লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৮ অক্টোবর ১৯৬৫
গল্প/কবিতা: ৩৭টি

সমন্বিত স্কোর

৫.১২

বিচারক স্কোরঃ ৩.৫২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৬ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবাংলার রূপ (এপ্রিল ২০১৪)

নষ্ট কিট
বাংলার রূপ

সংখ্যা

মোট ভোট ২৪ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.১২

মোঃ মোজাহারুল ইসলাম শাওন

comment ২২  favorite ১  import_contacts ১,৯৪৯
মা ছকিনা সন্ধ্যায় খুব জোরে চিৎকার করে উঠলেন, ‘ আমার হাসিনারে কে এমন করল রে। কে আমার সোনামনিরে মেরে ফেললরে রে, আমি এখন কি করিরে ?’
তার চিৎকারে পাশের বাড়ির দুই জা বেড়িয়ে এসে ছকিনার ঘরে ঢুকল। আজ সাপ্তাহিক হাটবার। পুরুষেরা সবাই হাটে গিয়েছে। সন্ধ্যায় লাগা হাটে যাওয়া পুরুষ গুলো ফিরবে রাতে, কেউ কেউ গভীর রাতে। ছকিনা আর তার দুই ছোট জা মেয়ে হাসিনাকে জিজ্ঞাসা করা শুরু করলেন। হাসিনার বয়স কত ,বড় জোর সাড়ে ৩ থেকে ৪ বৎসর হবে। খুব চঞ্চল এবং বুদ্ধিমতি। সারাদিন দাদার বাড়ির সব ঘরে ঘরে ঘুরে বেড়ায়। সকলকে আনন্দে মাতিয়ে রাখে। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে সকলকে বেতিব্যস্ত করে রাখে। কেউ তার উপর রাগ করেনা, শুধু মা ছকিনা মাঝে মাঝে বিরক্ত বোধ করেন। সারাদিন এবাড়ি ওবাড়ি বেড়ে বেড়ানো এই ছোট্ট মেয়েটিকে নিয়ে তাই মায়ের তেমন কোন চিন্তা মনে কাজ করেনা। শহুরে পরিবেশের মত গ্রামের পরিবেশে এখনো মানুষ এতো নিষ্ঠুর ও কঠোর হয়ে উঠেনি যে।

ছোট্ট হাসিনা কষ্টে যা উচ্চারণ করল তা শুনে ঘরে বসে থাকা ৩ মহিলার মুখে কোন শব্দ বের হলনা। হাসিনা আস্তে আস্তে উচ্চারণ করলঃ ‘আম্মু আজ দুপুরে পাশের বাসার হাফেজ রায়হান চাচ্চু একটি খুব বড় তরমুজ নিয়ে বাসায় আসছিল যে। আমি দেখে বলেছি ইয়া চাচ্চু কি বড় তরমুজ, আমারে এত্তু দিবা। চাচ্চু বলল আয় আমার বাড়িতে। আমি গেলাম। উনি তরমুজ কাটলেন। আমাকে একটুকরো হাতে দিয়ে আমারে কোলে নিলেন। বললেন, আহারে আমাদের হাসিনা কত্ত লক্ষ্মী হয়েছে রে। কত্ত বড় হয়েছে রে। এরপর আমাকে বলল, হাসিনা তোমায় আরও আদর করি? আমি মাথা নেড়ে হা বললাম। উনি আমাকে উপুর করে শুয়ে দিল। এরপর আমার প্যান্ট খুলে ফেলল, কি যেন করল আমার উপরে উঠে। আমি খুব ব্যথা পেয়ে উহ করে উঠলে উনি আমাকে ছেড়ে দিলেন। আমার হাতে আরও এক পিছ তরমুজ আর ২ টাকা দিয়ে তাড়াতাড়ি আমাকে বলল যে আমি যেন এই কথা কাউরে না বলি।’

হাফেজ রায়হান শাজাহানপুর গ্রামের একমাত্র হাফেজ পোলা। বয়স ২৩-২৪ হবে। গ্রামের মসজিদে তারাবির নামাজ পড়ান। সে জন্য গ্রামের মানুষের কাছে তার একটি ভালো ইমেজ। গত বৎসর বিয়ে করেছিলেন, কিন্তু বউ তাকে ছেড়ে ৩ মাসের মাথায় বাপের বাড়ি গিয়েছে। গ্রামের লোকদের হাফেজ রায়হান বলেছে যে হুজুর মানুষ তার পছন্দ নয়। সে এতো বন্দী হয়ে থাকতে পারছে না। হাফেজ সাহেব প্রথমে মেয়ের মনের অস্থিরতা কমানোর জন্য নিজেই বাবার বাড়িতে রেখে এসেছে। কিন্তু ৩ মাস পর সে তালাক নোটিস পেয়েছে বউয়ের কাছ থেকে। লজ্জায় আর তালাকের উত্তর বা বউকে ফিরে আনার চেষ্টা করেনি। দীর্ঘ ৪-৫ মাস একাএকা বাসায় থাকে। ধর্ম কর্ম করে। চুপচাপ একা একা চলাচল করে। তালাকের নোটিশে গিন্নী যে অভিযোগ করেছে সেখানে স্বামী পরিপূর্ণ মনোরঞ্জন দিতে ব্যর্থ ও পায়ু পথে সেক্স করার প্রতি আগ্রহের কথা লেখা হয়েছে। হুজুর এই বিষয়ে কাউকে কিছু না বললেও গ্রাম্য সংস্কৃতিতে গ্রাম্য প্রবাহে গ্রামের সব লোকেই এই বিষয়টি জেনে গেছে।

দুই জা হাসিনার কথা শোনার পর মা ছকিনার দিকে তাকালেন। ছকিনা তখন কাঁদতে কাঁদতে বলে চললঃ ‘আমি এখন কি করব রে তোমরা আমাকে বল। মেয়ে আজ সন্ধ্যা থেকে পেশাব বন্ধ হয়ে কষ্টে কাতরাচ্ছে। আমি ওকে পেশাব করতে নিয়ে গিয়েছি, না পেশাব হচ্ছে না। দেখো তোমরা ওর পেট পোয়াতি মেয়ের মত ফুলে উঠেছে যে। আমি কুপির আলোতে দেখেছি ওখানে কি অক্ত রে (রক্তকে ঐ অঞ্চলের মানুষ অক্ত বলে) ! আমি এখন কি করবরে’ ...বলেই হাউমাউ করে কেঁদে চলল। তিন জায়ের ছোট জা শিক্ষিত, আইএ ফেল, বেশ সাহসী। সে বলে উঠল, ‘বুবু, আপনি ওকে নিয়ে তাড়াতাড়ি উপজেলা হাসপাতালে যান। ওখানে ওকে দ্রুত চিকিৎসা দিয়ে পেশাব করাতে হবে, নইলে মরে যাবে যে !’ মরে যাওয়া কথা শুনেই হাসিনা আরও পাগল হয়ে পড়ল। ২ জায়ের সাহায্যে হাতে উপস্থিত ৩০০ টাকা নিয়ে মেয়েকে কোলে নিয়ে প্রায় দৌড়ে সদর রাস্তায় এলো। সেখান থেকে রিক্সা নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে শেরপুর উপজেলা হাসপাতালের ইমারজেন্সির ডাঃ এর রুমে ঢুকল। দুই চোখে কান্না ভরা, নাক বন্ধ হয়েছে সর্দিতে, শাড়ির আঁচলে নাক ঝেরে সর্দি পরিস্কার করল।

ডাঃ এর জিজ্ঞাসায় সে বলতে শুরু করলঃ
‘ডাঃ সাব, আমার এই বাচ্চা মেয়েকে আজ আমার গ্রামের হাফেজ রায়হান দুপুরে তরমুজ খাওয়ানোর কথা বলে ঘরে নিয়ে উপুর করে পায়খানার রাস্তা দিয়ে খারাপ কাম করেছে। এখন ও আর পেশাব করতে পারছে না। অক্তে ভিজে যাচ্ছে ওর সব !’
ডাঃ সাহেব মেয়েটির মুখের দিকে তাকালেন। পরীক্ষা করার জন্য চেয়ার ছাড়তে ইচ্ছে করল না। তাই সে একটি স্লিপ কাটতে বলে আবার চেয়ারে গা এলিয়ে দিলেন। মহিলাকে এক পিয়ন টাইপ লোক খুব সাহায্য করল। বলল, ‘আপা, ২০ টাকা দেন আমি সিলিপ আনে দিচ্ছ, আপনে দাঁড়ান। ভয় পায়েন না।’ ছকিনা শাড়ির আঁচল থেকে ২০ টাকা বের করে দিয়ে ডাঃ এর রুমেই মেয়েকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।
একটু পর ছেলেটি একটি টিকিট এনে দিল। যদিও টিকিটের দাম মাত্র ৫ টাকা। ইমারজেন্সি স্বাস্থ্য সেবা বলে কথা। হয়ে গেলো ২০ টাকা! ডাঃ সাহেব সিলিপের উপর দ্রুত ঘচ ঘচ করে কিছু লিখে ছকিনার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘দ্রুত মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান, বগুড়া। ওখানে এই রোগীর ভালো চিকিৎসার ব্যবাস্থা আছে। যান যান, রোগীর অবস্থা খুব খারাপ, বুঝলেন !’
ছকিনা কিচ্ছু বুঝে উঠার আগেই স্লিপ এনে দেয়া ছেলেটি বলল, ‘আপা, দেরী করছেন কেন। মেয়ের অবস্থা খারাপ। চলেন আমি আপনাকে বগুড়ার ডাইরেক্ট বাসে তুলে দিচ্ছি। ভয়ের কিছু নাই। আমি বলে দিব, ওরা আপনাকে হাসপাতালের গেটে নামিয়ে দেবে। ওখানে ইমারজেন্সিতে সব সময় ডাঃ থাকেন। কোন অসুবিধা নাই।’
ছকিনা মৃদু স্বরে বলার চেষ্টা করল, ‘আমি মেয়ে মানুষ। ওর বাবা হাটে গেছে, ওর বাবা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা যায় না?’
ডাঃ সাহেবের ইশারায় স্লিপ আনা ছেলেটি প্রায় হাত ধরে ইমারজেন্সি রুম থেকে ওদের বের করে নিয়ে সোজা বাস স্ট্যান্ড নিয়ে এলো। আসার পথে বারবার রুগির জীবন শংকার কথা বলে গেলো।

ছকিনা কিছুই বুঝে উঠার আগেই গাড়ি ছেড়ে দিল। ২৫ মিনিট পর তাকে গাড়ির হেল্পার বগুড়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সদর গেট এ নামিয়ে দিয়ে চলে গেলো। ছকিনার দুই চোখ বেয়ে তখন রাজ্যের বাধভাঙ্গা অশ্রু। তার কান্না দেখে একজন পথচারী জিজ্ঞাসা করল, ‘বোন, কি হয়েছে আপনার? কাঁদছেন কেন?’
ছকিনা বলল, ‘ভাই আমার মেয়ে বিকেল থেকে পেশাব করতে পারছে না, শেরপুর হাসপাতালে গেলাম ওরা আমকে এখানে পাঠিয়েছে। আমি তো কিছুই চিনিনা।’
জীবনে যত অন্ধকার আসুক না কেন সংসারের চলমান নিয়মেই অন্ধকারের পিছেই আলোর সমাধান পাওয়া যায়। আর এই আলো যেন অসহায়দের জন্য বেশী বেশী দেখা যায়। এই আলোকবর্তিকা হিসাবে ছকিনার এই মুহূর্তে যিনি হাজির হলেন তিনিই পথাচারি মিজান। মিজান বগুড়া শহরের একটি আঞ্চলিক পত্রিকার সাংবাদিক। সে ছকিনারে ইমারজেন্সিতে নিতে নিতে জিজ্ঞাসা করল, ‘তা বোন, কি হয়েছিল মেয়েটির। পেশাব বন্ধ হয়ে গেলো কেন?’
ছকিনা আঁচলে মুখ ঢেকে এগুচ্ছিল। গ্রামের মেয়েরা সাধারণত বোরকা পরে রাস্তায় বেরোয়। কিন্তু আজ এতো দ্রুত মেয়ের জন্য বাসা থেকে বের হয়েছিল বলে আর বোরকা পড়া হয়ে উঠেনি, মাথা ঠিক ছিল না যে। তাই শাড়িকে পেঁচিয়ে নিয়েছে শরীরের সাথে। মুখ আঁচল দিয়ে ঢেকে নিয়েছে। আস্তে আস্তে বলল , ‘মেয়েকে উপর করে করা সেই পশুত্বের কথা। রক্তে ভিজে থাকার কথা, পেশাব বন্ধ হয়ে থাকার কথা।’

মিজান চলতি পথেই বগুড়া সদর থানার ওসিকে মোবাইল করল। সাংবাদিকদের কাছে এসব সেভ করাই থাকে। কখনো কাজের জন্য, কখনো নিজের দাম বাড়ানোর জন্য। সদরের ওসি সাহব তাকে এই খবরটি শেরপুর থানায় জানাইয়ে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করার উপদেশ দিল। মিজান ধন্যবাদ দিয়ে ইমারজেন্সি কক্ষে প্রবেশ করল। ডাঃ সাহেব অন্য একটি রুগী দেখছিলেন। মিজান এগিয়ে গেলো ডাঃ সাহেবের কাছে। সে যত টুকু শুনেছিল তাতে একটু জোর দিয়ে রক্তপাত বেশী হচ্ছে এবং পায়ু পথের সেক্স করার কথা জানাল। কিন্তু ভুলে গেলো মেয়েটির পেশাব বন্ধ হয়ে থাকার কথা। ডাঃ সাহেব সাংবাদিক সাহেবের কেস দেখে একটি স্লিপ ফ্রি আনিয়ে নিলেন। এইবার মেয়ের মাকে বললেন, ‘ এখানেই সরাসরি এনেছেন, না অন্য কাউকে দেখিয়েছেন?’ ছকিনা শেরপুর হাসপাতালের কথা বলল। ডাঃ সেখানের কোন কাগজপত্র এনেছেন কিনা জিজ্ঞাসা করতেই ছকিনা আঁচলে বেঁধে রাখা কাগজটি খুলে ইমারজেন্সির চিকিৎসককে দিলেন।
ডাঃ কাগজের মোচড় খুলতে খুলতে বলে উঠল, ‘ একি করেছেন এই কাগজের অ্যাঁ?’ কিছুটা ধমকের সুরেই বললেন কথাটি। ডাঃ এর এই সামান্য ধমকের সুরে ছকিনা আরও মুসরে পড়ল। ডাঃ সাহেব শেরপুর হাসপাতালের কাগজটি পড়লেন। মেয়েকে দেখার কোন প্রয়োজনবোধ করলেন না। ঘচ ঘচ করে মহিলা সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করে দেবার কথা লিখে রুগিকে দ্রুত ২ তালায় নিয়ে যেতে বলে পরের রুগী দেখায় মনোযোগ দিলেন। যাওয়ার আগে ওয়ার্ড বয়কে বল্লেন পুলিস কেসের সিল দিয়ে দিস কিন্তু !

সাংবাদিক মিজানের সাহায্যে যখন ছকিনা মেয়ে হাসিনাকে নিয়ে মহিলা সার্জারি ওয়ার্ডে এলেন তখন রাত ১১ টা বেজে গেছে। একা কোন দিন ছকিনা এতো রাতে বাড়ির বাইরে থাকেনি। ভিতরে ভিতরে একটি ভয় কাজ করছিল তার। ওয়ার্ডে গেলেই একজন তরুণ চিকিৎসক এলো তাদের চিকিৎসা দিতে। সে কাগজ দেখল, ভর্তির কাগজে দেখে দেখে অনেক কিছু লিখল। পরে জিজ্ঞাসা করল, ‘ মেয়ে এখনো পেশাব করেনি? রক্ত কি এখনো পড়ছে?’
ছকিনা বলল, ‘না পেশাব হয়নি। কিন্তু অক্ত জমে গেছে।’
তরুণ ডাঃ বললেন , ‘শুনেন আগে মেয়েকে বাথরুমে নিয়ে যান। সেখানে কল ছেড়ে দিয়ে মেয়েকে কিছুক্ষন বসে রাখুন। মাঝে মাঝে তলপেটে কিছু ঠাণ্ডা পানির ছিটা দিন। দেখুন পেশাব হয় কিনা। যদি না হয় তখন আমরা যন্ত্র দিয়ে পেশাব করিয়া দেব।’ বলেই তরুণ ডাঃ অন্য দিকে চলে গেল । ছকিনা মেয়েকে নিয়ে বাথরুমের দিকে গেলেন। চোখে তার কান্নার ধারা, বন্ধ করতে পারছেন না। কিছুটা মেয়ের চিন্তায় কিছুটা ঐ নরাধমের কারণে। পুরুষ এতো নিষ্ঠুর হতে পারে? মনে মনে ভাবছে আর বিরবির করছে এই বলে যে, দুধছাড়া একটি মেয়েকে কেউ সঙ্গমের অংশিদার করতে পারে! আল্লাহ্‌ তুমি এর বিচার কর।

মিজান এই সময় বারান্দায় দাঁড়িয়ে শেরপুর থানার ওসির সাথে কথা বললেন। ওসি সাহেব সকালেই দারোগাকে পাঠিয়ে দেবেন বলে সব কিছু জেনে নিলেন। এমন সময় হাসিনার বাবা হরিন চঞ্চল পায়ে সেখানে প্রবেশ করেই মিজানকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ভাই ছোট্ট একটি মেয়ে সহ মাকে এখানে দেখেছেন? মেয়েটির নাম হাসিনা !’
মিজান তাকে হাত ধরে থামালেন। বললেন , ‘ ভাই, আমি মিজান। দৈনিক প্রত্যাশার আলো পত্রিকার সাংবাদিক। ভয় নাই সব ব্যবস্থা করে দিয়েছি। চিকিৎসা চলছে। বিচারের জন্য শেরপুরের ওসি সাহেবকে বলে দিয়েছি। কাল সকাল থেকেই সেই কাজ শুরু হবে। ১ ঘণ্টা আগে আমি না দেখলে কি হত জানিনা। এখন ভালো আছে, ওরা বাথরুমে গেছে।’

একটু পর হাসতে হাসতে হাসিনাকে নিয়ে বের হয়ে আসল ছকিনা। তার এই আনন্দিত হওয়ার কারণ মেয়ের পেশাব হয়েছে। মেয়ের পেট ব্যথা কমেছে। বারান্দা দিয়েই বিছানার দিকে যেতেই হাসিনা বাবা চিৎকার করে দৌড়ে যেতে গিয়েই বারান্দায় পরে গেলো। তার কোমরে এখনো অনেক ব্যাথা যে !
বাবা সাদেক এসে তাকে দ্রুত কোলে তুলে নিলেন। মুখে চুমু দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ এখন কেমন আছিস মা। জান আমার। কেমন আছিস এখন !’
ছকিনা বলল, ‘ এই আপনি কখন এলেন। আমি খুব ভয় পাচ্ছিলাম। আমাদের খুব ক্ষিদা পাইছে, আপনি খাইছেন?’
সাদেক বলল, না খাই নাই। আমি খাবার আনছি, চল বিছানায় যাই। আমি বিছানা চিনে খাবার আনছি, তোমরা থাক।’
বারান্দায় এসে সাংবাদিক মিজানকে নিয়ে হাসপাতালের বাইরের এক ইটালি হোটেলে গিয়ে দুই জনের খাবার পার্সেল দিতে বলে নিজেরা টেবিলে বসলেন। মিজানের বারংবার অনুরোধকে অগ্রাহ্য করেই দুইজনে হোটেলে রাতের খাবার খেলেন। বাইরে এসে মিজানকে একটি পান ও একটি গোল্ডলিফ সিগারেট কিনে দিলেন। নিজের জন্য ১ টি পান, ছকিনার জন্য একটি পান, মেয়ের জন্য ৩ টি চকোলেট আর নিজের জন্য একটি স্টার সিগারেট এর প্যাকেট কিনে হাসপাতালে ফেরত এলেন। মিজান বিদায় নিয়ে অন্যদিকে চলে গেলো।
সাদেক সিগারেট টানা দ্রুত শেষ করে মেয়ের বিছানার দিকে এগুলো। যাওয়ার আগে মিষ্টি পান খেয়ে নিল। তার আদরের এই মেয়ে আবার সিগারেটের গন্ধ সহ্য করতে পারেনা। বিছানায় যেয়ে ওদের হাতে খাবার দিল। মেয়ে এবং মা গো গ্রাসে সেই খাবার খেয়ে নিল। মেয়ের দিকে তাকিয়ে সাদেকের চোখে পানি এসে গেলো। কি নিষ্পাপ তার এই এত্তটুকু মেয়েটি। সেই কিনা এই অবস্থার স্বীকার হল? কি বলবে এই কুত্তার বাচ্চাকে ! এরা যে এই বাংলার নষ্ট কিট।

সারারাত সাদেক বারান্দায় পা চারি করে পাড় করল। মহিলা ওয়ার্ড বলে ভিতরে ঢুকতে পারল না। সকাল হয়ে আস্তে আস্তে দিনের আলো উজ্জ্বল হতে থাকল। সাদেক একটু সিগারেট খাওয়ার জন্য হাসপাতাল থেকে বেড় হতে ধরল। এমন সময় একজন দারোগা এসে পড়ল । উনার মেয়ের সিটে গিয়েই বলল, ‘এইটি কি হাসিনার বেড?’ সাদেক একটু ভীতু প্রকৃতির মানুষ। সে কিছু বলে উঠার আগেই ছকিনা বলল, ‘হা।’ ‘ও আচ্ছা’ বলে দারোগা হাসপাতালের সিস্টারদের রুমের দিকে গেল। সিস্টার তাকে হাসিনার সব ফাইল চিকিৎসা ফাইল দিয়ে দিল ঐ দারোগার হাতে। দারোগা, সাদেক ও তার গিন্নী ছকিনাকে সাথে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে এলেন। পাশের লাগোয়া মেডিক্যাল কলেজের ৪ তালায় ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে এসে কেরানীর কাছে সব কিছু জমা দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। কেরানি অফিসের নিয়ম অনুসারে সব কিছু লিপিবদ্ধ করে ডাঃ সাহেদের কাছে সব কিছু দিল।


বেলা প্রায় ৯ টা বাজে।
এস আই রহমত এলেন ছোট্ট একটি মেয়েকে নিয়ে সাথে ডাঃ সাহেদের কক্ষে। ডাঃ সাহেদ আবেদন এর সাথে মেয়ের ছবি গুলো দেখলেন। এরপর হাসপাতালের ভর্তির সব কাগজ পত্র দেখলেন। সেখানে ইতিহাস লেখার ঘরে লেখা শুধু পায়ু পথে সেক্স করার ইতিহাস এবং রক্তপাত। আর লিছুই লেখা নাই। প্রভিশনাল ডায়াগনসিস এর ঘরে লেখা ‘এনাল কয়টাস’। এস আই রহমত সাহেবকে হাসপাতালের কাগজ গুলো ফটোকপি সরবরাহের অনুরোধ করে মহিলা আয়াকে ডেকে হাসিনার মাকে কাছে ডেকে নিয়ে ঘটনার বিবরন শুনলেন। ছকিনা বললেন, ‘ স্যার, আমার এই অবুঝ মেয়ের যারা সর্বনাশ করেছে তাদের বিচার আপনার হাতে, আপনে যা সঠিক, সেই রিপোর্ট দেবেন।’ বলেই কাঁদতে শুরু করল।
ডাঃ সাহেদ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘পায়খানার রাস্তায় কাম করেছে এইটা কে বলেছে?’
ছকিনা দৃঢ়তার সাথে দ্রুত উত্তর দিল, ‘স্যার মেয়ে আমাকে সব বলেছে। পাষণ্ডটা আমার মেয়েকে উপর করে কাপড় খুলে কাম করেছে যে !’
মেডিক্যাল শিক্ষায় উচ্চতর ডিগ্রি নেয়া ডাঃ সাহেদ কিছুই বলল না। শুধু মনে মনে ভাবল হায়রে মূর্খ মহিলা সেক্স কতভাবে করা সম্ভব সে কিছুই জানেনা। এদের কাছে উপর করলে পায়ু পথে সেক্স করা বুঝায়, আর চিত হলে যোনি পথে। এরা তো এই ভিন্ন কিছুই চিন্তা করতে পারেনা।
আয়াকে সাথে করে ডাঃ সাহেদ হাসিনাকে পরীক্ষা করল। যোনি পথের নীচের অংশ ফেটে সেখানে এখনো যমাট বেঁধে আছে রক্ত। কিন্তু পায়ুপথ স্বাভাবিক। এমন সময় এস আই সাহেব ফটো কপি দিয়ে গেলেন। সবাইকে বের হয়ে গেলে ডাঃ সাহেদ আবারো হাসপাতাল, ইমারজেন্সির ফর্ম ও শেরপুর হাসপাতালের ফর্ম পড়লেন। এক শব্দ, এক লেখা কোন পরিবর্তন নাই। ডাঃদের এই অবহেলায় ডাঃ হিসাবে ওর মন তিক্ত হয়ে গেলো। একা একা একটি সিগারেট ধরিয়ে ভাবতে লাগল এমন একটি সিরিয়াস রোগীকে তারা কেউ পরীক্ষা করে দেখার প্রয়োজনবোধ করল না। শুধুমাত্র পেশাগত সাহায্য করার উদ্দেশ্যে সিগারেট শেষ করে মহিলা সার্জারি বিভাগের সহকারী রেজিস্টার ডাঃ মোঃ আলীকে ফোন করল।

ডাঃ মোঃ আলি ডাঃ সাহেদের চেয়ে ৬-৭ বৎসরের সিনিওর। সম্প্রতি সার্জারির এক শাখায় এমডি কোর্সের শেষ ভাগে আছেন। কিছুদিনের মধ্যেই বিশেষজ্ঞ সার্জন হবেন। লাখ লাখ টাকা কামাইবেন। সেই স্বপ্নে বিভোর ডাঃ মোঃ আলি একটু অহংকারী ভাবেই আজকাল চলেন। ফরেনসিকের ডাঃ এর ফোন পেয়েই বলে উঠলেন, ‘হুম জানি, এই কেস কাল রাতে ভর্তি হয়েছে। এক সাংবাদিক সাথে ছিল। আমি দেখেছি, পায়ু পথে খুব রক্ত পড়ছিল।’ মুখস্ত বলার মত করে বলে এক সময় থামলেন।
ডাঃ সাহেদ বলল, ‘ মোঃ আলি ভাই, আপনি নিজে কি রোগীকে একবার দেখেছেন? ওর গোপন অঙ্গ কি পরীক্ষা করেছেন?’
ডাঃ মোঃ আলি এই কথায় রেগে গেলেন। রেগে গেলে উনি কিছুটা তোতলান। উনি বলে উঠলেন, ‘ সা সা সাহেদ, তু তু তুমি কি আমার সাথে ই ই ইয়ার্কি মারছ না না নাকি! আ আআমি ক্ক ক্ক কি পরীক্ষা না করেই বলছি নাকি? আমি নিজে দেখেছি।’
ডাঃ সাহেদ বললেন, ‘না, ভাই মেয়েটার এনাস তো স্বাভাবিক। ওর সমস্যাতো ভেজাইনাতে। আপনার কাগজে তো জেনিটাল অরগান পরীক্ষা করার কোন কিছুই লেখা নাই। আপনি আসলেই কি দেখেছেন মেয়েটাকে?’
এইবার ডাঃ মোঃ আলি যারপর নাই রেগে গেলেন। উনার তোতলামো বেড়ে গেলো। রেগে বলতে শুরু করলেন, ‘ সা...সা...সাহেদ তুই কি বলতে চাস ! আ আ আমি খবর রাখিনা। আ... আ...আমি এ...এ... এম্নে এম্নে এমডি করছি না...না...নাকি! তোর যা ইচ্ছা রিপোর্ট দে, ...আ আমার কিচ্ছু দ্যাখার দরক্কার নাইক্ক্যা।’
ডাঃ সাহেদ নিজেকে বেশ অসহায় বোধ করল। একজন সিনিওর চিকিৎসক যদি একটি সিরিয়াস রোগীকে নিয়েও মিথ্যা বলে তো সে কি করতে পারে। বরং ফরেনসিকের ডাঃ বলে তাকে তাচ্ছিল্যভাব প্রকাশ করল। ডাঃ সাহেদ কাগজপত্র সব গুছিয়ে ভিকটিম মেয়ের এক্সরে ও ভেজাইনাল সোয়াব পরীক্ষার রিপোর্টের অপেক্ষায় থাকার জন্য বিষয়টি হজম করলেন। পরের সপ্তাহে পরীক্ষাগুলোর রিপোর্ট এলো। যথারীতি ভেজাইনাল সোয়াবের রিপোর্ট এ লেখা কোন বীর্য পাওয়া যায় নাই এবং এক্সরেতে মেয়ের বয়স ৪ বৎসর।
ডাঃ সাহেদ চূড়ান্ত রিপোর্ট লিখলঃ
‘সকল দিক পরীক্ষায় মেয়েটির যৌনাঙ্গে সম্প্রতি জোরপূর্বক সেক্স করার চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে যা ভেজাইনাল রুটে সম্পন্ন করেছে এবং ভিকটিম হাসিনার বয়স ৪ বৎসর।’
নীচে বিঃ দ্রঃ দিয়ে লিখে দিলঃ
‘এই রোগী হাসপাতালের মহিলা সার্জারি বিভাগে ভর্তি ছিল বিধায় প্রাথমিক ক্ষতের কোন কিছু জানার প্রয়োজন হলে সেখান থেকে মতামত সংগ্রহ করা যেতে পারে।’
রিপোর্ট ওইদিন বিভাগ হতে অবমুক্ত করা হল। রিপোর্টের এক কপি যায় পুলিশ সুপারের কাছে অন্যটি যায় সংশ্লিষ্ট থানায়।

একমাস পর।
ডাঃ সাহেদ তার রুমে একা একা অলস সময় কাটাচ্ছিল। এই সময় সে খুব সিগারেট টানত। আজ কোন ক্লাস নাই। শিক্ষার্থীরা অটোভ্যাকেশনে বাড়ি গেছে। আগামী সপ্তাহের আগে ক্লাস হবে না।
‘ভিতরে আসতে পারি?’চেনা কণ্ঠের আওয়াজ পেলেও মনে করতে পারল না কে?
বলল, ‘আসুন।’
ঘরে ঢুকল ডাঃ মোঃ আলি ও ইমারজেন্সি চিকিৎসক। ডাঃ সাহেদ দুইজনকে বসতে চেয়ার দেখিয়ে দিল। এরপর সিগারেট ফেলে দিয়ে কেরানিকে চা দিতে বলল। ডাঃ মোঃ আলি বলতে শুরু করল, ‘ ছোট ভাই, তোমার একটু সাহায্য লাগবে। ঐ যে মাস খানিক আগে তুমি একটি ভিকটিমের রিপোর্ট দিয়েছিলে। আমার ওখানে ভর্তি ছিল ওইটার ব্যাপারে আমাদের একটু সাহায্য করতে হবে যে।’
ডাঃ সাহেদ না বোঝার ভাবে বলল, ‘কোন মেয়েটা যেন?’
ইমারজেন্সি চিকিৎসক সাহেদের চেয়ে ৩ বৎসরের ছোট। সে এইবার বলল, ‘ভাই আপনি রিপোর্ট দিয়েছেন। কিন্তু এসপি সাহেব জানতে চেয়েছে আসলে এই মেয়েটির কোন পথে সেক্স করা হয়েছে, সেই বিষয়টি।’
ডাঃ সাহেদ তেমন কোন পাত্তা না দিয়ে নির্মোহ থেকে বলল, ‘চেয়েছে তা আপনারা যা দেখেছেন, উত্তর দেন। রেকর্ড রুমে কাগজ পত্র আছে না?’
এইবার ডাঃ মোঃ আলি খুব আকুতির স্বরে বলে উঠলেন, ‘ ভাই সাহেদ, আমরা নিরুপায় হয়েই তোমার কাছে এসেছি। আমাদের রেকর্ড রুমের কাগজে কিছুই লেখা নাই। কি বলব ! আজকালের ইন্টার্নি ডাঃরা কেউ কাজ করতে চায় না যে।’
ডাঃ সাহেদের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। মানুষের এই দ্বিত্য চরিত্রকে সাহেদ এক কথায় ঘৃণা করে। একবার মনে মনে ভাবল, অপমান করেই তুলে দেয়। আবার নিজেকে সামলে বলে উঠল, ‘ তা আপনাকে তো আমি ফোন করেছিলাম। আপনি নিজে রোগী দেখেছেন এবং সব পরীক্ষা করে দেখেছেন বলে আমাকে বলেছেন। আজ অন্যদের কথা বলছেন কেন? আপনারা যা খুশী তদন্তের রিপোর্ট দিন। আমার যা বলার বলেছি।’ বলে কিছুটা রাগ দেখিয়েই দুই জনকে রুম থেকে বের করে দিলেন।

দুই সপ্তাহ পর।
বি এম এ নেতারা এলো ডাঃ সাদেকের রুমে। আলোচনার এক পর্যায়ে সভাপতি বললেন, ‘তুমি ওদের সাহায্য কর। ওরা যতেসঠ শিক্ষা পেয়েছে।’
নেতাদের বললাম, ‘আমি কি করতে পারি?’
সভাপতি বললেন, ‘তোমার কাছে যে কাগজ আছে ওদের ফটোকপি দিয়ে দাও। ওরা বাকি কাজ করে নেবে। প্রয়োজনে রেকর্ড রুমের কাগজ সব বদলে দেবে।’
ডাঃ সাহেদ ভিতরে ভিতরে বিরক্ত হলেও মুখে প্রকাশ না করে হেসে বলল, ‘ কিন্তু রেকর্ড রুমের কাগজ তো পুলিশ ফটো কপি করে আমাকে দিয়েছে। যদি সে এক কপি রেখে দেয়? আগে ঐ পুলিশের কাছ থেকে কোন ফটো কপি রাখা হয় নাই, এই মর্মে প্রত্যায়ন আনতে বলুন, পরে আমি সাহায্য করব।’
সভাপতি বললেন, ‘কথাটি মূল্যবান। আগে ঐ কাগজ আনো, সাহেদ তো বলেছেই সাহায্য করবে। তাহলে আজ সকলে উঠা যাক।’ সকলে চলে গেলো। কেরানি না গিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে রইল। সে সাহেদকে অভিনন্দন জানাতে চায়। সাহেদ বুঝতে পেরে মুচকি হেসে বলল, ‘এই আমারে এক কাপ চা দেবে !’

অনেক টাকা খরচ করে এসপি রহমতের কাছ থেকে একটি প্রত্যায়ন আনল। এরপর সাহেদ তার রিপোর্টের ফটো কপি ডাঃ মোঃ আলি ও ইমারজেন্সি চিকিৎসককে পড়তে দিল। ওরা গোপন অঙ্গের পরীক্ষার অংশ টুকু টুকে নিয়ে চলে গেলো, যা রেকর্ড রুমের কাগজে লিখে দেবে। এস পি সাহেবের জানার দরকার পড়েছিল এই জন্য যে, যদি ভ্যাজাইনাল রুটে সেক্স করা হয়ে থাকে তবে শাস্তির পরিমাণ বেশী হবে, কিন্তু যদি এনাল সেক্স হয়ে থাকে তবে শাস্তি মাত্র ২ বৎসর (তখন তাই ছিল) হবে। ফলে আসল রুট জানা খুব জরুরী ছিল।

১২ বৎসর পর।
ইতিমধ্যে ডাঃ সাহেদ এখন অন্য মেডিকেলে বদলি হয়েছে।
ডাঃ সাহেদ স্বাক্ষী দিতে বগুড়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছে। সে জানেও না কিসের মামলা। সমন পেয়ে রাতেই বগুড়া পৌঁছে এক হোটেলে উঠেছে। সকালে সাড়ে ৮ টার দিকে গোছল শেষ করে নাস্তার জন্য ওয়েটারের জন্য অপেক্ষা করছে। ওর ফোন বেজে উঠল। অন্য প্রান্ত থেকে আকুল আবেদনে এক বৃদ্ধা বলতে লাগলো, ‘ বাবা তুমি রক্ষা কর। আজ ১২ বৎসর হয়ে গেছে, আমার একমাত্র হাফেজ পোলা জেলে। ওর অনেক শাস্তি হয়েছে। তুমি যদি একটু স্বাভাবিক করে স্বাক্ষী দাও, তো আমার ছেলেটি বেঁচে যায়।’ বলেই কাঁদতে লাগলো যার শব্দ সাহেদ স্পষ্ট করেই শুনতে পারছিল।
সাহেদ কোন উত্তর দিলো না। কোর্টে গেলো। হাজিরা দিতেই সরকারী উকিল বললেন, ‘ ডাঃ সাহেব এখন কোথায় আছেন?’
সাহেদ হেসে জানিয়ে দিল সে কোথায় আছে। সরকারী উকিল আস্তে করে কানের কাছে মুখ এনে বলল, ‘ডাঃ সাহেব আপোষ হয়েছে এতো দিনে। বুঝলেন না, মেয়ের এখন বিয়ের বয়স। আপোষ না করে উপায় আছে?’
ডাঃ সাহেদ মনে মনে বলছিল এতো স্পষ্ট রিপোর্ট দেবার পরেও এই কেস যদি আপোষ হয় তো আর রিপোর্ট দিয়ে কি হবে। মুখে বলল, ‘ বলেন কি এই কেস আপোষ হল কেন?’
সরকারী উকিল বলল, ‘ আরে মেয়ের বাপে খুব শক্ত, এতো দিন মানতেই চায়নি। ওর জন্যেই ১২ বৎসর লাগল'।
মন খারাপ করে ডাঃ সাহেদ উঠে পড়ল। স্বাক্ষ্য দিতে আরও ২ ঘণ্টা সময় পাবে। মন খারাপ করে শহরের মাঝে এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে গেলো। সাড়ে ১১ টায় কোর্টে ফেরত এলো। ওর যখন স্বাক্ষ্য দেবার ডাক পড়ল তখন ১২ টা বেজে ২৫ মিনিট। আসামী পক্ষের উকিল কাছে এসে বলল, ‘ডাঃ ভাই সালাম। কেস তো আপোষ হয়ে গেছে।’ মুখে বিজয়ির হাসি। ডাঃ সাদেক কাঠগড়ার দিকে তাকাল। দাড়িওয়ালা এক যুবক বয়স ৩৫ এর উপর হবে দুই হাত জোর করে দাঁড়িয়ে আছে নিঃসঙ্কোচে। ঘাড় উলটো দিকে ঘুরিয়ে দেখল একটি কিশোরী উজ্জ্বল শ্যমলা চেহারার মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাশে আধাপাকা মাথায় চুল নিয়ে এক মহিলাও দাঁড়িয়ে।
কোর্টের সকারি উকিল বললেন, ‘ডাঃ সাহেব শপথ পড়ুন।‘
ডাঃ সাহেদ বেশ জোরে পরে গেলো মুদ্রিত শপথের বানী ‘ এই মামলায় যাহা বলিব সত্য বলিব। সত্য বই কোন মিথ্যা বলিব না বা কোন সত্য গোপন করিব না’।
বিচারক বলিলেন, ‘ডাঃ সাহেব এই রিপোর্টে যে স্বাক্ষর দেয়া আছে তা কি আপনার?’
ডাঃ সাহেদ হা সুচক উত্তর দিল। বিচারক বলিলেন, ‘আপনি যে মতামত দিয়েছে তা একটু পরে শুনান তো।’
সাহেদ তার দেয় মতামত স্পষ্ট উচ্চারণে বলে গেলো, বিচারক হুবুহু লিখে নিলেন। এরপর বিচারক বললেন, ‘আপনেরা জেরা করুন!’
দুই পক্ষের উকিল প্রায় একসাথে বলে উঠলেন, ‘স্যার এই মামলা আপোষ হয়ে গিয়েছে। এই হল আপোষ নামা। আমাদের কোন জিজ্ঞাসা নাই।’
বিচারক এদিক ওদিক কি যেন দেখলেন। এরপর ডাঃ সাহেদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তাহলে নেমে যান ডাঃ সাহেব।’

৫ মিনিট পর কোর্টের উপস্থিতির সনদ নিয়ে জনগণকে ঠেলে বারান্দায় বেড়িয়ে এলো ডাঃ সাহেদ। কেমন একটা বিতৃষ্ণা ও ক্লান্তি বিষাদে মন ভরে গেছে। ৩ তালা থেকে নেমে ২ তালায় এসেছে এমন সময় পিছন থেকে এক মহিলার ডাক শুনেদা সাহেদকে দাঁড়াতেই হল। মহিলা একেবারে সামনে এলে সাহেদ দেখল সেই আধাপাকা চুলের মহিলা যে কোর্টের ভিতরে ছিল। সাথে সেই কিশোরী মেয়েটি। নির্বাক কিন্তু মুখে একটি ঘৃণার ছোঁয়ায় মেয়েটিকে কেমন সান্ধ্যকালিন সূর্যের আলোর মত নির্মোহ লাগছিল। মহিলা বলে উঠল, ‘স্যার এই আমার হাসিনা। আপনি ওর পরীক্ষা করে মত দিয়েছিলেন। আপনার মতের জন্য ঐ পাষণ্ড এতো দিন জেলে ছিল। ওর বাবা ওকে বেরুতেও দেয়নি। কিন্তু আর পারল না। ওরা বারবার সময় নিতে নিতে ১২ বৎসর পাড় করল। হাসিনা এখন বড় হয়েছে। আর কোর্টে আসতে চায়না। লোকজন ভয় দেখায় ওর বিয়ে হবেনা। এই মামলা মামলা করতে করতে আমরা আর কোন সন্তানও নিতে পারলাম না। এখন এই মেয়ের যদি বিয়ে না হয়... তাই ওর বাবা অগত্যে আপোষ করেছে। ওরা টাকা দিতে চেয়েছিল, ওর বাবা নেয় নি। আপনি খুব ভালো মানুষ। আজ স্বাক্ষ্য দিয়ে গেলেন। আল্লাহ্‌ আপনার মঙ্গল করবে।’

ডাঃ সাহেদ আবারো মেয়েটির দিকে তাকাল। ওর দেহের কোথাও কি কলংক লেগে আছে? না কেন থাকবে? কলংক লাগলে যারা ওর বিচার পেতে বাঁধা হয়েছে তাদের লাগবে। মেয়েটিকে কাছে ডেকে নিল। মাথায় হাত বুলায়ে দিল। ওর নিজের মেয়ের কথা মনে পড়ল। ওর মেয়ে হয়ত এই মেয়ের চেয়ে একটু বড় হবে। গোটা দেশে নষ্ট কিটে ভরে গেছে। মানুষ নাই, অমানুষেরা আজ কিলবিল করছে। ডাঃ সাহেদ আবারো নীচে নামতে শুরু করল। মেয়ের মা ছকিনা দৌড়ে এসে হাতে থাকা টিফিন ক্যারিয়ার থেকে বের করে ওর হাতে একটি পাটি শাপটা পিঠা দিয়ে বলল, ‘ভাই আপনি আমার ভাই। আমরা খাওয়ার জন্য এনেছিলাম, একটা যদি খেতেন !’

অজানা কারণে গা ঘিন ঘিন করতে থাকা ডাঃ সাহেদ মানুষের নির্মল ভালোবাসাকে উপেক্ষা করতে পারল না। হাত পেতে পিঠাটি নিয়ে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে থাকল যেন , এই আদালতের নোংরা অপবিত্র স্থান তাকে এক শ্বাসে পাড় হয়েই দম নিতে হবে মুক্ত বাতাসে !

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement