বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৩ জানুয়ারী ১৯৯২
গল্প/কবিতা: ৪টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

গল্প - পার্থিব (জুন ২০১৭)

বৃন্তচ্যুত

ওমায়ের আহমেদ শাওন
comment ৫  favorite ০  import_contacts ১০৬
কতই বা বয়স হইবে তাহার। সতেরোই শেষ হইয়া ওঠেনি। এ বয়সের গন্ডি পার না হইতেই নানান ঘর থাকিয়া বিয়ের প্রস্তাব আসিয়া হাজির। আর এমন প্রস্তাব না আসিবেই বা কেন? মেয়েটির যথাযথ গুণ, রূপ-লাবন্যে সদ্যযৌবনা। তাহার অমন রূপ দেখিয়া যেকোন মেয়ের হিংসা না হইয়া পারিবে না। যেকোন যৌবনদীপ্ত ছেলেও তাহাকে দেখিয়া লোলুপ দৃষ্টি অন্যত্র দিবেনা। তাই প্রায়শই পথে-ঘাটে বিদ্ঘুটে কথাবার্তাও শুনিতে হয়। অসম্ভব রকম বিরক্তবোধ তাহার অন্তঃকরণে আসিয়া যায়। তবুও প্রতিবাদের ক্ষিপ্ততা তুলিয়া তাঁকায় না। সরলতাই তাহার প্রতিবাদের প্রকাশভঙ্গি।
পিতা-মাতার নিকট সন্তান সব সময় ছোটই থাকে; সে যত বড় হউক না কেন। কিন্তু সামাজিক চোখ তাহাকে বড় করিয়া ফেলিয়াছে। ইহা ছাড়াও যে তাহার সহিত কথা বলিতে চায় সেও সুযোগ দেয়, কিছু মনে লয় না। কোমল ব্যক্তির বন্ধুর যেমন অভাব হয়না তেমনি শত্রুরও কমতি থাকেনা।
তাহার এরূপ আচরণ অনেকের নিকট আবেদনময়ীরূপে দেখা দিয়াছে। সেজন্য সত্য-মিথ্যার সংমিশ্রণে তাহার পিতাকে বোধগম্য করিবার বাকি রাখেনি। তাহার পিতা ইহা সম্পর্কে জ্ঞাত হইয়া মনস্থির করিয়াছে যে, মেয়েটিকে অতিসত্ত্বর বিবাহ বন্ধনে বাধিত করিতে হইবে। সে হেতুতে মেয়েকে দ্রুত বিবাহ দিতে উদগ্রীব হইয়া উঠিয়াছে। তাহা না হইলে কখন যে কোন অঘটন ঘটিয়া যায়। এমন সন্দেহ প্রত্যেক পিতারই মাঝে বিদ্যমান। এ অবস্থায় পিতা ও মেয়ের মাঝে সম্পর্কের দুরত্ব সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক। তাই পরিবার থাকিয়া অমানবিকতার স্পর্শ তাহাকে ঘিরিয়া বসিয়াছে।
বিয়ের আসনে বসিতে সে একেবারে অসম্নতি প্রকাশ করিয়াছে। অপরদিকে তাহার পিতা নাছরবান্দা হইয়া পড়িয়াছে। এবয়সে বিয়ের কথা বলিলে যেকোন মেয়েই তো রাজি হইবার কথা!
কোমলতা থাকিলে সহ্যতাও থাকিতে হয়। কিবা... তাহার করিবার রহিয়াছে। পিতার সিদ্ধান্ত সর্বোপরি শিরোধার্য। স্বীয় মতামত কিংবা সিদ্ধান্ত তাহা নেহায়তই হাস্যকর। যদি কোন মেয়ে অনিয়মের পৃষ্ঠে চলিতে চাহে তবে পরিবার থাকিয়া শেষ উক্তি আসিয়া যায়Ñ ‘যদি সিদ্ধান্তকে পদদলিত কর; তাহা হইলে সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া যাও, মরা মুখ দেখিবেÑ ইত্যাদি’। এ পরিস্থিতিতে বশ্যতা স্বীকার করা ব্যতিত আর কোন উপায় নাই বলিয়াই চলে। কারণ রক্তের বাঁধন ছিন্ন করিতে চাইলে বা ভাষায় প্রকাশ করিলে তো ছিন্ন হয়না। কোন কোন সময় মৌসুমী ভাবিয়া থাকে সুন্দর হওয়াটাই আজ¤œ অপরাধ। সুন্দর রূপের শোভনতাই তাহার জীবনের কাল হইয়া উঠিয়াছে। তাহা না হইলে বিয়ে লইয়া এতকিছু হইবে কেন? বাড়িতে সিদ্ধান্ত হইয়াছে। আগামীকাল বরপক্ষ আংটি পড়াইতে আসিবে। আর নিমেষে ছোঁ মারিয়া উড়াইয়া লইয়া যাইবে জীবনের এক বৃন্ত থাকিয়া আর এক বৃন্তে। এখন কি করিবে ভাবিয়া দিশেহারা হইয়া পড়িয়াছে। একদিকে পারিবারিক চাপ অপরদিকে শ্রাবণকে পাইবার প্রবণতা। দোটানায় হতবিহ্বল। মেয়েরা যদি সত্যিকার অর্থে কাউকে ভালবাসে তবে বিন্দুমাত্র টলিবে না।
এমতাবস্থায় তাহার সম্মুখে কঠিন চাপোমুখ দাঁড়াইয়াছে। অবশেষে হতাশ হইয়া পথের শেষে যাইবার জন্য অপেক্ষা করিতেছে।
পরদিন মাকে অনুরোধ করিয়াছিল। ‘‘আমাকে কোলে-পীঠে এত বড় করিয়া তুলিলে শুধুমাত্র পরের ঘরে তুলিয়া দিবার নিমিত্তে? এমন বন্ধন ছাড়িয়া কিভাবে রহিব? আমাকে না দেখিয়াই বা কেমন করিয়া থাকিবে?’’
ইহা যে নিয়তি। সহসা বলিয়া মৌসুমীর মা দীর্ঘশ্বাস ফেলিল। সন্তানের গোপন কাতরোক্তি মায়েই পূর্বে অনুধাবন করিয়া লয়। তবে মৌসুমীর মা ইহাতে অপারগ হইয়াছে।
ভাল ছেলে, ভাল বংশ। মেয়ের পছন্দ না হইবার কথা নহে। ইহা ছাড়া ধন-সম্পদও অগাধ। মেয়ে সুখেই রহিবে। যেকোন মেয়ের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট। মৌসুমী এ ধরণের ভাবনাকে মনের অভ্যন্তরে ঠাঁই দেয় নাই। প্রকৃত মেয়ে প্রকৃত মন খোঁজে। যাহাকে অজানা তাহার সম্পর্কে বিরূপ মত প্রকাশ করিবার অধিকার নেই বটে। কিন্তু তাহার সহিত ঘরবাঁধাও তো কঠিনতর।
মৌসুমীর জীবনে রহিয়াছে ব্যতিক্রমতার ছোঁয়া। যাহাকে বিশ্বাসযোগ্য বলিয়া মনে করিবে, তাহাকেই ভালবাসিবে। যাহাকে ভালবাসিবে তাহাকে সর্বস্ব দিবে। বিশ্বাস ও প্রেম জোর করিয়া হয়না। কিন্তু পারিবারিক দোর্দন্ডতায় তাহা কি পরিবর্তিত হইবে?
সন্ধার সেই লগ্নতা নামিয়া পড়িয়াছে। ঘন কালো জমানো মেঘ নীলিমার সমস্থ শরীরে। প্রকৃতির নীরবতা সত্ত্বেও মহাকালের ন্যায় মেঘাচ্ছন্ন হইয়া যায়। জমাট বাঁধা মেঘ। ছত্রভঙ্গ মেঘগুলি যেন দ্রুততার সহিত ছোটাছুটি করিতেছে। চারিদিক নির্জনতার আচ্ছন্নতা। অস্থিরতা বাড়িতেছে প্রবলভাবে। কাল রাতের রঙে পৃথিবী ঢাকিয়া গিয়াছে। তখন মৌসুমীর সংলগ্ন হইবার আকাঙ্খা জ¤িœয়াছিল শ্রাবণের।
সেই অস্থিরতার একরাত্রি কাটিল। প্রত্যুষে একঢোক জল পান করিয়া বেড়িয়া পড়িল। হাঁটিতেছে একান্ত নির্বাক নিস্পন্দভাবে। মৌসুমীর বাড়ির প্রায় নিকটে যাইয়া অকস্মাৎ থমকে দাঁড়াইয়া পড়িল। আর কেন জানি হাঁটিতে ইচ্ছে করিল না তাহার। অনেক দিন পর এখানে আসিয়াছে। অপরিচিত মনে হইতেছে এখানকার সকলকিছু। সবকিছু কেন জানি দ্রুত বদলাইয়া যায়। অথচ চিরচেনা এ জায়গাটি। মানুষ যখন নিজেকে চিনিতে পারেনা তখন কি অনেক কিছুই অচেনা মনে হয়! এখানেই মৌসুমীর অনেক আবেগ মিশিয়া রহিয়াছে। সে কারণেই কতবার আসিয়াছে ইয়ত্তা নাই। এমন সময় পিছুডাক শুনিতে পাইল।
এই শ্রাবণ কেমন আছো? যাইতেছো কোথায়? গন্তব্যে বুঝি!
আছি কোনমতে।
কোথায় যাইতেছে তাহা বলিতে বিব্রত বোধ করিল। কোন প্রকার উত্তর করিল না।
হাসপাতালে যাওনি কেন?
চমকে উঠিয়া বলিল! হাসপাতালে কেনÑ?
পরক্ষণে হৃদয় দাগা দিয়া উঠিল। দুঃখে-বেদনাতে জনাকীর্ণ হইল; না বলিতেই! এমন প্রশ্নে চিন্তা আসিয়া যাওয়াই স্বভাবত। আর এ চিন্তা মানুষের বোধশক্তি জাগায়: ঐরূপ মনে হইল।
মৌসুমী খুব অসুস্থ!
তাহাতে আমার কি?
কথাটি মুখে বলিবার পর হৃদয়ে একটা চাপা ভাবনা অনুভব করিল। প্রিয়জনের হঠাৎ দুঃসময়ের কথা শুনিলে বুকটা সবারই ধরাৎ করিয়াই ওঠে।
দু’এক মাস পূর্বে তাহার সহিত কথা কাটাকাটি হইয়াছিল। সেই অভিমানের ঘোর এখনো কাটিয়া যায়নি।
‘তোমার কি মানে? তুমি কি মানুষ! যাহার জন্যে আত্মহারা আর তাহাকে অসময়ে দেখিবে না?’Ñ রূঢ়ভাবে বলিল।
শ্রাবণের হৃদয়ে সব মিলিয়া হাহাকার ছড়িয়া গেল। হৃদয়ের উথাল-পাথাল কালে বোবার মত কষ্টের ভাষাগুলি নিজের মধ্যে গুটিয়া ফেলিল সে।
চল বাড়ি যাই!
কিছু না বলিয়া মাথা ঝুকিয়া সায় দিল।
বাটীতে পৌছিল। তবে স্থির থাকিতে পারিল না। অবশেষে স্থির করিল। যতই অভিমান থাক একবার যাই নাহয়!
চাহিলে কি আর যাওয়া যায়? মনে হইল, তাহার আত্মীয়-স্বজন তাহার প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করিতে পারে বলিয়া গেল না; এমনিতে মৌসুমীর নিকট যাওয়া-আসাতে অন্যদৃষ্টি হইয়াছে।
ক্ষণে ক্ষণে নিঃসঙ্গতার কঠোরতা চাপিয়া ধরিল। ঘন্টা কয়েক পর মৌসুমীকে ফিরিয়া আনা হইল। খবর পাইয়া চক্ষুলজ্জা উপেক্ষা করিয়া মৌসুমীকে দেখিবার জন্য তাহার পানে চলিল।
মৌসুমীর বাড়িতে পৌছিল। অনেক লোকের সমাগম। ভাবিতেছেÑ এখানে কোন আয়োজন নাকি! হ্যাঁ, আয়োজনের মতই। সে প্রচুর মানুষের চেহারা ভেদিয়া ঈশ্বর কণার মত কাহাকে যেন খুঁজিতে লাগিল।
প্রচুর লোকের উপস্থিতিতে মুখরিত চারিপাশ। উত্তর-পূর্ব দিকে কিছু দূরে নাদিরা, সাগর, ফারজানা, আমিনুর, তমাসহ অনেক বন্ধু-বান্ধবী। তাহাদের সন্নিকটে গেল। কাহারও মুখে কথা নাই। সবাই নিজেরা নিজেদের চোখের দিকে তাঁকাইয়া রহিয়াছে। তাহাদের নিকট ইহা অস্বাভাবিক বলিয়া মনে হয় নাই। ধীরে ধীরে সমাগমের ভিতের ঢুকিল। কাহারো আননে আর আয়োজনের আমেজমাখা চিহ্নটুকুও খুঁজিয়া পাইলো না। নিমেষে বিলীন হইয়া গেল! অনেকে ক্রন্দন করিতেছে কেহবা আফসোস করিতেছে। শোকাবহ চিহ্নের জলছাপে যে জীবনের কাল¯্রােত অতিক্রম হইয়া গিয়াছে তাহা খেয়াল করে নাই। অধিক চাপে মূহ্যমান হইয়া জীবনের যবনিকাপাত ঘটিয়াছে। কান্নার আর্তনাদ আহাজারি দিগন্ত জুড়িয়া বিস্তৃত। আর বুঝিতে বাকি রহিল না, বিদায় ঘন্টা বাজার পরক্ষণ।
চাহিয়াছিল অভিমান ভাঙ্গিয়া পূণরায় প্রেমের অবতারনা করিবে। তাহা আর হইল না। ততক্ষণে মৌসুমী জীবন-সায়াহ্নে পৌছিয়া গিয়াছে। সর্বগ্রাসী মৃত্যুর কাছে মানুষেরা সর্বদা অসহায়। জোয়ারের নৃশংস ¯্রােতের ন্যায় কড়াল গ্রাসে তাহাকে বিদীর্ণ করিয়া ফেলিল। উচ্চ চীৎকারে চারপাশ কম্পিত করিল। অথচ চীৎকারের শব্দটি কেবলমাত্র তাহার কর্ণ পর্যন্ত পৌছিয়াই স্তব্ধ হইয়া গিয়াছে। সবাই বলাবলি করিতেছিলÑ মৌসুমী বিষপাণ করিয়া আত্মহত্যা করিয়াছে। যাহারা ভালবাসাকে অবলম্বন করিয়া থাকে তাহারা আত্মহত্যা করিতে পারে না! কি অদ্ভুত রহস্য! মৌসুমীর মৃত্যু হইয়াছে।
মৃত্যু! মৃত্যু কি? দেহ হইতে আত্মা ও প্রাণের প্রস্থান? পৃথিবী হইতে কোথায় গমণ? তাহার বিশ্বাস হয় না। তাহাও আবার একান্ত প্রিয়জনের মৃত্যু। তামাশা করিতেছে হয়ত। লোক মুখে শোনা কত কথাই তো মিথ্যে হয়। তাহার খুব বলিতে ইচ্ছে হইল। ‘মৌসুমী তুমি ওঠ, আমার সাথে কথা বল, সবাই যে তোমাকে মৃত বলিতেছে। আমি তাহা সহ্য করিতে পারিতেছি না। ঘুম ভাঙ্গিয়া জাগিয়া উঠ। সবাই মিথ্যে বলিতেছে; তাহা প্রত্যয়ণ কর।’
মরণের ধুম্রোরজাল হইতে কেহ আর ফিরিয়া আসিবে না। শ্রাবণ প্রিয়জন হারানোর দূর্বিষহ বেদনায় নিজেকে সামাল দিতে অস্বমর্থ হইল। চোখের মাঝে জলবিন্দু জমাট বাঁধিতেছে আর গড়িয়া পড়িতেছে কপোল বহিয়া। বুকের বোবা কান্নায় অশ্রুপূর্ণ। যাহাকে নিয়ে স্বপ্ন-সাধ সে যদি না থাকে জীবনের এত রঙ-আয়োজন অনর্থক মাত্র। প্রচন্ড অভিমান ছিল তাহার প্রতি। মূহুর্তে চূর্ণ-বিচূর্ণ হইল সমস্ত অভিমান। হউক আরও কান্না হউক। ইহাতো জীবনের অভিমান ভাঙ্গার ক্রন্দন। এখানে কেউ কাউকে স্বান্তনা দেওয়ার নেই। নিজে নিজেকে স্বান্তনার বাণী শোনাইতে হয়। কিন্তু শ্রাবণ তাহার পূর্ণতাকেই (রূপ-গুণ-অবয়ব) চাহিয়াছিল, শুধুমাত্র আত্মার মিলনের চতুর্থ বিশ্বাসটাকে তো কেবল চায়নি!
অন্তিমকালে অনেককিছু বুঝিতে পারা যায়। শ্রাবণ তাহাকে বুঝিয়াছে। আর তাই জীবনের কতকথা জলসিক্ত। সামান্য অভিমানও বিমূর্তায়ন করিয়া দেয় দৃষ্টিটুকু। মৌসুমী কি শ্রাবণকে বুঝিয়াছে! নাকি আত্মার অভিশাপে জর্জরিত করিয়া দায়মুক্তি দেয়নি জানা যায়নি।
অনেকে শ্রাবণের দিকে তাঁকাইয়া রহিয়াছে দেখিয়া চোখ দিয়ে কাঁদিতে পারিল না। কাঁদিলে হয়ত মনটা কিছুটা হালকা হইত। না কাঁদার দরূণ শীতল হইয়া গেল। দুঃখ যখন বেশী হইয়া যায় ক্রন্দন তখন হারাইয়া যায়।
হৃদয় ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। তবুও নিজেকে বিশ্বাস করাইতে পারিতেছে না। সত্যি কি মৃত্যু হইয়াছে!
শেষ দেখা দেখিবার জন্য শবদেহের পাশে অনেকে অপেক্ষমাণ।
হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া গিয়াছে।পরিচিতদের মধ্যে অনেকজন বলিল ‘শ্রাবণ একবার দেখ না হয়। শেষ দর্শন করিয়া অন্তত স্মৃতি ধরিয়া রাখ।’
অদূরে দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। যাইতে পারিল না। মূর্তির মত চাহিয়া রহিল। ধারণার ভাবোদয় আসিল তাহার। শেষ দেখা দেখিতে পারিবে না; তাহাকে আজিবন স্মৃতির ফটোগ্রাফে দেখিয়া যাইবে। চিরদিন হৃদয়ের সম্মুখে বর্তমান রাখিবে।
দেখা না দেখার সিদ্ধান্তের দোলাচলে শেষ দেখাও হইল না। শেষ কথা শোনা কিংবা বলা হইল না। তাহার চিঠিতে আশার সঞ্চার ও প্রেম অসম্পূর্ণ রহিল।
মৌসুমীর দেহকে গোরস্থানে নিয়ে যাওয়া হইল। মাটিতে রাখা হইল। উপরে মাটি দেওয়া হইল। তখন কেমন যেন এক প্রচন্ড আকাঙ্খা জন্মিয়াছিল শ্রাবণের। পরমূহুর্তে তাহার মনে হইল, সেতো আমার অনন্ত প্রেম। প্রেমকে তো আর কবর দিতে পারিনা। জীবন-মৃত্যুর অনিবার্য বাস্তবতার নিকট সকলকেই পরাজয় বরণ করিয়া নিতে হয়। মাটির ঘোমটা দিয়া সে বিদায় নিয়াছে চিরতরে। দূর থাকিয়া চাহিয়া দেখিবার স্বামর্থটুকুও আর হইবে না। সমাজ ও শ্রাবণের লোচনে সে একসময় চোখের বালি হইয়াছিল। সেতো পরিত্রাণ দিয়াছে! সবাই কবর দিয়া চলিয়া গিয়াছে। শ্রাবণের মনে হইতে লাগিলÑ কবর নামের গর্তটি খুড়িয়া অনন্তকাল তাহাকে বক্ষে জড়াইয়া রাখিতে।
অপূর্ণতার বেদনা নিয়া একা দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। কাঁদিতে ভুলিয়া গিয়াছে; যন্ত্রণার তীব্র রঙে নীল হইয়াছে। অত:পর উর্দ্ধ সীমায় দু’হাত তুলিয়া কাঙ্গাল ভিখারীর ন্যায় অজান্তেই সত্য কথাটি প্রস্ফুটিত করিল। ‘সে আমাকে সত্যিকার অর্থে ভালবাসিয়াছে, যাহা তাহার এবং আমার মধ্যেই সীমাব্ধ ছিল। অবুঝ পরিবার তাহার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ করিয়াছে। মৃত্যুর পথে সে যাইতে চায়নি। ভাগ্যের চরম নির্মমতাই তাহার জন্য দায়ী। তুমি ক্ষমা কর, আমার প্রেমকে অমরত্ব দান কর। তুমিতো সর্বোৎকৃষ্ট ক্ষমাশীল হে বিধাতা। তাহার প্রমাণ আরেকবার নাহয় কর!’
একটি প্রাণ স্পন্দনের স্তব্ধতায় বড়ই শোকাহত! এই বিষপানÑ এই মৃত্যু সহজ মৃত্যু। তাহাকে নিরঙ্কুশ শুন্যতাবোধ আনিয়া দিল।
সেদিন মনে হইতেছিল বৃষ্টি হইবে। অনেক বৃষ্টি। ঠিক মুষল ধারায় বৃষ্টি। যেন মেঘ ভাঙ্গিয়া নামিয়া পড়িয়াছে। এমন মূহুর্তে বৃষ্টি চাওয়ার ছিল না। তারপরও তুমুল বৃষ্টি। ভিজিয়া দিল সমস্ত স্বপ্ন ও সুখগুলোকে। শুকনো রূপে তা কোলে তুলিয়া নিতে ব্যর্থ হইল। যেখানে বেদনা ভিজিয়া যাওয়ার কথা ছিল, অভিমান ভাঙ্গিয়া পূণরায় প্রেম সূচনা করিবার কথা ছিল, সেখানে বিপরীত হইয়া দাঁড়াইয়াছে। ভুল সবি ভুল। অধিক আশাও ভুল। জীবনের স্বাচ্ছন্দ বোধটাকে আচমকা নিমেষে ধুলিসাৎ করিয়া দিল। একটি মৃত্যু। অথচ অনেক মৃত্যুর দৃশ্য তো দেখিয়া আসিয়াছি!
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন