লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১০ মার্চ ১৯৬৭
গল্প/কবিতা: ৪০টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftভালবাসা (ফেব্রুয়ারী ২০১১)

দাঁড় কাকের বিউটি পার্লার
ভালবাসা

সংখ্যা

হোসেন মোশাররফ

comment ২৪  favorite ২  import_contacts ১,৫৬৬
দাঁড় কাক দম্পতি বট গাছের নিচে নূতন দোকান দিয়েছে। দোকানের নাম দিয়েছে রূপসীদের বিউটি পার্লার। ভালই চলছে তার দোকান। প্রতিদিন সকাল থেকেই ভিড় লেগে যায় তার দোকানে। চারদিক থেকেই অল্প বয়সী পাখিরা এসে বেশ ভিড় করতে লাগল প্রতিদিন।
কিন্তু দাঁড়কাকের জানা ছিল না সেই বট গাছটির মাথায় ছিল এক পেত্নী বাসা। দীর্ঘদিন থেকে সে সেখানেই থাকে অথচ কেউ জানে না সে কথা। পাখিদের সাজ গোঁজ দেখে দেখে একদিন তারও সাধ জাগল বিউটি পার্লারে যেয়ে একটু সাজ গোঁজ করার। তবে পেত্নী ইচ্ছা এত সকাল সকাল সেখানে যেয়ে হামলা না করা। আগে তাদের ব্যবসাটা একটু জম জমাট হয়ে যাক। হয়তো এমনও তো হতে পারে তাকে দেখেই দাঁড় কাক দম্পতি সেখান থেকে ব্যবসা গুটিয়ে অন্য কোথাও উড়াল দিল। পেত্নী সবুর ধরল।
দিন যায়, মাস যায়। বটগাছের নিচে কাকের দোকান; ব্যবসা ভালই চলছে। আর এদিকে ঠিক তার উপরেই পেত্নী বাসা; বেচারা ধৈর্য ধরে অপেৰায় আছে। অথচ তা কেউ, এমনকি কাক পৰিটাও জানে না।
অবশেষে এক রাত্রে এক জোড়া হাঁড়ীচাঁচা পাখি সেই বটগাছের মগডালে এসে বসেছে তাদের মধুচন্দ্রিমার রাত যাপন করতে। তারাও ঘুণাক্ষরে জানে না সেই গাছেই ব্যাচেলার পেত্নীর বসবাস।
সকাল বেলায় মধুচন্দ্রিমা যাপন শেষে যখন হাঁড়ীচাঁচা পাখি উড়ে চলে গেল তখন পেত্নীরও শখ জাগল ভূতের সাথে প্রেম করার। যেই কথা সেই কাজ। গাছের মাথায় বসে একটা লম্বা চওড়া প্রেম পত্র লিখে ফেলল পেত্নী। তারপর সেটা ফেলে এল পেঁচার পোস্ট অফিসে। রাতের ডাক দিনেই নিয়ে উড়ে চলে গেল বাদুড়।
ভূত বসবাস করে জাম গাছের মাথায়। অবেলায় বাদুড়ের ডাক শুনে চেয়ে দেখল সে বাদুড় এসে বসেছে গাছের ডালে। তার ঝোলায় চিঠির ঝাঁপি। উৎসাহিত হয়ে ভূত বলল, 'কি গো, এই অবেলায় কার চিঠি নিয়ে এলে, দিনের বেলায় তো তুমি বের হওনা জানি।'
'সাধে কী আর বের হয়েছি রাত হলেই তো তুমি বের হয়ে পড়বে তোমার ধান্ধায়। আর এ চিঠিও তো যার তার না ; তোমার বন্ধু পেত্নী। বাসায় ফিরলেই সে যখন জিজ্ঞেস করবে, তার চিঠির সংবাদ; তখন তাকে কী উত্তর দেব।' বলল ডাকপিয়ন বাদুড়।
বাদুড়ের কথা শুনে অবাক হয়ে চেয়ে রইল তার দিকে ভূত। তারপর বিস্ময়ের রেশ কাটিয়ে উঠে বলল সে, 'ভারি অবাক করলে তুমি। আমার কোন পেত্নী বন্ধু নেইতো।'
'থু ক্কু,আমারই বলতে ভুল হয়েছে। বন্ধু হবে কেন, তোমার বান্ধবী পেত্নী তোমাকে লিখেছে চিঠিটা।' শুধরে নিয়ে বলল আবার বাদুড়।
কিন্তু ভূত তার কথায় অনড় থেকেই বলল, 'হল বান্ধবী, কিন্তু আমি তো কখনো কোন পেত্নীর সাথে ইয়ে করিনি যে সে আমাকে চিঠি দেবে।'
'বললে তো হবে না পড়েই দেখ, কী লিখেছে তোমার প্রেমিকা।' বাদুড় সোজা সাপ্টা জবাব দিয়ে দিল ভূতের মুখের উপর।
'ভারি মুশকিলে পড়া গেল দেখছি।' রাগে গজ গজ করতে করতে ভূত বলল এবার, 'দাও দেখি এদিকে একটু পড়ে দেখি কার কর্ম এটা।'
তারপর ভূত চিঠিটা বাদুড়ের হাত থেকে নিয়ে পণ্ডিতি চশমাটা কায়দা মতো নাকে এঁটে পড়তে শুরু করল। লম্বা চিঠি। পড়তে অনেক সময় লাগবে। বাদুরের অপেক্ষা করার সময় নেই হাতে। বলল, 'আমার এখন অনেক কাজ। তোমার কাছে বসে থাকলে তো আমার চিঠি বিলি করা হবে না। আমি এখন যাই।'
বাদুড় কথা শেষ করে ওড়ার জন্য পাখা ঝাপটা দিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু ভূত তাকে থামাল। বলল, 'ভাই শোন, এত তাড়াহুড়া করতে নেই। চিঠিটা আমি পড়ে নিই, একটা জবাব টবাব যা হোক কিছু দিতে হবে তো; তারপর যেও।'
ভূতের কথা শুনে বাদুড়ের এবার রাগে পিত্তি জ্বলে গেল। মনে মনে বলল সে 'প্রথমে তো বেশ নেকামো পনা দেখাচ্ছিলে। এখন আবার চিঠি পড়ে তার উত্তর লিখে তারপর ছুটি।' ভূত বলে কথা, বেশি বকা যাবে না তার সাথে। তাই নিজেকে সামলে নিয়ে সে আবার বলল, 'দেখ ভাই ভূত। তোমাকে আমি সম্মান করি। কিন্তু তোমার কথা মতো চলতে গেলে তো চাকরিটাই খোয়া যাবে আমার। তারচে' পড়া শেষ করে, চিঠির উত্তর লেখা শেষ করে পার কোন চামচিকার হাতে দিয়ে পাঠিয়ে দিও চিঠিটা।'
ভূত নারাজ তাতে; বলল,'চামচিকার বিশ্বাস নেই। সে ছোট পাখি। কোথাকার চিঠি কোথায় নিয়ে ফেলবে শেষে বিপদে পড়ব আমিই। তারচে' চিঠির বিস্তারিত পড়ে কাজ নেই আমার, তুমি তাকে বলো জামগাছের ভূত তোমার চিঠি ফেরত দিয়ে বলেছে তোমার মতো পেত্নীর সাথে প্রেম করতে কাজ নেই তার। ব্যস, তাহলেই হবে।'
কী আর করা। বাদুড় হুকুমের দাস। চিঠিটা ফেরত নিয়ে আবার তার ঝোলায় পুরতে পুরতে বলল, 'আচ্ছা, ঠিক আছে। তাই হবে; তাই বলে দেব তাকে।'
সেদিন রাতে পেত্নী অধীর আগ্রহে বসেছিল পাতার ফাঁকে। সে ভেবে রেখেছিল জাম গাছের ভূত যখন দেখবে যে এক পেত্নী তাকে যেচে প্রেমপত্র লিখেছে; তখন নিশ্চয় সে তাকে হাতে হাতেই উত্তর লিখে পাঠাবে। কিন্তু বাদুড় কে শূন্য হাতে ফিরতে দেখে সে আগেই ভয়ে চমকে উঠেছিল। পরে যখন সব শুনল বাদুড়ের মুখ থেকে আর দেখল যে তার চিঠিটাও সে না পড়েই ফেরত দিয়েছে; তখন রাগে অগ্নি শর্মা হয়ে বলল, 'কী, এত বড় কথা? ঠিক আছে আমিও দেখে নেব। হাঁ যা,দেখে নেব কত ধানে কত চাল।'
তারপর আর দেরি করল না পেত্নী। সেদিন রাতেই দাঁড় কাকের বিউটি পার্লারে যেয়ে ধরনা দিল সে।

সেদিন একটু রাতই হয়েছিল দাঁড়কাক দম্পতির বিউটি পার্লার বন্ধ করতে। একে ভরা মৌসুম তার উপর জোনাকি পোকারা এসে আলো না ছড়ালে এত রাত করে দোকান খোলা রাখার প্রশ্নই ওঠে না। এমন সময় অন্ধকারে পেত্নী এসে দাঁড়াল তাদের দোকানের সামনে। কাক বলে কথা, ভয় পেল না মোটেও। বলল, 'এটা একটা বিউটি পার্লার। সাজগোজ করার জন্যে বনের পাখিরা এখানে আসে।'
পেত্নী বলল, 'ভালই জানি সব কিছু। বট গাছটার মালিক যখন আমি তখন আমি জানব নাতো কে জানবে।'
বিপদ বুঝে চমকে উঠে দাঁড়কাক বলল, 'তা বেশতো বেশতো। উচিত ছিল আমারই যেয়ে আপনার সাথে দেখা করা, তা যখন এসেই পড়েছেন বলুন এখন কী খেদমত করতে পারি আপনাকে?'
'খেদমত আর কীইবা করতে পার তুমি। উচিত ছিল সমুদয় বাকি পাওনা সহ বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী দোকান ভাড়াটা আগে মিটিয়ে দেয়া। তারপর পাওনা-বাটা চুকে বুকে গেলে তখন বাকি কথা শুরু করা।' ঠিক এভাবেই কেতাবি ঢঙে বলা শুরু করল পেত্নী।
মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল দাঁড়কাক দম্পতির। তারপর ভয়ে ভয়ে বলল তারা, 'দেখুন গরিব গুর্বা সামান্য কাক আমরা। আপনার দয়ায় একটু করে কম্মে খাচ্ছিলাম। যদি দয়া না করেন তাহলে চলে যেতে হয় অন্য কোথাও।'
সুযোগটা ষোল আনা বুঝে পাওয়ার পর পেত্নী এল এবার আসল কথায়। বলল, 'হাঁ যা, তা যা বলেছ। এমন একটা বট গাছের মালিক হওয়া তো আর চাট্টি খানি কথা না। দয়া দাক্ষিণ্যটা দেখাচ্ছি বলেই তো এখনো তোমার মতো গরিব গুর্বা পাখিরা সব করে কম্মে খাচ্ছে। ঠিক আছে ভাড়া তোমায় দিতে হবে না বাপু। তবে একটা শর্তে, আমাকে এমন ভাবে সাজিয়ে দাও, আর কিছু না হোক; ঐ জাম গাছে বাস করা গেছো ভূত যেন আমার পিছু না ছাড়ে আর।'
মাথায় আবার আকাশ ভেঙে পড়ল দাঁড়কাক দম্পতির। মনে মনে বলল এবার তারা, 'এই মরেছে। তারচে' ভাড়া চুকিয়ে দেয়াটাই ঢের সহজ বিষয় ছিল আমাদের জন্য। এখন ব্যাঙ ব্যাঙ রং ফুরালেও তো পেত্নী ঐ চেহারায় একটু খানি গোলাপি আভা ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হবে না। ব্যবসাটাই বুঝি গেল এবার।'
কিন্তু ধনুকের তীর আর মুখের কথা একবার বের হয়ে গেলে তাকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না। দাঁড় কাকের অবস্থাও তাই লেজে গোবরে হল। কিন্তু তাই বলে খরিদ্দারের সাথে তো আর খারাপ ব্যবহার করা যায় না। এদিকে আবার যেমন তেমন খরিদ্দারও না, রীতিমতো বটগাছটির মালিক সে; জাতেও পেত্নী। সুতরাং...
মিষ্টি হেসে দাঁড়কাক বলল, 'ওসব নিয়ে আপনি মোটেও ভাববেন নাতো। দেখবেন এমন করে চেহারাটা আপনার ফুটিয়ে দেব না, গেছো ভূত তো ভূত; ভূতের বাপেরও মাথা ঠিক থাকবে ন ন ন...এ যা আবার কী বলতে কী বললাম। ছি ছি...
পিছন থেকে মারমুখী হয়ে দাঁড়কাকের স্ত্রী বলল, 'থামো তো তুমি। কোথায় কী বলতে হয় তাও জানো না। দিলে তো সব নষ্ট করে।'

পেত্নী কিন্তু এতে মোটেও চটল না। উল্টো সে আরো দাঁড়কাকের কথায় সায় দিয়ে বলল, 'সে ঠিকই বলেছে, বাবার মাথা বেঠিক না হলে তো আর ছেলের বিয়ে তাড়াতাড়ি দেবে না। ঠিক আছে তাহলে কালই আমি আসছি তোমার দোকানে। তুমি তৈরি থেক।'
সেদিন পেত্নী বিদায় নেয়ার পর শুধু অল্পের জন্য দাঁড়কাক তার স্ত্রীর ঠোঁটের ঠোকর খাওয়া থেকে বেঁচে গেল। শুধু বেফাঁস কথা বলার জন্যেই সে এই শাস্তি পেতে যাচ্ছিল।

পরদিন দাঁড়কাক দম্পতি পেঁচার বাসায় গেল আকস্মিক এই বিপদের হাত থেকে বাঁচার জন্য একটা পরামর্শ নিতে। ভেবে চিন্তা পেঁচা তাদের বলল, 'গেছো ভূত হয়তো আমাকে দেখলে তার প্রেম কবুল করতে পারে কিন্তু পেত্নীর চেহারায় যতই পালিশ দাও না কেন তোমরা; হয়তো সেটা অসম্ভব কোন বিষয় হবে।'
পাংশু মুখে কাক দম্পতি বলল, 'তাহলে এখন উপায় কী হবে?'
'উপায় একটা আছে। তবে...
'তবে কী?' উৎসুক হয়ে জানতে চাইল কাক দম্পতি।
'একটু ধৈর্য ধরতে হবে তোমাদের।'
'ধরলাম। তারপর বলুন কী করতে হবে।'

পেঁচা দাঁড়কাক দম্পতির কানে কানে কিছু একটা বলল। পরদিন দেখা গেল দাঁড়কাকের বিউটি পার্লার বন্ধ। বন্ধ দরজার পাল্লায় একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনামা লেখা। সেখানে লেখা ছিল:-

ভালবাসলে বাসতে পার, তবে একটা কথা জেনো
গায়ের জোরে ভালবাসা পায়নি কেউ আজো।
ইচ্ছে হলেই বাসতে পারো ভাল,
তবে সাজ গোঁজ আর রং পালিশটা ছাড়ো-
তার সাথে কাজের গুণ আর স্বভাবটাও যদি,
বুঝে শুনে বদলে ফেলতে পার।
তবেই হবে ভালবাসা, এতে মিথ্যে নেই তো কোন।

পরদিন থেকে পেত্নী কে আর কখনো দেখা যায় নি ঐ বট গাছটির চৌহদ্দিতে। লোকমুখে শোনা যায় ভূতকেও নাকি আর কখনো জ্বালাতন করেনি সে। প্রেমপত্রও আর লিখতে হয়নি তাকে, তবে ভূতই নাকি একবার চেয়েছিল পেত্নীর সাথে গাঁটছড়া বাঁধতে। সেবার পেত্নীই আর তাকে পাত্তা পুত্তি দেয়নি। যাক, সে কথা-
আর সেই দাঁড়কাক দম্পতির বিউটি পার্লার? সেখানে সেই বটগাছের নিচে আজও আছে। কেউ যদি কখনো যান সেখানে একটু লৰ্য করলেই দেখতে পাবেন, সেখানে সেই দাঁড়কাক দম্পতি দিব্যি চুটিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সাবধান! আপনারা কেউ ভুলেও সেই বিউটি পার্লারে ঢুকতে যাবেন না যেন, বলা যায় না ; পেঁচা আবার তাদের কী পরামর্শ দেয়। আর তাতেই বিপদে পড়ে যাবেন আপনিও।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement