বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫
গল্প/কবিতা: ৪৩টি

ঋণ

ঋণ জুলাই ২০১৭

শঙ্খমোচড়

নগ্নতা মে ২০১৭

পরিধি বিহীন বৃত্ত

অবহেলা এপ্রিল ২০১৭

গল্প - পার্থিব (জুন ২০১৭)

তমসা শেষে

ফাহমিদা বারী
comment ১০  favorite ১  import_contacts ২৪১
এক
সুরমার ছেলে বাবর দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে ছুটে এসে খবর দিলো,
‘ও মা, তোমার বাপজানের নাকি মেলা অসুখ! আর নাকি বাঁচবো না। তোমারে ডাইকা পাঠাইছে। বাপজান কইলো তোমারে গিয়া শিগগির খবর দিতে।’
সুরমা ছেলের কথা শুনে অনেকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলো না। তার ধাতস্থ হয়ে নিতে সময় লাগছে। যা শুনলো ঠিক শুনলো কী না! তার বাবা তাকে ডেকে পাঠিয়েছে? এটা কীভাবে সম্ভব!
শীতের সকালের মিষ্টি রোদটা সবে মাত্র জমে এসেছে। সুরমা এক গাদা থালাবাসন পাশের পুকুর পাড় থেকে ধুয়ে নিয়ে এসেছে। গতকাল রাতের বাসি থালাবাসনের সাথে সকালের গুলো একসাথে জমিয়ে তারপরে সে পুকুর পাড়ে যায়। এই নিয়ে স্বামী হারেজ আলী প্রতিদিনই তার সাথে খ্যাঁচখ্যাঁচ করে।
‘বলি, তুমি কেমন গো! রাইতের টা রাইতে ধুইবার পারো না? সারারাত আঁইটা থালাবাসন ঘরের মইধ্যে পইড়া থাকে।’
সুরমার নিজেরও পরিষ্কারের বাতিক আছে। দিনমান সে ছোটাছুটি করে ঘরদোর ঝকঝকে তকতকে করে রাখে। কিন্তু রাতের বেলায় পুকুরপাড়ে গিয়ে থালাবাসন ধোওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। তার ভূতের ভয় আছে। বলা তো যায় না, ‘উনারা’ কোথায় কীভাবে ঘাঁপ্টি মেরে থাকে! আজ এতোগুলো বছরেও এই নিয়মের সে ব্যত্যয় ঘটাতে পারেনি।
উনিশ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছে সুরমার। এখন সে পঁয়ত্রিশ বছরের ভরা যুবতী। তিন ছেলেমেয়ের মা। এই দীর্ঘ ষোল বছরে অনেক পরিবর্তন এসেছে তার জীবনে। শাশুড়ির সংসারের ভীরু, ব্যক্তিত্বহীন একজন মানুষ থেকে আজ সে তার একক সংসারের সর্বময় কত্রী। কিন্তু একটা বিষয়ে আজো তার জীবনে কোনো পরিবর্তন আসেনি। এতোগুলো বছরে একদিনের জন্যও তার বাপের বাড়ি যেতে ইচ্ছে করেনি। ভুলেও কখনো সে বাপের বাড়ির নাম মুখে আনেনি। তার স্বামীই অনেকসময় প্রসঙ্গ টেনে এনে বলেছে,
‘এদ্দিন হইয়্যা গেল, একবারের জন্যও বাপের বাড়িত যাইবার মন চায় না তুমার? এমুন মাইয়ামানুষ জিন্দিগীতে দেহি নাই আমি।’
সুরমা তার শাশুড়ির সংসার করেছে দশ বছর। এই দশ বছরে তার কারো কাছে অভিযোগ জানানোর কোনো সুযোগ ছিল না। শাশুড়ির কথাই ছিল শেষ কথা। অনেকদিন সে আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছে। ঘুমহীন রাতে বুকচাপা দীর্ঘশ্বাসে তার বালিশ ভারী হয়েছে। জন্মের পরেই হারিয়ে ফেলা মায়ের কাল্পনিক অস্তিত্ত জুড়ে নিয়েছে বালিশের সাথে। সেটাকেই আঁকড়ে ধরেছে পরম মমতায়। সহস্র অভিযোগে বিদ্ধ করতে চেয়েছে প্রাণহীন নিষ্ক্রিয় বালিশের অসার দেহটাকে।
পাশে অঘোরে ঘুমে কাদা হয়ে থেকেছে স্বামী। সুরমার দীর্ঘশ্বাস তার শান্তির ঘুমে কোনো ব্যাঘাত ঘটায়নি। বাপের বাড়ি থেকে কানাকড়িও আনতে পারেনি দেখে অজস্র খোঁটায় এফোড় ওফোড় হয়েছে সুরমা। শাশুড়ি একেবারে পাড়া প্রতিবেশীকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলেছেন,
‘ফইন্নির ঘরেত বিয়্যা দিছি পোলারে। এক চিমটি সোনাও লগে আনবার পারেনি। আমার পোলারে নেওনের লাইগা মাইয়ার বাপের লাইন লাগছিল। আমার পোড়া কপাল জুটায় দিছে এমুন বউ...’
সুরমা দাঁতে দাঁত চেপে সর্বংসহা বৃক্ষরূপ ধারণ করেছে। একটা কথারও জবাব দেয়নি। বলুক যা খুশি! বলেই যদি কলিজায় শান্তি আসে তো আসুক!
অবশ্য বউ বাপের বাড়ির নাম নেয় না দেখে একদিক দিয়ে শাশুড়ি বেশ খুশিই ছিলেন। বউ যদি বাপের বাড়ির দিকে এক পা দিয়ে রাখে, তাহলে নাকি সেই সংসারে ভর-ভরান্তি আসে না। সারাজীবন দুর্দশা লেগেই থাকে।
কিন্তু বাপের বাড়ির দিকে পা দিয়ে না রাখলেও সুরমা’র সংসারে কখনোই ভর-ভরান্তি আসেনি। নিত্য অভাব যেন লেগেই আছে তার সংসারে। সামান্য যেটুকু সম্বল ছিল, এক ননদের বিয়ে দিতে সেটুকুও খুইয়েছে। সেই সম্বলে হাত দিতে দোনোমোনো করছিলো সুরমার স্বামী হারেজ আলী। তাতে ছেলেকেও শাপ-শাপান্ত করতে ছাড়েনি শাশুড়ি।
‘দেখ হারেজ, এই আমি কইয়া রাখলাম...আমার মাইয়ার যদি ট্যাকার লাইগা ভালা ঘরে বিয়া না হয়, তর সংসারের মুখে আগুন লাগবো। ফইন্নির মাইয়া লইয়াও আর সংসার করবার পারবি না। তোরে খাওয়াইয়া পরাইয়া বড় করছি না? ওহন, বইনের দায়িত্ব নেওনের আগে তোরে দুইবার ভাবন লাগে? ফইন্নির মাইয়া যদি তরে উলটাপালটা কিছু বুঝ দ্যায় তয় এই কইলাম...’
সেই শাপ-শাপান্তে দিশেহারা হয়ে সুরমা ছুটে এসে স্বামীর কাছে মিনতি জানিয়েছে,
‘আপনার পায়েত ধরি। বেবাক ট্যাকা দিইয়া দেন।’
‘বেবাক ট্যাকা দিইয়া দিলে তুমার মাইয়ার কী হইবো হেইডা ভাবছো?’
‘আল্লাহয় কপালে যা রাখছে একটা কিছু হইবো। আপনে ট্যাকা দিতে দেরি কইরেন না!’
হারেজও আপন মনে গজগজ করেছে,
‘এহন বুঝবার পারতাছো না। দিন আইলে বুঝবার পারবা। দুই মাইয়ারে কেমনে পার করবা হেই চিন্তা আছেনি তুমার? আমার তো আর হেই কপাল নাই যে শ্বশুরের ...’
শেষের কথাগুলো এতোটাই অস্ফূটে বলা যে, কান পেতে না রাখলে শোনা যায় না। সুরমার কান পাততে হয় না। সে এমনিতেই বুঝতে পারে তার স্বামীর শেষের কথাগুলো।
হারেজ আলী কিছুদিন আগেও শ্বশুড়ের সয়-সম্পত্তি পাওয়া না পাওয়া নিয়ে কোনো আক্ষেপ করেনি। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে ততই যেন তার চাপা ক্ষোভ আগল খুলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। দিনকে দিন তার সংসারের অবস্থা বেহাল হচ্ছে। টুকটাক ব্যবসাপাতি করে সে। তাতে লাভের মুখ দেখা তো দূরের কথা, এখন মূলধনই বলতে গেলে উঠে আসে না। কাজেই এই পরিস্থিতিতে তার আর মাথা ঠিক রাখার কোনো জো নেই। এতোদিন সে কখনোই শ্বশুরের টাকা পয়সার দিকে নজর দেয়নি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। হারেজ আলী বুঝে গেছে যে, তার অবস্থা এর চেয়ে ভালো কখনোই হবে না।
সুরমার বাপের বাড়ি পাশের গ্রামে। তার বাবা মীর হায়দার আলী তাদের গ্রামের একজন যথেষ্ট ধনাঢ্য ব্যক্তি। কাড়ি কাড়ি না হলেও তার জমা জমির পরিমান চোখ ঠাঠানোর মতোই। বলাই বাহুল্য, এই সম্পত্তির গন্ধ পেয়েই হারেজ আলীর মা তার ছেলের সাথে নিজ উদ্যোগে সুরমার বিয়ে দিয়েছিলেন। ‘ফইন্নির মেয়ে’ কে অন্য কেউ এসে তার ছেলের ঘাড়ে জুটিয়ে দেয়নি। তিনি নিজেই তাকে খুঁজে পেতে বের করেছিলেন, ভবিষ্যতের সমৃদ্ধির আশায়।
কিন্তু হা হতোস্মি সে আশায়! মীর হায়দার আলীর মতো কৃপণ ব্যক্তি এই তল্লাটে আর একটাও আছে কী না সন্দেহ। তার তিন ছেলে এক মেয়ে। সর্বশেষ সন্তান মেয়েকে জন্ম দিতে গিয়ে স্ত্রী গত হয়েছেন। এই মেয়েকে বড় করতে তিনি তেমন কিছু খরচ পাতি করেননি। ছেলেদের পড়িয়েছেন। তিন ছেলেই মেট্রিক পাশ দিয়েছে। মেয়ে দু’দিন পরেই পরের বাড়ি চলে যাবে। তাকে পড়াতে গিয়ে তিনি তার গাঁটের পয়সা নষ্ট করেননি।
সম্পত্তির উইলও করে ফেলেছেন ইতিমধ্যেই। সেখানে মেয়ের জন্য তিনি নামমাত্র কিছু টাকা রেখেছেন। নেহায়েত চক্ষু লজ্জার খাতিরে রাখতে হয় বলে রাখা। জমাজমি’র এক কানাও মেয়েকে দেননি। এতো কষ্টের সম্পদ তার। খামোখা পরের ছেলেকে দেওয়ার কোনোই মানে হয় না। এই নিয়ে তার মনে কোনো অনুশোচনাও নেই। মেয়েকে বড় করেছেন, ভালো ছেলের সাথে বিয়ে দিয়েছেন...বাবা হিসেবে তার দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন।
সুরমা ছোটবেলা থেকেই তার প্রতি তার পিতার এই ‘বিমাতা’ সুলভ আচরণ দেখেই বড় হয়েছে। খাবারের পাতে ভালো অংশ কিংবা উৎসব পার্বণে ভালো পোশাক আশাক কোনো কিছুতেই তার অগ্রাধিকার ছিল না। তার নিজেরও কতোদিন ইচ্ছে হয়েছে মাছের মুড়ো দিয়ে ভাত খেতে। ভাইয়েরা খেতে না চাইলে তবে কখনো সখনো হয়তো তার ভাগে এসে পড়েছে। নতুন একটা ফ্রকের জন্য কতোদিন সে বাবার কাছে বায়না করেছে। বাবা ধমক দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে তাকে। চোখের পানি মুছতে মুছতে সরে এসেছে সে। ভাইয়েরাও কোনোদিন আদর করে ছোট বোনটার হাতে কোনোকিছু গুঁজে দেয়নি। অনাদরেই একা একা অগোচরে বেড়ে উঠেছে সুরমা।
তাই একবিন্দু চোখের পানিরও অহেতুক খরচ না করে সুরমা স্বামীর বাড়ি এসেছে। একবারের জন্যও পেছন ফিরে তাকায়নি। যা সে ফেলে এসেছে তাকে চিরতরেই দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু স্বামীর এই আর্থিক অনটন আবার যেন তাকে সেই বাড়ির পথে পা বাড়াতেই প্রলুব্ধ করছে। আজ এতোদিন বাদে সে কীই বা গিয়ে বলবে? আর তাতে কতোটুকুই বা ফল মিলবে...সুরমা ভেবে পায় না।
এর মাঝেই এই অকস্মাৎ সংবাদ! তার বাবাই তাকে ডেকে পাঠিয়েছেন! কিন্তু কেন?

দুই
হায়দার আলী যেন মৃত্যুকে সামনে দেখতে পাচ্ছেন। কালো পোশাকে আচ্ছাদিত মৃত্যু একেবারে তার দোরগোড়ায় এসে হাজির। একটুখানি অসতর্ক হলেই সে তার মরণথাবা বসিয়ে দেবে। তিনি প্রাণপন তৎপরতায় তাকে ঠেকাতে চাচ্ছেন। তবু বুঝতে পারছেন, সব আয়োজন নিস্ফল। মৃত্যু তার পরোয়ানা জারী করে দিয়েছে।
হায়দার আলী দিশেহারা হয়ে তার জীবনের হিসেব নিকেশের খাতা খুলে বসলেন। প্রথমেই তার মনে পড়লো মেয়ে সুরমা’র কথা। মেয়েকে তিনি বঞ্চিত করেছেন। অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত করেছেন। মেয়ের বিয়ের পরে সে একবারের জন্যও তার বৃদ্ধ পিতাকে দেখতে আসেনি। তাতে অবশ্য তার তেমন কিছু মাথাব্যথাও ছিল না। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, ঝামেলাও চুকে গেছে। ছেলেরা তার জমাজমির হাল ধরেছে। দিব্বি তরতর করে বেড়ে চলেছিল সয় সম্পত্তি।
কিন্তু সব হিসেব গন্ডগোল হয়ে গেল। তিনি বেশ বুঝে গেছেন তার সময় শেষ। এখানকার হিসেব চুকিয়ে দিতে হবে কড়ায় গণ্ডায়। নইলে মৃত্যু তাকে কষ্ট দিয়ে দিয়ে মারবে। একবারে শেষ করবে না।
গ্রামের ডাক্তার আব্দুল হক, হায়দার আলী’র বিছানার সামনে রাখা চেয়ারে বসে আছেন। চিন্তিত মুখে রোগীর নাড়ি দেখছিলেন তিনি। শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত। অনিয়মিত নাড়ির স্পন্দন। এই বয়সে বৃদ্ধ’র শরীর নিমোনিয়ার ধাক্কাটা নিতে পারছে না। আব্দুল হক তেমন বেশি কিছু আশার বাণী শোনাতে পারছেন না।
হায়দার আলীও ডাক্তারের মুখ দেখে যা বোঝার বুঝে নিলেন। তিনি ছেলেদের ডেকে পাঠালেন।
‘বাবারা, তুমাগো বইন সুরমারে খবর দাও। কও, আমি ডাইকা পাঠাইছি।’
ছেলেরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলো। তাদের কাছে লক্ষ্মণ ভালো মনে হলো না। মৃত্যু শয্যায় শুয়ে বুড়ো বাপের কী মতিভ্রম হলো নাকি! নতুন করে উইল করতে বসবে না তো!
ছেলেদের আশঙ্কাই সত্যি হলো হায়দার আলীর পরের কথায়,
‘কাশেম উকিলরেও আসতে কইয়ো। আমি তুমাগো বইনরে ঠকাইছি। হ্যারে কিছু দেই নাই আমি। আইজরাইল তাই আমারে কষ্ট দিয়া মারবো। মরার পরে কী হইবো আমি জানি না...তুমরা হ্যারে ডাইকা আনো। আমি হ্যার কাছে মাফ চামু...।’
তিন ছেলে একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে গেল। বিষয় আশয় গুছিয়ে নিয়ে তারা তিন ভাই তাদের বাবার সম্পত্তিতে একেবারে জেঁকে বসেছে। উন্নতিও হয়ে চলেছে দুরন্ত গতিতে। হায়দার আলী এতোদিন এক হাতে যা কষ্ট করে সামলিয়েছেন, তারা তিন ভাই জোট বেঁধে তিন হাতে তা সামলিয়ে চলেছে নিখুঁত পারদর্শীতায়। একমাত্র বোনকে বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া গেছে নির্ঞ্ঝাটভাবে। এখন এসব কী যন্ত্রণা!
তারা খোঁজ নিয়ে জেনেছে, বোনের আর্থিক অবস্থা তেমন সুবিধার নয়। সে যে খবর দেওয়া মাত্রই ছুটে আসবে সে কথা চোখ বুজে বলে দেওয়া যায়। তাদের বাপের যে মনের অবস্থা, এখন একটু তাপে লোহাও গলে যাবে। বোন এসে যদি দুটো দুঃখের প্যাঁচালী শোনায়, ব্যস! তবেই হয়ে যাবে!
তিনভাই দাওয়ায় বসে নিজেদের মধ্যে শলা পরামর্শ করতে লাগলো। এখন যে করেই হোক, এটা ওটা বুঝিয়ে তার বাবাকে শান্ত রাখতে হবে। কিছুতেই সুরমাকে খবর দেওয়ার কথা আর যেন মুখে না আনতে পারে। কী করা যায় তারা জোর আলাপ চালাতে লাগলো।
হায়দার আলীর হাঁকডাক ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ছেলেদের আরো বার কয়েক তাগাদা দিলেন তিনি। কাশতে কাশতে গলার নালী ছিঁড়ে যাবার উপক্রম হলো। প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে তার। বুক থেকে ঘরঘর শব্দ শোনা যাচ্ছে। ডাক্তার আব্দুল হক বাইরে বেরিয়ে এলেন। তিন ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
‘উনি যা করতে বলছেন তাড়াতাড়ি করুন। উনার হাতে কিন্তু সময় বেশি নাই।’
ছেলেদের মধ্যে তবু ভাবান্তর দেখা গেল না। এখন তাদেরকে গ্রাস করে আছে জমির উইল। যাই হোক না কেন, কিছুতেই এই উইল পরিবর্তন করানো যাবে না। তারা প্রসঙ্গ ঘোরানোর জন্য বললো,
‘বাবারে যদি সদরে নেওয়া যায়, তাইলে কীমুন হয়?’
‘নিতে পারেন, কিন্তু উনার অবস্থা পরিবর্তন হওয়ার আমি তেমন সম্ভাবনা দেখি না।’
ছেলেরা বাপের কাকুতি মিনতি, হৈ চৈ অগ্রাহ্য করে তাকে সদর হাসপাতালের নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় করতে লাগলো। আপাতত এটা দিয়েই বুড়োর মনোযোগ সরিয়ে রাখা যাবে।
কিন্তু তাদের সব রকম সতর্কতা সত্বেও পরদিন সকালের মধ্যেই সুরমার স্বামীর কাছে খবর পৌঁছে গেল যে, তার শ্বশুর সুরমাকে দেখতে চেয়েছেন। এমন খবর নাকি বাতাসে ছড়ায়। সেরকম ভাবেই খবর ছড়িয়ে গেল পাশের গ্রামে।
সুরমার স্বামী হারেজ আলী খবরটা শুনে আর দেরি করে না। তৎক্ষনাৎ ছেলে বাবরকে গিয়ে তার মাকে জানাতে বলে। এমন একটা খবরের অপেক্ষাতেই বসে ছিল হারেজ আলী। আজ এতোদিন পরে সেই সুসময়টা এসেছে। শ্বশুর নিশ্চয়ই তার ভুল বুঝতে পেরেছেন। মেয়েকে বঞ্চিত করার জন্য আজ এতোদিন বাদে তার অনুশোচনা জেগেছে। তাই মৃত্যুর আগে তিনি নিজের ভুল সংশোধন করে নিতে চান। মেয়েকে সম্পত্তির ভাগ দিতে চান।
খুশি খুশি মনে ঘরে পা রেখে হারেজ আলী দেখতে পায়, সুরমা ঘরের উঠোনে পা ছড়িয়ে নিশ্চল বসে আছে। কেমন যেন নিশি পাওয়া মানুষের মতো চোখের দৃষ্টিতে একটা দিশেহারা ভাব। পাশে ছড়িয়ে আছে ধুয়ে নিয়ে আসা বাসন কোসন। হারেজ আলী সুরমাকে ঐভাবে বসে থাকতে দেখে জোর তাগাদা লাগায়,
‘তুমি অক্ষনো অমনে বইসা আছো? উঠো শীগগির। তুমার বাপে খবর দিছে। দেরি কইরো না।’
সুরমা ইতস্ততঃ কণ্ঠে ক্ষীণ প্রতিবাদ জানিয়ে বলে,
‘আমারে আইজ এদ্দিন বাদে বাপজানের কী দরকার? আমি হ্যানে গিয়া কী করমু?’
হারেজ আলীর বিরক্তি সীমা ছাড়ায়। একরকম খেঁকিয়ে বলে ওঠে,
‘এইসব ভাবের কথা থুইয়া জলদি উঠো কইলাম। দেরি করোন ঠিক অইবো না।’
এদিকে সুরমার বাবা হায়দার আলীর শেষ সময় উপস্থিত। তার শিয়রের কাছে ছেলে ছেলের বউ নাতিপুতি সবাই এসে দাঁড়িয়েছে। তিনি ক্ষণে ক্ষণে সুরমাকে ডেকে চলেছেন।
‘ও সুরমা! ও মা! আমারে মাফ কইরা দে মা! আমারে এই পাপ থেইকা মুক্তি দে রে মা! আইসা তোর ভাগের জিনিস নিয়্যা যা রে মা।’
কাশেম উকিলকে ডাকতেও একাধিকবার তাগাদা দিয়েছেন। কাশেম উকিলের কাছেও কে যেন গিয়ে খবর দিয়েছেন। হায়দার আলীর ঘরে পাড়া প্রতিবেশিরা ভীড় করেছে। তাদেরই কেউ খবর দিয়ে থাকবে হয়তো! কাশেম উকিল যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলো, এমন সময় হায়দার আলীর ছোট ছেলে এসে শাঁসিয়ে গেছে যেন বাড়ির বাইরে পা না দেয়।
হায়দার আলীর অস্থির অবস্থা দেখে একজন এসে তার কানে কানে জানিয়ে যায়, সুরমাকে খবর দেওয়া হয়েছে। সে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়লো বলে!
এই খবর জেনে সুরমার বাবা কেমন যেন স্বাভাবিক হয়ে গেলেন। এতোক্ষণের হৈ চৈ অস্থিরতা নিমেষে উধাও! বুকের ঘরঘরানিও অনেকটা কমে গেল। তিনি কেমন যেন সুস্থ বোধ করতে লাগলেন। কাল রাত থেকে তার ক্ষুধা তৃষ্ণা সব অনুভূতি চলে গিয়েছিল। এখন একটু যেন ক্ষুধা ক্ষুধাও বোধ হচ্ছে।
ডাক্তার আব্দুল হক কাছেই ছিলেন। তিনি এসে রোগীর নাড়ী দেখলেন। নাড়ী একদম স্বাভাবিক। রোগীকে পরীক্ষা নিরিক্ষা করে তার মনে হতো লাগলো যেন এই যাত্রায় ফাঁড়া কেটে গেছে। তিনি যারপরনাই বিস্মিত হলেন। তার এতো বছরের ডাক্তারী জীবনে এই ঘটনা এবারই প্রথম। গ্রামের ডাক্তার হলেও তার হাতযশ আছে। রোগীর নাড়ী টিপে তিনি ঠিক তার অবস্থা বুঝতে পারেন। অথচ, এ যে একেবারে উল্টো ঘটনা ঘটতে চলেছে!
হায়দার আলী বিছানায় শোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসলেন। মুরগীর মাংস দিয়ে দুগ্রাস ভাত খেলেন। একটা খিলি পানও কিছুক্ষণ চিবুলেন। শরীরটা বেশ হালকা লাগছে। যেন একটা ঝড় শেষে ঠান্ডা শীতল হাওয়া এসে গায়ে লাগছে।
দুপুরের পরে পরেই সুরমা চলে এলো। সাথে তার ছেলে বাবর।
ঘরের দুয়ারে পা রেখে সুরমার মনে কোনো ভাবান্তর জাগলো না। সে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারপাশটা দেখতে লাগলো। ষোল বছর আগে ফেলে যাওয়া কোনো স্মৃতিই তার ভাবাবেগকে জাগিয়ে তুললো না। বাড়ির আনাচে কানাচে কোথাও সে এক চিলতে মমতার দানা খুঁজে পেল না।
তার ছেলে বাবর অবাক বিস্ময়ে তার নানাবাড়ি দেখতে লাগলো। সে শুনেছিল তার নানা মস্ত বড়লোক। আজ চাক্ষুষ দেখে তার বিস্ময় যেন বাঁধ মানছে না।
সুরমাকে দেখে হায়দার আলী চোখ পিটপিট করে চাইলেন। সুরমা এগিয়ে গেল বাবার দিকে।

তিন
কথায় আছে, পৃথিবীতে সবচেয়ে মধুর সম্পর্ক নাকি বাবা-মেয়ের। সেই মধুরতম সম্পর্কের বাঁধনে বাঁধা দুজন মানুষ অত্যন্ত সতর্ক দৃষ্টিতে একজন আরেকজনকে নিরীক্ষণ করছে। হায়দার আলীই নীরবতা ভাঙলেন,
‘কী রে! একা আইছোস? তোর জামাইও আইছে নি?’
‘জামাই আসে নাই। তুমার শরীল কেমন?’
হায়দার আলী তার স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্য আর কাঠিণ্যের আবরণে নিজেকে তৎক্ষনাৎ ঢেকে নিলেন। কিছুক্ষণ আগের অযাচিত পাগলামীর জন্য নিজেকে মনে মনে তিরস্কার করলেন। অকম্পিত স্বরে বললেন,
‘শরীল ভালা। তুই কি আইজগা থাগবি নাকি...’
সুরমা প্রখর দৃষ্টিতে সামনে বসে থাকা দূর্বল অথচ ঋজু স্বভাবের মানুষটাকে দেখলো। সে বুঝতে পেরেছে, ষোল বছর আগের সেই মমতাহীন আশ্রয়টা আজো ঠিক তেমনি আছে।
‘থাকুম না বাবা। বাইরে ভ্যান দাঁড় করাইয়া রাখছি। চইলা যামু। আমার পোলাডারে একটু খাওন দিবা? ছোড মানুষ। না খাইয়া আইছে। মুখটা ছোট হইয়া আছে।’
সুরমার ভাইয়েরা তীক্ষ্ণ সজাগ চোখে তাদের বোন আর বাবার কথাবার্তা শুনছিলো। এতোক্ষণে তারা নিশ্চিত হলো। যাক, কালো মেঘ কেটে গেছে। আর চিন্তা নাই। বাপের সুমতি ফিরেছে।
বিকেলের দিকে সুরমা আবার তার বাপের বাড়ি থেকে চিরবিদায় নিয়ে দ্বিতীয়বারের জন্য স্বামীর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। অনেকখানি আসার পরে সে বেশ দূর থেকে একটা শোরগোল শুনতে পেলো। লোকজনের মিলিত পদচারণা, কান্নার আওয়াজ। আওয়াজ টা ভেসে আসছে তার বাপের বাড়ির দিক থেকেই।
মেয়েকে দৃপ্ত কন্ঠে বিদায় জানানোর অল্প কিছু পরেই হায়দার আলী পৃথিবীকেও শেষ বিদায় জানালেন।
বাপের বাড়ির দিকে তাকিয়ে সুরমা একটা কিছু বুঝতে পারলো। দু’পলক সেদিকে তাকিয়ে নিস্পৃহভাবে ভ্যানওয়ালার দিকে চেয়ে বললো,
‘জলদি জলদি টান লাগাও। রাইতের আগে আগে বাড়িত যাইবার পারি য্যান।’
বাইরে তখন জমতে শুরু করেছে কুয়াশার ঘের। আবার বুঝি তমসা এসে ঘিরে ধরে, এই আশঙ্কায় সুরমা ব্যগ্রভাবে ফেরার তাড়া অনুভব করে।



আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • মনোয়ার মোকাররম
    মনোয়ার মোকাররম শেষ টা এক কথায় দারুন।
  • কাজী জাহাঙ্গীর
    কাজী জাহাঙ্গীর গল্পের চেয়ে লেখকের বর্ণনাশৈলীই টানে বেশী, বেশ প্রাঞ্জলাতায় ভরপুর। কিন্তু কাহিনীটা একটু সেকেলে ধরনের হয়ে গেল। আগের লেখাগুলোতে যেরকম নতুনত্ব/চমক পেতাম এবার সেরকম হলনা। বিভিন্ন গল্প /নাটক/ আলোচনায় বিষয়টা শুনতে শুনতে বেশ কান ঝালা পালা হবার জোগাড়। যদিও গল্পে আ...  আরও দেখুন
    • ফাহমিদা বারী দু'বার পড়লাম মন্তব্যটা। ভালোভাবে বোঝার জন্য। মেয়েদের ছেলেদের প্রাপ্য সম্পত্তির অর্ধেক দিতে হয়, এটা গ্রামের বা শহরের সব শ্রেণির মানুষই জানে। তথাকথিত 'প্রগতিবাদি'রা কী ভাবে তা নিয়ে আমি ভাবছি না। গ্রামের একজন সাধারণ, ধূর্ত, মতলববাজ আবার একইসাথে যে মৃত্যুভয়ে কাতর এমন একজন মানুষের বোধ দিয়ে আমি দেখার ও বোঝার চেষ্টা করেছি। গতানুগতিক বা সাদামাটা এসবের উত্তরে কিছু বলার নেই ভাই। যে যেভাবে দেখে। এই গল্পের চেয়ে আমার ত মনে হওঁয় 'শংখমোচড়' গল্পটির কাহিনি অনেক বেশি সাদামাটা। এখানে পিতা কতৃক বঞ্চিত এক মেয়ের গল্প বলেছি যে ষোল বছরে বাবার বাড়ী যাওয়ার কথা মুখে আনেনি। একজন নারীর চোখ দিয়ে দেখলে বুঝবেন, এই বিষয়টা খুব গতানুগতিক নয়। সে যাক, গল্প পড়া ও বিস্তারিত মন্তব্য করার জন্য অশেষ ধন্যবাদ, :)
  • মোঃ কবির হোসেন
    মোঃ কবির হোসেন golpotite amader somajer kichhu chitro nikhut vabe tule dhorechhen. amar kachhe apnar golpoti oshadharon legechhe.