লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ জানুয়ারী ১৯৬৬
গল্প/কবিতা: ৯৩টি

সমন্বিত স্কোর

৪.২৮

বিচারক স্কোরঃ ১.২৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ৩ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - ফাল্গুন (ফেব্রুয়ারী ২০১৬)

কাশু খুনি
ফাল্গুন

সংখ্যা

মোট ভোট ২৫ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.২৮

এনামুল হক টগর

comment ১  favorite ০  import_contacts ৮৮১
বরফ ঝরা শীতের রাতে কাশু ঢাকা শহরের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আজ ফার্মগেট এলাকায় সে সারাদিন ভিক্ষা করেছে কিন্তু তেমন অর্থ উপার্জন হয়নি। এক সময় কাশু সন্ত্রাসী দলের সদস্য ছিল। সন্ত্রাস কার্যক্রম করতে গিয়ে কাশুর অনেক সহপাটিই নিহত হয়েছে। একদিন চাঁদাবাজীর এক ঘটনায় কাশুর পায়ে বুলেট বিদ্ধ হয়, সেই থেকেই কাশুর একটি পা হারিয়ে যায়।
সেই অপরাধের জন্য তার যাবতজীবন কারাদন্ড হয়। তারপর থেকে কাশু ছদ্মবেশে ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ভিক্ষা করে জীবন যাপন করে। আজ গভীর রাত নিঃশব্দ পৃথিবীর বুকে ঢাকা শহর যেন একা একা ঘুমিয়ে আছে। আগামী নতুন উষাকাল দেখার স্বপ্নে।
জীবনের আশা গুলো বুকে নিয়ে কাশু খুড়িয়ে খুড়িয়ে হেটে যাচ্ছে। তার পা টা মাঝে মাঝে ব্যথায় জর্জিত হয়। তখন সে ভিক্ষা করতে পারে না। সেই কারণে মাঝে মধ্যে তাকে অর্ধহারে অনাহারে দিন রাত কাটে হয়।
তার নিরন্তর হৃদয়ের মধ্যে এক অন্ধকার খেলা করে। কখন পুলিশ এসে তার হাতে হ্যানকাপ লাগাবে। অসত্য বিশ্বাস আর অদক্ষকর্ম কাশুকে ঘিরে আছে। কেউ তার হারানো সময় ফিরে দেবেনা।
এখন গভীর রাতে কাশুর ছোট বেলার স্কুল সাথী শিরিনের কথা মনে পড়ছে। শিরিন ধনী পরিবারের মেয়ে। সে খুব সুন্দর সরল মনের এক বন্ধু ছিল। কাশু যখন সন্ত্রাসী দলের সদস্য তখন শিরিন এইচ এস সি পাশ করে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়।
সে বহু বছর আগের কথা। কাশু মনে মনে ভাবে, ভালোভাবে লেখা পড়া করলে সেও হয়তো একজন ভালো ডাক্তার হতে পারতো কিন্তু অবিশ্বাসী জ্ঞান তাকে বিপদ গামী পথে নিয়ে গেছে।
তাই দেহের ভেতর বন্দি পাখিটা আজ অন্ধকারে কেঁদে ফিরে। শিরিন মুক্ত আকাশে উড়ে যাচ্ছে আলোর পথ ধরে। হাঁটতে হাঁটতে আগারগাঁও বস্তির কাছে গিয়ে দাঁড়ায় কাশু ।
একটু দূরে বিদ্যুতের খুটির পাশে একটি বিবস্ত কিশোর দাঁড়িয়ে আছে। কাশু ছেলেটির কাছে দাঁড়ায় এবং বলে কে তুমি কিশোর। এভাবে নিদারুণ কষ্টে দাঁড়িয়ে আছো। কিশোর বললো আমি এই পৃথিবীর মতো একা একা, কে আমার বাবা কে আমার মাতা কেউ বলতে পারে না।
এক ঝড়ের রাতে এই খানে আমি চিৎকার করছিলাম। পাশের বস্তি থেকে একজন রিক্সা চালক আমাকে তুলে নিয়ে আশ্রয় দিয়েছিল। তার কিছু দিন পর এক দূর্ঘটনার সেই রিক্সা চালক, মানে আমার পালিত পিতা মারা যায়। আর আমি এই ভাব বেড়ে উঠতে থাকি।
কাশু বললো তুমি আমার সাথে যাবে? কিশোর বললো কোথায় যাবো। আর তুমি বা কি কাজ করো? কাশু বললো ভিক্ষা করি। আমার সাথে তুমিও ভিক্ষা করবে। তাতে পেট ভরে দুবেলা খেতে পারবে।
কিশোর ভাবে, জীবন এক অন্ধকার গলি থেকে হাঁটতে শুর করেছে। সে ক্রমেই জীবন ও মৃত্যুকে খুঁজে যাচ্ছে। যেখানে লুকিয়ে থাকে প্রাণের রহস্য! আর লুকিয়ে থাকে ঈশ্বর গুপ্তভেদ। নিপণ কর্ম আর সাধনা দ্বারা এক সত্যকে জাগাতে হয়। আঁধারের অবগুণ্ঠন রহস্য উন্মোচন করতে হয়।
তবেই মানুষের আতœা যথার্থ আলো ছড়াতে পারে। দেহের ভেতর জীবন আর মৃত্য দুই জনই পাশাপাশি বাস করে।
কাশু বলে কিশোর কি ভাবছো? কিশোর বলে জীবন আর মৃত্যুকে নিয়ে ভাবছি। কাশু বলে জীবন কি? কিশোর বলে সত্য জ্ঞানকে প্রসারিত করো, জীবন তোমার হৃদয়ের সামনে এসে দাঁড়াবে।
কিশোররের কথায় কাশু ভাবে ভিক্ষা হলো অসভ্য এক আদিম জীবন। এক দিন গ্রামের পথে ডাকাতি করতে গিয়ে অনেক লোক তাকে ঘিরে ধরেছিল, পাশের নদীতে সাঁতার দিয়ে সে জীবন বাঁচিয়ে ছিল। সেই দিনই কাশু বুঝেছিল জীবনের ভেতরই মৃত্যু ঘুমিয়ে থাকে।যে কোন সময়ই সে জাগতে পারে।
কাশু চিন্তা করে ছোট বেলায় বাবা মা সাথে অভিমান করে জীবনকে বিপদগামী পথে নিয়ে এসেছি। বাবা মা সব-সময় চাইতো আমি যেন লেখাপড়া করে একজন ভালো মানুষ হতে পারি। কিন্তু গ্রামের এক কালো বাজারি আমাকে খারাপ পথে নিয়ে যায়। আমাকে সে প্রয়োজন অনুপাতে অর্থ দিত আর সেই অর্থ দিয়ে আমি বিলাসী জীবন বেছে নিয়েছিলাম।
আর কালো বাজারি মানুষটিকে বন্ধু হিসাবে মেনে নিলাম। বাবার সামর্থ না থাকায় আমি হয়ে উঠলাম কালো -বাজারির ভারাটে গুন্ডা। জীবন যে অনেক পথ হাঁটে তা আমার জানাছিল না।
এখন গভীররাত জীবনের ভেতর প্রেম খেলা করছে ভালো মন্দ সত্য অসত্য স্বপ্ন দেখছে। কিশোর বলে ছেলে বেলায় তোমার কোন বন্ধু ছিল।
কাশু বলে জি, ছিল।
অনেক বন্ধু, তার মধ্যে শিরিন ছিল মধুর এক সরল পবিত্র বন্ধু।
তার স্মৃতি বহু পুরাতন। সেই আদিকাল থেকে মৃত্তিকার বুকে বীজ যেমন আদর্শ স্বপ্ন দেখতো আমিও শিরিনকে নিয়ে সে ভাবে স্বপ্ন দেখতাম। কিশোর চিন্তায় মগ্ন, হয়ে বললো শিরিন এখন কোথায়।
কাশু বললো সে এখন দেশের বড় ডাক্তার এই ঢাকা শহরেরই থাকে। কিশোর মৃদু হেসে বললো তুমি এখনো তাকে নিয়ে স্বপ্ন দ্যাখো। কাশু না, তবে হৃদয় অন্য জিনিস সে কারো কথা শোনে না, ভালোবাসার জন্যই তার জন্ম।
নদী যেমন ঘুরে ঘুরে সাগরের মোহনায় মিলিত হয়। মানুষের স্বপ্ন আর কামনাও তেমনি ঘুরে ঘুরে জীবনের সামনে এসে দাঁড়ায়।
কিশোরের সাথে কথা বলতে বলতে রাত প্রায় শেষের দিকে। অনেক দিন পর আজ শিরিনের সাথে বেড়ে ওঠা স্মৃতি মধুর কথাগুলো মনে পড়লো। অনেক অনেক দিন আগের সেই ভালোবাসার সংসার মোহ, চেনা চেনা মধুময় রংগিলা বাঁশির এক সুরে, যে কিশোরী আমাকে ডাকতো তার সাথে সবুজ এক ছোট গ্রাম আর প্রিয় স্কুল সহ পাঠিদের কথা মনে পড়ছে।
তারা আজ কেমন আছে। কিশোর বললো তুমি আজ বড় ক্লান্ত এই পৃথিবীর মমতায়। প্রেম শিখা পরম আনন্দ ইতিহাস তোমাকে বিরহ করে তুলেছে। চলো তোমাকে কিছুটা পথ এগিয়ে দেই।
কাশু বললো আমি একাই যেতে পাড়বো। কিশোর বললো মানুষ কখনো একা একা সব পথে অতিক্রম করতে পারে না। তোমার উপর যে মহাবিচারপতি রাজা বসে আছেন তাকে সম্মানিত করো। তবেই তোমার জীবন থেকে সব দুঃখ বেদনা আর বিরহ কেঁটে যাবে।
আর পথ চলা শিখতে পারবে। কাশু ক্লান্ত মনে বললো আচ্ছা চলো তুমি আমাকে কিছুটা পথ এগিয়ে দিয়ে আসো।
শেষ রাতের লাল আভা পূর্বাকাশে ষ্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। অন্ধকার আচ্ছাদিত পৃথিবীর এক পাশ আলোকিত হচ্ছে আর অন্য পাশ ধীরে ধীরে আঁধারে ঢেকে যাচ্ছে, মাঝখানে এক গোপন মর্মভেদ কেন্দ্রবিন্দু চেয়ে চেয়ে দেখছে অবগুল্ঠন রহস্যের উন্মোচন।
আঁধারের ক্ষণিক মৃত্যুতে আলো প্রসারিত হচ্ছে, মহাজ্ঞানী ভবিষ্যৎ দ্রষ্টাকে ঘিরে। এক সময় পরিপক্ক জ্ঞান পূর্ণতার পথে মিলন ঘটাবে।
কাশু হাত ধরে কিশোর হেঁটে যাচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে গাফতলীর এক বস্তিতে গিয়ে পৌঁচ্ছায়।
কিশোর বললো এটাই তোমার থাকার জায়গা। কাশু হ্যাঁ এই খানেই আমি বিশ্রাম করি আর ঘুমায়। কিশোর মৃদু হেসে বললো মাঝে মাঝে এই খানে এসে তোমার সাথে আমি রাত্রি যাপন করবো। কাশু বললো শুধু রাত্রি বেলা কেন সব সময়ই তুমি আমার কাছে কাছে থাকবে।
কিশোর আচ্ছা সব সময়ই আমি তোমার সাথে থাকবো। সকালের সোনালী রোদ আলো ছড়াচ্ছে। কাশু পলিথিনের ব্যাগ থেকে কিছু মুড়ি বের করে নিজে খেল এবং কিশোর কে খেতে দিল। খাওয়ার সময় কিশোরকে বললো তোমার নাম কী? আমি তো রাত থেকে তোমাকে কিশোর কিশোর বলে ডাকছি।
কিশোর কাশু চোখের দিকে তাকিয়ে একটু মৃদু হেঁসে বললো, আমার নাম বাবলু। কে আমার নাম রেখেছে আমি জানিনা তবে বস্তির ছেলেরা আমাকে বাবলু বরে ডাকে।
কাশু আচ্ছা আচ্ছা বাবলু তোমার ভালো নাম আমি জানলাম। এখন থেকে তোমাকে বাবলু বলে ডাকবো। নাস্তা শেষে কাশু আর বাবলু ঘুমিয়ে পড়লো কারণ ওরা সারারাত জেগেছে। ঘুমের মধ্যে বাবলু একটি খারাপ স্বপ্ন দেখে। কে যেন তাকে হত্যা করছে। এমন দুঃস্বপ্নের কান্নায় তার ঘুম ভেঙ্গে গেল।
কাশু নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। এক সময় দুপুর গড়িয়ে গেলে কাশুর ঘুম ভাঙ্গে যায়। দুপুর বেলায় একই ভাবে মুড়ি খেয়ে ভিক্ষার জন্য বেড় হয়ে যায়। সূর্য গড়িয়ে পশ্চিম দিকে যেতে শুরু করেছে।
নগরের চারদিকে ব্যস্ত গাড়ি গুলো ছুটে যাচ্ছে। সত্য আর অসত্য এক পথে মিলে মিশে। মানুষ কল্যাণ আর অকল্যাণের দিকে ভীড় জমাচ্ছে। জীবনের ভালোমন্দ আকাঙখাগুলোর মধ্যে ক্ষণস্থায়ী কামনায় মানুষ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
কত চড়াই উৎরাইয়ের মধ্যে নিস্তব্ধতার এক গভীর আকুতি। কাশু হাত পেতে ভিক্ষা চাইছে। ক্রমেই দিন শেষে রাত্রি নেমে আসছে। তবু কাশু ভিক্ষা করছে। আজোও তেমন ভিক্ষা পায়নি।

তাই কাশুর মন খুব খারাপ। সেই বাড়ির দিকে রওনা হয়েছে। গভীর রাত আকাশে চাঁদ উঠেছে। প্রকৃতিকে আনান্দরত শীতকাল বাংলাদেশেকে জীবন্ত করে তুলছে। তন্দ্রাচ্ছন্ন রাতে পৃথিবীকে ঘিরে ধরছে এক আঁধার। দূর থেকে বিশ্বাসের ফসল ভরা গ্রাম তাকিয়ে আছে। ঈশ্বরের ধনরতœ কামনা বাসনা আর ক্ষমতা বুকে নিয়ে আমলা, রাজনীতিবিদরা ঘুমিয়ে আছে নৈঃশব্দের আড়ালে।
এই প্রবল স্রোত আর ঝড়ে কে হাল ধরবে, এই বিশাল মানবতার। দূর দৃষ্টি প্রত্যাশার উড়াল ছড়িয়ে কে মানুষকে পৌঁচ্ছে দেবে স্নেহের মমতা। যেখানে ফুলের ফুঁড়িগুলো জেগে থাকে অন্ধকার আচ্ছাদিত বৃক্ষের ডালে আর ভালোবাসার পাখি গুলো প্রেমের বাসা বেঁধেছে অমরতœহীন অস্থায়ী বাগানের সুঘ্রাণে।
কাশু বিশ টাকার বিস্কুট কিনে বাড়িতে ফিরে আসে। অনেক রাত বাবলু ঘুমাচ্ছে। সারারাত তার বাবলুর কথা মনে ছিলনা। আজ রাতে পুনরায় বাবলুকে দেখার পর মনে পড়লো ছেলেটি গত রাতে তার সাথে এই বাড়িতে এসেছে।
ভিক্ষা অল্প পাওয়ায় তার ব্যথিত মন থেকে গতরাতের ভালোবাাসাটুকো মুছে গেছে। কি ভাবে ভিক্ষা বাড়ানো যায় এই চিন্তা কাশুর মনের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। বিশ টাকার বিস্কুট থেকে কয়েক টা বিস্কুট খেয়ে কাশু ঘুমিয়ে পড়লো।
ভোর বেলায় বাবলু জেগে উঠলো। সারারাত ধরে ঘুম পেড়েছে। শরীরে তার প্রচন্ড ক্ষুধা। হাতের কাছে বিস্কুট দেখে কয়েকটা বিস্কুট সে খেয়ে নিল। পাশে কাশু ঘুমিয়ে আছে, কি বলে সে কাশু কে ডাকবে ভেবে পাচ্ছে না। হঠাৎই সে কাশুকে মামা বলে ডাকতে শুরু করলো। কাশ,ু মামা ডাক কোন দিন শোনেনি। এই প্রথম মামা ডাক শুনে কাশুর ঘুম ভেঙ্গে গেলো।
কাশু জেগে দেখে বাবলু তাকে মামা মামা বলে ডাকছে। বাবলুর দিকে সে তাকালো এবং বললো অনেক রাতে এসে আমি ঘুমিয়েছি। ঘুম শেষে তোমার সাথে কথা বলবো।
তারপর বাবলু ঘর থেকে বেড় হয়ে ছোট গলি দিয়ে হাঁটতে থাকে আগাঁর গাও বস্তির দিকে। দুপুর বেলায় কাশুর ঘুম ভেঙে যায়, এবং পাশের কল থেকে পানি নিয়ে গোসল শেষ করে।
ঘরে তেমন খাওয়ার নেই। গলির মোড়ে ছোট হোটেল থেকে দুইটি রুটি আর একটু ভাল ডাল দিয়ে দুপরের খাওয়া শেষ করে, এবং চিন্তিত মন নিয়ে আবার ভিক্ষার জন্যে নগরে পথে বের হয়।
আজও তেমন ভিক্ষা পাইনি। এভাবে কয়েক দিন সে ভিক্ষা না পেয়ে বড় ক্লান্ত এবং চিন্তিত হয়ে পড়ে। এমনি করে একদিন মাঝ রাতে ঘরে ফিরে দেখে বাবলু ঘুমিয়ে আছে। কাশুর মনে খারাপ চিন্তা উদয় হয়। সে ভাবে বাবলু ছোট মানুষ আর ছোট মানুষের প্রতি মানুষের খুব মমতা আর ভালোবাসা জাগে। বাবলুর যদি একটি হাত পুঙ্গঁ হতো তবে ওকে নিয়ে ভিক্ষা করে অনেক টাকা উপার্জন করা যেত।
ভাবতে ভাবতে কাশু একটি হাতুড়ি দিয়ে ঘুমন্ত বাবলুর হাতের উপর আঘাত করলো অমনি ঘুমের ঘোরে বাবলু চিৎকার দিয়ে উঠলো এবং মামা মামা বলে ডাকতে লাগলো। আঘাত করে কাশু একটু দূরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। মামা ডাক শুনে কাশুর হৃদয়টা মর্মাহত হলো এবং বাবলুর কাছে এগিয়ে গেলো। আহত বাবলু বেদনায় ছট ফট করছে। কাশুর ক্লান্ত শরীর আরো ক্লান্ত হয়ে গেলো। সে বুঝতে পারলো না কি করবে। সব ফেলে সে বাবলুকে শিশু হাসপাতালে নিয়ে গেলো, এবং ভর্তি করে দিল। বাবলু খুব ক্লান্ত তার সমস্ত শরীর জুড়ে ব্যথায় ভরপুর। এবং এক সময় বাবলু জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
হাসপাতালে ডাক্তার খুঁজতে গিয়ে কাশুর চোখে পড়ে শিরিনকে। শিরিন এখন শিশু হাসপাতালের বড় ডাক্তার। বাবলুকে নিয়ে হাসপাতালে ঢোকার সময়ই শিরিন কাশুকে দেখে ছিল এবং চিনতে পেরেছিল। শিরিন একজন জুনিয়ার ডাক্তারকে নিয়ে বাবলুকে দেখতে যায় এবং তার চিকিৎসা দেয়।
কাশুর হাতে টাকা নেই তাই সে ভিক্ষার জন্য পথে বেড়িয়ে যায়। আজ তার মন খুব খারাপ, পেছন থেকে কে যেন মামা মামা বলে ডাকছে। এরকম মধুর ডাক সে কোন দিন শোনেনি।
বিভ্রান্ত কালের ছায়ায় আজ এই নগরি তার কাছে আঁধার মনে হচ্ছে। ক্রমবর্দ্ধমান জীবনগুলো শোকে ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে। আলো থেকে জ্ঞানের শব্দ ঝরে আঁধারে মিশে যাচ্ছে।
এক গভীরতর পিপাসার আকাঙখা নিয়ে কাশু হেটে যাচ্ছে। অনেক দূরের পথে! হাঁটতে হাঁটতে কাশু ভুলে গেছে জীবনের কথা, বাবলুর কথা। সে দুঃস্বপ্ন দেখছে কে যেন ভোরের আকাশ থেকে একটি মুক্ত পাখিকে শিকার করলো। হঠাৎ বাবলুর কথা তার মনে পড়ে গেলো।
তার পর সে দ্রুত হাসপাতালের পথে রওনা হলো। বাবলু তখন মৃত। পৃথিবী থেকে সে অনেক দূরে চলে গেছে, ক্ষুধা বেদনা আনন্দ উপভোগ ছেড়ে, এক বৃহৎ সত্তার কাছে। বেদনায় কাশু ভূলে গেছে সে এক জন খুনী যাবতজীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি। পুলিশ তাকে সব সময় খুঁজছে।
গোয়েন্দা পুলিশের দল সব সময়ই হাসপাতালে যাতায়াত করে। হাসপাতালে গিয়ে কাশু বাবলুর সিটের দিকে যেতে থাকে। সিটের পাশে বেশ কিছু মানুষ ভীড় করে আছে। কাশু অনুভব করলো বাবলুর হয়তো কিছু হয়েছে।
সিটের কাছে পৌঁছে দেখলো বাবলু নেই। কাশু ভাবলো আমাকে পালিয়ে যেতে হবে নইলে বিপদ হবে। পালিয়ে যাওয়ার সময় পেঁছোন থেকে কে যেন ডাকলো কাশু দাঁড়াও।
কাশু দাঁড়িয়ে পেছনের দিকে তাকায় এবং দেখে ডাঃ শিরিন তাকে ডাকছে। কাশু দাঁড়িয়ে যায় এবং বলে তুমি আমাকে ডাকছো। ডাঃ শিরিন বলে হ্যাঁ, কেন ডাকছো? ডাঃ শিরিন বলে তুমি ভাবছো আমি তোমাকে চিনতে পারি নাই। তুমি সে ছোট বেলার সেই রূপপুর গ্রামের কাশু তা আমি প্রথম দিন দেখেই বুঝতে পেরেছি। ডাঃ শিরিন আরো বলে তোমার শরীরের ভেতর থেকে এখনো খুনের নেশা কাটেনি সেই তরুণ বয়সে সন্ত্রাসী ঘটনায় তোমার একটি পা হারিয়ে গেছে। খুনের দায়ে তুমি একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি। আবার কোন উদ্দেশ্যে এক কিশোরকে খুন করছো।
কাশু বলে ক্ষুধা পেটের ক্ষুধাই আমাকে অন্যায় পথে নিয়ে গেছে। আমাকে খুন করতে শিখিয়েছে। ডাঃ শিরিন দুঃখ ভারাক্লান্ত মন নিয়ে বলে স্কুল জীবনে তুমি আমাকে বলতে আমি বড় হলে মানুষকে বৃক্ষের মতো ছায়া দেবো। সেই ছায়া থেকে বিশ্বাস আর শুভ জ্ঞানের জন্ম হবে, যা মানুষের কল্যানে ছড়িয়ে পড়বে।
এই কি কল্যাণ? এই কিশোর কি সেই কল্যানের বলি। তরুণ বয়সে যার খুনের দায়ে তুমি যাবতজীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি সেটা কোন কল্যাণ ছিল। কাশু চিৎকার করে বলে ভূল সব-ভুল আমি কল্যানের স্বপ্ন দেখতাম কিন্তু ক্ষধা আমার দেহকে অন্ধকার করে তুললো। আর তখনই অকল্যাণ আর অশুভ্র আমার ভেতর প্রবেশ করলো।
আমি বুঝতে পারলাম না বলে সেই অকল্যাণের সাথে হাঁটতে হাঁটতে থাকতাম। ডাঃ শিরিন বলে তুমি নিজেই নিজেকে ক্ষত বিক্ষত করেছো শুধু ব্যথা অনুভব করোনি তাই কল্যাণ আর শুভকে বুঝতে পারনি।
মনে রেখো মানুষ গভীর যন্ত্রনা থেকে অধিক জ্ঞান অর্জন করে। মানুষের মধ্যে বিশ্বাস আর জ্ঞান পাশাপাশি বাস করে। অবিশ্বাস আর অকল্যাণকে অবরুদ্ধ করে ভেঙে ফেলো। তবেই পাবে মুক্ত নির্মল বাতাস আর পবিত্র জাতি যা তোমার উওরসূরীদের আদর্শকে সুসংগঠিত করবে।
কাশু দুঃখে ক্ষোভে বলে আমার কাছে আজ সব অষ্পষ্ট ঝাপসা মনে হচ্ছে। ডাঃ শিরিন আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে যিনি জীবন ও প্রাণকে তোমার দেহের ভেতর ধারন করে দিয়েছে তাকে ডাকো, তবেই জীবন ও মৃত্যুকে জয় করতে পারবে।
কাশু আর ডাঃ শিরিনের কথা হাসপাতালে অনেক মানুষ শুনছে। পাশে গোয়েন্দা পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। কাশু বুঝতে পাড়লো তার সব অপরাধ ফাঁস হয়ে গেছে। এখান থেকে পালানোর কোন পথ নেই। গোয়েন্দা পুলিশের দল কাশুর হাতে হ্যানকাপ লাগিয়ে দিল। কাশুকে নিয়ে আদালতের দিকে পুলিশের গাড়ি রওনা হলো।
পেছনে ডাঃ শিরিন দুঃখ ভাবাক্রান্ত মন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পুলিশের গাড়ি হুইসিল বাজিয়ে ছুটে যাচ্ছে। ঢাকা শহরের প্রত্যেক টি রাস্তা কাশুর চেনা। এই নগরের অধিংশ পথে কাশু ভিক্ষা করেছে। তাই ঢাকা নগর তার এক পরম বন্ধু। পাপের এক নিদারুণ আকুতি তার বিবেককে দংশন করছে। তাকে নিয়ে যাচ্ছে অন্য এক জগতের পথে যেখানে ভালো মন্দের বিচার শেষে রায় ঘোষনা করা হয়...।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement