বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ ডিসেম্বর ১৯৯৮
গল্প/কবিতা: ৪টি

সমন্বিত স্কোর

২.৬

বিচারক স্কোরঃ ১.১ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৫ / ৩.০

গল্প - ঐশ্বরিক (মার্চ ২০১৭)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ২.৬ আমার গল্প চাঁদপুর

নাহিদ সাজ্জাদ
comment ৩  favorite ০  import_contacts ৮৪
১৪ই মে ২০১৬.........
সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। নবীনগরের এদিকটায় ঝিঁঝিঁ পোকারা ডাক শুরু করে দিয়েছে। বাইরে অন্ধকার। দুজন বেরিয়ে পড়লাম বাস ধরার জন্য। নবীনগর পৌঁছাতেই বাস পেয়ে গেলাম। আপাতত লক্ষ্যস্থান সাভার। মিনিট খানেকের মাঝে এসেও পড়লাম। এর মধ্যেই ফেইসবুকে যাত্রার ব্যাপারে কাজ সম্পন্ন করে নিয়েছে আমার সহযাত্রী। সাভার থেকে এবারের উদ্দেশ্য গুলিস্তান। বিআরটিসির একটা দোতলা বাস পেয়ে উঠে পড়লাম। রাতের ঢাকা দেখার ইচ্ছে ছিলো বলে উপরের তলার একদম সামনের একজোড়া সিট বেছে নিলাম।
নাহ্.! ঢাকা শহর ঘুরে দ্যাখবার জন্য নয়, উদ্দেশ্য প্রথম বারের মতো লঞ্চ ভ্রমণ সাথে চাঁদপুর দেখার।ভ্রমণ পিয়াসুদের জন্য রাত কি দিন, দুটোর পার্থক্য খুব কম। একটাতে আলোর ব্যবহার করতে হয়, অন্যটিতে আলো পাওয়া যায়। সাত - পাঁচ ভাবতে ভাবতে আমরা গুলিস্তান পৌঁছে গেলাম। এবার যাত্রার দিক সদরঘাট। জ্যামের কথা ভেবে যতটা আগে এলাম সেই হিসেবে অনেকটা সময় হাতে রয়ে গেল। কিছুক্ষণ জনবহুল দূষিত বুড়িগঙ্গার পাড়ে বসে এর অতীত ইতিহাস নিয়ে ভাবতে লাগলাম। একে ঘিরেই তো মহানগরী ঢাকা। এতো ব্যস্ত আর স্বপ্নের শহর, বাঁচার তাগিদে ছুটে আসা বহু মানুষের জীবনের গল্পগাঁথা এই ঢাকা।
রাত ১১:৩০।
আমাদের লঞ্চ এবার ভোঁ বাজিয়ে দুলে উঠে চলতে শুরু করলো। প্রথমে আস্তে, তারপর গতি বাড়তে থাকলো চারপাশে ঢেউ তুলে। পিছনে ফেলে নগরজীবনের সব ঝঞ্ঝাট।
দাঁড়িয়ে আছি ছাদে। শীতল হাওয়ায় হাত দুটো দুদিকে মেলে ধরলাম।
উড়ন্ত মন,
অশান্ত জীবন,
পূর্ণ হোক এবার..
জীর্ণ করে সব ঝঞ্ঝার..!!
কিছু সময় পার করে নিচে নেমে এলাম।দেখলাম অনেকে কাঁথা, চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। আকস্মাৎ চোখ পড়লো এক মধ্যবয়সী মহিলার দিকে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে তিনি গর্ভবতী। উনার পাশে উনার স্বামী ঘুমাচ্ছেন। আর উনি চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে কি যেন ভাবছেন।বেশকিছু সময় খেয়াল করলাম। একবার লোকটি সজাগ হয়। মহিলাটিকে কি যেন বলে আবার ঘুমিয়ে যায়। এবার মহিলাটি উঠে এলো। এগিয়ে গেল ওয়াশরুমের দিকে। বুঝতে পারলাম অনাগতের প্রতি পিতার দায়িত্ববোধ কম, সেই সাথে গর্ভধারিণীর প্রতিও। হতে পারে ইচ্ছাপূরণে ব্যর্থ। যাই হোক, কোন পরিবারের অন্দরের খবর জানানো আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি বরং আমার প্রথম লঞ্চ ভ্রমণের গল্পটাই বলি।
রাত ৪:২০।
লঞ্চ পৌঁছে গেছে। কখন যে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম, টেরই পাইনি। তড়িঘড়ি করে নেমে একটা সিএনজি ভাড়া করলাম।যাব সাকিবের নানাবাড়ী। মিনিট তিরিশেক লাগলো। যেতে যেতে ভোরের আলো ফুটে গেলো। গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। ১২টার দিকে উঠে এলাকাটা ঘুরে দেখানোর জন্য সাকিব তার নানার মোটর সাইকেল নিয়ে নিলো। যাচ্ছি ওর ছোটবেলার সেই বিদ্যাপিঠে। পাশেই ৭১ এর স্মৃতিগাঁথা নদী। যদিও নদীতে এখন আর পানি হয় না।
একটি পুরোনো ইটের ঘরের সামনে এসে থামলাম। একটি বিশাল কাঁঠাল গাছ বীরসেনাদের অত্যাচারিত হওয়ার গল্প আপন করে নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।পুরোনো ইটের ঘরটি ছিলো মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনীর ক্যাম্প। বলছিলাম ফরিদগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের কথা। বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে তারপর আমরা গেলাম ফরিদগঞ্জ উপজেলা পরিষদে। সেখানকার শানবাঁধানো পুকুর ঘাটটায় বসে ছিলাম অনেকক্ষণ।
পাশেই আমগাছে ঢিল ছু্ঁড়ছে একটা পিচ্চি। কম করে হলেও পঞ্চাশবার চেষ্টা করলো বেচারা। ওর এমন চেষ্টা দেখলে রবার্ট ব্রুশও লজ্জা পেয়ে যেতেন।তবে শেষপর্যন্ত ছেলেটি ব্যর্থ হয় গাছ থেকে আমের বোটার সংযোগটি ছিন্ন করতে। এরপর গেলাম ফরিদগঞ্জের বিখ্যাত মিষ্টি খাওয়ার জন্য।
বেলা পেরিয়ে যাচ্ছে। বিকাল ৪টা কি ৫টা। সাকিবের ফোন বেজে উঠলো। এবার সময় হয়েছে ফিরে যাওয়ার। ঢাকায় ফেরার কথা বলছি না। বলছি সাকিবের নানার বাড়ী ফেরার কথা। মোটর সাইকেলে পনেরো মিনিটের পথ। একটানে চলে এলাম। এসে খাওয়া দাওয়া করে একটু বিশ্রাম।
সন্ধ্যার কিছু আগে আবার বেরিয়ে পড়লাম। কাছেই সাকিবের খালার বাসা। দুই বাড়ীর মধ্যে দূরত্ব শুধু মাঝের কয়েকটা ধানক্ষেত। ওখানে যাওয়ার পর সাকিবের খালাতো ভাইসহ আমরা তিনজন কিছু সময় গল্প করি।
বাড়ী ফিরতে রাত ৮টা বেজে গেল।
রাতের খাবার খেতে বসলাম। হিঁমড়ার ( পিঁপড়া, উল্লেখ্য: শুধুমাত্র এই একটি শব্দই শিখতে পেরেছি ) উৎপাতে তাড়াতাড়ি খেয়ে উঠে পড়ি। রাতে শোয়ার সময় জানলার পাশটা বেছে নিলাম। চাঁদের আলো এসে পড়ছে ঠিক মুখের উপর। জানালার বাইরে জোনাকি পোকাদের খেলা চলছে। জোছনাবিলাসের খুব ভালো একটা উপায় হলো। এমন রাত্রি নিয়ে ডজনখানেক চিন্তা মনের আনাচে কানাচে আসতে মানা নেই। প্রকৃতির কাছেই তে জীবনের রহস্যভেদ করার রসদ থাকে।তাই বলে কি প্রযুক্তির এই যুগে বিশ্ব থেকে আলাদা হওয়ার উপায় থাকে.?! ১২টা পর্যন্ত ফেইসবুক ঘাটাঘাটি করে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিলাম। ছোট্ট শিশুর মতো নিষ্পাপ এই ঘুম। মা থাকলে নিশ্চয়ই কপালের একপাশে চুমু খেয়ে বলতো, এবার ঘুমিয়ে পড়তো।

ভোর ৬টা।
বিছানা থেকে নড়েচড়ে উঠলাম। প্রতিদিনকার রুটিন মতো চোখ মেলেই ফেইসবুকে ঢুকে গেলাম। ঘণ্টাখানেক পর দুজন বিছানা ছেড়ে উঠলাম। আমপাতার দাঁতমাজন নিয়ে বের হলাম পাশের সুপারি বাগানে।জনপ্রাণহীন এ জায়গা দেখলে কে বলবে অল্পদূরেই হাজার মানুষের আনাগোনা! যায় হোক এটি সাকিবের জীবনের বহুস্মৃতিময় জায়গা।মন খারাপের মুহুর্তে নিরব জায়গা সবার ভাল লাগে।হয়তো সেজন্যই।
ফিরে এসে নাস্তা করে বেড়িয়ে পড়লাম সাকিবের বোনের শ্বশুর বাড়ির দিকে।বেহাল দশার বাঁকাতেড়া রাস্তার কারণে একটু বেশি সময় লাগে পৌঁছাতে।কিন্তু পরিজনের কাছে যাওয়ার উৎকন্ঠা এর কাছে নিত্যান্ত সাধারণ।পৌঁছাতেই একটি বাচ্চা মেয়ে মামা বলে কাছে আসে।এমন মামা ডাকার শুনার আকুতি কার না থাকে!ভেতরে ডুকতেই আরেকজন পিচ্চি পাওয়া গেল।সাকিবের ভাগনে।এখনও কোলের ছেলে।দুই পিচ্চির সাথে খুঁনসুটি বেশ জমে উঠে।এসবের মাঝে কখন যে দুপুর হয়ে গেল টের পেলাম না।এরপর দুপুরের খানাপিনা শেষে বেড়িয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিলাম।কিন্তু মন সায় দিচ্ছিল না।ভাগনেদের আবদার ছিল থাকার।তবুও নিরুপায় আমরা ফিরে এলাম।কে জানে!শিশু দুটো হয়তো অভিমাণ করেছে আমাদের উপর।
চলে এলাম হরিণা ঘাটে।একটা ফেরি।ট্রাক উঠছে এর উপর।গন্তব্য ওপারের শরিয়তপুর। মাথার উপর সূর্য।কোনো রকম গাছের ছায়াতলে দাঁড়িয়ে অপলক দেখে যাচ্ছি।পাশেই জেলে পাড়া।জেলেরা ব্যস্ত জাল ঠিক করার কাজে।বিকালের পরেই নৌকা নিয়ে নামবে জীবিকার তাগিদে।নদীপাড়ের এই মানুষগুলো বিচিত্র রকম খাটতে পাড়ে।রৌদ্রে পুড়ছে তাও কোনো অনুভূতি নেই।আসলে অনুভূতি থাকতে মানা।থাকলে হয়তো মৃত্যুপুরীতে কেউ ইচ্ছে করে যেত না।এভাবে বিকাল হয়ে এল।এবার ফেরার পালা।
বেড়িবাঁধের উপর নির্মিত এই রাস্তা ধরে ফিরছি।আসার সাথে সাথেই জানতে পারি পাশের বাসার কারোর মিলাদ হচ্ছিল।দাওয়াতের পাওয়ায় আমরাও গেলাম।মৃত্যুর পর এমন মিলাদ মূলত মৃতের আত্মার শান্তির জন্য করা হয়।মৃতের আত্মীয়ের বিষাদগাঁথা মুখগুলো দেখে মায়া হচ্ছিল।মিলাদ শেষে ফিরলাম আমরা।ব্যাগ গুছিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে বেরুতে হবে।নানা আমাদের দিয়ে যাবে সিএনজি স্ট্যান্ডে।বেরিয়ে পড়লাম।বিদায় নিয়ে নানার সাথে লক্ষ্মীবাজার।সিএনজি তে উঠলাম।আমরা পেছনের সীটে।সামনে আরেকজন উঠল।
ফিরছি।তবে ফিরছি চেনা ঢাকায় নতুন করে।সিএনজি চাঁদপুর লঞ্চঘাটের দিকে চলছে।মাঝপথে সামনের লোকটা কার সাথে যেন উচ্চস্বরে কথা বলছিল।লোকটি কিছুসময় পর নামলে ড্রাইভার জানায় এতো বকাঝকার পরও এখানকার মেয়েরা আদর পেলে সব ভুলে যায়।এমনকি স্বামী কোনো জঘন্য কিছু করলেও।এটা বাঙালি মেয়েদের চিরাতায়িত বৈশিষ্ঠ্য।কিন্তু লোকটির কথায় মনে হল এখানে মেয়েদের ইচ্ছের মূল্য খুবই কম।ছেলেরা যা বলবে সেটা বাধ্য কবুতরের মতো পালন করবে।
১১টার দিক চলে আসলাম চাঁদপুর লঞ্চঘাটে।রাতের যেকোনো শহরের চেয়ে চাঁদপুর কোনো অংশে কম না।কিন্তু সময় স্বল্পতায় ঘুরে দেখার সু্যোগ হয়নি ভালভাবে।একটু পরেই উঠে পড়লাম লঞ্চে।লঞ্চ চলতে শুরু করলে এগোতে থাকি ঢাকার দিকে পেছনে ফেলে চাঁদপুর।সাথে শুধু স্মৃতি।বার বার ওগুলাই মনে আসছিল।বিদায় বেলায় যেতে দিতে না চাওয়ার পর চলে যেতে দিতে হয়েছিল আমাদের।ফেল ফেল করে অবলার মতো তাকিয়ে থাকা চোখের দিকে তাকানো যায় না।আমরাও পারি নি।দিন শেষে তাদের এমন কষ্টের মূল্য কতটুকু দেওয়া যায় জানি না।অংকের খুব পারদর্শী ছাত্রটিও হিসাব নাও মিলতে পারে।কিন্তু আমার স্মৃতিতে চাঁদপুরের গল্প থাকার পেছনে যাদের অবদান তাদের ধন্যবাদ জানানোর যথেষ্ঠ শব্দ আমার জানা নেই।আতিথায়েত্ব থেকে শুরু করে পুরোটা সময় যারা আমাদের খুঁজ নিয়েছেন সকলকে মনের অন্তস্থল থেকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন