লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১২ ডিসেম্বর ১৯৯০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftআমার বাবা (জুন ২০১৫)

গ্যাস বেলুন
আমার বাবা

সংখ্যা

মো: শরীফ খান

comment ২  favorite ০  import_contacts ২৮৯
-বাবা, মা কি আজকেও আসবে না?
প্রশ্ন শোনে মেয়ের দিকে ফিরে তাকাল অনিমেষ।সে তার ৫ বছরের মেয়ে তিথি কে নিয়ে বসে আছে পার্কের বেঞ্চে।প্রতি মাসের শেষ শুক্রবার তিথিকে নিয়ে সে এখানে আসে।নিতুর সাথে যখন তার ছাড়াছাড়ি হয় তখন এমনটাই কথা হয়েছিল। মাসের শেষ শুক্রবার সে এসে মেয়েকে দেখে যাবে এখানে। প্রথম বছরকানিক এসেও ছিল কিন্তু বিগত ছয় মাস সে আসছে না।
-কি হল বাবা, মা কি আজকেও আসবে না?
-তোমার মা মনে হয় আজকেও কাজে আটকা পরে গেছে।
-মার এত কাজ কেন বাবা?
-বড়দের অনেক কাজ থাকে,তুমি বড় হও দেখবে তোমার ও কাজ থাকবে।
অনিমেষের খুব অস্বস্তি লাগছে।মেয়েটাকে মিথ্যা বলা হচ্ছে।গত ছয় মাস যাবত নিতুর সাথে তার কোন যোগাযোগই হয় নাই। এইসব কথা এখনই তিথিকে বলা সম্ভব না তাই বাধ্য হয়েই তাকে মিথ্যাটা বলতে হচ্ছে। মিথ্যাটা বলতে গিয়ে সে বুঝতে পারছে, বাবা হয়ে মেয়ের কাছে মিথ্যা বলাটা পৃথিবীর কঠিনতম কাজের একটি।
-বাবা, মা আমাদের সাথে থাকে না কেন?
-মাগো একসাথে থাকতে হলে ভালবাসা লাগে।
-বাবা ভালবাসা কি?
-আমি জানি না মা।
-মা এখন যেখানে থাকে সেখানে কি ভালবাসা আছে বাবা?
-অবশ্যই আছে, আছে বলেই তো তোমার মা ওইখানে থাকে।
-বাবা তুমি কি অনেক অনেক ভালবাসা আমাদের বাসায় আনতে পারবে না? মা এখন যেখানে আছে সেখান থেকেও অনেক অনেক বেশি ভালবাসা।তখন আমি মাকে বলতে পারব মা তুমি কেন চলে গেলে? দেখ আমাদের বাসায় কত্ত ভালবাসা, ফিরে আস মা।
অনিমেষ কিছু বলে না। কাওকে বেধে রাখার জন্য শুধু ভালবাসা সত্য হলেই হয় না, শক্তও হতে হয়। তবে ভালবাসা যদি কিনতে পাওয়া যেত তবে বোধ হয় ভালই হত।খাবারের দোকান গুলোতে যেমন রকমারি খাবার পাওয়া যায়, ভালবাসার দোকানেও পাওয়া যাবে রকমারি ভালবাসা। দোকানে ঢুকেই সে বলতো-
-মেয়ের জন্য মায়ের ভালবাসা আছে ভাই আপনার এখানে।
-থাকব না মানে, আমার এইখানে মানুষের প্রতি জিন্নতের ভালবাসা ও পাওয়া যায়। দাম একটু বেশি।
-ভাল ভাল, আমাকে মেয়ের জন্য মায়ের ভালবাসা দেন।
-ভাই এইগুলা নিয়া কি করবেন।পুরাতন আইটেম,এখন আর চলে না। আপনি বরং মানুষের প্রতি জিন্নতের ভালবাসা আইটেম টা নিয়া যান। একদম নতুন ।
-না ভাই এইটা আমার লাগবে না।
-আরে ভাই ভাল কথা শোনেন, আইটেম টা নিয়া যান। মানুষের ভালবাসা তো অনেক দেখলেন কিছু দিন একটু দেখেন জিন্নতের ভালবাসা কেমন লাগে।
-ভাল কথা শোনতে ইচ্ছা করছে না ভাই।
-তাও কথা, আপনি যদি ভাল কথা শোনার লোক হতেন তবে কি আর ভালবাসা খরিদ করতে আসতেন।
-জী, এখন আপনি আমার জিনিসটা দেন আমি চলে যাই।
-ওইটা নাই, পুরাতন আইটেম। মার্কেট আউট।
বিকেল শেষ হয়ে সন্ধ্যা হয়ে আসছে । এই সময়টাকে গোধূলি বলে। গোধূলির সময় সূর্য পৃথিবীতে আলো দেয় না, সূর্য ডুবে যাওয়ার পর পরই শুরু হয় গোধূলির সময়। পৃথিবীর উড়তে থাকা সব ধুলোবালি, অণু পরমাণু শেষ হয়ে যাওয়া সূর্যের আলোটাকে ধরে রাখতে চায় তখন। ধরে রাখার চেষ্টাটা মন্দ হয় না। এই সময়টায় সূর্যের ফেলে যাওয়া মায়ায় পৃথিবীটা বড় অপরূপ দেখা যায়। খোলা ছাদের কার্নিশ ধরে বা সবুজ মাঠের প্রান্তরে দাড়িয়ে কয়জনই বা পৃথিবীর এই রুপ দেখেছে। অনিমেষের বড্ড আফসোস হয়।তবে সে তার মেয়েকে অবশ্যই এই সব মায়াময় মুহূর্ত গুলো থেকে বঞ্চিত করবে না। তার মেয়েটা যে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মায়া থেকে বঞ্চিত।


-বাবা আমি কি আইসক্রিম খেতে পারি?
-অবশ্যই খেতে পার।
অনিমেষ দুই জনের জন্য দুইটা আইসক্রিম কিনে।একগাদা রঙ টং দিয়ে এরা জিনিসটা ভালই বানায়। দেখতে এত সুন্দর যে খেতে মন চায় না। সে তিথির হাতে আইসক্রিম তুলে দিতে দিতে বলে-
-বুঝলে মা তিথি, তোমার মা না থাকাতে এক দিকে ভালই হয়েছে। এইযে এখন আমরা আইসক্রিম খাচ্ছি তোমার মা থাকলে কিন্তু খেতে দিত না।
- কেন খেতে দিত না বাবা?
-এটা হচ্ছে মায়েদের শাসন। সব মায়েরাই তার সন্তানদের শাসন করতে পছন্দ করে। কাজটা তারা মায়া থেকে করে, কোন শাসনই মায়ার বাহিরে না, মায়া থেকেই শাসনের জন্ম।
-বাবা আমি যেদিন মা হব সেদিন কি আমিও শাসন করতে পারব?
-অবশ্যই পারবে।
-বাবা আমি কবে মা হতে পারব?
- একজন মানুষের ভেতরে যতটুকু মায়া থাকলে মা হওয়া যায় তোমার ভেতরে যখন ততটুকু মায়া তৈরি হবে তখন তুমি মা হতে পারবে।
-বাবা মায়া কি?
-মায়া বড় বিষম বস্তু গো মা।।
তিথি বাবার কথা কিছুই বুঝে না ফেল ফেল করে থাকিয়ে থাকে। অনিমেষের বড় অবাক লাগে, বাচ্চা একটা মেয়ে কে কিসব কঠিন কঠিন কথা বলছে সে। মাথাটা বোধহয় পুরাই গেছে।কিন্তু কি করবেন তার যে বলতে বড্ড ভাল লাগে।
দূরে এককোনে দাড়িয়ে একজন রংবেরঙের গ্যাসবেলুন বিক্রি করছে। অনিমেষ মেয়ের হাত ধরে সে দিকে এগিয়ে যায়। মেয়ের হাতে কয়েকটি রঙিন গ্যাস বেলুন কিনে দেয়। আনন্দে তিথির চোখমুখ ঝলমল করে উঠে। প্রতিটা মানুষের ভেতর রঙধনুর সাত রঙ থাকে,যতদিন সেই রঙ থাকে ততদিন মানুষের জীবনও রঙিন থাকে। কোন এক মহিন্দ্রক্ষনে মানুষ সেই রঙ গুলো তুলে দেয় তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির হাতে। অনিমেষও তার রঙ গুলো তুলে দিয়েছিল মানুষটির কাছে, মানুষটা চলে গেছে সাথে করে সব রঙও নিয়ে গেছে।
তিথির একটি হাত শক্ত করে ধরে আছে তার বাবার তর্জনী অন্য হাতে রঙিন গ্যাস বেলুন।পৃথিবীর গায়ের লেগে থাকা সূর্যের মায়া ফুরিয়ে আসছে, ফুরিয়েই তবে যাবে, মায়া যে অতি বিষম বস্তু, কেবলই ফুরিয়ে যায়।পরতে পরতে অন্ধকার নামছে চারদিকে। তিথি লাফ দিয়ে হাতের বেলুন গুলো ছেড়ে দেয় আকাশের দিকে। পাই পাই করে রঙিন বেলুন গুলো উড়ে যায় নীল রঙের আকাশটাকে ছুবে বলে।কিন্তু সকল মায়া যে ফুরিয়েছে, আকাশটা যে ক্রমেই অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে আর বেলুন গুলোও রঙ হারিয়ে ফ্যাঁকাসে হয়ে যাচ্ছে।
তিথি তার বাবার হাত ধরে হাঁটছে, কোথায় যেন একটা অপূর্ণতার দীর্ঘশ্বাস। বাচ্চা মেয়েটির এক হাত থাকবে তার বাবার হাতে অন্য হাতটি থাকবে তার মায়ের হাতে, দুজনকে দুইপাশে রেখে সে হেঁটে যাবে নির্ভয়ে তবেই না পূর্ণতা পাবে দৃশ্যটি। কত সুন্দর দৃশ্যই অপূর্ণ থেকে যায় কেবলই ভালবাসার অভাবে। তারপরও কেন একজন মানুষের ভালবাসা অন্য আরেকজনের আকাশে ফ্যাঁকাসে গ্যাস বেলুন হয়ে যায়?

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement