নিজের স্বামীর শারীরিক অক্ষমতার কারণে কোহিনূর ঘর ছেড়েছে। সেই কথাটি তাকে লাজ-লজ্জাহীনভাবে জগতসংসারের সামনে প্রকাশ করতে হয়। আমার গল্পের মূল ভাব ও বিষয়বস্তুর উপস্থাপনার সাথে এই সংখ্যার বিষয় ‘লাজ’ তাই প্রাসঙ্গিক।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৫ জুন ১৯৮০
গল্প/কবিতা: ২১টি

সমন্বিত স্কোর

৫.১১

বিচারক স্কোরঃ ২.৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৩১ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - লাজ (জুন ২০১৮)

আলোভূক পোকা
লাজ

সংখ্যা

মোট ভোট ২৭ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.১১

সাদিয়া সুলতানা

comment ২৩  favorite ১  import_contacts ৭১৪
১.
কোহিনূর এক বছরও সংসার করতে পারেনি। গেল বছর এই পথে দিয়েই ও শ্রীনগরে ওর শ্বশুরবাড়িতে গিয়েছিল। আবার দিন পনেরো আগে ছোট একটা ব্যাগ হাতে করে এই পথ দিয়েই বাপের বাড়িতে ফিরেছে। তখন অবশ্য এই রাস্তা পায়ে হাঁটার রাস্তা ছিল। আর আজ সামনে যতদূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। বাড়ি লাগোয়া হিজল তলার অস্থায়ী ঘাটে ভেড়ানো নৌকায় উঠে লতিফ হাঁক দেয়, আয় গো মা।

কোহিনূর ছোট একটা লাফ দিয়ে লতিফের কোসা নৌকায় উঠে পড়ে। দিন পনেরো আগে যেদিন ও বাড়ি ফিরেছিল সেদিন লতিফের এই নৌকাই ওকে বাড়ি নিয়ে এসেছিল। সেদিন বাস থেকে আলদিবাজার নামার সাথে সাথেই ঘাটে ভেরানো শ্যালো নৌকার পাশে লতিফ চাচার নৌকা দেখে খুশিতে ব্যাকুল হয়েছিল কোহিনূর। অনেক দিন পর নিজের আপনজনের দেখা পেয়ে ওর আনন্দের সীমা ছিল না। আজও ঠিক একই আনন্দ নিয়ে লতিফের নৌকায় ওঠে ও। মাঝির বিপরীতে পানির দিকে মুখ করে বসে কোহিনূর। কী টলটলা পানি! ওর মন নাচে, নৌকার দুলুনিতে ওর শরীরও নাচে। এবার কোহিনূর পানির দিকে আরও ঝুঁকে বসে। পানির বুকে মেঘের পাশাপাশি নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে ওর মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

মেয়েটার আনন্দ দেখে লতিফও খুশি হয়ে ওঠে। লতিফের নৌকাটা নতুন। নৌকার গায়ে পাতিলের তলার কালির মতো আলকাতরা লেপা। পানি ওপর ভেসে থাকা নৌকার কালো অংশে রোদ পড়ে সেই কালো রঙ চকচক করে। গত মঙ্গলবারের আগের মঙ্গলবার শ্রীনগরের দেউলভোগ হাট থেকে কোহিনূরের বাপ তোজাম এই নৌকা কিনেছে। এই বর্ষায় খেত-খামার আর বিলের পানি একাকার হবার সাথে সাথে এই অঞ্চলের মানুষের চলাচলের একমাত্র মাধ্যম হয় নৌকা আর এই সময়ে অনেকের জীবিকার ধরনও পাল্টে যায়। এই যেমন লতিফ বরাবর অন্যের জমিতে শ্রমিক হিশেবে খাটলেও বর্ষা মৌসুমে তোজামের নৌকা নিয়েই ব্যস্ত সময় কাটায়।

নৌকা পানি কেটে তিরতির করে এগোয়। এবার পানির বেশ বাড়বাড়ন্ত রূপ। বন্যা আসন্ন। বিস্তীর্ণ জলরাশির ফাঁকে ফাঁকে প্লাবিত মাঠে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে কিছু গাছপালা মাথা উঁচু করে আছে। কোহিনূর ওপরে তাকায়। অদূরে ঠাঁয় দাঁড়ানো তাল গাছের মাথায় মেঘের কুণ্ডলি। উন্মাতাল বাতাসের সাথে অমোঘ ঘর্ষণে মেঘেরা জায়গা বদল করে। মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া হরিয়ালের ঝাঁক দেখে কোহিনূরের শরীর-মন পাখির মতো ছটফট করে ওঠে। যেন অনেক চাই। অ-নে-ক কিছু চাই। কী যেন চাই ওর! কী চাই? কী? কোহিনূর বোঝে আবার বোঝে না। আত্মমগ্নতায় ডুবতে ডুবতে কোহিনূরের আচমকা মামুনের কথা মনে পড়ে।

গতকাল বড় পুকুরের কাছে মানুষটার সাথে দেখা হয়েছিল ওর। কোহিনূর নির্লজ্জের মত চোখ বড় করে তাকিয়ে তাকে দেখেছে। মানুষটা এখনো একই রকম আছে। তেমনই পেটা শরীর আর মাথাভর্তি কোকড়া চুল। পুরুষ মানুষের শরীরও যে কারো জন্য আরাধ্য বিষয় হতে পারে তা ও অনেককাল হলো জেনেছে। নিজের স্বল্প বিদ্যেবুদ্ধিতে কোহিনূর বুঝেছে, মনের খোরাকি জুটলে শরীরের চাহিদা তৈরি হয়। নানান বেলাজ ভাবনায় ওর শরীর-মন ছটফট করতে থাকে।

ভাবতে ভাবতে কোহিনূর বিহ্বলের মতো পানিতে হাত রাখে। কী ঠাণ্ডা! ও খেয়াল খুশিমতো পানি নিয়ে খেলা করতে করতে মুখে পানির ছিটা দেয়। পানির সারল্যে ওর মন খুশিতে নেচে ওঠে। থেকে থেকে মাছের ঘাইয়ে পানিতে বুদবুদ ওঠে। ঘাউরা, টাকি, কইয়ের ঝাঁক আছে নির্ঘাৎ। সাদা আর রঙিন শাপলার বিস্তৃতি থেকে একটা গোলাপি শাপলা হ্যাঁচকা টানে তুলে ডাঁটি থেকে ফুলটা ছিঁড়ে নিয়ে খোঁপায় গোঁজে কোহিনূর।

দূরে সয়ফলদের ভিটেতে দাঁড়ানো সয়ফলের বোন জরি হাঁক দেয়,
-কই যাসরে নূরী?

কোহিনূর রহস্যময় হেসে জবাব দেয়,
-ডুবতে যাই জরি...ইইই

বলেই ও কাঁচভাঙা হাসিতে আছড়ে পড়ে। কোহিনূরের হাসির শব্দ পেয়ে লতিফও হাসে।

উঁচু ভিটাগুলো বর্ষার পানির সাথে সমান্তরালে দাঁড়ানো। কোহিনূর আনমনে চারপাশ দেখে। কয়েকটা ছেলে কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে পলো ফেলে মাছ ধরছে। কোনো একবার কিছু মাছ ধরা পড়তেই খুশিতে হৈহৈ করে কোমরে বাঁধা খালুইয়ে মাছ রাখে আর পুনরায় দ্বিগুণ উৎসাহে পলো মারে।
-পুব পাড়া দিয়া একটু ঘুইরা যাও চাচা, খুব ফূত্তি লাগতাছে। অত তাত্তারি যাওনের কাম নাই।

লতিফ জানে বেশি দেরি করলে কোহিনূরের বাপ তোজামের কটাক্ষ শুনতে হবে। তবু মেয়েটার আনন্দ দেখে সে নৌকা ঘুরপথে নিয়ে গন্তব্যে দেরি করে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে। কোহিনুর লতিফের দিকে কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকিয়ে হাসে আর পানির সাথে খেলায় মশগুল হয়।

নৌকা বাজারের কাছাকাছি চলে এসেছে। বৈঠা দিয়ে পানিকে আয়ত্ত্বে রেখে লতিফ নৌকাকে আলদিবাজার ঘাটে ভেরায়। পাশে দাঁড়ানো শ্যালো নৌকার যান্ত্রিক আওয়াজের মধ্যে মাঝি জোরে হাঁক দেয়,
-ও মাইয়া কোসাত চড়ো ক্যা? ডুইবা মরবা তো। আমার নাওয়ে আসো।
কোহিনূর অযাচিত অভ্যর্থনায় হাসে।
-ডুইবাই তো আছি চাচা, আর মরণ নাই।

মাথার ওড়না বা কাঁধের পাশ দিয়ে দিয়ে ঘুরিয়ে এনে বুকের কাছে মুঠি করে রাখে কোহিনূর। লতিফের দিকে তাকিয়ে হাসে।
-যাই চাচা। দেরি হইবো না। অহনই ফিরুম।
-দেরি কইরো না মা। তোমার বাপে গাইলাইবো।
-মায় জানে তোমার বাড়ি যামু।
-তয় আলদি আইলা যে!
-মিছা কতা কইছি চাচা। তয় আমার দেরি হইবো না। তোমার লগেই যামু আর ফিরনের সুম চাচীর লগে দেহা করুমনে।

লতিফ ভয়ার্ত চোখে তাকায়। মেয়েটার ভাব ভালো না। কই যায়!
-তয় কই যাস মা, কইলি না।
-কবিরাজি ওষুধ আনতে।
-কার অসুখরে মাইয়া? বাড়ির সবাইরে তো ভালা দেখলাম। তর হউরবাড়ির কারো?

কোহিনূর চুপ করে থাকে। গুছিয়ে মিথ্যে বলার অভ্যাস ওর নেই। অপ্রস্তুত লতিফ মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে আর কোনো কথা খুঁজে পায় না। কোহিনূর শীতল গলায়, ‘তাগো কোনো খবর নাই আমার কাছে’ বলে কৌতূহলী লতিফকে পেছনে ফেলে ও বাজারের দিকে হাঁটা ধরে।

২.
বিনা নোটিশে বাপের বাড়ি বেড়াতে এসে তিন সপ্তাহ হয়ে যাবার পরও মেয়ে শ্বশুরবাড়ি ফিরে যেতে নাম করছে না দেখে কোহিনূরের মা হীরা আক্তার বুঝতে পারেন, মেয়ের সংসারে কোনো অশান্তি হয়েছে। কিন্তু মেয়েকে শত প্রশ্নের ফাঁদে ফেলেও তার বাপের বাড়ি থাকা নতুবা শ্বশুরবাড়ি ফিরে না যাবার কার্যকারণ আবিষ্কার করা তার পক্ষে সম্ভব না হওয়ায় তিনি সপ্তাহখানেক আগে চক্ষুলজ্জার মাথা খেয়ে মেয়ের জামাইকে ফোন দিয়েছিলেন। কোহিনূরের স্বামী বেলালের মোবাইল বন্ধ পেয়ে হীরা আক্তারের উৎকন্ঠা আরও বেড়ে গেছে। তিনি ভয়ে সে কথা স্বামী তোজামকে জানাতে পারেননি। কাউকে না জানিয়ে তিনি নিজেই সকাল-বিকাল মোবাইলে ফোন করার চেষ্টা করছেন কিন্তু জামাই বাবা ফোন ধরছে না।

কোহিনূরের বিয়ের প্রস্তাবটা এনেছিল মনতাজ ভাই। তিনি হীরা আক্তারের চাচাতো ভাই। পোস্টমাস্টারের চাকরি থেকে অবসর নেবার পর মনতাজ ভাইয়ের পাড়ায় পাড়ায় ঘটকালি করে সময় কাটে। মনতাজ ভাইকে একবার ফোন দিবেন কিনা তা ভাবতে ভাবতেই হীরা উঠানে দস্তরখানা পেতে স্বামীকে খাবার দেন। ভাত, বেগুন আলুর সাথে রুই মাছের ঝোল, মাছের ডিমের চচ্চড়ি দিয়ে খাবার সাজাতে সাজাতে অন্যমনস্ক হীরা আক্তারের হাত থেকে বারবার বাটি-ঘটির স্থানচ্যুতি ঘটে। কলঘর থেকে তোজাম দাওয়ায় পা রাখতেই স্বামীর পায়ের আওয়াজে হীরার বুক কেঁপে ওঠে।

খানিকটুকু উৎকণ্ঠা নিয়ে হীরা প্রশ্নের অপেক্ষা করে। থালায় ভাত তুলতে তুলতে তোজাম প্রশ্ন করে,
-মাইয়ার কী হইছে? সোহেলের বাপ রাস্তায় ধরলো। ইংগিত তো ভালা দিলো না। মাইয়ারে কিছু জিগাইছো? না কোলে বহায় ঘুমা পাড়াইতাছো?


হীরা আনমনা হয়ে যায়। জালুর মা গতকাল বুক হিম করা খবর দিয়েছে। জালু নাকি আলদিবাজারে মামুনের থানকাপড়ের দোকানে কোহিনূরকে বসে থাকতে দেখেছে। মাঝে মাঝেই কোহিনূর নাকি ওর দোকানে যায়। মামুন আর কোহিনূরের একসাথে হাসিমুখে গল্প করা নিয়ে নাকি বাজারের পরিচিত লোকজনের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। কোহিনূরের বিয়ের আগে কোহিনূরের পিছনে মামুন কম ঘোরেনি। কিন্তু তোজামের এক কথা, জোলার ঘরে মেয়ের বিয়ে দিবে না। কোহিনূরও তখন বাপের কথায় দ্বিমত না করে অন্য ঘরে বিয়েতে রাজি হয়ে গিয়েছিল। তবে এখন আবার কী!

হীরা আর ভাবতে পারে না। স্বামীর পাতে তরকারি দিতে দিতে হাত ফসকে তরকারির ঝোল দস্তরখানে পড়ে যায়। তোজাম বিরক্তচোখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে ভারি গলায় বলে,
-মাইয়া কবে যাইব? কিছু কইছে তোমারে। আমি সারাদিন গঞ্জে থাকি। মাইয়ারেতো কিছু জিগাইতে পারি না। তুমি কী কর?

জবাব না পেয়ে তোজাম আরেক লোকমা ভাত মুখে তুলতে তুলতে বলে,
-বাপের বাড়ি বেড়াইতে আইছস, ভালা কথা, দুইদিন বেড়াইয়া চইলা যা। বিয়ার পর বাপের বাড়িত এত কী!

হীরা আক্তার মাথার ঘোমটা টেনে আঁচলের খুঁট আঙুলে প্যাঁচাতে থাকে।
-কালকাই আমি লতিফরে দিয়া ওরে হউরবাড়ি পাঠামু। মাইয়ারে সাবধান কইরা দিও। যাওনের আগে কোনো কিচ্ছা য্যান না ঘটায়।

হীরা আক্তার কী করবে! কোনো কিচ্ছা ঘটলে তো আর কাজীপাড়া গ্রামে চাপা থাকে না। কাজীপাড়া গ্রাম আর দশটা গ্রামের মতো সহজাত কিছু গুণাবলী সম্পন্ন। নতুন গল্প পেলে সেটিকে সকাল বিকেল পরিচর্যা করে গল্পের ডালপালা বানানো এই গ্রামের মানুষের স্বভাবজাত। কোহিনূরের সংসার না করার গল্পের ডালপালা ছড়িয়ে যে বেশ একটা বিলাসী বটগাছের আকার ধারণ করেছে সেটা হীরা আক্তার আগেই টের পেয়েছেন। লোকের কথার তো শেষ নেই। কত কারণ যে বের করছে কোহিনূরের পিতৃগৃহে প্রত্যাবর্তন বিষয়ে। যদিও তিনি নিজেই এখনও মেয়ের সংসার ত্যাগের কারণ জানতে সমর্থ হননি।

স্ত্রীকে চুপ দেখে তোজাম পাত থেকে হাত তুলে দৃষ্টিকে মনোযোগী করে। এই বাড়িতে তার কাছ থেকে কিছু একটা লুকানো হচ্ছে। ঘর-গেরস্ত সামাল দিতে দিতে তার চুলে পাক ধরেছে। এসব বিষয় তার চোখ এড়ায় না। পল্লী বিদ্যুতের ঢিমে আলো তোজামের খটখটে মেছতাপড়া চেহারায় পড়ে আরো পোড়া পোড়া দেখায়। স্বামীকে নিশ্চুপ দেখে হীরা আক্তার তরকারির বাটি এগিয়ে দেয়।
-আট্টু ডিম চচ্চড়ি নেন, আপনার তো পছন্দ।
সামনে থেকে ডিম চচ্চড়ির বাটি ঠেলে দিয়ে তোজাম গলায় কাঠিন্য আনে,
-মুখে ঠুলি দিছো? মাইয়ারে ভাল মন্দ জিগাইস কিছু? এতক্ষণ ধইরা কি প্যাঁচাল পাড়তেছি কানে তোলো না?

অসহায় হীরা আক্তার কোনো রকমে উত্তর করেন।
-জিগাইছি, মাইয়া রা করে না।
-রা করবো ক্যান? রা করনের মুখ আছে?

এবার রাগে তোজামের মুখ থমথম করে।
-ডাকো তোমার সোহাগী মাইয়ারে। লাজ-লজ্জার মাথা খাইয়া বিয়াইত্ত মাইয়া পরপুরুষের লগে আলে-ডালে ঢলাঢলি করে...

স্বামীর কথা শুনে হীরা শরবিদ্ধ পাখির মতো কাতরায়,
-কী কন...

কোনো প্রতিউত্তর না করে স্ত্রীর দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাতে তাকাতে খাওয়া শেষ করে শোবার ঘরে খাটে আধ শোওয়া হয়ে বসে তোজাম। পকেট থেকে দেয়াশলাই বের করে সিগারেট ধরায়। কাশির কারণে সিগারেট প্রায় ছেড়েই দিয়েছে সে। ভাত খাবার পরে তবু একটু ধোঁয়ার উষ্ণতা না পেলে ভালো লাগে না। আর এখন তো মাথার ভেতরে বিষবাষ্প। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে সামনে দাঁড়ানো কোহিনূরের দিকে তার চোখ যায়।

হঠাৎ তোজামের কাশি ওঠে। কাশি চেপে চেপে মেয়েকে প্রশ্ন করে,
-কিরে হউর বাড়ির খবর কী?
-খবর ভালাই।
-জামাই মিয়া কেমুন আছে। কোনো খোঁজখবর নাই।

কোহিনূর উত্তর দেয় না।
-কালকাই তোরে ওইবাড়িতে পাঠামু। লতিফরে আইতে কইছি, তোরে নিয়া যাইব।
-আমি যামু না।

বলেই বাবার সামনে থেকে চটুল পায়ে ভেতর ঘরে চলে যায় কোহিনূর। মেয়ের ঔদ্ধত্য দেখে লতিফ হাতের সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে মেয়ের পিছু ধাওয়া করে।
-যাবি না? যাবি না মানে?
-হ, যামু না।
-ক্যান?

কোহিনূর বাবার কথার উত্তর দেয় না। যেন ও ফিরতি প্রশ্নটা শুনতে পায়নি। ঘরের পঞ্চাশ ওয়াটের বিজলি বাতির চারপাশে পোকারা উড়ছে। বাবাকে উপেক্ষা করে কোহিনূর পোকাদের নাচনের দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ ওর কী যেন হয়, চোখের সামনের দৃশ্যপট মুছে গিয়ে ও নিজের অবস্থান বিস্মৃত হয়ে যায়। কোথায় দাঁড়িয়ে আছে ভাবতে ভাবতে চোখের সামনে দেখতে পায় আলো-আঁধারিতে দুটি নগ্ন শরীর নাচছে। শব্দহীন সেই নাচন প্রচণ্ডভাবে কামনামুখর। তাই লজ্জা নামক কোনো শব্দের সীমারেখা জানা নেই দুটি শরীরের। আছে শুধু গন্তব্যে পৌঁছাবার তাগিদ।

নারী দেহটিকে চিনতে পেরে ওর কোহিনূর থরথর করে কেঁপে ওঠে। পুরুষটি কে?
উত্তর খোঁজার আগেই বিজলি চমকের মতো প্রশ্ন এসে ওকে ঝলসে দেয়,
-বেলাজ মাইয়া...কী শুনি তর নামে?

কিন্তু শ্রোতার কানে কথা পৌঁছায় না। যেন কোনো ঘটনার দৃশ্যান্তরে তরিতাহত কোহিনূর সাড়হীন দাঁড়িয়ে আছে। জাগতিক দিশা হারিয়ে ও চোখের সামনে দেখতে পায় অপরূপ এক দৃশ্য। নারী ও পুরুষের শরীর দুটি সাপের মতো নিজেদের দেহ পেঁচিয়ে ধরে এরা কারুকার্যময় জ্যোৎস্নারাতে অদ্ভুত এক ভ্রমের সৃষ্টি করছে। সময়ের প্রতি ফোঁটা সুখ তারা পরস্পরের কাছ থেকে নিঙড়ে নিতে চায়। এই শরীর দুটি যেন জানে এই মুহূর্তকাল অতিক্রান্ত হলেই তারা থৈ থৈ মহানন্দার মতো পূর্ণ হবে। সেই সাথে নারী শরীরটিও পূর্ণগর্ভা হয়ে জগতের কাছে আরও দামী হয়ে উঠবে। তারপর রোজ ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে পুড়ে এসে পুরুষ শরীরটি লাঙল হাতে উঠোনে দাঁড়িয়ে হাঁক দিবে, খোকার মাও, কই গেলা?

-কী জিগাই? কথা কানে যায় না?

তোজামের প্রশ্ন শেষ হতেই হঠাৎ বাইরের অন্ধকার ভেদ করে একটা প্যাঁচা ভয়ার্ত স্বরে ডেকে ওঠে। খুব দ্রুত দৃশ্যপট বদলে যায়। নাচতে নাচতে দম ফুরিয়ে গেলে আলোভূক পোকার মতো সেই দুটি শরীর পরস্পর থেকে খসে গিয়ে সাড়হীন পড়ে থাকে। যেন স্বপ্নপূরণের অপ্রত্যাশিত ভার তারা আর নিতে পারছে না।
-কী কই?

কোহিনূরের সম্বিত ফিরে আসে।
-ওই ব্যাটার লগে আমি আর সংসার করুম না।
-ক্যান?
-আমি তা তোমারে কমু না বাবা। তুমি এইসব শুনতে চাইও না।

কোহিনূর ঘরের বাইরে যাবার জন্য সামনে পা বাড়ায়। মেয়ের ঔদ্ধত্য দেখে তোজাম রাগে প্রায় অন্ধ হয়ে যায়। জ্ঞান-বুদ্ধিহীনভাবে ছুটে এসে তোজাম কোহিনূরের মাথা ঘরের খুঁটিতে ঠুকে দেয় আর অন্ধরাগে চিৎকার করে বলতে থাকে,
-কত্ত বড় সাহস। আবার ক, কী কইলি? ক আবার!

কোহিনূর বাপের হাত থেকে বাঁচার জন্য মরিয়া হয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। এরপর সর্বশক্তি দিয়ে নির্লজ্জ চিৎকার করে ওঠে,
-ওই ব্যাটার কোনো ক্ষ্যাম নাই! অর লগে আমি সংসার করুম না। আমি মামুনরে বিয়া করুম। মামুনের ক্ষ্যাম আছে...

খানিক আগের কোলাহল এবার হুট করে থেমে যায়। কোহিনূরকে দেখে মনে হয় ওর সামনে দাঁড়ানো পাথর সদৃশ নিষ্প্রাণ মানুষটি ওর ভেতরে কোনো প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে না। বিপরীতদিকে তোজামকে ভীষণ বিধ্বস্ত দেখায়। কিছু না বলে ধীরপায়ে তোজাম ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। প্রস্থানরত বাবাকে দেখতে দেখতে কোহিনূরের বেলাজ চোখেমুখে রাতের অবিন্যস্ত অন্ধকার উপেক্ষা করে আলোর অজস্র ফুল ফুটতে থাকে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement