লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২ জানুয়ারী ১৯৭৫
গল্প/কবিতা: ৪৪টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftউচ্ছ্বাস (জুন ২০১৪)

নতুন মাটির সুবাস
উচ্ছ্বাস

সংখ্যা

মোজাম্মেল কবির

comment ৩  favorite ০  import_contacts ১,০১২

ইসমাইল শেখ বাছুরটিকে দুই হাতে তুলে পুকুর ঘাটে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দেয় পানিতে । ডনু ভুঁইয়া মাচা থেকে দৌড়ে আসে ইসামাইল শেখের কাছে -করতাছ কি ইসমামাইল? বাছুরডা মইরা যাইবো!
-মরবো না। তিন দিন পরে আইসা দেইক্ষ্যা যাইয়ো। একটা মজার ঘটনা ঘটবো...
বাছুরটি কিছুক্ষণ আগে ভূমিষ্ঠ হলো। মাত্র দাঁড়িয়েছে। হাঁটতে চেষ্টা করছে। নাতী নাতনীরা বাছুরটিকে ঘিরে আছে। দশ বারো জন নাতী নাতনী গর্ত থেকে বেরিয়ে এসেছে। আকাশে কিছুক্ষণ পর পর পাকিস্তানী বিমান উড়ছে। বোমার চাইতে আতংক বেশী। বাড়ির পিছনের জঙ্গলে একটা ব্যাঙ্কার তৈরি করা হয়েছে। বিমানের শব্দ পেলেই নারী শিশু সব ঢুকে পরে গর্তে। বাছুরের জন্ম দেখে শিশুদের মন থেকে কিছুক্ষণের জন্য বিমানের ভয় দূর হয়ে গেছে। ডনু ভুঁইয়া পুকুর পাড়ে কাঁঠাল গাছের নীচে মাচায় বসে বসে শিশুদের আনন্দ দেখছে। ইসমাইল শেখ নাতী লতিফকে ডেকে বলে -লতু তোর দাদীর কাছ থেইক্যা পান নিয়া আয়। লতু দৌড়ে ভিতর বাড়িতে যায় পান আনতে।
মজার ঘটনা দেখার সময় নেই ডনু ভুঁইয়ার হাতে। এই কথাটা শৈশবের বন্ধু ইসমাইল শেখকে বলতে পারছে না। দেশ ভাগ হয় মাটি ভাগ হয় ধর্মে ধর্মে মানুষ ভাগ হয় মন ভাগ হয় আর কতোটা। হিন্দুর মন কান্দে মুসলমান বন্ধুরে ছাইড়া যাইতে। মুসলমান বন্ধু দোয়া করে হিন্দু পরিবারটা যেন বিপদ থেইক্যা রক্ষা পায়। কি এক রহস্য!
বাবার ইচ্ছা ছিলো সাতচল্লিশেই চলে যাবে ইন্ডিয়া। মায়ের ছিলো আপত্তি। যাওয়া হয় নি। এখন যেতে হবে রাতের অন্ধকারে। আজই, গোপনে। পাক বাহিনী আর দোসরদের নজর পড়েছে। যে কোন সময় পরিবারের সব গুলো প্রাণ হারাতে হতে পারে। যাওয়ার আগে কাছের মানুষ ইসমাইল শেখকে কিছু বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে যাওয়া উচিৎ। মানুষটা বড় বেশী সহজ সরল। চায়ের দোকানদার যত্ন কইরা দুইটা ডিম সিদ্ধ সামনে দিলো তো আদর কইরা এক কাঠা জমি লেইক্ষা দিবো। এমন সহজ মানুষ পদে পদে ঠকে।
সদ্য জন্ম নেয়া বাছুরটি পুকুরের পানিতে কিছুক্ষণ জীবন মরন সাঁতার কাটে। ইসমাইল শেখ পুকুর ঘাটে বাছুরের শরীরটা ভালো ভাবে ধুয়ে উপরে তুলে আনে। প্রথম বারের মতো মায়ের স্তনে মুখটা লাগিয়ে বলতে থাকে -যুদ্ধের সময় জন্ম নিলি, যুদ্ধ দিয়া তোর জিবনডা শুরু করলাম। ইসমাইল হাতটা ধুয়ে পাশে গিয়ে বসে। খুব বেশী চিন্তিত লাগছে ডনুকে। -খাঁ সাহেবের ভিটায় তিনটা লাশ পইরা আছে, দেখছ? ইসমাইলকে জিজ্ঞাসা করে।
-ফজরের নামাজ পইড়া হাঁটতে হাঁটতে গেছিলাম।
-চিনতে পারছ?
-না, মনে হইলো অল্প বয়সী মেয়ে মানুষটা মুসলমান আর পুরুষ মানুষ দুইটা হিন্দু। আশেপাশের কেউ না দূরের মানুষ।
-চিন্তা ভাবনা কিছু করতাছ?
-চিন্তা কইরা কি হইবো? কপালে মউত লেখা থাকলে কেউ ঠেকাইতে পারবো?

-আরে মিয়া আমি কি খালি তোমার কথা চিন্তা করতাছি? এতো গুলা নাতী নাতনী। দুই তিনটা কম বয়সী পুতের বউ । পাক বাহিনীর নজর কিন্তু কম বয়সী মেয়ে ছেলের দিকে বেশী।
ইসমাইলের কপালে ভাজ পরে। তাইতো! ছোট দুই পুতের বউয়ের বাচ্চা পেটে!

তিনটি গরুর গাড়ি লাইন ধরে চলছে। গন্তব্য বারুড়ী গ্রাম। শহর থেকে দশ বারো মাইল দূর। এই গ্রামটি এখনো পাক বাহিনীর হাত থেকে অনেকটা নিরাপদ। বাড়ির ছয়টি বউ ছোট ছোট নাতী নাতনী এই সময় শহরে নিরাপদ না। যে কোন সময় বিপদ আসতে পারে। ভাগ্নে নজরুলের বাড়ি বারুড়ী। এই বিপদের সময় এতো গুলো মানুষের অন্তত দুই বেলা খাবার নজরুল কোত্থেকে যোগার করবে। দুই গাড়িতে নারী আর শিশু পিছনের গাড়িতে চাল ডাল আটা সাথে ছোট দুই ছেলে আজিজ আর রশিদ। চাল ডাল যা দেয়া হয়েছে অন্তত মাস দুয়েক চলবে। ইসমাইল শেখ খুব অস্থির। একবার বাড়ির ভিতরে যায় একবার বাইরে এসে রাস্তার দিকে তাকায়। মানুষ গুলা ঠিক মতো যেতে পারলো নাকি বিপদে পরলো। বৃষ্টি হচ্ছে। গরুর গাড়ির চাকা মাটির রাস্তায় আটকে গেলে কি উপায় হবে! সন্ধ্যার পর রশিদ বৃষ্টিতে ভিজে খবর নিয়ে আসে সবাই ঠিক মতো পৌছুতে পেরেছে। ইসমাইল দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে শুক্রিয়া আদায় করে।
প্রতি রাতে নজরুল দশ বারো জন ক্ষুধার্ত মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে বাড়ি আসে। বাড়ি ভর্তি মানুষ। কেউ ঘরের মেঝেতে কেউ বারান্দায় কেউ আবার রান্না ঘরে ঘুমোচ্ছে। কাউকে বিরক্ত না করে চালের বস্তা থেকে চাল আর ডালের বস্তা থেকে ডাল বের করে খিচুড়ি রান্না করে খেয়ে শেষ রাতের দিকে চলে যায়। এভাবে রাতে এক বেলা খেতে পাড়লে দিন রাত যুদ্ধ করার শক্তি পাওয়া যায়। ইসমাইল শেখের পাঠানো চাল ডাল কয়েক দিনেই ফুরিয়ে যায়। সপ্তাহ দুই যেতে না যেতেই বাড়িতে খাদ্য সংকট দেখা দেয়। এতো গুলো মানুষ দুই তিন দিন না খেয়ে থাকে। ছোট ছোট বাচ্চা গুলো ভাতের জন্য দিন রাত কান্না কাঁটি করতে থাকে। ইসমাইল শেখের হাতে জমা টাকা নেই। গোলায় ধান চাল নেই। দেশের অবস্থা এতোই খারাপ, চলা ফেরা বিপদজনক। যে কোন সময় প্রাণ যেতে পারে। উপায় অন্তর না দেখে ছেলেদেরকে জানিয়ে দিলো যার যার স্ত্রী সন্তান নিজ দায়িত্তে নিরাপদে নিয়ে যেতে। সবাই সিদ্ধান্ত নিলো স্ত্রী সন্তান শ্বশুর বাড়িতে পাঠিয়ে দিবে। আজিজ তার অন্তস্বত্তা স্ত্রিকে নিয়ে যায় স্বশুর বাড়ি খুকশিয়া গ্রামে। রশিদ তার অন্তস্বত্তা স্ত্রিকে জীবনের ঝুকি নিয়ে উঠে শহরের লিচু বাগান শ্বশুর বাড়িতে। রশিদের স্ত্রীর সময় খুব নিকটে। নজরুলের বাড়ি থেকে সবাই চলে আসার তিন চার দিন পর পাক বাহিনী সে বাড়িতে আগুন লাগায়।


কলকাতার ফুটপাতে স্কুলের ছাত্র ছাত্রীরা পথচারীদের কাছ থেকে সাহায্য তুলছে। পূর্ব বাংলার আশি লাখ হাড্ডি সার উদ্বাস্তু আশ্রয় নিয়েছে সীমান্তের ওপারে। কলেরায় হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে প্রতি দিন। পুষ্টির অভাবে নারী আর শিশুর শরীরে হাড্ডির উপরে শুধু চামড়ার আবরণ। শুঁকিয়ে যাওয়া স্তনের বোটায় একেকটি কঙ্কাল শিশু কফোটা দুধের আশায় মুখ লাগিয়ে শুধু টানছে... প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিশ্বকে বোঝাতে চাইছে। কেউ সহজে বুঝতে চাইছে না। বেশীর ভাগ রাষ্ট্র ভারতের স্বার্থের গন্ধ খুঁজে বেড়াচ্ছে। মনে করছে এটা ভারতের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ।

৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ ময়মনসিংহ সদর হাসপাতালে পাক বাহিনী বিমান থেকে বোমা ফেলে। প্রাণ ভয়ে মুমূর্ষু রোগীরা বিছানা ছেড়ে হাসপাতাল থেকে পালাতে থাকে। একই দিনে লিচু বাগান বাপের বাড়িতে রশিদের স্ত্রী জোহরার প্রথম ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। শহরে প্রতি দিন জীবন নাশের আশংকা বাড়তে থাকে। সন্ধার পর কোন ঘরে আলো জ্বলে না। এক অন্ধকার রাতে রশিদ তার নবজাতক পুত্র সন্তান আর স্ত্রীকে নিয় রেখে আসে বড় ভাই আজিজের শ্বশুর বাড়ি খুকশিয়া গ্রমে।

আকাশে বিমান নেই। গুলির ভয় নেই। মেঠো পথ নিজেদের। গাছপালা পুকুর ঘাট সব নিজেদের। চার দিকে নতুন মাটির সুবাস। বিদেশী শাসক মুক্ত একটি দেশ। নিঃশ্বাসে ভয় নেই। আওয়াজ দিয়ে কথা বলতে ভয় নেই। ডিসেম্বরের দশ তারিখ মিত্র বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার সান সিং বাবাজী ও মুক্তিযোদ্ধা যুব শিবিরের প্রধান মতিউর রহমানের নেতৃত্বে ময়মনসিংহ শহর দখলে নেয় মুক্তিযোদ্ধারা। বীর মুক্তিযোদ্ধারা সার্কিট হাউস মাঠে স্বাধীন দেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে। শহর জুড়ে মিছিলে মিছিলে আনন্দ। ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে সে আনন্দ। প্রাণ ভয়ে পালিয়ে থাকা নারী শিশু গ্রাম থেকে ফিরে আসতে থাকে শহরে। শহরের পরিত্যাক্ত বাড়ি গুলোতে আবার প্রাণ ফিরে আসে।
নয় মাস বাড়িটি ফাঁকা ছিলো। বাড়ির উঠানে আগাছা জন্মে বাড়ির পিছনের জঙ্গল আর ভিতর বাড়ি একাকার। ছেলে বুড়ো সবাই মিলে বাড়ির আঙিনার আগাছা পরিষ্কার করছে। নয় মাস পর আবার চুলায় আগুন জ্বলছে। ইসমাইল শেখ পুকুরে জাল ফেলে দশ সের ওজনের একটা কাতল মাছ তুলে।
পূর্নিমা রাতে ইসমাইল শেখের উঠানে পাটি বিছিয় কিসসার আসর বসে। ঘর দুয়ার আঙ্গিনা আগের চচাইতে আনেক বেশী আপন মনে হয়। আকাশের দিকে তাকিয়ে চাঁদটাকেও মনে হয় পরিবারের এক জন। ছয় ছেলে তাদের স্ত্রী পুত্র কন্যা নিয়ে ঘিরে আছে। অধীর আগ্রহে সবাই অপেক্ষা করছে কিসসা শুরু হবে। ইসমাইল আজ ছোট ছেল রশিদকে বলে -আইজ তুমি একটা কিসসা কও বাবা। রশিদ শুরু করে -এক দেশে আসিলো এক অত্যাচারী রাজা...
ভাতীজা হারুন বলে -তার পর কি অইলো কাকা?
-------------------
ইসমাইল শেখের বাছুরটি প্রতি দিন সকালে নিয়মিত গোয়াল ঘর থেকে বের হয়ে পুকুরে নামে। গোসল না করে মায়ের স্তনে মুখ লাগায় না। এই মজার দৃশ্য দেখতে প্রতি দিন দূর দূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় করে। ইসমাইলের খুব শখ ছিলো ডনুকে এই মজার দৃশ্যটি দেখাবে। কিন্তু ডনুর সাথে জীবনে আর কোন দিন দেখা হবে না। রাতের অন্ধকারে পরিবার নিয়ে ভারতে চলে যায়। শূন্য পরে থাকে ভুঁইয়া বাড়ি।
রশিদ তার প্রথম সন্তানের নাম রাখে মোঃ মোজাম্মেল হক কবির। সে বাবার দেয়া নাম কিছুটা ছাটখাট করে ব্যবহার করে শুধু মোজাম্মেল কবির।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement