লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৮৪
গল্প/কবিতা: ১৯টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৬৭

বিচারক স্কোরঃ ২.১৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৫ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftক্ষোভ (জানুয়ারী ২০১৪)

চতুর্থ সূত্র
ক্ষোভ

সংখ্যা

মোট ভোট ২০ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৬৭

মনোয়ার মোকাররম

comment ১৫  favorite ০  import_contacts ১,৩১০
কিছু একটা যে ঠিকঠাক হয়নি তা আসলাম ঘর থেকে বের হবার পরেই বুঝতে পেরেছে। কিন্তু গোলমালটা ঠিক কি করেছে, কিছুতেই মনে করে উঠতে পারছে না। এই অবস্থাটা হচ্ছে সবচেয়ে যন্ত্রনাদায়ক অবস্থা। আপনি কিছু একটা মনে করতে চাইছেন, কিন্তু মনে করতে পারছেন না, এর চেয়ে বিরক্তিকর পৃথিবীতে আর কিছু নেই। এবং মজার ব্যাপার কি, না ভূল বলা হলো, এতে মজা পাওয়ার মতন কিছু নেই, পুরো ব্যাপারটাই যন্ত্রনা আর বিরক্তি মেশানো। বিরক্তির ব্যাপার হলো, আপনি যত বেশি মনে করার চেষ্টা করবেন, আপনার মাথায় তত বেশি জট পাকাতে শুরু করবে। মনে হবে আপনি সব কিছু খুব দ্রুত ভুলে যাচ্ছেন । আপনার কিছু মনে পড়ছে না। গতকাল ডিনারে কি খেয়েছেন, তা মনে পড়ছে না। সকালে কি দিয়ে নাশতা করেছেন, তা মনে করতে পারছেন না, কোথায় যাচ্ছেন, সেটাও মনে পড়ছে না। আসলামেরও প্রায়ই এমন হয়। এসব ক্ষেত্রে বুদ্ধিমানেরা যেটা করে, তা হলো, চিন্তা ভাবনাকে অন্য দিকে ডাইভার্ট করে ফেলে। আসলাম বুদ্ধিমান মানুষ। যদিও নন্দিতার বিবেচনায়, সে এই পৃথিবীর অন্যতম বোকা মানুষদের একজন। এই পৃথিবীতে যদি বোকাদের কোন প্রতিযোগিতা হয়, তাহলে নন্দিতার ধারনা আসলাম বিনা প্রতিদ্বন্দীতায় ফার্স্ট প্রাইজ জিতে নিবে। নন্দিতার আরেকটি ধারনা, আসলামের এই নির্বুদ্ধিতার জন্যেই সে আসলামের প্রেমে পড়েছে। তা না হলে, আসলামের মধ্যে প্রেমে পরার মত কিছু নেই। নাটক-সিনেমায়, মেয়েরা বুদ্ধিমান, স্মার্ট ছেলেদের প্রেমে পড়লেও বাস্তবে নন্দিতার বিশ্বাস, মেয়েরা আসলে ছাগল টাইপের ছেলেদের প্রেমে পড়তে বেশি উৎসাহ বোধ করে। চুম্বক যেমন লোহা টানে, আগুন যেমন পতঙ্গ টানে, তেমনি ছাগল টাইপ ছেলেরা টানে সুন্দরী মেয়েদের। নন্দিতার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। আসলাম অবশ্য এসব কথায় কিছু মনে করে না। বুদ্ধিমান লোকেরা মেয়েদের আবোল তাবোল কথায় কিছু মনে করে না বলেই আসলামের ধারনা। তবে ছাগল শব্দটার বেলায় সে একটু অস্বস্তি বোধ করে। ছাগলের খাবার চিবানোর ভঙ্গীটা তার একদমই পছন্দ নয় ।



আসলাম তাই বুদ্ধি করে তার চিন্তা ভাবনা অন্য দিকে সরানোর চেষ্টা করলো। তখন দেখা যাবে হুট করে মনে পড়ে গেছে। এটা একদম পরীক্ষিত ফর্মুলা। আসলাম এর আগেও অনেকবার এর প্রমাণ পেয়েছে। আসলামের সবকিছুই একেবারে নিয়মে বাধা, ছকে সাজানো। সকালে ঘুম থেকে উঠে দাত ব্রাশ, তারপর বাথরুম, তারপর শেভ, তারপর গোসল, তারপর খাওয়া, তারপর জামা কাপড় পড়া, তারপর ব্যাগ গোছানো, তারপর বেরিয়ে যাওয়া। সবকিছু অর্ডারলি সাজানো। তারপরও মাঝে মাঝে নিয়মের উলটপালট হয়। যেমন একবার বেল্ট না পড়েই বেরিয়ে গিয়েছিল। অফিসে গিয়ে খেয়াল পড়লো, তাও দুপুরের দিকে, যখন পেটের খাবার হজম হয়ে গিয়ে প্যান্টটা লুজ হতে শুরু করেছে। অফিসের পাশেই বায়তুল মোকাররম মার্কেট, একটা বেল্ট কিনে নিয়ে আসবে কিনা এই যখন ভাবছে, তখনি অফিসের পিওন মহসিন এসে জানালো, বস ডাকে। বস যখন ডাকে তখন তাদের পেটের ভিতর ডাকা ডাকি শুরু হয়ে যায়। তার উপর আবার বেল্ট ছাড়া এসেছে, যদি চোখে পড়ে তাহলে আর রক্ষা নাই। বসের চোখে পড়বেনা তা হয় না। ঠিকই চোখে পড়লো, আর এ নিয়েই তাকে মোটামুটি আধ ঘণ্টার একটা লেকচার দিয়ে দিল। তার লজ্জার অন্ত রইলো না। কর্পোরেট অফিসের চাকুরী, সব সময় একটা কেতা দুরস্ত ভাব রেখে চলা চাই। আরেকদিন তো প্রায় একটা কেলেংকারি হয়ে গিয়েছিলো। অফিসে যাওয়ার পর বোঝা গেলো সে আসলে বক্সার না পড়েই চলে এসেছে। চিন্তা করা যায়! তারপর নিজেই অফিসের পাশের মার্কেটে গিয়ে কিনে নিয়ে আসলো। খুবই লজ্জার ব্যাপার। সে যে এতো রুটিন মেনে চলে, তবু মাঝে মাঝে এরকম হয়ে যায়। যেমন আজকেও হয়ে গেলো। সে দাত ব্রাশ না করেই চলে এসেছে। ভূলটা হয়েছে আসলে প্রথমেই বাথরুমে চলে যাওয়াতে। আসলে কিছু করারও ছিল না। মাঝে মাঝে এরকম হয়ে যায়। তারপর শেভ, গোসল, সবকিছুই হলো। শুধু দাত ব্রাশটাই হলো না। এতক্ষনে মনে পড়েছে! মাথাটা একটু ফাকা ফাকা লাগছে এতক্ষনে। তবু, মনের ভিতরে খচখচানি লেগেই আছে। সকালে নন্দিতার সাথে একচোট হয়েছে। এটা অবশ্য নতুন কিছু নয় । বিয়ের পর থেকেই এমন হচ্ছে। ছোট খাট জিনিস নিয়েই হয়। পরে অবশ্য ঘটনা আর ছোট থাকে না। আমলকি থেকে জাম্বুরা হয়ে যায়।



আজকে যেমন হলো, আসলাম বের হয়ে যাবে, নন্দিতাকে ডাকলো।


- নন্দিতা আমি যাচ্ছি।


- একটু দাঁড়াও, তোমার খাবারের বক্সটা দিয়ে দেই।


-এখনো দাওনি। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছি। অলরেডি, সাড়ে আটটা বাজে !


- আরে বাবা, এইতো হয়ে গেলো। তোমার জন্যে একটা স্পেশাল ডিশ বানাচ্ছিলাম, তাতেই একটু লেট হয়ে গেলো


- তোমাকে কতবার বলেছি, সকাল বেলা তোমার স্পেশাল ডিশ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার দরকার দেখিনা।


- রেগে যাচ্ছ কেন? তোমার জন্যেই তো করি। অফিসে একটু ভালো মন্দ খাবে!


- হ্যা, তবে এগুলোর সাথে আমাকে প্রতি দিন বসের ঝাড়িও খেতে হয়। ঐ ঝাড়ির স্বাদ কেমন তাতো আর তুমি জান না।


- তুমি এমন চিৎকার করে কথা বলছ কেন?


- আমি মোটেও চিৎকার করে কথা বলছি না। আমার গলার কর্ড এমনিতেই একটু চড়া । প্রতি দিন অফিসে যাওয়ার সময় তোমার এই আহলাদের জন্য আমাকে অফিসে গিয়ে মূল্য দিতে হয়।


- আমি আহলাদ করি?


- তা নয় তো কি? তুমি জান এসব ন্যাকামি আমার একদম ভালো লাগে না। যত্তসব।



এসব ক্ষেত্রে প্রায়ই নন্দিতা একটা সময়ে রণে ভঙ্গ দিয়ে তার চোখের নদীতে জোয়ার বইয়ে দেয়। আজকেও তাই হয়েছে। চক্ষু নদীর জোয়ারে, খাবার ছাড়াই আসলামকে বের হতে হয়েছে।



সেটা কোন সমস্যা নয় । এসব ক্ষেত্রে ঝামেলা যেটা হয়, অফিস থেকে বাসায় ফিরে দেখে নন্দিতা বাসায় নেই। চিঠি লিখে যায়,



আসলাম,


তোমার সোনার জীবন আমি তামা তামা করে দিলাম। তুমি তোমার রঙ্গীন জীবন নিয়ে থাকো। আমার ন্যাকা কথা তোমাকে আর শুনতে হবে না।


ইতি, নন্দিতা



চিঠির ভাষা যতটা সিরিয়াস মনে হচ্ছে, ব্যাপার আসলে ততটা সিরিয়াস না। রাতে এসে একটা ফোন দিবে আসলাম। কথা বলার সময়ে একটু কাশবে। নন্দিতা জিজ্ঞেস করবে,


- তোমার কি শরীর খারাপ, কাশছ কেন?


- হ্যা, শরীরটা একটু খারাপ লাগছে, কেমন যেন জ্বর জ্বর লাগছে।


ব্যাস, আধা ঘণ্টার মধ্যে নন্দিতা হাজির। আসলাম মাঝে মাঝে ভাবে, সে নিজে নন্দিতাদের বাসায় গিয়ে নিয়ে আসলেও পারে। কিন্তু নন্দিতার বড় ভাইয়ের জন্যে যেতে চায় না। এই লোক রসিকতা ছাড়া কিছু বুঝে না। আসলাম রসিকতা একদমই পছন্দ করে না। রসিক লোক আসলামের দু চোখের বিষ। তবে আসলাম ভাবছে, আজ নন্দিতাদের বাসায় যাবে। প্রয়োজনে নন্দিতার বড় ভাইয়ের সাথে দু-একটা রসিকতাও করবে। নন্দিতার জন্যে একটু আধটু রসিকতা আসলাম করতেই পারে।



ভাবতে ভাবতে আসলাম বাসস্ট্যান্ডের কাছে চলে এল। সে রিকশায় করে মতিঝিল যাবে। মতিঝিলে ব্যাংক এশিয়ার লোকাল অফিসে সে সিনিয়র অফিসার। বাসে করে সে যেতে পারে না। বাসের ভেতর তার দম বন্ধ লাগে। তাছাড়া কত রকমের মানুষ বাসের ভেতর চড়ে তার কোন ঠিক নেই। একবার, সে বাসের সামনের দিকে একটা সিটে বসেছে, আর তখুনি তার পাশের লোকটা একদম তার ঘাড়ের উপর দিল পরপর দুইটা হাচি। সারাটা দিন আসলামের সারা গা কেমন রি রি করেছে।



একটা রিকশার কাছে গিয়ে, এই রিকশা যাবে, বলে রিকশাওয়ালার দিকে তাকাতেই তার আত্মা ছাড়া হওয়ার অবস্থা হলো। রিকশাওয়ালার নিচের ঠোট নেই, নিচের পাটির দাতগুলি সব ভয়ংকরভাবে বেড়িয়ে আছে। ভয়ংকর দেখাচ্ছে তাকে। আসলাম দ্বিতীয় বার তার দিকে না তাকিয়ে সেখান থেকে সরে এলো।



ওফ! ভয়ংকর অবস্থা! আজকের দিনটা তার জন্যে শুভ মনে হচ্ছে না।



আসলাম রিকশা খুজতে লাগলো। রিকশা খোজার ক্ষেত্রে সে কয়েকটা জিনিস ভালো করে খেয়াল করে যেন কোন রকম ঝামেলা না হয়।



রিকশাওয়ালাকে অবশ্যই বৃদ্ধ, ছোকরা ধরনের বা স্বাস্থহীন হলে চলবে না। এই জাতীয় রিকশাওয়ালারা রিকশা চালাতে গিয়ে অতিরিক্ত পরিশ্রম অনুভব করে এবং এর বিনিময়ে ভাড়া বেশী চায়। এমনকি এদের সাথে যে ভাড়া ঠিক হয়, নামিয়ে দেবার পরে অতিরিক্ত দশ পনের টাকা চেয়ে বসে, বলে, স্যার, মেলা কষ্ট হইসে, কয়টা টাকা বাড়ায়া দেন, স্যার। তখন লাগে একটা ঝামেলা। আসলামের কাছে রিকশাওয়ালাদের চেহারা সুরতও একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। অনেকগুলি রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। কারো কারো বসার ভঙ্গী দেখলে গায়ে জ্বালা ধরে যায়। মনে হয় কৃষ্ণদীপের রাজা হবুচন্দ্র বসে আছেন। কথা বললে এমন ভাব ধরে যেন শুনতেই পায় নি। আসলাম প্রতিদিন রিকশায় যেতে যেতে রিকশাওয়ালাদের সাইকোলজি মোটামুটি বুঝে গিয়েছে। কোন ব্যাটা যাবে না, কোনটা আজগুবি রকমের ভাড়া চাইবে, চেহারা দেখলেই বুঝতে পারে। সব হিসাব নিকাশ করে, সে একজনকে জিজ্ঞেস করলো,



- এই রিকশা যাবে?


- কই যাবেন?


- মতিঝিল।


- মতিঝিল, কোন জায়গায়?


- বিমান ভবনের সামনে।


- যামু


- কত?


- কত দিবেন কন?


- আমি কত দিব এটা দিয়ে তো তুমি যাবানা?


- পইত্তেক দিনতো যান, যা ভাড়া তাই দিবেন।


ব্যাটার মতলব সুবিধার মনে হচ্ছে না। আসলাম কোন ঝামেলায় যেতে চায় না। সে আবার বলে,


- কথা বাড়ায়া লাভ নাই, কততে যাবা বল?


- ৮০ ট্যাকায় যাইবেন?


- সত্তর টাকা যাবা?


- না, পুরা রাস্তা জ্যাম। মেলা সময় লাগব।


- সময় কি তোমার একাই যাবে? আমার সময় যাবে না?


- এত কিছু বুঝি না। গেলে চলেন।



আসলামের মেজাজ আরো খারাপ হতে লাগল। শালার রিকশাওয়ালার মেজাজ দেখলে মাথায় রক্ত উঠে যায়। এদিকে ঘড়ির দিকে তাকায়। আটটা পঞ্চান্ন বাজে। বেশি দরদাম করলে, সময় চলে যাবে। এক ঘণ্টা হাতে আছে। কিছুটা রিস্ক থেকেই যায়। আসলামের বস আবার দশটার অফিস ৯.৩০ টায় এসে বসে থাকে। একটা দিন ভুলেও দেরী হয় না। ব্যাটা কি মানুষ না রোবট, ভেবে পায় না।



আসলাম তাই রিকশায় উঠে পড়ে।



রিকশা চলছে। বেশ দ্রুত গতিতে। কিন্তু খুব একটা খারাপ লাগছে না। রিকশা চালানোর মধ্যেও এক ধরনের শিল্প আছে। কিন্তু বেশিরভাগ চালকই সেটা পারে না। তবে কালে ভদ্রে এরকম এক্সপার্ট দু একজন পাওয়া যায়। এই লোক মনে হচ্ছে সেরকম এক্সপার্ট।



আসলাম তার বিক্ষিপ্ত মনকে ঠান্ডা করার চেষ্টা করলো। নন্দিতাকে নিয়ে ভাবা যাক। নন্দিতাকে নিয়ে ভাবতে তার ভালো লাগে। নন্দিতাকে ভালোবাসতে ভালো লাগে, ঝগড়া করতে আরো বেশি ভালো লাগে। এই জন্যেই বোধ হয় প্রায় প্রতিদিন ঝগড়া হয়। ভালো লাগার প্রতি মানুষ এক ধরনের আকর্ষন অনুভব করে। অফিসে গিয়ে নন্দিতাকে একবার ফোন দিতে হবে। ইচ্ছে করে কিছু কড়া কথা বলতে হবে। তারপর অফিস থেকে একটু আগে বের হয়ে নন্দিতাদের বাসায় চলে যেতে হবে । নন্দিতার জন্যে না হয় একদিন বসের বাকা চাহনী সহ্য করে নিল। অফিসে গিয়ে ফোন দেওয়ায়র পর আসলাম আর নন্দিতার মধ্যে কথোপকথনটা কি রকম হতে পারে তা একটু ভাবতে চেষ্টা করলো আসলাম।


- হ্যালো, কে নন্দিতা


ওপাশ থেকে কোন কথা আসবে না।


- হ্যালো, নন্দিতা, কথা বলছ না কেনো।


- বলো


- কি বলো বলো করছো? এতক্ষণ ধরে চিৎকার করে যাচ্ছি, আর তুমি চুপ করে আছ? (একটু জোরেই বলবে, রাগ দেখিয়ে)


- তুমি আবার চিৎকার করছ!


- তোমাকে তো একবার বলেছি, আমার গলার কর্ড একটু চড়া, বার বার বলতে হয় কেন? তা তুমি কি বাসায় আছো, নাকি তোমার ঐতিহ্য বজায় রেখে বাপের বাড়ি নায়র চলে গিয়েছ?


নন্দিতা হয়তো ফোন রেখে দিবে। ওর আবার যখন তখন ফোন রেখে দেবার অভ্যেস আছে।



নাহ, কথোপকথনটা ভালো হচ্ছে না। একটু নরম সুরে কথা বলতে হবে। নরম সুরে কথা বললে হয়তো বাবার বাড়ি নাও যেতে পারে। অফিসে গিয়েই ফোনটা দিতে হবে এবং অবশ্যই নরম সুরে কথা বলতে হবে। সেক্ষেত্রে নন্দিতা হয়তো তার চিরাচরিত ঐতিহ্য রক্ষা নাও করতে পারে। আর আসলাম অফিস থেকে ঝিগাতলা যাওয়ার ঝামেলাটা থেকে বেচে যাবে। তাই যদি হয়, বাসায় গিয়ে নন্দিতাকে নিয়ে কোন একটা রেস্টুরেন্টে চলে যাবে। তাদের বাসার পাশেই বেশ কয়েকটা মোটামুটি মানের রেস্টুরেন্ট হয়েছে। সেগুলিতে চলে যাবে। নন্দিতার আবার ফ্রাইড চিকেন, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর বরফ মেশানো কোক খুব পছন্দ। আসলামের অবশ্য এসব ভালো লাগে না। রেস্টুরেন্টে বসে এত লোকের সামনে মুরগীর ঠ্যাং চিবানোতে কি মজা তা ভেবে পায় না। কিন্তু নন্দিতার জন্যে একদিন এতটুকু সে করতেই পারে।



দেখতে দেখতে রিকশা চলে এসেছে বিমান অফিসের কাছে।



আসলাম রিকশা থেকে নেমে মানি ব্যাগে হাত দিল। ভাংতি ৮০ টাকা হলে ভালো। ১০০ টাকার নোট দিলেই এরা ঝামেলা শুরু করবে। ১০ টা টাকা বাড়ায়া দেন, মেলা পথ আসছি এরকম হাবিজাবি কথা।



ভাংতি পাওয়া গেলো না। আসলাম ১০০ টাকার নোট বাড়িয়ে দিল। না, রিকশাওয়ালা কিছু বলছে না। তার লুঙ্গির খুট থেকে টাকা বের করছে। বাচা গেলো। এমনিতে ১০ টাকা তেমন কিছু না। কিন্তু প্রতিদিন এরকম আর কত ভালো লাগে। নিয়ম নীতির ব্যাপারে আসলাম আবার আপোষহীন।



রিকশাওয়ালা আসলামের দিকে ১০ টাকার একটা নোট বাড়িয়ে দিল। আসলামের মাথায় রক্ত টগবগ করতে লাগলো। তার আবার অল্পতেই মেজাজ খারাপ হয়ে যায়।



- ১০ টাকা দিলা কেন?


- মামা, ১০ টা টাকা বাড়ায়া নিলাম, মেলা পথ ঘুরে আসলাম, সোজা রাস্তায় আসলে এতক্ষন সায়েদাবাদ বসে থাকা লাগত।


- যে রাস্তা দিয়াই আসো, নামাইস তো বিমান অফিস, নাকি লণ্ডন নামাইস?


- ১০ টাকা বেশি দিয়া লণ্ডন যাইতে চান, মামা?


- আর ১০ টাকা দাও।


আসলাম শান্ত ভাবে বলে। কিন্তু সে মোটেও শান্ত নেই। তার মাথায় আগুন জলছে। ব্যাটার সাহস কত্ত। ১০০ টাকা থেকে বলা নেই, কওয়া নেই, ১০ টাকা বেশি রেখে দিয়েছে। এত বড় মাতব্বর।


- মামা, আর চায়েন না। দেহেন না, ঘাম টপ টপ কইরা পরতাসে।


- তোমার সাথে কথা হইসে ,আশি টাকার। যা খুশি হউক, টাকা দাও।


- মামা, দশ টাকা নিয়া বড়লোক হইয়া যাবেন?


- এতো কথা বলতেসো কেন?


-এতো কথা কই কইলাম।


- আশি টাকার ভাড়া নব্বই টাকা চাইতেসো কেন?


- ১০ টা টেকাই দেখলেন, কত অলিগলি ঘুইরা নিয়া আসলাম, কোন জ্যাম পাইলেন না, এইটা দেখলেন না? নাটক-সিনেমা দেইখা, ফুর্তি কইরা কত টেকা উড়াইয়া দেন, আমগোরে দুই একটা পয়সা দিতে গেলেই আপনেগো কইলজা কাপে।


- তুমি কিন্তু বেশি কথা বলতেসো। আসলাম কন্ঠে উত্তেজনা চরমে উঠে।


- আমি কেমতে বেশি কথা কইলাম। দশটা ট্যাকার লাইগা আপনি যা করতেসেন, আগে জানলে আমিই ১০ ট্যাকা কম লইতাম।


এতটা নেওয়ার জন্যে আসলাম প্রস্তুত ছিল না। এত বড় কথা। আসলাম তার সুবিশাল দেহের সুবিধাটা নিল। অকস্মাত ধাম করে বসিয়ে দিল রিকশাওয়ালার ডান গালে একটা আড়াই সের ওজনের চড়। রিকশাওয়ালা কিছু বুঝে উঠতে পারলা না। সে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকলো। আসলাম কিছুক্ষন তার দিকে চরম রক্তমাখা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থেকে অফিসের সিড়ির দিকে হাটা দিল। তাদের অফিসের দারোয়ান রিকশাওয়ালাকে চরম এক ধমক লাগালো। ঐ ব্যাটা, খাড়াইয়া আছস কেন, যা রাস্তা ক্লিয়ার কর। যেন রিকশাওয়ালা তার পাওনা বুঝে গিয়েছে, এখন আর অপেক্ষা কিসের।



যেতে যেতে আসলাম ভাবল, উচিৎ কাজ হয়েছে। এদেরকে প্রশ্রয় দেয়া একদম ঠিক না। ব্যাটা নিশ্চয়ই চোখে সর্ষে ফুল দেখছে। কানে তবদা লেগে যাওয়ার কথা, নাক কান দিয়ে নিশ্চয় গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে!



হঠাৎ আসলামের কাছে নিজেকে কেমন যেন নির্ভার লাগছে। হতে পারে তার সমস্ত ভার, থাপ্পরের সাথে সাথে রিকশাওয়ালার উপর চাপিয়ে দিয়েছে। আগের দিনের কিছু পেন্ডিং কাজ ছিলো, সেগুলি চট জলদি সেরে নিলো। ঘড়ির দিকে তাকালো। সাড়ে এগারোটা বাজে। নন্দিতাকে একটা ফোন দিতে হবে। টেলিফোনটা কাছে টেনে আনলো।


- হ্যালো, নন্দিতা?


ওপাশ থেকে কোন কথা আসছে না ? যা ভেবে ছিল তাই!


- হ্যালো, নন্দিতা চুপ করে আছ কেন? আমার অফিসে অনেক কাজ। তার মধ্যে সময় বের করে তোমাকে ফোন দিয়েছি। চুপ করে থেকো না, প্লিজ।


কোন কথা নেই। বেশ কিছুক্ষন এমন হোল। বোঝা গেলো নেটওয়ার্কে সমস্যা। তার অফিসে নেট ওয়ার্কে প্রায়ই সমস্যা হয়। গ্রামীন ফোনকে জানানোও হয়েছে। তারা বলেছে ব্যবস্থা নেবে।



আসলাম ফোন রেখে কম্পিউটারের দিকে ঝুকলো। একটা চিঠি ড্রাফট করতে দিয়েছিলো তার বস। যেকোন সময় চলে আসতে পারে। এটা করে ফেলা উচিৎ। তারপর আবার নন্দিতাকে একটা ফোন দিবে।



ভাবতে না ভবতেই আসলামের বস চলে এলো, সরাসরি তার রুমে। উনি প্রায়ই এমন চলে আসেন। সবাইকে একটু ভয়ে রাখার কৌশল আর কি। আসলাম দাঁড়িয়ে গেলো। কিন্তু বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলো, তার বস অবিরাম ঠোট নেড়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছে না। ঘটনা কি, তার বস তো রসিকতা করার লোক না। আসলাম কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। হঠাৎ তার মনে হলো, তার কান দিয়ে কেমন যেন গরম ধোঁয়া বের হবার মত লাগছে, একটা কেমন যেন শোঁ শোঁ আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে। আসলাম এখন পরিস্কার বুঝতে পারছে তার কানে তবদা লেগে আছে। আসলেই কি তাই। সে কি আরেকবার নন্দিতাকে ফোন করবে। এবার নিশ্চয় নন্দিতা সাড়া দিবে, এবার নিশ্চয় নন্দিতার কন্ঠ শুনতে পাবে সে। সে তাড়াতাড়ি ফোনটা কাছে টেনে নিল। ওদিকে তার বসের ঠোট নাড়া বন্ধ হয়েছে। তিনি তার ছোট ছোট চোখ গোল গোল করে আসলামের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার চোখে এক ধরনের বিস্ময় খেলা করছে। তার চেয়েও বেশি বিস্ময় আসলামের চোখে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement