বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১২ মার্চ ১৯৯৭
গল্প/কবিতা: ৮টি

বাবা (জুন ২০১৭)

স্বপ্নজালে আমি আর বাবা

মোঃ নুরেআলম সিদ্দিকী
comment ১  favorite ০  import_contacts ২০
জীবনের উননিশটি বছর পার হয়ে যখন বিশটি বছরে পড়লো তখনই বাবার সাথে সাক্ষাত-----
বাবা- কেমন আছো বাবা?
আমি- কে তুমি? কোথায় থাকো? তোমাকে তো কখনও দেখি নাই?
বাবা- আমি কে মানে, তোমার বাবা?
আমি- কি বলো এগুলো? জীবনের এতটি বছর পার হয়ে গেল, কখনও তো তোমাকে দেখলাম না, আজ কোথা থেকে আসলে? আমার বিশ্বাস হচ্ছে না যে, তুমি আমার বাবা? যাকে জীবনে দেখলাম না, যার সাথে হাটলাম না, যার সাথে বসলাম না, কখনও চললাম না, কিছুই তো করলাম না; সে আমার বাবা হতে যাবে কোন দুঃখে......
বাবা- দ্যাখো বাবা আমি মিথ্যা বলিনি, আমি আমার দিব্যি ছুঁই বলছি- আমি তোর বাবা.....
.
তুমি আমার বাবা? এতটি দিন পর এই অভাগা ছেলেটিকে দেখতে কোথা থেকে আসলে বাবা? বাবা তুমি জানো; কতটা দিন তোমার জন্য কাঁদছি, দু'চোখের পানি সমুদ্র হয়েছিলো। কতদিন তোমার জন্য না খেয়ে ঘুমায়ছি, তুমি আসবে এক সাথে খাব বলে মায়ের সাথে ভাত খাইনি। তোমার কোলে মাথা রেখে ঘুমাবো বলে কতদিন মায়ের সাথে রাগ করেছি। তোমার সাথে গল্প করবো বলে মাকে অনেক কষ্ট দিছি। কতদিন তোমাকে বাবা বলে ডাকছি, তোমার পায়ে সালাম করবো বলে ঈদে যায়নি, তোমার মুখে চুমো দিবো বলে কারও কাছে আদরের জন্য যায়নি। তুমি এতটা স্বার্থপর, এতটা নিষ্ঠুর হলে বাবা! কখনও না দিলে আমার ডাকে সাড়া, একটু চোখের পানিও তো মুছে দিতে পারতে! আমার ডাকে সারা দিলে না কেনো বাবা? আমি কি কখনও তোমার সাথে অপরাধ করছি? তোমার সাথে বেয়াদবি করছি? দেখাই তো হল না তোমার সাথে; অপরাধ, বেয়াদবি করবো কিভাবে?
.
জানো বাবা- কতদিন তোমাকে খোঁজছি। কতদিন তোমার জন্য মায়ের সাথে রাগ করে নদীর পাড়ে গিয়ে বসে থাকছি, কিন্তু তুমি আসো নাই। মা বলছে- তুমি নাকি ঐ আকাশে থাকো, সকাল হলে এসে আবার চলে যাও। তুমি জানো বাবা- রাত্রে তোমার সাথে দেখা করবো বলে অনেক রাত হয়ে যেত তবু ঘুমাতে যায়তাম না। মা বলতো, তুমি এখন ঘুমায় যাও খুব ভোরে তুমি আসবে। সত্যি আমি ঘুমায় যায়তাম। আর যখন সকাল উঠে মাকে জিঙ্গাস করতাম; মা বাবা কোথায়? মা বলে- তোমার বাবা এসে চলে গেছে। এত লুকোচুরি করলে কেনো বাবা? আমি তো সেই সময় লুকোচুরির খেলনা খেলতে জানতাম না। তুমি একটু দেখা করলে কি আর হত বল? তুমি খুব নিষ্ঠুর ছিল, তাই এমন করতে।
.
জানো বাবা- সকালে তোমাকে দেখি নাই বলে বাড়ি পালাই গেছি, স্কুলে যায়নি; আম্বিয়াদের বাড়িতে চুরি করে লুকাইছিলাম।
তুমি জানো না বাবা- তোমার হাত ধরে স্কুলে যাব বলে কত দিন মায়ের সাথে রাগ করছি। কিন্তু মা আদর করে গোসল করাই দিয়ে, পোষাক পড়াই স্কুলে দিয়ে আসতো। কত দিন তোমার সাথে স্কুল থেকে আসবো বলে- মায়ের সাথে আসতে চাইনি, কিন্তু ম্যাডামে আদর করে মায়ের হাত ধরে দিয়ে আসতো। তবু তুমি আসলে না, তুমি কি কখনও আমার জন্য অপেক্ষা করছো? জানি তুমি করবে না, তুমি তো পাষন্ড বাবা ছিলে। তোমার হৃদয়টা ছিলো আগুনের তৈরি, যেটাকে অন্য কিছু দিয়ে গলানো সম্ভব ছিল না।
.
তুমি জানো বাবা- কত দিন মা আমাকে খেলার মাঠে দিয়ে আসতো। খেলা শেষে দেখতাম; কতজনের বাবা খেলা শেষে সবাইকে নিয়ে যায়তো, চারদিক দেখতাম আমার বাবা আছে কি না? কাউকে দেখতাম না, একপাশে দেখতাম মা দাড়িয়ে আছেন। মায়ের কথা না শুনে মাঠে বসে থাকতাম, মা আমাকে আদর করে হাত ধরে বাসায় নিয়ে যেত। হাত মুখ ধুয়ে দিয়ে পড়ার টেবিলে বসাতো। আমি এত দুঃখ অনুভব করছি, কিন্তু তুমি আসলে না।
.
তুমি জানো বাব- কতদিন তোমার জন্য চিঠি লিখেছি। তোমার জন্য চিঠি লিখে মায়ের কাছে জমা দিছি, তোমাকে পাঠানোর জন্য। মা বলছে পাঠাইছে, তবে সে চিঠি গুলোতে কতটা আকুতি ছিল, কতটা ব্যথা ছিল, কতটা নিষ্প্রতিভ হাহাকার করা মনের প্রশ্ন ছিল কিন্তু সে প্রশ্নের উত্তর কখনও মিলল না। তুমি সে প্রশ্নের উত্তর পর্যন্ত দিলে না, তুমি খুব নিষ্ঠুরপ্রকৃতির ছিলে
.
জানো বাবা- যখন বিকাল বেলা স্কুলে পরীক্ষা ছিল; কত জনের মা- বাবা দেখতাম বড় বড় হোটেল থেকে নামী-দামী খাবার নিয়ে এসে দাড়িয়ে থাকতো, আর আমি পরীক্ষা দিয়ে বের হলে দেখতাম গাছের নীচে মা এক বাটি ভাত, আঁধা বাটি ডাল, আর এক টুকরো মাছ কিংবা একটু ভর্তা নিয়ে দাড়িয়ে থাকতো। আমি আসলে গাছের নীচে বসে মায়ের হাত দিয়ে খাবার মাখি আমার মুখে দিতো। মাকে বলতাম- মা দ্যাখো ওরা ওদের সন্তানের জন্য কত ভালো ভালো খাবার নিয়ে আসছে, আর তুমি আমার জন্য কি নিয়ে আসছো? মা বলতো- আমার হাতের বানানো খাবারই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খাবার। এর চেয়ে ভালো খাবার অন্য কোথাও হয় না। একদিকে আমাকে বলতো, আর অন্যদিকে দেখতাম দু'চোখে পানি ঝড়ছে। তখন আর থাকতে পারতাম না, মাকে বলতাম- মা আমি কিছু বলবো না, তুমি যা দাও আমি তা খাবো, তবু কেঁদো না মা। এমন করে যেতো পরীক্ষার সময়, আর তুমি তখন একটু দেখতে আসলে না কেনো বাবা?
.
তুমি জানো না বাবা- মাঠে খেলতে গিয়ে কত ছেলেরা আমাকে মারছে। যখন মাকে এসে বলতাম মা তাদের কিছু বলতো না, আমাকে আর তাদের সাথে খেলতে পাঠাতো না। শুধু তুমি ছিলে না বলে। তুমি জানো বাবা- কত রাত আমার ওষুকের কারনে মা সারা রাত জেগে থাকতো, ঘুমাতো না। কত রাত ঘুম থেকে জেগে দেখতাম- মা নামাজের বিছানায় বসে বসে দু'হাত তোলে কাঁদতো আর আমার জন্য দোয়া করতো। তুমি কখনও আমার জন্য দোয়া করেছিলে? জানি মোটেও করো নাই......তুমি খুব অন্য ধরনের মানুষ ছিলে।
.
তুমি জানো না বাবা- আমি কত দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে জীবনের এ পর্যায়ে পৌঁছেছি। প্রতিটি সময়ের সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছে আমাকে। সে যুদ্ধ জয় করতে হয়েছে আমাকে। তুমি যদি পাশে থাকতে এত কষ্ট করতে হত না, অনল জ্বালা নিয়ে এমন যুদ্ধের মোকাবেলায় পড়তে হত না আমাকে। আজও যুদ্ধ করি সফলতার কর্ণধারে পৌছতে, তবে দ্রুত পৌছে যেতে পারি যেন এমন দোয়ায় মা আমার জন্য করে।
.
শুনো বাবা- তুমি আমাকে কখনও ছেড়ে যেও না, আমার বুকে কষ্ট দিও না। আমি ভুলে গেছি পুরোনো স্মৃতিকে, ভুলে গেছি ভবিষ্যতকে; তবে তুমি আবার নতুন করে জাগ্রত করে দিলে নিদ্রাগত সে ঘুমন্ত প্রহরীকে। বারবার বলছি, বাবা তুমি আমাকে ছেড়ে কখনও যেও না।
বাবা তোমার বুকে একটু নাও না, আমাকে একটু ঘুম পাড়িয়ে দাও না বাবা।
££ ঘুমাবি নাকি, আয় আমার বুকে মাথা রেখে একটু ঘুমা। তোদের ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছা করে না রে বাবা, যেতে মন চাই না। কখনও যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না, যেতে চাইনি। আর যদি আবার ফিরে যায়, আর দেখা হবে না। ঐ জান্নাতের কূলে তোদের জন্য দাড়িয়ে থাকবো; সৎ পথে চলবি, সৎ কাজ করবি, বিধির বিধান মেনে চলবি, নামাজ পড়বি তাহলে ঐ জান্নাতের কূলেই আমাকে পাবি। আর তোদের নিয়ে একসাথে স্বর্গে যাবো....... আয় এখন ঘুমায় যা, রাত খুব কম।
$$ বাবা যখন এ কথাটি বলল তখনই বাবার বুকে মাথা রাখলাম। আর তখনই মা আমাকে ডাকলো- কি রে বাবা আর কত ঘুমাবি, অফিসে যাওয়া লাগবে না? ডাক দেয়া মাত্রই ঘুমটা ভেঙ্গে গেল, স্বপ্নটা নিশি পক্ষী হয় গেল, শরীরটা ঝির ঝির করে কাঁপতে থাকলে, আর আমি আস্তাগফিরুল্লা মনে মনে পড়তে থাকলাম।
£মনে হল বাবা যেন বাস্তবিক রুপে কাল্পনিক চরিত্রে অভিনয় করে হঠাৎ চলে গেলেন। তবে তুমি দোয়া করো বাবা, যেন আমি তোমার শেষের উক্তি গুলো পালন করে জাগতিক রুপ থেকে বিদায় হতে পারি.......
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন