বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১০ ফেব্রুয়ারী ১৯৭২
গল্প/কবিতা: ১টি

সমন্বিত স্কোর

২.৮২

বিচারক স্কোরঃ ১.৪২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৪ / ৩.০

গল্প - অবহেলা (এপ্রিল ২০১৭)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ২.৮২ থালি

হাসান মোঃ নূর
comment ৪  favorite ০  import_contacts ১৩২
সন্ধ্যা নামার আগেই বেশিরভাগ লোকজন বাড়ি ফিরে গেছে। শুধু কয়েকটা বড় দোকানে ভেন্না তেলের বাতি জ্বলছে। এখনও দোকান খুলে বসে আছে খুদু কবিরাজ। রোগীর জন্যে আর অপেক্ষা করে লাভ নেই সেটা সে ভাল করেই জানে। তবু মাঝে মাঝে মনে হয়, বাজারের শেষ ব্যক্তিটিও তো তার রোগী হতে পারে। হেমন্ত আর শীতের এই সন্ধিক্ষণটা বেশ ভাল সময়। অনেক রোগী পাওয়া যায়। এই গত বছরও রোগীর ভিড়ে তার জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছিল। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে অনেক কিছূ পাল্টে গেছে। হাটে নতুন কবিরাজ এসেছে। নাম সেরাজুদ্দিন ধানবাতি। কবিরাজি বিদ্যা শিখে এসেছে সে বিহারের ধানবাত থেকে। তাই তার নামের শেষে পরিচয়সূচক এ উপাধিটা যুক্ত হয়েছে। অবশ্য এর জন্যে তাকে কষ্টও করতে হয়েছে অনেক। নাঙ্গা পাহাড়ে বিশধর সাপের সাথে বসবাস করতে হয়েছে দিনের পর দিন। কাঁটা-গুল্মের তেতো ফলমূল বা শেকরের রস আর ঝরনার পানি দিয়ে আহার সারতে হয়েছে। রাত কেটেছে বড় কোন গাছের ডালে।

সেরাজুদ্দিনের এ গল্পের সবটুকু অবশ্য খুদু কবিরাজ বিশ্বাস করেনা। তার বিশ্বাস, এ বর্ণনায় সত্যের চেয়ে মিথ্যার অংশ বেশি। আর ধানবাতি উপাধিটাকে কোনভাবেই সে মেনে নিতে পারেনা। কারণ সেরাজ আলীকে সে শিশুকাল থেকে চেনে। একই সাথে তারা বড় হয়েছে। পাঠানপাড়ার মাটির গন্ধ তার শরীরে যেমন, সেরাজ আলীর শরীরেও তেমনি এখনও লেগে আছে। কিন্তু এলাকার লোকজনের কাছে সে এখন আর সেরাজ আলী নেই। সবাই তাকে ডাকে ধানবাতি বলে। সচ্ছল রোগীরা সবাই তার কাছে যায়। উন্নত চিকিৎসার আশায় অসচ্ছলদেরও একটা বড় অংশ এখন তার কাছে যেতে শুরু করেছে।

আজ খুদুর রোগী এসেছিল জনা পাঁচেক। ‘বাদলা’ যা পেয়েছে কোনটিই তার দরকার নেই। দুই কাঠা পেঁয়াজ, দুই কাঠা আলু, এক কাঠা কাউন, এক ধরা আদা আর পাঁচটা কুলা। আদা আর কুলা দিয়ে দুই ধরা চাল বদলা নিল খুদু। পেঁয়াজ, আলু আর কাউন দিয়ে বদলা নিল বড় একটা বোয়াল মাছ। মাছটা বড় বলেই এতক্ষণ বদলা হয়নি। সে মাছটা নিল আলালের কথা চিন্তা করে। বড় মাছের মাথা পছন্দ তার। ছেলেটা একমাস ধরে জ্বরে পড়ে আছে। চিকিৎসার কোন ঘাটতি হয়নি। কুটুরাজ ছালের রস, থানকুনি বাঁটা, অশ্বগন্ধার নির্যাস, মধু, মাগুর মাছ, মেথি গুঁড়া─ সবই খুদু তাকে নিয়মিত খাওয়াচ্ছে। কিন্তু অবস্থার কোন উন্নতি হয়নি। দুলালের মত আলালও আর কিছুদিনের মধ্যে মারা যাবে। লক্ষণ তা-ই বলে। সেক্ষেত্রে খুদু পরিণত হবে এক নিঃসন্তান মানুষে। কথাটা সে ভাবনায় নিতে পারে না। ভাবতে গেলে বুকের ভেতরটা মোচর দিয়ে ওঠে।

দোকান বন্ধ করে খুদু ভার সাজাল। পাঠানপাড়ার কোন হাটুরে আর হাটে নেই। এখনও খেয়াঘাট পর্যন্ত লোকজনের চলাচল আছে। ইছামতি পার হয়ে তাকে একাই বাড়ি পর্যন্ত যেতে হবে। পীরের জংলা পাড়ি দিতে তার ভয় করে। বড় বড় কড়ি গাছের ফাঁক দিয়ে পায়ে চলা পথ। পথের দু’পাশে ঘন জঙ্গল। খুদু একটা লাঠি হাতে নিয়ে ভার কাঁধে বাড়ির দিকে রওনা দিল। বাড়ির পেছনের বাঁশ ঝাড়ের নিচে পৌঁছে সে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। বিগত কুড়ি বছর ধরে প্রতিরাতেই খুদু একবার করে এ শঙ্কা ও শঙ্কাহীনতার স্পর্শ পায়। বিষয়টার মধ্যে শঙ্কা এবং স্বস্তির পরিমাণ সমান। যেদিন শঙ্কার পরিমাণ বেশি থাকে স্বস্থির পরিমানও বেশি থাকে সেদিন।

বছর পাঁচেক আগের এক বর্ষায় খুদু একা একা বাড়ি ফিরছিল। পীরের জংলার ঠিক মাঝামাঝি পৌঁছে সে দেখল, কালো কাপড় পরা অনেকগুলো লোক হাতে হাত ধরে তার পথ আগলে দাঁড়িয়েছে। সে লক্ষ করার চেষ্টা করল, গাছের ছায়া দেখছে কিনা। না। অবয়বগুলো মানুষেরই। খুদু দাঁড়িয়ে পড়ল। পেছনে ফেরার উপায় নেই। কারণ, জিনদের বৈশিষ্ট্যই হলো পলায়নপর লোকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া। আর সামনে এগনোর অর্থ, নিজেকে মৃত্যুর কাছে সমর্পণ করা। খুদু এক সময় লক্ষ করল, সে জোরে জোরে কলেমা শাহাদত পড়ছে। সে চোখ বন্ধ করে সুরা জিন থেকে প্রথম তিনটি আয়াত পড়ে শূন্যে ফুঁ দিল। চোখ খুলে দেখল, লোকগুলো অদৃশ্য হয়ে গেছে। সেদিনের বাড়ি ফেরার স্বস্তির আনন্দ এতটাই প্রবল ছিল যে এখনও তা সে মাঝে মাঝে অনুভব করে।

আলালের জ্বরের লক্ষণটা খারাপ হবার পর থেকে গত কয়েকদিন ধরে খুদু একটা অশুভ আশঙ্কা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। সে বাড়ির আঙিনায় পা দিতেই আমলকি গাছের ভেতর থেকে হুতুম পেঁচাটা ডেকে উঠল। প্রতিদিনই ডাকে। তার কাছে ডাকটা শুভ- অশুভ কিছুই মনে হয় না। বরং কোনদিন না ডাকলে একটা অসম্পূর্ণতার বোধ নিয়ে সে ঘরে ঢোকে। ঢোকার সময় ধীর পায়ে হাঁটে; পেঁচাটাকে শেষবারের মত সুযোগ করে দেয় তার আগমনবার্তা ঘোষণার। সাবিহাকে সে যেদিন গোপনে বিয়ে করে পালিয়ে নিয়ে এসেছিল এ বাড়িতে, সেদিনও এর পিতামহ- প্রপিতামহ বা এ ধরনের সম্পর্কের কেউ অনেক রাত পর্যন্ত ডেকেছিল। কান্নার মত শোনাচ্ছিল সে শব্দ। সাবিহা অলক্ষুণে নয়; বিগত কুড়ি বছরে সাবিহার কারণে অশুভ কিছু ঘটেনি। দুলালের মৃত্যু হয়েছে তার নিজের ভুল চিকিৎসার কারণে। আলালকে ঘিরে তাদের ছোট্ট সংসারটায় এখন অনেক সুখ। আরো পত্র- পল্লব বিস্তার করেছে তা ধীরে ধীরে। ‘জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা’ সবুজ কোমল কলমিলতার মত মায়াবী সাবিহার দিকে তাকিয়ে খুদু ভাবে, শুধু তার জন্যেই পৃথিবীতে এসেছে সাবিহা।

পঁচিশ বছর আগে সাবিহাকে প্রথম দেখেছে খুদু। সাবিহার বাবা মজিদ কাজী একজন মাঝারি ধরনের জোতদার। খুদু বাবার সাথে গিয়েছিল বর্গা জমির ধান দিতে। দুপুরে ভাত খেতে বসে বার বার সে সাবিহার দিকে তাকাচ্ছিল। বারবার সে চেষ্টাও করছিল, না তাকাতে, নিজেকে সংযত করতে। পারেনি। সাবিহাও অনেকক্ষণ পলকহীন তাকিয়ে ছিল তার দিকে। খুদু অবাক হচ্ছিল, এতটুকু একটা মেয়ে কেন তার দিকে এভাবে তাকাচ্ছে! তার পরের কয়েকটা বছর কোন রাত্রিদিন ছিলনা খুদুর। ছিল একটা দীর্ঘ বিরতিহীন অখণ্ড প্রতীক্ষার প্রহর। সে কাজ নিয়েছিল মজিদ কাজীর বাড়িতে। বাজারঘাট করা, জমিতে কামলা লাগানো, বেড়িতে ধান তোলা, নৌকা তৈরি, পাট বিক্রি─ সব দায়িত্বই সে পরম বিশ্বস্ততার সাথে পালন করেছে। এমনকি সাবিহাকে নানাবাড়ি নেপালতলীতে আনা নেয়ার মত দায়িত্বপূর্ণ কাজটিও করেছে সে অনেকদিন।

একবার বর্ষাকালে গজারি বিলের মাঝ দরিয়ায় খুদুর হাত থেকে বৈঠাটা ছুটে গিয়েছিল। বর্ষায় ইছামতির কূল উপচানো পানির স্রোত যায় গজারি বিলের ওপর দিয়ে। বৈঠাটা ভেসে গেল সেই স্রোতে। খুদু এক মুহূর্ত দেরি না করে পাক খাওয়া গহীন ঘোলা জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল বৈঠাটাকে ধরার জন্যে। বৈঠা নিয়ে স্রোতের বিপরীতে আসতে গিয়ে দম প্রায় চলে যাচ্ছিল তার। সে নৌকায় ওঠার সময় সাবিহা তার হাত ধরল। চটের ব্যাগ থেকে নিজের গামছাটা বের করে খুদুকে দিল। খুদু লক্ষ করল, সাবিহা ভয় পায়নি। বিচলিত নয় সে মোটেও। কিন্তু তার দুই চোখে পানি। শুধু একটা পলক ফেলার অপেক্ষা মাত্র। সবটুকুই গড়িয়ে পড়বে। খুদু গা মুছে বৈঠা হাতে নিল। সাবিহা বৈঠার মাথার দিকটায় হাত রাখল। বলল, ‘একটু জিরান’। কিন্তু জিরিয়ে নেয়া আর হলো না খুদুর। কারণ দেরি করলে নৌকা পাকে পড়বে। আর তখন ইছামতি দিয়ে ঘুরে আসা ছাড়া উপায় থাকবে না। বৈঠা চালাতে চালাতে সাবিহার দিকে তাকিয়ে সে দেখল, তার সামনে একটা পরিপূর্ণ রমণী বসে আছে─ নৌকায় ওঠার সময় যে ছিল নিতান্তই একটা কিশোরী। তার চোখের ভাষায় বোঝা যায়, সে কিছু একটা বলতে অথবা শুনতে চায়। কিন্তু দুজনের কেউ-ই কিছু বলল না। এবং এই না বলা দিয়েই শুরু।

এরপর কেটে গেছে পঁচিশটি বছর। খুদুর চোখে সাবিহার বড় কোন পরিবর্তন ধরা পড়ে না। এমনকি তার স্বভাবেও রয়েছে সেই কৈশোরের কমনীয়তা ─ একটু দুঃখ বা একটু আনন্দেই চোখ দুটো ছলছল করে ওঠা, সেই হাসির শব্দ, সেই অপলক তাকিয়ে থাকা। কবিরাজি ব্যবসায় ভাটা শুরু হবার পর থেকে খুদুর ঐশ্বর্যে টান পড়েছে, কিন্তু স্বচ্ছলতা এখনও অটুট আছে। সাবিহা বিত্ত- বৈভব নিয়ে চিন্তিত নয়। তার চিন্তা তার স্বামীর সম্মান নিয়ে। খুদুকে সে বেশ কয়েকবার বলেছে ধানবাত গিয়ে নতুন করে কবিরাজি শিখে আসতে। দরকার হলে কামরুপ কামাখ্যা যাবারও পরামর্শ দিয়েছে সে। কিন্তু সাবিহা দেখেছে, এ একটা বিষয়ে খুদু দারুণ অসহিষ্ণু। তার দাবী সেরাজ আলীর চেয়ে সে অনেক ভাল কবিরাজ। এ নিয়ে সাবিহা এখন আর কিছু বলে না।

ঘরের দরজায় টোকা দিতেই সাবিহা তড়িঘড়ি করে দরজা খুলে দিল। খুদু ঘরে ঢুকল। দেখল, পাশের বাড়ির বকুলের মা আলালের মাথায় পানি দিচ্ছে। আলাল চোখ বন্ধ করে আছে। গায়ে হাত দিয়ে দেখল অনেক জ্বর। আলাল কথা বলছে। সব প্রশ্নেরই উত্তর দিচ্ছে। কিন্তু একটাও প্রাসঙ্গিক নয়। দুলালের শেষ অবস্থাটাও ছিল এরকম। লক্ষণে কোন পার্থক্য নেই। সাবিহা বলল সেরাজ কবিরাজকে ডেকে আনতে। খুদু রেগে গিয়ে বলল, ‘সেরাজ কি আলীবর্দীর দরবারের কবিরাজ?’ আলালকে সে এক সানকি চিরতার রস খাওয়াল। কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্বর নেমে যাবার কথা। নামল না। আদা আর আমলকির রসে মেথি গুঁড়া মিশিয়ে খাওয়াল। কাঠের বাক্স খুলে কাঁথা বের করে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঢেকে দিল। অবস্থার কোন উন্নতি হলো না। সাবিহা হঠাৎ খুদুর পা ধরে ফেলল। বলল সেরাজ কবিরাজকে ডেকে আনতে। অনুনয়ের উত্তরে খুদু একটা কড়া ধমক দিল। একটা চড় দিতে গিয়েও সে ফেরত এলো। কিন্তু ভোররাতের দিকে বার দুই বমি করে আলাল যখন জ্ঞান হারিয়ে ফেলল তখন খুদু ফতুয়া গায়ে বেরিয়ে পড়ল। সাবিহাকে বলে গেল, সে সেরাজ আলীকে ডাকতে যাচ্ছে।

সেরাজ এসে প্রথমেই খুদুর দেয়া সব দাওয়াইয়ের অবশিষ্টাংশ জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিল। আলালের গা থেকে কাঁথার স্তুপ সরিয়ে ফেলল এবং কুয়ো থেকে ঠাণ্ডা পানি তুলে তাকে গোসল করাল। সবশেষে আটার মত সাদা এক ধরনের গুঁড়া ওষুধ পানিতে মিশিয়ে খাইয়ে দিল আলালকে। বলল, আছরের ওয়াক্তে আর একবার খাওয়াতে হবে। কাজগুলো অপছন্দ হলেও সাবিহা বাধা দিল না। কারণ, সে শুনেছে সেরাজ এরকম অদ্ভুত চিকিৎসার মাধ্যমেই বেশ কিছু জটিল রোগীকে সারিয়ে তুলেছে। খুদুও শুনছে একই কথা। বিশ্বাস করেনি। মনে মনে ভেবেছে, কোন দৈব ঘটনায় রোগী সেরে উঠেছে আর নাম কুড়িয়েছে সেরাজ আলী। এটা কোন চিকিৎসা নয়। চিরতার রস যে জ্বর নামাতে পারে না পৃথিবীর কোন দাওয়াই-ই তা পারে না। কিন্তু জোহরের ওয়াক্ত হবার আগেই আলালের জ্বর নেমে গেল। সে চোখ খুলে তাকাল এবং খেতে চাইল। মাগুর মাছের ঝোল মিশিয়ে তাকে আতপ চালের জাউ খাওয়ানো হলো। খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল আলাল।

বারান্দায় মাদুর বিছিয়ে খুদু আর সেরাজ আলীকে খেতে ডাকল সাবিহা। বড় রূপার থালিটা সে রাখল সেরাজ আলীর সামনে। এ থালি দশ গ্রামে কারো নেই। বিয়ের পর খুদু মুর্শিদাবাদে আলীবর্দী খাঁর প্রাসাদ দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল সাবিহাকে। প্রাসাদ দেখে সে অবাক হয়েছিল। ঘরের ওপর ঘর। তার আবার কোন খুঁটি নেই। দূর থেকে আলীবর্দী খাঁর ঘোড়াগাড়ির বহরও দেখেছে সাবিহা। মাথায় মুকুট পরা নবাবের অস্পষ্ট চেহারাও দেখা গেছে। বাড়ি ফেরার পথে খুদু সাবিহার জন্যে থালিটা কিনেছিল। রূপার মুদ্রা দিয়ে কিনতে হয়েছিল সেটি। কারণ শহরে বদলা চলে না। চলে শুধু কড়ি আর রূপার টাকা। এ পর্যন্ত কাউকে এ থালিতে খেতে দেয়া হয়নি। খুদু অনেকবার বলেছে কিন্তু সাবিহা নিজেও খেতে রাজি হয়নি। তার ধারণা, একবার খেলে এটি আর অনন্য থাকবে না। আর দশটা সাধারণ থালির মত হয়ে যাবে।

আকস্মিক এ ঘটনায় খুদু খুবই বিস্মিত হলো। সাবিহা সেরাজ কবিরাজের পাতে ভাত উঠিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল, এ কবিরাজি বিদ্যেটা সে কেমন করে রপ্ত করেছে। সেরাজ সবিস্তার বর্ণনা দিতে শুরু করল। বিরক্ত হলেও খুদু কোন কথা বলল না। এরপর যা ঘটল সেটা দেখে খুদু নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারল না। সাবিহা নিজ হাতে বোয়াল মাছের মাথাটা উঠিয়ে দিচ্ছে সেরাজ আলীর পাতে। সেরাজ আলী বিষম বিনয়ে তা ঠেকানোর চেষ্টা করছে। সেরাজ আলীর হাতের ছোঁয়া লাগছে সাবিহার হাতে। খুদুর মনে হলো, এ দৃশ্য দেখার আগে তার মৃত্যু হলো না কেন! অবশেষে সাবিহারই জয় হলো। সেরাজ আলীর পাতে বোয়াল মাছের বিশাল মাথাটা উঠিয়ে দিয়ে সে মোড়ায় বসে তাল পাখার বাতাস করতে থাকল দু’জনকেই।

পালিয়ে এ বাড়িতে আসার প্রথম রাত থেকেই সাবিহা খুদুকে বাতাস করে। এর আগে কাজী বাড়ির বাঁধা বান্দিরা চৈত্র থেকে ভাদ্র─ বছরের এ দীর্ঘ সময় সাবিহাকে বাতাস করে ঘুমিয়ে দিত। প্রয়োজন থাক বা না থাক সাবিহা বাতাস করলে খুদুর খুব ভাল লাগে। তার মনে হয়, বাতাস নয়, মমতার একটা উন্মাতাল স্রোতধারায় মিশে সাবিহাই তাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। আজ আর খুদুর সেরকম মনে হলো না। তার অসহ্য লাগল বাতাসের প্রত্যেকটি তরঙ্গ। সে বুঝল, সাবিহার দেয়া বাতাসটায় সে কারো সাথে ভাগাভাগি মেনে নিতে পারে না। সে স্পষ্ট বুঝল, তার মাথার ভেতরটা ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। থালির ভাতটা দেখাচ্ছে পায়েসের মত। সে উঠোনের আমলকি গাছটার দিকে তাকাল। গাছের পাতা দেখা যাচ্ছে না। শুধু সবুজ খড়ের গাদার মত একটা কিছু দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। খুদু খাওয়া শেষ না করেই থালিতে হাত ধুয়ে ফেলল। উঠে দাঁড়াতেই মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। খুঁটি ধরে দাঁড়াল সে এক মুহূর্ত। তারপর সোজা ঘরের মধ্যে গিয়ে শুয়ে পড়ল। সাবিহা পেছন পেছন গিয়ে বিছানায় শোয়া খুদুকে কিছুক্ষণ বাতাস করে ফিরে এলো। সেরাজ আলীকে বলল, আলালের চিন্তায় তার বাবার মনটা খুব খারাপ।

সেরাজ আলীর ভাত খাওয়া শেষ হলো। এক হাতে চিলিমচি ধরে অন্য হাতে পেতলের বদনা থেকে পানি ঢেলে দিল সাবিহা। সেরাজ আলী অনেক সময় নিয়ে হাত ধুয়ে মাদুরেই বসে রইল। খুদু খোলা দরজা দিয়ে তাকিয়ে দেখছে, সাবিহা এবার তার সখের তোয়ালেটা নিয়ে এসে সেরাজের সামনে ধরল। তোয়ালেটার এক মাথা ধরে আছে সাবিহা; অন্য মাথায় হাত মুখ মুছছে সেরাজ আলী। খুদু আলমারি খুলে ধুতুরা বিচির গুঁড়া ভর্তি কৌটাটা নিয়ে আলালের ঘরে গেল। সাবিহার ডাকাডাকিতে বেরিয়ে এলো একটু পরেই। সাবিহা বলল, ‘একটু পায়েস খাও’। খুদু বলল, শুধু মেহমানকে দিলেই চলবে। সে পায়েস পছন্দ করে না। তার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। শোবার ঘরের দরজা বন্ধ করে খুদু ঘুমিয়ে পড়ল ।

বৈঠকখানায় ফুলতোলা চাদরে শুয়ে জানালা দিয়ে হেমন্তের আকাশে ভেসে থাকা মেঘখণ্ডের দিকে তাকিয়ে আছে সেরাজ আলী। কাশবনের মত সাদা মেঘ আকাশের নিঃসীম নীল গাঙে ভেসে বেরাচ্ছে। যত ক্লান্তিই থাক দিনের বেলা তার ঘুম আসে না। সে ভাবছে, খুদুর ছেলেকে সারিয়ে তুলতে পারলে তার নাম ডাক ছড়িয়ে পড়বে আরো দশ গাঁয়ে। ব্যবসায় আরো পসার হবে। অন্যদিকে খুদুর খ্যাতি এখনও যতটুকু আছে তা দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাবে। প্রাচীনপন্থী কিছু লোকজন আছে যারা সেরাজ আলীর আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর এখনও আস্থা আনতে পারেনি। তারা মনে করে, সেরাজ আলী একটা প্রতারক, মিথ্যাবাদী। এ লোকগুলোও তার দলে ভিড়বে।

খুদুর ঘুম থেকে ওঠার নাম নেই। সাবিহা দরজায় টোকা দিল। ভেতর থেকে কোন সাড়া শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। দরজায় জোরে কয়েকবার ধাক্কা দিল সাবিহা। ভেতর থেকে মৃদু গোঙানির মত শব্দ করে খুদু কি বলল কিছুই বোঝা গেল না তার। সাবিহার রাগ হল। অসুস্থ ছেলেটাকে রেখে এভাবে একজন বাবা ঘুমাতে পারে! সে আপন মনে বিরবির করে বলল ‘মরণের ঘুম ঘুমায়!’ সেরাজ আলীকে ডেকে নিয়ে এলো সাবিহা। তারা আলালের ঘরে ঢুকল। আলালের মুখ দিয়ে দুধের মত সাদা ফেনা বের হচ্ছে। তার হাত পা বাঁকা হয়ে গেছে। বিছানায় ওলট পালট করছে সে। জ্বরের ওষুধটা পানিতে গুলিয়ে জোর করে আলালকে খাওয়াল সেরাজ। আলাল উঠে বসল। চোখে খুলে তাকাল। চোখের কালো অংশটা নেই। সেখানে ধবধবে সাদা ডিমের মত গোলাকৃতি দুটো মাংসপিণ্ড। আলাল শব্দ করে বমি করল পরপর কয়েকবার। শেষবার সে গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। এরপর খুব ধীরে চোখের পাতা দুটো মুদে এল আলালের। সাবিহার চিৎকারে খুদু ঘুম থেকে উঠে এলো। দেখল আলাল আর সাবিহা মেঝেভর্তি বমির মধ্যে শুয়ে আছে। বমিতে ধুতুরা বিচির গন্ধ।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন