বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ ডিসেম্বর ১৯৯৮
গল্প/কবিতা: ৪টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

গল্প - অবহেলা (এপ্রিল ২০১৭)

মোট ভোট অবহেলিত নবজন্মা

নাহিদ সাজ্জাদ
comment ৩  favorite ০  import_contacts ৪১
বাড়ির পাশের খাল পেরিয়ে ওপারে আমাদের খেলার মাঠ।প্রতিনিয়ত সেখানে খেলা হয়।আমি গেলে টিমে নেওয়ার জন্য লড়াই জমে যেত।কিন্তু আজকে একটু দেড়ি করে মাঠে গেলাম।তন্মোধ্যে খেলা শুরু হয়ে গেছে।পাশের গ্রামের একটি টিমের সাথে আমাদের ম্যাচ।বিলম্ব হওয়াতে আমাকে দলে নেওয়া সম্ভব হয় নি।একটু মন খারাপ হল।তাই ফিরে আসছিলাম।খালের ওপারে সর্বশেষ বাড়ির পাশে আসার পর বাড়ির ভেতরে অনেক শোরগোল শুনতে পেলাম।কথাগুলো স্পষ্ট শুনা যাচ্ছিল না তাই ভেতরে যাওয়ার জন্য এগিয়ে গেলাম।
-মাইয়্যাই যদি জন্ম দিব তাইলে এই হারামজাদি এই বাড়িতে কেন!হেরে খেদাইতে পারেন না ভাবিসাব?
এমন কথাই প্রথম কানে আসল।বুঝতে বাকি ছিল না এই বাড়িতে নতুন একজন এসেছে।এও বুঝতে পারলাম যে নতুন অতিথি এসেছে সে একটি মেয়ে।
শব্দগুলো পাশের ঘর থেকে কানে আসছে।ওখানটাই প্রসূত কন্যার দাদী এবং তৎসমতূল্য প্রজন্মের কয়েকজনের আলাপচারীতা চলছে।
বাড়িতে বেশ বড়সর জটলা পেকে গেছে।কেউ এসেছে সদ্য প্রসূত নতুন মুখ দেখতে। কেউ অবশ্য সরব মুখে নতুনের অভ্যর্থনা জানাতে।
আমি প্রথমটির দলভুক্ত হয়ে বাচ্চাটি দেখতে গেলাম।দরজার সামনে যেতেই সামাজিক প্রথার সম্মুখীন হতে হয়।পাতাবাহার গাছের ছোট ডাল কিংবা ছনের বা তৎসমতূল্য ছোট ঝাড়ুর মতো কি একটা পানির পাত্রে ডুবিয়ে তা ছিটিয়ে দেওয়া হয়।খানিকটা অবাক হলাম।কেউ সেই কাজটি করে নি।এ জন্মের উত্তাপ নেই।কেবলই শীতল প্রবাহে উষ্ণ দীর্ঘশ্বাসের মিশ্রণ।তবে বাচ্চাটির দিকে তাকাতেই মায়া হল।ফুটফুটে চেহারা।কিন্তু কে জানত দুনিয়ার সবচেয়ে অবহেলিত একজন সে!যার জন্ম তেমন কারোর মুখে হাসি ফুটাতে পারে নি।
তাড়াতাড়িই বেরিয়ে এলাম অন্ধকার ঘরটি থেকে।তবে অন্ধকার ঘরের চাঁদের কিরণ বারবার চোখে ভেসে ভেসে আসছে।একটু এগোতেই নবজন্মার পিতাকে দেখতে পেলাম।কেমন একটা বিষন্নতার ছাপ দেখা যাচ্ছিল মুখে।বিষন্নতা শব্দটি যায় না।অতৃপ্ততার ছাপ বলা যেতে পারে।
বাচ্চার মায়ের নাম শিউলী।জান্মিক এক অভাগার নাম।মাঝারী গড়নের ছিমছাম চেহারার অধিকারিণী।মায়াবতী বললেও ভূল হবে না।জন্মের পনের দিনের মাথায় মায়ের মৃত্যু হয়।সে থেকে মামার বাড়িতে বড় হওয়া।বাবার বাড়ি যাওয়া হয় নি সেভাবে।মায়ের মৃত্যুর দ্বিতীয় মাসের মাথায় বাবা নতুন বিয়ে করে।মৃত্যুর অপেক্ষা নয়তো!সবাই অপয়া বলেই ডাকত।না হলে অমন পিচ্চি বয়সে কেউ মাকে হারায় নাকি!হয়তো সে অপয়াই।
চৌদ্দ বছর বয়সে শিউলীর বিয়ে হয়।তার মামার বিদায় করার চিন্তা হয়তো ছিল।তখন নবম শ্রেণিতে কেবল উঠেছে।নতুন মলাটে বাঁধা বইগুলো তার পড়ার টেবিলে শোভা পাচ্ছিল।বিয়ের সাজটাও সে বইগুলোর সামনেই হয়েছিল।বিয়ে হয় মোল্লাবাড়ির মোল্লা কামাল উদ্দিনের সাথে।বিয়ের সময় কত যৌতুক দিয়েছে জানা নেই।মোল্লাবাড়ির খবর বাইরে তেমন পৌঁছুই না।তাও কান কথায় অনেকেই জানে ওরা যৌতুক ছাড়া বিয়ে করে না।তবে যে যা-ই জানুক মোল্লাবাড়ির কথা জানা পর্যন্ত ইতি।
বেশ ভালই চলছিল।বিয়ের প্রথম বছরেই ছেলের জন্ম হয়।নাম রাখা হয় নিরব।তৃতীয় মাসে পানিতে পরে নিরবেই মারা যায়।মারা যাওয়ার পর অনেকটাই ভেঙ্গে পড়ে সে।শিউলীর অপয়া তকমার পূর্ণতা সে থেকে শুধু উপলক্ষমাত্র।
তার দেড় বছর পর আজকের দিন।শিউলীর বয়স সাড়ে ষোল বৈকি সতেরো।তার বেশি হবে না।আজ নবজন্মার বয়স তিন দিন।
এইদিকে কামাল উদ্দিন নতুন বিয়ের জন্য মনস্থির করেছে।যে মেয়ে দ্বিতীয় প্রচেষ্ঠায়ও সুস্থ ছেলে জন্ম দিতে পারে নি তার সাথে সংসার করা চলে না।
ইতোমধ্যে পাত্রিও প্রায় ঠিক।কামাল উদ্দিনের খালার জ্যায়ের মেয়ে।শ্যামবর্ণের মাঝারী গড়নের অল্প মোটাসোটা কর্মঠ মেয়ে।এর আগে অবশ্য একবার বিয়ে হয়েছিল।স্বামীর সাথে বনিবনাত না হওয়ায় চলে এসেছে।কারণটা ঐ স্বামীর।মদ্যপ থাকতো সব সময়।সেখানে তার ব্যক্তি স্বতন্ত্রতা ছিল না।ব্যবহার্য বস্তুর মতো ব্যবহৃত হতো।
তাকে ঘরে আনলে কাজে কর্মে উপকার হবে।সাথে উপঢৌকন তো আছেই।টাকার অঙ্কে হাজার পঞ্চাশ।আর বংশধর তো খোদা চাইলেই হয়ে যাবে।
ততক্ষণে এ খবর শিউলীর কর্ণকোঠরে পৌঁছে গেছে।শুধু গ্রাম্যনারী নয়, বাঙ্গালী কোনো নারীই তার স্বামী সংসারকে ভাগ করতে চায় না।শিউলীও এর ব্যতিক্রম না।কন্যা সন্তান জন্মানোতে তার কোনো হাত নেই।সেটা ওর একার বুঝা দিয়ে কিছু হবে না।নিয়তির বাজে নিদর্শন বলে মেনে নিতে দ্বীধাবোধ করে কাজ নেই।কেননা সে এমন এক পরিবারে এসেছে যেখানে এমনটাই মনে করা হয়।
শিউলী তার মেয়ের দিকে তাকিয়ে কাঁদছে।আর বিড়বিড় করে অনেক কথা বলছে।মলিন মুখের বেদনার্ত ভাষা।
-মা তুই বড়ই অভাগা।তোর লাগি মা হয়ে কিচ্ছু করতে পারতাম না।মাফ করিছ মা।যদি বাঁইচ্যা থাকিস তাইলে তোরও এমন নানান দূর্ভোগ পোহান লাগব।কেন এমন নির্মম দুনিয়ায় আয়লি?
পরদিন কাকডাকা ভোরে আবার গিয়েছিলাম সেখানে।না,এবার সেই চাঁদমুখো নবজন্মাকে দেখতে নয়। নির্মমতার শিকারী ক্ষণজন্মাকে দেখতে।ওর নাম রাখার সপ্তমদিন আসে নি।তাই নাম রাখা হয়নি বলে ক্ষণজন্মা নামে সম্বোধন করলাম।সে চলে গেছে ফ্যাকাসে দেহকাঠামো অবশিষ্ঠ রেখে।সেদিনও নানান মুখে একটি কথায় শুনতে পেলাম।
-আহা,কি সুন্দর ছিল মেয়েটা!
ওর দাদী,বাবা কোথায় ছিল দেখতে পাই নি।কিন্তু মায়ের চোখের পানির প্রবলস্রোত দেখেছিলাম।
ওকে দাফন করা হয় ওর ভাইয়ের কবরের পাশে।দুটি ছোট কবর পাশাপাশি।দুয়ে মিলে ওখানটাই সুখ-দুঃখের গল্প হয়তো করবে।
ঐদিন সে বাসায় থাকা পুরো মুহুর্তেই প্রথম দেখা চাঁদমুখটা ভেসে ভেসে আসছিল।পরক্ষণে ফ্যাকাসে মুখটা।দুয়ের ব্যবধায়ক খুঁজে পাওয়া শুধু একটি সমীকরণের দ্বিতীয় লাইন।
তার কয়েকদিন পর কামাল উদ্দিন বিয়ে করে।প্রত্যাশার চেয়ে আপেক্ষিক হারে একটু বেশিই পেয়েছেন।যদিও বিয়ের দিন খাবার নিয়ে ছোটখাট ঝামেলা হয়েছিল।সে তেমন কিছু না।প্রাপ্তির খাতা পনের কলায় পূর্ণ থাকলে একের জন্য সমস্যা নেই।
সেদিন শিউলী নিজ হাতে কামাল উদ্দিনের বাসর ঘর সাজিয়েছিল।কাঁদে নি শিউলী।অস্রু অমূল্য হতে পারে না।সে কেবলই দুর্মূল্য।
বিয়ের রাত থেকে গোয়ালের পাশের গুদামঘরে স্থায়ী আবাস হয় শিউলীর।কাঠের মাচানের চৌকি।এর এক পাশে সাড়িবদ্ধ হাড়ি।উপরে পাট ঝুলান।ময়লা কাঁথা বিছিয়ে রাত্রি যাপন।মাথার নিচে তক্তার মতো এক পিন্ড বালিশ।কাভারতো সোনার হরিণ।উপর থেকে কখনও পোকার আগমণ,চারপাশ থেকে মশার গুঞ্জন আর আলিঙ্গনে ভোর হওয়ার অপেক্ষা ছাড়া অন্য কিছু নয়।
এদিকে নব নারীর সান্নিধ্যে কামালের দিনগুলো বর্ণিল হতে শুরু করে।শুনেছি সে নাকি বাবা হতে চলেছে।অভাগা শিউলী তখনও মোল্লাবাড়িতে।সতীনদের মধ্যে মাঝে মাঝে অল্প ঝগড়া হতো।অন্নের ঠাঁই দিয়ে কাজের মানুষ রাখা হয়।অন্নের রকমভেদ করা দূসাধ্য।এই বেঁচে থাকার মানে কতটুকু।এমনভাবে থেকে কি হবে।
দূর্ভোগের জীবনে উপভোগ দূর্লভ।প্রকৃতির নিদারুণতার প্রতিরূপ বলে সম্বোধন করা যেতে পারে।কিন্তু এই প্রকৃতি কেবলই মানুষ নিয়ন্ত্রনাধীন।
তারপর ক্ষণজন্মা চলে যাওয়ার চারমাস পর।
নিজেকে আবিষ্কার করলাম শিউলী নামক অপয়ার সামনে।যে প্রকৃতির বলি হওয়া অপয়া।তখন রাস্তায় হাটছিলাম।এলোমেলো ময়লা চুলে,নিচের দিকটা নষ্ট হয়ে যাওয়া সেন্ডেল পায়ে,পড়নে পুরনো ছেঁড়া শাড়ী।সেটাও ঠিক মতো পড়া নেই।ক্ষণজন্মার প্রথম দর্শনের সময় এই শাড়িটাই পড়া ছিল শিউলী।মাথায় নারিকেল তেলে ভেজা চুল ছাড়া কখনও থাকতো না।পরিপাটি আর লাবণ্যতার মাখামাখি থাকতো সব সময়।সে আজ পাগল।নিঃস্ব আর নিঃসঙ্গ এক পাগল।আমার বিপরীত দিকে হেটে যাচ্ছিল।পিছনে এলাকার কয়েকটা ছোট বাচ্চা।পাগলের পিছনে বাচ্চাদের দৌড়ানো স্বাভাবিক ঘটনা।কেউ অবশ্য ঢিল ছুঁড়ে।পাগল বলে মিছিলসুলভ রোল তোলা নিত্যান্তই ঘটা বিষয়ের একটি।আমাকে দেখতেই শিউলী থেমে গেল।বাচ্চাগুলো এবার দৌড়ে চলে গেল কিছুটা দূরে।তারপর শিউলীর কথা বলা।
-কেমন আছো?
-জ্বি,ভাল।কোথায় যাচ্ছো?
-আমার আবার যাওয়া।দুন্যায় পুরাডাইতো আমার জায়গা।সব জায়গায় যাই।
এইটুকু বলেই অঝোরে কান্না শুরু করল।এ যে মায়াবতীর দ্বিতীয় অশ্রু ফেলন।এর নবজন্ম হয়েছে কি!দুনিয়া পুরোটাই তার।বিশাল তার জগত।বিস্তৃত সে।
ওর মূর্ছিত হাসিও দেখেছিলাম।সত্যিই সে মায়াবতী।ক্ষণে ক্ষণে নবজন্মা।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন