লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৮৪
গল্প/কবিতা: ১৯টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৬৮

বিচারক স্কোরঃ ৩.৬৯ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৯৯ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftঈর্ষা (জানুয়ারী ২০১৩)

দেখতে তোমায় পাইনি
ঈর্ষা

সংখ্যা

মোট ভোট ৫৩ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৬৮

মনোয়ার মোকাররম

comment ৫২  favorite ৫  import_contacts ২,৪০৩
কায়সারের সাথে নীরার পরিচয় বছর খানেক আগে। নীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে পড়ছে, ২য় বর্ষে। নীরার বছর দুই-এর ছোট মিলির জন্যে একজন টিউটর দরকার। মিলি ইডেনে অর্থনীতি বিভাগে পড়ছে, প্রথম বর্ষে। যতটা আগ্রহ করে ইকোনোমিক্স নিয়েছিল, ক্লাশ শুরুর পর সেই আগ্রহ আর থাকল না। জটিল সব অংকে ঠাসা এক সাবজেক্ট। ক্যালকুলাস, ম্যাট্রিক্স, ইন্টিগ্রেশন আরো কত কি।

অগত্যা মিলির বাবা, আনোয়ার সাহেব একজন টিউটর খুজে বের করলেন। কায়সার তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করছে। সপ্তাহে তিনদিন সে মিলিকে ইকোনোমিক্স পড়ায়।

প্রথম যেদিন কায়সারের সাথে নীরার দেখা হয়, সেদিনের কথা মনে পড়লে নীরার এখনো বেশ হাসি পায়। নীরাদের বাড়িতে কায়সারের প্রথম দিন, কোন এক শুক্রবার, বিকেল বেলা।

নীরা দেখল, ড্রয়িং রুমে বসে আছে অসম্ভব মায়াময় চেহারার একটি ছেলে, বেশ জড়সড়। ছেলেদের চেহারায় মায়া নিয়ে সাধারনত কেউ মাথা ঘামায় না। পৃথিবীর সব মায়া সম্ভবত মেয়েদের জন্যে সংরক্ষিত। তাইতো মায়াবতী শব্দটাও মেয়েদের জন্যে সংরক্ষিত। তবে কালে ভদ্রে বিধাতা দু-একজন ছেলের চেহারায় মায়াবর্ষন করেন। কায়সারকে দেখে নীরার মনে হল এই ছেলেটি পৃথিবীর সৌভাগ্যবান সেই দু-একজনের একজন। কিন্তু আর সবার মতন নীরাও ছেলেদের মায়াময় চেহারা নিয়ে মাথা ঘামায় না। মায়া হচ্ছে মেয়েদের ভূষণ, ছেলেদের নয়।

আনোয়ার সাহেব মোটামুটি রসিক টাইপের মানুষ। জীবনের সব কিছুতেই তিনি রোমাঞ্চ খুজে বেড়ান। পরিচয় পর্বেও তিনি কিছুটা রোমাঞ্চ আনার চেষ্টা করলেন।

তিনি বললেন, শোন কায়সার, সামনে যে অতি রূপবতী Old Lady বসে আছেন, বুঝতেই পারছো, তিনি আমার সহধর্মিনী। অতি রূপবতী Old Lady খুশি হলেন কি দুঃখ পেলেন বোঝা গেল না। মনে হয় খুশীই হয়েছেন। আনোয়ার সাহেব সময় সুযোগ পেলেই তাকে বৃদ্ধ মহিলা বলে যে বিশেষ সুখানুভূতি লাভ করেন তাতে তিনি কিছু মনে করেন না। বরং আনন্দই পান। রূপবতী বৃদ্ধ মহিলার আবার অল্পতেই আনন্দিত হবার অসুখ আছে।

আনোয়ার সাহেব বলতে থাকলেন, আর এই যে দুই পাশে দুই অতি রুপবতী বালিকা বসে আছে এরা হচ্ছে আমার দুই মেয়ে, মিলি আর নীরা। এর মধ্যে একজন তোমার ছাত্রী, নাম মিলি। আর একজন সেই ছাত্রীর বোন, নীরা। এবার তোমার জন্যে Puzzle, বল কে নীরা আর কে মিলি?

কায়সার এর জন্যে প্রস্তুত ছিলনা।

অপ্রস্তুত অবস্থায় বেশির ভাগ মানুষের মস্তিষ্ক ঠিক মত কাজ করে না। মানুষের মস্তিষ্ক তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে ধারনা নেয় এবং সে অনুযায়ী তার কর্মপরিকল্পনার একটা এলগরিদম ঠিক করে নেয়। যখনি তার ধারনার চেয়ে পারিপার্শ্বিক অবস্থা ভিন্ন রকম হয়, তার অ্যালগরিদমে সাময়িক জটিলতা দেখা দেয়।

কায়সারের মস্তিষ্কের অ্যালগরিদমে কিছু উলট-পালট হয়েছে। মস্তিষ্কের জটিলতা দ্রুত শরীরের বাহ্যিক অংশে ছড়িয়ে পড়ে। কায়সারের মুখের রঙ অতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে লাগলো। নাকের অগ্রভাগে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। নীরার একবার ইচ্ছে হল কায়সারের কানের কাছে হাত নিয়ে দেখে তার কান দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে কিনা। সে চাইলেই এটা করতে পারে। সে বড় বিপদজনক মেয়ে এবং অবশ্যই অতি নির্লজ্জ ধরনের মেয়ে। তা অবশ্য সে করল না। তবে অনুমান করলো, হয়তো ধোঁয়া বের হচ্ছে। যদিও ধোঁয়া বের হওয়ার মত কোন ঘটনাই ঘটেনি।

কায়সার কিছুক্ষন চুপ করে বসে রইল। কিন্তু মস্তিষ্ক চুপ করে বসে থাকার বস্তু নয়। মানুষের মস্তিষ্ক সব সময় সচল থাকে। ঘুমের সময় সচল থাকে, এমনকি মৃত্যুর সময় নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও কয়েক মিনিটের জন্যে সচল থাকে। কায়সারের মস্তিষ্ক নিশ্চয় Puzzle সমাধানের জন্যে কোন অ্যালগরিদম তৈরী করছিল।

যেহেতু কায়সার Economics-এর ছাত্র, সুতরাং তার মস্তিষ্কও Economics-এর ছাত্র। সে কি Probability বা সম্ভাব্যতার অংক কষছিল? দুইজন মেয়ে। তাদের মধ্যে একজনের মিলি হবার সম্ভাবনা ১/২ । অর্থাৎ সে যদি আন্দাজে বলে দেয় তাহলে তার অনুমান সত্যি হবার সম্ভাবনা শতকরা ৫০ ভাগ। কিংবা তার মস্তিষ্ক হয়তো ছোটবেলার মতন চোর-পুলিশ খেলা খেলছে। সে পুলিশ, চোরের নাম মিলি। অবু ১০, ২০, ৩০, ৪০, ........., ১০০। ১০০ যার উপর পড়বে, সেই চোর সাব্যস্ত হবে। সে হবে মিলি।

কায়সার মেধাবী ছেলে। মেধাবী ছেলের মস্তিষ্ক Probability’র অংক করুক আর চোর-পুলিশ খেলা খেলুক, রহস্য উদ্ঘাটন করবে।

কায়সার একজনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, তুমি মিলি।

নীরা বলল, আমি দু;খিত। আপনার অনুমান কিঞ্চিৎ ভুল হয়েছে। আমি মিলি নই, নীরা।

কায়সার কিছু বললো না। সে দক্ষ পুলিশ অফিসার না এটা বোঝা গেলো। তার নাকের লাল রঙ আরেকটু গাঢ় হলো।

আনোয়ার সাহেবকে উৎফুল্ল দেখালো। মানুষের ব্যর্থতায় মানুষ বড় আনন্দ পায়। তিনিও বেশ আনন্দ পেয়েছেন বোঝা যাচ্ছে। কায়সারের ব্যর্থতায় তার Puzzle-এর গুরুত্ব বেড়েছে। কায়সার Puzzle-এর সমাধান দিয়ে দিলে এটা গুরুত্ব হারাতো। ব্যর্থতা, লক্ষ্যের গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়।

আলাপচারিতা শেষে নীরার মা-বাবা চলে গেলেন, নীরা আরো কিছুক্ষন থাকল।

কায়সার মিলির বই-পত্র নাড়াচাড়ায় মন দিল।

নীরা কিছুক্ষন চুপ করে বসে থাকল। তারপর কায়সারকে উদ্দেশ্য করে বলল,

- আপনার কি শরীর খারাপ?

- কই নাতো, শরীর ঠিক আছে, কায়সার কোনরকমে বলল।

- তাহলে আপনি এরকম করে ঘামছেন কেন?

- কই, আসলে গরম অনেক বেশি পড়েছেতো তাই।

নীরা বুঝতে পারছে কায়সারের অপ্রস্তুত অবস্থা। তার উচিৎ এখান থেকে চলে যাওয়া। কিন্তু তার যেতে ইচ্ছে করছে না। তার ইচ্ছে করছে, কায়সারকে আরেকটু অপ্রস্তুত করে দিতে। সে বড় বিপদজনক মেয়ে।

- তাই? গতকাল তো সারা দিন বৃষ্টি হলো। আজও সকাল বেলা বৃষ্টি হয়েছে। আমাদের তো বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে। তাই ফ্যান বন্ধ আছে। ফ্যান ছেড়ে দেব?

কায়সার শুধু বলেছিল, আমি এক গ্লাস পানি খাব।

নীরা এবং মিলি একসঙ্গে হেসে ফেলল। মিলি হাসতে চায়নি, তবু হাসি চলে এলো।

নাটক, সিনেমা কিংবা গল্প-উপন্যাসে এরকম অবস্থায় অনেক কিছুই হয়। কিন্তু নীরার কিছু হয়েছে বলে মনে হলো না। নীরা বুঝে গিয়েছিল কায়সার অসম্ভব অন্তর্মূখী একটা ছেলে। এ ধরনের ছেলে নীরার একদমই পছন্দ না। ছেলেরা হবে ছেলেদের মত। মিনমিনে স্বভাবের ছেলে নীরার একদমই অপছন্দ ।

পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘুরছে। পৃথিবীর কোন ক্লান্তি নেই। সে তার মত করে ঘুরছে তো ঘুরছেই। তাই সময়ও তার আপন গতিতে চলছে। কারো কোন ক্লান্তি নেই।

কায়সারের মাস্টার্স শেষ হল। একটা প্রাইভেট ব্যাংকে মোটা বেতনে তার চাকুরীও হয়ে গেলো। একদিন সে জানালো, তার পক্ষে আর মিলিকে পড়ানো সম্ভব হবে না। তবে মিলির এক্সাম শেষ হতে আর যে কটা দিন আছে সে কটা দিন সে থাকবে।

মিলির এক্সাম শেষ হল। কায়সারেরও এ বাড়ীতে আসা বন্ধ হল।

পৃথিবী তার মত করেই ঘুরছিল।

একদিন নীরার মা নীরাকে পাশে ডেকে বসালেন।

- নীরা মা। একটু পাশে এসে বোস। তোরা বোন দুটি আজকাল আমার কাছে আসিসই না। তোরা কি এমন বড় হয়েছিস যে এখুনি দূরে দূরে থাকতে হবে?
- মা, কি বলতে চাইছ বলে ফেল। তুমি ভালো করেই জানো ঘুরিয়ে-প্যাচিয়ে কথা বলা আমার একদম পছন্দ না।
- কায়সারকে তোর কেমন লাগে?
- কোন কায়সার? প্রশ্নটা করার পরপরই অবশ্য নীরার মনে পড়ল কায়সারের কথা। এত তাড়াতাড়ি কায়সারকে ভুলে যাওয়ার কথা না। তার মায়ের উদ্দেশ্যও বুঝতে পারল। কয়েকদিন ধরেই নীরার বিয়ের ব্যাপারে কথাবার্তা হচ্ছে। দু-এক জায়গা থেকে প্রস্তাবও এসেছে।
- মা, তোমরা কি কায়সার ভাই-এর সাথে আমার বিয়ের কথা ভাবছ নাকি? তোমাদের কি কায়সার ভাইকে খুব পছন্দ?
- শুধু আমাদের পছন্দ হলেই তো হবে না? তোর মতটাই আসল।
- আমি যদি বলি কায়সার ভাইকে আমার পছন্দ না, তাহলে?
- পছন্দ না হলে আমরা কথা বলবনা।
- বাবারও কি এ বিষয়ে মত আছে?
- তোর বাবাই আমাকে তোর সাথে কথা বলতে বলেছেন। তুই রাজি থাকলে উনি কায়সারের সাথে কথা বলবেন।
- প্রস্তাব কি কায়সার ভাইদের কাছ থেকে এসেছে?
- না, তোর বাবা কায়সারের কাছে কথাটা তুলেছিলেন। কায়সারের সাথে তোর বাবার ভালই যোগাযোগ আছে। তোর বাবা-ই যোগাযোগ রেখেছেন। সত্যি বলতে কি, কায়সারকে শুরু থেকেই তোর বাবার খুব পছন্দ। কায়সারেরও কোন আপত্তি নেই। শুধু বলেছে তার বাবা-মার সাথে কথা বলতে হবে। তাদের তো আপত্তি করার কোন কারন দেখিনা।
- মা, আমি দুঃখিত যে, আমার আপত্তি আছে। কায়সার ভাইকে আমার মোটেই পছন্দ না। কায়সার ভাই হচ্ছে গোবেচারা টাইপের লোক। লজ্জাবতী গাছ, মানুষের স্পর্শ পেলেই তিনি চুপসে যান। এ ধরনের ছেলে আমার পছন্দ না। মেয়েদের সামনে বসলে ওনার শরীর ঘামতে থাকে। মনে হয় উনার ১০৫ ডিগ্রী জ্বর ছিল। এই মাত্র ঘাম দিয়ে জ্বর নামল।
- কোন ধরনের ছেলে তোর পছন্দ? যারা মেয়েদের দেখলেই আদেখলাপনার মত গল্প জুড়ে দেয়, তেমন ছেলে?
- ঠিক ধরেছ মা, তেমন ছেলেই আমার পছন্দ। যে ছেলে সারাক্ষন আমার পিছে ঘুরঘুর করবে। কায়সার ভাই, ঠিকমত কোনদিন আমার হাত ধরবেন কিনা তা নিয়েই আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। মা, তুমি এক কাজ কর, কায়সার ভাই-এর সাথে মিলির বিয়ে দিয়ে দাও। ছাত্রী-শিক্ষকের সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীতে মোড় নেবে, ব্যাপারটা ভাবতেই কেমন একটা থ্রিল আসছে, বাবা খুব খুশি হবে। আর তুমি বিনে পয়সায় তোমার মেয়ের জন্যে একজন টিউটরও পেয়ে যাবে। কিরে মিলি, বিয়ে করবি কায়সার ভাইকে?

মিলি বলল, আপা, কায়সার ভাই মানুষটাকে কিন্তু আমার বেশ ভালোই লাগে। এ জাতীয় মানুষগুলো কিন্তু বৌ-এর খুব ভক্ত হয়। আমাকে বললে কিন্তু আমি দুই পায়ে খাড়া।

নীরা উঠে চলে গেলো।

জাহানারা বেগম মেয়েদের এই নির্লজ্জ আচরনে খুবই হতাশ হলেন। এই মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি চিন্তিত। এই মেয়েদের স্বামীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি আরো বেশী চিন্তিত হলেন।

কায়সার ছেলেটাকে জাহানারা বেগমের খুবই পছন্দ। ছেলেটা খুবই সহজ সরল। আজকালকার যুগে এতো ভাল ছেলে খুব একটা দেখা যায়না। দেখলেই কেমন যেন মায়া মায়া লাগে। তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। কেমন যেন নিজের ছেলের মত মনে হয়।

এমন সময় নীরা আবার ঘরে ঢুকল।

মা, আমার মনে হয়, কায়সার ভাইকে আমার বিয়ে করে ফেলাটাই ঠিক হবে। উনি না হয় কখনো আমার দিকে চোখ তুলে তাকাবেন না, আমার হাত ধরবেন না, তাতে কি, আমিই না হয় সারাজীবন উনার হাত দুটি শক্ত করে ধরে রাখবো, উনার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকবো। উনার চেহারার মধ্যে কেমন যেন একটা মায়া মায়া ভাব আছে, কেমন যেন শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে, তাইনা মা?

নীরা আগের মতই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। জাহানার বেগম অপলক চোখে তাকিয়ে আছেন মেয়ের দিকে। তার এই মেয়েটি বড়ই ভাল। তার চোখে পানি চলে এলো। অল্পতেই তার চোখে পানি চলে আসে।

মিলি দুঃখ পেল কিনা বোঝা গেলো না ।


অনেকটা তড়িঘরি করেই নীরার পানচিনি, মানে এনগেজমেন্ট হয়ে গেলো। তেমন ঘটা করে কিছুই হলো না। দুই পক্ষের কিছু লোকজন এলো। বিয়ের একটা দিনক্ষন নির্ধারিত হলো। নভেম্বরের ১২ তারিখে নীরা আর কায়সারের বিয়ে।

সব কিছুই যেন স্বপ্নের মত লাগলো নীরার কাছে। হঠাৎ হঠাৎ মনে হতো বুঝি সত্যি সে স্বপ্ন দেখছে। ঘুম ভেঙ্গে গেলেই তার স্বপ্ন শেষ। কায়সার তার কাছ থেকে অনেক দূরে চলে যাবে। কায়সারের জন্যে এতো ভালোবাসা তার অন্তরে লুকানো ছিল, আগে কেন সে বুঝেনি?

নীরা খুব ছেলে মানুষী একটা কাণ্ড করল। ক্যালেন্ডারের পাতায় সেপ্টেম্বরের ০২ তারিখের ঘরে সবুজ কালি দিয়ে একটা বৃত্ত একে দিল। আর একটা আঁকল নভেম্বরের ১২ তারিখের ঘরে। মাঝখানে ৭০ টি দিন। তার কাছে মনে হল ৭০ টি বছর।

প্রতিদিন একটি করে তারিখের ঘরে একটি করে ক্রস চিহ্ন একে দেয়। প্রথম দিকে মনে হতো সময় যেন যাচ্ছে না। ঘড়ির সেকেন্ডের কাটা, মিনিটের কাটা, ঘন্টার কাটা, সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত সবকিছুই কেমন যেন গতি কমিয়ে দিয়েছে। আহ্নিক গতি, বার্ষিক গতির সিস্টেমে কোন গোলমাল হয়েছে নিশ্চয়ই। পৃথিবী ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে গেছে। তার মেজাজ খারাপ হতো। আর হাসি পেত।

কিন্তু সময় থেমে থাকে না। সেকেন্ড, মিনিট আর ঘন্টার কাটাগুলো তাদের অসহ্য রকমের ধীর গতি নিয়েও ৬৩ টি দিন পার করে দিল। আর মাত্র ৭ টি দিন বাকী। আর ৭ দিন পরে কায়সারের হাত দুটি ধরে কায়সারের মায়াময় মুখের দিকে দুচোখ ভরে তাকিয়ে থাকতে নীরার আর কোন বাধাই থাকবে না।

আর মাত্র ০৭ টি দিন পার হলেই , কায়সারের সাথে নীরার বিয়ে হয়ে যাবে। কায়সার, নীরার হয়ে যাবে।

নীরা ঠিক করলো, কায়সারকে একটা চিঠি লিখবে। ফোন-ইমেইলের যুগে চিঠি অনেক আগেই যাদুঘরে গেছে। কিন্তু সে আজ একটা চিঠি লিখবে কায়সারকে। কি লিখবে নীরা। নীরা কাগজ কলম নিয়ে বসে অনেক কাটাকুটি করে যা লিখল, তা হলঃ

কায়সার ভাই,

আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে বিয়ের দিন কি আপনি আমার হাত ধরবেন। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, আপনি আমার হাত ধরতে খুব লজ্জা পাবেন। আমার কোন লজ্জা শরম নেই। আমি একটা নির্লজ্জ মেয়ে। আমি সারাক্ষন আপনার হাত দুটি শক্ত করে ধরে রাখব। আপনার কি কোন আপত্তি আছে ?

নাহ, এটা কোন চিঠি হলো? কায়সার ভাববে, নীরা সত্যি সত্যি একটা নির্লজ্জ মেয়ে। তাছাড়া কায়সারকে ভাই বলতে কেমন যেন লজ্জা লাগছে। আবার শুধু কায়সার বলতেও লজ্জা লাগছে। নীরা ঠিক করল, শাদা কাগজে কোন সম্বোধন ছাড়াই লিখবে,

আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে
দেখতে তোমায় পাইনি
আমি দেখতে তোমায় পাইনি।

কায়সারের জন্যে এতো ভালোবাসা সে কোথায় লুকিয়ে রেখেছিল? নির্বাক লুকানো প্রণয় কখনো কখনো সবাক প্রণয়ের চাইতেও মধুর হয়।

কায়সারের জন্যে নীরার লুকানো ভালোবাসা, লুকানোই থাকলো।

হঠাৎ সেদিন বিকেলে কায়সারের বাবা ফোন করলেন আনোয়ার সাহেবকে। অতি শান্ত গলায় তিনি যে কথাটি বললেন তা পুরো পরিবারটিকে মুহূর্তের মধ্যে অশান্ত করে দিল। সব হিসাব নিকাশ যেন এক পলকে বদলে দিল একটি মাত্র ফোনকল।

নীরার সাথে তারা কায়সারের বিয়ে দিচ্ছেন না। ভদ্রভাবে বললে বলা যায়, দিতে পারছেন না।

নীরার আগে কোন এক ছেলের সাথে সম্পর্ক ছিল, সেই ছেলে তাদেরকে নীরার সাথে আপত্তিজনক কিছু ছবি দেখিয়েছে। এত কিছু জানা ও দেখার পর তারা কিছুতেই আর নীরার সাথে তাদের ছেলের বিয়ে দিতে পারবেন না।

পৃথিবী আবার তার ঘুর্ণন থামিয়ে দিল। অন্তত নীরার পরিবারের কাছে তাই মনে হয়েছে। আনোয়ার সাহেব শুধু একবার নীরার কাছে জানতে চেয়েছিলেন। নীরা কিছুই বলেনি। নীরার কাছে আর কেউ কিছু জানতেও চায়নি। তারা যা বোঝার বুঝে নিয়েছেন, নীরা বড় বিপদজনক মেয়ে।

কায়সারের পরিবার একটি বিকল্প সমাধানের কথা বলেছে। এসব ক্ষেত্রে সাধারনত যা হয়। ছোট মেয়েটিকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়া হয়। কায়সারের মা-বাবার মিলিকে অপছন্দ নয়। মিলির পরিবার চাইলে তারা মিলিকে পূত্রবধু করে নিতে রাজী আছেন। এতে সমাজে তাদেরও মুখ রক্ষা হয়।

মিলির মা বাবা তাদের মুখ রক্ষার সুযোগ দিলেন না। তারা কায়সারের সাথে মিলির বিয়েতে রাজী হলেন না।

নীরা শুধু একবার মনে হলো, সে কায়সারের সাথে একটু দেখা করবে, কয়েকটা কথা বলবে। কিন্তু পরক্ষনেই ঠিক করলো, সে কোন কথা বলবেনা। সে বড় কঠিন মেয়ে।

নির্বাক প্রণয় নির্বাকই থেকে গেলো।

১২ নভেম্বর ২০১২ তারিখ। মিলির সাথে কায়সারের বিয়ে হয়ে গেলো।

নীরাই সব তদারকি করলো। নীরা খুব কঠিন স্বভাবের মেয়ে, কোন কিছুই তাকে টলাতে পারেনা। কায়সারের নির্লিপ্ততা, ভাগ্যের প্রহসন, কোন কিছুই তাকে দূর্বল করে দিতে পারেনি। নীরা বড় কঠিন মেয়ে। সে বড় ভালো মেয়ে।

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেই বরপক্ষ চলে গেলো। বরও চলে গেলো। কথা হলো যে তারা কয়েক মাস পরে মিলিকে উঠিয়ে নিবে।

নীরা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলো।

কিন্তু মিলি কেন যেন স্বাভাবিক হতে পারলো না। সে যথাসম্ভব নীরাকে এড়িয়ে চলছে। নীরা বুঝলো। ভাবলো ব্যাপারটাকে সহজ করা দরকার। যা হয়েছে আর যা হয়নি, তাতে নীরা কষ্ট পেয়েছে। মিলিও হয়তো কিছুটা বিব্রত। কিন্তু তাই বলে জীবন তো আর থেমে থাকতে পারেনা। জীবন থেমে থাকবে না। পৃথিবীর আহ্নিক গতি, বার্ষিক গতিও থেমে থাকবে না।

নীরা ভাবল, মিলির সাথে একটু গল্প করবে।

বিকেল পেরিয়ে কিছু সময় হয়েছে। দিনের আলো এখনো কিছুটা রয়ে গেছে। মিলি তার ঘরে জানালার ধারে দাড়িয়ে আছে। মৌন বিকেলের হলুদ রঙ মিলির মুখে এসে পড়েছে। মিলিকে খুবই সুন্দর লাগছে।

নীরা মৌনতা ভাংগলো।

- কিরে চুপ কেন? তোর তো এখন হাওয়ায় ভাসার কথা। টিউটরকে জামাই হিসেবে পেয়েছিস। এতদিন তোকে অংক করিয়েছে। এখন তুই অংক করাবি।
- কি যে বলনা। খুশি হওয়ার কি আছে। নিতান্ত বাধ্য হয়েই করতে হল বলে। নইলে ওরকম মিনমিনে ক্যাবলাকান্তকে কে বিয়ে করে। তুমিইবা কেন রাজি হয়েছিলে কে জানে। এখন পড়ল এসে আমার ঘাড়ে।

নীরা হাসল।

এ হাসির অর্থ মিলি বুঝে উঠতে পারল না, বুঝে উঠতে পারল না কথাগুলো বলে কোন কষ্ট দিল কিনা নীরাকে।

- আপা একটা কথা বলব?
- বল।
- তুমি কি আমার উপর অনেক রেগে আছ?
- দূর পাগল। তোর উপর রেগে থাকব কেন? তোর কি দোষ?
- যার দোষ, তার উপর কি তাহলে অনেক রেগে আছো?
- কার যে দোষ তাইতো বুঝতে পারছিনা। কোন ছেলে কি বলেছে, তার দোষ, নাকি অপরিচিত একজনের কথায় যে পরিচিতকে অবিশ্বাস করলো তার দোষ, নাকি আমারই দোষ, তাইতো বুঝতে পারছি না। কাকে দোষ দেব? কায়সারের সাথে আমার বিয়ে হয়নি এ নিয়ে আমার কোন আক্ষেপ নেই, আক্ষেপ শুধু সবাই আমাকে ভুল বুঝলো, কোন কারন ছাড়াই।
- আচ্ছা আপা যদি তুমি জানতে পার যে সব কিছু আমার জন্যেই হয়েছে, তাহলে?
- কি বলছিস তুই? তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেলো নাকি। আমার জন্যে তুই মোটেও মন খারাপ করিস না। আমার একটু খারাপ লেগেছে সত্যি, কিন্তু তাই বলে এমন কিছু হয়ে যায়নি যে কেঁদেকেটে মহিলা দেবদাস হয়ে যাবো। আমাকে তো চিনিস। আমি বড় কঠিন মেয়ে।
- আপা তুমি বড় ভালো মেয়ে। আর আমি একটা খুব খারাপ মেয়ে। তোমার এই অবস্থার জন্যে আমিই দায়ী। কায়সার ভাই এর মা-বাবার কাছে ঐ ছেলেকে আমিই পাঠিয়েছি, আপা। আমি যে কায়সার ভাইকে এতটা ভালোবাসি, আমি বুঝতে পারিনি। যখন তোমার সাথে কায়সার ভাইয়ের বিয়ে ঠিক হলো, আমি কিছুতেই তা মেনে নিতে পারছিলাম না। আমি তোমার কাছে হারতে চাইনি। কায়সার ভাইকে আমি হারাতে চাইনি। যে লোক ভালোবাসার কিছুই বোঝেনা, তাকেই কেন আমরা দুজনই ভালবাসতে গেলাম?

মিলি হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল।

- কি বলছিস তুই এসব মিলি? আমার কাছে হারবি কেনো তুই? শান্ত হয়ে বোস। আয়, আমার কাছে আয়।
নীরা, মিলিকে কাছে টেনে নিতে চায়। তার এই পাগল বোনটি কি বলছে, সে কিছুই বুঝতে পারছে না।

- আমি ঠিকই বলছি আপা। আমি তোমার কাছে হারতে চাইনি। চোখের সামনে তুমি কায়সার ভাইকে আমার কাছ থেকে নিয়ে নিবে, এ আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারছিলাম না। আমি আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম না। ভালবাসার ঈর্ষায় আমি অন্ধ হয়ে গেলাম। আমি তোমার অনেক বড় ক্ষতি করে ফেললাম। আমাকে তুমি কখনো ক্ষমা করোনা। আমি খুবই খারাপ মেয়ে।

নীরা শুধু মনে মনে বললো, Everything is fair in Love and War । প্রেম এবং যুদ্ধে সবকিছুই ক্ষমার যোগ্য।

কান্নার শব্দে মিলির মা-বাবা দুজনেই ছুটে আসলেন। এবং কি হয়েছে কিছু বুঝতে না পেরে হকচকিয়ে গিয়ে দাড়িয়ে রইলেন।

মিলি হাউমাউ করে কাঁদতেই থাকলো। সে বুঝতে পারছে, একটা মাদকাসক্ত ছেলেকে দিয়ে কিছু টাকার বিনিময়ে সে যা করিয়েছে, তা ক্ষমার অযোগ্য। কিন্তু কাজটি করার সময় মনে হয়েছে, সে পৃথিবীর সবচাইতে ন্যায্য কাজটিই করেছে। মানব মন বড়ই বিচিত্র।

হঠাৎই আনোয়ার সাহেবের ফোন বেজে উঠলো। তিনি আজকাল ফোন ধরতে বড্ড ভয় পান। তিনি ফোন ধরলেন। ফোনের ওপাশ থেকে কিছু কথা-বার্তার শব্দ শোনা যাচ্ছে। তিনি শুনলেন। তারপর ওপাশ থেকে ফোন রেখে দেয়া হলো।

আনোয়ার সাহেব ফোন রেখে ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লেন। তার চেহারা মৃত মানুষের মত রক্তশুন্য, ফ্যাকাসে। জাহানারা দ্রুত গিয়ে পাশে বসলেন। সবাই বুঝতে পারছে কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু কি হয়েছে সেটা শুধু আনোয়ার সাহেব জানেন।

- কি হয়েছে বাবা? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? কার ফোন ছিলো ? নীরা অস্থির কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো।

আনোয়ার সাহেব অনেক্ষন চুপ করে রইলেন। তারপর একসময় ধরা গলায় বললেন, অফিস থেকে ফেরার পথে কায়সারের রিকসা বাসের নিচে চাপা পড়েছে। অন দি স্পট ডেড। কথাগুলো তিনি খুবই সাবলীল ভাবে বললেন। তবে কতটুকু বুঝে বললেন, তা ঠিক বোঝা গেলো না। তার অনুভূতি কাজ না করারই কথা। তিনি চিরকাল রোমাঞ্চ পছন্দ করেন। কিন্তু জীবন তাকে এত বড় রোমাঞ্চ উপহার দিবে তা তিনি বুঝতে পারেন নি। মানব জীবন বড়ই রোমাঞ্চকর।

কারো মুখে কোন কথা নেই। কিছুসময়ের জন্য তাদের মনে হলো, তারা বোবা, কালা। তারা কথা বলতে ভুলে গেছেন। কিংবা কখনো কথা বলতে জানতেন না। নীরার বাবা-মা যেখানে বসে ছিলেন সেখানেই বসে আছেন।

মিলি তার শরীরটাকে কোনরকমে খাটের উপর টেনে নিয়ে দেয়ালের সাথে এক কোণে হেলান দিয়ে রাখলো। তার কান্না পাওয়া উচিৎ। কিন্তু তার কেন যেন কান্না পাচ্ছেনা। সম্ভবত, কারো জন্যে কাঁদতে গেলেও অধিকার লাগে। সে অধিকার সম্ভবত তার নেই। তার খুব ক্লান্তি লাগছে। তার মনে হলো, যে জিনিস তার কখনোই ছিলনা, তাকে কাছে টেনে নিতে গিয়ে সে চিরতরে দূরে সরিয়ে দিল।

নীরা উঠে দাড়ালো। তাকে এখান থেকে সরে যেতে হবে। সে চায় না, তার চোখ জলে ভিজে উঠছে, এটা কেউ দেখুক। নীরার একটা গান শুনতে বড্ড ইচ্ছে করছে, আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে, দেখতে তোমায় পাইনি, আমি দেখতে তোমায় পাইনি।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement