লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২ জানুয়ারী ১৯৭৫
গল্প/কবিতা: ৪৪টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftঘৃনা (আগস্ট ২০১৫)

সাদা মানুষ
ঘৃনা

সংখ্যা

মোজাম্মেল কবির

comment ৫  favorite ১  import_contacts ৭৬৩
সাদা মানুষ

শেষ পর্যন্ত প্রবাস জীবন বেঁছে নেয়া হলো না। তার কাছে দেশ ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পালিয়ে যাওয়ার মতোই অনেকটা। হেরে যাওয়া। এভাবে হেরে গিয়ে অনেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তুখোড় কৃষি বিশেষজ্ঞ হাফিজ সিডনীতে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এনাম নিউইয়র্কে। ডাক্তার আতাউল টরন্টোতে। সে চাকরীটা ছেড়ে বাজিতপুর ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

কলেজের ভিপি সবুজের টেবিলে একটা চাবুক। এই চাবুক কোন দিন ব্যবহার করা হয়নি। তবে তার ধারণা যে কোন সময় দরকার হতে পারে। দলের গোটা দশেক নিবেদিত প্রাণ কর্মী একটা আবদার নিয়ে এসেছে। এরাই দলের জান প্রাণ। দলের রক্ত প্রবাহ। দলের আপদ বিপদে এরাই রাজপথে নামে। বিপদে এদের সামান্য উপকারে না আসতে পারলে এই চেয়ারে বসে থেকে কি লাভ!
পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক আলী মনসুর টিউটোরিয়াল পরীক্ষার নাম্বার দিতে খুব কার্পণ্য করছে। তার হাতে পুরো পঞ্চাশ নাম্বার। তা থকে একটি নাম্বার হাতে না রাখলেও কিচ্ছু যায় আসে না। কিন্তু সে সাতাশ নাম্বারের উপর দিতে রাজী না। নাম্বার কি তার বাপ দাদার সম্পদ? ছাত্রদের দাবি -সবুজ ভাই একটু বললেই কাজ হবে। সবুজ তার কর্মীদেরকে আশ্বস্ত করে -তোরা যা আমি দেখছি ব্যপারটা।
পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে একা যেয়ে খোঁজ নেয় সবুজ। মনসুর স্যার জোহরের নামাজে গেছে। দশ মিনিট অপেক্ষা করে। সবুজ ইতিহাসের ছাত্র। স্থানীয় সাংসদের ছোট ভাই। এলাকার মানুষ জানতো সবুজ ক্লাস সিক্স সেভেন পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। কখন দুই দুইটা বোর্ড পরীক্ষায় পাশ করে অনার্সে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করলো এটাই সবার কাছে রহস্য। শোনা যায় তাকে ভিপি বানানোর জন্য কলেজের আগের প্রিন্সিপালকে বদলী করা হয়েছে। থানার ওসি টিএনও সবাই যখন তখন তার গালি গালাজ আর বদলী আতংকে ভুগে। কানে কানে তার অনেক দুর্ধর্ষ গল্প ছড়িয়েছে এলাকায় কিন্তু মুখে আনতে মানুষের ভয়।
ভয় কলেজের শিক্ষকদের মধ্যেও। চাকুরীর ভয় মানে সম্মানের ভয়। পরীক্ষার সময় তার দলের গোটা চল্লিশেক ছাত্রের জন্য অসুস্থ দেখিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় আলাদা কক্ষে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে কার খাতায় কে লিখে দেয় তার খোঁজ নেয়ার সাহস কারো নেই।
মনসুরের বয়স খুব বেশী না। বিয়াল্লিশ তেতাল্লিশ হবে। দাড়ি টুপির জন্য বয়স একটু বেশী লাগে। তার টেবিলের সামনে বসেছিলো সবুজ। নামাজ শেষে রুমে ঢুকতেই সালাম দেয়।
-ওয়ালাইকুম আসসালাম, কি উপকার করতে পারি সবুজ?
-উপকারের জন্যই আমার আসা স্যার। সবুজ বলে।
-বলো।
-আপনি স্যার ছাত্রদেরকে টিউটোরিয়াল মার্কস কিভাবে দিচ্ছেন?
-তা যে যা পাচ্ছে তাই দিচ্ছি!
-আপনি নাকি সাতাশ নাম্বারের উপরে দিতে চাইছেন না। আর দশ বারো জনকে নাকি ফেল করিয়েছেন?
-হ্যা, যারা নিয়মিত ক্লাস করেনি পরীক্ষা দেয়নি এমনকি টিউটোরিয়াল খাতা পর্যন্ত জমা দেয়নি তাদের জন্য আমি কি করতে পারি?
-অন্যান্য বিভাগ যা করছে আপনিও তাই করবেন!
-কি করছে অন্যান্য বিভাগ?
-তরা পঞ্চাশে আটচল্লিশ উনপঞ্চাশ দিচ্ছে। আপনিও তাই দিবেন।
-আমার এটা করা সম্ভব হবে না।
-আরেকবার ভেবে দেখুন স্যার।
-বললাম তো আমার পক্ষে সম্ভব না। মনসুর কিছুটা উত্তেজিত হয়ে যায়। সহজ সরল মানুষগুলো যেভাবে বোকার মতো রেগে যায়।
সবুজ মোটেই উত্তেজিত হয় না। সে শুধু স্যারের কানে কানে তার মুখটা নিয়ে খুব ঠাণ্ডা মাথায় বলে -স্যার আমার কাছে একটা চাবুক আছে এটা যে কোন সময় যে কারো পিঠে পরতে পারে।
মনসুর কিছুক্ষণ তার চশমার উপর দিয়ে সবুজের চোখের দিকে বোকার মতো তাকিয়ে থাকে।



স্ত্রী শাপলার হাঁটুতে ব্যথা। ডাক্তার বলছে ক্যালসিয়াম ঘাটতি। বিকেলে বাসায় ফিরার পথে ওষুধের দোকানে যাওয়ার কথা ছিলো। মাছ তরকারী কিনতে যাওয়ার কথা ছিলো বাজারে। সকালের নাস্তার রুটি তৈরির আটা শেষ। কন্যা সায়মার স্কুলের খাতা শেষ। কোথাও যেতে ইচ্ছে হলো না মনসুরের। মন খারাপ হলে কিছুক্ষণ পার্কের বেঞ্চে বসে থাকতে ভালো লাগে। আজ সেখানেও যেতে ইচ্ছে করছে না। তার মনে হচ্ছে কানে কানে সবুজের চাবুকের ধমক এতক্ষণে শহরের সবাই জেনে গেছে। তার পিছনে ছাত্ররা হাসি ঠাট্টা করছে।
বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর অলিউর তাকে একাধিক বার সতর্ক করেছে -বুঝলেন মনসুর সাহেব? যুগের হাওয়া বুঝে শুনে একটু সাবধানে চলুন। এতো কঠিন হলে বিপদ আছে। এখন সেও যেন মুচকি হেসে তাচ্ছিল্যের সুরে বলছে -এখন হলো তো!


নয়শ আটচল্লিশটি খাতা দেখে পনেরো তারিখের মধ্যে জমা দিতে হবে। আজ সাত তারিখ। হাতে সময় মাত্র সাত দিন। এখনো প্রায় অর্ধেক বাকী। রাত জেগে শেষ না করলে বিপদে পরতে হবে। আজ মনের অবস্থা এতোটাই খারাপ যে বসতে ইচ্ছে হচ্ছিলো না। না বসেও উপায় নেই। খাতা দেখতে দেখতে চায়ের মগে একটা চুমুক দিতেই মোবাইল ফোন বেজে উঠে। উপর থেকে ফোন, না ধরে উপায় নেই। খুব দরকারি না হলে ফোন না ধরলেও চলতো। ফোন রিসিভ করে সালাম দেয় মনসুর -আসসালামুয়ালাইকুম স্যার।
-অয়ালাইকুমস্লাম। কি খবর মনসুর সাহেব? কতদূর হলো?
-অর্ধেক হয়েগেছে স্যার। মনসুর বলে।
-দ্রুত শেষ করেন। দেখবেন পাশের হারটা যেন ঠিক থাকে। আরেকটা বিষয় যে জন্য এতো রাতে ফোন করা, পরিবর্তন আরেকবার আনতে হবে।
-কোনটা স্যার?
-পঁচিশ না বাইশ পর্যন্ত যারা পেয়েছে সবাইকে পাশ করাতে হবে।
-স্যার, পাশের হার ঠিক রাখতে গেলে যারা বাইশ নাম্বারের উত্তর দেয়নি তাদেরকেও পাশ দেখাতে হবে।
-তাই করুন। দরকার হলে খাতায় উত্তর লিখে নাম্বার দিন।
-দেখছি স্যার।
-ঠিক আছে ভালো থাকুন।
ফোনটা রেখে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে মনসুর। শরীরটা দুর্বল হয়ে আসছে। এতোটা আপোষ করে জীবন চলে না। এই জীবনকে বাঁচা বলে না। যারা এমন জীবন নিয়ে ভালো আছে ভালো থাকুক। আমার এমন ভালোয় কাজ নেই। এখন বুঝি সরে দাঁড়ানোর সময় হয়েছে। আজকাল মানুষ একটু বিকারগ্রস্ত ভাবতে শুরু করেছে মনসুর সাহেবকে। সবাই যা মেনে নিয়েছে সবার কাছে যা স্বাভাবিক তার কাছে যখন তা অস্বাভাবিক তখন সে অবশ্যই স্বাভাবিক না। সবাই যখন উল্টো পথে চলে তখন সেটাই সঠিক পথ হয়ে যায়।


বাজিতপুরে বাবার রেখে যাওয়া পুরোনো প্রায় পরিত্যাক্ত গ্রামের দোতলা বাড়িটাতে আবার সাদা রঙ পরেছে। দক্ষিনমূখী বাড়ির পূর্ব পাশে দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ। বাড়ির সামনে পুকুর। পুকুর ভরা মাছ। পুকুরের পশ্চিম পাশে গোয়াল ঘর। গোটা পঞ্চাশেক গাভী। পুকুরের পূর্ব পাশে সদ্য চালু হওয়া প্রাইমারী স্কুল। তার স্বপ্নের সাদা মানুষ তৈরীর কারখানা। যে মানুষ মুখে যা বলে অন্তরেও তাই। যারা দেশ প্রেমিকের ছদ্মবেশে দেশের সম্পদ লুটপাট করবে না। যারা আদর্শের বাণিজ্য করবে না। তার স্বপ্ন একদিন বাংলার ঘরে ঘরে সৎ সহজ সরল দেশপ্রেমিক মানুষ জন্ম নিবে। গোটা দেশ হবে সাদা মনের মানুষের হাট।
মানুষের শরীর তার নিজ দায়িত্বে ব্যাকটিরিয়া ভাইরাস আর কঠিন সব জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে অবিরাম। মানুষের মন লোভ লালসার কাছে পরাজিত হয় অনবরত। সাদা মনে লড়াই করার মতো পর্যাপ্ত শক্তির যোগান থাকে।



advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement