বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৬ আগস্ট ১৯৯৪
গল্প/কবিতা: ১৭টি

সমন্বিত স্কোর

৬.০৩

বিচারক স্কোরঃ ৩.০৩ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ৩ / ৩.০

“আঁধার নিধন”

আঁধার অক্টোবর ২০১৭

“আঁধার”

আঁধার অক্টোবর ২০১৭

“ভয়”

ভৌতিক সেপ্টেম্বর ২০১৭

গল্প - পার্থিব (জুন ২০১৭)

মোট ভোট ১০ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৬.০৩ “পার্থিব”

মোঃ নয়ন আহমেদ
comment ৬  favorite ০  import_contacts ৩১২
আচ্ছা জানিস আর্য তোর সাথে আমার দেখা হয়নি অনেক দিন । কত কত সন্ধ্যে ঝিলের ধারে একা একা বসে কাটিয়েছি শুধু তোর অপেক্ষায় ।সন্ধ্যাতারা কানে কানে
বলে গেছে আজো ....সে ভালোবাসে অন্য কাউকে ।দীপার ডায়রির পাতার প্রথমটুকু পড়েই আবার চোখে জল চলে এলো আর্যর । ইস সেদিন যদি ফোনটা সুইচ অফ না থাকতো
......
ডাইনিং রুম থেকে দীপা
ডাকলো । ডিনার রেডি...
তখন আর্য ডায়রিটা যথাস্থানে রেখে দিলো ।দীপা আজ ডিনারে অনেককিছু বানিয়েছে ।রান্নাটা ও বেশ ভালোই করে । খেতে খেতে প্রশংসা
করলো আর্য । তখন দীপা আনন্দে হেসে উঠলো । খুব অল্পে সন্তুষ্ট এই মেয়েটা মাত্র দেড় বছর বিয়ে হয়েছে ওদের, কিন্তু কোনোদিন দীপার কিছু আব্দার করতে
দেখেনি আর্য । ওর যেন সব পাওয়া হয়ে গেছে । কিন্তু ওর ক্লান্ত হাসির মধ্যে কোথাও যেন একটা চূড়ান্ত না পাওয়া রয়েছেই !! আর সংসারের যাঁতাকলে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে দীপা । আর্যর বয়স্ক বাবা-মায়ের দায়িত্ব, আর্যর বিবাহিত দিদির অনুশাসনে কেমন যেন আধমরা হয়ে গেছে ও । আর্যর দিদি মেঘলা বিয়ে হয়েছে । জামাইবাবু বাইরে চাকরি করেন । আমাদের একমাত্র ভাগ্নাও এখন পড়াশোনার জন্য হোস্টেলে রয়েছে বেশ মেধাবী ছেলেটা । এই অখন্ড অবসরে মেঘলাদির একমাত্র কাজ বাপের বাড়ি এসে ভাইয়ের বৌকে পরামর্শ দেওয়া । বাবা মায়ের দেখাশুনা ঠিক মত হচ্ছে কিনা সেদিকে মেঘলাদির ভীষণ খেয়াল । যদিও নিজের শ্বশুর শ্বাশুড়িকে আর ছোট ননদকে বাড়িতে রেখেই দায় সেরেছে ও । কিন্তু দীপার প্রতিটা কাজে খুঁত ধরেই যেন মেঘলাদির তৃপ্তি । মাঝে মাঝে ভীষণ অসহায় লাগে আর্যর ।দিদিকে কিছু বলতে গেলেই ও বলে, তোদের সংসারের ভালোর জন্যই বলা । কিন্তু ঘরে ঢুকেই যখন দেখে দীপা মনখারাপ করে চোখের জল ফেলছে তখন সত্যিই নিজেকে বড্ড অপদার্থ মনে হয় আর্যর। দীপাকে নিয়ে আজ মুভি দেখতে যাবে ঠিক করেই অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরেছিলো আর্য । পকেটে দুটো আইনক্সের টিকিট ছিল । আড়াই ঘন্টা অন্তত দীপাকে নিয়ে যেতে পারবে সেই পুরোনো পপকর্ণের গন্ধে । আর্য বাড়িতে ঢুকেই দেখলো, ছোট মামির সাথে দিদি বসে বসে কথা বলছে । আর মাও পাশে বসে আছে । ছোট মামির ছেলের বিয়ে, তাই নিমন্ত্রন করতে এসেছে । দীপা রান্নাঘর থেকে কাপড়ের আঁচলে মুখ মুছতে মুছতে বেরুলো হাতের ট্রেতে বিস্কুট আর চা ।আর্যর দিকে তাকিয়ে বললো , গরম আছে ...হাত ধুয়ে খেয়ে নাও ।
আর্য একটু আড়াল পেয়ে দীপাকে বললো, মুভি দেখতে যাবার কথা ।
দীপা চোখ দুটো মাটিতে নামিয়ে বললো...
আজ তো হবে না !!
এখন গভীর রাত... ঘুমে অচেতন দীপার গভীর নিঃশ্বাস শুনতে পাচ্ছে আর্য ।
একগোছা চুল এসে পড়েছে ওর ক্লান্ত মুখে ।
আর্য একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ওর দিকে কি মায়াবী মুখ । ডায়রির পাতাটা খুলে পড়তে শুরু করলো বারবার লুকিয়ে পড়া ঐ পাতাগুলো ।
"এই আর্য ! আমার মনে হয়। তুই সত্যি কোনো মেয়ের প্রেমে পড়েছিস ?
ভীষণ ভীষণ রাগ হয়ে গেলো আর্যর । বেশ কিছুদিন ফোনের সুইচ অফ তোর ।
রেগে গিয়ে সাইকেলটা নিয়ে স্পিডে চালাতে শুরু করলাম ...লক্ষ্য তোদের বাড়ি । আজ একটা হেস্তনেস্ত হয়েই যাক ।
দরকার হলে তোর গলা টিপে মেরে দেব । তবুও তোকে অন্য কারোর হতে দেব না ।"
তখন দীপার চোখে আলো পড়তে একটু বিরক্ত মুখে ওপাশ ঘুরলো ও ।
আর্যও টেবিল ল্যাম্পটা নিভিয়ে ডায়রিটা বন্ধ করলো ।

আর্যর যখন ঘুম ভাঙল তখন বাড়ি শুদ্ধু লোকের বেড টি খাওয়া হয়ে গেছে।ওদের ঘরে কুলদেবতা আছেন তাই আর্যর মা কোনো বেজাতের কাজের লোক বাড়িতে ঢুকতে দেন না । শুধু বাসন মাজা আর ঘর মোছা ছাড়া বাকি কাজ দীপাকে করতে হয় । নিরামিষ- আমিষের চক্করে দীপার সাধের সরোদসর্দ্দার এন্ড সন্সএর হারমনিয়ামে এখন ধুলোর আস্তরণ আছে ।
অফিস বেরুনোর আগেই দিদি বললো , বিকেলে তাড়াতাড়ি ফিরিস । ছোট মামির ছেলের বিয়ের গিফ্ট কিনতে সোনার দোকানে যেতে হবে ।
মুহূর্তে আর্যর মনটা ভালো হয়ে গেলো । আজ অন্তত এই সুযোগে দীপাকে নিয়ে একটু বেরোতে পারবে । বাড়ি ফিরে আশেপাশে দীপাকে দেখতে না পেয়ে নিশ্চিত হলো ,ও নিশ্চয় সাজগোজ করছে । মনে মনে কল্পনা করতে করতেই ঘরে ঢুকলো আর্য ।
উম দীপা ঐ গাঢ় নীল রঙের পিওরসিল্ক শাড়িটা পরবে আজ । আর চুলটা একটু তুলে বাঁধছে ব্যাক ক্লিপ দিয়ে । কপালে কি ম্যাচিং টিপ পরবে ! নাকি লালচে মেরুন ! ভুল ভেঙে গেল ঘরে ঢুকেই আর্যর ...
দীপা বাড়িতে পরা আটপৌরে শাড়ি পরে দিদির শাড়ির আঁচল ঠিক করে দিচ্ছে ।
আর্য চমকে উঠে বললো ...দীপা তুমি যাবে না ?

তবে দিদি অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, ও কোথায় যাবে ? বাবার বাতের ব্যাথাটাও বেড়েছে রে । ও না থাকলে কি করে হবে । তাছাড়া এসব সোনার জিনিস ও বুঝবেও না।
দীপা কোনো কথা না বলে আর্যর জন্য চা এনে দিল । আর ডায়রিরতে লেখা ছিল ...
"জানিস তোদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছি বেলাটা বাজাবো কিনা !! এমন সময় দেখি তোদের বারান্দায় তোর বাইকটা দাঁড় করানো ছিলো । বাইকটা দেখেই কেমন যেন সন্দেহ হলো ...
ঠিক তাই পায়ে, হাতে প্লাস্টার করে তুই ঘরে শুয়ে আছিস । আমাকে দেখে ভুত দেখার মত চমকে উঠে বললি ...তুই !!
বিশ্বাস কর আমি আস্তেই চালাচ্ছিলাম ...সাইড থেকে একজন এসে আমাকে....
তুই ভাবেছিলিস হয়তো আমি খুব বকবো, খুব রেগে যাবো ...
আমার চোখে জল দেখে হেসে বলেছিলিস ধুর পাগলী আমার কিছু হয়নি দেখ তুই । আর এক সপ্তাহ পরেই তো আবার ঝিলের ধারে দেখা করবো ।
"পুরোনো কষ্টগুলো আবার যেন জমাট বাঁধছে আর্যর মনে । সেই ঝিল ,সেই বৃষ্টি ভেজা বিকেল ...

তখন দীপা ঘুমের ঘোরেই একটা হাত আর্যর বুকের উপর রাখলো ।দীপার হাতটা নিয়ে অনেকক্ষন দেখলো আর্য । সেই একই আঙুল । সেই একই নখ । শুধু নেলপলিশ গুলো আধা খাপচা হয়ে উঠে গেছে । হয়তো লাগানোর সময় পায়নি তাই । একদিন সাতটা রিডে খেলা করতো ওর এই আঙুলগুলো । কতো সুর তুলতো হারামনিয়ামে । আর্য অবাক হয়ে শুনতো,
তারপর ফোনটা এলো ঠিক বিকেল সাড়ে পাঁচটায় । দীপা তখন ছাদের গাছে জল দিচ্ছিল । নীচে নেমে সন্ধ্যে দিতে হবে, তাই নীলাকাশে শেষ সূর্যের রং দেখার মতো বিলাসী
সময় আজ আর নেই ওর হাতে । একটু দেরি হয়ে গেলেই মা আর দিদিভাই মুখ চাওয়াচায়ি করে ।আর্যর নম্বর অথচ আর্যর গলা নয় দেখেই ভয়ে হাতপা ঠান্ডা হয়ে গেলো দীপার ! হঠাৎ কেন ওর অফিসের প্রদীপদা দীপাকে ফোন করে এখুনি ডাকলো, সেটাই তো বুঝতে পারছে না ও । আবার বাড়িতে এখন কিছু বলতেও বারণ করলো ।বুকের ভিতর রক্তরা
দ্রুতগামী হয়েছে টের পাচ্ছে । আকাশটাও কেমন ঘোলা হয়ে আছে যেন ।বৃষ্টি আসবে মনে হচ্ছে ।
তবে কি আর্য আবার একসিডেন্ট করলো ??
মানুষটা বলেছিলো, মুভি দেখতে যাবে... দীপা রাজি হয়নি । দুটো বালিশের মাঝে আইনক্সের টিকিট সেদিন নীরবে কেঁদেছিল । লোকে কি ভাববে ভেবে হানিমুনেও যায়নি দীপার । বয়স্ক শ্বশুর শাশুড়িকে রেখে বেড়াতে যাবে, না না !!
দিনের পর দিন আর্য সব ইচ্ছেগুলোকে গলা টিপে মেরে দিয়েছে দীপার । কিন্তু ও তো ইচ্ছে করে করেনি । নিরুপায় ছিল ।দীপা কোনোমতে একটা শিফন পরে দিদিকে বললো, একটু বেরোতেই হবে ।এসে বলবে কি হয়েছিল ।দিদিভাই আর মায়ের অবাক চোখের অসংখ্য প্রশ্নের সামনে দিয়েই আজ বেরিয়ে গেল দীপা।
প্রদীপদা ওকে ঝিলের ধারে ডেকেছে । তারমানে এক্সিডেন্ট টা ঝিলের ধারেই হয়েছে । কিন্তু এখনো কোনো নার্সিংহোমে নিয়ে যায়নি কেন ! ভাবনাগুলো ঘুরপাক খেতে খেতে জড়িয়ে যাচ্ছে যেন । টোটো থেকে নেমেই ছুট্টে গেলো ঝিলের ধারে । আর্যর বাইকটা দেখতে পেলো । ব্রিজের একধারে অক্ষত অবস্থায় । কালো মেঘে করাম করে একটা বাজ পরলো দূরে । বৃষ্টি নেমেছে ...দু চার ফোঁটা পরলো দীপার মাথায় । এদিক ওদিক তাকিয়েও মানুষটাকে খুঁজে পেল না দীপা । শুধু পার্সটা নিয়ে বেরিয়ে এসেছে ও । ফোনটা ভুলেছে আনতে, অসহায়ের মত লাগছে এখন । ঠিক ঐ ঝিলের ধারে কত কত সন্ধ্যে কাটিয়েছে দীপা আর আর্য । চুপটি করে অন্ধকার নামতো ঝিলের সবজে জলে । গুনগুন করে আর্যর কানের কাছে গান গাইতো দীপা । ওদের সেই প্রেমের উচ্ছল, প্রাণচঞ্চল দিনগুলো যে বিয়ের পর নিমেষে হারিয়ে গেল । সংসারের চাপে আর্য আর ওর ছোট্ট ছোট্ট স্বপ্নগুলো এখন শুধুই ঢেউয়ের সাথে মিশে যাওয়া বালির গুঁড়োর মতো । অবসন্ন লাগছে দীপার । বৃষ্টির শো শো আওয়াজ, আর্যর বাইক রয়েছে অথচ আর্য নেই । হঠাৎ পিছন থেকে দীপার হাতটা ধরে টান দিলো
কেউ । ভিজেছে বৃষ্টিতে দুটো হৃদয় । পাগলের মত জড়িয়ে ধরেছে দীপা আর্যকে । আর্য বললো, জানো তিনদিন ধরে তোমার ডায়রির লুকনো পাতাগুলো পড়তে পড়তে প্ল্যানটা মাথায় এলো ।
সেই বাইক একসিডেন্ট
....সেই তোমার ছুটে যাওয়া ।
সেই আমাদের একসাথে বৃষ্টিতে ভেজা ।
ঝিলকে সাক্ষী রেখে আমাদের মন দেওয়া নেওয়া। অনেকদিন পর আবার প্রাণচঞ্চল দীপাকে ফিরে পেয়েছে আর্য । আজ অনেকক্ষন ওরা জলের একলা মনের গান
শুনবে । দীপাকে বলবে স্রোতের সাথে ওর গলা মেলাতে । তারপর আর্য বললো, আজ তুমি নয় ...চলনা আমরা আবার সেই তুই হই ।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন