লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২ জুন ১৯৮৬
গল্প/কবিতা: ৫টি

সমন্বিত স্কোর

বিচারক স্কোরঃ ১.৬৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৩২ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবাংলার রূপ (এপ্রিল ২০১৪)

লাল কোঁচ
বাংলার রূপ

সংখ্যা

মোট ভোট ১১ প্রাপ্ত পয়েন্ট

হলুদ খাম

comment ১৪  favorite ০  import_contacts ১,৭১৩
গৌড় নগরী ও বরেন্দ্র অঞ্চলের মাঝা মাঝি একটি গ্রাম সহজানন্দ । চারিদিকে সবুজে ঘেরা এক মায়াময় পরিবেশে বিমোহিত হয়ে কিছু বৌদ্ধ – সহজিয়াগন প্রকৃতি-পুরুষের যুগল মিলনের সহজ আনন্দ সাধনা করত বলে এই গ্রামটির নাম সহজানন্দ । অনেকের মুখে সোনা যায় সৃষ্টিকর্তার সাথে প্রেমে তন্ময়তার স্থান হিসেবে এই গ্রামটি বেছে নিয়েছিলেন বিভিন্ন ঋষি ,সাধু , ফকির গন ।তৎকালীন সময়ে এই গ্রাম প্রাকৃতিক খ্যাদের আধার ছিল । নন্দদীঘির পাড় সর্বদা পাখিদের কলকাকলিতে মুখোর থাকতো চেনা অচেনা হাজারো বৃক্ষ ও বিহঙ্গের মিলন মেলা ছিলো নন্দদীঘি । এই দীঘির জল পানে নাকি পাঁচশ বছর আয়ু লাভ করা যেত , নাইলে রোগ ব্যাধি দুর হতো । ক্রমান্বয়য়ে বিভিন্ন উপজাতি ও ধর্মালম্বীরা এই গ্রামে বসত গড়ল , ঋষি ,সাধুদের সাধনার মূর্তি গুলো চুরি করতে শুরু করলো একটি চক্র । ভিক্ষুদের নানা ভাবে উত্তেজিত করা শুরু হলও , এই গ্রামে ঈশ্বরের কু দৃষ্টি পড়েছে ভেবে তারা ত্যাগ করে এই গ্রাম । বিবর্তনের ঘূর্ণি পাকে বর্তমানে মুসলিম , হিন্দু ও কিছু সাঁওতাল ও ধাঙ্গড় জাতী রয়েছে । আগের সেই রূপ আর নেই বাতাসে ভেসে আসা ফুলের সুবাস এখন আর পাওয়া যায়না ।ধুলো উড়া মেঠো পথে এখন আর কচ কচ করাত করাত শব্দে গরুর গাড়ি চলেনা ।আধাপাকা ভাঙ্গাচুরা সড়কে বিরক্ত কর শব্দে কালো ধোঁয়া উড়িয়ে মৃত্যুর বারতা বহন করে এক প্রকারের যানবহন ।
তিন চার যুগ আগেও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা সন্মান , একে অন্যর উপর সহানুভূতির রূপ ছিলো গর্ব করার মত । কিন্তু আজ দুঃখ করে বলতেই হয় বাংলার রূপ আজ বাঙালির নষ্টামিতে পূর্ণ হয়ে গেছে ।বকের সারি আজ আর কাশবনে লুকায়না , কাশবনে লুকিয়ে পড়ে মানুষের বিবেক ।জীবনানন্দের বনলতাসেন আজ ধর্ষিত হয়ে বুলেটের আঘাতে রক্তে রঞ্জিত । শামসুর রাহমানের স্বাধীনতা তুমি আজ পরাধীনতার প্রহর গুনছে । রবি ঠাকুরের কংকাল আর তার সাথে দেখা করেনা । যাযাবরের দৃষ্টিপাত আজ দৃষ্টিহীন , ঘাস ফড়িঙের লাল কোঁচ আজ অস্তিত্বহীন , ঝিঙে ফুলের মধু খেতে মৌমাছিরা ভয় পায় এই ভেবে যদি বিষ .........।

ঘুম টুটে গেলো অমিতের ।স্বপ্নে এই গ্রাম নিয়ে লেখা একটি গল্প পড়ছিলো কিন্তু শেষ করতে পাড়লনা । কোন এক বরফ বিক্রেতার মাইকের পঞ্চাশ হাজার ডেসিবলের কুরুচিপূর্ণ ড্রাম বিটের অপসংস্কৃতির গান “হামলোগ তুম লোগোকা পেয়ার মে কুত্তা হোগিয়া , কারাং নারাং চারাং কারাং নো নিড বাংলা সং ”।

বরফ বিক্রেতাকে একটু বকাবকি ও ভয় দেখানোর জন্য উত্তেজিত হয়ে গরু পেটানো সাঠা নিয়ে বাড়ি থেকে বেড় হলো অমিত ।কিন্তু দেউরিতে গিয়ে লজ্জার হাসি হাসলো সে কারন নগ্ন ,অর্ধ নগ্ন ছেলে মেয়েদের সাথে সাথে যুবক যুবতি বুড়ো বুড়িরাও নাচা নাচি করছে ।দোয়েল , বাবুই , চুড়াইরা তো ছুটে পালাচ্ছে ! একমাত্র পারিবারিক দায়বদ্ধতার জন্য গরু ছাগল , হাঁস মুরগী গুলো ও অমিত ই সেই নাচ অবলোকনের দর্শক । কিছুক্ষণ সমাজের মানুষ গুলোর রুচিবোধ এর অংক কষে ।

ঘড়িতে দেখলো বেলা তিনটে , সে ভাবল একটু দীঘি গঞ্জে যাবে । নন্দদীঘির পাড়ে এখন জুয়া ও মাদকের জমজমাট আড্ডা , এখানে রয়েছে আরও অনেক কিছু যা প্রকাশ করা সমীচীন নয় । দীঘির পাড় থেকে একটু দুরে গড়ে উঠেছে ছোট বাজার যার নাম দীঘিগঞ্জ ।চার গ্রামের মাঝা মাঝি বলে রাজধানীর ভুমিকা পালন করছে এই গঞ্জ । এখানেই সকলের আনাগোনা ।আমিত ও সেখানে যাচ্ছে আগামী পয়লা বৈশাখে একটি বড়সড় আয়জন করে বাংলার ঐতিহ্য সংস্কৃতি জাগ্রত করার বিষয়ে বড়দের সাথে আলোচনা করার উদ্দেশ্যে । অমিতের ধারনা বাংলার মানুষ বাংলার সুধা পানের সুযোগ পাচ্ছেনা বলে মানসিক তৃপ্তির জন্য অপসংস্কৃতি বেছে নিচ্ছে । কারন অপসংস্কৃতি আজ সহজলভ্য পাঙ্গাশ , সিলভার কাপ , বিদেশী মাগুর মাছের মতই সস্তা !

গঞ্জে গিয়ে অমিত শুনলো এবার চার গ্রামের চার মেম্বারের পুত্রদয় জমকালো নববর্ষ উদযাপন করবে ,বিভিন্ন দেশের প্রধান মন্ত্রীরা প্রধান অতিথি থাকবেন । ।এই গ্রামে নাকি কেজি ,মন , কুইন্টাল স্কুল হবে ।মধ্যে প্রাচ্যের অর্ধ নগ্ন নিত্য শিল্পী ,ভারতের শিল্পী আসবে, বাংলাদেশের লজ্জা পদের শিল্পীরা তো থাকবেই ,মাইকেল জ্যাকসন ও নাকি এবার গ্রাম মাতাতে আসবে ।


কিন্তু মাইকেল জ্যাকসন গত হয়েছে এই খবর মেম্বারের পুত্রগন জানেইনা । আরও নানা আজগুবি গপ্প শুনে বিরক্ত হয়ে হাসান মাষ্টারের পাঠশালার দিকে পা বাড়ালো অমিত ।একটি প্রশ্ন করার আসায় মাষ্টার সাব গ্রামে এসব কি শুরু হচ্ছে ? নষ্টামির সমাপনি হবে নাকি এভাবে চলতে থাকবে ? তার নিজের মাথার চুল গুলো ধরে সজোরে টান দিয়ে ক্ষোভ নিয়ন্ত্রন করে মনে মনে বলল তাদের থামাতে হবে ,গ্রামের মানুষদের ঘুম থেকে জাগাতে হবে ।

পথিমধ্যে দেখলও রত্নাদেবী তার ছয় বছরের ছেলে কমলন্ধু কে কান্না থামাতে বলছে কিন্তু সে কান্না থামাচ্ছেনা বরং কান্নার গিয়ার একটু বাড়িয়ে দিচ্ছে । তার কোলের ছরেলন্ধুর নাকের সিটকা বেড় করে একটি চটাস করে চড় কষার উসিলায় কমলন্ধুর গালে হাত মুছে নিলো । আমিত কাছে দিয়ে দাঁড়িয়ে বলে “কিগো রত্না বৌদি কমলরে মারছ ক্যা ?”
রত্নাদেবী ঃ “চমল্যা কোত থ্যাইকা দুইডা লাল কোঁচ আইন্যা দিছে কমল্যা কমল্যারে । আরও লেওনের ল্যাইগা কানতাছে । ইচ্ছা করতাছে হেডারে লাইথা ভগবানের কাছে পাঠাইয়া দেই । চামারের বেটা, ইতরের ঘরের ইতর হইছে একডা ।”
একটু থেমে আবারো বলে- “ওবাগো অমিত তিল পিঠা বানাইছি খাবানি ?”

আমিত মাথা দুলিয়ে খাবো না জানায় । কমলন্ধু কে কোঁচ পেড়ে দেবার জন্য সাথে নিয়ে যায় । কিন্তু কয়েকটি স্থান যেখানে কোঁচ পাওয়া যায় খুঁজে খুঁজে একটিও কোঁচ এর গাছের দেখা পেলনা অমিত । তবে কিছু লজ্জাবতীর দেখা পেলো তা দেখিয়ে কমলন্ধু কে আনন্দ দেবার চেষ্টা করল অমিত ।আমিত আজ বুঝতে পারলো ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে গ্রামটাকে বনসাই করা হয়েছে । আদি ঋষি দের মত ফোঁস লক্ষ্মীরাও এই গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছে । ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের কাছে অমিত জানতে চায়লো কোঁচ এর গাছ কোন দিকে আছে ? তারা যেন জীবনের প্রথম এই শব্দটি শুনল কমলন্ধুর হাতে জীবনের প্রথম তারা কোঁচ দেখলো তাদের চোখে যাদুঘরের নিদর্শন দেখার অনুভূতি উপলব্ধি করলো অমিত । মনে মনে ভাবলো পাড়ার ছেলে মেয়েদের যাদুঘর দেখতে নিয়ে যাবার জন্য হাসান মাষ্টারের সাথে কথা বলতে হবে ।

শেষ পর্যন্ত লাল কোঁচ পাওয়া গেলোনা এই উদ্ভিদগুলো মানুষের হাতে খুন হয়েছে হয়ত বা কয়েকবছর আগেই । সম্পূর্ণ অস্তিত্বহীন হতে হয়তবা আরও কয়েক বছর লাগবে । বাংলার প্রাকৃতিক অকৃতিম রূপ আজ ইতিহাসের পাতায় বন্দী । ইতিহাস , ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি্‌ গীতি কবিতা , খেলাধুলা , নির্মল প্রকৃতিতে আজ মহামারী । মানবতার প্রদীপ আজ নিভু নিভু করছে ।
পয়লা বৈশাখে নগ্নতায় ভরে গেছে গ্রাম । লাল কোঁচের মত বাংলার রূপ হারিয়ে যাচ্ছে সুখের নদী শুকিয়ে যাচ্ছে ।তবু অমিত ও হাসান মাষ্টারের মরা গাছে ফুল ফোটানোর চেষ্টা অবিরত .........।





(প্রথমে বলা প্রয়োজন ছিলো -আমি যে কোঁচ এর কথা বলছি তা কিন্তু প্রশিক্ষক, আদিম অধিবাসী ,মাছ ধরার বিশেষ ফাঁদ , কোন স্থান এমন কি পরিধানের বস্ত্র নয় । এটি হলও বরেন্দ্র অঞ্চলে ঝোপ ঝাড়ে জন্ম নেয়া এক প্রকারের লতা বৃক্ষের বীজ বা ফল । এগুলোর আক্রিতি গমের চেয়ে একটু বড় লাল টুকটুকে বোটায় একটি কালো বিন্দু দেখা যায় । ছোট্ট শিশুরা এগুলো নিয়ে খেলা করে আমিও করেছি । এগুলো কি কাজে ব্যবহিত হয় তার সঠিক তথ্য আমার আজো অজানা তবে আব্বার মুখে শুনেছি স্বর্ণ কারেরা এগুলো ব্যবহার করে ।ও এটি একপ্রকারের ঔষুধি গাছের ফল । এগুলো কবিরাজ রাও ব্যবহার করে । এগুলো শুধু লাল কালো রঙের হয়না , সাদা কালো , হলুদ কালো , সবুজ সাদা বিভিন্ন বর্ণের হয়ে থাকে । আমার ভাগ্যে অবস্য শুধু লাল কালো গুলোর দেখা মিলেছে । আমরা ছেলেবেলায় বলতাম এগুলো লাল পরীর কালো টিপ দেয়া কোঁচ ।যায় হোক এগুলো কোচ অথবা কোঁচ অন্য কোন স্থানে অন্য নামে পরিচিত হতে পাড়ে । এগুলো এখন আর দেখা যায়না । এই কোঁচের সাথে তুলনা করা হয়েছে বর্তমান প্রেক্ষাপট ।স্বপ্ন দেখা হয়েছে বাংলার আসল রূপ ফিরিয়ে আনার । )

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement