লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ মার্চ ১৯৮০
গল্প/কবিতা: ২৪টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবর্ষা (আগস্ট ২০১১)

বহুরুপ
বর্ষা

সংখ্যা

বিন আরফান.

comment ১০৫  favorite ৮  import_contacts ১,২২৪
কাধে লম্বা হাতল যুক্ত থলে। পরণে প্যান্ট-পাঞ্জাবী, হাতে কলম ডায়েরী। সাংবাদিক সাংবাদিক ভাব। সংবাদ সংগ্রহ পেশা না হলেও নেশা। নেশা এমন এক বদঅভ্যাস -নেশা কাটাতে নেশার টানে কথিত আছে স্ত্রী বন্ধক হয়ে থাকে। অনেকে নেশার টানে সন্যাসী আবার কেহ বৈরাগী হয়ে ঘুরে বেড়ায়। একই নেশায় অর্থ সম্পদ বিলিয়ে দিয়ে জঙ্গলে দরবেশ বেশে খানকা বানায়। ইসলাম উপরের কোনটাকেই সমর্থন করে না, যদিও তথ্যটি বিতর্কের ঝড় তোলে।

নেশাখোরদের যুক্তি- কলকিতে আগুন লাগায়ে টান দিয়ে দেখ ‘মনের মানুষ খুঁজে পাবে’ আর ভবে নিজেকে রাজা রাজা মনে হবে। বৈরাগী বলে একতারায় ক্ষুধা মেটায়, ডুগডুগিতে তৃষ্ণা। দরবেশ তসবিহ গণে আর বলে “ আমি তখন শান্তিনগরের শাহাজাদা। শিশুকাল থেকেই মক্তবে আরবী উর্দূ দিয়ে শিক্ষা জীবন শুরু করি। উস্তাদজির আদর্শে নিজেকে পরিচালিত করব বলে মনস্থির করি। সেই থেকে আমি কখনো কোন রমণীর সংস্পর্শে ও রাজমহলের বাহিরে বের হইনি। জ্ঞান হবার পূর্বেই মাতৃবিয়োগ হয়েছিল। পিতৃবিয়োগের পর বাদশাহী দায়িত্ব আমার উপর অর্পিত হয়। আমার স্বীয় কর্মকান্ডের জন্য রাজ পরিবারে খাবার সংকট দেখা দেয়। বাধ্য হয়ে আমি এক চাষীর বাড়িতে যাই ধান চাল সংগ্রহ করতে। সেখানে বার বছরের এক মেয়েকে দেখে আমার খুব দুঃখ হয়।

দেখি মেয়েটির বুকে দু’টি টিউমার হয়ে আছে। আমি যখন কারণটা জানতে চাই মেয়ের জননী অন্তরাল থেকে বলে- ওটা টিউমার নয় জাহাপনা স্তন। ওর বিয়ের পর যখন সন্তান হবে তখন ওই স্তনে দুধ হবে আর সেই সন্তান তা পান করে বেঁেচ থাকবে। সুবহানআল্লাহ। তাৎক্ষণিক আমার ভাবনায় চলে আসে তাহলে আমি এত সম্পদ আর আহার খুঁজে বেড়াই কেন ? কবে সন্তান হবে সেই ঠিক নেই অথচ তার জন্য খাবারের অগ্রিম ব্যবস্থা করা আছে সেহেতু সৃষ্টিকর্তা আমার সৃষ্টির পূর্বেই রিজিকের সকল ব্যবস্থা করে রেখেছেন। সেই থেকে আমি এই জঙ্গলে। বাদশাহী ছেড়ে দরবেশ।

নেশা সংক্রান্ত যুক্তিগুলো অনেকের মানতে কষ্ট হলেও আমি বিশ্বাস করি, করতে হয়। কেননা আমি যেহেতু মলাট করা সোনালী প্যাকেটের কাঠিতে আগুন জ্বালিয়ে টানার জন্য বেতনের এক-তৃতীয়াংশ অনায়াসে শেষ করি তাতেও আমাকে নেশাখোর বলা হয় না। সেহেতু নেশার সংজ্ঞা উদাহরণসহ বুঝাতে যুক্তিগুলো যুক্তিযুক্ত। যুক্তিগুলো বুঝাতে আরেকটু স্পস্ট করি- আমি যখন রাষ্ট্রীয় কোন টেন্ডার, অফার, কণ্ট্রাক্ট, ইনডেন্ট, ভেটিং ও ইন্সপেকশনসহ আইনোট স্বাক্ষর করি তখন বিনির্দেশসীমা বহির্ভূত মালামাল ক্রয়-বিক্রয় করে নিজের পকেট ভারি করি বা নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব উৎকোচ ব্যতিরেখে সম্পাদন করিনা। তখন কিন্তু আমাকে চোর বলা হয় না। বরং সেই অবৈধ টাকায় স্যুট কোট পড়ে চলাফেরা করি বিধায় আমাকে সাহেব তথা ভদ্রলোক বলে।

অথচ যারা ক্ষধার তাড়নায় কয়েকটাকার সম্পদ নিয়ে যায় তাদেরকে আমরা সমাজে চোর বলে চিহ্নিত করি। ধরা পড়লে বেধম প্রহার করি। কিন্তু আমি ধরা পড়লে কেহ চোর বলেনা। বরং ব্যপারটা সিদ্ধান্তে ভুল ছিল বলে অনেকে সাফাই গায়।

আর আমি যখন জনগণের প্রতিনিধি হয়ে চুরি করি, সেই আমাকে চোর বলতে মানুষ মনে মনেও সাহস করেনা বরং আমার কাছ থেকে দশ-বিশ টাকা ছিনিয়ে নিতে আমার স্বপক্ষে স্লোগান দেয় ‘বিন আরফানের চরিত্র ফুলের মত পবিত্র, নেতা তুমি চুরি কর সরি এগিয়ে আমরা আছি তোমার সাথে।’ অথচ আমার স্ত্রী সেই স্লোগান শুনে আমার নিকট হতে জানতে চায় ‘তারা কি কাগজের ফুলের কথা বলছে ? যেই ফুলের গন্ধ নেই, আছে কালি যুক্ত কার্নন।’

তখন স্ত্রীর দিকে তাকালেই সে বুঝে যায় আমার স্বপক্ষে সাফাই গাইতে হবে। নচেৎ পূর্বের মত অবস্থা প্রহার। অবশ্য এটা নারী নির্যাতন নয়। কেননা আমার প্রহার কেহ দেখে না। নারী নির্যাতনতো শুধু হত দরিদ্র আর মুর্খ্য লোকগুলো করে। তারা অকথ্য উচ্চবাচ্য করে, লোক দেখিয়ে বউ পেটায়। আর আমারটাতো চার দেয়ালে মোজাইক দিয়ে ঘেরা। মূলত পুরুষ শাশিত সমাজে কোননা কোন স্তরে কোননা কোন ভাবে প্রতিটি নারীই নির্যাতনের স্বীকার। কেহ প্রকাশ করে, কেহ করেনা এই আর কি।

যাইহোক সংবাদ সংগ্রহের নেশায় আমি ছুটে যাই সিরাজগঞ্জ জেলার যমুনা নদীর তীর সংলগ্ন ধুনট থানার ভান্ডারবাড়ি গ্রামে। ভান্ডারবাড়ি গ্রামের পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলো পলাশপুর, বীরচত্বর, নেগাইও যমুনার তীরে অবস্থিত। কবি সু-সাহিত্যিক ইসমাঈল হোসেন সিরাজী এর নামানুসারে এই জেলার নামকরণ। ঢাকা থেকে রওয়ানা হলে অরণ্যে ঘেরা জেলা গাজীপুর হয়ে টাঙ্গাইলের বুক পেরিয়ে যমুনা পাড়ি দিয়েই পৌঁছতে হয়।

আমার নিকট আলাদিনের চেরাগ বা হযরত শাহজালাল (রঃ) এর সুরমা নদী পাড়ি দেয়ারমত জায়নামাজ বা হযরত নুহ (আঃ) নবীর কিস্তির না থাকলেও হেটেই পাড়ি দিয়েছি নদীটি। যদিও পানি ছিলনা তবুও নদী। ধুধু বালুচর। আবাদি জমিতে কারণ ফসল নেই। রোদ্রের প্রখর তাপে মাটি ফেটে হা-করে আছে। বৃষ্টি নেই বিধায় কোন বীজও ফুটেনা। কৃষি নির্ভর জেলা বিধায় কৃষক-শ্রমিকের হা-ভাতের জন্য হাহাকার। প্রচন্ড গরমে পানির স্তরও অনেক নিচে নেমে গেছে। পানির তৃষ্ণায় সবার অন্তর কাতর।


অসহ্য গরমে ঘাম শীতের শিশির বিন্দুর ন্যায় শরীরে স্থান দখল করে বসে আছে। বিন্দু হতে একটু বৃদ্ধি পেলেই টপটপ করে পা বেয়ে মাটিতে পড়ছে। বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজিন আছে কিন্তু বাতাস বলতে যা অনুবব করি তা খুঁজে পেলাম না। গ্রাম গ্রামান্তর সকলের বিনীত আর্তনাদ আয় বৃষ্টি আয়। শুধু কি তাই বৃষ্টি না হওয়ার কারণ উপলব্ধি করতে যেয়ে সকলেই তাদের পাপ পূণ্যের হিসাব কষতেছে। পাপের ক্ষমা চাচ্ছে, পূণ্যের বদৌলতে বৃষ্টি।

বিধাতাকে এমন নরম আর বিনীত স্বরে ডাকছে যে, বিধাতার দিল নরম না হওয়ার কথা নয়। কেননা তিনি দয়াময় পরম দয়ালু। তাদের কাকুতী এরূপ ছিল যে, যেভাবে আগুন মোমকে গলায়। আগুন আগুন বললে মোম গলবে না, আগুন জ্বালাতে হবে ও জ্বলতে হবে। ঠিক সেরূপ চাল চলন দেখে গোটা সমাজটাই আমার নিকট ধার্মিক মনে হলো। মসজিদ মন্দির গীর্জা সব ধর্মীয় স্থাপনা গুলোতে ধর্ম প্রাণদের ভীড়। এক স্থানে দেখি, খোলা একটি মাঠে অনেকেই একত্রিত হলো উল্টো নামাজ পড়তে। সমস্বরে সকলের একই আরজ করুণাময় তোমার কৃপায় বৃষ্টি দাও। বাঁচা যে বড় দায়। আয় বৃষ্টি আয় আয়।

আহা এমন কাকুতী মিনতি বিধাতার অন্তরে হয়তো দাগ কেটেছে। হঠাৎ দৃষ্টিতে পড়ে কিছু পাখি আকাশে উড়ছে। চারিদিক অন্ধকার হয়ে আসছে। আকাশ গুড়ুম গুড়ুম শব্দ করছে। কী চমৎকার অনুভূতি ! নারী শিশু বৃদ্ধ যুবক প্রত্যেকের চোঁখে মুখে উল্লাস। ঐ দেখ বৃষ্টি আসছে ! ঐ দেখ বৃষ্টি আসছে !! আমারও ভালো লাগে। অস্বস্তিতে ছিলাম দু’টা দিন।

রিমঝিম তালে তালে বৃষ্টি শুরু হলো। ফসলের মাটি মৃদু হাসছে অনুভব করলাম। প্রাণটা শীতল হয়ে গেল। নতুন ধানে হবে নবান্ন এরূপ হাস্যোজ্জ্বল মনোভাব এলাকাবাসীর মধ্যে বিরাজ করছে। সময়টা ছিল তখন সকাল এগারোটা। টানা দুই ঘন্টা বর্ষণ। পানিতে টুইটুম্বর, কানায় কানায় পৌঁছে গেছে জল।

দুপুরেই কৃষক-শ্রমিক আবাদের জন্য প্রস্তুত। যে যার মত বীজ রোপন বপন করছে। সে দৃশ্য দেখার অনুভূতিটা ভিন্ন মাত্রার। কারো মনে আনন্দের ঘাটতি নেই। খানাপিনা, নাচ-গান, হৈ-হল্লুর। মসজিদ মন্দির গীর্জাগুলো এতিম হয়ে আছে। বিধাতা যে ছিল বা আছে সে চিন্তা কারো মনে কিঞ্চৎ আছে বলে আমার আর মনে হয় না। অশ্লেল আর অপকর্মের কিছু দৃশ্যও চোঁখে পড়ল। যে যার মত রঙ তামাশায় ব্যস্ত।

যে সংবাদের খোঁজে গিয়েছিলাম তা হলো সত্যতা যাচাই যে, ঐ এলাকার মানুষ নাকি সকলেই ধার্মিক আর প্রভূভক্ত। কিঞ্চিৎ প্রমাণ পেয়েছিলাম যা ছিল অভাবে আর মসিবতে আর্তনাদ। একে স্বার্থের জন্য সাজানো নাটকও বলা যেতে পারে। মৃত্যু ভয়ে আল্লাহ আল্লাহ, জীবন পেয়ে নাঁচরে মালা।

মনটা খারাপ হয়ে গেল। বাড়ি ফিরব মনস্থির করলাম। রওয়ানা দেব এমন সময় আবারো চারিদিক অন্ধকার দেখলাম। দূর থেকে আওয়াজ ভেসে আসছে ঘূর্ণিঝড় উঠেছে সবাই ঘরে যাও। যেন লক্ষাধিক সাপের ফানা তোলা শব্দের ন্যায় ফোস ফোস-শোশো আওয়াজ আমার ভিতরে কামড় দিয়ে উঠল। কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না। মুহুর্তের মধ্যেই গাছ পালা, বাড়ি ঘর মাটিতে লুটে পড়ল জল খেতে। ছিলাম ঘরের ভেতর। এখন দেয়াল ঘেরা খোলা আকাশের নিচে নিজেকে আবিস্কার করি। আবারও বৃষ্টি, টানা বর্ষণ। বর্ষা নয় তবুও বন্যার লক্ষণ।

পূণরায় গ্রামে হাহাকার। তবে এখন সেই স্বর নয় যে, আয় বুষ্টি আয় আয় । এখন ভিন্ন স্লোগান- মরার বৃষ্টি আকাশ যেন ফেটে গেছে। হাহাহাহা, হাসি পেল। নৌকায় চড়ে যমুনা পাড়ি দিয়ে আমি ফিরে এলাম। পান্ডুলিপি লিখব এমন সময় ফজরের আযানের শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। যে জন্য গিয়েছিলাম আর যা দেখলাম বুঝলাম কলমে তার স্বপক্ষে বা বিপক্ষে কি লিখব বা উপসংহার টানবো সেটা জেঁগে শেষ করা হলো না। শুধু মসজিদ মন্দির গীর্জার সংস্পর্শে এসে যা বুঝেছিলাম অযু করি আর ভাবি-
মন্দিরে যখন যাই
মনে লাগে দোলা,
মসজিদে যেতে মোর
হৃদয় উতালা।

মসজিদ ও মন্দির
প্রার্থনার স্থান,
পালন করি স্ব-ধর্ম
যার যেই খান।

আমি মরলে কবরে
কাউকে শ্মশ্মান,
জীবন করি অর্পণ
হই ধর্ম প্রাণ।

কেহ সুধাই আল্লাহ
কেহ ভগবান,
বুলি দু’টি শুধু মাত্র
ভাষা ব্যবধান।

ধর্ম অন্ধ জন্ম অন্ধ
দু’টোই সমান,
আগে পড়ি ধর্ম গ্রন্থ
দিয়ে মনপ্রাণ।

ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি
করা মহাপাপ,
সুতা ছিড়ে নাল টেনে
নেই কোন লাভ।

মারামারি হানাহানি
নিছক না করি,
যার ধর্ম নিজ ধ্যানে
সে পালন করি।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement