বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫
গল্প/কবিতা: ৪৭টি

সমন্বিত স্কোর

৫.০৬

বিচারক স্কোরঃ ৩.০৩ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.০৩ / ৩.০

নামছো কোথায়

আঁধার অক্টোবর ২০১৭

আমার আপন আঁধার

আঁধার অক্টোবর ২০১৭

কুহেলী

ভৌতিক সেপ্টেম্বর ২০১৭

গল্প - আমার স্বপ্ন (ডিসেম্বর ২০১৬)

মোট ভোট ৫৪ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.০৬ স্বপ্নের সিঁড়ি ভেঙে...

ফাহমিদা বারী
comment ৩৫  favorite ১  import_contacts ২,৩৫৮
এক
‘আমি শুনেছি আপনি খুব ভালো লেখেন। আমার জীবন নিয়ে একটা গল্প লিখবেন?’
আমি চোখ সরু করে তাকালাম আমার সামনে দন্ডায়মান প্রায় ছয় ফুটের কাছাকাছি উচ্চতার দীর্ঘকায় মানুষটার দিকে। উজ্জ্বল ফর্সা লোকটির গায়ের রঙ। মাথার চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করা। কুচকুচে কালো জোড়া ভ্রুর নীচে বুদ্ধিদীপ্ত উৎসুক দুটি চোখ আর তার সাথে মানানসই তীক্ষ্ণ নাক। মুখের গড়ন অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বয়স চল্লিশ আর পঁয়তাল্লিশের মাঝামাঝি কোনো একটা জায়গায়। পরনে দামী স্যুট, বাহারী টাই। তার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে জলপাই রঙের একরঙা শার্ট। লোকটার সার্বিক অবয়বে একটা অতি আভিজাত্যের ছাপ। এমন একজন মানুষের আমাকে দিয়ে গল্প লেখানোর পেছনে কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে তা ঠিক আমার বোধগম্য হচ্ছে না।
তবে এমন আবদার যে এটাই প্রথম শুনছি এমনটাও ঠিক নয়। ইদানীং মাঝে মধ্যেই দুএকজন এমন খেজুরে আবদার জানিয়ে বসে। শখের লেখালেখির গণ্ডি ছাড়িয়ে এখন অনেকটা পেশাদারিত্বের দাবি নিয়ে লিখছি। প্রায়ই এখানে সেখানে ছাপার হরফে নিজের লেখা দেখতে পাই। পিতার দেওয়া নামটাও এখন অনেকের কাছে পরিচিতি পেয়েছে। এই বছর লেখালেখির পেছনে আরেকটু বেশি সময় দিবো এই আশায় অফিস থেকে একবছরের ছুটিও নিয়েছি। ইচ্ছা আছে একটু নিরিবিলি কোথাও গিয়ে কিছুদিন থাকার, প্রকৃতির কাছাকাছি। পরিচিতজনদের কাছ থেকেও খানিকটা আড়ালে যেতে চাই। দেখা হলেই কেন ছুটি নিলাম, এতো দীর্ঘ সময় বাসায় বসে কী করবো ইত্যাদি হাজার প্রশ্ন করে সবাই। এখন আমি যদি ছুটি নেওয়ার পেছনের আসল উদ্দেশ্য সবাইকে জানিয়ে দিই, তবেই হয়েছে আর কী! কাজের ফাঁকে অল্পবিস্তর লেখালেখি করছি এই পর্যন্ত ঠিক আছে। তাই বলে এটার জন্য আসল কাজ থেকে ছুটি? এটা কোনো কাজের কথা হলো! লেখালেখি তো ফাঁকে ফাঁকেই করতে হয়। এটার জন্য আবার ছুটি নিতে হয় না কী! কিন্তু লেখালেখিও যে বললেই কলমের আগায় চলে আসে না, এর জন্যও যে দস্তুরমতো প্রস্তুতি নিতে হয় এটা তাদেরকে বোঝানো আমার কম্মো নয়।
সে যাক। আপাতত এই সুদর্শন ভদ্রলোককে কীভাবে ভদ্র ভাষায় ‘না’ বলা যায় আমি সেই দিকে মনোনিবেশ করলাম।
চমৎকার সুন্দর ভাবে শুরু হয়েছিল আজকের দিনটা। বাসায় রোজকার হৈ-হট্টগোল নেই। কেবল শান্তি আর শান্তি। গিন্নি দুদিনের অবকাশ যাপন করতে তার বাবার বাড়িতে গিয়েছে। ছেলেমেয়েদুটোকেও সঙ্গে নিয়ে গেছে। ফ্রিজে আমার দু’দিনের রসদ মজুত করে গিয়েছে। অতএব আপাতত মাথায় কোনো আলাদা চাপ বোধ করছি না। শীতের সকালের মিঠেকড়া রোদ সবে সোনা ঝরাতে শুরু করেছে। আমার লেখার টেবিলের পাশের জানালাটা খুলে দিয়ে একমগ ধোঁয়া ওঠা গরম চা নিয়ে বসেছি…এমন সময় এই অনাহুত অতিথির আগমন। আমি ঈষৎ বিরক্তি বোধ করলাম। মনের ভাব গোপন রেখে হাসিমুখে বললাম,
‘বসুন, আপনাকে এই পাড়ায় আগে দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না!’
‘ঠিকই ধরেছেন। আমি এখানে খুব বেশিদিন হয় আসিনি। আপনার বাসা থেকে কয়েকটা বাসা সামনে নতুন যে তিনতলা ভবনটি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সেটার মালিক মূলত আমিই।‘
এতোক্ষণে আমি এই অভিজাত ভদ্রলোকটিকে চিনতে পারলাম। যদিও তাকে স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য আমার এতোদিন ঘটেনি, কিন্তু গত প্রায় বছর খানেক যাবত এই পাড়ার প্রতিটি মানুষের মুখে মুখে তাকে নিয়ে বিস্তর চর্চা হয়েছে। পাড়ার সবচেয়ে সুন্দর বাড়ি ‘চৌধুরী’ ভিলা কে এই অচেনা ভদ্রলোক কিনে নিয়েছেন, এমনটাই জানে সবাই। সেই চৌধুরী ভিলা অবশ্য এখন আর আগের অবস্থানে নেই। আগের পুরাতন ভবন ভেঙে সেখানে নতুন ভবন তৈরি হয়েছে। এটি আগের চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক। ‘চৌধুরী’ ভিলার চৌধুরী সাহেব গত হয়েছেন প্রায় অর্ধ যুগ হতে চললো। তার দুই ‘সুপুত্র’ পিতার রেখে যাওয়া সম্পত্তির এক কানাকড়িও বিস্তার ঘটাতে পারেনি। বখে যাওয়া দুইজন দিনরাত নানারকম অসামাজিক কর্মকাণ্ডে মেতে থাকতো। মদ, জুয়া, মেয়েমানুষ…কোনোকিছুই বাদ ছিল না। ‘চৌধুরী’ ভিলার আভ্যন্তরীণ নষ্টামিতে পাড়ার মানুষ প্রায় অতিষ্ট হয়ে উঠেছিল। পাড়াটার বদনাম হয়ে গিয়েছিল এই এক ‘চৌধুরী’ ভিলার কারণে। গত বছর অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই পটভূমি পাল্টে যায়। একদিন ভোরে উঠে সবাই দেখতে পায়, ‘চৌধুরী’ ভিলার জিনিসপত্র ট্রাকে উঠানো হচ্ছে। খালি করে ফেলা হচ্ছে বাড়ীটা। চাকর বাকর ব্যস্তসমস্ত ভাবে এদিক সেদিক ছুটাছুটি করছে। ভয়ানক গম্ভীর মুখে দুইভাই কাজকর্ম তদারকি করছে। সাদা শাড়ি পরিহিতা চৌধুরী গিন্নি কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে এসে বাসার সামনে অপেক্ষারত সাদা পাজেরোতে উঠে বসেন। হতবিহবল লোকজন চাকর বাকরদের কাছ থেকে সামান্য যেটুকু জানতে পারে তা হলো, বিক্রি হয়ে গিয়েছে চৌধুরী ভিলা। এই বাড়ির মালিক এখন অন্য একজন।
পাড়ার মানুষ নিজেদের মতো করে অনুমান করে নেয়। অতি নষ্টামির ফল যা হয় তাই হয়েছে। হয়তো জুয়াতে হেরে গিয়ে বাড়িটাকেই খুইয়েছে। যাই হোক, যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। এতোদিনে হয়তো পাড়াটা আবার কিছুটা ভদ্রস্থ হবে।
‘চৌধুরী’ ভিলার নতুন মালিক প্রথমেই বাড়িটার খোলনলচে পালটে ফেলেন। পুরনো ধাঁচের বাড়িটার জায়গায় অত্যাধুনিক স্থাপত্য নকশার এক নয়নাভিরাম বাড়ি স্থলাভিষিক্ত হয়। সবকিছুই খুব রাতারাতিই ঘটে যায়। পাড়ার লোকজন নতুন মালিককে নিয়ে অনেক কল্পনা জল্পনা করে। তিনি কেমন মানুষ, কোথায় থাকেন, কী করেন.....এমনি সব নানান রকম ভাবনা। আজ কিনা সেই ভদ্রলোক স্বয়ং আমার মতো এক সামান্য মানুষের দুয়ারে উপস্থিত!
ভদ্রলোক মনে হয় আমার মনের এই অস্থিরতা টের পেলেন। আমাকে খানিক আশ্বস্ত করার মতো করে বললেন,
‘আমি এখানে অল্প কয়েকদিন যাবত বাস করছি। দেশের বাইরে ছিলাম বেশ কয়েকবছর। বাকী জীবন দেশেই কাটিয়ে দিতে চাই। এখানে আসার পরেই লেখক হিসেবে আপনার নাম ডাক শুনেছি। বলতে পারেন পরিচিত হবার ইচ্ছেটা দমন করতে পারিনি। কারণ আমি নিজেও লেখালেখির প্রতি খানিকটা দূর্বলতা বোধ করি। কিন্তু পেশাগত ব্যস্ততায় সেভাবে সংযুক্ত হতে পারিনি এই ক্ষেত্রে। আমি একজন স্থপতি।‘
ভদ্রলোক একটু থামলেন। মনে হলো তিনি যেন ভূমিকা অংশটুকু সেরে নিলেন। আমি তার পরবর্তি অংশের জন্য সাগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলাম। আমার ভেতরের বিরক্তি ইতিমধ্যেই অতি আগ্রহে রূপ নিয়েছে।

দুই
প্রতিটি মানুষের জীবনেই একটা গল্প থাকে এটা তো বিশ্বাস করেন , করেন না? হয়তো খুব সাধারণ, হতদরিদ্র একজন মানুষ…তার জীবনেও আছে এক অসাধারণ গল্প। বেশিরভাগ মানুষই কিন্তু এই জীবনের গল্প নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামায় না। তারা বিশ্বাস করে, জীবন তো কেবল যাপন করার জন্যই। কতোটা নিখুঁত আর ঝামেলা বিহীন ভাবে তা যাপন করা যায়, সেটাতেই সকল সার্থকতা। জীবন তার স্বাভাবিক ছন্দে চলতে গিয়ে পথের বাঁকে বাঁকে কতোরকম ভাবেই না তার পদচিহ্ন রেখে যায়! ক’জনই বা তার খোঁজ রাখে!
আপনি আমার বেশভূষা দেখে আর এই পাড়ার অতি বিখ্যাত ‘চৌধুরী’ ভিলার নতুন মালিক হওয়াতে হয়তো মনে মনে আমাকে খুব কেউকেটা ভাবছেন। আপনার দোষ নেই। যেখানেই গিয়েছি আমার এই বাহ্যিক অবয়ব আমাকে অকারণেই অতিরিক্ত খাতিরদারি পাইয়ে দিয়েছে। এটাতে অবশ্য খুশিই হবার কথা। লোকজনের বেশি মনোযোগে কে না আপ্লুত হয়!
কিন্তু আমি হতে পারিনি। কারণ, আর কেউ না জানুক আমি তো জানি আমার নিজের পরিচয়। আজ আমি সুরম্য প্রাসাদোপম বাড়িতে বাস করছি ঠিকই, কিন্তু একসময় এই আমাকেই রাত যাপন করতে হয়েছে শ্যাঁওলা ধরা অনাথ আশ্রমের ঠাণ্ডা মেঝেতে। আর দশজন অনাথ শিশুর সাথে গাদাগাদি করে একই শয্যায়।
আমার সাত বছর বয়স পর্যন্ত মা’র কাছেই থেকেছি আমি। আমার মা ছিল কাজের বুয়া। মানুষের বাসায় কাজ করতো। খুব কষ্টে দিন কাটতো আমাদের। আধপেটা খেয়ে, কখনোবা না খেয়ে। একদিন মা আমাকে নিয়ে একটা বাড়িতে যায়। খুব সুন্দর সেই বাড়িটা। সামনে পিছনে বিশাল জায়গা জুড়ে বাগান। টানা বারান্দা। কী সুন্দর বড় বড় ঘর সেই বাড়িটাতে! দেওয়াল জুড়ে বিশাল সব ছবি টাঙ্গানো। কাঁচের আলমারী ভর্তি কতো সব সাজিয়ে রাখার জিনিসপত্র! ডাইনিং টেবিলে বসে সেই বাড়ির ছেলেগুলো খাচ্ছে আর খাবার নিয়ে খেলা করছে। তাদের পরনে দামী পোশাক, সুন্দর জুতা। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো সবকিছু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম।
ছেলেদুটো মাকে দেখেই ‘বুয়া’ ‘বুয়া’ বলে চিৎকার জুড়ে দিলো। ওদের চেঁচামেচিতে ভেতরের ঘর থেকে একজন সুন্দর শাড়ী পরা মহিলা ছুটে এলেন। তিনি মাকে দেখেই খুব রেগে উঠলেন। জোরে জোরে বলতে লাগলেন,
‘তুমি আবার এসেছো? তোমাকে না আবার আসতে বারণ করেছি! কী চাও তুমি? কোনো পাওনা বাকী আছে তোমার? অসভ্য মেয়েমানুষ! লজ্জা শরম বলে কিছু নাই? এতো বছর পরে আবার এসেছো বেলেল্লাপনা করতে। ভালোই ভালোই যাবে নাকি পুলিশ ডাকবো?‘
আমি খুব ভড়কে গেলাম। মা তবু কাকুতি মিনতি করে বললো,
‘আমাকে উনার সাথে একবার দেখা করতে দেন। আমি কথা দিচ্ছি আর কোনোদিন আসবো না। এই শেষ বার। আমার বাচ্চাটার তো কোনো দোষ নাই।‘
মার কথা শুনে ভদ্রমহিলা রেগে উঠে কিছু একটা বলতে যাবেন এমন সময় উপরের ঘর থেকে একটা পুরুষালি আওয়াজ ভেসে আসে।
‘ওকে উপরে আসতে দাও।‘
ভদ্রমহিলা আর কিছু বলে না। কেবল বিষাক্ত চোখে তাকিয়ে থাকে মায়ের দিকে। মা ঐ আওয়াজ শুনে আর একমুহুর্ত দেরি করে না। আমার হাত ধরে সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে উপরে উঠতে থাকে। এতো সুন্দর প্যাঁচানো সিড়ি! আমার কী যে ভালো লাগে উপরে উঠতে! মা শক্ত হাতে আমাকে ধরে রাখে। যেন হাত ছেড়ে দিলেই আমি নীচে পড়ে যাবো। আমি নাচতে নাচতে উপরে উঠি। আমার মনে হয় এতো সুন্দর সিঁড়িটা বেয়ে উপরে উঠতে পারলেই বুঝি আমার জীবনের সব দুঃখ দূর হয়ে যাবে।
সিঁড়ির ধাপগুলো পার হয়ে মা একটা ঘরের সামনে এসে দাঁড়ায়। দরজার পর্দাটা একহাতে সরিয়ে খুব ভয়ে ভয়ে উঁকি দেয় ভেতরে। আমি পেছনে ঘুরে সিঁড়ির দিকেই তাকিয়ে থাকি। আমার মনের মধ্যে ভীষণ লোভ জাগে, যদি এই সিঁড়িটা আমি রোজ ভাঙতে পারতাম!
আমি দেখি, মা কাঁদছে। ভেতরে যে লোকটা আছে আমি তাকে দেখার চেষ্টা করি। পর্দার কারণে তার অবয়ব ঠিক স্পষ্ট হয় না আমার কাছে। ঝাপ্সা যেটুকু বুঝতে পারি তাতে মনে হয় লোকটা অনেক লম্বা। তার একটা কথাই আমার কানে আসে,
‘আমি তো বললাম, আমি দেখবো।‘
মা আবার আমাকে নিয়ে নীচে নেমে আসে। অবসন্ন পায়ে বেরিয়ে যায় সেই সুন্দর বাড়িটা থেকে। পেছন থেকে ভদ্রমহিলার তীক্ষ্ণ আওয়াজ ভেসে আসে,
‘আর কখনো যদি এই বাড়ির আশেপাশে দেখতে পাই.....................’
আমাদের মা-ছেলের জীবন একই রকম ভাবেই কেটে যেতে থাকে। সেদিনের সেই ঘটনা তেমন কোনো পরিবর্তন বয়ে আনে না আমাদের জীবনে। কিন্তু, একটা খুব গোপন সূক্ষ্ণ ঘটনা ঘটে যায় আমার জীবনে। সেদিনের পর থেকে আমি প্রায়ই সেই সিঁড়ি ভাঙার স্বপ্ন দেখি। স্বপ্নে আশ্চর্যরকম সুন্দর মনে হয় সেই সিঁড়িটাকে আমার। যেন আমার দুঃখ জয়ের কিছু পদক্ষেপ সেই সিঁড়িগুলোর মাঝেই লুকিয়ে আছে। ঐ পদক্ষেপ টুকু হাঁটতে পারলেই আমি পৌঁছে যাবো আমার সুখের স্বর্গের কাছাকাছি।

তিন
পড়াশুনাতে আমার আগ্রহ দেখে মা আমাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়। পড়তে বেশ ভালো লাগতো আমার। কিন্তু আমার মার শরীরটা দিন দিন খারাপ হয়ে যেতে থাকে। মা বেশি পরিশ্রম করতে পারতো না। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি দেখতে পাই, মা আর চোখ মেলছে না।
আমার কিছুই করার ক্ষমতা ছিল না। চুপচাপ মার মাথাটাকে কোলে নিয়ে নিশ্চল বসে থাকি আমি। আস্তে আস্তে মানুষজন জানতে পেরে এগিয়ে আসে। মাকে নিয়ে যায় আমার কাছ থেকে। তারপর কীভাবে কে বা কারা আমাকে একটা অনাথ আশ্রমে দিয়ে আসে আমার কিছুই মনে নাই। শুধু মনে আছে, একদিন কেতাদুরস্ত পোশাকের একজন লোক এসে আমার সাথে কথা বলে। আমার পড়াশুনার খোঁজখবর নেয়। টেলিফোনে ‘স্যার’ সম্বোধন করে কারো সাথে কথা বলে।
মার মৃত্যুর পরে যে অনাথ আশ্রমে আমার স্থান হয়, সেখানে আমার তেমন একটা খারাপ লাগতো না। অন্য অনেক বাচ্চাদের সাথে ভালোই দিন কেটে যেতো। মার সাথে যখন থাকতাম, তখন সারাদিন একা একাই থাকতাম। এখানে অন্য বাচ্চাদের সাথে নিজেকে কখনো একা মনে হয় না। সবার সাথে গল্প করি, কাজ করি। স্কুলে যাই আগের মতোই। কোথা থেকে আমার পড়ার খরচ আসে বা কে দেয় আমি কিছুই জানি না। এখানকার সবাই আমার সাথে ভালো ব্যবহার করে। অন্য বাচ্চাদের অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়, ঠিকমতো খাবারও দেওয়া হয় না সবাইকে। কিন্তু এদের সবার চেয়ে আমার যেন আলাদা একটা অবস্থান। এটা সেই বয়সে বুঝতেও আমার সমস্যা হয় না।
পড়াশুনাতে আমার আগ্রহ উত্তরোত্তর বেড়েই চলে। আমি স্কুলে বেশ ভালো করি। আমার সামাজিক অবস্থা আমার শিক্ষাজীবনে কোনোই প্রভাব ফেলতে পারে না। শিক্ষাজীবনের প্রতি স্তরেই আমি বৃত্তি নিয়ে পড়াশুনা চালিয়ে যাই। আর সেই সাথে থাকে এক অচেনা সহৃদয় মানুষের মহানুভবতা। দেশের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পেয়ে যাই আমি। জীবনে যা অবিশ্বাস্য অভাবনীয় স্বপ্নের মতো ছিল তা আমার জীবনে সত্যি হয়ে ধরা দেয়। কিন্তু ছেলেবেলার সেই স্বপ্ন আমার কাছে অধরাই রয়ে যায়। সেই জাদুর স্পর্শ মাখা সিঁড়ির ধাপ, আর সেই ধাপ পেরিয়ে পৌঁছে যাওয়া কোনো প্রত্যাশা ভরা স্পর্শের কাছে। সেই বয়সে আমি বুঝতে পারি নাই, কেন সেই পদক্ষেপ টুকু এতোখানি প্রত্যাশিত ছিল আমার কাছে। কিন্তু পরিণত বয়সে এসে সেই রহস্য আমার কাছে উন্মোচিত হয়। আমি জানতে পারি কী ছিল সেই সিঁড়ি পেরিয়ে উঠে যাওয়া দরজার ওপাশে। সেখানে লুকিয়ে ছিল আমার পরিচয়, আমার আমিত্ব... যা আমি এতোদিন ধরে খুঁজে চলেছি।
দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়ার সুযোগ ঘটে একসময়। আমার পিএইচডি যখন প্রায় শেষের পথে, তখন আমি দেশ থেকে একটা চিঠি পাই। মৃত্যু পথযাত্রী কোনো ‘চৌধুরী’ সাহেব তার কিছু সম্পত্তির সাথে একটা বাড়ি রেখে গেছেন আমার নামে।
ডিগ্রী শেষ করে দেশে ফিরে আসি। খোঁজখবর করে দেখা করি, চৌধুরী ভিলায় বাসরত ব্যাক্তিদের সাথে। পুরনো একটি দিন ছায়াছবির মতো ভেসে ওঠে আমার মনের পর্দায়। সবকিছু ঠিক সেই একই রকম আছে। কোনো কিছুই বদলায়নি। শুধু পালটে গেছে সময়টা আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর প্রতিকৃতি। আমি তাকিয়ে থাকি সেই প্যাঁচানো সিঁড়িটার দিকে। যে সিঁড়ির প্রতিটি ধাপ আমাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে আমার স্বপ্নে।
বাড়িটা আমি ওদেরকেই ফিরিয়ে দিতে চাই। বিনিময়ে চাই আমার পরিচয়টুকু। যা আমার, তা আমাকে ফিরিয়ে দিক ওরা।
কেউ রাজি হয় না। বিনিময়ে ‘চৌধুরী’ ভিলা টাকেই দিয়ে দেওয়া অপেক্ষাকৃত সহজ মনে হয় সবার কাছে।

চার
ভদ্রলোক থামলেন।
আমি বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি। কোনোমতে বলি,
‘কিন্তু...কিন্তু...এটাতো আপনার জীবনের অনেক স্পর্শকাতর একটা গল্প। এই গল্পটা আমাকে কেন শোনালেন?’
তিনি মৃদু হাসলেন। এতোক্ষণে আমার মনে হলো, এই অভিজাত চেহারা আমি আগেও দেখেছি। কিন্তু কোথায় যেন একটা অমিল থাকার কারণে আমি ঠিক ধরতে পারছিলাম না। এই ভদ্রলোকের চেহারাতে একটা পবিত্রতা মিশে আছে, যেটি আমার দেখা সেই চেহারাতে ছিল না। সম্ভবত সেটার কারণেই আমি ঠিকমতো চিনে উঠতে পারছিলাম না।
‘মানুষ খুব লোভী হয়, বুঝলেন! কেউ সম্পদের লোভ করে, কেউ ক্ষমতার, কেউবা অমরত্বের। আমার নিজের লোভটাকেও আমি জয় করে উঠতে পারি নাই। অনেক চেষ্টা করেও এটি থেকে মুক্তি মেলেনি আমার। আমার স্বপ্ন আমাকে দিবানিশি সেই লোভ দেখিয়েছে। যা আমি কোনোদিন পাইনি সেই লোভ, আমার নিজের পরিচয়... একটা নাম।‘
শেষের দিকে একটু যেন ধরে এলো তার গলা। কিছুক্ষণ থেমে থেকে আবার যেন খানিকটা শক্তি সঞ্চয় করে কথাটা শেষ করলেন...
‘আপনি কি আমাকে সেই ‘পরিচয়’ টা দিতে পারবেন, আপনার লেখনীর শক্তি দিয়ে?’
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন