লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১০ অক্টোবর ১৯৮০
গল্প/কবিতা: ২৮টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবাবা - আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু (জুন ২০১৬)

জোবরদখল
বাবা - আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু

সংখ্যা

আশরাফ উদ্ দীন আহমদ

comment ১  favorite ০  import_contacts ৩৪২
বিলমালোয়ের লোকেরা আবার একটা হাঙ্গামা দেখার অপেক্ষা করতে থাকে, খুনোখুনি-রক্তারক্তি এখন যেন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা, কেউ যেন নেই এর বিহিত করার। মানুষ ক্রমশঃ ভয়াবহ রূপে নিজেকে পরিণত করতে পেরেছে, ভালোবাসা-সম্প্রীতি স্নেহ-মায়া কি তবে শুধুই কথার কথা। যুদ্ধই কি শেষ অস্ত্র, যুদ্ধ দিয়েই কি তবে সমস্ত সমাধান পরিমাপ করা হয়, নিজের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ, এই যুদ্ধ কোনোদিন শেষ হবার নয়। মানুষ আদিকাল থেকে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যুদ্ধ করছে, যেন মায়ের গর্ভ থেকে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলাটা রপ্ত করে এসেছে, কিন্তু মাটির জন্য যুদ্ধ অর্থাৎ মায়ের জন্য যুদ্ধের তো শেষ নেই, তারপর কি হবে তাও কেউ জানে না।
বিলমালোয়ের আশেপাশে দেওপাড়া-বোয়ালিয়া দামনাশ-এনায়েতপুর এবং শালজোড়ের লোকেরা এই যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করে প্রতিনিয়ত, টিকে থাকার এই লড়াই পূরুষানুক্রমে চলছে এ’ অঞ্চলে। কারণ বিলমালোয়ের শত-সহস্র জমি খাসজমি হয়ে গেছে সেটেলমেন্ট রেকর্ডে, বত্রিশ/ সাতচল্লিশ এবং বাষষ্টি সালের রেকর্ডে যার নাম লিপিবদ্ধ আছে, তারা কেউই আর বাহাত্তরের রেকর্ডে নেই, অর্থাৎ খাসজমি। আর মালিকানা হারিয়ে মূল মালিক হয়ে যায় ভূইফোঁড়, তারপর চলে আরো ফাইল চালাচালি, কিন্তু কিছুই করার থাকে না, মাঝখান থেকে কোট-কাঁচারী খেয়ে নেয় যাবতীয় সঞ্চয়, ভূমিহীন এবার হয় দলিতমথিত, এভাবেই চলে দিনের পর দিন, মাসের পর বছর এবং দশক, সবখানে ক্ষমতার দম্ভ, যে যায় লংকায় সে হয় রাবণ। তার চেয়ে বড় কথা পেশি শক্তি, যার আছে পেশি শক্তি সেই হিরো, সমাজ-রাষ্ট্র তাকে কুর্নিশ করে, সে হয় রাজা, তাকে আর দেখে কে, কিন্তু যখন ক্ষমতা চলে যায় তখন সে আবার ঘরের ছুঁচো হয়ে ভাগাড়ে চড়ে বেড়ায়।
সাতচল্লিশের পর ওপার থেকে আসা মানুষগুলোই অংশিদারিত্বের মামলা ঠুঁকে ভোগদখল করে, কেউ কম নয় কারো চেয়ে, বিলের মালিক সবাই হতে চায়, আর সে কারণে যে কোনো ছুঁতোয় হাঙ্গামা-ফ্যাঁসাদ এবং তারপর পুলিশকেস, বিলের এই অংশ নিয়ে আজ সমাধান হলো তো কাল আরেক অংশ নিয়ে চলতে থাকে নতুন করে হাঙ্গামা। মানুষের তো কোনো কাজ নেই, শুধু ধান্দা আর ফন্দি-ফিকির, তা চলতে দোষ কোথায়!
দবির মুন্সী আকাশ-পাতাল কতো কিছুই ভেবে যায়, তার ভাবনার আর শেষ নেই, জীবনই বুঝি এই, ছেলে ছেলেবউ নাতি নাতনি আর আত্মীয়-অনাত্মীয়তে ভরপুর তার পরিবেশ, চারদিকে চোখ মেলে সে অনেক কিছুই অনুধাবণ করে, অনেক দূরের দৃশ্য চোখে না এলেও মনের ভেতরের আরেক লেন্সহীন চশমায় অনেক স্মৃতি-স্মৃতি দৃশ্যাবলী ফুটে ওঠে,তখন তার মন হাহাকার করে ওঠে, জীবন যেন কতো জটিল আর কঠিন, এই কঠিনের মধ্যে সে আজ নিসঙ্গ পথিক, কোথায় যাবে জানে না, আর তাই দাঁড়িয়ে আছে পুরোনো শিরিষগাছে নীচে, কেউ কি তাকে ডেকে নেবে, অথবা কাছে এসে দু’ দন্ড দুটো কথা বলবে। সময় যে কঠিন এবং জটিল, সেই জটিল-কঠিন আর দুঃস্বপ্নময় সময়ের আঙিনায় দাঁড়িয়ে দবির।
সাতচল্লিশে নিজ দেশ-ভিটে মাটি ছেড়ে-ছুড়ে চলে আসে বাপের হাত ধরে, তারপর এই মাটিই হলো আশ্রয়, জীবনের অনেক খন্ড-খন্ড গল্প ভেসে ওঠে মনের সরোবরে, মন এখন তো ভোঁতা তরবারী, কোনো কাজের কাজ করে না, শুধুই অদ্ভূত সব স্বপ্ন রচনা করে, কিন্তু ছেলেবউ সেই স্বপ্নকে বলে, বুড়োর সব ঘোড়ারোগ...
ঘোড়ারোগ শুনে দবির মুন্সী চুপসে যায়। সে’ বার মরণজ্বরে ছেলে-মেয়ে দুটোকে ফেলে রেখে কপিরন চলে গেলো, না ফেরার দেশে, তারপর থেকে সে নিঃসঙ্গ, কেউ আসেনি কাছে, শুধুই স্মৃতি মন্থন করে পথচলা, কঠিন জীবনের পথে-পথে এতো কাঁটা, এতো অসমতল কেনো, বোঝে না, বুকের মধ্যে অন্যরকম এক কষ্ট বেড়ে ওঠে, বিলমালোয়ের মানুষগুলো প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে, যুদ্ধ-যুদ্ধ এই খেলা চলছে, আরো কতো কাল বা চলবে, হয়তো চলতেই থাকবে দিনপুঞ্জিকা মেনে, খাস জমি-দখলি জমি-পত্তানি জমি পরিত্তাক্ত জমি-শত্র“ সম্পত্তি, এই ভাবে জমি রয়েছে শত-সহস্র বিঘা-একর, মানুষ জমির অধিকার ছাড়তে চায় না, শুধুই দখল করতে চায়।
দবির মুন্সীরা যখন এই বিলমালোয়ে প্রথম আসে, তখন চারদিকে ছিলো জলেমগ্ন আর অবাধ জমি, জমি আর জমি, খাড়ি জমি, দু’ ফসলি জমি, রবিশস্যের জমি, ফসল যেন বুক উজার করে ঢেলে দিতো, আর পানিতে ছিলো নানান মাছের সমারোহ, বড়-বড় শোল-মাগুর-রুই কাতলা বোয়ালের মতো মাছগুলো বিলের পানিতে অবাধে সাঁতরে বেড়াতো, শুধুই বংশ বিস্তার আর বংশবিস্তার।

এখন সবই গল্প, খোলা চোখে তাকিয়ে থাকে বিলের দিকে যেন মহাসমুদ্র কিন্তু মানুষ কামড়ে খেতে চায়। কেউ কারো চেয়ে কম নয়, দবির মুন্সীর চোখ আদিগন্তে ছুঁতে পারে না, ছেলেদের-নাতিদের শাসন করবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, যার যতো শক্তি সেই পায় জমির অধিকার, জমি হলো গিয়ে বেগানা মেয়েমানুষ, সুন্দরী মেয়েপরীকে কে না চায় নিজের আয়ত্তে রাখতে, মেয়েমানুষ হলো গিয়ে পুরুষের সৌর্য-বীর্যের অধিকার, তাকে ছিনিয়ে নাও, ইচ্ছে মতো তার সঙ্গে সঙ্গম করো, মাটিও তেমন, জলভরা বিল হলো গিয়ে মেয়েমানুষের মতো তাকে ইচ্ছে মতো ছিনিয়ে নাও, কোনো কথা হবে না, নিজের করে রাখো যদি পুরুষ হও, যদি নিজেকে সমাজের ওপরে রাখতে চাও, তাহলে জমি এবং মেয়েমানুষকে ঠিক করে রাখো, যার কোমরে শক্তি-সাহস সেই পারে ধরে রাখতে নিজের বাহুতে, সরকারী মানুষগুলো কখনো-সখনো হামলে পড়ে, কিন্তু অধিকার তো কারো চিরকাল থাকে না, চরদখলের মতো আবার দখল হয়ে যায়, তখন যুদ্ধ বাঁধে, ভয়াবহ যুদ্ধ, জীবন-মরণ যুদ্ধ, বেঁচে থাকা না বেঁচে থাকার যুদ্ধ, তাতে কেউ পরাজিত হবে কেউ দখল পাবে, খুনোখুনিতে রক্তপাত হবে, থানা-পুলিশ কোট-কাঁচারি হবে, তারপর কিছুদিন সব কেমন থেমে যাবে, যেন বা শান্ত দীঘির পরিস্কার জল, কাকচক্ষু সেই জলের ভেতর দর্পণের মতো মুখ দেখা যায়, অথচ আবার ঘোলা করে দেয় সময়, সময়ের নদী সাঁতরে আসে হাঙড়, সেই হাঙড় খেয়ে ফেলে নিস্তবতাকে, নিরন্তর চলা লড়াই মনের নিভৃত কোণে ক্যাকটাসের মতো বাড়তে থাকে, দবির মুন্সীরা পলকহীন তাকিয়ে নিঃশ্বাস ফেলে, নিজেকে কচ্ছপ ভেবে সিঁধিয়ে যায় খোলসের ভেতর, একদিন তারও তাগদ শক্তি ছিলো, হাতের পেশি-কোমরে সেই শক্তি আর নেই, সময় তাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে চায়, ছেলেরা-নাতিরা লাঠি-রামদা বৈঠা-শড়কি কাস্তে-বাঁশ নিয়ে ছুটে যায় প্রতিপক্ষের ওপর, গ্রামবাসী যুক্ত হয়, বাইরের মানুষকে অধিকার দেবে না, বিলের মালিকানা হাতছাড়া হওয়ার মানে উদ্বাস্তুর মতো জীবনযাপন। একবার দেশত্যাগি হয়ে এসেছে আর মাটি হাতছাড়া করবে না, মাটি যে জীবন, মাটি যদি না থাকে কৃষকের ইজ্জত থাকে কি, জীবন থাকতে কৃষক মাটি হাতছাড়া করতে পারে না, তার জন্য জীবন বাজি লড়ে যুদ্ধ করবে, সে যুদ্ধে জীবন চলে গেলোও ভালো, তবু কোনোভাবে জম ছাড়া করবে না।
দবির মুন্সী কখনো বা চিৎকার করে বলে, মার-মার শালাদের একেকটাকে জিন্দা গিলে খা...আজকাল তারও কেমন সময় যেন আর কাটে না, সময় আটকে থাকে, কাটতে চায় না, নিজেকে ভারী অসহায় মনে হয়, কোথাও শান্তি নেই, মেয়েদের সংসারে কতোদিন বেড়াতে গেছে, আদর-যতœ ভালোবাসা সেবাতে ভরিয়ে দেয়, ছেলেরাও কম নয়, বাপের প্রতি সবার দৃষ্টি সজাগ, কিন্তু তার আর ভালো লাগে না, জীবনটা কেমন পানসে হয়ে গেছে, ভয়াবহ স্বপ্নগুলো গুচ্ছ-গুচ্ছ অন্ধকার হয়ে ছুটে আসে, খালপারের দিকে অনেকরাত্রে ছুটে যায়, হাসনাহেনার ঘ্রাণে ভরে থাকে চারদিক, অনেকটা সময় দাঁড়িয়ে থাকে, কপিরনের কবরের মাটি হাতে স্পর্শ করে দেখে, বুকে নেয়, নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ নেয়, এখানে কতো আপনজন শুয়ে আছে কতোকাল ধরে, সকাল-সন্ধ্যে পাখি ডেকে যায় গাছে-গাছে, দবির মুন্সী শুধু বিচ্ছিন্ন তাদের থেকে, কবে বা ওপারের ডাক আসবে, মন অস্থির তার, কপিরন যেন একসময় কথা বলে ওঠে, এখানে কেনো, বাড়ি ফিরে যান, অনেক রাত্রি এখন...
দবির মুন্সী এলোপাথারী খুঁজে যায় নিজের ছায়ার ভেতর আরেক ছায়াকে, কে কথা বলে, কপিরন আমাকে তাড়িয়ে দিয়ো না...
রাত্রি বাড়তে থাকে, দূরে শিয়ালের চিৎকার, নানান কীটপতঙ্গের কলরবের মধ্যে দবির মুন্সী হারিয়ে ফেলে নিজেকে, রাত্রের আকাশে তারাদের খেলা চলে, সোনার থালার মতো চাঁদ আলো ঢেলে যায়, বাতাসে মিষ্টি কোনো ফুলের ঘ্রাণ, মাটির গন্ধ ঘাসের গন্ধ, পাতার গন্ধ, জোনাকি মেয়েদের বিন্দু-বিন্দু আলোয় ভেসে যায় দিগন্ত, বিলমালোই যেন কথা বলে ওঠে প্রবীণ এই মানুষটার সঙ্গে, কি কথা বলে কেউ জানে না, কেউ কখনো জানতে পারবে না, চাঁদ আলোর লুকোচুরি খেলা চলে শুধু নিরন্তর।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement