লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১০ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৯
গল্প/কবিতা: ৩৭টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftএকুশে ফেব্রুয়ারি (ফেব্রুয়ারী ২০১৪)

একুশের মা
একুশে ফেব্রুয়ারি

সংখ্যা

কামরুল হাছান মাসুক

comment ১  favorite ০  import_contacts ৩২৩
মা আজ ঢাকায় যাব। তনু তার মাকে বলল। তনু এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়ে। কয়েক দিনের জন্য বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল।
মা বললেন তুই না বললি বেশ কয়েকদিন থেকে যাবি। হঠাৎ করে এমন কি কাজ পড়ল যে আজই যেতে হবে।
তনু বলল মা তুমি এসব বুঝবে না।
মা একটু অভিমানের সুরেই বললেন আমরা কি কিছু বুঝি না।
তনু বলল মা আমি কিন্তু এভাবে বলতে চাই নি। তনু তার মাকে খুব ভালবাসে। মা ছাড়া তনুর আর কেউ নেই। তনুর বাবা দেশ বিভক্ত হওয়ার সময় দাঙ্গায় মারা গেছে। তনুর আর কোন ভাই বোন নেই। আত্মীয় স্বজনও তেমন কেউ নেই। তনু এগিয়ে এসে মার কুলে মাথা দিয়ে বলল মা ঢাকাতে ভাষার জন্য আন্দোলন হচ্ছে। আমরা যদি এ সময় না থাকি তাহলে কে আন্দোলন করবে। তুমি যদি শুন আন্দোলনের জন্য আমি চলে যাচ্ছি তাহলে অবশ্যই চিন্তা করবে। আমি চাচ্ছিলাম তুমি যেন আমার জন্য চিন্তা না কর।
মা বলেন ভাষার জন্য আন্দোলনের দরকার কি? ভাষা তো আর হারিয়ে যাচ্ছে না।
তনু এবার বিস্তারিত বলতে লাগল। মা পাকিস্তানিরা চাচ্ছে বাংলাভাষাকে মুছে ফেলতে। পাকিস্তানের যে বড় নেতা তার মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ । সে ঘোষণা করেছে উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। তাহলে দেখবা আমাদের ভাষা কালক্রমে হারিয়ে যাবে। আমরা তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছি। এখন যদি আন্দোলন করতে না পারি তাহলে মায়ের ভাষা অপমানিত হবে। একসময় দেখা যাবে তুমি আমি যে ভাষায় কথা বলছি সে ভাষায় কথা বলতে পারব না। মনের আবেগ, অনুভূতি গুলো প্রকাশ করতে পারব না। বাধ্য হয়ে অন্য ভাষা শিখতে হবে। ঐ ভাষা ছাড়া অফিস, আদালতে চাকরি হবে না। আমরা তখন নিজ ভাষাকেই বালুর চরে দাফন করতে হবে। কারণ যে ভাষা কোন কাজে লাগে না এ ভাষা শিখবে কেন। তখন বাংলা ভাষাটা হয়ে যাবে চাষাদের ভাষা।
তাহলে আমাকে নিয়ে চল। আমিও তোদের সাথে থাকব। আমিও তো বাংলায় কথা বলি। তাহলে আমারও যাওয়া উচিত। ভাষার জন্য আমাদের ও আন্দোলন করা উচিত। যে ভাষায় আমাদের কত পুর“ষ কথা বলেছে তার কোন হিসেব নেই। কুটি কুটি মানুষ এখনও কথা বলছে। সে ভাষা থাকবে না এটা কোন কথার কথা হল।
মা সবই ঠিক আছে। তোমাকে নিয়ে এখন আমি রাখব কই। আমিতো থাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে। তাছাড়া হঠাৎ করে বাসা পাওয়া একটা ঝামেলার বেপার।
তনু তোরা যদি আন্দোলন করছি তাহলে দেখবি হল বন্ধ করে দিবে। তখন তোরা কি করবি। দেখবি অনেক ছাত্র বাড়ীতে চলে যাবে। এতগুলো ছাত্র ঢাকায় কউ থাকবে। তাহলে আন্দোলন করবে কে। আন্দোলনের জন্য অনেক কিছু রাখা চাই। সেই গুলো কোথায় রাখবি। প্রেরণার দরকার আছে। সে প্রেরণা কোথায় পাবি। গোপনে গোপনে কত বৈঠক করতে হয়। সেই বৈঠক কোথায় করবি। যারা আন্দোলন করে তাদের লিস্ট থাকে। লিস্ট দেখে নেতাদের ধরে নিয়ে যায়। পালানোর মত জায়গাও পাবি না। তরা যদি এবারে ধরা দিস তাহলে বল আন্দোলন কে করবে।
ওকে মা তুমি আমার সাথে চল। তনু, তনুর মা ঢাকায় এসে রইল। এদিকে ভাষার দাবিতে রাস্তা ঘাট খুবই উত্তপ্ত। কেউ কাউকে ছাড় দিবে না। ভাষার জন্য সবারই স্বতঃফূর্ত অংশগ্রহণ আছে। তনু তার সকল বন্ধুদের তনুর মার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। হলে কোন সমস্যা হলেই সবাই এক সাথে থাকে। তনুর মাও এতে অনেক খুশি। ভাষা রক্ষা করার জন্য সেও ত্যাগ ¯ি^কার করছে। তনুর এক মেয়ে বান্ধুবি আছে যে ঢাকা মেডিকেলে পড়ে। সে প্রত্যেকদিন তনুর বাসায় আসে। মার সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ হয়। মারও মেয়েটাকে অনেক ভাল লাগে। যেমন সুন্দর করে কথা বলতে পারে তেমনি বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে তথ্যটাকে আরো শক্ত করে। যে দিন তনু বাসায় থাকে সেদিন মেয়েটা তেমন কথা বলে না। কথা বললেই যেন মুখে বাজে। মা এবিষয়টা অনেক দিন ধরে ল¶ করছেন। একদিন তনুকে বললেন মেয়েটা কি তকে ভয় পায় নাকি।

তনু হাসতে হাসতে বলল একদিন তার বান্ধবীদের সাথে এমন যুক্তি দিচ্ছিল যে গুলোতে ভুলের ভরা ছিল। আমি তাকে ভুল গুলো ধরিয়ে দেওয়ার পরও তর্ক চালিয়ে যাচ্ছিল। ঐ খান থেকে ধরে এনে তাকে একটি ইতিহাস বিষয়ক বই দিলাম। সে ঐগুলো পরে বুঝতে পারল তার কি পরিণাম ভুল হয়েছে। এর পর থেকে আমার সামনে কোন তথ্য কথা বলে না। এমন সমই তš^ী রুমে প্রবেশ করল। তš^ী হচ্ছে তনুর মেয়ে বন্ধু। তনুকে দেখেই চোখ গুলো কেমন বড় বড় করে তাকাল। কারণ এমন সময় তনুর বাসায় থাকার কথা না।
তনু বলল হায় তš^ী কেমন আছ। তুমি নাকি আমি উপস্থিত থাকলে কম কথা বল।
তš^ী হঠাৎ এরকম প্রশ্নে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল।
ঐ দিকে ভাষা নিয়ে ঢাকা উত্তপ্ত। সর্বস্তরের মানুষ একযুগে ভাষার দাবীতে অনড়। মারা যাবে তবু ও ভাষাকে রক্ষা করবে। সবার সাথেই তনু, তনুর মা, তন্বী একসাথে মিছিল করেছে। শ্লোগান দিয়েছে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, বাংলা চাই। মিছিলের শেষ পর্যায়ে তনুর মা গ্রেফতার হলেন। তনুর মাকে পিকআপ ভ্যানে করে নিয়ে যাচ্ছে। তনু মা মা করে চেঁচাচ্ছে। তন্বী কাছে এসে তনুকে বাসায় নিয়ে এলো। মাথা ঠান্ডা রাখতে বলল। পরের দিন জেলগেটে মার সাথে দেখা হল। মাকে এরা খুব মেরেছি। হাত, পায়ে রক্তের দাগ দেখা গিয়েছিল। মা বললেন এই ভাষার জন্য কত মানুষই ত জীবন দিবে। আমার একটা জীবন নিয়ে চিন্তা করিস না। আমার বয়স ও হয়ে গেছে অনেক। এমনিতেই হয়ত আর বেশিদিন বাঁচব না। একটি মহত কাজেই জীবনটা দিয়ে দেই। আর তন্বী মেয়েটা অনেক ভাল তাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেঁচে নিস। তনুর চোখের পানি টপ টপ করে পরছে। মা পিকআপ ভ্যান থেকে বলছে ভাল করে খানাদানা করিস।
বাসায় এসে দেখি তš^ী বসে আছে। আমি তাকে বললাম তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে। যা বলছি একটু মনোযোগ দিয়ে শুন। মা এখন কারাগারে। মিছিল হচ্ছে প্রতিদিনই। কোনদিন যে আমাকে ধরে নিয়ে যায় তার কোন হিসেব নেই। তুমি আমার সাথে নিজের জীবনটাকে ঝরিত কর না। পড়ে অনেক কষ্ট পাবে।
তš^ী বলল তুমি তোমার চিন্তা ভাবনা থেকে বলেছ। এ গুলত না হতে পারে। হলেই কি দূরে চলে যেতে হবে। দুঃখ, কষ্ট মানুষের জীবনেই আসে। দুঃখ, কষ্টের ভিতরেই মানুষকে যাবতীয় কাজ করে যেতে হয়। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে আমি আবার কাল আসব। ভাত, তরকারি দেওয়া আছে খেয়ে নিয়। পাকিস্তানিরা আজ একশত চোয়ালি­শ ধারা জারি করেছে। ছাত্ররা একশত চোয়ালি­শ ধারা ভাঙ্গার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভাষার দাবিতে ছার নেই। আজ সমুদ্র উত্তাল জনতা প্রমাণ করেই ছাড়বে যে, ভাষা তাদের হ্রদয়ের বন্দন, ভাষা তাদের জীবন, ভাষা তাদের মরণ। একশত চোয়ালি­শ ধারা ভাঙ্গার সাথে সাথেই পাখির মত গুলি বর্ষণ। যে যেদিকে পারছে সে সেদিকে ছুটছে। তনুর হাতের একটু পাশে কয়েকটা গুলি লেগেছে। তনুকে পিকাপ ভ্যানে তুলে নিচ্ছে। সারা দিন অজ্ঞাত একটা স্থানে রেখে সন্ধ্যার দিকে হাসপাতালে নেওয়া হল। কতর্বরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করল। অত্যধিক রক্তক্ষরণে তনুর মৃত্যু হয়েছে। একফুটাও রক্ত ছিল না তার শরীরে। ভাষার জন্য সবটুকও রক্ত ঢেলে গেলেন। মা মুক্তি পেল। বিশাল সংবর্ধনা দিয়ে আনা হল একুশের মাকে। মা এত হাজার হাজার ছেলের মাঝে তার নিজের ছেলেকে খুঁজছে। এমন একটা দিনে তার ছেলে আসল না ভাবা যায়। তখন তন্বীকে দেখলেন বিমর্সভাবে দাড়িয়ে আছে। মা ওদিকে ছুটে গেলেন। আমার ছেলে কোথায়। তন্বী বলল ভাষার জন্য রক্ত দিয়ে ইহজীবন ত্যাগ করেছেন। মা অনেক দিন বেঁচে ছিলেন। ছেলের জন্য শুধু দু চোখের জল ফেলেছেন। সবাই এখন তাকে ডাকে একুশের মা।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement