লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪
গল্প/কবিতা: ৩টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবাবা দিবস (জুন ২০১৩)

এ কেমন বাবা
বাবা দিবস

সংখ্যা

জাহিদ রিপন

comment ০  favorite ০  import_contacts ৫৫৭
বিকালে বন্দুদের সাথে বাড়ীর সামনে স্কুল মাঠে খেলছিলাম। আমার সমবয়সী দু-সম্পর্কের চাচা দেীড়ে এসে খবর দিল,তুই এখানে খেলছিস,তোর মা তো মারা গেছে। বললাম,তুই আমার সাথে সবসময় ফাজলামি করিস কেন? ছয় বছর বয়সে টাইফয়েড হয়ে প্রানে বেঁচে গেলেও চোখের দৃষ্টি শক্তি অনেকটাই কেড়ে নিয়েছে । পুরো গ্লাসের চশমা পড়তে হয়, চশমা ছাড়া কিছু চোখে দেখিনা। আর চশমা পড়ার কারনে আমাকে সহজ-সরল ও বোকাবোকা লাগে একথা সবাই বলত। আসলেই আমি সহজ-সরল হলেও খুব একটা বোক না,তবে চালাকও ছিলামনা। এজন্য অনেকই আমার সাথে ফাজলামো করত। চাচা বলল, ফাজলামিনা, যা বাড়ী গিয়ে দ্যাখ। এইতো একঘন্টা আগে মাকে দেখে এলাম ঘর ঝাড়- দিচ্ছে,সুস' মানুষ।আমরা পিঠাপিঠি পাচ ভাই-বোন থাকলেও তার কোন রোগ ছিল বলে জানতামনা।শত কাজের মাঝেও পরিশ্রানত্ম মাকে দেখতামত সদাহাস্যময়।বাড়ীর কাজের লোক,গরুর রাখাল,কৃষান,প্রতিবেশী সবার কাছে মা বিপদের ভরসা,ভালবাসার কেন্দ্রবিন্দু। কেন জানিনা মনটা মোচড় দিয়ে ঊঠল,এরকম তো হয়না,সত্যি ও তো হতে পারে। এই ভাবনা কেন যেন আমাকে শুধু বিচলিত নয়,মাথাটা শূন্য করে দিল।
কেন যেন কি এক আশংকায় দেীড়ে বাড়ী এলাম। এসে দেখি মা বিছানায় শুয়ে আছে, দেখে মনেহয় ঘুমাচ্ছেন।সর্বদা যেমন মায়ের ঘুমসত্ম হাসি মুখ দেখি,তেমনি। মায়ের পাশেই আমার ছয় মাস বয়সী ছোট ভাইটি হাত-পা ছুড়ে খেলছে,আর সব ভাই-বোনরা পাশে বসে আছে।ঘর ভর্তি লোকজন,কারো চোখে কন্নার পানি,অনেকে আবার কানাকানি করে কথা বলছে।বাবাকে দেখলাম মামা-খালাদের খবর দেয়ার জন্য লোক পাঠানোর আয়োজন নিয়ে ব্যসত্ম।আমি মায়ের পাশে গেলাম, সব সময় মায়ের গালে গাল ঘসে মুখটা ধরে যেভাবে বায়না ধরতাম ঠিক সেভাবেই করে মা-মা বলে ডাকলাম। বললাম,মা কথা বল। কি হয়েছে তোমার?একটু আগেই না আমার সাথে কথা বললে এখন কি হল? কথা বল মা,কথা বল। মা আর কথা বলেনা। বুঝলাম চাচা যা বলল তাই সত্যি! মা-মা বলে জোরে জোরে চিৎকার দিলাম। এরপর আর কিছু মনে নেই। আবছা মত এটুকু মনে পড়ছে কেউ একজন এসে আমাকে কোলে তুলে নিয়ে গেল।
পানির ঝাপটায় যখন চোখ খুলে তাকালাম,তখন হ্যাজাক এর আলোয় চারিদিক আলোকিত। প্রথমটায় কিছু বুজতে না পাড়লেও পরে সব কিছু মনে পরল।চারিপাশে কন্না আর কথার শব্দ।আমার সমবয়সী চাচা আর মেঝ খালাকে পাশে দেখলাম,কাঁদছে। আমি চোখ খুলতেই তারা আমাকে জড়িয়ে ধরল,আরো জোরে কেঁদে উঠল। আমিও তাদের জরিয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে থাকলাম।কাদঁছি,কেঁদেই চলছি।খালা কিছু বোঝাতে চাইছেন,মাথায় ঢুকছেনা,আরো বেশি কন্না পাচ্ছে। এরই মাঝে বাবা এসে,মেঝ খালাকে উদ্দেশ্য করে বলল,ওকে নিয়ে আস এখন দাফন করা হবে। অসহায় ভাবে বাবার মুখের দিকে তাকালাম, বাবা আমার দিকে তাকালেননা।মেঝ খালাকে তাড়া দিলেন,মৃত দেহ এত সময় রাখা ঠিক নয়।
বাড়ীর সামনে মসজিদের পাশে মাকে দাফনের ব্যবস'া করা হয়েছে।সাদা কাপড়ে মোড়ানো মাকে সামনে রেখে জানাজা পড়ানো হল।কবরের কাছে নিয়ে আসা হল দাফন করার জন্য।কেউ একজন বলল,ওদেরকে নিয়ে আস শেষ বারের মত মাকে একবার দেখুক।আমাদেরকে মায়ের পাশে নেয়া হল,কাপড়ের বাধন খুলে মায়ের মুখ দেখতে দেয়া হল।আমরা সব ভাই-বোনরা হাউমাউ করে কান্না শুরু করে মায়ের মৃত দেহের উপর ঝাপিয়ে পড়লাম ছুয়ে দেখার জন্য,শেষ বারের মত স্পর্শ পাওয়ার জন্য। মায়ের কপালে চুমু দিলাম,আমার দেখাদেখি ভাই-বোনরাও মায়ের কপালে চুমু দিল।বাবাকে বলতে শুনলাম,মুর্দাকে বেশি সময় রাখতে নেই তাতে তার আত্না কস্ট পায়।জানিনা কারা টেনে আমাদের মায়ের পাশ থেকে সরিয়ে আনল।আমার সেজ ভাইটা মাকে বেশি জ্বালাতন করত,আর মা মাঝে মাঝে রাগ করে বলত,যেদিন মরে যাব সেদিন বুঝবি।সেজ ভাইটা হাত-পা ছুড়ে কাঁদছে আর বলছে,মা আমি আর তোমাকে জ্বালাতন করবনা,তুমি ফিরে এসে মা।মায়ের মুখটা সাদা কাপড়ে আবার মোড়ানো হচ্ছে, আমি মায়ের মুখের দিকে তাকানো,হঠাৎ কানে বাজল মায়ের কণ্ঠ।মাথায় হাত বুলিয়ে মা আমাকে বলছে,তুমি ওদের দেখ রেখ বাবা।আমি আসে-পাশে তাকালাম,স্পস্ট মায়ের কণ্ঠ শুনলাম, মাথায় মায়ের হাতের স্পর্শ পেলাম,মোটেই ভুল হবার নয়।আমি মা-মা বলে চিৎকার করে উঠলাম।চারিদিক শূন্য মনে হয়,ফাকা ফাকা লাগে,অসহায় মনে হয়,মনে হয় এরচেয়ে মৃত অনেক শ্রেয় ছিল।
এরপর মাকে কবরে শোয়ানো হল,আমাদের ডাকা হল মায়ের কবরে মাটি দেয়ার জন্য।প্রথমে বাবা তারপরে আমরা সব ভাই-বোনরা মায়ের কবরে মাটি দিলাম।হ্যাজাকের আলোয় দেখলাম মাটিতে মাটিতে একসময় মায়ের কবর ছোটখাট একটা উচ ু টিলার রূপ নিল।চারপাশে বেড়া দেয়া হল,কবরের উপড় ধানের তুষ দেয়া হল। ভাই-বোনরা মাটিতে বসে বসে কাঁদছিলাম আর দেখছিলাম।মায়ের রুহের মাগাফরাত কামনা করে মসজিদের ঈমাম সাহেব দোয়া পড়ালেন। আমাদের নিয়ে সবাই বাড়ী চলে আসল।
বাড়ী চলে আসার পর মাটিতে শুয়ে শুয়ে একা একা কাঁদছিলাম,ভাবছিলাম মা একা অন্দকারে ওখানে কিভাবে থাকছে,মা অন্দকারকে খুব ভয় পেত।যে আমি অন্দকার আর কবরকে ভয় পাই,সেই আমি একা হাটতে হাটতে মায়ের কবরের কাছে চলে এলাম। কাঁদছি,কেঁদেই যাচিছ,কাঁদতে কাঁদতে কখন যে কবরের উপড় ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা । আমার মাথায় হাত বুলিয়ে মা বলছে,ওঠ বাবা ফজরের আযান হয়েছে।উঠে নামাজ পড়,ছোট ভাই-বোনদের ঘুম থেকে ডেকে উঠিয়ে দে,সকালের পড়া মনে থাকে ভাল,সবাই একসঙ্গে পড়তে বস,ওদের খেয়াল রাখিস।” মাথায় মায়ের হাতের স্পর্শে চোখ খুলে তাকালাম,মাকে দেখতে পেলামনা।দেখলাম মায়ের কবরের উপড় শুয়ে আছি।চারিদিক ফর্সা হয়ে আসছে। কে তাহলে আমার মাথায় হাত রাখল? না ভুল হবার নয়,মায়ের হাতের স্পর্শ আমার চিরচেনা।খেয়াল করে দেখলাম আমার পাশেই ছোট ভাই-বোন গুলো শুয়ে আছে।পরম নিশ্চিনেত্ম যেন মায়ের কোলে ঘুমিয়ে আছে। আসেত্ম আসেত্ম মনে পড়ল সব কিছু,আমি তো একা এলাম,তাহলে ওরা এল কখন? সবাই ধুলা-বালিতে একাকার। ছোট ভাই-বোন গুলোকে ঘুম থেকে ডেকে তুললাম।ঘুম থেকে উঠতেই ওদের কাছে জিজ্ঞেস করলাম ওরা আসল কিভাবে?
মেঝ ভাইটা বলল, তুমি আসছ দেখে আমরাও তোমার পিছন পিছন চলে এলাম।
জিজ্ঞেস করলাম,তোদের ভয় করেনি?
মেঝ ভাইটা বলল,না ভয় করেনি,আমরা সবাই একে অপরের হাত ধরে এখানে এসেছি।কথাটা শুনে আর কান্না চেপে রাখতে পারলামনা।হাউ-মাউ করে কেঁদে উঠলাম,বললাম,এখন থেকে এমনি করে আমরা একজন অপরের হাত ধরে থাকব কেউ কাউকে ছেড়ে যাবনা।আমার কান্নার সাথে সাথেই ছোট ভাই-বোন গুলো আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে দিল।
অনেক পড়ে দেখলাম ছোট খালা আর মেঝ খালাকে আমাদের কাছে আসতে।পরম মমতায় আমাদের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,তোরা এখানে আর তোদের কোথায় না কোথায় খুজলাম।চল বাবা বাড়ী চল,মা-বাবা কারো চিরদিন বেঁচে থাকেনা। দেখনা আমাদের তো মা-বাবা কেউ নেই। তোদের তো তবু বাবা আছে।সারা রাত না খেয়ে আছিস,ধুলো-বালিতে একাকার,গোছল করে কিছু খেয়েনে।বাড়িতে এনে আমাদের আমাদের গোছল করিয়ে নতুন কাপড় পড়ানো হল ।তখন সকাল হয়ে গেছে। খাবার খেতে দেয়া হল,খেতে চেস্টা করছি কিন' গলা দিয়ে কিছুতেই খাবার নামছেনা। ছোট ভাই-বোনদের দিকে তাকালাম ওরা কাঁদছে আর খাচ্ছে,আমার মতই যে ওদেরও খেতে কস্ট হচ্ছে তা বুঝতে আমার এতটুকু কস্ট হয়না।


ভাগ-বাটোয়ারা
দেখতে দেখতে দুদিন কেটে গেল। গ্রামের সব লোকদের দাওয়াত করে বাড়ীর মসজিদে মায়ের নামে মিলাদ পড়ানো হল। আসর নামায বাদ মিলাদ শেষে আমাদের সকল আত্নীয়-স্বজন মিলে আলোচনায় বসলেন,আমরা কিভাবে থাকব,আমাদের দেখাশোনা কিভাবে হবে?এনিয়ে দীর্ঘ আলোচনা শেষে সিদ্বাসত্ম হল,নি:সনত্মান মেঝ খালা আমার ছ’মাস বয়সী ছোট ভাইকে নিবেন।এসিদ্বানেত্ম দেখলাম মেঝ খালা মহাখুশী ।এতক্ষনে খেয়াল হল মা মারা যাবার পর থেকেই ছোট ভাইটা তার কাছে আছে। ছ’মাস বয়সী ছোট ভাইটাকে নিয়ে আমার চিসত্মা আর কস্টের বোঝা হালকা হল, নি:সনত্মান মেঝ খালার কাছে ও পরম মমতা আর আদরে বেড়ে উঠবে। এরপর যা ঘটল তার জন্য আমি মেটেও প্রসত্মত ছিলামনা। আর তিন খালা আমার ছোট দু’ভাই ও বোনকে সম্পত্তি ভাগের মত ভাগ করে নিয়ে গেলেন।বাবার দিকে তাকালাম,অনুভূতিহীন এবং কিছুটা খুশী। খুশীর কারণ কি আমরা ভাই-বোন তাদের কাছে ভাল থাকব একারনে,বুজতে পারছিনা।খুব কস্ট হচ্ছে,অনেক কস্ট হচ্ছে, ভাই-বোনদের আর একত্রে থাকা হলনা।বাবার কাছে যদি আমি থাকতে পারি তাহলে কেন ওরা পারবেনা? কিন' কিছু বলতে পারছিনা কারণ আমি জানি আমার কোন কথার এখানে গ্রাহ্য হবেনা॥ সবশেষে সিদ্বাসত্ম হল আমাকে আমার একমাত্র মামার কাছে থাকতে হবে।ভাবছি তাহলে একা বাড়ীতে বাবা কিভাবে থাকবেন? বাবা হাসি মুখে সম্মতি জ্ঞাপন করলেন।
পরদিন সকালে,সম্পত্তির মত ভাগ- বাটোয়ারা করা আমাদের চার ভাই ও বোনকে খালারা যে যার বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলেন।আমার মেঝ ভাইটার তিন বছর বয়সে টাইফয়েড হয়ে মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছিল কিস' মুখটা বেকে গিয়েছিল আর সারাক্ষন চোখ দিয়ে পানি পড়ত।ও দৌড়ে এসে আমার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,দাদা আমরা একসাথে থাকব,যাবনা। দাদা তুমি বাবাকে বুঝিয়ে বলনা। সেজ ভাই আর ছোট বোনটাও দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে একই কথা বলে কাঁন্না শুরু করে দিল।আমি নিজেকে সি'র রাখার সিদ্বাসত্ম নিয়েছিলাম কিস' পারলামনা,কেঁদে ফেললাম,ওদের শুধু এটুকু বললাম,দেখিস আমরা সবাই ভাল থাকব।
বোনটা কাঁদছে আর ওর ছোট-ছোট পাগুলো ছুড়ে বলল, লাগবেনা তোমার ভাল থাকা, মা বলছেনা আমদের একসঙ্গে থাকতে,আমরা একসঙ্গে থাকব।”আমি অনুমান করার চেস্টা করলাম আমার বোনটার বয়স কত হবে,পাচ নাকি ছয়? ওকে কোলে তুলে নিলাম,গালে কপালে চুমু দিলাম,চোখ মোছতে চাইলাম, দিলনা।বলল,তুমি যদি আমাদের একসঙ্গে না রাখ তবে আমি কোনদিন তোমার সাথে কথা বলবনা।সবাই বলত মায়ের উজ্জল ফর্সা গায়ের রং,গোলগাল মুখের গড়ন আর সরলতা নাকি আমি আর বোনটা পেয়েছি।ওকে বললাম,মা কখন একথা বলল?মা তো বলেছে আমাদের এভাবেই থাকতে।দেখনা বাবা তো তাই চায়।
ও বলল, তোমাকে আর মিথ্যা বলতে হবেনা, মা মারা যাবার সময় আমাদের বলে গিয়েছে।তুমিতো কাছে ছিলেনা, তুমি কি জান।
এতটুকু মেয়ে এতকিছু বোঝে,এ মেয়েকে আমি কি বলে সনত্মনা দিব।মায়ের মৃত্যুর সময় কাছে ছিলামনা এবেদনা আমাকে আরো কস্ট বাড়িয়ে দিল।ভাইদের মাথায় হাত বুলিয়ে,গালে-কপালে চুমু দিয়ে মিথ্যা সানত্মনা দিলাম।এরকম জোড় করেই সবাইকে আমার চোখের সামনে থেকে নিয়ে গেল।মনে হয় আমরা আমাদের মা-বাবার নয়,তাদের সম্পত্তি,কেনা ক্রীতদাস! সেজ ভাইটা ঘাড়ত্যাড়া স্বভাবের,সে এদিক-ওদিক,এরপিছনে-ওরপিছনে পালানোর জন্য সমানে চিৎকার-চেচামেচি ,কেঁদে -কেঁদে ছোটাছুটি করছিল।বাবা ওকে ধরে ওর গালে কষে এক চর মারলেন।বাবার করা আঘাত সহ্য করতে না পেরে ও মাটিতে লুটিয়ে পড়ে,গাল ধরে হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে চিৎকার করে কাঁদছিল। সে অবস'ায় ওকে পাজাকোলে করে তুলে নিয়ে যাওয়া হল।চোখের সামনে এসব হৃদয় বিদারক দৃশ্য দেখেও কিছু বলা বা করতে না পারার বেদনায় মনে হচ্ছিল,মৃত যস্ত্রনাও এর চেয়ে শ্রেয় ছিল।তখন নীরবে চোখের পানি বিসর্জন ছিল আমার একমাত্র করনীয়।

সবাই চলে গেলে মামা বললেন,এখন আমার বাড়ীর দিকে রওয়ানা হতে হয়।আমি বাবার কাছে গেলাম,তার পা ছুয়ে ছালাম করলাম।বাবা ভাল-মন্দ কিছু বললেননা, আগে যেভাবে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন,তাও করলেননা। মামার পিছু পিছু হাটতে হাটতে মসজিদের সামনে এলাম। মামাকে বলে শেষবারের মত মায়ের কবরের কাছে গেলাম।মামা তাড়া দিয়ে বললেন,তাড়াতাড়ি চলে আসবি। মায়ের কবরের কাছে গিয়ে নিজেকে আর সামলাতে পারলামনা,হুমড়ি খেয়ে পড়লাম কবরের উপড়। চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম,বললাম,মা আমি তোমার দেয়া কথা রাখতে পারিনি। ওদের আমার চোখের সামনে থেকে একে একে নিয়ে গেল আমি কিছু করতে পারলামনা মা ।মা বলতে পার কেন এমন হল,কেন তুমি না বলে চলে গেলে,বাবা কেন তার সসত্মানদের বুকে ধরে আগলে রাখতে চাচ্ছেনা? বল মা কি দোষ আমাদের?মা তুমি আমাকে ক্ষমা করোনা,কিন' তোমার অন্য সনত্মানদের জন্য স্বর্গ থেকে দোয়া কর,ওরা যেন ভাল থাকে,সুখে থাকে।
মামার কাছে এলে তার আগ্নিমূর্তি দেখে বুজতে পারলাম আনেকটা সময়ই মায়ের কবরের পাশে কাটিয়েছি। মামার তাগিদে তার পিছু পিছু হাটা শুরু করলাম। গ্রামের কাচা রাসত্মায় হাটায় অভ্যসত্ম আমি মামার হেটে ঠিক তাল মেলাতে পারছিলামনা। বেশ কয়েকবার এজন্য ধমক খেলাম।মামা হাটছেন আর মাঝে মাঝে পিছন ফিওে তাকাচ্ছেন। তার ভিতর দেখলাম বাড়ী ফেরার প্রবল তাড়া। মাথার ভিতর বয়ে যাচ্ছে অনেক চিনত্মার ঝড়,ছোট তিনভাই ও বোনটা কিরকম থাকবে?ভাবতেই চোখে জল এসে যায়।
মামার বাড়ী
মামার বাড়ী এসে পেীছতে ভর দুপুর হয়ে গেল। কতদিন পড়ে মামার বাড়ী এলাম! শেষ বার এসছিলাম মায়ের সাথে,কবে তা মনে নেই। গোসল সেরে মামার সাথে খেতে বসলাম।সামনে মামার পাঁচ স্ত্রী মানে আমার পাঁচ মামী উপসি'ত।মামা ছিলেন তার বাবার একমাত্র সনত্মান,শত কানি জমির মালিক মামা একে একে পাঁচটি বিবাহ করেছেন। একা বিশাল বাড়ী,এত সম্পদ কে দেখবে,এই দর্শন থেকেই মামার নাকি এত বিয়ে করা।যদিও এযুক্তি আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়না।কারণ বড় মামী এদেশের হলেও অন্য মামীরা দূর দেশের।শুনে ছিলাম মামা যেখানে কাজের প্রয়োজনে যেতেন সেখানে কাউকে পছন্দ হলে বিয়ে করে নিয়ে আসতেন। ইতমধ্যে আরো দুই মামী মারা না গেলে তার বউয়ের সংখ্যা হত সাত,ছেলে-মেয়েও সতের জন। ছেলে-মেয়ের এ সংখ্যা যে ভবিষ্যতে আরো বাড়বে তা বুঝতে অসুবিধা হয়না।
মামা বললেন,শোন, কাছারি ঘরে থাকবি আর বাড়ীর সামনে স্কুলে ভর্তি করে দিব,ঠিকমত মন দিয়ে লেখা পড়া করবি।আমার ছেলে-মেয়েদের পড়াবি। সময়ে সময়ে মামীদের ফুট-ফরমায়েস করে দিবি, কাজের লোকদের মাঝে-মধ্যে সহযোগিতা করবি।
আমি এমনিতে খুব চাপা স্বভাবের। ছোট বেলায় টাইফয়েড হয়ে মরতে মরতে বেচেঁ গিয়েছিলাম ।বেঁচে গেলেও রোগটি কেড়ে নিয়েছিল আমার স্বাভাবিক দৃস্টিশক্তি।চশমা ছাড়া কিছু চোখে দেখিনা।মামার দিকে তাকালাম,ঘাড় নেরে হ্যাঁসূচক জবাব দিলাম।
প্রতিদিন ফজরের আজানের সময় ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে মামাতো ভাই-বোনদের পড়তে বসাই,নিজেও পড়ি।প্রাইমারী স্কুলের গন্ডি না পেরোনো মামার ছেলে-মেয়েরা তার যে ব্যতিক্রম হবেনা এটা বুঝতে একটু সময়ই লাগল।ওরা পড়ার চেয়ে আমার পড়ায় ব্যঘাত ঘটায় বেশি।এর মধ্যে কতক্ষন এমামী ডাকে তো কতক্ষন ওমামী ডাকে,একাজ করো-দোকান থেকে এটা-সেটা এনে দাও।সকাল সাতটায় মামার বাড়ীর কাজের লোকদের সাথে ভাত খেতে হয়।বাড়ীতে কাজের লোকও কম নয়,হালচাষের কামলা,গরু-মহিষ-ছাগল-ভেরার রাখাল,সব মিলিযে পঁয়ত্রিশ জনের মত। সকালের খাবারে বাসি ডাল-তরকারি,কখনো বা শুধু পোড়া মরিচ বেশি হলে মাঝে মধ্যে গুড় জোটে। কাজের লোক গুলোর দিকে তাকিয়ে দেখতাম তারা পরম তৃপ্তিতে গোগ্রাসে খেয়ে যাচ্ছে। হাড়ভাংগা খাটুনির পরে ওদের ক্ষিদের মাত্রাটা বেশিই থাকে।। প্রথম প্রথম খেতে কস্ট হত, ওদের দেখে এখন আর হয়না।কারণ আমিও তো ওদের মতই মানুষ,ওদের মতই এবাড়ীর কামলা। এমামারইতো বোন ছিল আমার মা,আমাদের বাড়ীতেও কামলা আছে,কই তাকে তো কখনো দেখিনি তাদের এভাবে খাওয়াতে! সেই সকাল সকাল উঠে মা রান্না করে পরম মমতায় সনত্মানের মত নিজে বসে থেকে তিন বেলাই খাওয়াতেন,আমাদের খাওয়াতেন তারপর নিজে খেতেন। কিন' মামার বাড়ীতে দেখলাম কামলাদের জন্য এক ধরনের রান্না আর তাদের নিজেদের জন্য আলাদা রান্না। মাকে দেখেছি সবার জন্য একরকম রান্ন্‌া করতে।
কখনো যদি মাছ বা মাংশ জুটত তবে তা নামমাত্র,যাকে বলে গন্দ শুকে বুঝে নাও কি দিয়ে খাওয়ালাম আজ।আমি ঝাল খেতে পারতামনা,একদিন সকালে শুধু পোড়া মরিচ দিয়ে পানত্মা ভাত দিল। যা আমি কখনো করিনি তাই করে বসলাম ,আমি নোয়াখালী মামীর কাছে একটু গুর চাইলাম।নোয়াখালী বাড়ী বলে তাকে আমরা নোয়াখালী মামী বলে ডাকতাম.মামীও এতে বেশ খুশী।মামী বললেন,এই নবাবের বেটা তোর জন্য কি তোর বাপ গুর কিনে রেখেছে যে চাইলেই পাবি।আমি মোটেও একথার জন্য প্রসত্মত ছিলামনা।শুনে কান গরম হয়ে গেল,চোখ জ্বালা করতে লাগল। মামী যতক্ষন সামনে ছিলেন ততক্ষন ভাত নাড়াচাড়া করলাম,খেতে চেস্টা করেও খেতে পারলামনা। মামী চলে গেলে ভাত রেখে উঠে যেতে চাইলে মাজু চাচা বলল,আরে ভুখা মানুষের রাগ থাকতে নাই। শোন,ভুখা মানুষরা এসব বড়লোকদের কাছে মানুষনা পরগাছা,পেটেরদায়ে পরা মানুষরা এদের কাছে ক্রীতদাস। আল্লাহ এদের টাকা দিয়ে পাঠিয়েছেন কিন' মন দেননাই। দু:খ করে লাভ নাই এরা মানুষের মন বোঝেনা। খেয়ে নাও। অহংকারীদের সম্পদ আল্লাহ রাখেননা।
মাজু চাচা মাথায় হাত রাখলে চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারলামনা। মাজু চাচার কাধে মাথা রেখে অনেকক্ষন কাঁদলাম।
কত ঈদ-কোরবানী গেল কিন' ঈদের সময় বাড়ীর কামলাদের একজোড়া লুঙ্গি দিত সেছাড়া সারা জীবনে আর কিছু পাইনি । ঈদের দিনে মামাতো ভাই-বোন আর মামীদের নতুন কাপড় পড়তে দেখলেও এনিয়ে মনে কোন দু:খ ছিলনা। আশ্রয় দিয়েছে,খেতে দিয়েছে,লেখাপড়া করার সুযোগ দিয়েছে এটাইতো অনেক বড় পাওয়া। ছোট ভাইরা,বোনটা ওরা কি নতুন জামা-কাপড় পেয়েছে?একথা ভেবে কাঁদতাম। আমার ঈদের দিনটা থাকত সবচেয়ে বিভীষিকাময় আর যন্ত্রনার দিন।
মাজু চাচা
খেতে বসলে,ঘুমাতে গেলে এই মাজু চাচা আমাকে তার পাশে রাখতেন। যেদিন মামার বাড়ি প্রথম আসি সেদিন তার সাথে পরিচয়। রাতে ঘুমাতে গেলে ঠিক ভাবে বিছানা গুছাতে পারছিলামনা, মাজু চাচা দেখে এগিয়ে এলেন,আমাকে তার পাশে বিছানা করে শোয়ার ব্যবস'া করে দিলেন।বিছানা বলতে মোটা কাথা আর তেল চটচটে একটা বালিশ। যাতে কোনদিন শুয়নি, মাজু চাচা বুঝতে পেরে সবার বালিশ দেখে মোটামুটি ভাল একটা এনে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন,আজকে এটা ব্যবহার কর কাল দেখি ভাল ব্যবস'া করতে পারি কিনা। রাতে পাশাপাশি শুয়ে জানতে চাইলেন আমার মন খারাব কেন। মায়ের মৃত্যুর কথা,ভাই-বোনদের সম্পত্তির মত ভাগ-বাটোয়ারা হওয়ার কথা। মনের ভার হালকা করার জন্য যা যা হয়েছে তা সবিসত্মারে তাকে বললাম । সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে আমার কথা শুনল,আমি বলতে বলতে চোখের পানি ফেললাম,আর তারা শুণে চোখের পানি ফেলল।
মাজু চাচা বললেন, তোর মত আমারও একটি ছেলে আছে সে এবার ক্লাস সেভেন এ পড়ে।আর একটি মেয়ে আছে , ক্লাস ফাইভ এ পড়ে।বাবা বড় কস্ট করছি মানুষ রূপী অমানুষদের বাড়ীতে কামলা থেকে তাদের লেখাপড়া শিখিয়ে শিক্ষিত করার জন্য। তোরে আমরা সবাই আদর যত্ন করব,তুই চিনত্মা করিসনা। তুই শুধু মন দিয়ে লেখাপড়া করে যা।
বাড়ীর সবার কাজে-কথায় কস্ট পেলেও,তাদেরই বাড়ীর কামলা খেটে খাওয়া মানুষদের থেকে পেয়েছি অফুরনত্ম ভালবাসা। ছাত্র হিসাবে বরাবরই ভাল ছিলাম। ক্লাসে ফার্স্ট হয়ে শিক্ষদের নজরে এলাম। মামা খাতা-কলম-বই কিনে দিতে অস্বীতৃতি জানালে মাজু চাচা সহ আর সবাই মিলে চাঁদা তুলে তা কিনে দিতেন। গরমের দিনে,সারাদিনের খাটুনির পর রাতে এসে পালাক্রমে এক একজনে বসে বাতাস করতেন আর আমাকে পড়তে বলতেন। শীতের দিনে আগুন জালিয়ে গা গরম রাখার ব্যবস'া করতেন।এদের এই ভালবাসা দেখে মাঝে মাঝে কেঁদে ফেলতাম,তাদের নিষেধ করতাম এসব না করার জন্য।
মাজু চাচা বলত,বাপ,নিজের ছেলের জন্যও তো এটা করতাম,তুই শুধু মন দিয়ে পড়ে যা,এসব ভাবতে হবেনা।
রাতে পাশাপাশি শুয়ে মাজু চাচা শুনাত তার ছেলে -মেয়ে শিক্ষিত হয়ে চাকুরী করবে,সে আর তার বউ তখন আবসর নিয়ে আরাম-আয়েশে দিন কাটাবে। একদিন মেয়েকে বিয়ে দিবেন,ছেলেকে বিয়ে করাবেন,নাতি-নাতনী হবে। তাদের নিয়ে হেসে খেলে দিন কেটে যাবে। প্রায় প্রতিদিন রাতে মাজু চাচা তার এই সপ্নের কথা বলতে থাকেন। আমি কখনও শুণি,আবার কখনও নিজেকে নিয়ে,ভাই-বোনকে নিয়ে ভাবনার অতলে হারিয়ে যাই।ওরা কেমন আছে জানিনা। চাপা কান্নায় চোখের জ্বলে বালিশ ভিজাই।মাঝে-মধ্যে একা বাহির হয়ে অন্দকারে বসে জোড়ে জোড়ে কাঁদতাম,বিনিদ্র রাত কাটাতাম। কখনো কখনো মাজু চাচা ঘুম ভেংগে পাশে না দেখলে উঠে আসতেন,কাঁদতে দেখে নিজেও কেঁদে দিতেন। ধরে নিয়ে শুয়ে দিতেন,পরম মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পড়িয়ে দিতেন।
আমার মেট্রিক পরীক্ষার ঠিক দুই মাস আগে মাজু চাচা ভীষন অসুস' হয়ে পরলেন।এলাকার কবিরাজ এর কাছ খেকে ঔষধ এনে খাওয়ালাম।মোটামুটি সুস' হলে তিনি বাড়ী যেতে চাইলেন।মামার কাছে জমানো সব বেতন টাকা চাইলে তিনি সব দিলেননা । মন খারাব করে যাওয়ার সময় অসুস' মাজু চাচা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করলেন,বললেন,বাপ,মন দিয়ে পড়বা,এই গোরস'ান থেকে বেড়িয়ে ভাই-বোনদের উদ্বার করবা। আর আমার ঠিকানা লিখে রাখ আমি আর নাও আসতে পারি,কতদিন আর মানু্রেষর সংসার টানব নিজেরওতো সংসার আছে। যদি না আসি তবে পরীক্ষা দিয়া আমার বাড়ীতে বেড়াতে যাবা,তোমার আসা যাওয়ার খরচা সব আমি দিব। তোমার চাচির কাছে তোমার কথা বলব। আর রহিমকে আমি বলে গেছি ও তোমার খেয়াল রাখবে,সবাইকেই বলে গেছি,এমনিতেই সবাই তোমার খেয়াল রাখবে।
তারপর রহিম চাচাকে বললেন, ভাই রহিম আমার এতিম বাপটার একটু যত্ন নিস ।ওর উপড় অনেক বড় দ্বায়িত্ব,ওকে অনেক বড় হতে হবে।তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,মনে রাখিস বাপ।
আজ কতটা বছর পিতার স্নেহে দিয়ে যে লোকটি আমাকে আগলে রেখেছিল সেই মাজু চাচা যেদিন চলে গেলেন সেদিন অনেক্ষন কাঁদলাম। রহিম চাচা তার উপড় অর্পিত দ্বায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন করেছেন।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement