লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৮ অক্টোবর ২০১৯
গল্প/কবিতা: ৫৭টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftকৈশোর (মার্চ ২০১৪)

আমরা ছিলাম
কৈশোর

সংখ্যা

মোহাম্মদ ওয়াহিদ হুসাইন

comment ১৬  favorite ০  import_contacts ১,১০১
‘...পিকনিক...,’ আমি অনেকটা আপন মনেই বললাম।
মগরিবের আযান শুরু হয়েগেছে। দাড়িবান্দা খেলা শেষ করে কালাম, মজিদ আর আমি মাঠে হাত পা ছড়িয়ে বসে আছি। মাঠের সাথের পুকুরে আমাদের পাঁচ সাতজন হাত মুখ ধুয়ে নিচ্ছে। ওরা একে একে এখানে এসে বসবে। আরো কিছুক্ষণ কথা বার্তা চলবে, তারপর যে যার বাড়ির পথে।

‘আবার ক্ষণিকায় যেতে চাস নাকি?’ কালাম মাঠের পূব দিকের পুকুরের ওপারের নারকেল শুপারি গাছের জটলার দিকে তাকিয়েছিল। আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে হাসতে হাসতে বলল।
‘না রে, অনেক টাকার ব্যাপার...।’

টাকার ব্যাপারটা নির্ভর করে বনভোজনের মানের উপরে। কিন্তু বনভোজন নিজে নির্ভর করে সম্ভবত মানসিকতার উপর। আমাদের সেটার নিতান্তই অভাব।

উত্তর দক্ষিণে লাঠিরমত লম্বা প্রায় হাজারগজি রাস্তাটার প্রধানত দুপাশের বাড়িঘর নিয়ে আমাদের এলাকা। এটাকে মোটামুটি তিনভাগ ধরলে দ্বিতীয় ভাগের শুরুটাই একটা পুকুর দিয়ে। সরকারী পুকুর। আর এটা দিয়েই আমাদের রাস্তাটার নাম- মিউনিসিপ্যাল ট্যাংক রোড। আমাদের কাছে- এমটি রোড। শিক্ষিত বিজ্ঞজনেরা শুনলে নাকমুখ কুঁচকে বলেন- খালি রাস্তা?

ছোটখাট একটা শহরের কোন এক পাশের দিকের রাস্তা ফাঁকা থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যদি একটা ক্ষুদে রাস্তার দ্বিতীয় অংশ থেকে শুরু করে তৃতীয় অংশের প্রায় আধা খানি জুড়ে আঠারটার চেয়েও বেশি পুকুর থেকে থাকে তবে সেটাকে কেউ খলি বললে প্রতিবাদ করতে যাওয়ার যুক্তি কোথায়?

তবে আমাদের সমস্যা সেটা নয়। এই তিন অংশের ছেলে ছোকড়াদের মধ্যে মুখ চেনাচিনি থাকলেও মাখামাখি ছিল না। ভাল রকমের একটা পাঠাগার বা ক্লাব জাতীয় কিছু ছিলনা যার মাধ্যমে একটা একতা ধরণের কিছু গড়ে উঠতে পারে। আমাদের বড়ভাইদের আমলটা ছিল উল্টো। কিন্তু তারা এখন নিজ নিজ পেশায় ব্যস্ত।
তাদেরই একজন- কলিমের বড়জন- বছর দুয়েক আগে আমাদের একটা বনভোজনের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। পাঁচটনি ট্রাকে করে আমরা ক্ষণিকায় গিয়েছিলাম। আমাকে চাঁদা দিতে হয়েছিল পাঁ-চ-টা-কা! ছোট যারা তারা যে যা পেরেছিল দিয়েছিল- এমন কি বিনে পয়সাতেও! হায়রে! আমি কেন তখন আরো ছোট ছিলাম না। পাঁচটাকা হলে হ’লে গিয়ে চারবার সিনামা দেখা যেত। আর কি সব ছবি! গ্যালিভারস ট্রাভেলস, থিফ অফ বাগদাদ, আলীবাবা এন্ড ফরটি থিভস, আলাদিন এন্ড দি ম্যাজিক ল্যাম্প, থরটি ইয়ারস অফ ফান, জ্যাসন এন্ড দি আরগোনেটস, ম্যাজিক ওয়ারল্ডস অফ নিনজা। বাংলা উর্দু আর হিন্দি ছবির কথা না হয় নাই বললাম। কিন্তু পয়সার বড়ই টানাটানি। পাঁচশিকি জোগাড় করতেই দম বের হয়ে যেত।

তবে সেই বনভোজনে মজা পেয়েছিলাম দারুণ। কিন্তু পরেরটারমত নয়!
‘...এবার অন্য রকম কিছু একটা করলে হয়।’
‘কী করবি?’

আর সবাই একে একে এসে চারিপাশে ধপাধপ বসে পড়তে শুরু করেছে। কারো মুখে আগ্রহ, কারো মুখে কৌতুক।
‘এবার দেখা যাক শটকাটে সারা যায় কিনা?’
‘কীভাবে?’
‘আগে আমরা দেখব কতজন হয়। তাতে কতটা পোলাউএর চাল আর মাংস লাগবে সেটা হিসাব করে নেব...।’
‘হিসাবটা কে করবে, তুই?’
‘হাহ! নিজের খাবারের চালের হিসাবই জানিনা...। শোন, তুই, তুই আর তুই...,’ কালাম, মজিদ, ইমতিয়াজ তিন জনকে দেখিয়ে বললাম। ‘...তোরা তো মাঝে মধ্যে পোলাও টোলাও খাওয়াস, বাড়ি গিয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করবি মাথা পিছু কতটা চাল আর মাংস লাগতে পারে। তিন জনেরটা আমরা গড় করে ধরব...।’
‘...দাওয়াত আর পিকনিকের খাওয়া কি এক রকমের হবে নাকিরে গাধা?’ কালাম আমাকে বাধা দিয়ে বলল। ‘...একা ইস্তাকইতো...।’ কথা শেষ না করে ইস্তাকের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। ইস্তাক হো হো করে হেসে উঠল। আমার মুখেও হাসি।
‘এই, আমি একটু তাড়াতাড়ি করে খাই বলে কি বেশি খাই?’
আসলেও ও বেশি খায় নাকি সেদিন পরে আর পায়নি বলে বেশি খায়নি সে খবর রাখে কে? তবে আমি আজ অবধি এত দ্রুত পাতের খাবার সাফা করতে আর কাউকে দেখিনি।

সিরাজদের পরিবার একটু অন্য রকম করে ধর্মপালন করে থাকে। তাদের খানকা শরীফ তারেরপুকুরের পাশে। মাঝে মধ্যে আমাকে আর কালামকে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি সম্ভবত সিরাজের আছে। সেখানে আমরা ধর্মচর্চা করি বা না করি মুঠো ভর্তি জিলিপি বা মিষ্টি বিলক্ষণ হাতে পাই। সেদিন হয়ত বিশেষ কোন উপলক্ষ ছিল- আমাদের সাথে ইস্তিয়াক আর ইমতিয়াজও দাওয়াত পেল। সন্ধ্যার পরে জনা পনেরর লাইনে আমরা পাশাপাশি বসেছি। পাতে বিরিয়ানি দিয়ে গেল। দুতিন লোকমা খাওয়ার পরে পাশে তাকিয়ে দেখি ইমতিয়াজ খালি প্লেটে বুড়ো আঙ্গুল ডলছে। খাবারের দাগ না থাকলে মনে হত তাকে বোধ হয় খাবার দেওয়াই হয় নি। বেশ মজা লাগল। খাবার দেওয়ার জন্য হাঁক পাড়লাম। আবার খাবার দেওয়া হল। আমি মুখের কাছে হাত তুলে আড়চোখে দেখতে লাগলাম। আঙ্গুলগুলো সোজা রেখে থালা মোছার ভঙ্গিতে অর্ধেক খাবার একবারে তুলে মুখে পুরল। প্রায় পর মুহূর্তে বাকিটুকু...।

‘...সে যাই হোক, দেখা যাবে। ওর জন্য আমরা নাহয় ডবল চাল ধরব।’
‘না রে, আমি একটু তাড়াতাড়ি খাই, কিন্তু বেশি খাই না। তোরা কিছু ভাবিস না।’
‘ও নিয়ে মাথা ঘামাস না তো তুই।’ কালাম বলল। ‘দরকার হয় তোর খাওয়া শেষ হলে আমরা খাওয়া শুরু করব...।’
‘বাজে কথা বাদ দিয়ে আগে ঠিক কর কবে যাবি, কোথায় যাবি, কীভাবে যাবি আর চাঁদা কত ধরবি।’ মোস্তাক বাধা দিয়ে বলল। ‘পিকনিকের খবর নাই, খাওয়া নিয়ে টানাটানি।’
‘আগে ঠিক করতে হবে, চাল মাংস মশলাপাতি আর সকালের নাস্তা কলা পাঁউরুটিতে মোট কত লাগবে। সেটাকে আমরা যতজন হব সেই সংখ্যা দিয়ে ভাগ করে মাথা পিছু কত দিতে হবে ঠিক করব। এক পয়সাও বেশি না।’
‘যাতায়তের খরচ?’
‘কাঁচকলা। হেটে যাব। পরশু দিন ছুটি আছে। আমরা যে কয়জন পারি, চল রূপসার ওপারে যাই। সোজা একঘণ্টা হাটব। কর্ণপুর বা সামন্তসেনার কাছাকাছি ডানে বা বামে গ্রামের দিকে আরো আধা ঘণ্টা। রূপসা থেকে শুরু করে যে জায়গাটা সবচেয়ে ভাল লাগবে সেটাই হবে আমাদের স্পট।’
‘দারুণ বলেছিস!’ ইস্তাক উচ্ছ্বাসিত। বাড়ির আশেপাশে আর স্কুল ছাড়া তার বিশেষ কোথাও একটা যাওয়া হয়না। ‘কিন্তু এতটা হাঁটতে হবে, খিদে পাবেনা?’
হতচ্ছাড়াটা আসলেই পেটুক হবে হয়তো।
‘এক ঘণ্টা হাঁটার পরে গাছের ছায়ায় পাঁউরুটি আর...।’
‘ঝোলাগুড়...।’ মোস্তাক হাসতে হাসতে বলল। ‘কিন্তু ভাইডি, চাল ডাল লাকড়ির বোঝা চাপাবা কোন গাধাডার ঘাড়ে?’
এই বাড়ির আদুরে ফিটফাট ছেলেটার কথায় আমরা গুরুত্ব দিয়ে থাকি।
‘তুই থাকতে আর কার ঘাড়ে চাপাব?’ আমি হাসতে হাসতে বললাম। সবাই হেসে উঠল।
‘তাইলে আমি সাথে সাথে চিৎপটাং।’ মোস্তাক বলল। ‘আসলে তোর মনে কী আছে আমি জানি। ভাগ ভাগ করে সবাই কিছু কিছু করে নেব। পাতিলা থাকবে খালি। আর লাকড়ির দরকার হবে বলে মনে হয় না। গ্রামে যাচ্ছি, লাকড়ি মাকড়ি কুড়িয়েই কাজ চালাতে পারব। নাকি?’
‘হ্যা। তবে পাতিলায় মাংস থাকবে।’
‘ভাল। আরো একটা কাজ করা যেতে পারে।’
‘কী?’
‘মাল সামান সবসহ দুজনকে ট্রেনে তুলে দিই। টিকিটের পয়সা আমরা সবাই চাঁদার সাথে ধরে দিল আর কয় পয়সাই বা বেশি হবে। যদি তোদের কাছে বেশি মনে হয়, আমি না হয় সেটা দিয়ে দেব। আর কোন ষ্টশনের টিকেট কাটতে হবে, সেটা তো তোরা আগেই জানতে পারবি। ট্রেন থেকে নেমে বাকি সবার জন্য অপেক্ষা করবে। রূপসার কাছাকাছি হলে আর ট্রেনের দরকার নাই।’

‘তুই ট্রেনে যাবি?’
‘না। আমি সবার সাথে হাঁটতে হাঁটতে যাব।’
‘ইস্তাকটা বেশি হাঁটে টাটে না ওটাকে, আর মজিদটা চালাক চতুর আছে, এই দুজনে ট্রেনে যাক। কিরে, তোদের আপত্তি নাই তো?’
বিশেষ একটা সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না। গাছে পিকনিকের কাঠাঁল পাঁকা তো দূরের কথা, সবে ফুল ফুটতে শুরু করেছে।

‘ধরা যাক জায়গা ঠিক, পোলাও খাওয়াবি, মাংস কিসের? গরুর?’ মোস্তাক জানতে চাইল।
‘একটা খাসি টাসি কিনে নিলে খরচ পুষিয়ে যাবে।’
‘জবাই আর মাংস বানানর কাজ করবে কে? আমাদের দ্বারা হবে বলে মনে হয় না। তোর আব্বাকে বললে জবাই আর চামড়া ছাড়ানর কাজটা করে দেবে না? আমরা সাহায্য করব?’
‘পিকনিকের কথা শুনলে আমাকে জবাই করে আমার খাল ছাড়াতে রাজি হবে...।’
কশাই না হলেও আমাদের কুরবানির খাশি সাধারনত আব্বা নিজেই জবাই করে আর আমরা সবাই মিলে বাকি কাজ সারি, এটা এরা জানে।
‘এটা নিয়ে ভাবতে হবে না, বললে আইনাল করে দেবে।’ কালাম বলল।
গায়ে শক্তি টক্তি আছে, সেটা সে পারতেও পারে। যদিও যখন তখন এসে আমাদের গল্পগুজবে ভাগ নেয় তবু আয়নালকে ঠিক আমাদের বন্ধু বলা চলেনা। কাল সুঠাম দেহের একজন যুবক। বরিশাল থেকে একাই চলে এসেছে। এখানে থেকে রিক্সা চালায়। মিশুক, হাসিখুশি। তার একটু ছেলেমী ভাব আছে বলে হয়তো নিজের স্তরের কারো সাথে মিশে আনন্দ পায় না।
‘ভাল,’ মোস্তাক বলল। ‘পোলাওয়ের ব্যাপারটা কী হবে?’
‘পোলাওয়ের ব্যাপারটা কী হবে মানে? পোলাও হবে।’
‘রান্না করবে কে? মাকে বললেই আমাদের বাড়িতে রান্নার ব্যবস্থা করে দেবে। কিন্তু এখান থেকে রান্না করে নিয়ে...?’
‘আয়নালকে আমাদের সাথে নিয়ে যাব, সে রান্না করবে।’
‘কী ী ী ী!’ আমাদের কয়েক জনের মুখ থেকে একসাথে বের হল।
‘ও মাস খানেক ধরে রিক্সা চালায় না, আমাদের ভড়াটিয়া সাহেবের রান্না করে...।’
বিদেশী এক সাহেব কালামদের বাড়ির পাশের অংশটা ভাড়া নিয়েছে। তাকে আমরা চিনিনা, জানিনা আর দেখিওনা। নিজের কার চালিয়ে যায় আসে আর যতক্ষণ থাকে ঘর থেকে বের হয়না। সাহেব যার রান্না খুশি খাকগে, কিন্তু রিক্সাওলার রান্না পোলাও আমাদের খেতে হবে? তার বাড়ির দাওয়াত হলে না হয় অন্য কথা ছিল।
‘ওর রান্না বিরিয়ানি পোলাও মাংস যদি খেতে ভাল না হয় তাহলে আমার নাম বদলে রাখিস।’ তারমানে মাঝে মধ্যে ও তার রান্না চেখে দেখে! রাঁধতে জানে। ভাল।

আয়নাল রাজি, তবে শর্ত- তার কাছ থেকেও চাঁদা নিতে হবে। সেটা আরো ভাল।

চাল, মাংস আর মসলাপাতির হিসাব তো বটেই, মোটামুটি দামও জানা গেল আয়নালের কাছ থেকে। মায়েদের আর এর হিসাবে খুব একটা ফারাক হল না।

ষোলজন হল। খরচের হিসাবে এল দু-এক টাকা কম চল্লিশ। মাথাপিছু ধরা হল আড়াই টাকা।

মসলা ইত্যাদির টাকা আয়নালকে দেওয়া হল। নতুন বাজার থেকে কিনে নেবে। আমরা বড়বাজার থেকে চাল আর খাসি নিয়ে আসব।

তূলাপট্টির মোড়ে পাঁঠা, খাসি আর ছাগল দেখে মন ভরে গেল। বাজেট পঁচিশ টাকা
আমাদের চাহিদার কাছাকাছি একটার দিকে হাত বাড়ালাম।
‘...পঁয়ত্রিশ টাকা।’
‘পঁচিশ টাকায় হয় না?’
‘তুমরা ভাইডি মানুষ, ত্রিশ টাকা দে নে যাও।’
আমরা তিন জন মুখ চাওয়া চাওয়ি করি। চাঁদা নেওয়া হয়ে গেছে। পাঁচ টাকাকে ষোল ভাগ করলে মাথা পিছু বিশ পয়সা। বেশি না, কিন্তু আদায় হবে কীভাবে? আমরা সরে পড়ি। পাম পট্টি দিয়ে কীভাবে দাম কমাতে হয়, সেটা আমরা জানিনা। মজিদটা থাকলে হত।

খাসিটার চেয়ে একটু বড় একটা ছাগল। সুঠাম না, একটু ট্যারাব্যাকা। শেষকালে এটাই নিতে হল। মনে হল, আমরা অন্তত পাঁচ টাকারমত জিতেছি। রাতের অন্ধকারে সবার নযর বাঁচিয়ে ছাগল নিয়ে ফিরে এলাম। মাংস খাবার সময় কজনেই বা টের পাবে- মহিলা না পুরুষ? আমি কখনই টের পাই না- পাঁঠা হলে আলাদা কথা। তবু মনটা একটু খুঁতখুঁত করতে লাগল- খাসির মাংসের কথা বলেছি। তবে শেষ কালে সেই খাসিই ভাগ্যে জুটেছিল।

মাঠের সামনেই কালামদের বাড়ি। সেটারই একটা ঘর আমাদের ভান্ডারখানা হল। পাঁচিল ঘেরা উঠোনে তাদের একটা ছাগলের সাথে আমাদেরটা থাকল। কালামের মা কালামের মাধ্যমে আমাদের সব ধরণের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।

সকালে কালামের সাথে দেখা হতেই জানাল, তার মা আমাকে দেখা করতে বলেছে। ব্যাপার জটিল। তার মা কিছু জানাতে হলে কালামের মাধ্যমেই জানিয়ে থাকে। কালামের মুখ কিছুটা গম্ভীর। তার মায়ের ইচ্ছাটা সম্ভবত তার পছন্দ নয়। তবে যাই ঘটুক, আমি ওর মাকে ওর চেয়ে ভাল ম্যানেজ করতে পারি। হাজার হলেও পাড়াতুতে খালা। দুজনে গেলাম।

‘হ্যারে, তোরা এটা কি ছাগল কিনেছিস?’
‘কেন?’ আমি আকাশ থেকে পড়ি।
‘তোরা এটা জবাই করবি? এটার পেটে তো বাচ্চা।’
‘আঃ...তাহলে কী করব?’
পেটে আন্ডাবাচ্চা যাই থাক আমাদের আর করার কিছুই নাই। আজ রাতে কেটেকুটে কাল ভোরে চালান করতে হবে। মাংসটা একটু কমে গেল- পাঁচ টাকারমত ক্ষতি। কী আর করা।

কিছুটা ইতস্তত করে কালামের মা যা বলল তার মানে দাঁড়ায়- এটাকে সে পোষার জন্য কিনে নিতে চায়। পাঁচ টাকা সে খুশি হয়ে আমাদের বেশি দেবে যাতে আমরা সেই খাসিটা পাওয়া গেলে যেন কিনতে পারি। আমাদের জন্য এর চেয়ে আর ভাল প্রস্তাব কী হতে পারে? আমি মহা রাজি।
‘হ্যারে, এ কী চাল কিনেছিস তোরা? শেদ্ধ চাল, এতে কি পোলাও হবে?’

আঃ! ভদ্রমহিলা আমাদের ভাড়ারের সব কিছু খুঁটিয়ে দেখেছেন আর একটু একটু করে সূতো ছাড়ছেন। আমরা কটা টাকা বাঁচানর জন্য একটু কমদামি পোলাওয়ের(?) চাল কিনেছিলাম। রান্না হয়ে গেলে কে আর কোয়ালিটি নিয়ে গবেষণা করতে যাবে? এ তো আর সরকারের টেন্ডারের দালান কোঠা নয়। কিন্তু এখানে ধরা খাব জানলে অন্যখানে রাখার ব্যবস্থা করতাম। কালামের দিকে তাকালাম। তার রাগ হচ্ছে মায়ের উপর।

‘কী করা যায়?’
‘শোন, আমার কাছে পোলাওয়ের চাল আছে। তোদের এই চাল আমি মেপে রেখে সমান পোলাওয়ের চাল দেব। কী বলিস?’
‘ঠিক আছে।’ এক মুহূর্ত চিন্তা না করেই জবাব দিলাম। এর চেয়ে ভাল প্রস্তাব আর কী হতে পারে? তবে মাপার সময় দেখলাম লাভের কিছুটা অংশ কমে গেল- পাল্লায় ওজন না করে কৌটোয় করে মাপলেন। সিদ্ধর বদলে আঁতপ, কাজেই ওজনে একটু কম পেলাম। কিন্তু দামের তুলনায় সেটা কিছুই না। তাছাড়া এই পরিবার হয়তো আমাদের আনা এই চালের ভাত হয়তো খান না। আমাদের উপকারের জন্য খেতে পারেন। আল্লাহ এই ধরণের সমস্ত নারী পুরুষদের সুখি করুন।

...দারুণ সুন্দর একটা জায়গায় আমরা পিকনিকটা করেছিলাম। জাহিদ নামের আমাদের চেয়ে ছোট একজন আমাদের সাথে ছিল। পিকচার প্যালেসের কাছে তাদের ফটোগ্রাফির দোকান। সে একটা সাদা কাল ফিল্মসহ ক্যামেরা এনেছিল। আমি ফটো তুলেছিলাম।
জায়গাটা ছিল গাছপালায় ভরা খালের পাড়। একপাশে মেঠোপথ অপর পাশে চরেরমত। চরের কাদার ভিতরে আমাদের লাফালাফি ঝাপাঝাপি আর পুরোটাকে ঘিরে রেখেছে গাছ পালা। আমি ফটো তোলার ব্যাপারে আনাড়ি হলেও স্থান-মহাত্মের গুনে ফটোর দোকানের প্রফেশনালরাও ফটোগুলোর প্রশংসা করেছিল।

...আমাদের মাথাপিছু খরচ হয়েছিল আড়াই টাকা। পাঁচটাকা বেঁচেছিল, সেটা আমরা ফিরে এসে জিলাপি কিনে নিজেরাসহ এলাকার পিচ্চি-পাচ্চাদের দাওয়াত দিয়ে খাইয়েছিলাম...।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement