লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৮ ফেব্রুয়ারী ১৯৯০
গল্প/কবিতা: ৯টি

সমন্বিত স্কোর

৬.৩৯

বিচারক স্কোরঃ ৩.৮৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৫৪ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftশীত (জানুয়ারী ২০১২)

হঠাৎ চৈতন্যোদয়
শীত

সংখ্যা

মোট ভোট ১৩১ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৬.৩৯

মোঃ শামছুল আরেফিন

comment ৮৬  favorite ৭  import_contacts ২,৩৬২
এক
কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছিলনা মোটেও।
তবুও যে আবার কিছু বাক্যব্যয় করতে হবে ভাবতেই মনের কষ্টে কপালে ভাঁজ পরে মেয়েটির। একটু আগে যে কারণে শাওনকে জীবনের সেরা ঝাড়িটি উপহার দিয়েছিল এবারের কারণটা তার চেয়েও জঘন্য।

সানজিদার কথাই ঠিক। শাওনটা আসলেই একটা ম্যাদামারা। ম্যাদামারা না হলে এমন তো হবার কথা ছিলনা। বাদামওয়ালা ছেলেটির কাছ থেকে অনেক বলে কয়ে আগে এক টাকা আদায় করে নিল। তারপর দুটাকার কয়েনটা হাতে নিয়ে কয়েকবার কচলানোর পর এগিয়ে দিল ছেলেটির কাছে। ছেলেটিও কম যায়না। গুনে গুনে পাঁচটা বাদাম দিল সে। যদিও প্রদেয় অর্থের বিনিময়ে প্রাপ্ত বাদামের সংখ্যা কম নয়; তবে দুজনের মাঝে বন্টণ করতে গেলে অসমবিভাজন করতে হবে। শাওন তাই ছেলেটির কাছে আরো একটি বাদামের জন্য হাত পাতল। বাদামওয়ালা একটি বাদাম দিল ঠিকই, তবে সাথে একটি অপমানজনক কথা বলতেও ভুল করেনি। অথচ শাওন কিছুই বললনা। ভাবটা এমন যেন কেউ তাকে কিছু বলেনি। কিছুই গায়ে মাখেনি সে।

রাগে আর ঘৃণায় তখন গিজগিজ করছে সানজিদা। শাওন তার পাশে এসে তিনটি বাদাম বাড়িয়ে দিল।
বুঝলি সানজু, এই একবিংশ শতাব্দীতে নারীপুরুষ কোন ভেদাভেদ নেই। সবকিছুতেই সবার সমান অধিকার, সবার সমান ভাগ। তোর জন্য তাই এই তিনটা। নে। তোর আজকের লাঞ্চ।
চেঁচিয়ে উঠল সানজিদা।
তোর কূটনৈতিক আলাপ বন্ধ কর। বাদাম খাবোনা আমি। ছোটলোক কোথাকার! একটাকার বাদাম কিনিস। আবার অপমান সহ্য করে একটা বাদাম চেয়েও আনিস। লজ্জা করলোনা তোর!
তুই না বোকা রয়ে গেলি সানজু। লজ্জা লাগবে কেন? পরিস্থিতি মানুষকে অনেক কিছুই করতে বাধ্য করে। নে, খেয়ে নে। না খেলে শরীর খারাপ করবে।
এই তিনটামাত্র বাদাম না খেলে শরীর খারাপ করবে কথাটা শুনামাত্র সানজিদা এমনভাবে শাওনের দিকে তাকিয়ে থাকল যেন শাওন অতিবিরল প্রজাতির কোন নিরীহ চিড়িয়া। আফ্রিকার গভীরজঙ্গল থেকে অনেক অর্থের বিনিময়ে কিনে এনে তাকে ঢাকার চিড়িয়াখানায় রাখা হয়েছে। আর একজন ভাবুক দর্শকের মত গালে হাত দিয়ে গভীর মনযোগ দিয়ে সে এই আজব চিড়িয়ার সকল কর্মকাণ্ড দেখছে। শুধু পার্থক্য এই যে ভাবুক চোখে সাধারণত ভারী একটি চশমা থাকে, সানজিদার বেলায় তা নেই। তবুও সানজিদার এমন অপমানজনক চাহনীর দিকে একবার তাকিয়ে দ্বিতীয়বার আর তাকালো না শাওন। পাছেই আরো লজ্জায় পড়তে হয়। শুধুমাত্র চোখ দিয়ে মানুষকে যে কতপ্রকারে প্রহসন দেয়া যায় সে যে তা কতবার হাতে-কলমে শিক্ষা পেয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। আপাতত তাই চুপ হয়ে থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

দুই
দুপুর ছাড়িয়ে বিকেল গড়াল সেই কখন।
বাতাসটা যেন আরো বেশি উগ্র হয়ে তেড়ে আসছে। হিম শীতল বাতাস। গায়ে লাগলে পশম দাঁড়িয়ে যায়। অথচ গাছের গোঁড়ায় ইট-সিমেণ্টের আসনে তখনও বসে আছে ওরা। পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে বসেছে শীত কম লাগবে বলে। ঝগড়া মিটে গেছে অনেক আগেই। তবুও কারো মুখে কোন কথা নেই। চরম বিষণ্ণ একটা ভাব তাদের চোখে-মুখে, আর দৃষ্টি গিয়ে ঠেকেছে বহুদূর।
সানজিদার পড়নে লাল শাড়ি। একটি হালকা চাদর দিয়ে শরীরের উপরিভাগ মোড়ানো হয়েছে। আর কলাপাতা রঙয়ের একটি পাঞ্জাবী গায়ে দিয়ে জড়সড় হয়ে বসেছে শাওন। শীত পড়তে শুরু করায় এইবেলায় এই রকম দম্পতির দেখা কম মিলে। তবুও যেকটি ঝুটি শীত উপেক্ষা করে এখনও প্রেম করছে তাঁদের মাঝে ওদেরকে চোখে পড়ে আলাদাভাবে। মালা মেয়েটি তাই ছুটে গেল তাঁদের কাছে।
ভাইজান, এই দুইটা মালাই আছে আর। বকুলফুলের মালা। আপারে যা মানাইবোনা! লইয়া লন। দাম বেশি রাখুম না। দুইটা মিললা মাত্র পাঁচ টাকা দিয়েন।
ভারী মায়াবী একটি মুখ।দেখলেই মায়া লাগে। গায়ের রং কাল, নাক চ্যাপটা। যিনি গড়েছেন তিনি কোন ত্রুটি করেননি। তবুও গাল খসখসে হয়ে দাগ পড়েছে ছাল উঠানো গাছের মতন, আর ঠোঁট ফেটে সেখানে গজিয়েছে ডালপালা। কতকাল যে চুলে তেল মাখেনি সে হিসাব মনে হয় সে নিজেও জানেনা। লালচে চুলের দিকে তাকিয়ে তাই পাখির বাসা মনে হলেও তাকে দৃষ্টিবিভ্রম বলা যাবেনা। শাওন ও সানজিদা তাকিয়ে রইল মেয়েটির দিকে। সানজিদার কথা কম বলার অভ্যাস। স্বভাবের নিয়মে তাই শাওন বলল,
দুইটা মালা পাঁচ টাকায় বিক্রি করলে তোর পোষাবে?
না, পোষায় না। তয় আইজ তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরতে অইব। বাপজানের অসুখ ত। তাই আপনাগো জইন্য দুই মালা পাঁচ টাকা।
এই মালা দুটো বিক্রি করতে পারলেই তুই তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরতে পারবি, এই তো?
মালার মুখে হাঁসি ফুটল। হ ভাইজান।
দে দেখি তোর মালা দুটি। এইখানে বসে এই সুন্দরী আপার সাথে গল্প কর।
মালা মেয়েটি কিছু বুঝে উঠার আগেই শাওন হাঁটা ধরল পার্কে থাকা অন্য দম্পতিগুলোর দিকে। মালা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল সেদিকে।
আপা, ভাইজান কি পাগল কিসিমের!
না। ও পাগল হতে যাবে কেন? একটু বোকা। তবে অনেক ভাল একটা ছেলে। দেখলে না তোমার মালা কিনতে পারেনি বলে মালা বিক্রি করতে নিয়ে গেল।
বলেন কি আপা! আপনা গো কাছে পাঁচ টাকাও নাই?
না, ও পকেট খুঁজে দুই টাকার একটা সিকি পয়সা পেয়েছিল। এক টাকার বাদাম কিনা হয়েছিল দুপুরে লাঞ্চ করার জন্য। এখনও এক টাকা আছে। ঐ টা দিয়ে রাতের ডিনারের ব্যবস্থা করতে হবে।
মালা যেন গাছ থেকে পড়ল। বিশ্বাস অয়না আপা। আপনাগরে দেখলে মনে অয় আপনারা অনেক বড় ঘরের মানুষ। জীবনে এই পরথম নিজেরে অনেক ধণী মনে অইতেছে। দেহেন আমার কাছে ষাইট টাকা আছে।
সানজিদা হাঁসে এমন কথা শুনে।
আপনি মনে অয় মজা করতেছেন আপা।
না, মজানা; সত্যি। আমরা আজ বাসা থেকে পালিয়ে এসেছি। কাজী অফিসে যাব বলে সিএনজিতে চড়লাম। কিছুদূর যাবার পর কিছু অস্ত্রধারী যুবক সিএনজি থামালো।
আপা সিনেমার গুন্ডাগো মত অগো মুখ কি কালা মুখোস দিয়া ঢাকা আছিল?
না, সেই রকম ছিলনা। ওরা অস্ত্র ঠেকিয়ে দুজনের ব্যাগ, টাকা-পয়সা, মোবাইল সব নিয়ে গেল। পারলে পায়ের জুতাটি পর্যন্ত নিয়ে যায়। এতক্ষণে আমাদের কক্সবাজারের পথে থাকার কথা ছিল। অথচ দেখ কি ভাগ্য! এখনও এই গাছের তলায় পড়ে আছি।
এখন বাসায় ফিইরা যাইবেন্যা আপা?
তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? পালিয়ে এসেছি। বাসায় ফিরে গেলে বাবা-মা খুন করে ফেলবে।
ততক্ষণে শাওন এসে হাজির। মালার হাতে একটি পাঁচশ টাকার নোট গুঁজে দিয়ে বলল,
এই নে তোর মালা বিক্রির টাকা। সন্ধ্যা পড়তে শুরু করেছে। তুই তাড়াতাড়ি বাসায় চলে যা।
মালার চোখে তখন বিস্ময় আর সানজিদা মিটিমিটি হাসছে শাওনের দিকে তাকিয়ে। খুব ভাব নিয়ে শাওন আবার নিজেই কথা বলতে শুরু করল।
যাদু বুঝলি যাদু! পার্কের ঐ কোণায় এক বুড়া-বুড়ি পেলাম। কি যে রোম্যান্টিক ওনারা চিন্তা করতে পারবিনা। এমন পাম দিলাম যে বুড়ির ভাঁজ পড়া গাল পর্যন্ত লাল হয়ে গেল। মালাদুটো ধরিয়ে দিলাম বুড়োর হাতে। মালদার পার্টি। তোর বাপের মত। পাঁচশ টাকা তো দিলই আমাদের জন্য দোয়াও করল।
তুইকি আমার কথাও বলেছিস নাকি?
বলেছিনা আবার! আজকের দিনের সব কাহিনী খুলে বলেছি।
হুম… বেশ করেছিস।
মালা মেয়েটা চুপ করে রইল। তার কাছে মনে হচ্ছে সে এখন ঘোরের মধ্যে আছে। ঝিমানি ভাব কেটে গেলে একটু পর সব ঠিক হয়ে যাবে। সানজিদা তার গায়ে হাত দিয়ে বলল,
কি নাম যেন তোমার?
একটু ভিড়মি খেয়ে উত্তর দিল সে,
মালা।
বাহ অনেক সুন্দর নাম। মালা তুমি বাসায় চলে যাও। তোমার বাবা-মা তোমার জন্য চিন্তা করবেন।
আপনারা এখন কই যাবেন আপা?
কোথাও যাবনা। ভাবছি এই গাছতলায়ই রাত কাটিয়ে দিবো।
আপা, কইছিলাম কী, এই জায়গাটা ভালোনা। আপনাগো বিপদ হইতে পারে। তার উপর এখন শীত পড়ন শুরু করব। আপনাগো এত কষ্ট সহ্য অইবোনা। আপনেরা আমার লগে চলেন। আইজ আমাগো মেহমান হইবেন। আমার বাপ-মায় আপনাগরে দেখলে মেলা খুশী অইব।

শাওন আর সানজিদা কিছুক্ষণ একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে রাজি হয়ে গেল। জীবনটাকে আজ ভিন্নভাবে উপভোগ করতে চায় ওরা।
রিক্সা নিল মালা। পথ ছোট হলেও মেহমানদের হাঁটিয়ে নেয়া অশোভন। শাওনের মনে পড়ল দুপুরের লাঞ্চের জন্য কিনা ছয়টি বাদাম এখনও পকেটে পড়ে আছে। তৎক্ষণাৎ তিনজনের মাঝে সমানভাবে বিতরণ করে দিল সে মহার্ঘ। সানজিদাও কোন আপত্তি না করে বাদাম খাচ্ছে। প্রথম বাদামটি শেষ করে দ্বিতীয় বাদামটি যেইনা ছিড়ল, শাওনের মেজাজ চটে গেল। বাদামওয়ালা ছেলেটি দেখেশুনে তাকে একটি পচা বাদাম দিয়েছে। আফসোস করতে থাকল সে নিজে নিজে। মালা আর সানজিদা টের পেলনা কিছুই।

তিন
মাটির চুলোটা মনে হয় অনেক যত্ন করে বানানো হয়েছিল। তাই আগুন খুব একটা বেরিয়ে আসতে পারছেনা। চুলার উপর একটি বড় পাতিলে পানি ফুটছে। তার উপর চালুনিতে উপুড় করে রাখা হয়েছে চালের গুড়া, খেজুরের মিঠাই আর নারিকেলের মিশ্রন করা ছোট ছোট বাটি। তারপর আবার একটা ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। কিছুক্ষণ পর নূরজাহান বেগম ঢাকনা তুলে ধোঁয়া উঠা গরম গরম ভাপা-পিঠাগুলো নামিয়ে রাখছেন। সানজিদা পাশে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছে পিঠা বানানোর এই সুনিপুন পদ্ধতি আর ভাবছে, এই পিঠাগুলো জীবনে কোনদিন খায়নি সে। হঠাৎ করে মালা বলল,
মা আরো চাইর পিস লাগবো।
একজন আধা-বুড়া বয়সের ভদ্রলোকে এসে দাঁড়িয়েছেন চুলোর পাশে। উনি পিঠা বাসায় নিয়ে যাবেন। প্রতি পিস পিঠা পাঁচ টাকা করে। আগে অবশ্য নূরজাহান বেগম এই পিঠা বিক্রির উদ্দেশ্যে বানাতেন না। তবে এখন সময় ভাল যাচ্ছেনা।
মালারা থাকে পান্থপথে। এখানে রাত কাটানো অন্যান্যদের চেয়ে তাঁদের অবস্থা একটু ভাল। ঘর বলতে ওদের যা আছে তা হল পলিথিনে মোড়ানো ছোট্ট একটি ঝুপড়ি, দিন হলে আবার ভাঁজ করে রাখতে হয়। সেখানে বসে গল্প করছে কালা মিয়া আর শাওন। সবকিছু শুনে কালা মিয়া মোটামুটি চিন্তিত। অনেক জটিল একটা কেইস।

তারা দুজন একসাথে পড়াশুনা করে, সেই সাথে রুটিনমাফিক প্রেম। কিন্তু মেয়ের বাবা-মা ছেলেকে মেনে নিবেন না। কারণ ছেলে এখনও চ্যাংড়া, দাড়ি-গোঁফ গজালেও মাসে দুইবার কামানোর দরকার পড়েনা। তার উপর বেকার ছেলে। কালা মিয়াও মনে মনে সানজিদার উপর বেজার। এত কম বয়সে প্রেম করে একটা নাদান ছেলের সাথে চলে আসল। এখন সমাধান একটাই। ‘রশীদ মনে অয় কাম থেইকা ফিরছে। আগে যখন গেরামে আছিল তহন মক্তবে পোলাপানগরে সক বাতাইয়া দিত। এহন ভ্যান চালায়। আপনারা অজু কইরা আসেন। কালেমা পড়াইয়া বিয়াটা অইয়া যাক। ঝামেলা ফিনিশ।’ প্রস্তাব করল কালা মিয়া।
না চাচা, রেজিস্ট্রেশন ছাড়া বিয়ে আমি করবোনা। জগতে পুরুষ মানুষদের বিশ্বাস নেই।
এই কথা শুনে শাওন চোখ ছোট করে তাকিয়ে থাকল সানজিদার দিকে। বড় একটি নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
চাচা আমিও চাইনা বিয়েটা এভাবে হোক। আজকের দিনে আমার শিক্ষা হয়েছে। যা কিছু হবে পারিবারিক ভাবেই হবে। শাওনের কন্ঠে অনেক আত্নবিশ্বাস। সানজিদার মুখেও হাঁসি ফুটল খুশীতে। শাওনকে আর ম্যাদামারা বলা যাবেনা।

মেহমান এসেছে বলে কালা মিয়া আজ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কাঁঠাল-বাগান থেকে বাজার করে এনেছে। তারপর পেয়াজ দিয়ে কই মাছ বুনা আর টমেটো দিয়ে ডাল রান্না হল। আয়োজন ছোট হলেও সমাদরের ত্রুটি নেই। খাওয়ায় ধোঁয়া উঠছে। নূরজাহান আর মালা কি করে শাওনদের একটু বেশি খাওয়াতে পারবে সেই চেষ্টায় রত। কালা মিয়া তখন তাদেরকে কিস্যা শুনাতে ব্যস্ত। সানজিদা আর শাওনও মন দিয়ে শুনছে সে কিস্যা।
......... হেরপর সেই নব্বই সনের বন্যা। তালগাছ সমান পানি উঠছিল। আমাগো ঘরবাড়ি, ক্ষেতের ফসল সব ভাইস্যা গেল। আমরা হগলে মিইল্যা তখন একটা বাঁধের উপর সংসার পাতছি । হঠাৎ দেখলাম পানিতে ভাসা একটা কাঠের গুড়িতে কি জানি নড়াচড়া করতেছে। কাছে গিয়া দেখি একটা জ্যান্ত বাচ্চা। ঐ বিপদের মধ্যে বাচ্ছাডারে কেউ নিতে রাজী হইলোনা। আমাগো কলিজার টুকরা সেই মালা এখন দেহেন কত বড় হইছে! মাসাল্লাহ।
এই কথা শুনে হঠাৎ যেন চৈতন্য ফিরে ফেল সানজিদা। তার মায়ের কথা মনে পড়ছে।খুব খারাপ লাগছে মায়ের জন্য। নূরজাহান বেগম মালাকে পেটে ধরেননি। অথচ কত ভালবাসে মালাকে। মা যতই রাগ দেখান না কেন তার মাও কল্পনার চেয়ে অনেক বেশি ভালবাসে তাকে। এতক্ষণে মা নিশ্চয়ই কেঁদে অস্থির। কত যায়গায় খবর লাগিয়েছে কে জানে! সানজিদা মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, কাল সকালেই বাসায় ফিরে যাবে। মা কিছু বকা-সকা দিয়ে ঠিকই আবার বুকে টেনে নিবেন।

পাঁচ
রাত অনেক হয়েছে। শক্ত ইটে মাথা রেখে আর গায়ের উপর চটের বস্তা পেঁচিয়ে কি সুখে ঘুমাচ্ছে মানুষ তিনটি। লাখ টাকার বিছানায় শুয়েও মানুষ মনে হয় এত সুখে ঘুমাতে পারেনা। অনেক পুরানো, স্থানে স্থানে বড় ফুঁটা হয়ে যাওয়া আর ধূলিময় একটা ভারী কাঁথা অবশ্য আছে, আছে দুইটি ভয়ানক তেল ছিটছিটে বালিশও। সেগুলো দেয়া হয়েছে শাওন আর সানজিদাকে। তবে ওরা আগেই ঠিক করে রেখেছিল আজকের রাত না ঘুমিয়েই কাটাবে।

কাঁথাটা গায়ে জড়ানোর ইচ্ছে ছিলনা তাদের। কিন্তু রাত বাড়ার সাথে সাথে শীত যেন জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকলো। সানজিদার পাতলা চাদরে তখন আর শীত মানছেনা। ময়লা কাঁথাটা গায়ে জড়িয়ে বসে আছে ওরা। দুহাত দিয়ে সানজিদাকে জড়িয়ে রেখেছে শাওন। সানজিদা আরাম পাচ্ছেনা। জেগে থাকার ইচ্ছে থাকলেও চোখে ঘুম জড়িয়েছে সারাদিনের ক্লান্তিতে। তাই কখনও মাথা রাখছে শাওনের বুকের কাছে, তারপর আবার নড়েচড়ে বসে। শাওন তার কানের কাছে মৃদু স্বরে বলল,
এই সানজু, এমন রাত তো আর পাবোনা কোনদিন। চল না বাইরে যাই। শীতের রূপ দেখে আসি গিয়ে।
তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে! শীতে মারা যাবি।
আরে না, কিছু হবেনা। চল।
আমার অত রোমাঞ্চ নেই, তোর ইচ্ছে হলে তুই যা।
হঠাৎ করে সানজিদাকে টান মারল শাওন। একদম বুকের সাথে মিশিয়ে ফেলল। সানজিদার চোখ মেলে গেল এবার। ঘুম ঘুম চোখে সে বলল,
কি নোংড়ামি হচ্ছে? অসভ্য কোথাকার। ছাড় বলছি।
ছাড়বোনা। সানজিদা তাকিয়ে রইল শাওনের দিকে।
শাওন নরম হয়ে আবারো বলল, আগে বাইরে চল।

সানজিদাকে প্রায় জোরপূর্বক বাইরে নিয়ে আসলো শাওন। কুয়াশা বেশি নেই, তবে হাড়-কাপানো শীত পড়ছে বাইরে। রাস্তার হলুদ ল্যাম্পোস্টগুলো ঘিরে কোন পোকাটি পর্যন্ত নেই। এক কাঁথায় জড়াজড়ি করে হাঁটছে ওরা। পিচডালা রাস্তায় লম্বা ছায়া পড়ছে। পেছন থেকে ওদের লাগছে ভূতের মত। হাঁটতে হাঁটতে কাওরান বাজারের ভেতর চলে এল ওরা। হঠাৎ করে থেমে গেল সানজিদা। তার চোখজোড়া ভয়ংকর কিছু আবিষ্কার করল। সে দেখতে পেল শুদু ফুটপাতেই নয়, রাস্তার ধারের ভ্যান আর সবজীর টুকরিগুলোতে মুমূর্ষের মত কাতরাচ্ছে কিছু মানুষ, শীতের জ্বালায় ঘুমাতে পারছেনা তারা। সানজিদার মনে হচ্ছে সে কোন ধ্বংসস্তূপের কিনারায় এসে পড়েছে। তার চোখ ভিজে গেল জ্বলে। পৃথিবী কি নিষ্ঠুর এখানে! পৃথিবীর মানুষগুলো কি নিষ্ঠুর! পৃথিবীটাকে একটা লাথি দিতে ইচ্ছে করছে তার। কেন এত বৈষম্য? কেন সবার সুখ সমান হয়না? কেন মানুষ কেবল নিজেকে নিয়ে বাঁচতে ভালবাসে? কি স্বার্থপর এই পৃথিবীর মানুষগুলো। পরের দুঃখ কখনও স্পর্শ করেনা তাদের। পৃথিবীর ধনী মানুষগুলোর প্রতি প্রচন্ড ঘৃণা হচ্ছে সানজিদার। একট কান্নার শব্দ শুনতে পেল সানজিদা। চেয়ে দেখল পাশেই একটি ছোট বাচ্ছা কাঁদছে; যতটা না ক্ষুধার জ্বালায়, তার চেয়ে বেশি শীতের জ্বালায়। সানজিদা সইতে পারলোনা সে দৃশ্য। কাঁথার নীচ থেকে তার গায়ের চাদরটি বের করে তাড়াতাড়ি জড়িয়ে ধরল শিশুটিকে। সানজিদা আবারো আসবে ওদের কাছে, তবে খালি হাতে নয়।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • রওশন জাহান
    রওশন জাহান অনেকদিন পর তোমার চমত্কার একটি গল্প পড়লাম.এগিয়ে যাও এই গতিতে. শুভকামনা থাকলো.
    প্রত্যুত্তর . ১৬ জানুয়ারী, ২০১২
  • রনীল
    রনীল গল্প যে প্যাটার্নের উপর দাড় করিয়েছেন, সেটা করার জন্য যথেষ্ট সাহস এবং দক্ষতার প্রয়োজন হয়... বোঝা গেল এর দুটোই আপনার কাছে আছে। শুরুতে জমতে একটু সময় লেগেছে, কিন্তু এরপরের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে গল্প এগিয়ে নিয়ে গেছেন তরতর করে... অনেক ভালো লাগলো... শুভ কামনা।
    প্রত্যুত্তর . ১৬ জানুয়ারী, ২০১২
  • মোঃ শামছুল আরেফিন
    মোঃ শামছুল আরেফিন রওশন আপু, অনেকদিন পর পেলাম আপনাকে। ভাল লাগছে আপনার কমেন্ট পেয়ে। অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
    প্রত্যুত্তর . ১৬ জানুয়ারী, ২০১২
  • মোঃ শামছুল আরেফিন
    মোঃ শামছুল আরেফিন রনীল ভাই, এইবার আপনাকে অনুরোধ করে এনেছিলাম আমার গল্পে। কারণ হচ্ছে আপনার কমেন্ট মিস করা। গল্পে এসে আপনার মূল্যবান মতামত দিয়েছেন এবং আমাকে অনেক উৎসাহ জুগিয়েছেন সেই জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
    প্রত্যুত্তর . ১৬ জানুয়ারী, ২০১২
  • মুহাম্মাদ মিজানুর রহমান
    মুহাম্মাদ মিজানুর রহমান ভাগ্নে, তুমি তো দেখছি সবাইকে টপকে যাবে এইবার.......অসাধারণ.......
    প্রত্যুত্তর . ২৭ জানুয়ারী, ২০১২
  • প্রজ্ঞা  মৌসুমী
    প্রজ্ঞা মৌসুমী দারুণভাবে শুরু হলো। প্রাণবন্ত লেখনী। দুজনের ঘোর ছিনতাইকারী আর মৌলিক চাহিদার ধাক্কায় যেভাবে সরালে, ভালো লাগলো। ভাবছিলাম কি হবে ওদের পরের দিন। কিন্তু শেষে এসে ঐ চিন্তা হারিয়ে গেল।সলীলদার গানটা মনে পড়লো "আজ নয় গুন গুন গুঞ্জন প্রেমের...আসুক সারা বিশ্বের বেদনা...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ৩০ জানুয়ারী, ২০১২
  • সালেহ  মাহমুদ
    সালেহ মাহমুদ গরম গরম শুভেচ্ছা আরেফিন। খুব ভালো লাগলো।
    প্রত্যুত্তর . ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০১২
  • ইসমাইল বিন আবেদীন
    ইসমাইল বিন আবেদীন অভিনন্দন...............
    প্রত্যুত্তর . ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১২
  • Sisir kumar gain
    Sisir kumar gain অনেক সুন্দর শীতের গল্প, হৃদয়কে স্পর্শ করে যায়। লেখার হাতও ভাল। লেখা চালিয়ে যেয়ো। "একুশে ফেব্রুয়ারী" সংখ্যার লেখা না পেয়ে শীত সংখ্যা পড়ে ফেললাম।শুভ কামনা রইল।
    প্রত্যুত্তর . ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১২
  • খোন্দকার শাহিদুল হক
    খোন্দকার শাহিদুল হক বাহ! বিলম্বে হলেও পড়তে পেরে ভাল লাগছে। সত্যিই দারুন। শুভ কামনা আপনার জন্য।
    প্রত্যুত্তর . ৯ মার্চ, ২০১২

advertisement