লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ মার্চ ১৯৭১
গল্প/কবিতা: ২৮টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৭৯

বিচারক স্কোরঃ ৩.৬৯ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.১ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগ্রাম-বাংলা (নভেম্বর ২০১১)

চন্দ্রমল্লিকা
গ্রাম-বাংলা

সংখ্যা

মোট ভোট ৭৭ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৭৯

সালেহ মাহমুদ

comment ৭২  favorite ৮  import_contacts ৯০৫
গুদারা ঘাটে নৌকা থেকে নামতেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হয়। আর পড়ি কি মরি করে দৌড় দেয় রায়হান। দৌড়ে গিয়ে মিলগেটের বাইরের বড়সর মন্দিরটার খোলা বারান্দায় উঠতে গিয়ে থামকে দাঁড়ায়। ঝুঁকে পড়ে পায়ের জুতো খুলে হাতে নিয়ে তারপর মন্দিরে প্রবেশ করে। তার জন্য না হোক আর কারো জন্য পবিত্র স্থান এটা। সেই পবিত্রতাকে সম্মান না করে পারে না রায়হান। একটু জড়োসড়ো ভাব নিয়ে মন্দিরের চারদিকটা দেখে। বেশ বড় মন্দির। বাইরের বারান্দা দুই ধাপের। পাশ-দিঘে প্রতিটি ধাপ প্রায় দশ হাত-বিশ হাত হবে। এরপর এরকম বড়সড় আরেকটা ধাপ। তারপর কলাপসিবল গেট দিয়ে আটকানো মূল মন্দির। ভিতরে বিশাল ফাঁকা জায়গার শেষ প্রান্তে অনেক দেব-দেবীর মূর্তি সাজানো। সে কেবল কালী মুর্তিটাকেই চেনে, আর কোন মূর্তি চেনে না।
কাঁধে ব্যাগ, হাতে জুতো নিয়ে দাঁড়িয়েই থাকে রায়হান। এত বড় বারান্দায় আরো জনাকয়েক থাকলেও পরিচিত কাউকে দেখতে পেলো না সে। ভিতরের বারান্দায় মূর্তির দিকে গড় হয়ে বসে থাকা একজন বাদে বাকী সবাইকে তার মুসলমান বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু তাদের কারো ভিতর কোন বিকার আছে বলে তার মনে হলো না। মাঝ বয়সী কৃষক গোছের দু'জন পাশাপাশি বসে আরাম করে বিড়ি ফুঁকছে আর গল্প করছে। মালকোছা মারা আধভেজা একজন একটা খামের গায়ে হেলান দিয়ে নিবিষ্ট মনে নাক খুঁটছে আর বষ্ঠিগুলো আঙ্গুলে ডলে ডলে শক্ত করে বারান্দায়ই ফেলে দিচ্ছে। রায়হান ঘেন্নায় চোখ ফিরিয়ে নিল। তার মনোযোগ ঐদিকে থাকাতে সে খেয়ালই করে নি তার বামপাশে কাকভেজা হয়ে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে।
রায়হানের গায়ে যখন চুল ছিটানো পানি এসে পড়লো তখন সে তাকিয়ে দেখলো তার ঠিক গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে কাকভেজা এক যুবতী। বৃষ্টির পানিতে ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে আছে তার সালোয়ার কামিজ। মাথার চুল দুই বুকের উপর ছড়িয়ে দিয়ে কিছুটা আব্রু ঢাকতে চাইছে সে। রায়হান ফিরে তাকাতেই চোখে চোখ পড়ে গেল তার। যুবতীটির লাজবিনম্র, জড়োসড়ো-ভীত-সন্ত্রস্ত চাহনি রায়হানের ভিতর কাঁপন তুলে দেয়। রায়হান সাথে সাথেই চোখ নামিয়ে নিয়ে কাঁধের ব্যাগ খুলে একটি বড় তোয়ালে বাড়িয়ে দেয় যুবতীর দিকে। যুবতীটি তোয়ালে লুফে নিয়ে বুক-পিঠ ঢেকে ফেলে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে আর সকৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে রায়হানের দিকে তাকিয়ে বলে, "আপনাকে যে কি বলে ধন্যবাদ দেব বুঝতে পারছি না, আপনি আমাকে বিব্রতকর অবস্থা থেকে মুক্তি দিলেন। আপনি সত্যি অনেক ভালো মানুষ। ধন্যবাদ আপনাকে।"
রায়হান অবাক হয়ে যায় যুবতীর কথায়। কি ঝরঝরে শুদ্ধ বাংলা, এই অঞ্চলে তো এ রকম শুদ্ধ করে কেউ কথা বলে না। নিঃসন্দেহে যুবতীটি উচ্চশিক্ষিত! রায়হান বিনয় প্রকাশ করে- না না, এ আর এমন কি! আমার কাছে তোয়ালে ছিল বলেই না দিলাম। না থাকলে দিতাম কোত্থেকে? আমার সাধ্যে যতটুকু ছিল ততটুকু করেছি আপনার জন্য, এর বেশী কিছু না।
যুবতীটি যেন আরো বিনয়ী হয়ে ওঠে। এ আপনার বিনয় জনাব, আপনাকে আবারো ধন্যবাদ দিয়ে খাটো করবো না। তবে এটুকু বুঝতে পারছি আপনার কাছে তোয়ালে না থাকলে আপনি গায়ের শার্টটা খুলেই আমাকে দিয়ে দিতেন। কি ঠিক বলছি না জনাব?
না, ঠিক সেভাবে তো ভেবে দেখিনি। তোয়ালে না থাকলে চিন্তা করা যেতো আর কি।
কথার মাঝখানে বৃষ্টির মাত্রা বেড়ে যায়। সাথে সাথে মৃদু ঝড়ো বাতাস। মন্দিরের সামনে বটগাছটা অত বিশাল না হলেও একেবারে ছোট নয়। বটগাছের চারপাশ জুড়ে বেদি করা হয়েছে। সেখানে বসে এতক্ষণ গল্প এবং গোসল করছিল পাশের মিলের কয়েকজন শ্রমিক। ঝড় বাড়ছে দেখে তারা ধীরে ধীরে কেটে পড়ে যার যার গন্তব্যে। মন্দিরের বারান্দার টিনের চালে আছাড় পড়ে বটের শাখা-প্রশাখার। চমকে ওঠে রায়হান। যুবতীটিও চমকে উঠে রায়হানের গা ঘেঁষাঘেষি হয়ে দাঁড়ায়।
মন্দিরে আশ্রয় নেওয়া কেউ খেয়া পারের জন্য বসে নেই। বাড়তে থাকা ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেই মাথায় গামছা-শার্ট তুলে ধরে দৌড়ে সবাই চলে যায় এক এক করে। গড় হয়ে বসে থাকা পূজারী ব্যক্তিটিও ভিজতে ভিজতে বেরিয়ে পড়ে এক সময়। সে আর যুবতী মেয়েটি ছাড়া আর কেউ নেই এখন মন্দিরে।
অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে খুব দ্রুত। ঘড়ির দিকে তাকায় রায়হান। সাড়ে ছ'টা বেজে গেছে। ঢাকার দিকে লাস্ট বাস ছাড়তে আর মাত্র আধ ঘন্টা বাকী। এখন কোন রিঙ্া পেলে ভিজে হলেও বাসস্ট্যান্ডে যাওয়া দরকার। হেঁটে অতটা পথ যেতে পারবে না সে। তাছাড়া রাস্তাও চেনা নেই তার। অবশ্য মিলের ভিতর ঢুকে কাউকে জিজ্ঞেস করে রাস্তা চিনে নিতে পারবে। কিন্তু এই ঝড়-বৃষ্টিতে যাবে কি করে? বাস মিস করলে আজকের মতো আর ঢাকা যাওয়া হবে না তার। জামালপুর হলে রিঙ্া-টেম্পোতে করে কোনমতে পাঁচদোনা পর্যন্ত যেতে পারলেই হতো, সিলেট-ভৈরব রুটের যে কোন বাসে ঢাকা ফিরতে কোন কষ্ট করতে হতো না তার। কিন্তু এই পলাশ থেকে শেষ বাসটা ধরতে না পারলে পাঁচদোনা পর্যন্ত যেতে অনেক ঝক্কি, তার চেয়ে গ্রামের বাড়ী ফিরে যাওয়া অনেক ভালো। কিন্তু এই ভর সন্ধ্যায় গ্রামের বাড়ী ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতেই তার বুকটা কেঁপে ওঠে। একে তো রাত-বিরাতে কখনো এই পথ মাড়ায় নি সে। তার ওপর ডাকাতের প্রচণ্ড ভয়। খেয়া পার হয়ে রিঙ্া না পেলে মাইল তিনেক পথ হাঁটতে হবে তাকে, যা তার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
গ্রামের বাড়ী থেকে কখনো এ পথে ঢাকায় যাতায়াত করে নি রায়হান। সব সময় জামালপুর গুদারা ঘাট পার হয়ে রিঙ্ায় ঘোড়াশালে এসে বাস ধরেছে অথবা হাত তুলে পলাশ থেকে ছেড়ে আসা বাস থামিয়ে ঢাকা ফিরেছে। আজ তার ব্যতিক্রম হলো রিঙ্াঅলার জন্য। আসর নামায পড়ে বাড়ী থেকে বেরিয়ে পরিচিত কোন রিঙ্া না পেয়ে হাটফেরত এক রিঙ্ায় জামালপুরের কথা বলেই উঠল। দু'মিনিট যেতে না যেতেই পরিচয় হয়ে গেলো রিঙ্াঅলার সাথে। পাশের গ্রামেই বাড়ী। পরিচয়ের পর রিঙ্াঅলা হাসতে হাসতে বলে,
- আপনে যে মাস্টারের পোলা, আমরা তো চিনিঅই না। দেশগেরামে না আইলে কি চিনন যায় বর। আপনের বাপে বড় বালা মানুষ গো। তাইনের শইলডা অহনে কেমুন?
রায়হানের বাবার মাস্টার হিসেবে খুব নামডাক তাদের থানা ও জেলায়। প্রচুর জনসেবা করতেন তিনি। কাউকে হাসপাতালে নেওয়া, কারো জন্য কোথাও সুপারিশ করে দেওয়া, মসজিদ-মাদরাসার জন্য ফান্ড কালেকশন করা, রাস্তা-ঘাট ইত্যাদির জন্য বিভিন্ন অফিস-আদালতে দৌড়াদৌড়ি করতেন নেশার মতো। কোথাও থেকে নিরাশ হতেন না। এ জন্য সবাই তাকে খুব পছন্দ করতো। তিনি যদিও ঢাকা শহরে সেটেল্ড হয়েছিলেন, কিন্তু নাড়ির টানে সবসময় ছুটে আসতেন গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে। গ্রামের মানুষরাও বলা নেই, কওয়া নেই পান থেকে চুন খসলেই ছুটে যেতো তার বাবার কাছে। মাস ছয়েক আগে স্ট্রোক করে প্যারালাইজড হওয়ার পর সবাই খুব মন খারাপ করে তার জন্য। রিঙ্াঅলার এই সহমর্মিতা রায়হানের খুব ভালো লাগে। হাসিমুখে উত্তর দেয়-
আপনেগো দোয়ায় আল্লাহ তারে বাঁচাইয়া রাখছে। আগের চেয়ে অনেক সুস্থ এখন। হাত নাড়াইতে পারে, পাওটা কাইত-চিৎ করতে পারে। আরো বছর খানেক না গেলে পুরা ভালা অইব না মনে হয়। দোয়া কইরেন।
আপনে ঢাহা গেলে পলাশেত্তে আরামে সিট লইয়া বইয়া বইয়া যাইতে পারেন। জামালপুরদা গেলে তো অনেকখুন খারইয়া থাহন লাগব।
হেইডা ঠিক কইছেন। তয় পলাশ দিয়া কোন সময় যাই নাই তো, চিনি না।
আরে একবারে সোজা। গুদারা পার অইয়া রিঙ্ায় একটানে বাসস্টেনে যাইবেন গা, তারপর টিকিট কাইট্রা খালি বাসে বইয়া পড়বেন।
তাইলে তো খারাপ অয় না। বাস ধরতে পারমু তো?
আরে কয় কি? লাস্ট বাস ছাড়ে সাতটা বাজে, ধরতে পারবেন বাস। যামু নি কন?
যান তাইলে, যদি ভালো হয়!
রায়হানের অনুমতির অপেক্ষায়ই ছিল যেন রিঙ্াঅলা। তার অনুমতি পেয়েই রিঙ্ার মুখ ঘুরিয়ে নতুন রাস্তায় ছুটতে থাকে নদীর দিকে। এ রাস্তায় বেশ ভালো লাগে তার। জামালপুরের রাস্তার দুই পাশে সব্জি ক্ষেতের ছড়াছড়ি। সব্জি ক্ষেত ছাড়িয়ে বিশাল ধানক্ষেতও আছে নদীর পাড় পর্যন্ত বিস্তৃত। কিন্তু ঐ পথের প্রতিটি বাঁক তার মুখস্ত বলে সেই চোখ জুড়ানো প্রাকৃতিক দৃশ্য তাকে আকর্ষণ করে না কখনো। কিন্তু এই পথটা নতুন বলে সে চারপাশের প্রকৃতি ভালো করে উপভোগ করতে থাকে। রাস্তার পাশের সারি সারি গাছগুলো ঝুঁকে আছে রাস্তার ওপর। দু'পাশে পুকুর, ধানক্ষেত, আবার পুকুর আবার ধানক্ষেত, বাঁকের পর বাঁক, বহুদূর বিস্তৃত ধানক্ষেতের পর বৃক্ষরাজির সীমানা দেয়াল। দূরে একটা উঁচু মিনার, ধানক্ষেতের মাঝখানে জাতীয় বিদু্যৎ গ্রিডের উঁচু টাওয়ার। রায়হান মুগ্ধ হয়ে যায়। তার মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে আসে- অপূর্ব!
দূরে ধানক্ষেতের মাঝখানে খোলা মাঠে খেলছে একদল শিশু কিশোর। দেখে তার শৈশবের কথা মনে পড়ে যায়। তাদের গ্রামের বাড়ীর দক্ষিণে ছিল বিশাল লম্বা টানা ঘাসময় ঢালু ভূমি। উপর থেকে গোলাকার কিছু ছেড়ে দিলে ধীরে ধীরে নীচের ধানক্ষেতে গিয়ে পড়তো। সেখানে তারা গ্রামের সব ছেলেমেয়ে খেলাধূলা করতো। গোল্লাছুট, বউছি, ডাঙ্গুলি, কানামাছি সব খেলা। এইসব খেলায় তার সাথে খুব জমতো পশ্চিম বাড়ীর জামিলার।
জামিলার কথা মনে পড়তেই বুকটা খালি খালি লাগে রায়হানের। মেয়েটাকে ভালোই লাগতো তার। কিন্তু ক্লাশ টেনে উঠলেই তার বিয়ে হয়ে যায়। সে এখন স্বামী-সন্তান নিয়ে শ্বশুর বাড়ী পলাশেই থাকে। মনে মনে ভাবে পলাশ দিয়ে যাচ্ছি- জামিলার সাথে যদি দেখা হতো! রিঙ্ার টুং টাং শব্দে তার তন্ময়তা কেটে যায়। ঘাটে এসে পড়েছে। গুদারা ঘাটটি অসম্ভব ভালো লাগে তার। জামালপুরের মতো ঘাটটা কাঁদাময় আর ন্যাড়া নয়, শক্ত মাটির ঘাট, তারপরও দুই পাশ জুড়ে বিশালাকার বৃক্ষরাজি ছায়াময় মায়ার পরিবেশ তৈরী করেছে। রিঙ্াঅলাকে অনেক ধন্যবাদ দেয় সে।
প্রচন্ড শব্দে চারদিক আলোর ঝলকানিতে ভরে তুলে কাছেপিঠে কোথাও বজ্রপাত হয়। যুবতী মেয়েটি প্রচন্ড ভয়ে চিৎকার করে রায়হানকে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে থাকে। আবারো মুহূর্মুহূ বজ্রপাত হয়। মেয়েটি চিৎকার করে আরো জোরে জড়িয়ে ধরে রায়হানকে, রায়হানও জড়িয়ে ধরে মেয়েটিকে। বজ্রপাত থামলে রায়হান হাতের বাঁধন শিথিল করে মেয়েটির পিঠে আঙ্গুলের হালকা সুড়সুড়ি তুলে মৃদু কণ্ঠে বলে- বজ্রপাত থেমেছে।

মেয়েটি ঘোর লাগা কণ্ঠে বলে- থামুক।
আমি ভিজে যাচ্ছি তো।
তাতে কি, শুকিয়ে যাবে এক সময়।
রায়হান মহা ফাঁপড়ে পড়ে যায়। অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে, সাথে ঝড়ো বাতাস। বৃষ্টির ঝাপটা মাঝে মাঝেই তাদের গায়ে এসে লাগছে। এদিকে মেয়েটির আলিঙ্গনের উষ্ণতায় শরীরে মিষ্টি একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ছে। এমন অনুভূতি আগে কখনো অনুভব করে নি সে, এমনকি স্ত্রীর আলিঙ্গনেও। অগত্যা সেও মেয়েটিকে আরো নিবিড় করে জড়িয়ে ধরে।
কিছুটা ধরে আসে বৃষ্টি। কিন্তু ততক্ষণে অন্ধকারে ছেয়ে গেছে চারদিক। ঘড়ি দেখে রায়হান, সাড়ে সাতটা। বুকের ওপর মেয়েটার দিকে খেয়াল করে, কি নির্ভাবনায় তাকে জড়িয়ে ধরে আছে। মনে হচ্ছে কত জনমের পরিচিত তারা দু'জন। রায়হানের পৌরুষত্ব জেগে উঠতে শুরু করে। অস্থির হয়ে পড়ে সে, মেয়েটির দুই কাঁধে ধরে জোর করে ছাড়ানোর চেষ্টা করে। পারে না। শেষ পর্যন্ত বলেই বসে, আপনি বুঝতে পারছেন না কেন আমি একজন পুরুষ মানুষ। বৃষ্টি কমেছে, এবার দয়া করে ছাড়ুন।
রায়হানের কথায় জাদুর মতো কাজ হয়। যুবতী মেয়েটি তাকে ছেড়ে দিয়ে তার দিকে মুখ করেই অধোবদনে দাঁড়িয়ে থাকে। অন্ধকারের কারণে কারো চেহারা ঠিকমত দেখা যাচ্ছে না। বৃষ্টি একটু ধরে আসলেও আবার বাড়তে থাকে, সেই সাথে বাড়তে থাকে ঝড়ো বাতাস। রায়হান নদীর দিকে তাকায়। আবছা আঁধারে নদীতে বৃষ্টি পতনের ছন্দ আর হালকা ঢেউ ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। কোন নৌকা কিংবা ট্রলার ইত্যাদি কিছুই না। রায়হান হতাশ হয়ে পড়ে। ঠিক এই মুহূর্তে কোত্থেকে যেন একটা ব্যাঙ লাফ দিয়ে এসে মেয়েটির পায়ের ওপর পড়ে। মেয়েটি ভয়ে 'মাগো' বলে চিৎকার করে লাফিয়ে উঠে আবারও জড়িয়ে ধরে রায়হানকে।
রায়হান মেয়েটিকে ছাড়িয়ে দিতে দিতে বলে- কিছু না, ওটা একটা ব্যাঙ। দেখুন ও চলে যাচ্ছে।
মেয়েটি রায়হানকে ছেড়ে দিয়ে এবার দু'হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলে হু হু করে। রায়হান কিছুই বুঝতে পারে না। কি করবে সে এখন? মেয়েটি কেন কাঁদছে? ভয়ে না লজ্জায়! কে জানে! রায়হান কিছু বলতে যেয়েও থেমে যায়। মেয়েটির কান্না আরো বাড়তে থাকে। রায়হান এবার আর পারে না। মেয়েটির মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করে, আরে আপনি কাঁদছেন কেন? ভয় পেয়েছেন? আমাকে ভয় করছে?
মেয়েটি মাথা নেড়ে অস্বীকার করে। কিন্তু তার কান্না থামে না। রায়হান তার মাথায় হাত দিয়ে শান্ত্বনা দেয়- আরে বাবা, কান্না থামান। কেউ দেখলে তো ভাববে কি না কি করে ফেলেছি। প্লিজ কান্না থামান।
মেয়েটি এবার কান্নার বেগ কমিয়ে দেয়। ফোঁপাতে থাকে শুধু। রায়হান খুব মনোযোগ দিয়ে মেয়েটিকে দেখে। খুব নরম স্বরে জিজ্ঞেস করে- কাঁদছেন কেন? বাড়ীর কথা মনে পড়েছে?
না। মেয়েটি মাথা নেড়ে জবাব দেয়।
তাহলে?
মেয়েটি এবার দুই হাত জোড় করে রায়হানের সামনে মাথা নীচু করে দাঁড়ায়। আর ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে- আপনি আমাকে খারাপ ভাববেন না প্লীজ। আমি ভয় পেয়ে আপনাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। আর কিছু না। আমাকে খারাপ ভাববেন না প্লীজ।
রায়হান বুঝতে পারে বিষয়টা। হেসে ফেলে মিষ্টি করে। বলে- ঠিক আছে। আপনার মন খারাপ করার কোন কারণ নেই। আমি বিষয়টাকে খুব সহজভাবে নিয়েছি। এবার কান্না থামান প্লিজ।
কান্না থামায় মেয়েটি। আর সাথে সাথেই অবাক করা কান্ড করে বসে। মেয়েটি রায়হানের পায়ের উপর হুমড়ি খেয়ে প্রণাম করে। রায়হান বিব্রত বোধ করে। ঝুঁকে পড়ে মেয়েটিকে টেনে তোলে। শশব্যস্ত হয়ে ভয়ার্ত কণ্ঠে বলে- আমার ধর্মে তো মানুষকে এভাবে প্রণাম করা মহাপাপ। এ কি করলেন আপনি?
মেয়েটি খুব দৃঢ় অথচ বিনয়ী কণ্ঠে বলে- আপনার ধর্ম কি আমি জানি না। শুধু জানি আপনি দেবতার মত সুন্দর এবং পবিত্র। এ জন্যই আমি আপনাকে প্রণাম করলাম। আমার ধর্মে এটা খুব পূণ্যের কাজ। আমি আপনার সেবা করতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করব।
রায়হান হতবিহ্বল হয়ে যায় মেয়েটির কথা শুনে। অন্য রকম একটা বোধ এসে ভর করে তার ভিতর। সে কোন কথা বলতে পারে না। বৃষ্টি ধরে এসেছে। ঝড় থেমে গেছে। ব্যাঙের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর শব্দ, ঝিঁ ঝিঁ পোকার শব্দ উঠে আসছে চারদিক থেকে। পাশের পলাশ সার কারখানার উঁচু টাওয়ারের বাতিগুলো জ্বলে ওঠায় একটু আগের অন্ধকার ভাবটা কেটে গিয়ে চারদিক ফর্সা হয়ে গেছে।
মন্দিরের বারান্দা থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে তারা দু'জনই। ঘড়ি দেখে রায়হান। আটটা বেজে গেছে। সে যে কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। কিছু একটা করা দরকার। নদীর দিকে তাকায়। আবছা আঁধারে নদীকে স্বপ্নময় মনে হচ্ছে তার কাছে। দূর থেকেই নদীর হালকা ঢেউ বোঝা যাচ্ছে স্পষ্ট। কোন খেয়া নৌকার দেখা মিলছে না এখনো। বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যার শীতল অনুভূতি খুব ভালো লাগছে তার। আকাশের দিকে তাকায়। আকাশ পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। নক্ষত্রগুলো ফুটে উঠছে ধীরে ধীরে। কিছুক্ষণ পর চাঁদও উঠে যাবে আকাশে। ভাবতেই খুব স্বপ্নময় মনে হয় তার। রায়হান ঘোরলাগা চোখে নদীপাড়ের বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যার মায়াময় রূপ দেখতে থাকে।
অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বলে না। মেয়েটিই মুখ খোলে এক সময়- এখন কি করবেন ভাবছেন?
ভাবছি কি করা যায়! বুঝতে পারছি না। গ্রামে ফিরে যাওয়া দরকার। এছাড়া কোন পথ নেই। কিন্তু কিভাবে যাব, ঘাটে তো কোন নৌকাও নেই।
নৌকা নিয়ে ভাববেন না। এখনই মিলের সাইরেন বেজে উঠবে। আর তারপরই ওপার থেকে নৌকা চলে আসবে শ্রমিক পারাপারের জন্য।
রায়হান খুশী হয় শুনে। এই কথাটা তার মাথায় আসে নি। তাহলে তো রিঙ্াও আসতে পারে দু'একটা। তাহলে গ্রামে না গিয়ে পলাশে গিয়ে কোন হোটেলে রাতটা কাটিয়ে দিলেই হয়। কিন্তু ওখানে কি হোটেল আছে কোন? ভাবতে ভাবতে সে প্রশ্ন করে বসে মেয়েটিকে- পলাশে কি কোন আবাসিক হোটেল আছে?
মেয়েটি একটু ভেবে বলে, না আবাসিক হোটেল নেই।
একটু কি যেন ভেবে মেয়েটি আবার বলে- কিছু যদি মনে না করেন তাহলে একটা কথা জিজ্ঞেস করি।
হ্যাঁ, কোন সমস্যা নেই। বলুন কি জানতে চান?
না মানে আপনি যাবেন কোথায়? আর এসেছেনই বা কোত্থেকে?
এতক্ষণে রায়হানের খেয়াল হয়, আসলে তাদের পরিচয়ই হয় নি এই এত দীর্ঘ সময়ে। ঘটনার আকস্মিকতায় তারা কেউই কারো পরিচয় জানতে চায় নি। অথচ তারা কত ঘনিষ্ট হয়ে গেছে এরই মধ্যে। কি আশ্চর্য! মেয়েটি না জিজ্ঞেস করলে তো সেটাও জানা হতো না। সে হাসতে হাসতে বলে-
দেখুন তো কি আশ্চর্য, আমরা কারো নামটাও জানি না, অথচ কতটা সময় একসাথে পার করে দিলাম।
মেয়েটি এবার খিলখিল করে হেসে ফেলে বলে- ভগবানের লীলা বোঝা বড় দায়। আমিও আশ্চর্য হচ্ছি ব্যাপারটায়। সে যাক- আমি চন্দ্রমলি্লকা, বাড়ী ঠিক নদীর ওপারে। আর আপনি?
আমি রায়হান। ঢাকা থাকি। গ্রামের বাড়ী বড়গাঁও। আপনাদের ওখান থেকে মাইল তিনেক দূরে। ঢাকা যাচ্ছিলাম এই পথে।
ও, বুঝেছি। আর আমি ঢাকা থেকে এলাম, এনজিও'র একটা জরুরী প্রোগ্রাম সেরে। আপনি তো আর আজকের কোন বাস পাবেন না। আবাসিক কোন হোটেলও নেই এদিকটায়। পরিচিত কেউ আছে নাকি পলাশে?
আছে তো অনেকেই। কিন্তু আমি তো কারো নাম-ঠিকানা কিছু জানি না। এ পথেও আজই প্রথম এলাম আমি।
ওহ্্ হো, তাহলে তো সমস্যা অনেক। আচ্ছা আপনি কি গ্রামে ফিরে যাবেন? পারবেন তো এই রাতে ফিরে যেতে?
তাই ভাবছি। কখনো গ্রামে-গঞ্জে রাত-বিরাতে একা একা বের হই নি। রিঙ্া পেলে হয়তো যাওয়া সহজ হবে। কিন্তু না পেলে খুবই কঠিন হবে আমার জন্য।
আচ্ছা চলুন আগে ওপারে যাই। রিঙ্া হয়তো পাওয়া যাবে না, তবু একটা কিছু ব্যবস্থা করতে হবে।
চলুন না আগে যাওয়া যাক।
কথা বলতে বলতেই মিলের সাইরেন বেজে ওঠে। রায়হান সচকিত হয়ে ওঠে। ভালো করে তাকায় নদীর দিকে। ওপারে কতগুলো টর্চের আলো জ্বলে উঠতে দেখে রায়হান। বোঝা যায় তারা ঘাটে এসে নৌকা ঠিকঠাক করছে। খেয়াপারের সব নৌকাগুলো ধীরে ধীরে ওপার থেকে এপারে আসা শুরু করে। চন্দ্রমলি্লকার ইশারায় রায়হান নদীর দিকে নামতে থাকে। পাশাপাশি নামছে তারা। নদীতীরের ঝোপঝাড়গুলোর দিকে চোখ যায় রায়হানের। অসংখ্য জোনাক পোকা ওড়াওড়ি করছে। রায়হান দৌড়ে গিয়ে একটা জোনাক পোকা ধরে মুঠোয় পুরে খেলতে থাকে। চন্দ্রমলি্লকা রায়হানের ছেলেমি দেখে হাসে। ভালো লাগে তার।
নদীর দুই পাড় ভালো করে লক্ষ্য করে রায়হান। এপাড়ে পলাশের দিকে মিল-কারখানার আলোয় আলোকিত নদীর পাড়, আর ওপারে জমাট অন্ধকার। এপাড়ে জীবনের প্রাণচাঞ্চল্য, ওপাড়ে ঘুমের আবেশ। নদীর মাঝামাঝি এলে সে অবাক হয়ে নদীর জলে মিল-কারখানার আলোর ঝিকিমিকি লক্ষ করে। পানিতে হাত ভিজিয়ে নদীর সাথে মিতালী করতে চেষ্টা করে। হাত দিয়ে পানি ছুঁড়ে দিয়ে আলোর ঝিকিমিকি ছত্রখান করে দেয়। খুব ভালো লাগে রায়হানের। মনে মনে ধন্যবাদ দেয় ঝড়-বৃষ্টিকে। এ সময় পুব আকাশে চাঁদ ওঠে টকটকে লাল গোলাকার থালা হয়ে। এই চাঁদটাকে সে আগে কখনো দেখে নি। সে অবাক হয়, এটা কি চাঁদ নাকি সূর্য! সে অবাক হয়। চাঁদটা ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠতে থাকে আর উজ্জ্বল হতে শুরু করে। নদীর পানিতে বৈঠা ফেলার শব্দ ছাড়া আর শব্দ নেই। রায়হান তন্ময় হয়ে চন্দ্রের ধীরে ধীরে উঠে আসা দেখতে থাকে। মনে হয় দেখতে থাকবে অনন্তকাল। মেয়েটি তার তন্ময়তা ভাঙতে চায় না। তার কানের কাছে মুখ এনে অস্ফুটে জিজ্ঞেস করে- কি দেখছেন?
রায়হান ঘোরলাগা কণ্ঠে বলে ওঠে- চন্দ্রমলি্লকা।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • ফাতেমা প্রমি
    ফাতেমা প্রমি বাহ....সুন্দর লেখনি.....
    প্রত্যুত্তর . ২০ নভেম্বর, ২০১১
  • সালেহ  মাহমুদ
    সালেহ মাহমুদ ধন্যবাদ ফাতেমা প্রমি |
    প্রত্যুত্তর . ২০ নভেম্বর, ২০১১
  • জাকিয়া জেসমিন যূথী
    জাকিয়া জেসমিন যূথী আপনার লেখায় অনেকগুলো বানানে ভুল রয়েছে। টাইপিং মিসটেক। এটা কেন হয়েছে? এত্ত ভালো এক লেখনীর ভেতরে এত বানানের টাইপিং মিস্টেক আসলে বরদাস্ত করা যায়না। গল্পটি মন ছুঁয়ে গেলো।
    প্রত্যুত্তর . ২১ নভেম্বর, ২০১১
  • সালেহ  মাহমুদ
    সালেহ মাহমুদ জুঁইফুল : অনেক ধন্যবাদ ভালো লাগার জন্য। আর বানান ভুল কিছু হয়েছে বেখেয়ালে, কিছু হয়েছে কনভার্ট জনিত সমস্যার কারণে। ভবিষ্যতে এ দিকে যত্নবান হওয়ার চেষ্টা করবো। ধন্যবাদ।
    প্রত্যুত্তর . ২১ নভেম্বর, ২০১১
  • আনিসুর রহমান মানিক
    আনিসুর রহমান মানিক বেশ ভালো /
    প্রত্যুত্তর . ২৩ নভেম্বর, ২০১১
  • খোরশেদুল আলম
    খোরশেদুল আলম বৃষ্টি ভেজা গ্রামের অন্ধকার রাত, আকাশে চাঁদ, ঝিঝি পোকার ডাক। দুজন অচেনা মানুষের রোমান্টিকতা। খুব ভালো হয়েছে গল্প।
    প্রত্যুত্তর . ২৩ নভেম্বর, ২০১১
  • সালেহ  মাহমুদ
    সালেহ মাহমুদ আনিসুর রহমান মানিক : ধন্যবাদ |
    প্রত্যুত্তর . ২৩ নভেম্বর, ২০১১
  • সালেহ  মাহমুদ
    সালেহ মাহমুদ খোরশেদুল আলম : ধন্যবাদ ভাই |
    প্রত্যুত্তর . ২৩ নভেম্বর, ২০১১
  • রনীল
    রনীল কাহিনীটি সাধারন কিন্তু বর্ণনার কারনে গল্পটি মন কেড়েছে। মাঝখানের ফ্ল্যাশব্যাকটায় কিছুটা বিভ্রান্ত হয়েছি। একটা পর্যায়ে এসে মনে হয়েছিল- গল্পটি ভৌতিক দিকে এগুচ্ছে, কিন্তু সেদিকে যায়নি। এখন মনে হচ্ছে সেদিকে গেলে আরো ইন্টেরেস্টিং হত হয়তো।
    প্রত্যুত্তর . ২৮ নভেম্বর, ২০১১
  • সালেহ  মাহমুদ
    সালেহ মাহমুদ ধন্যবাদ রনীল। আমার উপলব্ধিও তাই। একটা কথা, আমি আসলে বর্ণনাটিকেই প্রাধান্য দিয়েছি। ধন্যবাদ আবারও।
    প্রত্যুত্তর . ২৮ নভেম্বর, ২০১১

advertisement