বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯
গল্প/কবিতা: ১৩টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

১৯৯

মিথিলা

বাবা জুন ২০১২

মেঘলা নীল অন্তর

প্রিয়ার চাহনি মে ২০১২

আমার প্রাণের পরে চলে গেল কে!

নতুন এপ্রিল ২০১২

বন্ধু (জুলাই ২০১১)

মোট ভোট ১৯৯ বেওয়ারিশ

ফাতেমা প্রমি
comment ১৮৮  favorite ২৬  import_contacts ২,৫৫৬
কুণ্ডলী পাকিয়ে জড়াজড়ি করে ওরা দুজন শুয়ে ছিল। ভয়াবহ শীতের ছোবল থেকে বাঁচার এই প্রচেষ্টায় বাধ সাধছে উত্তুরে হিম-হাওয়া। মিষ্টি চাঁদের আলো ওদের দুজনের কোমল দেহ ভাসিয়ে দিচ্ছিল পরম মমতায়। কিন্তু সূর্যের ধার করা আলো নিয়ে চাঁদের কাছে সে উত্তাপ ছিল না যা ওদের দরকার। ওদের জন্য কারো কাছেই অবশ্য কিছু থাকে না। কারণ ওরা বেওয়ারিশ, এতিম,টোকাই।

ওদের একজন রতন আর একজন মনটু। ওরা দুজনেই প্রাণের বন্ধু। রতন তো মাঝে মাঝেই বলে,
‘‘তুইও এতিম,আমিও এতিম। আমি খোঁড়া,তুইও। বুঝলি মনটু তোর আর আমার অনেক মিল। তাই আমরা দুই বন্ধু-দুই ভাই।’’
মনটুও সম্মতি জানায়। কারণ আসলেই কথাটা ঠিক। ওরা দুজনই পথে পথে ঘুরে, ডাস্টবিন ঘেঁটে খাবার খায়। কেউ ওদের ভালবাসে না, করুনা করেও দুমুঠো বাসি-পান্তা এঁটো-কাঁটা দেয় না। আগে হোটেল-রেস্তরায় চাইত ওরা। কিন্তু মানুষের মনের মায়া দয়া উঠে গেছে,তাই আজকাল দুবন্ধু আবর্জনা ঘেঁটে ঘেঁটে খেতেই আজকাল বেশী পছন্দ করে।

তারপরও বিদেশী দামি হোটেলের চেয়ে রতনের ভাতের হোটেল গুলো বেশী পছন্দ। তবে এখানেও অনেক ঝামেলা, কখনো কখনো মার পর্যন্ত খেতে হয় । মাঝে মাঝে অবশ্য মেঘ না চাইতে জলের মতই অপ্রত্যাশিত ঘটনাও ঘটে। ওদের পরিচয়টাও একটা ভাতের হোটেলে খেতে গিয়েই হয়েছিল।

আশ্বিনের এক রাতে, যখন হোটেল গুলতে বেচাকেনা শেষ রতন গিয়ে হাজির হল সেখানে,কিছু পাবার আশায়। কিন্তু ভাগ্য বিরূপ সেরাতে। কিছু তো জুটলই না বরং ফ্রী কিছু বকা ঝকা খেয়ে ফিরতে হল। তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল মনটু,ও বেচারার মায়াকাড়া দৃষ্টিও গলাতে পারল না হোটেলওয়ালাদের মন। দুদিন কিছু খায়নি, সিটি কর্পোরেশনের পানি ছাড়া। বাতাসে ময়লা উড়ে এসে পড়ল রতনের চোখে, রতনের চোখ দিয়ে পানি গড়াচ্ছিল। কে জানে ময়লায় না ক্ষুধায়?

এমন সময় রতন টের পেল কেউ তার হাত স্পর্শ করেছে,তাকিয়ে দেখে মনটু। কি আকুতিই না ঝরছিল ওর চোখ থেকে। চোখের দিকে তাকিয়ে রতন বুঝতে পারে কোনটা ক্ষুধার দৃষ্টি,আর কোনটা মায়ার। কারণ এইদুএর সন্ধানেই তো তার সারা জীবনের দর্শন রচিত। মনটুর চোখে খুধা আর মায়া দুটাই ছিল। রতন আনমনে বলল,
”তুই তো বিপদে ফালায় দিলি।আমি নিজেই তো খাইতে পাইনা। তোর খুধা লাগছে,না?’’
মনটু মাথা নাড়ে,তার আসলেই প্রচণ্ড ক্ষুধা লেগেছে।
রতনের পকেটে সন্ধ্যায় প্রেমিক যুগলকে বিরক্ত করে পাওয়া কিছু টাকা ছিল। অনেক খুঁজে পেতে দুজন একটা দোকান খুঁজে বের করে পাউরুটি আর চা কিনল। তারপর দুজনে ভাগাভাগি করে খেয়ে নিল। একাকী বন্ধু ভালবাসাহীন জীবনে এই প্রাণের বন্ধুকে রতন সাদরেই গ্রহন করে। সেই থেকে দুজন একসাথে থাকে,খায়,রাতে রাস্তায় ঘুমায়। দুজনের জীবনের কত স্বপ্ন,আশা তারা জেনেছে,বুঝেছে। কিন্তু উপায় ছিল না স্বপ্ন পূরণের।
কাছাকাছি থাকা দুটি প্রাণীর দুঃখ ভ্রমণে একটা নিবিড় বন্ধন হয়েছে,কষ্ট যাত্রায় পরম মায়া জন্মেছে পরস্পরের প্রতি। এই নিবিড় কষ্টের কাহনেই দুটি আত্মা একাত্ম হয়েছে,পরিছয় ডোরে বাঁধা পড়েছে তারা। দুজনের কারোই কোন আশ্রয় ছিল না,কিন্তু দুজনেই ছিল একে অপরের ঠিকানা। ঠিক যেন হরিহর আত্মা। একেই তো বলে বন্ধুত্ব।
রাতটা কেটে যেতেই আড়মোড়া ভাঙল রতন। মনটু পাশেই বসে আছে। গত রাতের শীতটা অসহ্য ছিল খুব। মনটু টার কাল শীতে খুব কষ্ট হয়েছে,কিন্তু ও তো আর একথা মুখ ফুটে বলবে না রতনকে। তারপরও বোঝে রতন-ছোট্ট মনটুর দিকে তার কড়া নজর। মনটুও কম যায় না,কত দিন এমন গেছে রতন তীব্র জ্বরে হাঁটতে পারছে না,তখন ঐ ছোট্ট মনটুই তো তার মুখে খুঁজে পেতে খাবার এনে তুলে দিয়েছে। আজ রাত আসবার আগেই কাঁথা-কম্বল কিছু একটা না হলেই না,তাই খাবারের সাথে তারও সন্ধান করতে হবে আজ। দীর্ঘ ক্লান্তিকর আরও একটা দিন শুরু হতে যাচ্ছে ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে।

অনেকগুলো রাস্তা,ডাস্টবিন, আবর্জনা ঘেঁটে শেষে ক্লান্ত হয়ে দুজন বসে পড়ল। আজ তেমন কোন কিছু পায়নি ওরা। শুধু এক প্যাকেট ময়দা আর বাসি একটা আধখাওয়া রুটি ছাড়া,তাই খেয়ে নিতে দুজন ফুটপাথে বসেছে। খাওয়া শেষে দুজনের মহামূল্য গুপ্তধনের ঝুলি খুলে বসল ওরা। এই ঝুলিতে আছে মনটুর খুঁজে পাওয়া বারবি পুতুলের হাত সহ ছেঁড়া বডি। প্লাস্টিকের লাল বল। দুটাই তার অতি প্রিয়,মাঝে মাঝেই খেলে সে। আর রতনের আছে ছেঁড়া বর্ণমালার বই,স্কুলগামী শিশুদের ছবিওয়ালা খবরের কাগজের ছেঁড়া টুকরো এসব। ও জানে এগুলো শুধু সবপ্ন,জা পূরণ হবার না;তারপরও মাঝে মাঝে বের করে দ্যাখে ও।
মানুষ তো অসম্ভব স্বপ্ন দেখতেই ভালবাসে- অসম্ভব সবপ্নই তো একদিন মানুষকে উড়তে শিখিয়েছে। চাঁদে,মঙ্গলে পা রাখার সৌভাগ্য দিয়েছে। হয়ত মানুষকে স্বপ্ন দেখাবার সেই সহজাত প্রবৃত্তিই রতনকে ভাবায়।
কিন্তু বাস্তবতা এটাই যে ওদের নিয়ে মাঝে মাঝে সভা সমাবেশ হবে সুশীল সমাজের;মোপাসাঁ-ভিঞ্চি’রা ছবি আঁকবে,রচিত হবে দুঃখের মহাকাব্য। কিন্তু ওদের দুঃখ ঘোচাতে কেউ এগিয়ে আসবে না,বরং দূর দূর করে তাড়িয়ে ফিরবে সবাই। এটাই সমাজের নিয়ম। তাই ওরাও মেনে নিয়েছে সবকিছু।
খেলতে খেলতে মনটু বেশ দূরে চলে গিয়েছিল,সেদিকে তাকিয়ে আছে রতন। সে দৃষ্টিতে আশা নেই, স্বপ্ন নেই,শুধু আছে একরাশ গভীর শূন্যতা।
ডাস্টবিনে কুড়িয়ে পাওয়া ময়দার প্যাকেট খুলল রতন, রুটিটা এত ছোট ছিল যে পেট ভরেনি অর-তাই এই ময়দাই খেয়ে নেবে ভাবল ও। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে ও জানে একটু লবন আর পানি দিয়ে মথে নিলে আটার দলাটা অমৃত মনে হবে।
হঠাৎ বজ্র মুঠিতে চুলগুলো টেনে ধরল কেউ, উপর্যুপরি শক্ত চড়ে গালদুটি লাল হয়ে গেল।সাথে বুট পরা পায়ের লাথি। কুঁকড়ে যাওয়া রতনের ক্লিষ্ট নোংরা মুখের দিকে তাকিয়ে ইনস্পেক্টর হাবিব বলে উঠলঃ-
“সার দেখলেন হারামির বাচ্চা ভাত পায় না,কিন্তু এততুকু বয়সে আবার হেরোইন ধরছে।”


পরিশিষ্ট
শামা লাফিয়ে উঠলো,
“এই দোস্ত দ্যাখ জোশ একটা ছবি পাইছি। বন্ধু দিবসের চরম ছবি হবে। এই ছবি পাইলে এডিটর তো আমারে এ্যাওয়ার্ড দিবে রে!”
ছবিটা পরদিন ‘কালের ডাকাডাকি’ পত্রিকায় অর্ধ পাতা জুড়ে ‘বেওয়ারিশ দুই বন্ধু’ শিরোনামে ছাপা হল। মানবতাবাদী ফটোগ্রাফার শামার নামে চতুর্দিকে ধন্য ধন্য পরে গেল।
ছবিটা ছিল একটা খোঁড়া ছেলে আর একটা খোঁড়া কুকুর কুণ্ডলী পাকিয়ে জড়াজড়ি করে শুয়ে আছে। ছেলেটার মলিন মুখে রক্ত ছোপ ছোপ লেগে আছে,কিন্তু ঠোঁটের কোণে এক টুকরো হাসি। যেন পরম বন্ধু পেয়ে চির সুখি সে ।।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • M.A.HALIM
    M.A.HALIM কি বন্ধু ফাতেমা, কোন লিখা পড়তে পারছি না কেন? শরীর ভালো আছেত?
    প্রত্যুত্তর . ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১১
  • রুহুল আমিন
    রুহুল আমিন বিবেকহীনদের যদি আপনার গল্পটি বোঝার বিবেকটুকুও থাকত তবে জীবটা কত সুন্দর হত।ধন্যবাদ আপনাকে। অনেক অনেক অনেক
    প্রত্যুত্তর . ৪ মার্চ, ২০১২
  • জায়েদ  রশীদ
    জায়েদ রশীদ অসাধারণ! অবিশ্বাস্য!
    আপনার ক্ষুদ্র ঝাঁপি দেখছি অমূল্য রত্নে ঠাঁসা!
    তা... নতুন লেখা পাইনা কেন?
    প্রত্যুত্তর . ১১ জুন, ২০১৩