, কি হচ্ছি, কি করছি, সব সবকিছু তোরা দেখছস, জানছ। এখন তোরাই আমাকে বল, আমি কি স্বপ্নকে ডিনাই করিতে পারি? কখনো না। স্বপ্নই আমার পথ প্রদর্শক। স্বপ্ন আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। স্বপ্নই আমাকে জিরো থেকে আজ পর্যন্ত টেনে এনেছে। স্বপ্ন আমার বড়ই আপন। স্বপ্ন ছাড়া আমি বাচি কেমনে? স্বপ্নহীনা আমাকে ভাবতেই আমি শিউড়ে উঠি, কলিজা কেপে উঠে, রক্তের সঞ্চালন থেমে যেতে চায়, চোখে অন্ধকার দেখি, বাকশূন্য হয়ে যাই।
বাস্তবেই রফিক দয়ালু ও ভাবুক টাইপের মানুষ। কোনো অহংকার নাই। কেউ তার কোনো উপকার করেনি তবুও তাকে বলবে তুমরা আমার জন্য এ করেছো ও করেছো। একজনে উপকার করল। তো সবাইকে কৃজ্ঞতা জানাবে। ভাগ্যবান ছেলে। সফল ছেলে। নিজে এতো কিছু করেছে বা অর্জন করেছে তবুও সে নিজেকে ছোটো ভাবে, বড়ো মনে করে না। আমিত্ব তার মঝে একেবারেই অনুপস্থিত। সত্যিই প্রশংসার যোগ্য।
রফিক স্বপ্ন কম দেখার জন্য বিছানা পরিবর্তন করতে চেয়েছিলো। শক্ত বিছানায় ঘুম কম হয়। ঘুম কম হলে স্বপ্নও কম দেখা যাবে। কিন্তু আকস্মিৎ তার জীবনে এক ভয়ঙ্কর তুফান বয়ে যায়। সে এক বাসায় গিয়েছিলো কোন এক কারনে বা দরকারে। হয়তো বন্ধুর সাথে। কিংবা সে বাসার কারো সাথে পরিচয়ের সূত্র ধরে। তুফানটা সেখানেই বয় তার জীবনে। সেখানে সে অবিশ্বাস্য রকমের অসম্ভব অতুলনীয় সুন্দরী মেয়ে দেখে সে। জিবনে এর চেয়ে সুন্দরী মেয়ে সে আর কেখনো দেখেনি। রফিক তার জিবনে অসংখ্য মেয়ে দেখেছে। সিনেমা, ছবি, স্বচোখে আরো কতভাবে দেখেছে। এর মতো না। রফিক ভাবে, পৃথিবী তার জীবনে এমন মেয়ে উপহার দেয়নি আর দিবেও না। এ একটিই। এ যেন মহামূল্যবান একমাত্র মুক্তা-হীরা। রফিক তার সাথে কথাও বলেছে। যেমন রূপ তেমন কন্ঠ। তার সুন্দর্যে কোনো কমতি নেই। রফিক নিশাগ্রস্থের মতো ঘোরলাগা অবস্থায় কোনো রকমে নিজের রুমে আসে। তার অন্তর থেকে যায় ঐ বাসায়। যেখানে ঐ মেয়ে বাস করে। মেয়েটি তার অন্তর রাখেনি। রফিকের অন্তর বিদ্রোহ করে থেকে যায় সেখানে। রফিক ফিরে আসে শুধু বডি নিয়ে। তখনই তার মাথায় বিছানা না সারানোর যুক্তি চেপে বসে। তার এখন ভয়ঙ্কর ধরনের স্বপ্ন দেখতে হবে। যে স্বপ্নের অনুভূতি আলাদা। যার বর্ণনা দিতে ভাষা অপারগ বরং ব্যর্থ হবে সম্পূর্ণরূপে। রফিক ভাবে, আজ থেকে নতুন উদ্দামে সুখের স্বপ্ন দেখতে হবে। যে স্বপ্ন সে আর কখনো দেখেনি বা অযৌক্তিক মনে করে ডিনাই করেছে। এখন আর তা ডিনাই করা যাবেনা। এখন ডিনাই করলে মূলবান কিছু হারাতে হবে। বিছানা নরম হতে হবে। শক্ত হলে তার ঘুম কম হতে পারে। স্বপ্ন দেখাতে বিগ্ন ঘটতে পারে। তাই সে নরম বিছানা সরায়নি।
রফিক নরম বিছানায় সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন দেখে। রফিক স্বপ্ন দেখে, সে এ মেয়েকে বিয়ে করেছে। তার সাথে দূরে অজানায় কোথাও বেড়াতে গেছে। তখন জোৎস্না রাত। চাঁদ হাসছে। আজ তার জোৎস্না একটু বেশি। সে পৃথিবীকে নিজের জোৎস্না দিয়ে বাসিয় দিচ্ছে। পৃথিবীকে ¯স্নান করাচ্ছে। রফিক মনে করে, চাঁদ তার সামনে আরেক চন্দ্রপ্রতিমা দেখে হাসছে। হয়তো বা রফিককে আশির্বাদ দিচ্ছে। তারা দুজনে বসে আছে একটি বাগানে। বাগানে দেখা যাচ্ছে অসংখ্য ফুলগাছ। ডালে ডালে পাতার ফাকে ফাকে ফুলগুলো মুচকি হাসছে। মুচকি হাসার কারনে তাদের ভিতর থেকে সুগন্ধি সৌরভ চারপাশে ভোঁ ভোঁ করছে। আহ! কি সুবাসিত সৌন্দর্যময় পরিবেশ। ফুলগুলো তাদের প্রস্ফুটিত হওয়াকে আজ সার্থক মনে করছে। ফুলগুলো আজ তাদের থেকে সুন্দর বহু সুন্দর আরেক ফুল দেখছে। যদিও অন্যরা ফুলকে দেখে। রফিক দেখে, এখানে নাই বলে এমন কোনো ফুল সে দেখছে না। সে দেখছে, এখানে হাজার ধরনের ফুল। সে তো কয়েক ধরনের ফুল চিনে। এখানে কয়েকটি ফুল ছাড়া সবগুলোই অপরিচিত। এখানে রয়েছে লাল,সাদা,নীল হলুদ, বাদামি, সোনালী ইত্যাদি ফুল। তারা যেখানে বসে আছে, তাদের চরণতলে সবুজ গালিচার মতো ঘাস। তারা বসে আছে একটি পাথরের উপর। পাথরটি অতিশয় শুভ্র। সামনে সাগরও রয়েছে। সাগরের জল চিকচিক করছে আর খেলা করছে চাঁদের রশ্মি নিয়ে। রফিক দেখে, বাগানটি সাগরের পার্শে। সাগরের ঝিরঝির বাতাস মেয়েটির মেঘকালো কেশগুলো থমকে থমকে দোলে দিচ্ছে। রফিক তার দিকে তাকায়, মেয়েটি হাসে। রফিকের অন্তর ককিয়ে উঠে। একধরনের ব্যাথা ও চঞ্চলতা অনুভব করে সে। আহ! কি সুন্দরই না মেয়েটি। কাজল কালো চোখ, হাসলে গালে টুল পড়ে। রফিক বলে, তুমি হাসলে ফুলগুলো মাটিতে ঝরে পড়তে পারে। তুমার হাসিতে যেন মুক্তা ঝরে। রফিক স্বপ্নে তার সাথে খুনশুটি করে। মেয়েটি অত্যধিক লজ্জাবতী। আলতো স্পর্শেই লজ্জাবতীর ন্যায় নিজেকে ঘুটিয়ে নেয়। তার হাসি যেন উন্মাদ অগ্নিকেও নিবিয়ে দিবে। আগুন হয়তো জ্বালাতেও ভুলে যাবে। তার কন্ঠ শুনে সাগর তার উত্তাল থামিয়ে দিবে। কোকিল ডাকা বন্ধ করে দিবে। ফুলগুলো লজ্জায় নিজেকে হীন মনে করবে তার সৌন্দর্য দেখে। রফিক স্বপ্ন দেখে, পরদিন সে কোন কারনে আত্মহত্যা করতে ঘরে আসে। সেখানে এসে দেখে তার সামনে ঐ মেয়েটি। সে ভুলে যায় আত্মহত্যার কথা। তার পকেটে থাকে বিষের বোতল। মেয়েটি বলে, বিষের বোতল কেনো? রফিক উত্তর দেয়- এমনিতেই কিনেছি। মেয়েিেট বলে, মিথ্য বলছো, তুমি বিষ খেতে চাও। মরে যেতে চাও। তুমি মরে গেলে আমি কষ্ট পাবো। তখন মেয়েটির দুচোখ বেয়ে দুফোটা অশ্রু বের হয়। রফিক দেখতে পায়, অশ্রুর ফোটা দুটি তার ঘরে চাঁদের আলোর ন্যায় আলোর বন্যা বয়ে দিচ্ছে। রফিক কেদে উঠে, চিৎকার দিয়ে, না আমি মরবো না। তুমি পাশে থাকলে আমি কখনো মরবো না। বেচে থাকবো অনেক দিন। যতদিন তুমি পাশে রবে। তখনই তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। রাত ৩:৫৫ বাজে। রাত আর বেশি বাকি নাই।
রফিক তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার প্রতিজ্ঞা করে শেষ রাতে। সকালে ঘুম থেকে উঠে সে তার কৌশল সাজাতে থাকে। এবার রফিকের টনক নড়ে উঠে। সে দেখে, এ স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করা অসম্ভব। এ স্বপ্ন বাস্তবায়ন হওয়ার নয়। রফিক তাতে হার মানেনি। সে বশ মানার পাত্র নয়। সে আবার যায় ঐ মেয়ের বাড়িতে। কথা বলে সবার সাথে। কোনো একটি কারনে রফিক মেয়েটির বাড়িতে প্রায়ই যায়। হয়তো ঐ মেয়ের ভায়ের কারনে। রফিক তার যাদু বলে তাদের সাথে সখ্য গড়ে তুলে। বন্ধু মহল রফিকের স্বপ্নের কথা জানতে পারে। সবাই তাকে অনুরোধ করে, এ স্বপ্নের পিছনে না ছোটার জন্য। বন্ধুরা এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে বাধা দেয়। মেয়ের পরিবার রফিকের উপর আগ্রহী নয়। রফিক জানতে পারে। কারণ রফিক মেয়ের যোগ্য নয়। তার ক্রেডিট কম। রফিক গরীব। রফিক ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নেয়। সে মেয়েকে করতলগত করতে মেয়ের যোগ্য হবে। তার ক্রেডিট চাই। তার ধনী হতে হবে। সে তার মিশনে নেমে যায়। বন্ধুরা বাধা দেয়। সে শোনার পাত্র নয়।
রফিক এক প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় দেশের বাহিরে উচ্চতর গবেষণার জন্য যেতে রাজি হয়। এতেই তার জীবনের মোড় অস্বাভাবিকভাবে বদলে যায়। সে দুবছর গবেষণা করে। ব্যাপক সফলতাও অর্জন করে। ঐ প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ও ভালো রেজাল্ট করে। ঐ প্রতিষ্ঠানও সোনা চিনতে ভুল করেনি। তারা তাকে কল্পাতীত এক প্রস্তাব দেয়। তারা তাকে ওখানেই রেখে দিতে চায়। বেতনের অংক শুনে স্বয়ং রফিকও নড়েচড়ে বসে। সে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। স্বপ্ন মনে হয়। রফিক খুব আনন্দিত হয় তার স্বপ্ন পূরণ হওয়া দেখে। সে রাজি হয়ে যায় তাদের প্রস্তাবে। তারা তাকে জড়িয়ে ধরে ধন্যবাদ জানায়। তারা তাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য বিশাল আয়োজনের ঘোষণা করে। এতে রফিক প্রতিবাদের সুরে বলে এতো বড় আয়োজন? না আমার জন্য এতো কিছু করতে হবে না। আপনারা আমাকে লজ্জিত করবেন না। তারা রফিকের কথায় কান দেওয়ার পাত্র নয়। তারা রফিককে বলে, চলেন- আমাদের সাথে। তারা তাকে গড়িতে তুলে নিয়ে যায় সামান্য দূরে দু-এক মাইল হবে। সাগর পাড়ে। তারা এক বিশাল প্রাচীর ঘেড়া সুনিপূণ নকশায় তৈরি বাড়ির সামনে এসে দাড়ায়। গাড়ি থেকে নেমে সবাই বাড়িতে ঢোকে। ঢোকার সাথে সাথে রফিকের মনে পড়ে তার দেখা সেই স্বপ্নের কথা। যা সে ঐ মেয়েকে নিয়ে দেখেছিলো। রফিক এবার খুশিতে চিৎকার করে বলে, আমি এ বাড়ি চিনি। আমি এ বাড়িতে আগে একবার এসেছিলাম। আমি এর আগে এ বাড়িতে স্বপ্নে এসেছি। স্বপ্নে দেখেছি এ বাড়ি, আরো কত কি দেখেছি। লোকগুলো একে অপরের মুখ চাইতে লাগল। রফিক তাদের সন্দেহ দূর করার জন্য বলে এ বাড়ির কোথাও একটি বাগান রয়েছে যাতে অনেক ধরনের ফুল রয়েছে। সামনে সাগরও আছে। বলে, রফিক কাঁদতে লাগল, কয়েক ফোঁটা লোনা জল তার নেত্র থেকে বের হয়ে গন্ডদেশ বেয়ে ভূমিতে পড়লো। তারা তাকে বাগানও দেখালো। এটা রফিকের স্বপ্নের বাগান।
অনুষ্ঠান খুব আয়োজন ও প্রচুর লোক সমাগমের মাধ্যমে শেষ হলো। অনুষ্ঠানে অনেক গুণিজনও হাজির হন। সবাই রফিককে সংবর্ধনা জানায়। রফিককে বিশেষ ক্ষমতা দেয়া হয়, সে যদি চায় তাহলে সে তার পরিচিত জনদেরকে দাওয়াত দিতে পারেবে। সে এতে কৃপনতা করেনি। সে কৃপন নয়। পরিচিত যাকে পারে তাকে সে দাওয়াত দিয়ে দেয়। তাদের অনেকে আসেও।
অনুষ্ঠান শেষ করে অগ্রিম বেতন ও বিশেষ উপহার-উপঢৌকন ও কোটি টাকা নিয়ে দেশে ফিরে আসে। রফিক তার বন্ধুদের সাবাইকে দাওয়াত দেয় নিজ বাড়িতে। ইতিপূর্বে বন্ধুরা রফিকের সাফল্য বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে জানতে পারে। যখন রফিক তাদেরকে দাওয়াত দেয় তখন তারা বিশ্বাসই করতে পারে না যে বিজ্ঞানী রফিক তাদের মত বন্ধুদের আজো ভুলেনি। বন্ধুরা একে একে সবাই এসে হাজির হয়। রফিক সবাইকে নিয়ে গাড়ি করে যেতে চায় মেয়ের বাড়িতে। কিন্তু বন্ধুরা নির্বাক হয়, একে অপরের দিকে তাকায়। রফিক বলে আমি কি এখন মেয়ের যোগ্য হতে পেরেছি? তোরা, ওরা না বলেছিলো আমি মেয়ের অযোগ্য? বন্ধুরা সবাই কাঁদতে থাকে। রফিক বলে, তোরা জানিস, আমি প্রেম-ভালোবাসাকে সব সময় ডিনাই করেছি। কিন্তু, ঐ মেয়ে? না, তাকে আমি ডিনাই করিতে পারিনি। আমি তাকে সীমাহীন ভালোবেসে ফেলি। তাকে পেতে স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে চাই। বাধা হয়ে ধারায় যোগ্যতা ও ক্রেডিট। আজ অবশ্যই আমি তার যোগ্য হতে পেরেছি। আমার ক্রেডিট এতো বেশি যে তোদের, তাদের কল্পনাকেও হার মানাতে বাধ্য করবে। বন্ধুরা ভয় পায়। সাহস পাচ্ছেনা। তারা কি বলবে তার ভাষাও খোজে পাচ্ছে না। রফিকের ভালেবাসার পাত্র আজ তার পৃথিবী বদলে ফেলেছে। ও রফিকের সীমানার বাহিরে দূর বহু দূরে অবস্থান করছে। এক বন্ধু চিৎকার করে অশ্রু সজল চোখ নিয়ে বলে, থাম রফিক! তুই বিজ্ঞানী হলেই কি হবে। তুই আসলে বোকা। তুই আমাদের বলেছিলি না? দোস্ত! সব স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা যায় না। কিছু অপূর্ণ থেকে যায়। রফিক বলে হ্যাঁ! বলেছি তো, তো কি হয়েছে। আমি তো আমার এ স্বপ্ন পূরণ করেছি। দোস্তরা! শুন, আমি পাক্কা প্রতিজ্ঞা করেছি। আমি এর পরে আর কোনো স্বপ্ন পূরণ করার পিছনে দৌড়াবো না। এটাই আমার শেষ স্বপ্ন। বন্ধু বলে, পূরণ করেছিস? রফিক বলে, হ্যাঁ! নিশ্চয়। বন্ধু বলে, তুই আসলে স্বপ্ন দেখতে জানস না। তুই অভিনয় করিস। তুই একটা পাক্কা অভিনেতা। স্বপ্ন কাকে বলে তুই জানেসই না। আমরা আসল স্বপ্ন দেখি। তুই কোনো স্বপ্ন কোনো দিন দেখিসনি। সব বাওতা বাজি। তুই মিথ্যুক। ধোকাবাজ। বড়ো মিথ্যুক। তবে তুই আজ থেকে আসল স্বপ্ন দেখবি। বন্ধু রফিককে জড়িয়ে ধরে বলে। দোস্ত! তুই আসলে মহান। ও তার পৃথিবী বদলে ফেলেছে। তুই ওকে ভুলে যা। মানবি তো আমাদের কথা?
রফিক বলে, দোস্তরা! তোদেরকে আমি বলেছিলাম না? আমি গন্ডারের চামড়ার মতো অনেক কিছু সইতে পারি। এটাও সইতে পারবো না। কিন্তু এ যে আমার ভিতর থেকে আঘাত করেছে। তোরাই বল, আমি কেমনে সইবো? কেমনেই বা সইতে পারি? এ যে সইবার নয়। এ যে আমি সইতে পারবো না। দোস্তরা! আমি আজ থেকে তোদের কথা মতো আসল স্বপ্ন দেখা শুরু করবো। ঘুমালে আর উঠবো না। শুধু স্বপ্নই দেখবো। আমি আমাকে ওর মতো বদলে ফেলবো।
রফিক চলে গেছে স্বপ্ন দেখার জন্য অনেক দূরে ঐ স্বপ্নের বাগানে। সেখানে রয়েছে আরামের বিছানা। সৌরভময় বাগান, দোলনা আরো কত কি। সে আজো স্বপ্ন দেখে।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • সুমন আফ্রী
    সুমন আফ্রী ভালো লাগলো। শুভকামনা লেখকের জন্য। আমার পাতায় আমন্ত্রণ..
    প্রত্যুত্তর . ২ জানুয়ারী
  • মামুনুর রশীদ ভূঁইয়া
    মামুনুর রশীদ ভূঁইয়া সে আজো স্বপ্ন দেখে... ভালো লেগেছে লেখাটি। লিখতে থাকুন অবিরাম। শুভকামনা। আমার ‘হিটলার ও কয়েকটি কয়েন’ গল্পটি সময় পেলে পড়বেন। ধন্যবাদ।
    প্রত্যুত্তর . ২ জানুয়ারী
  • ওয়াহিদ  মামুন লাভলু
    ওয়াহিদ মামুন লাভলু জীবনের জন্য স্বপ্ন বলতে গেলে অপরিহার্য, এটাই আমার অভিমত। কারণ মানুষের জীবন থেকে যখন সবকিছু শেষ হয়ে যায়, নিঃশেষ হয়ে যায়, যখন মানুষ সবকিছু হারায় তখন মানুষের হয়তো বেঁচে থাকতেই ইচ্ছা করতো না, যদি স্বপ্ন না থাকতো। সবকিছু হারানোর পর মানুষ বেঁচে থাকে শুধু স্বপ্...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ৮ জানুয়ারী