লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ ডিসেম্বর ১৯৭১
গল্প/কবিতা: ২৭টি

সমন্বিত স্কোর

৪.১৬

বিচারক স্কোরঃ ২.২২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৯৪ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftব্যথা (জানুয়ারী ২০১৫)

অকৃতজ্ঞ
ব্যথা

সংখ্যা

মোট ভোট ৪২ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.১৬

ওয়াহিদ মামুন লাভলু

comment ২৮  favorite ০  import_contacts ১,৮৭৩
এক

মাহমুদার দর্শন ছিল ‘‘ডাক্তারের উচিৎ ডাক্তারকেই বিয়ে করা।’’ ঢাকা মেডিকেল কলেজে প্রথম বর্ষ থেকে দ্বিতীয় বর্ষে উঠতে মাহমুদা প্রথম স্থান অধিকার করে উঠেছিল। প্রোসেকটর মহিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে মাহমুদাই প্রোসেকটরের দায়িত্ব পালন করতো। পরবর্তীতেও তার রেজাল্ট ওই রকম ভালোই ছিল।

সাত জন মেয়ের মধ্যে মাহমুদা ও জোবেদা ছাড়া আর সকলেই সাধারণতঃ সালোয়ার-কামিজ পরেই ক্লাসে আসতো; মাঝে মধ্যে তারা শাড়ী পরেও আসতো এবং যেদিন শাড়ী পরে আসতো সেদিন সালোয়ার-কামিজ ওয়ালীরা আগে থেকেই যুক্তি পরামর্শ করে সকলেই শাড়ী পরেই আসতো এবং সেদিন ছাত্র-শিক্ষক সহ তাদের নিজেদের কাছেও সেটা খুব মজার ব্যাপার হতো। প্রচুর মুচকী হাসাহাসি ও একটু লজ্জা পাওয়া বা একটু কটাক্ষ-এসব হতো। অবশ্য আনোয়ারা কোনদিন শাড়ী পরে আসতো না-এটা লক্ষ্য করতো সকলেই।

শায়লাকে নিয়ে ক্লাসের ছেলেরা অ্যানাটমির এক ভিসেরার একটি রিলেশন রচনা করেছিল এভাবেঃ ‘‘শায়লা (এস) সখি (এস) গায়ে (জি) পায়ে (পি) জল (জে) কেন (কে)?’’ বন্ধনীর মধ্যেকার অক্ষরগুলো ভিসেরাটির রিলেশন-এ স্থিত দৈহিক অঙ্গগুলোর নামের প্রথম অক্ষর। যেমন প্রথম এস-তে স্টমাক হতে পারে, দ্বিতীয় এস-তে হতে পারে স্প্লীন, জি-তে গল ব্লাডার, পি-তে প্যানক্রিয়াস, জে-তে জেজুনাম এবং কে-তে হতে পারে কিডনী-এই রকম আর কি। অ্যানাটমির অর্গান বা ভিসেরাগুলির রিলেশন মনে রাখার এটি একটি অতি সহজ এবং মেডিকেল কলেজের ছাত্র/ছাত্রীদের একটি অতি প্রিয় পদ্ধতি। ‘‘প্রিয়া (পি) মোর (এম) পাশে (পি) শুয়ে (এস) অ্যানাটমি (এ) পড়ে (পি)’’-এটিও একটি ওই ধরণের গাথা। শুধু মেডিকেল কলেজ নয়, উচ্চ পর্যায়ের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র/ছাত্রীদের জন্যই পদ্ধতিটা খুব ভালো।

মাহমুদা অত্যন্ত সুন্দরী ছিল কিন্তু আকর্ষণীয়া ছিল না। তার এই আকর্ষণীয়া না হওয়ার কারণটি সম্ভবতঃ এই ছিল যে সে ছিল বিবাহিতা। একটি অবিবাহিতা যুবতীই সাধারণতঃ একজন অবিবাহিত যুবকের কৌতূহল উদ্রেককারী, বিবাহিতা নারী কোন অবিবাহিত পুরুষের কৌতুহল উদ্রেক করে না। সেই কারণে মাহমুদার সম্পর্কেও ক্লাসের ছেলেদের কারও কোন কৌতূহল ছিল না; সে বিবাহিতা এটা জানার সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতি ছেলেদের আর কোন কৌতুহল থাকে নি। অবিবাহিতা যুবতীদের ক্ষেত্রেও বিবাহিত পুরুষদের ব্যাপারে সাধারণতঃ এরূপ অনুভূতিই হয়।

মাহমুদার স্বামী ছিল একজন পোস্ট মাস্টার এবং মাহমুদা তার স্বামীর টাকাতেই মেডিকেল কলেজে পড়েছিল। শরীফ নামের এই যুবক মাহমুদার মেডিকেল কলেজের ছাত্রীজীবনের প্রথম দিকে পাবনা জেলার সাঁথিয়া পোস্ট অফিসে কর্মরত ছিল। তাদের একটি সন্তানও হয়েছিল।

শরীফের বাড়ি সিরাজগঞ্জ। বিয়ের পূর্বে সে বেড়া পোস্ট অফিসে ছিল। তখন প্রায়ই সে বেড়া বাজারের একটি লাইব্রেরীতে যেত। তার বিণয়, সততা ও সুন্দর ব্যবহার সেই লাইব্রেরীর মালিককে মুগ্ধ করেছিল বলে তিনি শরীফের সঙ্গে তার মেয়ে মাহমুদার বিয়ের জন্য শরীফের কাছে লোক মারফত প্রস্তাব পাঠান।

লোকটি শরীফের কাছে এসে বলেছিল, ‘‘আপনার যদি আপত্তি না থাকে তবে আপনার বিয়ের জন্য একটা মেয়েকে দেখাতে চাই।’’
শরীফ জানতে চেয়েছিল, ‘‘মেয়েটি কে?’’
লোকটি বলেছিল, ‘‘হাতীগাড়া গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক সাহেবের মেয়ে। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সে সকলের বড়। ইন্টারমিডিয়েটে পড়ে। খুবই সুন্দরী, আপনার পছন্দ হবে।’’
শরীফকে আব্দুর রাজ্জাক সাহেব খুব স্নেহ করতেন বলে শরীফ তার প্রতি দুর্বল ছিল। তাই সে ইতিবাচক মতামত দেওয়ায় কয়েকদিনের মধ্যেই দেখার ব্যবস্থা হয়ে গেল।

তখন ছিলো শরৎকাল। মাহমুদাদের বাড়িতে যাওয়ার পর বাড়ির দক্ষিণ দুয়ারী বৈঠকখানায় প্রথমে শরীফদেরকে বসতে দেওয়া হয়েছিল। সেদিন শরীফের সঙ্গে তার এক ছোট বোন ও তার বাবাও ছিলেন। প্রথমে একটু হাল্কা নাস্তা দেওয়া হয়েছিল। বাড়ির ভিতরে দেখার ব্যবস্থা করে তাদেরকে ভিতরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মাহমুদা ও শরীফের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল সামনা-সামনি।

একসময় সামনের ঘর থেকে মাহমুদা বের হয়ে এলো তার মেজ মামার সঙ্গে। সবুজ জর্জেটের একটা শাড়ী ছিল তার পরনে, কপালের সিঁথির দু-পাশে ফুলিয়ে চুল বাঁধা ছিল; সিঁথিটি ঠিক নাক বরাবর ছিল না, একটু বাঁ দিকে ছিল, তার সিঁথি একটু বাঁকাই ছিল-সোজা সিঁথি উঠতো না। ঘর থেকে বের হয়ে বেশ কিছুটা পথ হেঁটে আসতে হলো, এই সময়ের মধ্যেই রূপের তরঙ্গ তুলে তার হেঁটে আসাটা দেখলো শরীফ। চেয়ারের কাছে এসে একটু দাঁড়ালো এবং বসতে বলায় সে বসলো। চোখ দুটো তার ডাগড় নয়, অপেক্ষাকৃত ছোটই কিন্তু তার মুখের সাথে মানানসই। শরীফের প্রায় সমানই লম্বা-স্বাস্থ্য সুন্দর ও সুগঠিত, গায়ের রং ফর্সা, গৌরবর্ণ নয়। সব মিলিয়ে সে সুন্দরী-অপূর্ব সুন্দরী। শরীফের বাবাই জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘আপনার নাম কি?’’
অত্যন্ত মধুর অথচ মৃদু কন্ঠে সে জবাব দিল, ‘‘মাহমুদা আক্তার।’’

তারপর মামুলী কিছু কথাবার্তা, দু-চারটে প্রশ্ন ও উত্তর, একটু কোরআন শরিফ পড়া শুনা, একটু হাতের লেখা দেখা ইত্যাদি। তারপর মাহমুদা চলে গেল। সেদিনই বিয়ে পাকাপাকি হলো। বিয়ের দিন ধার্য করা হলো ৫ই জুলাই, মঙ্গলবার।

শরীফের হবু শ্বশুর শরীফের বাবার কাছে একটা অনুরোধ উপস্থাপন করেছিলেন, ‘‘বিয়ের পর আমার মেয়েটাকে আপনারা বি. এসসি. ডিগ্রীটা পাস করাবেন।’’
শরীফের বাবা তাতে আনন্দচিত্তে সম্মতি জানিয়েছিলেন। শরীফরা খাওয়া-দাওয়ার পর চলে এসেছিল। সেদিন ছিলো ‘বিজয়া দশমী’। বিসর্জনের দিন।

দুই

বিয়ের দিন তিনবার ‘কবুল’ পড়া দ্বারা ‘মাহমুদাকে’ স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করার মাধ্যমে শরীফ নতুন জীবনে প্রবেশ করলো। যথারীতি বিয়ের বাকী অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন করার পর মাহমুদা যে ঘরে ছিল শরীফকে সেই ঘরের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হলো এবং মাহমুদার হাত তার হাতের উপর স্থাপন করে তাকে তার হাতে সমর্পণ করা হলো। তারপর তার হাত ধরেই ঘর থেকে তাকে নামিয়ে নিয়ে এলো সে। একান্ত নির্ভরতায় তার হাত ধরে সে এলো তার সাথে সাথে এবং বেশ কিছুটা পথ হেঁটে এসে তাকে সঙ্গে করে শরীফ গাড়িতে উঠলো।

‘নতুন বউ’ দেখে বাড়ির এবং আশেপাশের বাড়ির সকলেই খুব খুশী ও আনন্দিত হলো। মাহমুদাকে নিয়ে মেয়েদের আমোদ-আহ্লাদের পর তাকে বাসর ঘরে রেখে শরীফকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হলো।

মাহমুদা খাটের উপর বসে ছিল। শরীফও খাটের এক কোনায় বসলো। হঠাৎ করেই যেন নিজেকে অনেক দায়িত্বশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হলো শরীফের। এতদিন ছিল সম্পূর্ণ একা, একক। বিয়ের মধ্য দিয়ে আর একটি যুবতীর জীবন-যৌবন সবকিছু তার জীবন-যৌবনের সঙ্গে জড়িত হওয়ার মাধ্যমে সে যেন নিজেকে একটি দায়িত্ববান মানুষ হিসাবে আবিষ্কার করলো।

মাহমুদা ঘোমটা মাথায় দিয়ে জড়োসড়োভাবে ছিল। শরীফ চিন্তা করলো যে এই এক অদ্ভূত অথচ চিরন্তন জীবন নারীদের। যেখানে সে জন্মে, যাদের মধ্যে সে বড় হয় তাদের সবাইকে ছেড়ে একদিন তাকে সম্পূর্ণ অজানার পথে যাত্রা করতে হয়। এই যে একটি অনিন্দ্যসুন্দরী পূর্ণ যুবতী আজ তাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছে এবং এখন তার কাছাকাছি চুপচাপ বসে আছে তার কথা ভেবে দেখা প্রয়োজন। আজ থেকে সতের-আঠার বছর আগে যে ঘরে সে জন্মেছিল, যে বাড়িতে এবং যাদের মধ্যে সে হেসে খেলে বড় হয়েছিল, যে আলো গ্রহণ করে ও যে বাতাসে শ্বাস নিয়ে সে বেড়ে উঠেছিল তার রূপ-যৌবন নিয়ে, আজ সেই ঘর, সেই বাড়ি, তার মা-বাবা, ভাই-বোন, নানা-নানী, মামা-মামানী প্রভৃতি তার আপনজনেরা, সেই আলো, সেই বাতাস আর তার কাছে কেউ নয়, কিছু নয়। আজ সেইসব ছেড়ে সম্পূর্ণ অজানা এক অন্ধকারের মধ্যে যার হাতে হাত রেখে সে বের হয়ে এসেছে একান্ত বিশ্বাসে ও নির্ভরতায় সেই সে তার সামান্যতম পরিচিতও নয়, এমন কি দেখা পর্যন্তও যার সাথে তার হয় নি কোনদিন কখনও সেই একমাত্র দেখার দিন ছাড়া। ভাবতে অবাক লাগে! নারী জীবন কি কঠোর ত্যাগ ও গ্রহণের জীবন! বিগত সতের-আঠার বছরের সবকিছুকে ত্যাগ করে তাকে গ্রহণের এবং আপন করে নেয়ার সাধনা করতে এবং করে যেতে হবে সেই সবকে এবং সেই সব মানুষকে যারা কোনদিন তার কেউ ছিল না, কিছু ছিল না। এ যে কী কঠোর সাধনা তা যে নিজে একজন নারী নয় সে বুঝতে পারবে না কখনও। নারী জীবন এমন একটি চারা গাছের মত যাকে তার অংকুরোদগম ও বড় হওয়ার স্থান থেকে হঠাৎ একদিন তুলে নিয়ে রোপন করে দেওয়া হয় এমন এক মাটি ও এমন এক আলো-বাতাসে যে মাটি ও যে আলো-বাতাস তার মোটেই পরিচিত নয়। স্বামী যদি হৃদয়বান ও সহানুভূতিশীল না হয়, সে যদি নারীদেহের ও তার চিত্ত-চেতনার এই অসহায়ত্বের কথা না বোঝে এবং সে যদি সচেতনভাবে স্ত্রীর দেহ-মনে ও চিত্ত-চেতনায় সবসময়ে প্রেম-প্রীতি ও দরদ ভালোবাসার পানি সিঞ্চন না করে তাহলে স্ত্রীর সেখানে বাঁচাই কঠিন হবে, বেড়ে ওঠা ও ফল প্রদান করার তো প্রশ্নই আসে না।

শরীফ বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে মাহমুদার মুখের দিকে তাকাতেই সে সলজ্জে তার মুখ নামিয়ে নিলো, মাহমুদা শরীফকেই দেখছিল। শরীফ মাহমুদাকে বললো, ‘‘কথা বলছো না যে।’’
কোন জবাব নাই। শরীফ জিজ্ঞাসা করলো, ‘‘চুপ করে আছো যে, কিছু ভাবছো?’’
এবারও সে কথা বললো না। আবারও শরীফ জিজ্ঞাসা করলো, ‘‘কি, কথা বলবে না?’’
তবুও সে মুখ খুললো না কিংবা চোখ তুলে তাকালোও না। ‘‘ফ্রয়েডের নারী চরিত্র’’ বইতে শরীফ পড়েছিল যে এরূপ ক্ষেত্রে অধৈর্য্যতা খুব সাংঘাতিক পরিণতি ডেকে আনতে পারে, অথচ যে সব ক্ষেত্রে ধৈর্য্য রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন। সে কারণে কিছুমাত্র অধৈর্য্য না হয়ে আবারও জিজ্ঞাসা করলো শরীফ, ‘‘তাহলে আমাকে কি তোমার পছন্দ হয় নি?’’
এবারও মুখ খুললো না, তবে চোখ তুলে পূর্ণ দৃষ্টিতে শরীফের দিকে তাকালো, সেও তাকালো; চারি চক্ষের মিলন হলো। সলজ্জে মৃদু হেসে মাথাটা ডান দিকে সামান্য কাত করে ইশারায় জানালো, ‘‘হ্যাঁ, হয়েছে।’’
শরীফ জানতে চাইলো, ‘‘তাহলে কথা বলছো না কেন?’’

এবার সে মুখ খুললো, একটু হাসলোও যেন। এই প্রথম তার স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর শুনলো শরীফ-কত মধুর! বললো, ‘‘কি বলবো? তুমিও তো কিছু বলছো না।’’
অনুযোগ। কিন্তু তবুও তার প্রথম কথা তো! খুব ভালো লাগলো শরীফের। ভাবলো শরীফ, ঠিকই তো; কথা তো তাকে আরও আগেই বলতে হতো, অথচ এই এতক্ষণও তাকে কিছুই বলা হয় নি। শরীফ বললো, ‘‘ভাবছি।’’
মাহমুদা জিজ্ঞাসা করলো, ‘‘কি ভাবছো? আমাকে তোমার পছন্দ হয় নি, তাই?’’
হঠাৎ ধাক্কা খেলো শরীফ, ডান হাতের আঙ্গুলগুলির অগ্রভাগ দিয়ে তার চিবুক ধরে তার সুন্দর মুখখানা চোখের সামনে তুলে বললো, ‘‘এই রূপ কি পছন্দ না হওয়ার?’’
এভাবেই শুরু হয়েছিল মাহমুদা ও শরীফের মধ্যেকার প্রেম-আলাপন।

ক্রমে দু’জনেরই ব্যবহার ও কথাবার্তা সহজ ও স্বাভাবিক হয়ে এলো। নির্জন কক্ষে তারা কত কথাই যে বলাবলি করলো! অর্থহীন সে সব কথা! কিন্তু কোন অর্থ না থাকা সেই সব কথাও যে কত অর্থ বহন করে বা করতে পারে সেদিন তা উপলব্ধি করতে পেরেছিল তারা। দু’জনের বাল্য, কৈশোর ও যৌবনের কত কথা, কত সাধ, স্বপ্ন ও আশা-আকাংখার কথাই যে তারা একে অপরকে শুনিয়েছিল তার কি ঠিক আছে? না তার শেষ আছে? দু’জনের পরিবারের সব কথা, কার পরিবারে কে কে আছে, কার পরিবারের কে কেমন, কার সঙ্গে কীরূপ ব্যবহার করতে হবে ইত্যাদি-ইত্যাদি আরও কত সব নিরর্থক কথা!

সকালে ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার পর চকিতেই রাত্রের সব কথা মনে পড়ে গেল শরীফের-একটা স্বপ্ন যেন। রাত্রে মাহমুদাকে দেখেছিল একটা স্বপ্নিল পরিবেশে। ভোরের আলোয় তাকে দেখলো, কত স্নিল্ধ-কত মধুর! অপূর্ব লাগলো।

সারাদিন বিয়ে বাড়ির ব্যস্ততা নিয়ে সময় কাটলো। বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজন ও লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলার মাধ্যমে মাহমুদার সংকোচ-ভয় কেটে গিয়ে সে অনেক সহজ হয়ে এলো। খাওয়া-দাওয়ার প্রস্তুতি সব সম্পন্ন হয়ে গেল, ও পক্ষের কুটুমরাও সব এসে গেলেন এবং গ্রামের যাদেরকে দাওয়াৎ করা হয়েছিল তারাও সব এসে গেল। যথাসময়ে খাওয়া হয়ে গেল।

যাওয়ার আয়োজন চলছে। এই সময়ে শরীফের মাথায় একটা দুষ্ট বুদ্ধি এলো। কাপড়-চোপড় পরে প্রস্তুত হয়ে ঘরের মধ্যে মাহমুদা তার কাপড়-চোপড় ও জিনিসপত্র গুছাচ্ছিল। শরীফ খাটের উপর আধশোয়াভাবে বসে মুগ্ধদৃষ্টিতে অত্যন্ত পরিতৃপ্তির সাথে তার পায়ের দিকে মাহমুদার যৌবনমণ্ডিত অপরূপ সৌন্দর্য্যময় দেহের ছন্দময় গতি উপভোগ করছিল। শরীফের চোখে চোখ পড়তেই মাহমুদা সলজ্জভাবে নিজেকে গুটিয়ে নিতে নিতেই মৃদু হেসে শরিফকে জিজ্ঞাসা করলো, ‘‘তোমার কি কি নিবো?’’
শরীফ জিজ্ঞাসা করলো, ‘‘কেন, আমার আবার কি নিবে?’’
মাহমুদা বললো, ‘‘কেন? কাপড়-চোপড়?’’
শরীফ হেসে বললো, ‘‘আমার কাপড়-চোপড় কেন? আমি তো যাবো না।’’
মাহমুদা আশ্চর্য্য হলো যেন। বললো, ‘‘মানে? তাহলে আমিও যাবো না।’’
বলেই খাটের উপর শরীফের পায়ের কাছে ধপ করে বসে পড়লো। উঠে বসলো শরীফ। বললো, ‘‘না, তোমাকে নিতে এসেছে, তুমি যাও।’’
মাহমুদা বললো, ‘‘তোমাকেও তো নিতে এসেছে। তুমি-আমি আলাদা নাকি এখন?’’
শুনে শরীফের খুব ভালো লাগলো। বললো, ‘‘তাই নাকি?’’
মাহমুদা বললো, ‘‘হ্যাঁ তাই তো।’’
শরীফ বললো, ‘‘কিন্তু আমাকে তো কেউ যাওয়ার কথা বলে নি।’’
মৃদু হেসে মাহমুদা লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল। তারপর বললো, ‘‘এই তো আমি বলছি।’’
শরীফ জিজ্ঞাসা করলো, ‘‘কোথায় যাবো?’’
মাহমুদা বললো, ‘‘কেন, আমার সঙ্গে। আমি তোমাকে যেখানে নিয়ে যাবো সেখানে যাবে।’’
শরীফ জানতে চাইলো, ‘‘কি রকম?’’
মাহমুদা বললো, ‘‘কাল আমি এসেছিলাম তোমার সঙ্গে, আজ তুমি যাবে আমার সঙ্গে আমি যেখানে নিয়ে যাবো সেখানে, ব্যাস।’’
বলেই হাসলো। মুচকী হেসে শরীফ বললো, ‘‘এতো জোর?’’
মাহমুদা বললো, ‘‘হ্যাঁ তাই।’’
বলেই আবার হাসলো। শরীফ দেখলো আর কথা বাড়ানো ঠিক হবে না। বললো, ‘‘আচ্ছা যাবো।’’
মাহমুদা খুব খুশী হলো তর্কে জিতে গিয়ে, জিজ্ঞাসা করলো, ‘‘তাহলে কি কি নিবো?’’
শরীফ হেসে বললো, ‘‘তোমার যা খুশী তাই নাও-যা পরলে তোমার স্বামীকে ভালো দেখাবে।’’
মাহমুদা বললো, ‘‘আমার স্বামীকে লুঙ্গী ও গেঞ্জীতেও অপরূপ দেখায়।’’
বলেই হাসলো মধুরভাবে।

তাগিদ আসছিল তাড়াতাড়ি বের হওয়ার জন্য। প্রস্তুতি সমাপ্ত করে মাহমুদা এগিয়ে এলো। শরীফের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলো। শরীফ জিজ্ঞাসা করলো, ‘‘এটা আবার কি হলো?’’
মাহমুদা প্রশ্ন করলো, ‘‘কোনটা?’’
শরীফ বললো, ‘‘এই যে সালাম করা?’’
মাহমুদা বললো, ‘‘কেন? সালাম করতে হয়।’’
শরীফ বললো, ‘‘কাল তো করো নি।’’
মাহমুদা বললো, ‘‘কাল ভুলবশতঃ করা হয় নি, তাই আজ করলাম।’’
বলেই হেসে ফেললো। দেখে এবং শুনে খুব আনন্দ পেল শরীফ। সকলে রওয়ানা হলো।

হাতীগাড়া পৌঁছার পর অনুষ্ঠানাদি ও খাওয়া-দাওয়া শেষ করতে করতে রাত অনেকই হলো। বাড়ির মধ্যে মাহমুদাকে খুব উল্লসিত ও উৎফুল্ল অবস্থায় ছুটাছুটী, হাসা-হাসি ও দৌড়াদৌড়ি করতে দেখলো শরীফ। বেশ গভীর রাতেই যে ঘরে শোওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল সেই ঘরের দিকে শরীফকে নিয়ে যাওয়া হলো। ঘরে প্রবেশের মুখেই শরীফের মেজ মামী শাশুড়ী ও আরও কয়েকজন মহিলা দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের মধ্যে থেকেই কে একজন বললো, ‘‘বাবাজী, ও কিন্তু একেবারে পাগল। বেয়াদবী বা পাগলামো করলে আপনি কিন্তু রাগ করবেন না। যান, ঘরের দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ুন।’’
তারা চলে গেলেন।

ঘরে ঢুকে শরীফ দেখলো মাহমুদা শুয়ে আছে কাত হয়ে। দরজা বন্ধ করে বিছানায় গিয়ে শরীফ মাহমুদাকে জিজ্ঞাসা করলো, ‘‘আচ্ছা, আমাকে তোমার পছন্দ হয়েছে?’’
মাহমুদা বললো, ‘‘হ্যাঁ, খু-ব।’’
শরীফ জানতে চাইলো, ‘‘কবে? গতকাল বিয়ের দিন, না সেই দেখার দিন থেকেই?’’
মাহমুদা বললো, ‘‘তারও আগে থেকে।’’
আশ্চর্য্য হলো শরীফ। জানতে চাইলো, ‘‘সে কেমন? তার আগে কি তুমি কখনও আমাকে দেখেছো?’’
মাহমুদা বললো, ‘‘দেখেছি।’’
শরীফ জানতে চাইলো, ‘‘কোথায়?’’
মাহমুদা বললো, ‘‘তোমার অফিসে। আগে থেকেই আমার বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছিলো, তিনজন দেখেছিলও। সেই সময়েই বাবা খুবই তোমার গল্প করতো।’’
শরীফ খুব আগ্রহান্বিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, ‘‘কি গল্প করতো?’’
হাসলো মাহমুদা। বললো, ‘‘এই যেমন খুব সুন্দর চেহারা, অল্প বয়স, মাথাভরা চুল, সুন্দর স্বাস্থ্য, নামাজী আর আচার-ব্যবহারও খুব ভালো-এইসব।’’
বলেই মৃদু হাসলো। শরীফও হাসলো।

বেশ ভালোভাবেই সেই রাতটা কেটেছিল।

পরবর্তী সময়ে মাহমুদাদের পরিবারের সবাই শরীফকে অত্যন্ত ভালোবেসে ফেলেছিল এবং তাকে পেয়ে তারা ধন্য হয়েছিল বলেই মনে হয়েছিল শরীফের কাছে।

তিন

মাহমুদা পরে তার দর্শনটা সহপাঠীদের কাছে বলতো। এ দ্বারা সে স্পষ্টতঃ এটাই বুঝাতে চাইতো যে সে যেহেতু একজন ডাক্তার সুতরাং তার স্বামীরও একজন ডাক্তারই হওয়া উচিৎ। অর্থাৎ পোস্ট মাস্টার স্বামীকে তার আর পছন্দ হচ্ছিল না এবং শেষ পর্যন্ত সে তার পূর্বতন পোস্ট মাস্টার স্বামীকে ত্যাগ করেছিল।

বিচ্ছেদের পূর্বে সর্বশেষ যে রাতটি তারা একত্রে কাটিয়েছিল সে রাতে মাহমুদা শরীফকে বলেছিল, ‘‘তোমার সাথে জীবন-যাপন করে আমি মানসিকভাবে তৃপ্তি পাই না এবং তোমাকে নিয়ে গর্ব অনুভব করি না। তাই এই আত্মতৃপ্তিহীন ও বিব্রতকর জীবনের বেড়াজাল থেকে আমি রেহাই পেতে চাই। প্লিজ আমাকে তুমি মুক্তি দাও।’’
শরীফ কোমল স্বরে বলেছিল, ‘‘আমি তোমাকে আমার শ্রেষ্ঠ ভালোবাসাটাই সবসময় দিয়ে এলেও এখন থেকে তোমাকে আরও বেশী ভালোবাসবো। তাছাড়া আমার যে জমিগুলো আছে সেগুলো বিক্রি করে দিয়ে চাকরীর পাশাপাশি ব্যবসা করে আমি আরও উপরে উঠার চেষ্টা করবো।’’
মাহমুদা নির্দয়ভাবে বলেছিল, ‘‘কিন্তু তুমি তো আর নিজেকে পরিবর্তন করে পোস্ট মাস্টার থেকে ডাক্তার হতে পারবে না।’’
মাহমুদার কথা শরীফের মনে চরমভাবে ব্যথা দিলেও নিরূপায় শরীফ নিশ্চুপ থাকা ছাড়া অন্য কোন উপায় খুঁজে পায় নি।
মাহমুদা বলেছিল, ‘‘কবে আমাকে বন্ধনমুক্ত করে দিবে সে ব্যাপারে চিন্তা করে সকালেই জানিও।’’

পরদিন সকালে মাহমুদা শরীফকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘‘তোমাকে রাতে যা বলেছিলাম সে ব্যাপারে কি ঠিক করলে?’’
মুখে বিব্রতকর হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে শরীফ কাচুমাচু স্বরে বলেছিল, ‘‘ওসবের কোন দরকার হবে না। দেখো তুমি, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।’’
ফোঁস করে জ্বলে উঠে মাহমুদা শরীফকে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দিয়ে বলেছিল, ‘‘নির্বোধ অপদার্থ কোথাকার।’’

তালাকের কাগজপত্রে স্বাক্ষর করার দিন বিদায় মুহূর্তে শরীফ তার শাশুড়ীর কাছে কান্নাজড়িত কন্ঠে জানতে চেয়েছিল, ‘‘এই জন্যেই কি আপনারা আমাকে আপন করে নিয়েছিলেন?’’
কিন্তু তিনি কোন কথা না বলে নিরব ছিলেন। শরীফের শ্বশুর তখন জীবিত ছিলেন না।

শিশু সন্তান নুসরাতকে মাহমুদা তার সঙ্গে না রাখতে চাওয়ায় তার চিৎকারে সেদিন সেখানকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। স্বীয় মেয়ের চিৎকার শুনেও মাহমুদার মন গলে নি বলে গাছপালাগুলো ও পশুপক্ষীরাও বোধ করি তা দেখে জানিয়েছিল নিরব ধিক্কার। উপস্থিত স্থানীয় মানুষগুলো চুপ করে থাকলেও এই দুঃখজনক ঘটনা মেনে নিতে তাদের প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছিল।

তখন ছিল ফেব্রুয়ারী মাসের শেষ ভাগ। মেহগনী গাছের পাতাগুলো গাছের সাথে চিরকালের জন্য সম্পর্ক ছিন্ন করে ঝরে পড়ছিল ধুলার উপর, ঝড়-ঝঞ্জা সহ সকল পরিস্থিতিতে গাছের সাথে একত্রিত থাকার করুন স্মৃতিগুলো পিছনে ফেলে।

অবশেষে মাহমুদা তার চেয়ে দুই বছরের সিনিয়র এক ডাক্তারকে বিয়ে করেছিল।

হায় অকৃতজ্ঞ নারী, তোমার কি একবারও মনে হলো না, যে ডাক্তার হয়ে তুমি ‘ডাক্তারের ডাক্তারকেই বিয়ে করা উচিৎ’ বলে মনে করে অডাক্তার স্বামীকে লাথি মেরে একজন ডাক্তার স্বামীকে বিয়ে করলে সেই ডাক্তার কিন্তু তুমি হয়েছিলে সেই অডাক্তার পোস্ট মাষ্টার স্বামীর টাকাতেই! শরীফ তোমাকে ডাক্তার বানালো আর তার ফল ভোগ করলো আর একজন!

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement