ভ্যালেনটেইন সংখ্যায় লেখা অবশ্যই ভালোবাসা নির্ভর হওয়ার কথা। অআমার গল্পটা পড়ে আশা করি পাঠক ঠকবেন না।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১১ অক্টোবর ১৯৮৮
গল্প/কবিতা: ৮টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - ভ্যালেন্টাইন (ফেব্রুয়ারী ২০১৯)

মেম আর মম
ভ্যালেন্টাইন

সংখ্যা

আপেল মাহমুদ

comment ৪  favorite ০  import_contacts ১৪০
আরিশা ঘুমিয়েছে অনেকক্ষণ। এতোক্ষণে রাহাতও ঘুমিয়ে যেতো। কিন্তু আগামীকাল মেয়ের স্কুলের কথা ভেবে ঘুম আসছে না। কাল গিয়ে কি জবাব দেবে সে? না থাক, কাল না হয় আরিশার স্কুলেই যওয়ার দরকার নেই!

ভোর কার না ভালো লাগে? ভালো লাগে ভোরের হাওয়া। আরো ভালো লাগে ভোরের হাওয়া গায়ে মাখিয়ে খালি পায়ে সবুজ ঘাসে হাটতে।
রাহাতও রোজ ভোর বেলায় হাটতোআল্পনাকে সাথে নিয়ে। কিন্তু আল্পনা মারা যাবার পর ভোর বেলায় আরহাটা হয় না। প্রিয় ইচ্ছে গুলোতে সাড়ে তিনটি বছর ধরে মরিচা পড়ে আসছে, প্রতিনিয়ত পড়ছে! পড়তে পড়তে একসময় হয়তো ইচ্ছে গুলোর সবটাই মরিচা হয়ে যাবে!হয়তো---

- বাবা! স্কুলের সময় হয়েছে।
মেয়ের কন্ঠ শুনে পেছন ফিরে তাকায় রাহাত। আরিশা স্কুল ড্রেস পড়ে রেডি হয়েছে। মেয়েকে মিথ্যে বলতে ভালো লাগে না ওর। তবুও বললো - আজ তো স্কুল বন্ধ মা।
- কিন্তু মেম যে গতকাল বললেন- আজ ড্রয়িং খাতা নিয়ে যেতে!
- ওহ! বলেছে বুঝি?
- হুম, বলেছেন তো।
- তাহলে চলো।

দ্রুত রেডি হয়ে নিল রাহাত। আরিশার দাদুমনি চা দিয়ে গেলেন। চা খেয়ে বেরোলো রাহাত।এখন ৭টা বেজে ৫২ মিনিট। আটটায় স্কুল আরিশার। কিছুদুর হাটতেই রিক্সা পেল। রিক্সাওয়ালাকে একটু জোরে যাওয়ার অনুরোধ করলো সে।
- বাবা! তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?
- করো মা।
- তুমি কি মেমকে ভয় পাও?
- কেনো জিজ্ঞেস করছো মা?
- তুমি যে মিছে মিছে বললে- স্কুল বন্ধ।
- তোমার মেম কি তোমাকে কিছু বলেছে?
- হুম।
- কি?
- বলেছেন- তোমার সাথে স্কুলে না আসতে। এটা মেয়েদের স্কুল। মহিলা কারও সাথে যেতে বলেছেন।

খানিক পরে রিক্সা এসে স্কুলের গেটে দাঁড়ালো। ভাড়া মিটিয়ে দ্রুত ক্লাসরুমের দিকে এগিয়ে গেল। হাতঘড়িতে দেখলো ৮টা বেজে ৪ মিনিট। ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। আরিশাকে ক্লাসে দিয়ে বেরোবে এমন সময় মেম ডাকলেন-
- রাহাত সাহেব!
- জি¦!
- স্কুল শেষে অফিস রুমে একটু দেখা করবেন।
- জি¦ আচ্ছা।

রাহাত জানে যে মেম কি বলবেন। এর আগে রোজিনার সাথে স্কুলে আসতো আরিশা। রাহাতের স্ত্রী আল্পনাই রোজিনাকে নিয়ে এসেছিল ওর বাপের বাড়ি থেকে। মেয়েটি খুব ভালো ছিল। রাহাতও কখনো কাজের মেয়ের মতো দেখতো না। কিন্তু হঠাৎই ওর বাপ বিয়ে ঠিক করে ফেললেন, আর মেয়েকে নিয়ে গেলেন।

বাসায় ফিরে নাস্তা করে অফিসে গেল রাহাত। মায়ের চোখে চোখ রাখতে পারেনা কোনমতেই। মা নিজেই অসুস্থ। হার্টের রোগী। একবার অ্যাটাক হয়েছিল। ডাক্তার বলেছেন- বিশ্রামে থাকতে, দুশ্চিন্তা না করতে। বাবাতো আগেই গত হয়েছেন,- আল্পনারও আগে।

বারোটা বাজতে আর পাঁচ মিনিট বাকি। আরিশাকে স্কুল থেকে বাসায় ড্রপ করতে হবে। অফিস থেকে তাড়াহুড়ো করে বেরোলো রাহাত। ইনকাম ট্যাক্সের ইন্সপেক্টর সে। চাকুরীর শুরুতে কখনোই সে সৎ ছিলোনা। আল্পনা ওকে অনেকবার বলেছে- ঘুষ না নিতে। কিন্তু সে সময় না হলেও আল্পনা মারা যাবার পর নিজেকে শুধরে নিয়েছে সে।

রিক্সা থেকে নেমে স্কুলের অফিসে গেলো রাহাত। আজও দশ মিনিট লেইট করেছে সে। চশমার ফাকে আড়চোখে মেমের দিকে তাকাতেই খানিকটা শঙ্কা উড়ে গেল। মেমকে আজ বড়ই শান্ত দেখাচ্ছে।মেমের পাশে বসে চকলেট খাচ্ছে আরিশা।
- রাহাত সাহেব বসুন,-বললেন মেম।
- থ্যাংস।
- কিছু কথা বলবো বলে আপনাকে ডেকেছি।
- আপনি কি বলবেন আমি জানি। আসলে আমি খুব বিপদে পড়েছি। কাজের মেয়েটা হঠাৎই-----
- রাহাত সাহেব! আমি খুবই দুঃখিত। মনে হয় আপনাকে একটু বেশী চাপে ফেলে দিয়েছি। কিন্তু কি করবো বলুন? অন্যান্য স্টুডেন্টের মায়েরা একটু অস্বস্তি বোধ করেন।
- আমারও খারাপ লাগে। আমি চেষ্টা করছি। নতুন কাজের মেয়ে খুঁজছি। বিশস্ত না হলে কি তার সাথে মেয়েকে পাঠানো সম্ভব?
- ভাবী কতো আগে মারা গেছেন?
- জি¦? সাড়ে তিন বছর। কিন্তু বিষয়টি আপনিও জানেন?
- জানতাম না। আজ জানলাম।
- আরিশা বলেছে?
- হুম। আজ ওদের ক্লাসে ছবি আঁকতে দিয়েছিলাম। যে যার ইচ্ছেমত ছবি এঁকেছে। আরিশা কি একেছে জানেন? ওর পরিবারের ছবি। ছবিতে বাবা আছে, দাদুমনি আছে আর আরিশা আছে। কিন্তু মা আর দাদুভাই অ্যাবসেন্ট!

রাহাত কি জবাব দেবে? গলাটা ধরে আসছে। খানিকটা সময় নিয়ে নিজেকে সামলিয়ে বললো-
- এখন অক্টোবর মাস চলছে। আমাকে দুটো মাস কনসিডার করুন। সামনে ডিসেম্বর মাসে আরিশাকে অন্য স্কুলে দেবো।
- কিন্তু এ দুটো মাস অন্তত লেইট করবেন না।
- ওকে। থ্যাংকস।

পরদিন আর দেরী করলোনা রাহাত। আটটা বাজার আট মিনিট আগেই স্কুলে পৌছে গেল। স্কুলের মূল গেট খুলতেই আরিশার মেম মানে নীলা মেমের সাথে দেখা হলো। আজ শাড়ী পড়ে এসেছেন। কালো শাড়ী। এমনিতেই ছিপছিপে গড়নের। তার উপর শাড়ী পড়ে একটু বেশীই লম্বা দেখাচ্ছে। উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণ শরীরে কালো শাড়ী বেশ মানিয়েছে। মৃদু হেসে নীলা মেম বললেন-
- উপরে থেকে আরিশাকে দেখে নেমে আসলাম। গতকাল আপনার সমস্যা নিয়ে হেড মেমের সাথে আলাপ করেছি। মেম বলেছেন- আরিশাকে আপনি গেটেই ছাড়বেন। আমি রিসিভ করবো। ভেতরে না আসলেতো কারো কোন সমস্যা নেই। আর যাবার সময় আমি ওকে নিয়ে স্কুলের সামনে দাড়িয়ে থাকবো।
- এটা আপনার জন্য বেশ কষ্টদায়ক হবে। আর আমার জন্যও অস্বস্তিকর।
- তবুও সমস্যাটার সমাধান তো হবে।
- হুম, তা হবে।
- ঠিক আছে আরিশাকে দিন, ক্লাসের সময় হয়েছে।

নীলা মেম আরিশাকে নিয়ে এগোতেই শাপলা মেমের সাথে দেখা। শাপলা মেম একগাল হেসে বললেল- নীলাকে আজ মেম এর চেয়ে মম হিসেবেই ভালো মানিয়েছে!রাহাত কথাটি না শোনার ভান করে হন হন করে চলে গেল।

রাত এগারোটা পেরিয়েছে। রাহাত ছাদে একা একা দাড়িয়ে আছে আনমনে। কাল জন্মদিন ওর। দেখতে দেখতে জীবন থেকে চৌত্রিশটি বছর চলে গেলো!আল্পনাকে খুব মনে পড়ছে। বেচারী কি ভালই না বাসতো। বিয়ের আগে যদিও জানা-শোনা ছিলনা, তবুও বিয়ের পরের প্রেমটা ছিল অসাধারন। খানিকটা অভিমান প্রিয় হলেও একটু ভালবাসাতেই গলে যেতো। বেড়াতে খুব পছন্দ করতো। কে জানতো- এই বেড়াতে গিয়েই দুর্ঘটনাটি ঘটবে!
সেদিন ছিলোশুক্রবার । পড়ন্ত বিকেলে রাহাত ও আল্পনা রিক্সা করে বাড়ি ফিরছিল। আচমকা পেছন থেকে এক অটো রিক্সা এসে ধাক্কা দিলো। যদিও খুব জোরে নয়, তবুও নিজেকে সামলাতে পারেনি আল্পনা,- শরীরটা রাস্তায় পড়লেও মাথাটা রোড ডিভাইডারে গিয়ে পরে। রাহাত নিজেকে সামলাতে পেরেছিল।দ্রুত হসপিটালে নেওয়া হলো আল্পনাকে। ডাক্তার সাহেব দেখে ভর্তি করালেন, আর জানালেন-আপাতত ভালো আছে, আমরা পর্যবেক্ষনে রাখবো। যদি বমি হয় তবে অবশ্যই সিটি স্ক্যান করাতে হবে।
স্বাভাবিকই ছিলো আল্পনা। কথাও বলছিল। রাত পৌনে এগারোটার দিকে হঠাৎই বমি শুরু হলো!মাথাটা ভারী হয়ে আসছিল! চোখ দুটো ক্রমেই ঝাপসা হয়ে আসছিল! কর্তব্যরত চিকিৎসক জরুরী ভিত্তিতে সিটি স্ক্যান অব ব্রেইন করতে বললেন। নিউরোসার্জনকে কল করলেন। ডাক্তার - নার্স সবাই আন্তরিক ছিলেন।
সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট পেতে আরও এক ঘন্টা পেরিয়ে গেলো। এর মধ্যে নিউরোসার্জন এসে আল্পনাকে দেখেছেন। সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট দেখে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। রাহাতকে রিপোর্ট বুঝালেন- ব্রেইনে হেমাটোমা মানে মস্তিস্কে রক্তজমাট বেঁধে আছে! দ্রুত অপারেশন লাগবে। খুব রিস্কি আপারেশন!বাঁচা-মরার চান্স ফিফটি ফিফটি! এমনকি অপারেশন থিয়েটারেও মারা যেতে পারে! আবার অপারেশন না করলেও নিশ্চিত মৃত্যু!
বন্ধু-বান্ধব আত্মীয় স্বজনের ভীর ক্রমেই বাড়তে লাগলো। রক্তও ম্যানেজ হয়ে গেলো। রাত প্রায় তিনটা নাগাদ অপারেশন শুরু হয়েছিলো। টানা চার ঘন্টার মতো সময় লেগেছিল। এরপর পোস্ট অপারেটিভ রুমে যখন নিয়ে গেল, তখনো ডাক্তার বেশ আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু ঘন্টা দুয়েক পরে ডাক্তার - নার্সদের অস্তিরতা বেড়ে গেলো! রোগীকে আইসিইউ তে শিফট করা হলো। দুই দিন মৃত্যুর সাথে লড়ে অবশেষে সোমবার ভোরে রাহাতের গোছানো পৃথিবীটা এলোমেলো করে না ফেরার দেশে চলে গেলো আল্পনা!

ফোনের রিংটোনের শব্দে ভাবনা ভঙ্গ হলো রাহাতের। অপরিচিত নাম্বার। রিসিভ করতেই মেয়ে কন্ঠ শোনা গেলো- শুভ জন্মদিন।
- আপনি!
- জি¦, নীলা বলছি। আরিশার ফাইলে আপনার ভোটার আইডি থেকে জেনেছিলাম-আজ আপনার জন্মদিন। অনেক অনেক শুভ কামনা আপনার জন্য।
- থ্যাংকস।
- ওয়েলকাম। আরিশা ঘুমিয়েছে?
- জি¦।
- রাতে খেয়েছেন?
- জি¦।
- শুধু যে জি¦ - জি¦ করছেন! আমি কি আপনাকে বিরক্ত করছি?
- জি¦! না মানে জি¦-না!
রাহাতের এমন উত্তরে খিল খিল করে হেসে উঠলো নীলা। সে হাসিতে খানিকক্ষণের জন্য নিজেকে হারিয়েছিল রাহাত। অতঃপর সামলে নিয়ে বললো- আপনাকে বিশেষ ধন্যবাদ আমাকে হেল্প করছেন এ জন্য।
- আমি কিন্তু আপনাকে হেল্প করছিনা। যা করছি নিজের ভালো লাগা থেকেই। আরিশাকে আমি ভালবাসি। ওর জন্য কেনো যেনো মায়াটা একটু বেশীই।

- হয়তো করুণা থেকে!
- ছি! ছি! এভাবে বলবেন না। আমি কোন ভাবেই করুণা করার যোগ্য নই। আপনি আমার সম্পর্কে জানলে এভাবে বলতেন না।
- কষ্ট পেলেন? তাহলে স্যরি।
- না-না, ঠিক আছে।। অনেক রাত হয়েছে। আপনি হয়তো ঘুমোবেন।
- হুম। কাল দেখা হচ্ছে।
- মানে?
- মানে- আরিশার স্কুলে।
- কাল কিন্তু শুক্রবার!
- ওহ্ স্যরি!
- শুভ রাত্রি।
- শুভ রাত্রি।

আরও এক মাস পেরিয়ে গেল। গত একটি মাস নিয়ে বেশ চিন্তিত রাহাত। এর মধ্যে নীলার সাথে ফোন, মেসেঞ্জার, ইমো কিংবা হোয়াটস অ্যাপে যতটুকু যোগাযোগ তার সবটুকুই কি যৌক্তিক ছিল? এ নিয়েআরিশার স্কুলেও কানাঘুষা চলছে! মানুষের মনটা বড়ই অদ্ভুত। কখনো কখনো এমন হয় যে, কি চায় সে নিজেই জানে না। নিজেকে প্রশ্ন করে রাহাত- সে কি নীলাকে ভালোবাসে? কিন্তু সেটা কিভাবে সম্ভব? ওর সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে শুধুই আল্পনা। তবে কেনো ভাবনার অনেকটা অংশ জুড়ে নীলার বিচরন!
আচ্ছা নীলা কি শুধু আরিশার জন্যই এতো ফোন করে, যোগাযোগ রাখে? নাকিঅন্য কিছু? সে অবিবাহিতা। ওর সাথেবয়সের পার্থক্যও বেশ,- সাত আট বছর তো হবেই।ওর সাথে কি প্রেমের সম্পর্ক হতে পারে?
ছি! ছি! এসব কি ভাবছে রাহাত! নিজের প্রতি খুব রাগ হচ্ছে ওর,খানিকটা ঘৃণাও!নিজের জন্য বউ চিন্তা করা গেলেও আরিশার জন্য সৎ মা কল্পনাও করতে পারেনা সে। এটা এখানেই শেষ করা দরকার। পকেট থেকে ফোন বের করে নীলাকে ফোন দিল রাহাত। ফোন তুলে সালাম দিলো নীলা- আসসালামু আলাইকুম।
- ওয়ালাইকুম আসসালাম।
- আপনি ফোন দিয়েছেন- আমিতো বিশ্বাসই করতে পারছিনা।
- আপনার সাথে জরুরী কিছু কথা ছিলো।
- বলুন।
- ফোনে নয়। সাক্ষাতে। আজ বিকেলে কি আপনার সময় হবে?
- হুম হবে। কোথায় আসবো।
- পাঁচটায়। পৌর পার্কের ক্যাফেতে।
- ওকে।
- বাই।
- বাই।

তেমন সাজ-গোজ করেনি নীলা। তবুও অসম্ভব সুন্দর লাগছে। কিন্তু এ সৌন্দর্য়ে মুগ্ধ হলে চলবে না রাহাতের। কফিতে একটা চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
- আপনি কি জানেন, আমাদের নিয়ে স্কুলে, পরিচিত মহলে অনেক কথা হচ্ছে?
- জানি।
- খারাপ লাগেনা আপনার?
- ভাবছি চাকুরীটা ছেড়ে দেবো।
- তার চেয়ে কি আমাকে ছেড়ে দেয়া ভালো নয়?
- আমি কি আপনাকে ধরে রেখেছি?
- তাহলে আজ থেকে আমাদের যোগাযোগ বন্ধ।
- তাতে আপনি কি ভালো থাকবেন?
- নিশ্চয়। আচ্ছা, আপনার সাথে আমার সম্পর্কটা কি?
- আপনিই বলুন।
- কিছুনা।
- তাহলে ভাংতে চাচ্ছেন কি?
- দেখুন, আপনি টিচার মানুষ। আপনার সাথে কথায় পারবো না। আমার মনে হয় স্পস্ট করে বলাই ভালো। আমি একজন বিবাহিত মানুষ। আমার একটা বাচ্চা আছে। আরিশার মা মারা যাবার পর আরিশার খালার সাথে আমার বিয়ের প্রস্তাব এসেছিলো। আমি রিফিউজ করেছি, এজন্য যে আমার মেয়েকে যেনো সৎ মায়ের যন্ত্রনা সহ্য করতে না হয়।অবশ্য আরেকটা কারনও ছিলো। আরিশার খালার অন্য ছেলের সাথে সম্পর্ক ছিল। সেও চায়নি আমি রাজি হই। রিফিউজ করার কারনে আমার শশুর বাড়ির সাথে সম্পর্ক নাই বললেই চলে। আপনি হয়তো ভাবছেন- এসব কথা আপনাকে কেনো বলছি? বলছি এজন্য যে, আপনার সাথে আমার সম্পর্কের কোন নাম নেই। যদি আপনি অন্য কিছু ভেবে থাকেন তাহলে আপনার এ কথাগুলো জানা উচিত।
- সব সৎ মাই কি খারাপ হয়?
- এ প্রশ্ন সব সৎ মাই করে। কিন্তু তারা কি করে সবাই জানে।
- আচ্ছা, আপনি কি আমাকে নিয়ে কিছুই ভাবেননি?
- লুকোবো না,- আপনাকে আজ ডেকেছি এজন্য যে, আমি ক্রমশ আপনার প্রতি দূর্বল হয়ে যাচ্ছি।এটাকে আর এগোতে দেওয়া উচিত নয়।
- আরিশার প্রতি আমার টানটা অন্য স্টুডেন্টের চেয়ে অন্যরকম ছিল তবে সেটা আপনার জন্য নয়। আপনার প্রতি কোন ফিলিংস ছিলো না। কিন্তু যেদিন শাপলা আপা আমাকে বললেন- আমাকে নাকি আরিশার মম মম লাগছে, সেদিন থেকে অন্যরকম এক ফিলিংস কাজ করতে শুরু করে।
- এটা আবেগ। বাস্তবতা আলাদা।
- আমার বাস্তবতটা একটু শুনবেন কি?
- বলুন।
- আমার বয়স যখন আট বছর তখন মা মারা গেছেন লিভার ক্যন্সারে। পরে বাবা আরেটা বিয়ে করেন। সৎ মায়ের যন্ত্রনা যে কি তা ভালোই বুঝি। দু’বছর হলো বাবাও মারা গেছেন। স্ট্রোক করে প্যারালাইজড হয়ে পড়ে ছিলেন চার মাস। বাবা মারা যাবার পর সৎ মা আমার বিয়ে ঠিক করেন তারই এক মামাতো ভাইয়ের ছেলের সাথে, যার বউ আত্মহত্যা করেছে মদ্যপ স্বামীর নির্যাতনে। একবছর জেলেও ছিলো। যে লোকটা নেশা করে বউকে নির্যাতন করে, সে লোকটাকে কিভাবে বিয়ে করতে পারি? পালিয়ে মামার বাসায় আসি। মামা আমাকে আশ্রয় না দিলে হয়তো ----
চোখের জল মুছে নিয়ে আবারো বলতে শুরু করলো নীলা-
- এতোক্ষন যা বললাম তার কোনটাই আপনাকে পছন্দ করার কারণ নয়। আপনাকে পছন্দকরার পেছনে একটা বাস্তব কারন আছে। বলতে পারেন আমার নিজের স্বার্থেই আপনাকে পছন্দ করি। আমার একটা বয়ফ্রেন্ড ছিলো। খুব ভলোবাসতাম ওকে। সে আমাকে কেনো ছেড়ে গেছে জানেন? আমার মা হবার সক্ষমতার প্রশ্নে। আমার ডান পাশের ওভারীতে চকোলেট সিস্ট ছিলো। অপারেশন করে ওভারী সহ সিস্ট ফেলে দেয়া হয়েছে। ডাক্তার সাহেব বলেছিলেন- একটা ওভারী থাকলেও গর্ভধারনে সমস্যা হয়না।তবুও সে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলো। পরবর্তীতে যখন বাম পাশের ওভারীতেও সিস্ট ধরা পড়লো, তখন সে একেবারে ছেড়ে গেলো। আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। ডাক্তার বলেছিলেন- ওটা তখনো জটিল কোন সিস্ট ছিলো না। অপারেশন হয়তো লাগবে, তবেদ্রুত বিয়ে করে বাচ্চা নিয়ে তারপর।কিন্তু সে যখন ছেড়ে গেলো তখন আমি ভেঙ্গে পড়েছিলাম। ভেবে নিয়েছিলাম- বিয়েই করবো না কখনো। তাই বাম পাশেরটাও অপারেশন করে ফেলেছি।কিন্তু আরিশাকে পেয়ে আমার মা হবার ইচ্ছেটা দিন দিন বেড়েই চলছে।তাছাড়া মামা-মামী আমাকে কতদিন রাখেবেন। আমি তাদের কাছে বোঝা হয়ে থাকতে চাই না।
- আমাকে যেতে হবে।
- আমি কি চাকুরীটা ছাড়বো?
- সেটা আপনার ইচ্ছা। তবে আরিশা স্কুলটা ছাড়বে অবশ্যই।
- আমার থেকে পালিয়ে কি ভলো থাকতে পারবেন?
- চেষ্টা করবো।
- আমি আপনার অপেক্ষায় থাকবো।
- সময়ের সাথে এ আবেগটাও চলে যাবে। ভালো থাকবেন। আর আমাকে ক্ষমা করবেন।

রাহাত উঠে কফির বিল মিটিয়ে রাস্তায় দাড়ালো। নীলাকে রিক্সা ডেকে দিয়ে নিজে হাটতে লাগলো। নীলা রিক্সায় উঠে ডাকলো- শুনুন। পেছন ফিরে তাকালো রাহাত। নীলা বললো-
- আমাদের কি আর যোগাযোগ হবে?
- না।
- মাঝে মাঝে কি আরিশার সাথে দেখা করতে পারি?
- সেটাও সম্ভব না।
- ঠিক আছে। চেষ্টা করবো যোগাযোগ না করতে। অনেক মিস করবো আরিশাকে। আর আপনাকেও। অনেক স্বপ্ন দেখে ফেলেছিলাম। ভালো থাকবেন। আর -- হ্যা,- আপনি গোফ রেখেছেন কেনো? বয়স বাড়ানোর জন্য? আপনার ফেসের সাথে কিন্তু একদম মানায় না।
রাহাত হনহন করে চলে গেলা।


সময়ের সাথে অনেক কিছু বদলায়। আরিশা এখন নতুন স্কুলে যায়। রাহাতের মা ছেলেকে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেই যাচ্ছেন।নীলার সাথে আর যোগাযোগ রাখেনি রাহাত।তবু কেনো যেনো ফেসবুকে ফলো করে যায়।
ফেসবুকে নীলার পোস্ট করা একটা স্ট্যাটাচে অস্থির হয়ে উঠলো রাহাত - “সবাইকে ভ্যালেন্টেইন ডে’র শুভেচ্ছা। সামনে আমার বিয়ে। সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন।”
এটা কিভাবে সম্ভব । নীলার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে! কিন্তু সে তো বলেছিল অপেক্ষা করবে। মিথ্যুক কোথাকার!
নিজের অজান্তেই নীলাকে ফোন দিল রাহাত। ফোন রিসিভ করতেই রুক্ষ গলায় বললো -
- কোথায় আপনি? এক্ষুনি পার্কের ক্যাফেতে আসুন, কথা আছে।
- মানে কি? আমি তো এখন স্কুলে।
- আমি এতো কিছু বুঝিনা। এক্ষুনি আসুন।

ফোন কেটে দিলো রাহাত। একটা অজানা অস্থিরতা কাজ করছে ভেতরে। রেডি হয়ে দ্রুত চলে এলো ক্যাফেতে। একটু একটু করে আধা ঘন্টা পেরিয়ে গেলো। নীলা আসার নামটি পর্যন্ত নেই। ফোনটাও ধরছেনা। কি আজব মেয়ে!
অবশেষে নীলা এলো আরো কুড়ি মিনিট পড়ে। রাহাত হাত ঘড়িটা দেখে জিজ্ঞেস করলো-
- আপনার কি সময় জ্ঞান আছে? কতোক্ষণ ধরে বসে আছি!
- আমি স্কুলে ছিলাম - ক্লাশ নিচ্ছিলাম। ক্লাশটা শেষ না করে কিভাবে আসি?
- চাকুরীটা ছাড়েননি কেনো?
- কেনো ছাড়বো?
- আমি বলছি তাই ছাড়বেন। চোখে এতো বড় চশমা লাগিয়েছেন কেনো? বয়স বাড়ানোর জন্য? খুলে ফেলুন- চোখ দেখা যায়না ঠিকমত! ফেসবুকে কি লেখেন এগুলো? একদম পড়া যায় না।
- আমার বিয়ে - - -
- কিশের বিয়ে? চলুন, মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো।
- আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।
- মিথ্যে কথা।
- কেনো মিথ্যে?
- আমার জন্য অপক্ষো করবেন বলেছিলেন।
- কেনো করবো? আপনি তো আমাকে ভালোবাসেন না!
- যদি বলি সেটা মিথ্যে।
- তাহলে আমার বিয়ে ঠিক হওয়াটাও মিথ্যে।
খিলখিল করে হেসে উঠলো নীলা। কি সুন্দর সে হাসি! মায়াবী সে হাসিতে আবারো নতুন করে নিজেকে হারিয়ে ফেললো রাহাত।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement