লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৮ অক্টোবর ১৯৬৫
গল্প/কবিতা: ৩৭টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftমা (জুন ২০১৪)

বিজ্ঞাপন বন্ধ করুন

কৌশিকের মা!
মা

সংখ্যা

মোঃ মোজাহারুল ইসলাম শাওন

comment ১  favorite ০  import_contacts ২৮৫
ক্লাস নাইনে পড়া কৌশিক স্কুল থেকে বাসায় এসে প্রতিদিনের মত নিজের ঘরে ঢুকে। এই সময় তাদের বাসায় কারো থাকার কথা নয়। কারণ তাদের বাড়িরই সবারই চাকুরি বা স্কুলে যাওয়ায় এই সময় বাড়ি বন্ধ থাকে। ঘরে ঘরে তালা দেওয়া থাকে। আজ কৌশিকের স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সাহেব নিজ বাড়িতে ছুরিকাহত হয়েছেন বলে মাত্র ২ ঘণ্টা ক্লাস হয়েছে ! আগে ছুটি হওয়ায় কৌশিকের মন খুব ভালো। বর্ষাকাল খুব গরম হলেও বাড়ির সামনে মসজিদের পুকুরে খুব করে গোছল করবে। এই চিন্তা মাথায় নিয়েই সে বাড়িতে ফিরেছে। যথারীতি নিজ ঘরে ঢুকে স্কুলের কাপড় চোপড় খুলে লুঙ্গি পরেছে। এমন সময় পাশের ঘরে ঠুকঠুক শব্দ শুনে আস্তে করে সে মাঝের ঘরে উঁকি দিয়েছে। তার ধারণা হয় কোন চোর ঢুকেছে, নয় তো তার আগেই অন্য কোন ভাইবোনের কেউ স্কুল ফাঁকি দিয়ে বাড়ি এসেছে !

মাঝের ঘরের দরোজা বন্ধ ভিতর থেকে। সে আস্তে করে চাপ দিয়ে নিশ্চিত হয়েছে এবং দরজায় কান দিয়ে আবারো ঠুকঠুক শব্দ নিশ্চিত হওয়ায় , ‘এই ঘরে কে? কে?’ বলে একটু জোরে ধাক্কা দিয়েছে ! তার ধাক্কার জোরে গ্রামের বাড়ির কাঠের দেয় খিল খুলে গিয়েছে। ঘরের ভিতর সে যা দেখেছে তা অবর্ণনীয় ! কৌশিক কোন শব্ধ উচ্চারণ না করেই বাড়ি থেকে এক দৌড়ে বাহির হয়ে... কেন যেন মনের জ্বালা মিটাতে পুকুরে গিয়ে ঝাপ দিয়েছে। কৌশিকের কিশোর মনে একটি ঘৃণাবোধ সে সময় কাজ করেছে ! সে কেন মাঝের ঘরে উকিই দিতে গেলো, কেন? না দিলেই তো সে এতো কষ্ট পেতো না।

১ মাস পর ।
কৌশিকের প্রচণ্ড মাথা ব্যথা শুরু হওয়ায় স্কুল থকে ৩য় ঘণ্টায় ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছে। ওর ছিল সাইনুসাইটিজ রোগ। মাথা ব্যথা শুরু হলে কিছুই ভালো লাগতো না। বাড়ি এসে নিজের রুমে ঢুকতে গিয়ে হটাত তার মাঝের ঘরের দিকে নজর যায়। আজকাল সে মাঝের ঘরে ঢুকতে চায়না। মনের কোন থেকে এক অভিশপ্ত ঘৃণা তার মনে ভর করে। কিন্তু মানব মন বড়ই জটিল, রহস্যময়। পৃথিবীর সকল রহস্য, গোপনীয়তা প্রকাশ করার জন্য যেন কোন কোন মানুষকে তৈরি করা হয়েছে ! কৌশিক সেই দলের নেতা গোছের কেউ একজন ! রুমের ভিতর নজর পরতেই সে স্পষ্ট দেখল মাত্র একটি গামছা গাঁয়ে তার মা রুম ঝারু দিচ্ছে। কিন্তু এই সময় কৌশিকের মায়ের বাড়িতে নয় স্কুলে থাকার কথা। সে ভালো করে তাকাতে পারেনা। নিজের রুমে ঢুকে মাথা ব্যাথার জন্য বালিস চাপা দিয়ে বিছানায় শরীর বাকিয়ে শুয়ে থাকে। এরই এক ফাঁকে বাড়ি থেকে এক অচেনা লোককে বেড় হতে দেখা যায়। কৌশিকের মাথায় রক্ত উঠে যায়। সে সোজা উঠে রক্ত চক্ষু নিয়ে মায়ের কাছে যায়...।
গ্রামের ছেলে হলেও তার ভিতরে একটি প্রতিবাদী সত্ত্বা কাজ করত। এই সত্ত্বা ছিল ঘুমন্ত কিন্তু আদর্শবাদী। সে মাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘কে সেই লোক?’
মা ছেলের এই প্রতিবাদে কিছুটা ভরকে যায় ! আমতা আমতা করে কোন তাদের এক কাছের আত্মীয় বলে পরিচয় করিয়ে দেয়। কৌশিকের মাথায় সেই আত্মীয় পরিচয় ঢুকে না। সে সরাসরি প্রশ্ন করে, ‘সেই আত্মীয় ঘরে থাকতে সে কেন শুধু গামছা পরে ছিল?’ এই সত্য কঠিন প্রশ্নের উত্তর কৌশিকের মা দিতে ব্যর্থ হয় ! কৌশিকের কিশোর বয়সের তারুন্য মাথা গরম করে ফেলে। নিজের মাকে সে অশুচি ভাবতে গিয়ে কি করবে বুঝতে পারেনা। সে হটাত মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে উঠে, ‘তুমি এতো নোংরা, ছি? তোমাকে মা ভাবতে আমার কষ্ট হচ্ছে !’ মা আমতা আমতা করে বলে উঠে, ‘আমার ভুল হয়েছে। আর এমন হবে না!’ কৌশিকের কিশোর মন এই ভুল স্বীকার কে গভীর করতেই দৌড়ে পাশের ঘর থেকে কোরআন শরিফ এনে খুলে পাতা বেড় করে মায়ের হাতে দিয়ে বলে, ‘তুমি এই কোরআন শরিফের পাতায় হাত দিয়ে বলো, আর কোন দিন এমন কাজ করবে না, বলো !’ কৌশিকের মা প্রচণ্ড ভাবে কাঁপতে থাকে। একদিকে ছেলের সামনে ভুল স্বীকার করা অন্যদিকে যৌবনের জ্বালা মিটানোর গোপন সুখ ! তবুও সন্তানের কাছ থেকে আপাতত মুক্তি পেতে কম্পিত হাতে কোরআন স্পর্শ করে বলে, ‘আর কোন দিন এমন ভুল করব না ! তুমি কাউকে এসব বলো না।’

কৌশিকের মায়ের চোখে জলের ধারা দেখা যায়। কৌশিক আর মায়ের সামনে দাঁড়াতে পারে না। এক দৌড়ে বাড়ির বাহির হয়ে যায়। সমস্ত কাপড় চোপড় সহ পুকুরে ঝাপ দেয়। ডুব দিয়ে থাকে যেন আর উঠতে না হয়। কিন্তু এক সময় সে প্রাকৃতিক কারণেই ভেসে উঠে পানির উপর। ক্ষোভে দুঃখে নিজের জীবনকে শেষ করতে পারে না। সেই দিনের পর থেকে কৌশিক কেমন মন মরা হয়ে যায়। পৃথিবীর প্রতি তার কোন মোহ জম্মায় না। তার মনের ভিতর এক অশুচিতার জম্ম নেয়। সেই অশুচিতাই আবার মনের ভিতর তীব্র শক্ত করে সুচিতা জম্ম দেয়। কৌশিককে চরিত্রবান হতে হবে, যে কোন মুল্যে ! জীবনের প্রতিটি স্তরে এই নাবোধক কাজ গুলোই হাবোধক কাজ করতে উৎসাহিত করে...। কৌশিক খুব নীতিবান মানুষ হিসাবে নিজেকে নিজের চেষ্টায় গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয় !
কৌশিকের লেখা পড়ায় পদে পদে বিড়ম্বনা সৃষ্টি হতে থাকে। কোন এক অজ্ঞাত কারণে কৌশিকের ভালো ফলাফলের পরেও বাড়িতে কোন খুশির জোয়ার বহে না। এর মধ্যেও কৌশিক খুব ভালো ফল করে এসএসসি পাশ করে। কিন্তু যথারীতি তার বাড়িতে কোন আনন্দ প্রকাশিত হয় না। কৌশিক কলেজে ভর্তি হয়। একমাস পর ১০০ টাকা চুরির দায়ে কৌশিককে বাড়ি থেকে বেড় করে দেওয়া হয় । কৌশিকের বাবা তাকে নির্দয়ভাবে পিটিয়ে বাড়ি ছাড়া করলেও, কৌশিকের বুঝতে কষ্ট হয়না কি তার দোষ ! কারণ কৌশিক তো টাকা চুরি করেনি, যদিও কৌশিকের বইয়ের ভিতরে ১০০ টাকা পাওয়া যায়। কৌশিক মার খাওয়ার এক সময় জানতে পারে এই ১০০ টাকা সকালে বাড়ি থেকে হারিয়েছিল। কেউ কৌশিকের কথা শুনে না। এক অনিশ্চিত জীবনের পথে কৌশিক শূন্য হাতে বই গুলো কুড়িয়ে নিয়ে বাড়ি থেকে মানুষ হতে বেড়িয়ে পরে। পিছনে পরে থাকে তার জীবনদাত্রি মায়ের প্রতিশোধ স্প্রিহা ! মায়েদের কাছে বাবারা সবসময় দুর্বল থাকে, থাকতে হয়। নইলে সংসার টিকে না। সংসার টিকানোর জন্য সমাজে বাবাদের সব মেনে নিতে হয়। কারণ তার প্রত্যক্ষ চেষ্টায় যে সন্তান পৃথিবীতে আসে ! সন্তান জম্মদানের প্রক্রিয়ায় নারী সব সময় পরোক্ষ উপলক্ষ্য হয়েই থাকে যে !

কৌশিক নিজ চেষ্টায় আজ মানুষ হয়েছে। দুনিয়ায় প্রতিটি মায়ের প্রতি কৌশিক সম্মান দেখায়। কারণ ওর মনের কোনে জমে থাকা মায়ের প্রতি ক্ষোভ জমে আছে যে ! জীবনের রহস্য নিয়ে কৌশিক কখনো ভাবে না। ওর কাছে কখনো কখনো মায়ের সন্তানপ্রীতিও স্বার্থপরতার শিকলে বন্দী বলেই মনে হয়। যে বিশ্বাস কে সে কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলে দিতে পারে না। পৃথিবীর সব মাকে সমান সম্মান করা তাই এখনো কৌশিকের হয়ে উঠে না ! ওর মনে হয় সব না হলেও অনেক মা সব কাজ করতে পারে, শুধু নিজের স্বার্থে ! কতবার জীবনে কৌশিক ভেবেছে সে এই ভাবনা আর ভাববে না, কিন্তু এই রহস্যময়ি পৃথিবীর কি সব রহস্যের জালে আটকে কৌশিক প্রতি নিয়ত এসব ভাবতে বাধ্য হয়, হচ্ছে। এই খেলা কবে বন্ধ হবে, সে জানে না ! হয়ত মৃত্যুই কৌশিকের এই কষ্ট থেকে মুক্তি দিতে পারে !
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন