লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২০ জুন ১৯৭০
গল্প/কবিতা: ২০টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৫৮

বিচারক স্কোরঃ ২.৩৩ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.২৫ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবিজয় (ডিসেম্বর ২০১৪)

বিজয়ী বাদল
বিজয়

সংখ্যা

মোট ভোট ১৫ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৫৮

জি সি ভট্টাচার্য

comment ৯  favorite ০  import_contacts ৯০৫
সে’দিনটা ছিল রবিবার।

সকালবেলা।

আমাদের জল খাবার খাওয়া সবে মাত্র শেষ হয়েছে। আর আমার পরীর দেশের রাজকুমার বারো বছরের অপরূপ সুন্দর ভাইপো চঞ্চল খবরের কাগজখানা টেনে নিয়ে পড়তে বসেছে। ঘরে বাদল ও ছিল।

হঠাৎ রূপবান ছেলে চঞ্চল বলল –‘ও কাকু, নতুন ধরনের এক ডাকাতি হয়েছে কাল রাতে শহরের দক্ষিণ দিকে, তুমি সেই খবর কি পড়েছ’?

আমি বললুম –‘কই না । পড়িনি তো, চঞ্চল’।

‘কাকু, তবে আমি পড়ছি, তুমি শোন। কাল বিকেলে এক কারখানার মালিক শ্রমিকদের মাইনে দেবে বলে ব্যাঙ্ক থেকে নগদ দশ লাখ টাকা তুলে নিয়ে নিজের গাড়ি করে বাড়িতে এনে রাখে প্রত্যেক মাসের নিয়ম মতন। আজ পয়লা তারিখ। মাইনের দিন। কিন্তু কাল রাত বারোটা নাগাদ এক অদ্ভূত ডাকাতের পাল্লায় পড়ে তিনি সব টাকা হারিয়েছেন...’।

আমি বললুম –‘কোন ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলেছিলেন তিনি’?

‘পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক, চক বাজার শাখা...’

‘কারখানাটা কোথায়?’

রাম নগরের ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট এলাকায়। কিন্তু তাঁর বাড়ী লংকায়। ডাকাতি সেই বাড়িতেই হয়েছে। গাড়ির চালক, পাহারাদার গানম্যান এরা সবাই অতি বিশ্বাসী লোক।’

‘বিবরণ কিছু দিয়েছে?’

‘তা খানিকটা আছে, তবে সামান্যই, কাকু। রাতে হঠাৎ কেউ তাঁর বাড়িতে ঢুকে পড়ে ছিল। কি ভাবে তা জানা যায়নি। গেট তো বন্ধই ছিল। মালিকের শোবার ঘরের দরজায় হাজির হয়ে নক করে সে। দরজা খুলতেই লোকটা মালিকের ঘরে সোজা ঢুকে পড়ে যেন সেটা তারই ঘর’।

‘শেঠ তাকে দেখেই চমকে উঠে চেঁচিয়ে বলেন—‘কে? কে তুমি? এখানে তুমি এলে কি করে?’

লোকটা কোন কথা না বলে এগিয়ে এসে শেঠের মাথায় হাত দিয়ে বলে-‘বাপু হে। শান্ত হও। চেঁচিও না একদম। সে’টাই তো….বুদ্ধিমানের মতন কাজ ...। ধন্যবাদ..’.

ব্যাস, শেঠ ধড়াম করে মাটিতে পড়ে তখনি অজ্ঞান হয়ে যান।

শেঠের চেঁচামেচির আওয়াজ শুনে একজন সতর্ক গার্ড তখনি ছুটে আসে আর সেই অচেনা আগন্তুককে লক্ষ্য করে বন্দুক তোলে। লোকটার হাতে একটা চুষিকাঠির মতন কিছু জিনিষ ছিল। সে সেইটা মুখে পুরে দিয়ে এক ফুঁ দিয়ে বলে-‘আরে, করো কি? করো কি? সর্বনাশ…..ওই নল বেঁকা বন্দুক দিয়ে কি তুমি আত্মহত্যা করতে চাও নাকি’?

তখনি কট করে কি একটা শব্দ হয় আর গার্ড দেখে যে তার বন্দুকের নল নিচু হয়ে ঝুলছে চোপসানো বেলুনের মতন।

সে তাই দেখে ভয়ে বন্দুক নামিয়ে নিতেই লোকটা এগিয়ে এসে তার মাথায় ও হাত বুলিয়ে দিয়ে আশীর্বাদ করে-‘ওঁ শান্তি ওঁ…’

আর সে ও হয় পপাত ধরণীতলে।

‘লোকটা তখন ধীরে সুস্থে গিয়ে সেফ খুলে সব টাকা পয়সাগুলো দিব্যি করে হাতিয়ে নিয়ে সরে পড়ে। বাড়ির গেট যেমন বন্ধ তেমনই ছিল, সে ধার দিয়ে ও সে যায় নি।...’

‘কি কাণ্ড রে বাবা, এ কি ডাকাত না ভুত?’ আমি বললুম।

‘মানুষ ডাকাত, কাকু। ভূত টাকা পয়সা নিয়ে কি করবে? তাদের কি দরকার বলো না?’
বাদল বলল।

‘হুম, তা ঠিক বটে, তবে সে ছুঁলেই লোক অজ্ঞান হয়ে পড়ে কেন? বন্দুক বেঁকে যায় কেন? আর সে আসে যায়ই বা কোন পথে, বাদল?’

‘সে আসে যায় রাতের অনাহূত অতিথিদের পক্ষে সুবিধাজনক কোন পথে নিশ্চয়ই। আর মনে হয় সে কিছু নতুন ধরণের যন্ত্র ও ব্যবহার করেছে। তাই একে আটকাতে পারা যায় নি। ঘটনাস্থলে না গেলে সে কোন পথে যে আসে যায় তা বলা যাবে না, কাকু। আর এই দুষ্টু ডাকাতকে জব্দ করত হ’লে আমাদের ও উপযুক্ত যন্ত্র পাতি না হ’লে চলবে না। তবে এও ঠিক যে এখন তার সাহস খুব বেড়ে যাবে কাকু
আর সে রোজই ডাকাতি করে করে চটপট এক্কেবারে বিরাট বড়লোক ও ঠিক হয়ে যাবে কাকু, হি ….হি…… হি......’

‘কিন্তু কি যন্ত্র হ’তে পারে, বাদল?’

‘একটা তো মনে হয় ব্যাটারী চালিত বৈদ্যুতিক শকার ছিল তার হাতে আর অন্যটা কি হতে পারে বলো তো, কাকু?’

‘আমি বলি? আমার মনে হয় সেটা ইনটেন্সিভ ইনফ্রারেড রে গান...’ চঞ্চল বলল।

‘ঠিক... ঠিক কথা। তা হ’তেই পারে কাকু, তাই ব্যাপার খুব সহজ নয়। বিদেশী কেউ আছে হয়তো এর সাথে জড়িত কেননা ওই সব অদ্ভূত যন্ত্রগুলো মোটেই এই দেশের তৈরী জিনিষ বলে আমার মনে হয় না, কাকু। কোথায় যে তৈরী তা ভগবানই জানেন তবে এ হচ্ছে বৈজ্ঞানিক ডাকাত, কাকু। পুলিশ সহজে এর কিছুই করতে পারবে না মনে হয়’………. বাদল বলল।

‘আরে বাবা ...সে তো তবে খুবই মুস্কিলের ব্যাপার। ...তা আমরা এখন কি করবো?’

‘কিছুটি করবো না, কাকু। আমাদের তো কেউ কিছু করতে বলেই নি এখন অব্দি, কাজেই……………….’ ।

তা অবশ্য ঠিক কথা।

সেই ভেবে আমি ও চুপ করে রইলুম কিন্তু ডাকাতরা চুপ করে বসে থাকবে কেন? তারা রোজই একটা না একটা নতুন ডাকাতি করে যেতে লাগলো সমানে ....আর খবরের কাগজ ওলাদের তো হ’লো পোয়া বারো । তারা রোজ নতুন নতুন চুরি আর ডাকাতির খবর ছেপে খুব পয়সা পিটতে শুরু করে দিলো আর পুলিশকে গালাগাল দিয়ে ভূত ভাগিয়ে দিতে লাগলো।

তখন সি আই ডি পুলিশ ও এসে অতি গোপনে তদন্ত করা শুরু করে দিলো রাজ্য সরকারের আদেশে।

শেষে অতি কষ্টে সি আই ডি পুলিশ যাকে সন্দেহ ক্রমে ধরতে পারলো তিনি লংকা থানার ও সি নিজেই।

কি সর্বনাশ…!

তখন টনক নড়ল কেন্দ্র সরকারের ও।

দিল্লি থেকে হুকুম এলো যে আমাদের কেউ ধাপ্পা দিয়ে ফুলিশ বানিয়েছে এই কেসে। তাই যে করেই হোক সাত দিনের মধ্যে আসল ডাকাতকে ধরতেই হবে । পুরস্কার ঘোষণা করা হল নগদ পাঁচ লাখ টাকা।

আর ডিটেকটিভ বিভাগে থাকার ফলে কেসটা অপারেট করবার দায়িত্ব দাদার ঘাড়েই পড়ে গেল। বিশেষ করে দাদার হোম টাউন বেনারস বলেই হয়তো।

কিন্তু হলে কি হয়। এ ডাকাতকে যে ধরা ছোঁয়াই যায় না। ধরতে গেলে ধরা পড়ে পুলিশ ইন্সপেক্টর নিজেই। বাঃ, বেশ তো কান্ড যা হোক….

সব কথা শুনে বাদল বলল-‘ও কাকু, বড়কাকুকে তুমি একটু ফোনে বলে দাও দেখি যেন ফ্লাইটে এসে লাল বাহাদূর শাস্ত্রী ইন্টার ন্যাশনাল এয়ারপোর্টে নেমে একটু গোপনে শহরে আসে আর ছদ্মবেশে ও সি সাহেবকে ও সঙ্গে করে নিয়ে আসে। আমি তাঁর মুখে ঘটনাটা পুরো শুনে বুঝতে চাই যে তিনি নিজে পুলিশ হয়ে সি আই ডি পুলিশের হাতে শেষে চোর দায়ে ধরা পড়লেন কি করে? এর মধ্যে একটা কিছু ঘোর রহস্য আছে মনে হয়’।

আমি ফোন করতেই দাদা দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বললো-‘সে বুদ্ধি আমার ঘটে আছে। তুই ফ্যাচ ফ্যাচ করবি না বেশী। মনে হয় আমার ফ্লাইট সাড়ে সাতটায় নামবে তবে আমি বাড়ী প্রায় ন’টা নাগাদ পৌঁছব’।

যা বাব্বা। ভালো কথার দেখি কালই নেই আজকাল আর। অবশ্য কথাটা মোটেই আমার নয়। শ্রীমান বাদল কুমারের আর ওই সুন্দর মতন ছেলেটার কোন অতি সাধারণ কথা ও অগ্রাহ্য করলেই তার ফল হাতে হাতেই পাওয়া যায়। সে আমি বহুবার নিজে পরীক্ষা করে দেখেছি। যা হয় হোক এখন। আমি আর ফোন করছি না…।।

তাই আমি চুপটি করে বসেই রইলুম।

তবে রাত ন’টার সময়ে আসবার কি কথা? এগারোটা বাজলো কিন্তু দাদার পাত্তা নেই। আমি এয়ারপোর্টে ফোন করলুম। তারা বললো-‘স্পাইসজেটের দিল্লীর ফ্লাইট যথাসময়ে মানে সাতটা পঁচিশে বেনারস এয়ারপোর্টে এসে গেছে’।

কি কান্ড?

তখন দিল্লিতে ফোন করতে জানা গেল যে দাদা ফ্লাইট ধরতে যথা সময়েই বেরিয়েছে। কি গেরো….তবে দাদা কোথায় গেছে? একটা জলজ্যান্ত মানুষ থুড়ি পুলিশ মানুষ হঠাৎ করে নিপাত্তা হয় কি করে?

রাত হ’তে ছেলে দু’টোকে আগে খাইয়ে দাইয়ে দিয়ে আমি ঘুম পাড়াতে নিয়ে গেলুম কিন্তু জামা কাপড় ছেড়ে বিছানায় শুয়ে পড়লে কি হয়? কেউ দেখি ঘুমোয় আর না।

শেষে বাদল বলল-‘ও কাকু, বড় কাকু দেখি যে বড়ই অসাবধান। তাই তাঁর আসতে হয়তো অনেক দেরী হবেই আজ । তুমি ও এখন খেয়ে নাও, কাকু। অনেক রাত হয়েছে’।

‘কেন দেরী হবে, বাদল?’।

‘আমার মনে হয় যে বড়কাকু হয়তো ছদ্মবেশে আসেই নি আর বিশেষ সাবধান ও হয়নি। পুলিশ নিজেদের একটু বেপরোয়া বলে মনে করে তো স্বভাবতই তাই হয়তো ভেবেছিলো যে থানায় এসে চেঞ্জ করবে আর এয়ারপোর্ট থেকে বাইরে আসতেই পড়ে গেছে ওদের নজরে। এখন ঠিক বুঝবে ঠ্যালা। তুমিই তো বলো যে শত্রুকে কখন ও বোকা বা অসাবধান ভাবতে নেই, কাকু’

‘চঞ্চল ছেলেটা কি ঘুমিয়েছে, বাদল?’

‘মোটেই না কাকু। তোমার দুধের বরণ চকচকে ঝকঝকে পরী ছেলেটা হয়তো ভাবছে তার বাপী গেলো কোথায়? আমি যত বলছি যে বেশী দূরে নয়, বেনারসেই আছে । এসে পড়বেই খানিক পরে নিজে নিজেই। তা সে ছেলে আমার কথা তো মোটে শুনছেই না। আচ্ছা কাকু, তুমি যদি একটা হীরে জহরতের দোকান খুলে দাও তো কেমন হয় বল দেখি? সে বেশ ভালো না, কাকু?’

‘হুম, বুঝেছি বাপু। তা দোকানদার হ’তে আমার কোন আপত্তি নেই তবে মূলধন কোথায় পাবো, বাদল?’

‘সে তোমাকে ভাবতে হবে না, কাকু? ভগবান ঠিক জোটাবেন……হিঃ….হিঃ…..হিঃ…..’

রাত প্রায় তিনটের সময় একটা নীল রঙের পুলিশ মার্কা জীপ এসে থামলো আমাদের বাড়ির কাছে। তাইতে চড়ে দাদা এলো বটে তবে বেশ বিধ্বস্ত অবস্থায়।

প্রথমে জামা কাপড় বদলে হাত মুখ ধুয়ে খাবার দাবার খেয়ে দাদা একটু সুস্থ হয়ে তখন বললো-‘তোর এই ডাকাত তো দেখি বড়ই সাংঘাতিক রে। আজ আমাকেও খুব খানিক ঘোল খাইয়ে ছেড়ে দিয়েছে এক্কেবারে। তবে আমি ও দেখে নেব শয়তানদের, তা ঠিক কথা’।

‘কি ভাবে ঘোল খাওয়ালো তোমাকে দাদা? গেলাসে করে নিয়ে জোর করে গলায় ঢেলে দিলো না কি? তা তুমি হাঁ করলে কেন? কাতু কুতু দিয়েছিলো?’

বিষম রাগে কটমটিয়ে আমার দিকে চেয়ে দাদা বললো-‘হুঁ….ইয়ার্কি হচ্ছে ?? তা হবেই। কি আর করা? তবে ঠিক ঘোল নয়, চা বলা উচিৎ। আরে তোর মাষ্টার বন্ডের কথা অগ্রাহ্য করবার ফল আর কি। তখন তোর তো বলা উচিৎ ছিল আমাকে ফোনে, যে ওই কথাটা বাদল বলতে বলেছিল তোকে। পরে আমি আন্দাজে সব বুঝলুম ঠিকই তবে তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে। তুই একটা অপদার্থ……..’।

‘তুমি যা খিঁচিয়ে উঠলে আমাকে। সাহসই হ’লো না’।

‘সেটি হবে কেন? এখন কাল আমি ও চোর দায়ে ধরা পড়ে মরি আর কি?’

‘সে কি কথা, দাদা? ঘোলের বদলে চা খেয়ে চোর……?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ। সেই ব্যাপারই হয়েছে।.শোন আগে সবটা তুই, হাঁদারাম। বাদল ছেলেটা তো এখন ঘুমিয়ে আছে। এতো রাতে বাচ্ছা ছেলেটার আর ঘুম ভাঙিয়ে কাজ নেই। তবে ছেলেটার যে একটা আনুমানিক বা কল্পনা ভিত্তিক দিব্যদৃষ্টির মতন কোন শক্তি আছে, তা ঠিক’।

‘শোন, আমি আসছিলুম এয়ারপোর্ট থেকে। দারোগা সাহেব নিজেই গিয়েছিলেন আমাকে রিসিভ করতে জীপ নিয়ে….তা মাঝপথেই এক বিভ্রাট। একটা টায়ার হঠাৎ দুমুস করে গেল ফেঁসে। অবশ্য সঙ্গে যে দু’জন সেপাই ছিলো তারাই চাকা বদলাতে বসলো। আমরা পথে নেমে আশে পাশেই ঘুরছিলুম। গরম কাল। তাও দেখতে দেখতে অন্ধকার হয়ে গেছে তখন’।

‘হঠাৎ একটা কালো রঙের গাড়ী এসে আমাদের কাছে থামলো আর একজন লোক নেমে পড়ে বললো- ‘কি হয়েছে, স্যার? টায়ার পাংচার? তা তো হ’তেই পারে। কেননা আসবার পথে তো দেখলুম যে অনেক ধারালো কাচের টুকরো রয়েছে পথে ছড়ানো। অনেক কষ্টে নিজেদের চাকা বাঁচিয়েছি, স্যার। ইয়া বড় বড় সব বোর্ড পিন ও পড়ে ছিল। নিশ্চয়ই কারো অপকীর্তি………………তা তাড়া থাকলে আপনি আমার গাড়িতে চলে আসুন না। আপনাকে পৌঁছে দিতে পারি বেনারসে। গাড়িতে একজনের মতন জায়গা হয়ে যাবে’।

‘তাড়া তো আমার ছিলই। তাই দারোগা সাহেবকে গাড়ী ঠিক হ’লে থানায় আসতে বলে আমি সেই গাড়িতে উঠে পড়লুম। আমি প্লেন ড্রেসে ছিলুম আর সঙ্গে সার্ভিস রিভলবার ও ছিল । তাই একটু নিশ্চিন্ত ছিলুম আমি’।

‘গাড়ীখানা বেশ ভালো। দারুণ স্পীড নিয়ে ছুটলো কিন্তু প্রায় একঘন্টা পরে যখন থামলো তখন দেখি যে লংকা থানার বদলে একটা বড় গেটওয়ালা কোন বাড়ী রয়েছে ঠিক সামনে। বেশ বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলুম—‘এ আবার কোথায় নিয়ে এলেন আমাকে? বললুম না যে আমার তাড়া আছে?’

‘লোকটা হাতজোড় করে বললো-‘অধীনের বাড়ী। একটু পায়ের ধূলো দিয়ে এক কাপ চা অন্তত খেয়ে বাধিত করে যান। এতোটা পথ এসেছেন যখন। আপনি অতিথি। আর থানা কাছেই। পাঁচ মিনিটে পৌঁছে দেব আপনাকে’।

‘কি আর করি? অগত্যা গাড়ী থেকে আমি নামলুম। বাড়ির মধ্যে বেজায় বড় এক হলঘরে নিয়ে গিয়ে সাদরে সে বসালো আমাকে। বিনয়ের অবতার হয়ে। বেশ বড়লোকের কেতা দুরস্ত ড্রয়িংরুম মনে হ’লো ঘরটা। তবে সে’টাকে আয়না ঘর বললে ও কিছুমাত্র ভূল হয়না। চারদিকের দেওয়ালে দেওয়ালে লাগানো আছে দামী দামী সব বেলজিয়াম কাঁচের বড় বড় আয়না। ফ্রেমে মোড়া। বিশাল আকার সেই সব আয়নার’।

তিনি তখন –‘আমি আপনার জন্য একটু চা বলে আসি….’ এই বলেই সরে গেলেন বাড়ির ভেতরে। আমি যা একটা গাধা তাই একবার ও আমার মনে হ’লো না যে এতো বড় বড়লোকের বাড়িতে তো দশ জন চাকর বাকর থাকবার কথা। মালিক নিজে যায় কেন?’

‘তা আমি কি আর করি তখন একলা হাঁ করে বসে বসে? উঠে কাছে গিয়ে একে একে সেই আয়নাগুলোই দেখতে শুরু করলুম মনোযোগ দিয়ে। যে কেউ তাই করতো। যখন আমি দাঁড়িয়ে পঞ্চম আয়নাটা খুঁটিয়ে দেখছি, হঠাৎ মনে হ’তে লাগলো যে কেউ যেন আমাকে টানছে পাশের আয়নাটার দিকে। জন মানব নেই অথচ মনে হচ্ছে কেউ আছে নইলে কে টানবে? তবু এগিয়ে গিয়ে পাশের আয়নাটার সামনে দাঁড়ালুম। আর তখনি মনে হ’লো যেন মাটি মানে সবুজ জাজিম পাতা মেঝেটা দুলছে। আমি সামলে উঠতে চেষ্টা করে ও পারলুম না। হুড়মুড়িয়ে পড়ে গেলুম যেন সেই দুলুনিতে মাথা ঘুরে’।

‘কি সর্বনাশ? ভূমিকম্প….? তারপর, দাদা?’

‘তারপর আমার মাথা আর মুন্ডু। ভূমিকম্প না ছাই। সব বদমায়েসী কিন্তু বুঝতেই পারিনি। তখনি ছুটে এসে আমাকে ধরে তুললেন সেই যিনি সঙ্গে করে এনেছিলেন। কি হ’লো? কি হ’লো? বলতে বলতে’।

‘তা আমি তখন আর কোনো কথাই বলতে পারছিলুম না। অসাড় হয়ে সোফায় বসে পড়লুম। চা এলো। তাও খেলুম খানিক তবে চুপচাপ। অনেক কিছু টাও ছিল চায়ের সঙ্গে। সে’সব আমি কিছুই মুখে তুলতে পারলুম না। মনে হ’লো ঠিক যেন চোয়াল ধরে গেছে আমার। শেষে তিনি ড্রাইভারকে ডেকে বললেন-‘যা সাহেবকে এইবার পৌঁছে দিয়ে আয়। আচ্ছা স্যার, নমস্কার। আসুন’।

‘টলতে টলতে কোনমতে গিয়ে গাড়িতে উঠলুম আমি। গাড়ী চললো তবে থানার বদলে যখন আবার একটা নির্জন নিঃঝুম মতন বাড়ির সামনে গিয়ে থামলো, তখন সেটাও থানা নয় দেখে অতিকষ্টে জানতে চাইলুম যে এ আবার কোন চুলোয় নিয়ে এলে? কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজই বেরোলো না আমার’।

‘লোকটা কি কৌশলে যেন বাড়ির সামনের বড় গেটটা খুলে ফেলে বললো-‘আসুন। এই যে এইখানে। ছাদ থেকে এই দড়িটা ঝুলছে দেখতে পাচ্ছেন তো? এই বেয়ে আপনাকে সোজা ছাদে উঠে যেতে হবে আর সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এসে সদর দরজাটা আমাকে একটু খুলে দিতে হবে আপনাকে কষ্ট করে। আপনাদের কাছে এই সব কাজ করা তো অতি সহজ কিন্তু আমার মতন লোকের পক্ষে তা নয়। তার ওপরে ভয় ও আছে। ছাদে আমার হাত বা পায়ের চিহ্ন পড়ে থাকাটা ও তো কোন কাজের কথা নয়। সি আই ডি পুলিশের যা উৎপাত বেড়েছে আজকাল’।

‘আর একটা কথা শুনুন। মনে হয় ভেতরে একজন চৌকিদার আছে। তবে তাকে কব্জা করে দরজার চাবী আদায় করতে আপনি ভালোই জানেন। সে খুব একটা বাধা দেবে না আপনাকে। উল্টে সে ভয়ে ভয়ে সিন্দুক টিন্দুক কোন ঘরে আছে তা দেখিয়ে ও দেবে আমাদের। বাড়ির মালিক বিদেশে গেছে, তাই এই দড়িটাও সেই ঝুলিয়ে রেখেছে। আবার সব কাজ শেষ হয়ে গেলে সে আমাদের আনাগোনার সব চিহ্ন মুছে ও দেবে। তাই কুইক……’

‘কি কান্ড? এ যে একেবারে ডাকাতী। দাদা, তখন তুমি কি করলে?’

‘ডাকাতী করিয়ে নেওয়া বল। তা তখন আমি কি আর করবো? আমার কোন ক্ষমতাই ছিলো না প্রতিবাদ করবার। তাই সে যা হুকুম দিলো তাই করলুম। আমার নিজের কোন শক্তিই ছিলো না…………’।

‘সে কী? তুমি ডাকাতদের জন্যে সেই বাড়ির ছাদে উঠে দরজা খুলে দিলে?’

‘হুম। বুঝলুম। এইভাবেই দারোগা ও চোর হয়। চৌকিদার আমাদের দরকারী ঘর ও দেখিয়ে দিলো। সেই ঘরের তালা ভেঙে ঘরে ঢুকে পোর্টেবল অক্সিঅ্যাসেটিলিন টর্চ দিয়ে সিন্দুক কেটে সব টাকা পয়সা, গয়নাপত্র যা ছিলো সব লুঠ করে নিলো ডাকাতটা। তবে নিজে যে কিছু করলো তা নয়। প্রায় সব কাজই করতে হ’লো আমাকে নিজের হাতে। শেষে চৌকিদার আমাদের সব পায়ের ও হাতের ছাপ যত্ন করে মুছে ফেললো আর আমরা সব কাজের শেষে তাকে বেঁধে ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করে ফেলে রেখে চম্পট দিলুম। ফেরবার পথে আমাকে সে নামিয়ে দিলো থানার খানিকদূরে আর ঘুরে অন্যদিকে সাঁ করে গাড়ী চালিয়ে চলে গেলো। তখন ও আমি মোটেই ধাতস্থ হইনি, তা ঠিক’।

‘থানায় দারোগা তখন ও বসে ছিলেন। চারদিকে লোক ও পাঠিয়েছিলেন আমার খোঁজে। আমি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছি শুনে একজন সেপাইকে পাঠালেন নগওয়া থেকে ডঃ পান্ডেকে ডেকে আনতে। ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে বললেন –‘স্যার, মনে হয় খুব প্রেসারে নার্ভাস ব্রেকডাউনের মতন হয়েছে আপনার । আমি ওষুধ দিচ্ছি। একঘন্টায় সুস্থ হয়ে যাবেন তবে কোন টেনশান নেবেন না। বিশ্রাম নিন। ভেরী হাই ইন্টেন্সিটির ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডের মধ্যে অনেকক্ষন থাকলে মানুষের মাথায় অনেক সময় এই ধরনের নার্ভের সিনাপসেটিক ডিসঅর্ডার দেখা দেয়। আপনি এখন কোন বিদ্যুৎবাহী তারের ধারে কাছে ও যাবেন না যেন’।


‘এই সব বলে তিনি বিদায় নিলেন। আমি একটু সামলে উঠে জীপে চড়ে বাড়ী এলুম রে ভাই। এখন বল, আমার অবস্থাটা … ‘বল মা তারা দাঁড়াই কোথা……’ হয়েছে কি না?’

‘হ্যাঁ। তা ঠিক হয়েছে বটে। বাদলের কথা অগ্রাহ্য করলে এই রকম সব কান্ড হ’তেই পারে। আর এখন যদি ঠিকমতন সব প্রমাণ লোপ না হয়ে থাকে, তবে কালই তুমি চুরী বা ডাকাতির দায়ে ধরা ও পড়ে যাবে নির্ঘাৎ করে । তা সেই বাড়িটা কি কাল সকালে তুমি চিনতে পারবে, দাদা?’

‘হুঁ,…………..মোটেই না’।

‘বুঝেছি, তা তুমি এখন একটু রেষ্ট নাও, দাদা। মনে হয় এটা শুধু সিনাপ্সেটিক ডিসঅর্ডার নয়। এটা হচ্ছে ইচ্ছাকৃত ভাবে তৈরী সিনপ্সেটিক রিফর্মেশন….যাতে অস্থায়ীভাবে সাধুকে করা যেতে পারে চোর, পুলিশকে ডাকাত…এ হচ্ছে গভীর গাঢ্ঢা, দাদা…’

‘তবে কি উপায়ে এখন মান রক্ষা ও চাকরী রক্ষা করি তাই বল, ভাই। ঘুম আসবে না আমার দু’চোখে আজ’।

‘অতো চিন্তা করো না, দাদা। তুমি এখন একটু বিশ্রাম নাও। আমি ও গিয়ে একটু শুয়ে পড়ি। রাতটা তো কাবারই হ’লো দেখছি। তবে বাদল আমাকে বলেছে দোকানদারী করতে। মনে হয় তাই করতে হবে শেষে আমাকে। ’।

‘কি কান্ড? শেষে দোকানদারী???......তার মানে?’

‘এখন ও বেশী কিছুই আমি জানি না, দাদা। পুরোটা বাদল হয়তো কাল বলবে’।

‘হুম…বাদল হচ্ছে মাষ্টার মাইন্ড। তাই তো আমি বলি মাষ্টার বন্ড। তবে ছেলেটার স্ট্র্যাটেজিটা যে কি তা তো বুঝছি না। হুম….দোকান? কিসের দোকান?…’

‘মনে হয় রেয়ার ও ভ্যালুয়েবল স্টোন ও জড়োয়া গয়নার। বাদল হয়তো চায় কন্টকে কন্টকোত্তোলন করতে, দাদা। বা যন্ত্রে যন্ত্রস্য শমনম্ ও বলতে পারো তুমি……আচ্ছা, গুডনাইট ’

দাদাকে গুডনাইট বলে পাশের ঘরে গিয়ে বিছানায় উঠে আমি চঞ্চল আর বাদলের মধ্যে গিয়ে ঝপ করে শুয়ে পড়তেই হঠাৎ বাদল আমাকে ডান পাশ থেকে তার নরম নরম মসৃণ দু’হাতে জড়িয়ে ধরে বলে উঠলো—‘কাকু, ইলেক্র্টোম্যাগনেটিক সিনাপ্সু রিঅর্গ্যানাইজার থেকে কিন্তু খুব সাবধান…। আমাদের ও একটা ভেরী স্ট্রং ফোর্সফিল্ড বা শীল্ড চাই এবং আরো বেশ কয়েকটা যন্ত্র ও চাই। রেডিও অ্যাকটিভ রেডিয়েটার থেকে শুরু করে ব্যাটারির জন্য হিউমিডিটি এনহ্যান্সার ও রেগুলেটার অবধি অনেক যন্ত্র আমাদের ও লাগাতেই হবে এই পাজী ডাকাতদের ধরতে হ’লে কাকু, নইলে তোমার দোকানদারী করা হয়তো মাথায় উঠবে। তোমাকেও হয়তো গিয়ে বড়কাকুর মতন ডাকাতী করতে হবে …. হিঃ হিঃ হিঃ….’

‘তার মানে? তুমি ঘুমোও নি মোটেই। আমাদের সব কথাই শুনেছো?’

‘হুঁ, তা শুনেছি বইকি, কাকু। এখন তুমি একটা হীরের জড়োয়া গয়নার দোকান হাতিয়ে নিয়ে বসতে পারো কি না তাই দেখো তো। পেপারে দামী দামী রত্নসম্ভারের বিজ্ঞাপন ও দিতেই হবে পাতা জোড়া নইলে মহাপ্রভুদের নেক নজর পড়বে না তোমার ওপরে। আচ্ছা, বিখ্যাত চলতি দোকান রত্নভান্ডারটাই না হয় তুমি কিনে নিও
কালকে।….. হিঃ হিঃ হিঃ..’

‘হুম………..তোমার ফন্দিটা আমি এখন বেশ বুঝতে পারছি, বাদল। তবে অতো সব জটিল যন্ত্রপাতি যোগাড় করাই তো হ’বে আমাদের পক্ষে খুব কঠিন। বাজারে মিলবে না। হয়তো শেষে বিদেশে অর্ডার দিয়ে বা সুবিধা মতন উপযুক্ত কোন মেকানিক নিয়ে এসে নিজেদেরই বানিয়ে নিতে হ’বে কিন্তু………..’

‘কোন কিন্তু নেই, কাকু। বড়কাকু না …. এখন দারুণ ক্ষেপে গেছে বাধ্য হয়ে ডাকাতদের সাহায্য করে এসে। এখন তুমি যা যা করতে বলবে, যে করেই হোক সব ঠিক ব্যবস্থা করবে…. দরকারে অ্যামেরিকা থেকে ও আনিয়ে দেবে… .হিঃ…. হিঃ…. হিঃ….’

আমি ঘুমন্ত চঞ্চলকে বাদ দিয়ে তখন দু’হাতে শক্ত করে বাদল ছেলেটাকেই জড়িয়ে ধরে আদর করা শুরু করলুম।

কাল থেকে আমার কপালে দোকানদারী করা তো দেখি নাচছেই।


***********************************************

তা দাদার উঠে পড়ে লেগে পড়া চেষ্টায় সহজেই দোকানদারী ও ঠিক জুটে গেলো একটা আমার ভাগ্যে, পরদিন থেকেই।

আবার লম্বা চওড়া করে খবরের কাগজে দেওয়া পাতা জোড়া সুনিশ্চিত উপহার লাভের গ্যারান্টী সহ বিজ্ঞাপনের মহিমায় সেই দোকানে খদ্দেরের ভীড় ও দিনকে দিন এমনভাবে বাড়তে লাগলো যে সাতজন কর্মচারী রাখতে হ’লো আমাকে কেননা প্রোপাইটারের জায়গায় আমার নামই দেওয়া হয়ে ছিল বিজ্ঞাপনে। অবশ্য সেই সব কর্মচারী সবাই সি আই ডির লোক।।

শেষে খান কয়েক দুর্মূল্য হীরে ও দোকানে আনানো হ’লো সুরাট ও জয়পুর থেকে। খুব ভাল কোয়ালিটির হীরে বিক্রি করার জন্যে আনা হয়েছে আমাদের দোকানেতে এই বলে একটা বিজ্ঞাপন ও আবার বেরোলো কাগজে। শো কেসে সেই ঝকঝকে হীরেগুলোকে দিনে সাজিয়ে রাখা হ’তো আর রাতে সব সিন্দুকে বা আলমারিতে তুলে রাখা হ’তো। ...’

তারপরে শুরু হ’লো এক দোকানদারের সে এক অন্তহীন প্রতীক্ষার পালা। কেউ আর তেমন সন্দেহজনক লোক আসেই না।

সাত দিন কাটলো। দশ দিন কাটলো। ফল ফললো পনেরো দিনের দিন।

একজন খদ্দের এলেন রাত আটটায় যখন দোকান বন্ধ হয় হয় ঠিক তখন। অবশ্য তিনজন আর্মড গার্ড মোতায়েন ঠিকই ছিলো সামনে আর গোপনে ও ছিল অনেকেই।

তিনি সেই দামী হীরে গুলো দেখতে চাইলেন। আমি নিজেই গিয়ে দেখালুম। তিনি অন্য কাচের টুকরো বাক্সে রেখে দিয়ে আসল হীরে গুলো যাতে হাতসাফাই না করতে পারেন, তার জন্য কোয়ালিটি চেকিং ইন্ডিকেটর প্রত্যেক হীরের বাক্সে লাগানো ছিলো।

হয়তো সেই ছোট্ট যন্ত্রটা তার চেনা ছিলো বা অন্য কিছু নিয়ে মনে সন্দেহ হয়ে থাকবে, তাই পছন্দ হ’লো না বলে সব ফেরৎ দিয়ে আরো ভালো জাতের দামী হীরে আনিয়ে রাখবার জন্য নগদ বিশ হাজার টাকার একটা অ্যাডভান্স চেক লিখে দিয়ে অর্ডার বুক করিয়ে রেখে তিনি বেরিয়ে যেতেই তাঁর পেছনে পুলিশের লোক লেগে গেলো নিয়ম মতন।

পরে সেই চেক অবশ্যই বাউন্স হয় ফলে ক্যাশ আর করা যায়নি। কিন্তু চেকটায় হাতের লেখা আর সই ছিলো। সেগুলো প্রমাণ হিসেবে আমাদের কাজ দিয়েছিলো অনেক।

দোকান বন্ধ হয় গেলো। কর্মচারিরা ও যে যার বাড়ী চলে গেলো।

কিন্তু তার পরে গভীর রাতেই দোকানে অনায়াসে এসে ঢুকে পড়লো তিনজন সত্রক অজ্ঞাত হানাদার।

তখন চারদিক ছিল ঘোর নিস্তব্ধ আর অন্ধকার। জনমানববিহীন পথ।

তারা নিঃশব্দে দোকানের শাটারের সবগুলো তালা খুলে ফেলে ভেতরে ঢুকে শাটার ফেলে দিলো। হয়তো মাষ্টার কী নিয়ে এসেছিলো। কিন্তু তারা জানতে ও পারলো না যে তখনি শাটারের নীচে লাগানো বিদ্যুৎ চুম্বক সক্রিয় হয়ে উঠলো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায়। এখন শাটার না ভেঙে আর কেউ তা টেনে তুলে খুলে ফেলতে পারবে না কোনমতেই।

বাদলের প্ল্যান মতন লাগানো এক নম্বর অটোমেটিক বিদ্যুৎ চুম্বক যন্ত্র নিঁখুতভাবে কাজ শুরু করলো গ্রাফিন কোটিংয়ের সাহায্যে। কার্বন কণার এক অপররূপ ন্যানোফর্মের বিদ্যুৎ সুপরিবাহী কিন্তু খালি চোখে প্রায় অদৃশ্য এই অতি পাতলা গ্রাফিন লেয়ার। একটা অন্য কেসে ও আগে বাদল এই গ্রাফিন লাগাবার পরামর্শ দিয়ে সফল হয়েছিলো। শাটার ফেলে দিয়ে তার খাঁজে আগে থেকে লাগানো গ্রাফিন কোটিংয়ের ওপরে মোম স্প্রে করে দেওয়া ছিলো বাইরে থেকে। শাটার তুললেই ঘষা খেয়ে তা উঠে যাবেই আর গ্রাফিন লেয়ার বেরিয়ে পড়বে। খুব সাবধানে প্ল্যান করেছিলো বাদল ঠান্ডা মাথায় বসে আর দাদা তাকে যোগান দিয়েছে সব কিছু সে’কথা আমি আগেই লিখেছি। তাই কেউ তখন কিছু জানতে ও পারলো না হানাদাররা। দোকানের শাটার তোলা ও নামানোতেই কাজ শুরু হয়ে গেল।

দোকানের মধ্যে লাগানো ছিলো স্বয়ংক্রিয় ইনফ্রা রেড ক্যামেরা। তাইতে তাদের গতিবিধির সব রেকর্ডিং ও শুরু হয়ে গেলো প্রবেশ মাত্রই তখন। এই ক্যামেরা অন্ধকারেও ছবি তুলতে সক্ষম তাই বাদলের এটি হচ্ছে দ্বিতীয় চয়নিত যন্ত্র। এই রেকর্ডিং ও ডিজিটাল করা হয়েছে বলে এখন আইনে মানে অর্থাৎ কোর্টে ও স্বীকৃতি পায়।

চোর দায়ে ধরা পড়ে জব্দ হবার ভয়ে তার পরের দিন সকালে উঠেই বারো বছরের ছেলে বাদল যা যা লাগাতে বা করতে বলেছিল, তাই করে ছিল আমার পুলিশ অফিসার দাদা চোখ কান বন্ধ করে। কেননা একবার ডাকাতী করেই যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছিলো দাদার।

লোকগুলো তখন তো আর তা জানেনা। তাই নিশ্চিন্ত হয়ে রাতের অতিথিরা এগিয়ে গেলো আলমারী খুলতে। খুলে ও ফেললো। একজন হাত বাড়িয়ে দিলো হীরেগুলোকে তুলে নিতে। তখন অতি মৃদু একটা শব্দ হয়েই জোর স্পার্কিং হ’লো সে’খানে একটা আর ঘুমিয়ে থাকা এক ফোর্সফিল্ড সক্রিয় হয়ে উঠে একটা বৈদ্যুতিক শক মারলো এমন যে লোকটার হাতের জামা সমেত চামড়া পুড়ে কালো হ’য়ে গেলো এক নিমেষের মধ্যে। বিকট এক চিৎকার শোনা গেলো তার কন্ঠে। এটি হ’লো বাদলের পছন্দের তৃতীর নম্বরের এক শক্তিশালী বৈদ্যুতিক যন্ত্রের কাজ।

‘কি হ’লো রে? কি হয়েছে? চেঁচালি কেন? সাবধান……….টর্চ জ্বাল, দেখি।’

অন্যজন বললো-‘নাঃ, মোবাইলের অল্প আলোতেই দেখে নে কি হয়েছে। রেকর্ডিং ক্যামেরা থাকতে পারে’।

উত্তর দেবার তখন আর কোন ক্ষমতাই নেই প্রথমজনের। অন্যজন বললো-‘মনে হয় শক লেগেছে। আগে কারেন্টের লাইনটা উড়িয়ে দে মেন থেকে…।’

‘সব যে ইন্টিরিয়র লাইনিং আর মেন যে কোথায় রয়েছে তা যে দেখাই যায় না’।

‘তবে বার কর আমাদের ভাইব্রেটর। কারেন্ট অফ হয়ে যাবে আপনিই। তুলে নে হীরেগুলো। মনে হয় সংখ্যায় দশটাই ঠিক আছে …..’

ভাইব্রেটর অন করতেই ভয়ানক একটা স্পার্কিং হ’লো লোহার সেই আলমারী আর ভাইব্রেটরের মধ্যে। যেন ঘরে চড়াৎ করে বাজ পড়লো আর একটা। কালো ঘন কটু পোড়াগন্ধের ধোঁয়ায় ঘর ভরে গেলো।

‘এটা এখন আবার কি কান্ড হ’লো রে?’

‘সর্দার, আজ গতিক বিশেষ সুবিধের নয় বলেই মনে হচ্ছে আমার। আমি শুনতে পাচ্ছি যে বাইরে দূরের রাস্তায় এতো রাতে জাগছে অনেকগুলো ভারী পায়ের শব্দ। পুলিশ বুটের শব্দ হ’তেই পারে। আজ আপনার নিজে আসা হয়তো ঠিক হয়নি…।’

‘আরে ছোঃ….পুলিশ আমার কি করবে? মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিলেই ওরা সবাই হবে ঠান্ডা। নয়তো ট্র্যান্সমিটার তো আছেই আমাদের শেষ অস্ত্র। তবে আমাদের বন্ধু চ্যাং লি হচ্ছে অতি চালাক লোক। এতো সব দামী জটিল বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি সে গোপনে আমাদের সরবরাহ করেছে কি মুখ দেখতে না কী? নিজেই আসরে কবে নেমে পড়তো সে । নেহাৎ চৈনিক বদন লুকোনো কঠিন এই দেশের লোকের ভীড়ে, তাই সে আমাদের আড়ালেই আছে এখনও । ওপরে ওপরে ওরা ভারতের সঙ্গে পরম বন্ধুত্বের খোলসটা তো আরো কিছুদিন টিঁকিয়ে রাখতেই চায় যাতে বাণিজ্য করবার ঢালাও অনুমতি অব্যাহত থাকে, ওপেন ইকনমি আর মার্কেট গ্লোবলাইজেশনের কল্যাণে’।

তা দেখ, ভাইব্রেটর কি বলে?’

‘এক্কেবারে চুপ, সর্দার। মনে হয় কয়েলটাই পুড়ে গেছে’।

‘অসম্ভব। তার জন্য হাই ভোল্টেজের দরকার। সে যাক গে। ইনটেন্সিভ ইনফ্রারেড রেডিয়েটর দিয়ে গোটা আলমারিটাই গলিয়ে ফেল। দেখি তখন কি হয়?’

সোঁ….করে একটা আওয়াজ হয়েই সব চুপ চাপ হয়ে গেলো আবার।

‘কি রে? এখন আবার কি হ’লো?’

‘কিছু ভালো বুঝছি না আমি, সর্দার। তবে মনে হয় এই রেডিয়েটর ও কাজ করছে না’।

‘সে কি রে? এই দোকানঘরে কি ভূত আছে? এই সব অত্যাধুনিক আর ভয়ংকর যন্ত্র অকেজো হয় কি করে?’

‘মনে হয় কোন লোকাল ট্রান্সফর্মার দিয়ে কেউ সুপার স্ট্রং ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরী করে রেখেছে এই দোকানঘরে। এখন আমাদের পক্ষে ওই হীরেগুলোকে হাতানো হচ্ছে এক অসম্ভব ব্যাপার’।

‘কভি নেহী। আমি হার মানবার পাত্র নই এতো সহজে। তুই চালা আমাদের শোষক যন্ত্র হীরে গুলোর সামনে। দরজা খোলা…..সব গুলোকে টেনে নে। ওই ফোর্সফিল্ড কি করে আটকায় দেখি’।

‘চালাবো কি করে? কোন প্লাগ পয়েন্টই তো দেখছি না এই ঘরে। সর্দার, এটা কোন আমাদের জন্য তৈরী কোন ফাঁদ নয়তো?’

‘যা ইচ্ছে হয় হোক। কুছ পরোয়া নেই। তুই ব্যাটারী মোডে চলে যা। অ্যাবজর্ভার স্টার্ট কর…..’

‘ও সর্দার। এই ঘরে হঠাৎ এতো ঠান্ডা বাড়ছে কেন বলো তো? এখানে কি এ০সী০ চলছে না কী? আমার তো ঠান্ডায় হাত পা কাঁপছে সর্দার। কিন্তু এ০ সী০ নয় চলছে পুরোদমে কিন্তু তার সঙ্গে যেন দারুণ ভিজেভাব ও বাড়ছে যে। এঃ …এটা কি ভেপার স্প্রেয়ার চলছে না কী? এই সাংঘাতিক জলো ভিজে ঘরে আমাদের ব্যাটারী যে ও দ্রুত ডাউন হয়ে যাচ্ছে মনে হয়। এখন একবার টর্চ জ্বালো তো । আর উপায় নেই। দেখো, টর্চ ও জ্বলে কি না?’

‘না রে। এ তো দেখি জ্বলছেই না। সত্যিই ব্যাটারির কেমিক্যালের দফা গয়া….. ভীষণ হিউমিডিটি……ব্যাটারী ডাউন হতেই পারে…’।

‘সর্বনাশ। সর্দার, এখনি পালাও…’

‘তাই? তবে খোল শাটার….’

‘এই খুলছি… মারো টান হেঁইয়ো ….আরেঃ …আরে ….একী কান্ড? শাটারটা যে আমি তুলতেই পারছি না।‘

‘সে কী রে? সকলে মিলে উঁচু করে তোল শালার শাটারকে। জল্দী কর…’

‘কোনমতেই হচ্ছে না বস। এই শাটারটাকে মনে হয় স্বয়ং হনুমানজী নিজে এসে নীচে থেকে টেনে ধরে রেখেছেন। আমাদের সাধ্য কী যে খুলি? তুমি নিজে ও পারবে না সর্দার.’

‘বেশ….দেখি আমি………………………আরেঃ ….কি সর্বনাশ? তাই তো দেখছি রে। তবে আর কোনই পথ নেই আমাদের সামনে খোলা। এইবার আমাদের শেষ ভরসা। আজ কি ড্রাগনের কপালে ফাঁদে পড়ে মরা লেখা ছিলো? ছোঃ………. এই টিপলুম আমি ইন্টার মলিক্যুলার ট্রান্সমিশন সেটের লাল বোতাম। দেখি কি হয়? ধর সবাই আমার হাত। ভেদ করে চলে যাবো আমরা এই শয়তানের শাটারকে’।

‘ও সর্দার, কই? কিছুই তো হ’লো না যে। তবে তো আমাদের আজ দফা গয়া বলতেই হবে’? ’

‘আরেঃ, সত্যিই তো……….এ কী? অ্যাঁ? ….আমরা শাটার বা দেওয়াল কিছুই যে ভেদ করতে পারছি না। কেন? কেন? সর্দার, শিগ্গীর লি কে এখন তুমি ফোন করো। সে এসে বাঁচাক আমাদের। ইস্স……. এই সব হতচ্ছাড়া বাজে পচা মেশিনের ধাপ্পাবাজিতে না ভূলে আমি অন্তত যদি একখানা শাবল বা দেশী ফরসা বা গাঁইতি ও আনতুম সঙ্গে করে…এই শাটার টিঁকতো……ছিঃ ছিঃ…’

‘আরে, তোরা বলছিস কি তাই তো আমি কিছু বুঝছি না। পরমাণু শক্তিচালিত এই যন্ত্রের সাহায্যে চীনের প্রাচীর ও ভেদ করা যায় কিন্তু এইখানে এই সামান্য একট পচা দোকানঘরের শাটার….’

‘সামান্য নয়, সর্দার। মোটেই সামান্য নয়। আমার সন্দেহ হচ্ছে। ঘোরতর সন্দেহ। তুমি তো জানোই যে কোন সলিডের ইন্টার মলিক্যুলার স্ট্রং ফোর্স কমজোর হয় বৈদ্যুতিক শক্তির ধাক্কাতে। তখন এই ইন্টার মলিক্যুলার ট্রান্সমিশন সহজেই সম্ভব হ’তে পারে…..এখন সেই শক্তি ভালো কাজ করে না একমাত্র কোথাও রেডিও অ্যাক্টিভিট ওয়েভ বা ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফোর্স হঠাৎ করে ভীষণভাবে বেড়ে গেলে। একটা গাইগার কাউন্টার আমাদের সঙ্গে থাকলেই ব্যাপারটা বোঝা ও ধরা যেতো, সর্দার। এই ঘরে হঠাৎ রেডিও অ্যাক্টিভ অ্যাল্ফা, বিটা বা গামা রে আসে কি করে? সর্দার? নাঃ মনে হয় আজ আর আমাদের পরিত্রাণ নেই। আমরা হীরের লোভে হয়তো আজ জব্বর কোন এক বিটকেল ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছি। এই শয়তানী বুদ্ধি ওই ব্যাটা মাথামোটা ধুমসো পুলিশটার বা দারোগাটার হতেই পারে না। সেই কুচুটে শয়তানটাকে একবার হাতে পেলে আমি জ্যান্ত চিবিয়ে খাই। ওঃ….আমাদের পালাবার সব পথই হয়েছে বন্ধ আর তাই সময় শেষ আমাদের। এইবার আর অপেক্ষা না করে তুমি করো ফোন’।

বাধ্য হয়ে ফোন করলো সর্দার।

লি সাড়া দিলো ও ঘটনা শুনে বাছা বাছা খানকতক চৈনিক গালাগালির ঝড় তুললো।

শেষে বললো--‘শালার ইনকম্পিটেন্ট ইন্ডিয়ান…দাঁড়া ….আসছি আমি..’


*******************************************


তারপরে তো লি সমেত সবাইকার ধরা পড়া আর তাদের শ্রীঘর যাত্রার ইতিহাস। অবশ্য লি ছাড়াই।

সে সব আর বলে কি হবে?

লির রিসিভিং কল টেপ করা হ’লো। টাওয়ার লোকেট করে কোন এরিয়া তা জেনে নিয়ে পুলিশ কর্ডন করে ঘিরে ফেললো পুরো এলাকাটাই।

সিআইডি পুলিশ ব্যারিকেটিং করলো দোকানঘরের সামনে

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement