লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৯ মে ১৯৯৫
গল্প/কবিতা: ১টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

৫০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftমা (মে ২০১১)

রেসাস ফ্যাক্টর
মা

সংখ্যা

মোট ভোট ৫০

তানভীর শাহরিয়ার রিফাত

comment ২২  favorite ১  import_contacts ১,১০১
সবাই অবাধ্য হিসেবেই জানে। কারোর কোন কথা শোনে না। আদেশ-নিষেধের ধার ধারে না। এখন কেউ তার ব্যাপারে তাদের মহামূল্যবান নাকটাকে আর গলায় না। ফলশ্রুতিতে সে মনের সুখে আকাম-কুকাম করে বেড়ায়।
আজ আরেকটা অকাজ করে বাসায় ফিরছে সজীব। একটা বিড়াল ছানাকে কব্জা করেছে সে। ছানাটির মা একটু চোখের আড়াল হতেই সে টুপ করে তুলে এনেছে তাকে। এজন্য তার মোটেই দু:খ হচ্ছে না। বরং তার আনন্দ হচ্ছে। কারণটা তার নিজেরও জানা নেই।
তবে সমস্যা একটা রয়ে গেছে। রাগে গজরাতে গজরাতে ছানাটির মা সজীবের পিছু পিছু আসছে। সজীব পিছন ফিরে ওটাকে তাড়া করল। বিড়ালটি পিছু হটলেও একেবারে চলে গেল না। শুধু অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। বোধহয় সে বুঝতে পেরেছে শক্তিতে সে পেরে উঠবে না।
সজীব একটা নিচু দেওয়ালের উপর পা ঝুলিয়ে বসে বিড়াল ছানাটির কথা ভাবলো। ছানাটি কত সৌভাগ্যবান! ওর মা ওকে কত ভালবাসে! আর তার নিজের মা? মাকে নিয়ে তার কোন স্মৃতি নেই। থাকবেই বা কি করে? তার জন্মের দিনই তিনি মারা যান। মায়ের ভালোবাসা- নামক বস্তুটাকে সে কোনদিন পায় নি। আরও ছোট থাকতে স্কুলে টিফিনের সময় যখন অন্য ছেলেমেয়েদের মায়েরা এসে তাদের টিফিন খাওয়াতো তখন সজীবের তার মৃতা মায়ের উপর ভীষণ রাগ হতো। এখন আর হয় না। সজীব জানে মৃত্যুর উপর ছড়ি ঘুরানোর ক্ষমতা কোন মানুষের নেই। তারপরও মায়ের উপর অভিমান, একটু স্নেহ পাবার আকুতি- তাকে এক মুহূর্ত শান্তি দেয় না। তার ভিতর যে Damn care ভাব আছে- তা সৃষ্টি হওয়ার গোপন রহস্য বোধ হয় এটাই।
এতসব ভাবনার মধ্যে মনের অজান্তেই সজীবের হাত চলে গেল প্যান্টের পকেটে। সেখানে একটা চিঠি রয়েছে। তার বাবার চিঠি। গত দুই দিন ধরে সে এটা সাথে করে নিয়ে ঘুরছে। সে পড়ে নি। আসলে পড়তে ইচ্ছা হয়নি। পত্রলেখক তো সেই বাবা যার সাথে বছরে দুই-তিনবার দেখা হয় এবং কথা হয় অনেকটা অফিসিয়াল স্টাইলে! তিনি আবার লিখেছেন চিঠি?
আজ কি মনে করে চিঠিটা খুলল সজীব। পত্র শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে স্মারক। এটা কিসের স্মারক? জানা নেই সজীবের।

স্নেহের সজীব,
‘স্নেহের’ শব্দটা লিখতে গিয়ে অস্বস্তি হচ্ছিল। তোমার ষোল বছরের জীবনে আমি কখনো কি তোমাকে ‘স্নেহ’ নামক স্বর্গীয় জিনিসটাকে দিয়েছি? প্রশ্নটার উত্তর তোমাকে ভাবতে হবে না। নিদারুন উত্তরটা আমি জানি।
তোমার মনে কোনো এক সময় নিশ্চয়ই প্রশ্ন জেগেছে, কেন আমি তোমাকে নিজের কাছে না রেখে এক মফস্বল শহরে তোমার খালার কাছে রেখেছি? যার ফলে প্রতিনিয়ত তোমার আর আমার মধ্যে দূরত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পাচ্ছে। যদিও আমি এর সদুত্তর দিতে পারবো না। তারপরও কথাগুলো বলে বুকের উপর ষোল বছর ধরে চেপে থাকা পাথরটা সরাতে চাই।
তুমি হয়তো বা ভাবছো, এতদিন পর আমি কেন আমার কৃত কাজের কৈফয়েত দিতে যাচ্ছি? আসলে এর কারণটা তোমার মা। কাল রাতে স্বপ্নে বর্ণকে দেখলাম। তোমাকে নিয়ে তাকে খুব চিন্তিত মনে হল। জানি এটা আমার অবচেতন মনের সৃষ্টি। তারপরও তোমাকে সবকিছু খোলাখুলিভাবে বলার সিদ্ধান্ত নিলাম।
তবে মূল ঘটনাটি বুঝতে হলে তোমাকে Medical Science-এর একটা বিষয় সম্পর্কে জানতে হবে। সহজ ভাষায় বিষয়টা তোমাকে বলার চেষ্টা করছি। আশা করি তুমি বুঝতে পারবে। বিষয়টার নাম Rh factor বা রেসাস ফ্যাক্টর। একেবারে সহজ কথায় বলতে গেলে বলতে হয় মায়ের রক্তের গ্রুপ যদি নেগেটিভ হয় এবং বাবার পজেটিভ হয় তবে প্র্থম সন্তান জন্ম হবার পর মায়ের শরীরে এক ধরনের এন্টিবডি তৈরী হয়। এন্টিবডি সম্পর্কে নিশ্চয়ই তুমি ক্লাসের বইয়ে পড়েছো। যাই হোক, মায়ের শরীরে সৃষ্ট ঐ এন্টিবডি তাদের দ্বিতীয় সন্তানের ভ্রূণ নষ্ট করে দেয়। আর যদিও বা সন্তানের জন্ম হয় তবে সে রক্তশূণ্যতা এবং জন্ডিস রোগে ভোগে।

তুমি কি বুঝতে পারছো এতসব কথা আমি কেন বলছি? কারণ বর্ণ আর আমার মধ্যে Rh factor কার্য্কর ছিলো। একথা তুমি নিশ্চয়ই জানো, তোমার এক বড় ভাই ছিল। সে এক বছর বয়সে মারা যায়। এর অর্থ হল তুমি আমাদের দ্বিতীয় সন্তান। Rh factor অনুযায়ী তোমার জন্ম হওয়ার কথা ছিলো না, অথবা জন্ম হলেও বিভিন্ন্ স্বাস্থ্য্গত সমস্যা দেখা দেওয়াটাই নিয়মের ভিতর পড়ে। কিন্তু বুঝতেই পারছো তার কোনটাই ঘটে নি।
তোমার বড় ভাই মারা যাওয়ার পর থেকেই বর্ণ মনমরা হয়ে থাকতো। একদিন সহসাই সে দ্বিতীয় সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত্ নিয়ে ফেলে। আমি তাকে অনেক বুঝানোর চেষ্টা করলাম। এতে তারও যে জীবনের ঝুঁকি রয়েছে তাও বললাম। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। তোমার এক রোখা মা নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকলো। কথা বন্ধ্ করে দিলো, না খাওয়ার হুমকি দিলো। শেষমেষ মনের প্র্বল অনিচ্ছা থাকা স্ব্ত্ত্বেও বর্ণের কথাই আমাকে মানতে হলো।
যখন তোমার জন্ম হলো তার আগ মুহূ্র্তেও ডাক্তারদের ধারণা ছিল যে, তুমি মারা যাবে। কিন্তু সকল ধারণা ভুল প্র্মাণিত করে এই ধরাতে তোমার আগমণ হল সুস্থ্-সবলভাবে। বর্ণের সাথে আমার দেখা করার সুযোগ মিলল। বিস্ম্য় চেপে রেখে ঘরের ভিতর গেলাম। বর্ণ আমাকে দেখে ম্লান হেসে বলল, ‘দেখলে তো! আমার ছেলের কিছু হয় নি। ভবিষ্যতেও আমি আল্লাহর কাছে আমার জীবনের বিনিময়ে ওকে চেয়েছি।’ আমি কোন কথা বলতে পারলাম না। এর ঘন্টাখানেক পর বর্ণ মারা যায়।
এই হল ঘটনা। এরপর আমার উচিত ছিলো তোমাকে নিজের কাছে রেখে মানুষ করা। কিন্তু আমি তা সঠিকভাবে করতে পারতাম না। কারণ তোমাকে দেখে আমার খালি মনে হতো তোমার জন্য্ বর্ণ মরেছে। এই জন্য্ই আমি সবসময় তোমার থেকে দূরে দূরে থেকেছি। জানি, সম্পূর্ণ অমূলক একটা ভাবনা দ্বারা আমি তোমার উপর অবিচার করেছি। এ অপরাধ ক্ষমার যোগ্য্ না। ক্ষমা চাচ্ছিও না। শুধু তোমার জীবনের মূল্য্ বোঝাতে চাই।
তোমার জন্ম তারিখ হল ১৪ই মে। দিনটি ছিল মাসটির দ্বিতীয় রবিবার। অর্থাৎ বিশ্ব্ মা দিবস। এই মা দিবসে মাতৃস্নেহের যে অনুপম দৃষ্টান্ত্ তোমার মা রেখে গেছে তা অতুলনীয়। তোমার মনে মাকে নিয়ে একটা অভিমান জমাট বাঁধাই স্বাভাবিক। কারণ তুমি জন্মের পর থেকে কোনদিন মায়ের ভালোবাসা পাও নি। এটা ভেবে তুমি নিশ্চয়ই কষ্ট্ পাও। তবে তুমি জন্মের আগে যে ভালোবাসা পেয়েছো, তা এই পৃথিবীতে কয় জনে পেয়েছে? তোমার শরীরের প্র্তিটি DNA তোমার মায়ের ত্যাগের ফসল। একমাত্র্ তোমার মায়ের ভালোবাসার কারণেই Medical Science হার মেনেছে। ঘটে গিয়েছে Miracle।
তোমার খালার কাছ থেকে জানতে পেরেছি, তুমি দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছো। কারোর কোন কথা শুনছো না। আমি শুধু একটা কথাই বলব। প্র্কৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে তোমার জন্ম। তাই অন্ত্ত নিজের মায়ের জন্য্ জীবনটাকে হেলায় নষ্ট করে দিও না। এটা তোমার প্র্তি আমার অনুরোধ।
আজ অনেক দিন পর মনটা অনেক হালকা লাগছে। আমি সম্পূর্ণ ভারমুক্ত্। আমার মন বলছে, তোমার সাথে আমার আর দেখা হবে না।
ইতি
তোমার বাবা


চিঠিটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকলো সজীব। তার আরেক হাতে বিড়াল ছানাটি তখনও ধরা ছিলো। সজীবের চোখ এদিক-ওদিক মা বিড়ালটিকে খোঁজা শুরু করল। ওই তো, একটু দূরেই তো বসে রয়েছে! কিন্তু ওটা এমন ঝাপসা কেন? তবে কি সজীবের চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে? সে কি কষ্ট পেয়েছে? সজীব ছানাটিকে মাটিতে নামিয়ে রুদ্ধ্ কন্ঠে বলল, ‘যা, তোর মায়ের কাছে যা।’

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement