লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৩০ নভেম্বর ১৯৮২
গল্প/কবিতা: ৪৪টি

সমন্বিত স্কোর

৬.৮

বিচারক স্কোরঃ ৪.২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৬ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftঅন্ধকার (জুন ২০১৩)

অন্ধকারে আলোর ঝিলিক
অন্ধকার

সংখ্যা

মোট ভোট ৩৯ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৬.৮

জাকিয়া জেসমিন যূথী

comment ৩৩  favorite ৪  import_contacts ৩,৩৭৭
।।১-বিষন্ন প্রহর।।

এক মধ্যবয়স্কা মা তার মেয়ে পায়েল এবং ছেলে ইফতিকে নিয়ে প্রায় বারো বছর পরে কিছুক্ষণ আগে ঢাকা থেকে রংপুরে মেজ জায়ের বাড়ি বেড়াতে এসেছে।
দুপুরে খাবার টেবিলে সবাই খেতে বসেছে। পায়েলের মুখে দীর্ঘ বাস ভ্রমণের ক্লান্তির ছাপ। খেয়ে তৃপ্তি পাচ্ছে না! টেবিলে রয়েছে চিংড়ির দোপেয়াজা, মুড়োঘন্ট, লাউ শাক ভাজি, ঢেড়শ ভাজি, মাসকলাইয়ের ঘন ডাল, গরুর গোশের ভুনা। খাবারের প্লেটে হাত রেখে পায়েল ভাবছে সবগুলো আইটেমই ওর খুব পছন্দের কিন্তু একটুও স্বস্তি পাচ্ছে না। বেশ ক্ষুধা সত্বেও মনে হচ্ছে খেলেই সব বেরিয়ে আসবে। বমি বমি লাগছে। গলার কাছে কি যেন একটা আটকে আছে। কোনরকম সামান্য খেয়ে হাত ধুতে উঠে পরলো।
দুই তিনদিন কেটে গেলো। পায়েলের মধ্যে কোন উচ্ছ্বলতা নেই। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেরীতে। দিনের বেশিরভাগ সময়েই ছাদে গিয়ে বসে থাকে। চাচীর বাড়ি এসেছে কতদিন পর। আনন্দে কাটানোর কথা। বেশিরভাগ সময়েই একা একা থাকে। চাচী বেশ খেয়াল করছেন ওকে। পায়েল তো এইরকম না। হাসিখুশী চঞ্চল বাড়ি মাথায় করে রাখা মেয়ে হঠাত এত চুপচাপ কেন?
খাওয়ার টেবিলে ধরলেন তিনি, “পায়েলের কি এখনো জার্নির টায়ার্ডনেস যায়নি?”
“ও একটু ঐরকমই। ওর জন্যই তো আমরা এসি বাসে আসতে পারলাম না! ওর বলে এসির গন্ধ সহ্য হয় না!”
“পায়েল তো খায়ও না ঠিকমত। ইদানিং বোধহয় শরীরের খুব যত্ন নেয় নাকি?” মৃদু হেসে বলে ওঠেন চাচী আবার, “ওর বিয়েটিয়ের কি করলা, ছোট ভাবী? রেজাল্টের আগেই ভালো পাত্র দেখে বিয়েটা সেরে ফেলো।”
পায়েলের মা মেয়ের চোখে চেয়ে জবাব দিলেন, “ওর বলে একজনকে পছন্দ। দেখি!”
“ওমা তাই নাকি? সে তো খুব ভালো কথা। আজকাল নিজেরা পছন্দ করে ফেললেই ভালো। জুটি মেলানো যা কষ্ট। আমার টুশির বিয়েতেও তাই আমি অমত করি নাই। ছেলের অভাব পূরণ করে দিয়েছে আল্লাহ আমার দুই মেয়ের জামাই দিয়েই” চাচীর কথায় স্পষ্ট আনন্দ।
দুই জা কথা বলতে থাকেন। পায়েলের খাওয়া হয়ে গেছে। হাত ধুতে উঠে পরে।


।।২-চিন্তার জাল।।

ষাটোর্ধা মিসেস জাহান বারিধারায় নিজেদের এপার্টমেন্টে থাকেন। বছর তিনেক হলো স্বামীহারা হয়েছেন। এই বয়সে নিজেকেই শুধু না দুটি জোয়ান ছেলে আর এক মেয়েকেও সামলাতে হয়! এদের বাবা এঞ্জিনিয়ার শাফকাত জাহান চৌধুরী নামকরা লোক ছিলেন, নিজের চেষ্টায় এতীম সন্তান হয়েও নিজের পায়ে নিজে দাঁড়িয়েছিলেন। মিসেস জাহান নিজেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল সায়েন্সের মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। কিন্তু, ছেলেগুলো কেন যে প্রতিষ্ঠিত হতে পারছে না মাঝেমাঝে তা ভেবে অদৃষ্টের দিকে চেয়ে তীব্র রাগ প্রকাশ করেন। ইদানিং আবার জুটেছে আরেক আপদ। বেকার ছেলের বউয়ের খায়েশ দেখে তো চোখে অন্ধকার দেখছেন। সেই মেয়ের ভাবসাব দেখলে মনে হয় কবুল হলেই খুশি আর কিছু চায় না! কিন্তু সাদমান যে কবে স্টাবলিশ হবে কবে নিজের পায়ে দাঁড়াবে সেটাই তো নিশ্চিত না বিয়ে করবে কি! তার উপর বিয়ে না হয় করলো বউয়ের খরচাপাতি কোত্থেকে আসবে। আজকালকার মেয়েদের যা ডিমান্ড! একটা বউ পালা আর হাতি পোষা সমান কথা!
“মেয়েটাকে এত যে ফোন করে বুঝাচ্ছি! বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ম্যাচিউর মেয়ে কিচ্ছু বুদ্ধিশুদ্দি নাই! পড়াশুনা শেষ। পাশ টাশ করে ভালো একটা স্টাবলিশ ছেলে ধর। আমার বেকার ছেলের ঘাড়ে এসে জুড়েছে!”
“কেন মা, কি হয়েছে? সাদমান এইবার পাশ করলেই ক্যারিয়ার শুরু হয়ে যাবে। আর ওকে নিয়ে চিন্তা থাকবে না আপনার! আর ভালোবাসা অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করে মা!” কথাটা বলতে বলতে ছেলের সুজি বানাতে লাগলো মিসেস জাহানের বড় ছেলের বউ ইরিন।
“কচু হবে! ঐ মেয়ের সময় অসময়ের আবদার মেটাতে মেটাতে আমার ছেলেটা আরো পাগল হবে। কোত্থেকে যে এক আপদ জুটেছে! মেয়ের মা কি আর কোন ছেলে চোখে দেখে না! এত ছেলে থাকতে আমার ছেলে কেন! বেকার শুনেও সরে না! এটা কি!”
শাশুড়ি খেপে গেছেন দেখে আর কিছু বলা প্রয়োজন মনে করলো না বড় বউ। ছেলেকে খাওয়াতে নিজের ঘরে চলে গেলো। এখন ছোট ছেলের জন্য হা হুতাশ কছেন। খানিক পরে মা ছেলে মিলে যাবেন। মাঝখান থেকে কিছু বলে খারাপ হতে চায় না সে।
রান্নাঘরে গরমের মধ্যে কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছেন মিসেস জাহান। ছোট ছেলে সাদমান টিভি দেখছে বসার রুমে। সামনে মেডিকেল ফাইনাল প্রফ পরীক্ষা। ওর সাইকিয়াট্রিস্ট বলেছেন, এইবার ও পরীক্ষা দিতে পারবে। অনেকটা সুস্থ এখন। কিন্তু পড়াশুনা করতে তো তিনি দেখছেন না। সারা রাত জেগে থাকে আর সারাদিন ঘুমায়। নিশ্চয়ই ঐ মেয়ের সাথে ফোনে কথা বলে। আপদ জুটার আর সময় ছিলো না। বেলা করে ঘুম থেকে উঠো। ঠিক সময়ে খাওয়া নাই। ঘুম নাই। যখন তখন খালি মোবাইলে গপ্পো। আর সকাল বিকাল দেখা করো। সুখ কত! বুড়া দামড়া ছেলে। কামাই নাই রোজগার নাই। সারা দিন-রাত খালি ওই মেয়ের গল্প। পায়েল এই করেছে। পায়েল ওই করেছে!
কিছু সময় পর কষ্টে তাঁর দু’চোখ বেয়ে পানি ঝরতে থাকে। ছেলের এখন চৌত্রিশ। কবে যে পাশ করবে ছেলেটা ভেবে পান না! ওর সাথের সবাই বউ বাচ্চা নিয়ে সুখে থাকছে ওর কেন ইচ্ছে করবে না! ছেলের কষ্ট কি তিনি বুঝেন না? কিন্তু তাঁর ছেলের সমস্যাটা শুনলে কোন ফ্যামিলি কি রাজী হবে? সবকিছু না জানিয়ে কোন মেয়েকে ঠকানো সম্ভব! নিজেরও যে একটা মেয়ে রয়েছে! আরেকটি সুখী মেয়েকে কেন তিনি নরকে টেনে আনবেন?
সাদমানের সমস্যাটা যে কতটা গভীর তা নিজেও পুরো খোলসা করতে পারছেন না। সেই মেয়েটাও দিনে দিনে আরো গভীরভাবে দূর্বল হয়ে পরছে। হবেই। মেয়ে মানুষের মন কোথাও গেড়ে বসতে সময় নেয় না! তিনি কি করবেন ভেবে পান না! মেয়েটার ভালোর জন্য ও’কে বুঝাতে গিয়ে ভয়ও পান। পায়েল যদি সাদমানকে সব বলে দেয় তাহলে ছেলে মাকে ভুল বুঝবে! কি যে করবেন কার কাছে যে সাহায্য চাইবেন বুঝতে উঠতে পারেন না তিনি। সাদমানের সমস্যাটা কেউ বোঝে না! সবাই ওকে সুস্থই মনে করে। অথচ ছেলেটা যে মাঝেমাঝে রেগেমেগে উল্টাপালটা কাজ করে! ইদানিং বেশি টেনশন সহ্য হয় না তাঁর। মেয়েটাকে সব বলে দেয়া দরকার! কয়েকবার ফোন করেছেন। কিন্তু আসল কথাটাই বলা হয়ে ওঠে না।


।।৩-প্রেমের ঘোর।।

‘তুমি এসে আমার মনে ফাগুন জাগালে...’ মোটা বেসুরে গলায় গানটা গাইছে সাদমান। হাতে ধরা নোকিয়া এস ফরটি সেট। এমনভাবে ধরা যেন কেউ কেড়ে নিয়ে যাবে। শক্ত করে তালুতে চেপে রেখেছে। ডান হাতে মোবাইল আর বাম হাতে চুলে হাত বুলাতে বুলাতে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে মায়ের ঘরের দিকে গেলো। উঁকি দিয়ে মায়ের ঘরে মা’কে পেলো না। হেঁটে চলে এলো বারান্দায়। সেখানেও নেই। এরপরে ভাই-ভাবীর ঘর পেরিয়ে চলে এলো উলটোদিকে কিচেনে। মাকে খুঁজে খুঁজে পেলো এতক্ষণে।
“আম্মু, একশোটা টাকা দাও তো। আমি একটু বাইরে যাবো। পায়েল ডেকেছে!”
“আজকে আবার কি হয়েছে? এত ঘন ঘন দেখা হওয়ার দরকার কি?”
“আম্মুউউ যাই না! না গেলে ও খুউব রাগ করবে!” আদুরে বাচ্চার মতন দু’হাতে মায়ের গলা জড়িয়ে বলে উঠে সাদমান।
“আমার কাছে টাকা নেই। আজকে যেতে হবে না! আরেকদিন যাও!”
“ভাইয়ার কাছ থেকে নিয়ে দাও না” সাদমান জেদ করতেই থাকে। জানে জেদ ধরলে মা ঠিকই দেবে। তাতেও কাজ না হলে জোরে একটা হাক দেবে! চেয়ারটা ধুম করে ফেলে দেবে! ব্যস! প্রয়োজনে সেই ওষুধ প্রয়োগ করবে! তবু যেতেই হবে!
“জান! বিকেল ৫টা! ধানমণ্ডি লেক!” বলে পায়েলের নাম্বারে একটা এসএমএস করতে করতে রান্নাঘর থেকে সরে বাইরের দরজা খুলে চলে এলো ছাদে। ওরা পঞ্চম তলায় থাকে। এটা ওর খুব প্রিয় একটা জায়গা। খুব মন খারাপ থাকলেও সে এখানটায় আসে। আবার খুব ভালো লাগলেও। আজ ওর মন খুব ভালো। নীল আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে অন্যরকম এক অনুভব। ‘আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে’ তারপরে পায়েলের কথা মনে পরলো। দেখা হবার দ্বিতীয় দিন। প্রথম দিনে শাড়ি-পাঞ্জাবী পরলেও ঐদিন ছিলো সালোয়ার কামিজ আর শার্ট প্যান্টে দেখাদেখির আবদার দুজনের। ঢাকা ভার্সিটি মধুর ক্যান্টিনের বাইরে চেয়ার পেতে বসেছে! দুজনে পাশাপাশি বসে স্ন্যাকস আর কফি খাচ্ছে। শীতের চলে যাবার পালা। কিন্তু সেদিন খুব বৃষ্টি হয়েছিলো। পায়েলের গায়ে কোন শাল নেই। আটোসাঁটো কামিজে ওর শরীরের প্রতিটি বাঁক স্পষ্ট। কোথাও এতটুকু বাড়তি মেদ নেই। এরকম আবেদনময়ী একজন ওর এত কাছে! আহা! দু’জনের মাথাতেই হয়তো একই চিন্তা উঁকি দিয়েছিলো নইলে খানিক পরেই কেন পায়েল ওর জুতো থেকে খোলা পায়ের পাতার উপরে নিজের পা রাখবে! কনকনে শীতের রাতে পায়ে পায়ে ছুঁয়াছুঁয়ির সেই গরম গরম আনন্দটা কোনদিনও ভোলার নয়! পুরনো সেই স্মৃতি ভাবতেই এই খোলা আকাশের নিচে এখনো সেই গরম রোমান্টিক শিহরণ ফিরে এলো! তলপেট থেকে আরো নিচে টিংটিং শুরু করেছে! “নাহ নিচে যেতে হবে! তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে একটু ঘুম! আজকে জানের সাথে দেখা!” নাকে চোখে হাস্যোজ্জ্বল আভা নিয়ে সাদমান নিচে নেমে এসে বাসায় ঢুকে শাওয়ার নিতে বাথরুমে ঢুকে গেলো।
এদিকে মিসেস জাহান মোবাইলে টিপে টিপে একটা নাম্বার ডায়াল করলেন। ‘তুমি আসবে বলে তাই, আমি সকাল সন্ধ্যা বসে থাকি...’ ওয়েলকাম টিউনটা সুন্দর। গান পুরোটা শেষ হবার আগেই রিসিভ হয়ে যায়। মিসেস জাহান কথা বলতে শুরু করেন, “শোন পায়েল, তুমি নাকি আজকে সাদমানকে ডেকেছো? শুনো, আমি আগে বলি। তারপর তুমি কথা বলো। ওকে তুমি এখনো বুঝো নাই, বুঝছো? ও রাতে ঠিক মত ঘুমায় না। সারা রাত কি তোমার সাথে কথা বলে?” পায়েলের জবাব মিললো, “আন্টি, আমি তো রাত বারোটার মধ্যেই ঘুমিয়ে যাই আর...” পায়েলের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে তিনি বলতে থাকেন আবার, “ওর তো সামনে পরীক্ষা! এরকম রাত জেগে কথা বলা, যখন তখন বাইরে বাইরে বেড়ানোর কোন মানে আছে বলো? ওকে যখন তখন ডাকবা না বুঝছো? ওর সমস্যাটা তুমি জানো না। তুমি ওর সাথে একটু সাবধানে চলবে। বুঝেছো কি বললাম? সাবধানে থাকবে! আর শুনো আমার ছেলেকে তুমি কিন্তু বোলো না যে আমি কল করেছিলাম। ওকে রেগুলার ঠিকমত পড়াশুনা করতে বলো। পাশ না করলে ইন্টার্নিতে না ঢুকলে আমি তো ওর বিয়ে দেবো না! আচ্ছা, আমি এখন রাখি। পরে কথা বলবো।”
পায়েল জাস্ট হতভম্ব! “ভদ্রমহিলার সমস্যাটা কি? জোয়ান ছেলেকে দেখা করতে আটকান কেন? কি খালি বারে বারে সমস্যা সমস্যা করেন! আজাইরা! সব কথাই ও মা’কে কেন বলে? ধুর!”
রাগ করে সাদমানকে একটা মেসেজ দিলো, “এই, মা’কে জানিয়েছো নাকি দেখা হওয়ার কথা?”
ফিরতি মেসেজ এলো, “হ্যাঁ!”
আবার রিপ্লাই পায়েলের, “আশ্চর্য! সব কথাই মা’কে বলতে হবে?”
“আরে, কোথায় যাবো আম্মুকে বলবো না?” আবারো মেসেজ আসে!
“জানাবা ভালো কথা। এই নিয়ে যেন আমাকে কোন কথা শুনতে না হয়!”
“তোমাকে কেন কথা শুনতে হবে? আশ্চর্য! বিকেলে আসবো। এখন ঘুমোচ্ছি। লাভ!”
পায়েল চিন্তায় পরে যায়। দজ্জাল মহিলা শেষ পর্যন্ত ওকে বের হতে দেবেন তো! নিজেও দুপুরে ঘুমোয়। কিন্তু সাদমান আসবে না আসতে পারবে না ভেবে অস্থিরতায় ঘুমটা লেগেও লাগে না।
মা ছেলেকে লোভ দেখান, “তুই এভাবে দেখাদেখি না করে পাশ করে দেখা। তাহলেই পায়েলের সাথে তোর বিয়ে দেবো।”
শেষ পর্যন্ত মায়ের শর্তের দেয়াল ভেঙ্গে বেরোতে পারেনা সাদমান। অভিমান চেপে বসে।


।।৪-স্বপ্নে বাঁধা বাড়ি।।

পায়েল আর সাদমান। দুজনের বয়সের ব্যবধান ছাড়া আর প্রায় সব বিষয়েই অসম্ভব মিল। মিলের শুরুটা একেবারে দেখা হবার দিন থেকে শুরু। দুজনেই বন্ধুর জন্মদিনের জন্য বসুন্ধরা সিটি শপিং মলে গিফট কিনতে গিয়েছিলো। ঘুমোবার আগে উভয়েই কিছুক্ষণ বই পড়বে অথবা গান শুনবে। কারোই বাবা নেই। মারাত্নক রাগ ও অভিমানটা দুজনেরই! মা’ই পায়েলের সমস্ত পৃথিবী। আর সাদমান আম্মুর অনুমতি ছাড়া এক পা’ও এদিক ওদিক নড়ে না। তবু, কোন বাঁধাকেই বাঁধা বলে ভাবছে না তারা। মিয়া বিবি রাজী তো কেয়া কারেগা কাজী! দুই ফ্যামিলির কেউ শেষ পর্যন্ত এক না হলেও এরা চার হাত এক করতে পিছপা হবে না এমনই অংগীকারে বাঁধা পরেছে। সারাদিন হয় ফোনে কথা বলা। না হয় মোবাইলের এসএমএস। প্রতিদিন অন্তত একশোটা মেসেজ এসে ওদের মোবাইলের ইনবক্সটা ভর্তি হবেই। সকাল সন্ধ্যা ফেসবুকে চ্যাটিং আর টুইটার মেসেজ তো রয়েছেই। একটা না একটা মাধ্যম রয়েছেই পরস্পরের আত্মার সাথে জুড়ে থাকা। এ যেন সিনেমাকেও হার মানানো একটা সুন্দর প্রেম কাহিনী।
কিন্তু সুখে দুঃখে মেলানো আমাদের এই জীবন। প্রকৃতির সাথে পাল্লা দিয়ে যখন মহাসেন ঝড়ের পূর্বাভাস দেখে দেখে প্রত্যেকটা জেলা উপজেলার মানুষগুলো আতংকে অস্থির, সেই মুহুর্তে ঝড়ের পূর্বাভাস এই দু’জনার মাঝেও। মাত্র মাসখানেকের পরিচয়েই গভীর ভালোবাসা, প্রেম আর বিয়ের স্বপ্ন। পায়েল খুব অল্পেই সন্তুষ্ট হয়ে যাওয়া মেয়ে। একটা উথাল পাথাল প্রেম চেয়েছিলো জীবনে। সেই প্রেম এসেছে। সে এটাকে যেকোন মূল্যে ধরে রাখবে। আর তাই নিজে মাস্টার্স পাশ করে ফেলবে। সামনে ওর ভালো চাকরী হবে আর যাকে পছন্দ করেছে বিয়ে করবে বলে সে যে কয়েক বছর পরীক্ষা না দিয়ে দিয়ে অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে ক্যারিয়ার কবে শুরু হবে তাও নিশ্চিত নয় তা জেনেও মানুষটিকে দূরে সরিয়ে দেয়ার পক্ষে যেতে পারলো না। বরং এই মানুষটার পাশে দাঁড়িয়ে রইলো। কারণ পায়েল বিশ্বাস করে ভালোবাসায় সব হয়। কোন অসম্ভবই অসম্ভব থাকে না।

কিন্তু এতবার পরীক্ষা বাতিল করার পেছনের কারণ ঘাটতে গিয়ে ও জানতে পারলো, “সাদমান খুব জটিল মানসিক সমস্যা ফোবিক ডিসঅর্ডারে ভুগছে; ও হয়তো আর কোনদিনই পাশ করতে পারবে না।” সম্পর্কের যখন দু’মাস তখন পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা অনেকটাই গেড়ে বসে যায়। তাই, পায়েলের মনে এই নিয়ে কোন দ্বিধা কাজ করলো না। পরীক্ষা দিতে না পারলে পড়াশুনা বাদ দিয়ে না হয় বিজনেস করবে। আর কিছু না থাক ভালোবাসা তো আছে।
কিন্তু মানুষ যা ভাবে তা যদি সবসময়ে হতো তাহলে তো উপরওয়ালার ইচ্ছা বলে কোন বাক্য মানুষের মুখে মুখে ফিরতো না! রংপুরে আসার আগের দিন। লালমাটিয়ায় নিজেদের বাড়ি। সব ফ্লোর ভাড়া দিয়ে ওরা থাকে পাঁচতলায়। পূর্বপাশে। পশ্চিম পাশের ফ্লোর ফাঁকা। ছাদই রয়ে গেছে। সেখানে বাগান করেছে ও।
প্রতিদিনের মত সকালে ঘুম থেকে জেগেই পরস্পরকে শুভ সকাল জানানো দু’জনের প্রতিদিনের রুটিন। সাথে ‘লাভ’, ‘ফিয়ান্স’, ‘ডার্লিং’, ‘সুইট হার্ট' শব্দগুলো থাকবেই। সাদমানের মোবাইল থেকে আসা রিপ্লাই মেসেজে ওর ভেতরটা গুড়িয়ে যাচ্ছে! “ইউ আর নট মাই ফিয়ান্স ইয়েট! ফার্স্ট নো দা ওয়ার্ড প্রোপারলি। দেন ইউজ ইট!” বলা নেই কওয়া নেই কোন ঝগড়াঝাটি রাগারাগি নেই এরকম কথা সাদমান কেন লিখবে! মেসেজটা পাওয়ার সাথে সাথেই ও কল করে যাচ্ছে। কিন্তু ফোনটা ওপাশ থেকে কেউ রিসিভ করছে না।
আগের রাতে বৃষ্টি হয়েছিলো। আর সেই বৃষ্টির রেশ ছড়িয়ে গেলো পায়েলের হৃদয় কোণেও! নানারকম ফুল-ফল গাছে ছাওয়া ওর প্রিয় ছাদের এক কোণে এসে সাবধানে বসে ডান হাতে মোবাইল চেপে একটা নাম্বার ডায়াল করে ‘চলো দুজনে হারাই, মেঘের নীলিমায়, দুজনে জোছনার আলোর নিচে এক হয়ে যাই... চলো দুজনে হারাই...’ সুন্দর ওয়েলকাম টিউনটা শুনতে থাকে আনমনে মুগ্ধতায়... ওপাশ থেকে হঠাত রিসিভ করা হয়। ও’ও গান ভুলে কথা বলে ওঠে কান্না ভেজা উত্তেজিত কণ্ঠে_
“হ্যালো, সাদমান কি মেসেজ দিলে এটা?”
ও পাশ থেকে কোন শব্দ শুনা যায় না। রিসিভ করেছে অথচ কথা নেই। ও আবার জিজ্ঞেস করে,
“হ্যালো সাদ!”
“হ্যালোওও...” একটা মেয়ের স্লো কন্ঠ শুনে পায়েল জিজ্ঞেস করে,
“কে বড় ভাবী?”
“সরি আমি তো সিংগেল। কারো ভাবী নই!
“ওহ!”
“বুঝলাম না ভাবী কাকে বলছেন?”
“আপনি কে কথা বলছেন সেটাও তো আমি বুঝছি না!”
“সাদমান কে? কাকে চাইছেন?”
“সাদ মানে সাদমান”...একটু লজ্জিত দ্বিধা জড়ানো স্বরে বলে উঠে “আমার হবু বর। এটা তো সাদমানের নম্বর।”
“সরি? এটা আমার নাম্বার!”
“আপনার নাম্বার কি করে হয়? এই নাম্বারে আমি তো রাতেও যোগাযোগ করেছি।”
“সরি, আপু। এটা আমারই নাম্বার। আপনার বিশ্বাস না হলে গ্রামীণ ফোন কল সেন্টারে গিয়ে খোঁজ নিতে পারেন।” শুনে এইবার গেলো ক্ষেপে। বলে উঠলো- “আরে কি আশ্চর্য! এরকম কি করে হবে? আমি সব সময়ে একটা মানুষের সাথে এই নাম্বারে কথা বলতেছি। এই নাম্বার থেকে আমার মোবাইলে কত এসএমএস এসেছে। সারাদিনই আসে। গত তিন মাস ধরে কথা বলছি আমি এই নাম্বারে এক টানা। এটা হঠাত আপনার নাম্বার হয় কি করে? আপনার নামটা বলুন।”
“আমি কেন আপনাকে আমার নাম বলবো? আপনি কখনো আপনার হবু হাজবেন্ডের মোবাইল চেক করে দেখেছেন? দেখেন নি তো?
“মোবাইল চেক করে দেখার বা সন্দেহ করার কথা আমি ভাবি না!”
“ও! উচিত ছিলো! যাই হোক, বারে বারে কল করে জ্বালাবেন না!”
“আমি জ্বালাচ্ছি?”
“জ্বালাচ্ছেন না? এক কাজ করুন-আপনার নম্বরটা কল ডাইভার্ট করে রেখেছেন কিনা তাহলে সেটা চেক করুন” বলে মেয়েটা লাইন কেটে দেয়।
সাদমানের মোবাইলে একটা অচেনা মেয়ে কথা বলবে কেন? দূরে আকাশে মেঘ জমেছে। আজ রাতেও বোধহয় বৃষ্টি হবে। হঠাতই খুব বেশি মন খারাপ হয়ে যায় পায়েলের। আরেকটা নাম্বারে কিভাবে কল চলে যায় ও বুঝতে পারে না। কল ডাইভার্ট কি একেই বলে! সাদমান এই নাম্বারে কেন কল ডাইভার্ট করে রাখবে? মেয়েটা কি সাদমানের গার্লফ্রেন্ড? মেয়েটাকে যদি ডিস্টার্বই করা হবে তাহলে এত শান্ত স্বরে কথা বলে কেন? মজা দেখে? কোনকিছু নিয়েই পায়েলের হিংসেবোধ নেই। শুধু একটা জায়গা ছাড়া। এই দুনিয়ায় কোন মেয়ে আছে যে তার সবচেয়ে প্রিয় পুরুষটিকে অন্য একটি মেয়ের সাথে ভাগ করে নেবে! সাদমানের পাশে কোন মেয়েকে পায়েলের সহ্য হয় না!
প্রথম দু’তিনদিন অভিমানে পায়েল কথা বলে না। ভেবে নিয়েছিলো ওটা সাদমানের দুষ্টুমি হলে ও নিজে থেকেই যোগাযোগ করবে। কিন্তু শুধু অপেক্ষায়ই কেটেছে ওর। এর মধ্যে ঢাকা ছেড়ে এতটা দূরে আসা। এখন তো ইচ্ছে থাকলেও ছুটে বারিধারায় যেতে পারবে না। এক সপ্তাহের উপরে হয়ে গেছে সাদমান ওর সাথে যোগাযোগ করছে না। এদিকে পায়েলের ফ্যামিলি ওর নিজের পছন্দেই বিয়ে দেয়ার জন্য রাজী হয়ে বসে আছে। সারাক্ষণই কথায় কথায় সাদমানের প্রসঙ্গ টেনে আনে ওরা। পায়েলের খুব মন খারাপ। কিভাবে বলবে ও সম্পর্কের সুতোটা কিভাবে যেন ঢিলে হয়ে গেছে। কারণটা নিজেই জানে না!
সাদমান কি করছে না করছে তার সামান্য ধারণা পায় ওর টুইটারের স্ট্যাটাস দেখে। ওকে ট্যাগ করে কিছুই লিখে না! যেন পায়েল নামের কাউকে ও চিনেই না। ফোবিক ডিসঅর্ডারে কি এরকম হয়? স্মৃতি হারিয়ে যায় নাকি এসব ইচ্ছাকৃত?
হবু শাশুড়ির সাথে কথা বলতে ওর লজ্জা লাগে। কখনোই নিজে থেকে কল করে না। আর তাছাড়া ভদ্রমহিলা এত দ্রুত কথা বলেন। নিজের কথা ছাড়া অন্যকে কিছু বলার সুযোগ দেন না। আর কোন উপায় না দেখে একদিন পায়েল ফোন করতে বাধ্য হলো। এবারও ব্যতিক্রম কিছু হলো না। ভদ্রমহিলা এতটুকুই জানালেন, “সাদ নিজে থেকে কথা না বললে তুমি যোগাযোগ করবে না। তুমি রিজার্ভ থাকো।” ফোনটা ছেড়ে পায়েল স্বগরোক্তি করে উঠলো, “ধুর!”
বান্ধবীরা পরামর্শ দেয়, “এত ভেঙ্গে পরিস না! ও ছাড়া কি আর কোন ছেলে নেই? গার্ডিয়ানকে বলে অন্য কাউকে খুঁজে নিবি!” কিন্তু, প্রেমিকার মন কি সহজে ছাড়া পায় এই এতটুকু উক্তিতে? পায়েল ভাবে, “এত সহজে কোন কারণ ছাড়া একটা লোক এরকম ব্যবহার কিভাবে করতে পারে? ওর দোষ কি!” কিন্তু ঐ যে অভিমান! ভেতরে ভেতরে গুমড়ে মরবে কিন্তু কাউকে কোন কিছুর জন্য নালিশ করবে না। শুধু যার ফেরার কথা সে যদি একটু সরি বলে এসে পাশে দাঁড়ায় তাহলেই ওর সব রাগ পানি হয়ে যাবে।
কিন্তু কই? সাদমান তো আর ফেরে না! ধীরে ধীরে পায়েলের বিষন্নতা বাড়তে থাকে। রাতে ঘুম কমে যায়। সারাটা রাত মোবাইলটা একটু পরে পরে বালিশের নিচ থেকে নিয়ে দেখে টুইটারে কোন বার্তা এলো কিনা! পুরো রাত জেগে থেকে থেকে ইদানিং ওর মাথাটাও বেশ ব্যথা করে। চেহারায় নামে ক্লান্তি। বিষন্নতা! প্রকৃতির এতটা কাছাকাছি সবুজের মাঝে এসেও ধীরে ধীরে ও যেন কোথায় হারিয়ে যেতে থাকে। মাত্র এক সপ্তাহে ওর চেনা পৃথিবীর রঙ পালটে যায়। একটা প্রেম যেকোন নারী পুরুষের জীবনে যেমন প্রজাপতির ডানায় ভর দিয়ে হাজারো রঙের স্ফুরণ ঘটায় তেমনি সেই ভালোবাসা হারালে সারা পৃথিবী জুড়ে অন্ধকার নেমে আসতেও সময় লাগে না। ধীরে ধীরে মাত্র সাত দিনের অনেকগুলো মিনিটের প্রতীক্ষায় অভিমান জমতে জমতে পায়েলের হৃদয়ে শক্ত একটা গিঁঠ বেঁধে যায়।


।।৫-আধারে বিলীন।।

ওদিকে--
সাদমানের কলেজ বন্ধু শিফাত ঢাকা মেডিকেল কলেজের এনাটমী বিভাগের সিনিয়র লেকচারার। দু’বন্ধুর অনেকদিন পরে ফেসবুকে যোগাযোগ।
শিফাতঃ “দোস্ত, বান্ধুবী তো জুটাইছো! কিন্তু ধইরা রাখতে পারবা তো?”
সাদঃ “ধরে রাখতে পারবো না কেন?”
শিফাতঃ “ও তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। ক’দিন পরেই তো রেজাল্ট।”
সাদঃ “হু। তো কি হয়েছে?”
শিফাতঃ “মাস্টার্সের রেজাল্ট হয়ে গেলে কি ও তোর পাশ করার অপেক্ষায় বসে থাকবে?”
সাদঃ “ভালোবাসাই আমাদের একসাথে বেঁধে রাখবে!”
শিফাতঃ “তাহলে দোস্ত এইবার ভালো করে পড়াশুনা কর। আর হেলাফেলা করিস না। এইবারই তোর লাস্ট চান্স।”
সাদঃ “হুম। এইবার আর মিস করবো না।”
আরো কিছুক্ষণ চ্যাটিং এর পরে শিফাত গুড নাইট জানিয়ে লাইন অফ করে দেয়।
কিন্তু সাদ তখনো জেগে থাকে। টেবিলে বসে বইগুলো খুলে চ্যাপটার দেখতে থাকে। আর মাত্র দু’মাস আছে পরীক্ষার। এখনো কিছুই পড়া হয়নি। এতো পড়া কিভাবে শেষ করবে। হাতে মাত্র দু’মাস! চোখে অন্ধকার দেখতে লাগলো। সত্যি কথা বলতে ওর এখন আর পড়তেই ইচ্ছা করে না। কিন্তু, মায়ের কঠিন শর্ত! ইন্টার্নিতে না ঢুকলে বিয়ে দেবেন না!
রাত যত বাড়তে থাকে ওরও টেনশন বাড়তে থাকে। নানা ধরনের চিন্তা শুরু হয়। সত্যিই তো! পায়েলের রেজাল্টের পরে ওর জন্য কত ভালো ভালো প্রস্তাব আসবে। এখনি আসতেছে। ও কি আর একজন ফাইনাল পাশ না করা ছাত্রের জন্য বসে থাকবে? “নাহ! আমাকে অনেক ভালো করে পড়াশুনা করতে হবে। আজই এক্ষুণি আমি সিরিয়াস হবো। শিফাত আমাকে ভালো কথা মনে করিয়ে দিয়েছে!” ক্রমশঃ রাত বাড়তে থাকে। সেই সাথে বাড়তে থাকে সাদমানের অস্থিরতা।
কোনকিছু নিয়ে টেনশন করলেই সাদমানের অসুস্থতা বেড়ে যায়। তখন সাদমানের কোন কান্ডজ্ঞান থাকে না। সারা রাত জেগে থেকে সকাল হয়ে এলে মোবাইলে প্রতিটি সকালের মত নির্ধারিত মেসেজ এসে টুংটুং শব্দে বেজে ওঠে, “হাই মাই হ্যান্ডসাম, শুভ সকাল। তোমার ফিয়ান্স কাল ঢাকার বাইরে যাচ্ছে কিছুদিনের জন্য।”
এমনিতেই সারা রাত নির্ঘুম কাটিয়ে এখন ভীষণ ক্লান্ত, এর মধ্যে মা এসে দিলো ঝাড়ি, “সারা দিন রাত শুধু মোবাইল নিয়েই থাকো। পড়াশুনা বা ভালো ক্যারিয়ার তোমার দরকার নাই।”
পৃথিবীর সব মানুষের অবহেলা সাদমান সহ্য করতে পারে শুধু মায়ের কোন নেগেটিভ কথা ওর সহ্য হয় না। একদিকে পায়েলের বাইরে যাওয়া! আরেকদিকে মায়ের যখন তখন জোয়ান ছেলেকে তাচ্ছিল্য! আর সহ্য হয় না। মনটা পুরোপুরি ডিসঅর্ডার সেশনে চলে যায়। এই সময়টায় ওর কোন কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। পায়েলকে মেসেজ পাঠালো, “ইউ আর নট মাই ফিয়ান্স ইয়েট!...!” মেসেজটা সেন্ড করে দিয়ে আনমনে বলতে থাকলো, ‘যাও, তোমরা সব ভালো থাকো। আমি আজ থেকে খাবো না। না খেতে খেতে মরে যাবো। সব ভালো থাকো।’ তারপর, মোবাইলটা ডক্টর ফারহানার নাম্বারে কল ডাইভার্ট অপশনে দিয়ে রাখলো! “আহ কি শান্তি! এখন আর কেউ ফোন করে ওকে পাবে না! কারো জন্য ওকে পাশ করার টেনশনে যেতে হবে না। কেউ বুড়া ছেলে বলে রাগারাগি করতে পারবে না। ও এখন মুক্ত। পরীক্ষাও দেবে না। পড়তেও হবে না।”
‘এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’ বলতে বলতে পাশ ফিরে বালিশে কাত হয়ে বেহুঁশ হয়ে ঘুমাতে লাগলো।
পরের কয়েকদিন ওর এটা নিয়মিত রুটিন হয়ে দাঁড়ালো। সারা দিন ঘুমায়। সারা রাত জেগে থাকে। আর মোবাইল থেকে অনলাইনে টুইটার স্ট্যাটাস দেয়- ‘হাই গাইস, আমি এখন নাশতা খাচ্ছি’, ‘এখন আমি ঘুমোতে যাচ্ছি’, ‘আমি এখন টিভি দেখছি’!
অথচ, পায়েল যার নাম, সে প্রতিদিন ওর অপেক্ষায় থাকে। সকাল। বিকাল। রাত। শুধু একবার সরি বলুক অথবা ডাক দিক শুধু নাম ধরে “পায়েল কেমন আছো?”


।।৬-শেষ থেকে শুরু।।

পায়েলরা এক সপ্তাহ আগে ঢাকা ফিরে এসেছে। সাদমানের এখনো কোন খবর নেই। আজকে একুশতম দিন। কিন্তু ওকে ফোন দিতে গিয়ে আবারো কল ডাইভার্টে আরেক মেয়ের সাথে কথা বলতে হলে নিজের মেজাজটা আবারো বিগড়ে যেতে পারে। এর চেয়ে হবু শাশুড়ির সাথে কথা বলা ভালো। লজ্জা লাগলেও ভদ্রমহিলার সাথে কথা বলাই শ্রেয় মনে করলো। নাম্বার ডায়াল করলে ও পাশ থেকে রিসিভ করা হলো—
“আসসালামু আলাইকুম আন্টি? কেমন আছেন?”
“আমার ছেলে তো বোধহয় এবারও পরীক্ষা দিতে পারবে না!”
“কেন আন্টি কি হয়েছে?” পায়েলের বুকটা হঠাত ধ্বক করে ওঠে “খারাপ কিছু ঘটেনি তো!”
“ছেলে যেন কেমন হয়ে গেছে! খাওয়া-দাওয়া ঘুম সবকিছু নিজের ইচ্ছামত করে। কারো সাথে কথা বলে না!”
“ওহ, আমি আজকে একটু আসতে পারি আপনার বাসায়?”
“তুমি এসে কি করবা? ছেলে তো মাকে তোয়াক্কাই করছে না!”
“আমি একবার আসতে চাই আন্টি।” বলে ফোনের লাইনটা কেটে দিলো।
সম্পূর্ণ রেডি হয়ে মাকে জানালো “একটা অগ্নি পরীক্ষায় যাচ্ছি, মা! তোমার দোয়া রেখো যেন সফল হয়ে ফিরতে পারি!” বাসা থেকে বেরিয়ে প্রথমে আড়ং থেকে দুটি খেলনা গাড়ি কিনে নিলো সাদমানের ভাতিজার জন্য। তারপরে একটা সিএনজি চেপে রওনা হলো বারিধারার উদ্দেশ্যে।
ধনু রাশির জাতক পায়েল মচকাবে কিন্তু ভাংবে না! হঠাতই ওর মনে হলো যে তিন সপ্তাহ চলে গেছে সেটা ওর জীবনের চরম ভুল ছিলো। সামনের আর একটা দিনও নষ্ট করা চলবে না। এখন প্রতিটি মুহুর্ত ওকে সাদমানের পাশে থাকতে হবে। যে করেই হোক এই মানুষটিকে ও এবার পরীক্ষায় বসাবেই। ছেলেটার জীবনের অন্ধকারতম অধ্যায় কেটে গিয়ে আলোর সূচনা যদি কাউকে করতেই হয় সেই দৃষ্টান্ত হবে পায়েল। হবে ওর ভালোবাসার জন্য।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement