লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৩০ মে ১৯৮১
গল্প/কবিতা: ১৬টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftঘৃনা (আগস্ট ২০১৫)

জোছনার জননী হয়ে ওঠা
ঘৃনা

সংখ্যা

গাজী তারেক আজিজ

comment ৬  favorite ১  import_contacts ৯১১
প্রভাতের রাঙা সূর্যটা উঁকি দিয়ে জানান দেয় জোছনার জননী হয়ে ওঠায় বিধুর হয়ে কানে বাজে সদ্যোজাত পুত্র সম্পর্কে শ্বাশুড়ী ও ননদের তীর্যক মন্তব্য। এ জগতে কারো সহানুভূতি দূরে থাক বিস্মৃত হতে থাকা কুমারী জীবন উল্টো দহন করে। চিন্তার প্রকোষ্ঠ আড়াল হয় শিশুপুত্রের গগনবিদারী চিৎকারে। রুগ্ন চিন্তার লোকগুলি নগ্নতায় আস্ফালন করে। দূর্বোধ্য করে তোলে আগামীর পথচলা। কৃষ্ণকায় শিশু ক্ষীণ স্বাস্থ্যের কারণে উপলক্ষ্যে পরিণত হয়। গর্ভধারিণী হিসেবে জোছনা সমুদয় কষ্ট মুখ বুঁজে সয়ে যায়। ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে পিতৃ-মাতৃস্নেহে কাটানো শৈশব-কৈশোর যতটা নির্ঝঞ্ঝাট ছিলো তার সম্পূর্ণ বিপরীত হচ্ছে এই সংসার জীবন। একহারা গড়নের কারণে শিশুপুত্র আরো অস্থির করে তোলে। কিন্তু বোঝার সামর্থ্যহীন পুরোপুরি অজানা অধ্যায় এই মাতৃত্ব। মাতৃত্ব-সুখ উদযাপন দূরের কথা আরো গ্লানি নিয়ে হাজির হয় প্রাত্যহিক উৎসব-পার্বণ সামাজিক আচার রীতিনীতি। এই করে সময় অতিবাহিত হতে থাকে। পরিবারের সবার সবার আগ্রহের কেন্দ্রে প্রবেশ করে বংশ প্রদীপ।
নাম রাখা হয় জিয়া। মায়ের আদর বঞ্চিত করার হীন কৌশল বেছে নেয় সকলে। কোলে-পিঠে রাখে। বড় আহ্লাদী করে তোলে। অবাধ্য করে তোলে। জিয়া আদুরে হয়ে ওঠে। কৃষ্ণকায় গায়ের রঙ জোছনার স্ফুট আলোয় সমুজ্জ্বল হয়ে ক্রমশঃ ধবল হতে থাকে। পিতার সাথে স্কুল পরিদর্শনে যায়। প্রথম দ্বিতীয় শ্রেণী বাদ দিয়ে তৃতীয় শ্রেণীকেই অধ্যয়নের প্রাক-প্রারম্ভ হিসেবে বেছে নেয়। শিক্ষকদের প্রবল আপত্তির মুখেও পুত্রের আগ্রহে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি নিতে বাধ্য হয়। শুরু হয় পাঠচক্র। সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে সবাইকে অবাক করে দিয়ে প্রথমস্থান অধিকরে। সেই শুরু শিক্ষাজীবন। জিয়া রেকর্ড পরিমাণ মার্ক নিয়ে এস এস সি কোয়ালিফাই করে। ভর্তি হয় পিতার আগ্রহ ও নিজের অনাগ্রহে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে। সম্পূর্ণ নতুন হওয়া সত্ত্বেও প্রতি পর্বের সমাপনীতে ষ্টাইফেন পায়। ততদিনে ফাইনাল সেমিষ্টারে। ফেনীর রাজনৈতিক পরিস্থিতি চরম বৈরী হয়ে ওঠে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে শুরু হয় যুদ্ধের দামামা। সরকারি সিদ্ধান্তে বন্ধ করে দেয়া হয় প্রতিষ্ঠান। সিভিলে প্রথম বর্ষে ভর্তিরত মেজোভাইকে ঢাকা পলিটেকনিকে ও জিয়াকে ময়মনসিংহ। শিক্ষাজীবন বিপর্যস্ত হয়। লেখাপড়ায় অনাগ্রহ তৈরী হয়। ছেদ পড়ে প্রাত্যহিক জীবনে।
পিঠেপিঠি ছোটভাই ও পিতা-মাতার প্রচেষ্টায় শিক্ষাবিরতির সনদ নিয়ে ভর্তি হয় এইচ এস সিতে। যথারীতি ভালো ফলাফল। তারপর বি এস এস পাস। আবার শুরু হয় দেশের রাজনৈতিক ক্রম অস্থিরতা। পারিবারিক সিদ্ধান্তে পূণ্যভূমি সৌদিআরব যাত্রা। শুরু হয় কর্মযজ্ঞ। চার বৎসরকাল অতিক্রান্ত হওয়ার পর দেশে আসে জিয়া। হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেয় দক্ষিণ আফ্রিকা যাওয়ার। ভিনদেশ ভিন্ন সংস্কৃতি হুটহাট সিদ্ধান্ত নিজেকে তথা পরিবারকে পর্যন্ত পিছনে ফেলে দেয়। পরিবারের অর্থায়নে পুনরায় শুরু হয় ব্যবসা। বারবার মার খাওয়ার পর হতাশ জিয়া পাড়ি জমাতে চায় অপর কোন দেশে। পরিবারের অমতে তা আর হয়ে উঠে না।

একদিনের ঘটনা অভিবাসী হওয়ার কাগজাদি পোক্ত করার লক্ষ্যে নবায়নের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় দীর্ঘপথ। চোখে লালন করে স্বপ্ন পরিবারের পিছুটান সবকিছু তুচ্ছজ্ঞান করে ভয়াবহ দূর্ঘটনার শিকার হয়ে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। সাথে থাকা একাধিক যাত্রীর মৃত্যু ও চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ নিয়তির লিখন মেনে নেয়া ছাড়া কোনই গত্যন্তর থাকে না।
আর এদিকে কর্তৃপক্ষ জিয়াকে হেলিকপ্টারযোগে হসপিটালে পাঠায়। খবর আসে দেশে। কান্নার রোল পড়ে।
জিয়া গভীর কোমায়। জ্ঞান ফিরে না। বিদেশ থাকে আত্মীয় মারফত প্রায় বারো ঘন্টা পর খবর পায় পরিবারের লোকজন। আত্মীয়-অনাত্মীয় সবার মাঝে চাউর হয় গাঁয়ের প্রিয়মুখটার মৃত্যু সংবাদ। মায়ের কান্নায় কেঁপে উঠে খোদার আসন-আরশ। পুত্রের এক্সিডেন্টের খবরে শোকে আচ্ছন্ন হয় পাড়া মহল্লা।
পরিবারের সবাই মিলে আপতকালীন বৈঠকে বসে। পিতা সান্ত্বনা দিয়ে বলে 'যা হওয়ার হয়েছে, আমার বুঝ আমি পাইছি, যে যেটাই বলুক সে বেঁচে নেই। আল্লাহ যতদিন হায়াৎ দিয়েছে বেঁচে ছিলো।' মুহূর্তেই চোখ ছলছল করে ওঠে জোছনার। মনে পড়ে পুত্রকে নিয়ে কাটানো আনন্দ বেদনার সব স্মৃতি। মেনে নিতে কষ্ট হয় এরূপ নির্দয় নিষ্ঠুরতম মন্তব্যে। চিড় ধরে হৃদয়ের অতলান্তে। ছোটভাই জিন্টো এবং মাতা জোছনার এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।
খবর আসে জিয়া মৃত্যুকে পরাজিত করে বেঁচে আছে। গভীর কোমায় থাকা অবস্থার উন্নতি হয়। নিকটাত্মীয়ের মাধ্যমে তিনদিন পর জিয়ার সাথে কথা হয় ছোটভাই জিন্টোর। সকল সংশয় সন্দেহ পরাভূত করে জিয়ার নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যাওয়া প্রমাণ করে বিধাতার কাছ থেকে মায়ের আকুতিতে পুত্রের প্রাণ ভিক্ষা কবুল করে।

আজ জোছনার চার সন্তান। মেজো ছেলে আইনজীবী সেজো ছেলে স্কুল শিক্ষক ছোট ছেলে বিবিএর ছাত্র। স্বামী অবসর জীবনে। প্রায় চল্লিশ বৎসরকাল সংসার ধর্ম অতিক্রান্ত করে জীবনযুদ্ধে জয়ীর খাতায় নাম লেখাতে চায় অশীতিপর বৃদ্ধ মা জোছনা।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement