বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২ আগস্ট ১৯৭৩
গল্প/কবিতা: ১৫টি

সমন্বিত স্কোর

৪.২

বিচারক স্কোরঃ ২.৪ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮ / ৩.০

আলোর ছায়া

ভৌতিক সেপ্টেম্বর ২০১৭

শ্বাসকষ্ট

কামনা আগস্ট ২০১৭

রূপান্তর

ঋণ জুলাই ২০১৭

গল্প - ঐশ্বরিক (মার্চ ২০১৭)

মোট ভোট ২১ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.২ সুন্দর বাড়ি

আহা রুবন
comment ১০  favorite ০  import_contacts ২৪৩
আর দশটা পিতা-পুত্রের মত নয় তাদের সম্পর্ক। শীত কালের পুরোটা সন্ধ্যা তারা কাটিয়েছে ব্যাডমিন্টন খেলে। বছর প্রায় ঘুরে এল রবি চাকরিতে ঢুকেছে—এখনও জুতো বা সার্ট কিনতে একজন অন্যকে সঙ্গে করে বাজারে ছোটে। বন্ধুদের সঙ্গে বই মেলায় ঘোরাঘুরি শেষে, তারা নির্দিষ্ট স্থানে অন্যের জন্য দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর বাবা-ছেলে গল্প করতে করতে বাড়ি ফেরে।

ছুটির দিনে বাইক নিয়ে বেরিয়েছিল রবি, দুঃসম্পর্কের এক মামাকে তুলে আনতে। তার মাধ্যমেই নতুন জমিটার খোঁজ পাওয়া। আজ বিকেলে তিন জনে বায়নার টাকাটা দিতে যাবে। পাঁচ মাস আগে আদেল সাহেব পেনশনের অর্থ হাতে পেয়ে একটা ভাল জমির খোঁজ করছিলেন। জমিটার ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকে বাবা-ছেলে সুখের তর্ক শুরু করে— বাড়ির বাগান কতটুকু হবে, বারান্দা কয়টি কেমন, গেটের পার্শ্বে ঝাউ নাকি করবি ডাল ঝুলবে অথবা বাড়ির নাম কী হবে—‘আমি বলি কি এত ভাবনা বাদ দাও—এর চেয়ে “সুন্দর বাড়ি” রেখে দেই, কি বলো?’
‘তোর মাথা! আমি রাখব “আমার বাড়ি”।’
‘ওর চেয়ে বাবা “মামার বাড়ি” রাখো, মধুর রসের স্বপ্ন দেখতে পারবে।’
‘খারাপ বলিসনি, তোর স্বপ্ন শব্দটা শুনে মনে মনে ভাবছি—“স্বপ্নতরি” কেমন হয় রে?’
শেষ পর্যন্ত বাড়িটার নাম ঠিক হয় ‘পুষ্প নিবাস’। যেহেতু বাড়িটা থাকবে ফুলগাছে ঠাসা—এই একটা বিষয়ে সম্পূর্ণ একমত।

দুঃসংবাদটি যখন এল, স্ত্রী একটি চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারায়। আদেল সাহেব ধপ করে সোফায় বসে পড়েন। বারান্দায় গাছে জল দিচ্ছিলেন। কলিং-বেল শুনে এগিয়ে এলেন। ঘরে ঢোকে রবির বন্ধু বিনয়। ঘামে মুখ চপচপে, ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে ‘সর্বনাশ হয়ে গেছে খালু ...’
‘কী কী ...!’
‘প্রাইভেট কার পেছন থেকে ... কল লিস্ট দেখে কেউ একজন ফোন করেছিল ... কিছুই করার ছিল না খালু ...’ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বিনয়।

পুরো মহল্লা যেন উপচে পড়েছে। আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশীদের বিলাপ, আহাজারি—কেবল একমাত্র সন্তান হারানো আদেল সাহেব নির্বিকার! সোফায় দু চোখ বন্ধ করে বসে আছেন।

জানাযায় বাবাকে অনেকটা যেন জোর করেই নিয়ে যাওয়া হল। একটি কথাও বললেন না। কবরে ছেলেকে শোয়ানো হচ্ছে, তিনি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন এক পাশে। কেউ একজন এক মুঠ মাটি হাতে তুলে দেয়—এক দৃষ্টিতে হাতের মাটি দেখতে থাকেন।

ছেলের রুমে ঢুকে সারাদিন দরজা বন্ধ করে রইলেন। রবির জামা-কাপড় গোছালেন, বইগুলোর ধুলো মুছলেন। শেষে খাটে বসে থাকলেন চুপচাপ। আত্মীয়রা ডেকে খাওয়াতে চেষ্টা করলেন, তিনি দরজা খুললেন না।

পরদিন সকালে আলমিরা খুললেন, জমি বায়নার জন্য রাখা টাকাটা বের করলেন। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস করল না। প্যান্ট-ফতুয়া গায়ে চাপিয়ে মাথা নিচু করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন আদেল সাহেব।

ট্রেনের এক কোণে বসেছিলেন তিনি। এক যাত্রী এসে বলল ‘আঙ্কেল আপনার ভুল হয়েছে। এটা আমার সিট।’
উঠে এসে সিটটার পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন।
‘কোথায় যাবেন?’
কোনও প্রশ্ন শুনতে পেয়েছেন বলে মনে হল না। টিকেট চেকার এসে টিকেট দেখতে চাইলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন।
‘টিকেট দেখান।’
‘কাটতে ভুলে গেছি।’
‘আশ্চর্য! যাবেন কোথায়?’ গলায় ধমকের সুর।
‘কোথাও না...’
‘কী আশ্চর্য! কোথাও যাবেন না তো ট্রেনে উঠেছেন কেন?’ কোনও জবাব দেন না আদেল সাহেব।
‘এই হাশেম, সামনের স্টেশনে একে নামিয়ে দাও। যত সব পাগল-ছাগল...!’

সারা রাত সারা দিন স্টেশনে ঘোরাঘুরি করে কাটালেন। একটা পাউরুটি কিনে খেলেন। পানি খেলেন পাশের মসজিদের চাপকলে। বারান্দায় একটু শরীর এলিয়ে দিলেন আদেল সাহেব। কিছুক্ষণ পর যে লোকটি মসজিদের ভেতর কোরান তেলায়ত করছিলেন, দরজায় তালা লাগিয়ে বারান্দায় তাকে দেখতে পেয়ে উঠিয়ে দিলেন।
‘এটা আল্লাহর ঘর! ঘুমানোর জন্য নয়! আল্লাহর পথে আসেন, বেহেস্তে ঘুমানোর জন্য উত্তম ঘর অপেক্ষা করবে।’
উত্তম ঘর! উত্তম ঘর! বেহেস্ত ... বেরিয়ে এলেন। স্টেশনে একটু পাকা বেঞ্চে জায়গা পেলেন—সবাই যে যেটুকু পেরেছে দখলে নিয়ে শুয়ে আছে। সকালের আলো ফুটতেই স্টেশন ছেড়ে চলে গেলেন আদেল সাহেব।

গ্রামের জ্ঞাতি ভাই তাকে দেখে স্তম্ভিত! প্রযুক্তির এই যুগে দুঃসংবাদ পৌঁছতে দেরি হয়নি। কেউ কোনও প্রশ্ন করল না। কেবল ভেতরে আসুন বলে ঘরে নিয়ে গিয়েছে।

বিকেলের দিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না তাকে। অবশেষে গ্রামের কবরস্থানের মায়ের ঝোপালো কবরে মাথা নিচু করে বসে থাকতে দেখা গেল। মাত্র দুদিনে যেন বয়সটা হঠাৎ লাগামহীন হয়ে উঠেছে। চোখের নিচে কালি পাশের ত্বকে কাটাকুটি, কুঞ্চিত ললাট—সাদা মাথা আর খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি মুখটাকে অপরিচিত করে তুলেছে।

জ্ঞাতি ভাইকে দিয়ে ডেকে পাঠানোয় মসজিদ কমিটির দুজন ইমাম সাহেবকে নিয়ে উপস্থিত।
‘আমি মসজিদে কিছু টাকা দিতে চাই।’
‘আলহামদুলিল্লাহ...’ ইমাম সাহেব বললেন।
‘আপনি তলব করাতেই আমরা বুঝতে পেরেছি। আপনার মত বড় মনের মানুষ কয়জন আছে।’
মসজিদে কিছু দিন হয় তহবিলে সংকট চলছে। অবশ্য এই টানাটানি সব সময়ই থাকে এবং এই টাকাটা পাওয়ার পর টানাটানি আরও বেড়ে যাবে। উত্তর পাড়ার মসজিদে এদের চেয়ে বেশি দামের দামি টাইলস লাগিয়েছে। কয়দিন হল কেউ কেউ প্রস্তাব করছে তারা এবার গ্রামের মধ্যে প্রথম এসি লাগাবে।
‘তা কত টাকা দিতে চান ভাই সাহেব?’ আজিজ মণ্ডল দাঁড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন।
‘আমার কাছে নগদ তিন লক্ষ আছে; দুই লক্ষ চেক...’
‘মাসাল্লাহ! মাসাল্লাহ! পুরো নগদ দেয়া যায় না? আল্লার নামে কিছু নিয়ত করলে বাকি না রাখাই অতি উত্তম...’
‘একটা জমি বায়না করার জন্য তিন লক্ষ টাকা তুলেছিলাম—জমিটা আর কিনতে চাই না। চেকে সমস্যা হবে না—আজকেই তোলা যাবে।’
‘আল্লাহ আপনার ইচ্ছা পূরণ করুক। দুনিয়ায় জমি না কিনে আখেরাতের জন্য জমি কেনার নিয়ত করেছেন—এই জমিখানা ফুলে-ফলে ভরে উঠুক সেই দোয়া করি। আল্লাহ পাক সব থেকে সুন্দর বাড়িটি যেন আপনাকে দান করেন।’
সুন্দর বাড়ি! সুন্দর বাড়ি! মনে মনে বললেন।
‘আমিন! ইমাম সাহেব ঠিকই বলেছেন। আমরাও সেই দোয়াই করি। আল্লাহ-পাক আপনাকে সুমতি দিয়েছেন, তিনিই সবথেকে ভাল জানেন।’
এক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এল। আজিজ মণ্ডল বললেন ‘কাল বাদ আছর পাড়ার সবাইকে ডাকি—সেখানেই আপনি দানটা করলেন ভাই সাহেব। তাতে যুবকদের মধ্যে ঈমান-আকিদার জোর বাড়বে।’

আদেল সাহেবকে যখন নিয়ে যাওয়া হয় বেশ অবাক হলেন। মসজিদ প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে আম বাগান, বাঁশঝাড় পর্যন্ত লোকজনে ঠাসা। তাদের খুব কম সংখ্যকই আছরে নামাজ আদায় করতে মসজিদে প্রবেশ করল। ছোট একটা মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। তাকে একটা হাতলওয়ালা চেয়ারে বসানো হয়েছে। চারপাশে উৎসুক জনতা বিভিন্ন মন্তব্য করছে। ‘কত টাকা দেবে যে এত আয়োজন!’
‘লাখ তো হবেই।’
‘কীসের চাকরি করত রে? বড় চাকুরে মনে হয়।’
‘জানি না। তবে উপরি-টুপরি ভালই কামিয়েছে।’
‘হাজার কথার এক কথা! ঘুস খোরেরা শেষ কালে মসজিদ-মাদ্রাসায় দান-খয়রাত করে। কিন্তু লাভ নেই, উপরওয়ালা ঠিকই ছাই দিয়ে ক্যাঁক করে ... জিবলা টেনে ...’ মৃদু একটা হাসির রোল উঠল। একজন ধমকে উঠল ‘চুপ করো সব! চাচার ছেলে মারা গেছে। তাই ছেলের জন্য কিছু করতে চান। আর তোমরা মুখে যা আসে বলে যাচ্ছ!’ সব চুপসে গেল নিমিষে।

আদেল সাহেবের পেছনের ডান থেকে ফিসফিস করে কেউ বলল ‘মনে হয় পুলিশ বিভাগে ছিল। কঠিন হৃদয়! ছেলে মারা গেছে তবু বোঝা যায় না।’
‘ছেলে মারা গেছে তার কবরে না গিয়ে মায়ের কবরে বসে থাকে...’
‘মনে হয় ছেলে নেশাখোর ছিল, তাই কোনও কষ্ট নেই...’

টুকটাক এসব কথা কানে আসায় আদেল সাহেব বেশ বিব্রত বোধ করলেন। কমিটির সভাপতি সবাইকে চুপ করতে বললেন। সকলে নড়েচড়ে বসল। খুব সংক্ষেপে ভূমিকা না দিয়ে বললেন মাগরিবের ওয়াক্ত হয়ে আসছে আপনারা যা বলবেন তাড়াতাড়ি করেন।

ইমাম সাহেব দাঁড়িয়ে বললেন ‘আল্লাহ কখন কাকে হেদায়েত করবে কেউ জানে না। এই যে ভদ্রলোক উনি নামাজ আদায় করতেন অনিয়মিত। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় গতকাল থেকে আমাদের সাথে সব ওয়াক্তের নামাজ আদায় করছেন। তার দিলে রহমত বর্ষিত হয়েছে—তিনি দাঁড়ি রাখতে শুরু করেছেন (তিনি আদেল সাহেবের দিকে একবার তাকালেন।) তার জন্য আমরা সবাই দোয়া করব।’

আদেল সাহেব দাঁড়িয়ে আজিজ মণ্ডলের হাতে তিন লক্ষ টাকা এবং দুই লক্ষ টাকার চেক তুলে দিলেন। মাইকে ঘোষিত হল।
‘মারহাবা! মারহাবা!’ চারদিকে ধ্বনি উঠল।
‘আগামী পরশু থেকে আমাদের মসজিদের কাজ শুরু হবে। সবাই শুকরিয়া আদায় করি।’

আদেল সাহেব এক দৃষ্টিতে বাম পাশের আজিজ মণ্ডলকে দেখছিলেন আর তার কথা শুনছিলেন—বড় করে শ্বাস টেনে নিলেন তিনি—সোজা সামনে তাকালেন, লম্বা একটা নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • সেলিনা ইসলাম
    সেলিনা ইসলাম আমাদের সমাজের কিছু মানুষের ভণ্ডামি নিয়ে গল্পের থিমটা অসাধারণ লাগল। তবে গল্পের প্রথমদিকে কেমন যেন ছাড়া ছাড়া মনে হল কাহিনী। উপস্থাপনা এবং বাক্য গঠনে আরও সতর্ক হতে হবে। শুভকামনা নিরন্তর।
    প্রত্যুত্তর . thumb_up . ৯ মার্চ, ২০১৭
    • আহা রুবন আপনার অভিযোগের জবাবের কিছুটা প্রথম প্রতিমন্তব্যে আছে। পরামর্শের জন্য ধন্যবাদ।
      প্রত্যুত্তর . ৯ মার্চ, ২০১৭
  • এম ইমন ইসলাম
    এম ইমন ইসলাম ধর্মে রাজনীতি বা রাজনীতিতে ধর্ম যেটায় বলি না কেন সঠিক ভাবে ব্যবহার হলেই সুন্দর হবে। তবে মানবিকতাকে বাদ দিয়ে কখনো ধার্মিক হওয়া যায় না।
    ভালোই লিখেছেন। আরও ভালো, শিক্ষাণীয় গল্প আশা করি। ভোট দিতে মানা নেই!
    প্রত্যুত্তর . ১২ মার্চ, ২০১৭
  • ইমরানুল হক বেলাল
    ইমরানুল হক বেলাল বেশ সুন্দর গল্প লিখেছেন দরদী ।
    পাঠে মুগ্ধতা জানিয়ে গেলাম ।
    প্রত্যুত্তর . ১৮ মার্চ, ২০১৭