লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৯ নভেম্বর ১৯৮৬

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবাবা দিবস (জুলাই ২০১৪)

ফজলু আসছস, ও ফরিদ...
বাবা দিবস

সংখ্যা

অশ্বদ তলে ঈশ্বর

comment ০  favorite ০  import_contacts ১৬৮
১.
বুড়ি জানে ওরা আর আসবেনা। ওরা আর আসবার নয়। আর কত? বুড়া চলে গেছে বহু বছর আগে। একা বুড়ি ভূষণ্ডির কাক হয়ে ছেলেদের ঘরে ঘরে চড়ে বেড়াচ্ছে বছরের পর বছর। কিন্তু কিইবা করার। ডাক না আসলে উপায় কি? প্রতিদিনই তাকে বিড়বিড় করে বলতে শুনা যায়, ‘আল্লা মউত দে, মউত দে’। কিন্তু হায়, সময় না হলে কিইবা তার করবার? আরশে লেখা আছে আগেই; কে কখন আসবে বা কে কখন যাবে।
এখন তো সে একেবারে অথর্ব। ছেলেগুলার নাম ছাড়া প্রায় সবই ভুলে গেছে, কিছুই মনে থাকে না। গায়ে জোর নাই, নড়া চড়ার বল নাই, পাশ ফিরে শুতেও কষ্ট। হাগামুতা? সেত বিছানেই। ঘিন্নায় কেউ কাছেই ঘেঁষে না। মাঝে মাঝে ছেলে বউদের বিজাত গাইল কানে আসে তার। তখন মনে হয় লক্ষ মাইল দূর থিকে কেউ তার দিকে থুতু ছিটাই দিচ্ছে। থু থু..!. আর কি মানায় তার এপারে বসবাস?
সালামত শেখ আছিলো একটা শুয়োরের বাচ্চা, মনে মনে অভিশাপ দেয় বুড়ি। বিছানে শুইলে কাম তার ছিল একটাই। কিন্তু বছরের পর বছর ঝামেলা যা করার তাতো ছালেকাকেই করতে হয়েছে। পোলাই পয়দা দিছে ছয়ডা। ওহ! মনে হইছে, পোলাগো নামের বাইরে নিজের নামটা তার এখনও মনে আছে। পোলাদের একজন ভ্যান চালায়, একজন তাঁত বোনায়, একজন ভটভটি আর বাকিগুলানের কথা একেবারে ইয়াদ আসতেছে না। আর, আরও কি জানি একটা মনে আছে......।
বারান্দা, এক বারান্দা আর লোকজন, ডাক্তার। হুম ডাক্তারই তো। ডাক্তার তার বন্ধ চোখের পাতা টান মেরে দেখতেছে কিছু একটা। চোখে লাইট ধরে কেন হারামির পুত। বুড়ি বিড়বিড় করে ছড়া কাটে ‘খিদা নষ্ট করে মুড়ি, বাড়ি নষ্ট করে বুড়ি। খিদা নষ্ট করে মুড়ি, বাড়ি নষ্ট করে বুড়ি’। বুড়ি সারা বাড়ি নষ্ট করেছে, সারা দুনিয়া নষ্ট করছে কিন্তু তারপরেও তার এখনও ডাক আসছে না কেন?

২.
বাঁশের মাচালে লাশের মত পড়ে আছে এক নিষ্প্রাণ দেহ। মাচালটা কাঁধে চাপিয়ে ব্যস্ত পায়ে হনহন করে হেঁটে চলছে দুই জন। পেছনে পেছনে আরও একজন হাঁটছে। ‘ওই থাম, মেলা দূর আইছি, এইহানেই নু ফালাই যাই’ পেছনের জন বলে। ‘ভাই খাড়াও, পাক্কি সড়ক সামনেই, সড়কের কাছে ফালাই যাই, এইহানেত শিয়াল কুত্তায় খাব’ অন্যজন উত্তর দেয়। ‘খাইগগ্যা। আচ্ছা নু সড়কেই ফালাই যাই’ অপরজন মন্তব্য করে।

৩.
জীপ গাড়িটা লাশটার সামনে জোরে ব্রেক কষে। ইচ্ছা করলে একটু সাইড দিয়েই যাওয়া যেত। কিন্তু কি যেন মনে করে গাড়িটা থামায় আজমল। ‘হুট শালা, এইডা কি জিনিস!’ গাড়ী থেকে নেমে এগিয়ে যায় আজমল। আরে এত লাশ, খুনখুনে বুড়ি একটা! আহারে। পরক্ষনেই নিজেকে সামলে নেয় আজমল। গাড়ীতে মালিক নাই, কোন ঝামেলায় যাওয়া যাবে না। রাতের মধ্যেই ঢাকা পৌঁছাতে হবে। নইলে নির্ঘাত মালিক তার খবর করে করবে। আবার গাড়ীতে গিয়ে বসে সে, কিন্তু গাড়ীটা স্টার্ট দেয় না। কি মনে করে সে আবার চলে যায় লাশটার কাছে। ময়লা কাপড়টা সরায়ে নাসারন্ধ্রের সামনে দুই আঙ্গুল ছোয়ায় সে। ‘আরে এত তাজা, হায় হায় জান আছে দেহি’ নিজমনে চেঁচিয়ে উঠে সে। বুড়ির কানের কাছে মুখটা নিয়ে সে ডাকতে থাকে, ‘বুড়ি, ওই বুড়ি, বুড়ি’। বুড়ি চোখ দুটো না খুলেই ক্ষীণ ভাবে জিহ্বা নাড়ায়, ‘উঁ, ফরিদ’।

‘বাদ দে, বাদ দে’ মনে মনে কয়েকবার বলেও বাদ দিতে পারল না আজমল। পাঁজাকোলা করে পেছনের সীটে শুইয়ে দিয়ে ড্রাইভারের সীটে গিয়ে বসে সে। বিরক্তি নিয়ে সে পেছনে একবার তাকিয়ে গাড়ী স্টার্ট করে। যেতে যেতে নিজেকে বকতে থাকে সে, শালা আজমল জীবনেও মানুষ হইতে পারল না। পাশ কাঁটায়ে চলে আসলেই হইত। কিন্তু পারলই না। হ্যাঁ, পারত। অবশ্যই সে পারত যদি না মরা মা’য়ের নির্মল রোগা মুখটা তার চোখের সামনে ভেসে না উঠত। আবার চোখটা ভিজে উঠতে থাকে আজমলের। শালা দুই নম্বর মাল পেটে গেছে আজ, সন্ধ্যারাতেই নেশা কেটে যাচ্ছে তার। একদিকে নেশা কাটছে, অন্যদিকে চোখ ভিজে উঠছে। হুদাই।
রাস্তার পাশের একটা টং দোকানের কাছে গাড়িটা থামায় আজমল। এক টুকরা পাউরুটি এনে বুড়ির মুখে গুজে দিয়ে বলে সে, ‘নে বুড়ি। ওহ! তোর তো দাতই নাই দেখি, পাড়বি খাইতে?’ আজমলকে অবাক করে দিয়ে বুড়ি চোখ মুদেই রুটির টুকরাটি মুখের ভেতর ঢুকিয়ে নিতে থাকে। দেখতে দেখতে পুরো টুকরাটি সে সাবার করে ফেলে। অবাক চোখে আজমল ফের প্রশ্ন করে, ‘ও বুড়ি আরও খাবি?’ বুড়ি উত্তরে ‘উঁ’ বলে উঠে।

৪.
কোনখানে জায়গা নাই। আজমল জানে জায়গা থাকারও কথা না। জায়গা কোনদিনও থাকবে না। তার মায়ের জন্যও জায়গা ছিলা না এখানে। কিন্তু আজমল তখন না জানলেও এখন ঠিক জানে কিভাবে কি করতে হয়, কি করলে কি হয়। তাই অন্তত ঢাকা মেডিকেলের কোন এক ওয়ার্ডের বারান্দায় বুড়ির জন্য একটু খানি জায়গা বের করতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। হয়ত দু একের মধ্যে একটা সীটও পেয়ে যাবে।

৫.
পরদিন আজমল যখন কমলা আর কলা নিয়ে বুড়িকে দেখতে গেল অযথাই; তখন সে কাছে যেতেই বুড়ি চোখ আধখোলা করে ঝাপসা চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠল, ‘ফজলু আসছস, ও ফরিদ...’। কিন্তু বুড়ি আসলে ভালমতই জেনে গেছে ফজলু বা ফরিদ কেউ আসেনি। ওরা আর আসবার নয়। কিন্তু কেন যে সে ভোর বিহান থেকেই বারাবার ওদের স্বরে বিড়বিড় করে যাচ্ছে তা কিছুতেই সে ঠাউর করে উঠতে পারছে না।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement