লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৩১ ডিসেম্বর ১৯৯২
গল্প/কবিতা: ৫টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftনববর্ষ (ডিসেম্বর ২০১৩)

ঝরাপাতার ধ্বনি
নববর্ষ

সংখ্যা

সোহাগ বিশ্বাস

comment ০  favorite ০  import_contacts ৩২৮
আজ ইংরেজী নববর্ষ , ২০৪০ সাল । সুশীল সমাজ আয়োজিত ‘শান্তির বার্তা ‘ পদক বিতরণী অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে । প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত আছেন নারী সংগঠনের সম্মানিত চেয়ারম্যান বেগম মিলি সুলতানা । পুরষ্কার ঘোষিত হলো , এবারের শান্তির বার্তা পদক লাভ করেছেন, জনাব আরিফ সাহেবের পথশিশুদের নিয়ে গড়া প্রতিষ্ঠান
‘ঝরা পাতার ধ্বনি’ । আরিফ সাহেব মঞ্চে গেলেন , নির্বোধের মত ভ্যাবাচেকা হাসি হেসে দাড়ালেন বেগম মিলি সুলতানার সামনে । পুরষ্কার নেয়ার পর দর্শকদের উদ্দেশ্যে তাকে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করা হল । তার বক্তব্য শুরুর আগে তার সমন্ধে দু চারটি কথা জেনে নেওয়া যাক । বয়স ৪৫, বিয়ে করেননি । তার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটিই এখন তার পরিবার । এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান কাজ হল , পথশিশুদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা ।
তিনি বক্ত্বৃতা শুরু করলেন , এই প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পিছনের গল্প বললেন :

আরিফ সাহেবের তখন পচিঁশ বছর বয়স । পার্কে মিলি ও আরিফ গল্প করছে ।
মিলি : এবারের নববর্ষ টা কেমন করে উদযাপন করি বলতো ।
আরিফ : রিকসা করে সারা ঢাকা শহর ঘুরবো ।
মিলি : তোমাকে আমি নববর্ষে কি উপহার দেবো বুঝতে পারছি না ।
আরিফ : বুঝতে পারার দরকার কি, উপহার কি মানুষ বলে কয়ে দেয় নাকি , যখন দেয় তখন যা দেয় তাই উপহার হয়ে দাড়ায় ।
মিলি : তুমি আমাকে কি দেবে ?
আরিফ : বলবো কেনো , ঐ গানটি শোননি, তবে থাক,তোলা থাক না বলা কথা ।
মিলি : হাসতে হাসতে, তোমার দুষ্টুমিই আমার কাছে শ্রেষ্ঠ উপহার ।

আগামীকাল নববর্ষ । আরিফ পড়ন্ত বিকালে ফুটপাত ধরে হাটছে আর চিন্তা করছে , মিলির জন্য কি কেনা যায় । একটা ৭-৮ বছরের ছেলে একটি রজনীগন্ধার স্টিক হাতে ধরে বলল, স্যার একটা ফুল নেবেন, কাল নববর্ষ । আরিফ না সূচক মাথা নাড়ল । ছেলেটি বিনীত ভাবে আবার বলল, নেন না স্যার একটা ফুল ।
আরিফ ছেলেটার দিকে তাকাল , মায়াবী চেহারার ছেলেটা, চোখে মুখে কষ্টের ছাপ । আরিফ একটা ফুল নিয়ে সযত্নে ছেলেটির হাত ধরে প্রশ্ন করল, খোকা তোমার নাম কি ?
ছেলেটি বলল : রন্জু
আরিফ : ও আচ্ছা । তোমার পরিবারে কে কে আছেন ?
ছেলেটি : আমি আর আমার মা , বাবা মারা গেছেন ।
আরিফ : ফুল বিক্রির টাকায় তোমার সংসার চলে ?
ছেলেটির চোখ দুটি ছল ছল করে উঠল । চোখের পানি সামলে সে বলল, স্যার আমার মায়ের অসুখ । ডাক্তার বলছে অপারেশন করাতে হবে, পচিঁশ হাজার টাকা লাগবে । দেরী হলে রোগীর বাঁচার সম্ভাবনা কম । আমি স্যার অনেক কষ্টে বাইশ হাজার টাকা যোগাড় করেছি । এদিকে মার অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে । বাকী তিন হাজার টাকা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যোগাড় করতে হবে । নইলে স্যার , আমার মা বাচঁবে না ।

আরিফের মনটা ব্যাথায় ভরে উঠল । একটা আট বছরের ছেলে অসুস্থ মাকে বাচাঁনোর জন্য রাতদিন পরিশ্রম করছে । কখনো আধপেটা খেয়ে , কখনো শুধু পানি খেয়েই পেট ভরাচ্ছে । নিজেকে আরিফের খুব ছোট মনে হল এই ছেলেটার কাছে । সে মিলির উপহার কিনতে যে চার হাজার টাকা পকেটে রেখেছিলো তার পুরোটাই ছেলেটির হাতে তুলে দিয়ে বলল, তোমার মা অবশ্যই সুস্থ হয়ে উঠবেন । আমি আগামী কাল সকালে এখানে আসব । তুমি আমাকে তোমার বাড়িতে নিয়ে যাবে । দুজনে মিলে তোমার মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবো , কেমন ! ছেলেটি কিছুই বলতে পারলো না , শুধু ফুঁফিয়ে কাদতে লাগল ।


আজ নববর্ষ । আরিফ সকালে বের হলো । রন্জুর মাকে হাসপাতালে পৌছে দিয়ে মিলির সংগে দেখা করতে হবে । নির্দিষ্ট যায়গায় পৌছে দেখে, ছেলেটি আগেই দাড়িয়ে আছে । দুজনে রন্জুর বাড়ি তথা রাস্তার পাশের খুপরি ঘরে গেল । আরিফ যতটা আন্দাজ করেছিলো, রন্জুর মায়ের অবস্থা তার চেয়েও বেশী খারাপ । তাড়াতাড়ি একটা অটো রিকসা করে দুজনে মিলে উনাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল । ডাক্তার বললেন, রাতে অপারেশন হবে । রন্জুকে নিয়ে আরিফ হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলো । রন্জুকে বলল, তুমি মায়ের পাশে থাকো , আমি সন্ধায় আবার আসব ।
আরিফ দৌড়ে একটি চলন্ত বাসে উঠতে গেল কিন্তু পারল না । মাথায় প্রচন্ড আঘাত পেয়ে রাস্তায় ছিটকে পড়ল । রন্জু হাসপাতাল অভিমুখে যাচ্ছিল, চিৎকার চেঁচামেচি শুনে পিছন ফিরে দেখল আরিফ রাস্তায় পড়ে আছে । সে দৌড়ে গিয়ে আরিফকে টেনে তুলল । তাকে অজ্ঞান অবস্থায় হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেয়া হল । ভীড়ের মধ্যে মোবাইল হারিয়ে যাওয়ায় পরিবারের সংগে যোগাযোগ করা সম্ভব হলোনা ।

পরদিন সন্ধ্যায় আরিফের জ্ঞান ফিরল । ধীরে ধীরে সে সবকিছু মনে করার চেষ্টা করল । তার রন্জুর কথা মনে পড়ল । সে ডাক্তারকে রন্জুর মায়ের কথা জিজ্ঞাসা করল । ডাক্তার জানালেন , সে অ্যাকসিডেন্ট করার পর রন্জু তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসে । মাথায় প্রচন্ড আঘাতের ফলে জরুরী অপারশনের প্রয়োজন পড়ে । রন্জু মায়ের চিকিৎসার জন্য গচ্ছিত সকল টাকাই আরিফের অপারেশনের জন্য তুলে দেয় । আজ সকালে রন্জুর মা মারা গেছে , সে মাকে কবর দিতে গেছে । কবর দেয়া শেষে সে এখানে আসবে ।
আরিফ পাথরের মত বেডের দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে । তার পৃথিবী যেন চতুর্দিকে ঘুরতে আরম্ভ করেছে । এ ঋণ সে কিভাবে শোধ করবে । টাকার ঋণ শোধ হয়, রক্ত দিয়ে রক্তের ঋণ শোধরানো যায় কিন্তু যে ছেলে মৃতপ্রায় মায়ের চিকিৎসার টাকা অপরিচিত কারো চিকিৎসার জন্য তুলে দেয় , তার ঋণ , সেই মাতৃস্নেহের ঋণ কি দিয়ে শোধ হবে ।
ইতোমধ্যে রন্জু ফিরে এসেছে । আরিফকে ঔষুধ খাইয়ে দিল । আরিফের মনে হল , পথচারী এই শিশুর সাথে তার গাঁটছাড়া বাঁধা হয়ে গেছে ।

সেই থেকেই ‘ ঝরাপাতার ধ্বনি ’ র কার্যক্রম শুরু ।
বক্ত্বৃতা শেষ হলো । দর্শকদের প্রায় সকলের চোখে জল । বেগম মিলি সুলতানার চোখে জল গড়িয়ে পড়ছে , এ জল আজকের নয় । এ জল বিশ বছর আগের মিলির চোখের জল ।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement